#তুমি_আসবে_বলে_বসন্ত_এসেছে '১৬'
#জেরিন_আক্তার_নিপা
দৃষ্টি কলেজ থেকে ফিরে বাড়িতে দু'জন মেহমানকে দেখে যখন জানতে পারল, আজ থেকে উানারা তাদের সাথেই থাকবে। প্রথমে তার একটু আশ্চর্য লেগেছিল। কিন্তু পরমুহূর্তেই এই ইন্টারেস্টিং খবরটা পেখমকে জানাতে রুমে ছুটে গেল। উনারা কারা, কেন তাদের বাড়িতে থাকবে এসব পরেও জানা যাবে। ফোন হাতে নিয়েই পেখমের নম্বরে কল করল।
পেখম রুমে ফিরে এখনও দম নিতে পারেনি। এর মাঝেই দৃষ্টির কল দেখে কপাল কোঁচকাল। ফ্যানটা আরও বাড়িয়ে দিয়ে এসে কল রিসিভ করল।
-কী হয়েছে? বাড়িও তো পৌঁছতে দিলি না।
-আমাদের বাড়িতে কী চলছে এটা তো জানিসই না।
-এখন জানতে চাইও না। শাওয়ার নেব, খাবো তারপর তোকে কল করব। এখন রাখছি বাই।
-শোন শোন। তাওয়াফ ভাই কাদের যেন বাড়িতে নিয়ে এসেছে। এবং সবথেকে ইন্টারেস্টিং পার্ট কী জানিস? ওরা নাকি এখন থেকে আমাদের সাথেই থাকবে।
অন্য কোন কথা হলে পেখম নিশ্চয় কল কেটে দিত। কিন্তু তাওয়াফ ভাইয়ের নাম শুনে কেনই যেন কল কাটতে পারল না। ভ্রু কুঁচকিয়ে জানতে চাইল,
-কাদের নিয়ে এসেছে?
-একজন মহিলার সাথে আমাদের বয়সীই একটা মেয়ে।
আপনাতেই পেখমের কপাল এবং নাক কুঁচকে গেল। তাওয়াফ ভাই কাদের নিয়ে এসেছে? দু'জনই মেয়ে!
-ওরা তোদের সাথে থাকবে মানে কি?
-মানে আমাদের বাড়িতে থাকবে।
এটা তো পেখমও বুঝতে পারছে। কিন্তু দুইটা মেয়ে মানুষকে তাওয়াফ ভাই বাড়িতে থাকার জন্য কেন নিয়ে আসবে! পেখম নিজেও বুঝতে পারছে না এই কথাটা জেনে তার কেন মেজাজ খারাপ হচ্ছে। কন্ঠে তিক্ততা, কৌতূহলের মিশ্রণ ঘটিয়ে পেখম জানতে চাইল,
-কারা ওরা জানিস কিছু?
-খুব সম্ভবত ভাইয়ার কোন বন্ধুর মা আর বোন।
বন্ধুর মা বোনকে বাড়ি নিয়ে আসতে হবে কেন? তা-ও আবার থাকার জন্য! পেখমের এসব শুনতে আর ভালো লাগছে না। তাই সে দৃষ্টিকে বলল,
-তোদের বাড়ি। তোর ভাই যাকে খুশি এনে রাখতে পারে। আমি জেনে কী করব। আমাদের বাড়িতে তো আর কেউ থাকতে আসেনি। আমার এতকিছু জেনে কাজ নেই। ফোন রাখ। ড্রেস চেঞ্জ করে খেতে যাব।
দৃষ্টি কল কেটে দিলেও পেখমের মেজাজ ঠিক হচ্ছে না। তাওয়াফ ভাই যাদের খুশি এনেছে। তার সমস্যাটা কোথায় হচ্ছে? ওই বাড়িতে সে গিয়ে কতদিনই বা থাকে? তার সমস্যা হওয়ার কথা না। তারপরও হচ্ছে।
****
দুপুর এবং বিকালটা দৃষ্টি দূরে দূরে থাকল। নতুন মানুষ দু'জনের সাথে কথা বলার কোন চেষ্টাই করল না। কিন্তু রাতে আকৃতি আপুর সাথে ওদের রুমে এসেছে। আকৃতি আন্টিকে সালাম দিয়ে জিজ্ঞেস করল,
-কেমন আছেন আন্টি?
-আলহামদুলিল্লাহ মা, আল্লাহ ভালো রেখেছেন।
আকৃতি প্রিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল,
-আমাকে চিনতে পারোনি?
প্রিয়া সচ্ছ হেসে বলল,
-চিনতে পেরেছি। আপনি তাওয়াফ ভাইয়ার বোন।
আকৃতিও হাসল। তার রিনরিনে মিষ্টি গলায় কৌতুক করে বলল,
-আমি তোমার বড়। কিন্তু আপনি ডাকার মতো এতটাও বড় না। তুমি আমাকে তুমি করেই ডাকতে পারো।
আকৃতি আপু কথা বললেও দৃষ্টি চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। আকৃতি প্রিয়ার সাথে ওর পরিচয় করিয়ে দিয়ে বলল,
-ওর নাম দৃষ্টি। আমার সেজো চাচার মেয়ে। ও কিন্তু তোমার ছোট।
একেবারে বোবা হয়ে থাকলেও খারাপ দেখায়। তাই দৃষ্টি জানতে চাইল,
-আপনি কিসের পড়েন আপু?
-অনার্স সেকেন্ড ইয়ার।
-ওহ। আমি কলেজে ফার্স্ট ইয়ারে পড়ি।
আকৃতি প্রিয়ার সাথে আরও নানান কথা জমিয়ে দিয়েছে।
-আমার বাবারা চার ভাই। আমরা দুই ভাইবোন সহ তিন চাচাদেরও ছেলেমেয়ে আছে। সবাই মিলে অনেক মানুষ। দুপুরে সবাই স্কুলে ছিল। এখন রাত হয়ে গেছে তাই আসছে না। সকালেই দেখবে সবাই কেমন তোমার সাথে খাতির জমাতে চলে আসবে।
রাতের খাবার ওদেরকে ঘরেই দিয়ে আসতে বলেছিল তাওয়াফ। নতুন পরিবেশ, নতুন মানুষের মধ্যে সহজ হতে একটু সময় লাগবে। রাতে সবাই খাবার টেবিলে থাকলেও ইলহাম ছিল না। কারণ সে এখনও বাড়ি ফিরেনি। ইলহামের বাবা স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলেন,
-কল করেছিলে ইলহামকে?
-কল করলেও লাভ নেই। তোমার ছেলে ফোন ফেলে রেখে কোন রোগীর পাশে গিয়ে বসে আছে সে-ই জানে।
খাওয়াদাওয়া পর তাওয়াফ খালাম্মা আর প্রিয়াকে দেখতে এলো। দরজায় টোকা দিয়ে বলল,
-ভেতরে আসব?
প্রিয়া জবাব দিল,
-আসুন।
অনুমতি পেয়েও তাওয়াফ একটু দেরি করল। ভেতর এসে আমেনাকে শুয়ে থাকতে দেখে জিজ্ঞেস করল,
-খালাম্মা কি ঘুমিয়ে পড়েছে?
-হুম।
-খালাম্মা খেয়েছিলেন? তোমাদের খাওয়ার টেবিলে ডাকিনি কারণ নতুন পরিবেশে হয়তো সবার সাথে বসে খেতে কমফোর্টেবল ফিল করবে না।
-না ডেকে ভালোই করেছেন। আমার সত্যিই ভীষণ লজ্জা করছে।
-কেউ কি এঘরে এসেছিল? আমি ওদের না করে দেব কেউ এসে যেন বিরক্ত না করে।
-আমি এই কথা বলিনি। নিজের বাড়িতে বাহিরের কেউ এসে থাকা...
-এবাড়ির মানুষ গুলো যেমন আমার পরিবার, তোমাকে আর খালাম্মাকেও আমি আমার পরিবারই মনে করি।
-আমি জানি। তারপরও...
-তারপরও তুমি আমাকে ভাই বলো। কিন্তু ভাইয়ের জায়গা আজ পর্যন্ত দিতে পারোনি।
প্রিয়া কীভাবে বোঝাবে? তার অনুভূতি বোঝাতে ব্যর্থ সে। তাওয়াফ দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলল।
-ঘুমিয়ে পড়ো প্রিয়া। আর তোমার যদি এখানে থাকতে খুব বেশি অসুবিধা হয় তাহলে আমি অন্য ব্যবস্থা করে দেব।
****
ইলহামের ফিরতে ফিরতে এগারোটা বেজেছে। দুই ঘন্টা লাগিয়ে অপারেশন করে একটা রোগীর জীবন বাঁচাতে সক্ষম হয়েছে। এই দু'ঘন্টা ফোন বন্ধ ছিল। ক্যাবিনে ফিরে ফোন চালু করার পর বাড়ি থেকে এত জনের কল যাওয়া দেখে, বাড়িতে কী না কী ঘটে গেছে ভাবতে বাধ্য হলো। মা, বাবা, বড় আব্বু, ভাই সবার তিন চারটা করে মিস কল। সাথে সাথে ইলহাম মা'র ফোন কলব্যাক করেছে। জানিয়ে দিয়েছে তার ফিরতে কতক্ষণ লাগবে।
মা তার ফেরার অপেক্ষায় জেগে ছিল। ছেলের ক্লান্ত মুখ দেখে জাকিয়া বলল,
-হাসপাতালে কি আজ বেশি চাপ ছিল?
-রাতে একটা অপারেশন করেছি। পেশেন্টের অবস্থা খুবই ক্রিটিকাল ছিল। অপারেশন শেষ করতে দুই ঘন্টা সময় লেগেছে। সেজন্যই তোমাদের কল তুলতে পারিনি।
ইলহাম মা'র সাথে কথা বলতে বলতে হাঁটছে। হঠাৎ সে যেন একটা ছায়া দেখতে পেলো। সব লাইট অফ করা। হালকা পাওয়ারের দুই তিনটা লাইট জ্বলছে। এতে অন্ধকার কাটছে না। ইলহাম ভূতপ্রেত বিশ্বাস করে না। যে জিনিসের কোন অস্তিত্ব নেই ওই জিনিসে সে ভয়ও পায় না। কিন্তু কিছু একটা দেখেছে এটা নিশ্চিত।
রুমে পানি ছিল না। তাই প্রিয়া পানি নেওয়ার জন্য এসেছিল। সে ভেবেছিল এসময় হয়তো কেউ জেগে নেই। কিন্তু পানি নিয়ে ফেরার সময় কোন পুরুষের গলা পেয়ে তাড়াতাড়ি রুমে চলে এলো। দরজা লাগিয়ে দিয়ে মায়ের পাশে শুয়ে পড়ল।
****
মির্জা বাড়ির সদস্যদের ঘুম ভাঙার আগে প্রিয়ার ঘুম ভেঙেছে। এমনিতেও সে আজানের সাথে সাথেই ঘুম থেকে উঠে। মা'কে নিয়ে নামাজ পড়ে। আজকে মায়ের নামাজ নেই। তাই সে একাই নামাজ পড়ে বাইরে বেরিয়ে এলো। এখনও কেউ জেগেছে বলে মনে হলো না। অন্ধকার কেটে আলো ফুটতে শুরু করেছে। প্রিয়া হাঁটাহাঁটি করার জন্য সদর দরজা খুলে বাইরে চলে এলো। বিশাল বড় লনে জুতা খুলে খালি পায়ে ঘাসের উপর হাঁটছে। লনের উত্তর পাশে বাড়ির পেছন দিকে বাগানও আছে। প্রিয়া ভাবছে, মানুষের ভাগ্য কখন কী থেকে কী হয়ে যায় এটা মানুষ ধারণাও করতে পারে না। ভাইয়া বেঁচে থাকলে তাদের ছোট্ট পরিবারটাও সুখী পরিবার হতো। নিজেদের বাড়িটা বিক্রি করে দিতে হতো না। ভাইয়ার কথা মনে পড়লে প্রিয়ার ইচ্ছে করে সে-ও যদি ভাইয়ার কাছে চলে যেতে পারত। কিন্তু পরে আবার ভাবে তাকে ছাড়া মা একা কীভাবে থাকবে? প্রিয়া বুক চিঁড়ে আসা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
-ভাইয়া তুই যেখানেই আছিস, ভালো থাকিস।
ইলহাম নামাজ শেষে ব্যালকনিতে এসে দাঁড়িয়েছে। ফজরের পর ঘুমায় না সে। ভালো করে আলো ফুটলেই দৌড়াতে বের হবে। তার চোখ হঠাৎ বাগানের দিকে গেলে সাদা কাপড় পরিহিত কাউকে দেখতে পেলো। দোতলার উপর থেকে যতটুকু দেখা যাচ্ছে তাতে কোন মেয়েই মনে হলো। তবে আকৃতি আপু বা দৃষ্টি না ওটা। তাহলে কে হতে পারে? ইলহাম আশ্চর্যান্বিত হলো। এত সকালে তাদের বাগানে কে হতে পারে এটা? রাতেও কোন ছায়া দেখেছিল। এখন তো ছায়া টায়া বাদ দিয়ে সরাসরি মানুষ দেখতে পাচ্ছে।
প্রিয়ার চোখ ব্যালকনিতে দাঁড়ানো লোকটার উপর গেলে সে বাগান থেকে চলে আসা ধরল।
ইলহাম রুম থেকে বেরিয়ে নিচে আসতে আসতে প্রিয়া বাড়ির ভিতরে চলে এসেছে। কারো সামনে পড়ার আগে সে রুমে চলে গেল। ইলহাম সদর দরজা লাগানো দেখে কপাল কুঁচকে ভাবল,
-দরজা তো লাগানো। তার মানে বাড়ির কেউ বাগানে যায়নি!
ইলহাম বাগানে এসেও কাউকে পেলো না। কোথায় গেল? সে স্পষ্ট কাউকে বাগানে হাঁটতে দেখেছে। এখন তাহলে কেউ নেই কেন?
-সবটাই কি আমার চোখের ভ্রম! নাকি আমার কল্পনা?
ইলহাম ভূতপ্রেত আত্মা বিশ্বাস করে না। কিন্তু মানুষ হলে নিশ্চয় সে আসতে আসতে উধাও হয়ে যেতে পারত না। সন্দেহ দূর করার জন্য হেঁটে গেট পর্যন্ত এলো। গেট তো ভেতর থেকে আটকানো। তাহলে কোনদিক দিয়ে বাইরে বেরিয়ে গেল?
চলবে
পাঠক, আপনারা জানেন না আপনাদের একেকটা মন্তব্য আমার লেখার আগ্রহ কতটা বাড়িয়ে দেয়। তাই কিপ্টেমি না করে গল্প নিয়ে সুন্দর সুন্দর মন্তব্য করুন।