ফন্ট সাইজ:
থিম:
তুমি আসবে বলে বসন্ত এসেছে

১৭তম পর্ব

লেখক: জেরিন আক্তার নিপা

#তুমি_আসবে_বলে_বসন্ত_এসেছে '১৭'

#জেরিন_আক্তার_নিপা

ইলহামের ভূত প্রেত দেখার রহস্য খাবার টেবিলে ভেদ হয়েছে। একজন একজন করে সবাই টেবিলে চলে এসেছে। তাওয়াফ এসে বসল না। দাদীর অনুমতি নিতে বলল,

-দাদী খালাম্মাদেরও এখানে নিয়ে আসি? আমাদের সবার সাথে খাবে।

নূর জাহান নাতির মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন,

-তুই কি আমার থেকে অনুমতি নিচ্ছিস?

তাওয়াফ হাসল। সে খালাম্মাদের নিয়ে আসতে চলে গেল। ইলহাম যেহেতু এব্যাপারে কিছুই জানত না তাই সে জিজ্ঞেস করল,

-কে খালাম্মা দাদী? ভাইয়ের খালাম্মা আছে? বড়মার না কোন বোন নেই।

নূর জাহান মেজো বৌমার দিকে তাকালেন। উনার তাকানোর মানে, ইলহামকে এখনও জানাও নি তুমি! মেজমা বলার আগেই দৃষ্টি বলে উঠল,

-আরে ভাইয়ার আপন খালা না। বন্ধুর মা। উনারা গতকাল দুপুরে এসেছেন। এখন থেকে আমাদের সাথ..

-তুই চুপ কর।

দৃষ্টির মা ধমক দিয়ে মেয়েকে মাঝ কথায় থামিয়ে দিলেন। গুরুত্বপূর্ণ একটা কথা দৃষ্টিকে বলতে না দিয়ে তিনি বললেন,

-উানারা কিছুদিন আমাদের সাথেই থাকবেন।

কিছু দিন থাকুক বা বেশি দিন থাকুক। এতে ইলহামের কোন আপত্তি নেই। কিন্তু কেউ তাকে এব্যাপারে জানাবে তো। ইলহামের চেহারার ভাষা বুঝতে পেরে জাকিয়া বললেন,

-রাতে তোকে বলতে মনে ছিল না।

তার মানে রাতে সে যে ছায়া দেখেছে ওটা কোন মানুষ ছিল। তাহলে কি সকালেও যাকে দেখেছে..

-সাবধানে খালাম্মা।

ইলহামের ভাবনা শেষ হওয়ার আগেই তাওয়াফ আমেনা আর প্রিয়াকে নিয়ে চলে এসেছে। তাওয়াফ আমেনাকে সাবধানে চেয়ারে বসিয়ে দিল। প্রিয়ার জন্যও নিজেই চেয়ার টেনে দিল। ইলহাম ভাইয়ের বন্ধুর মাকে দেখার জন্য সামনের দিকে তাকিয়ে চমকিত হয়ে রইল। প্রিয়া এতক্ষণে চেয়ারে বসেছে। ইলহাম মেয়েটাকে কোথাও দেখেছে। কোথায় দেখেছে এটা মনে করতে একটু সময় লাগল। হাসপাতালে সেদিন এই মেয়েটাই ছিল। কোন রোগীকে নিয়ে গিয়ে নার্সদের সাথে চিল্লাপাল্লা করছিল। প্রথম দর্শনে তাকেও কথা শোনাতে বাকি রাখেনি।

প্রিয়া কারো দিকে তাকাচ্ছে না। তাহমিনা তার প্লেটে খাবার তুলে দিলে মাথা নিচু করে খাচ্ছে। ইলহাম এখনও বুঝে উঠতে পারছে না এই মেয়ে তাদের বাড়িতে কী করছে।

দৃষ্টি পাশ থেকে ইলহামকে ধাক্কা দিয়ে বলল,

-ভাইয়া মুখ বন্ধ করো। বুঝতে পারছি আপুটা ভীষণ সুন্দরী। কিন্তু তাই বলে তুমি পুরো পরিবারের সামনে ফ্যালফ্যাল চোখে এভাবে আপুটার দিকে তাকিয়ে থাকবে!

ছোট বোনের এরূপ কথায় ইলহাম লজ্জা পেলো। দৃষ্টি ঠোঁট টিপে হাসছে। ইলহাম নিচু গলায় দৃষ্টিকে জিজ্ঞেস করল,

-এই মেয়ে কে?

-ভাইয়ার বন্ধুর বোন। আপুটা অনেক কিউট না?

ইলহাম জবাব দিল না। মেয়েটা সুন্দর বা কিউট বলে সে দেখছিল না। সে সম্পূর্ণ অন্য কারণে তাকিয়ে ছিল।

প্রিয়া কোন কথাই বলছে না দেখে নূর জাহান বললেন,

-কি গো বোন, খাওয়ার সময় কি তুমি কথা বলা পছন্দ করো না? আমার নাতি নাতনিদের তো আবার খাওয়ার সময় কথা না বললে খাবার গলার নিচে নামে না।

নূর জাহান মেয়েটাকে তাদের সাথে সহজ করার চেষ্টা করছেন। প্রিয়াও এটা বুঝতে পারছে। মৃদু স্বরে প্রিয়া জানাল, খাওয়ার সময় কথা সে-ও বলে। নূর জাহান বললেন,

-তাহলে এখন বলছো না কেন? আমাদের লজ্জা পাচ্ছ? এই বয়সে আবার লজ্জা কী? কথাটথা বলো।

প্রিয়া আগের মতোই মৃদু স্বরে জিজ্ঞেস করল,

-কী কথা বলব?

নূর জাহান হাসতে হাসতে বললেন,

-দেখো মেয়ের কাণ্ড! কী কথা বলবে এটাও আমাকে জিজ্ঞেস করছে।

তাওয়াফ প্রিয়ার পক্ষ হয়ে বলল,

-দাদী কয়েকটা দিন সময় দাও। প্রিয়া দৃষ্টির থেকেও বেশি কথা বলতে পারে। ও একবার কথা বলা শুরু করলে তুমি কান চেপে ধরতে বাধ্য হবে।

ইলহাম চোখ তুলে মেয়েটার দিকে তাকাল। মেয়েটা যে কথা বলতে পারে এটা তারও কিছুটা অভিজ্ঞতা আছে। তবে সে কিছুতেই সেদিন হাসপাতালের মেয়েটার সাথে সামনে বসা এই মেয়েটাকে মিলাতে পারছে না। হয়তো নতুন পরিবেশ বলেই আজ মেয়েটা এত চুপচাপ।

এই বাড়ির মানুষগুলো সবাই-ই ভীষণ ভালো। প্রিয়াকে নিজেদের একজন ফিল করাতে কোন কমতি রাখছে না। তৌকির মির্জা ভাইদের সাথে বিজনেস নিয়ে কথা বলতে গেলে মায়ের ধমক খেতে হলো।

-তোদের কাজের কথা বলতে হলে আগে খাওয়া শেষ করে উঠে যা।

প্রিয়ার খাওয়া শেষ। খাওয়ার পুরোটা সময় সে কারো দিকে তাকায়নি। কিন্তু উঠে যাওয়ার সময় সামনে চোখ গেলে একটা মানুষকে দেখে অবাক হতে হলো। সেই ডাক্তারটা! তার মানে কি উনিও এই বাড়ির ছেলে? সেদিন তাকে একটা ধন্যবাদ দেওয়ারও সুযোগ দেয়নি। এতগুলো কথা শুনিয়ে দিয়েছিল বলে পরে নিজেই অনুতপ্ত হয়েছে।

***

পেখম তুফানের গড়িতে চারদিকে তোড়ফোড় চালিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নেমে এলো। টেবিলের সামনে ব্রেক কষে শব্দ করে চেয়ার টেনে বসল। নাতনির কাজকর্ম দেখে গোলাপ জানের বিরক্তির শেষ রইল না। তিনি মুখ বাঁকিয়ে বললেন,

-আদবকায়দা তোরে কিছু শিখাইতে পারলাম না! মেয়ে মানুষ না হাতি হইছোস।

পেখম মুখ ভেঙাল। বুড়ীর সাথে লাগার মুড নেই তার। তাই কিছু বলল না। পেখম আজ নাকেমুখে ব্রেকফাস্ট ঠুসছে। মেয়েকে এমন হড়বড়িয়ে খেতে দেখে জেসমিন পেখমের পিঠে হালকা করে চাপড় দিয়ে বলল,

-পুলিশে তাড়া করেছে? ধীরেসুস্থে খেতে পারিস না?

পেখম কেন তাড়াহুড়ো করছে এটা শুধু সে-ই জানে। আজ হাতে সময় নিয়ে একটু আগেই বেরোতে হবে। কলেজ যাওয়ার পথে বড়ো দাদীদের ওখানে যাবে। ওই বাড়িতে কী হচ্ছে জানতে হবে। দৃষ্টি দুপুরে খবর দিয়েছিল। বলেছিল রাতে কল করবে। কিন্তু রাতে পেখম অসংখ্য কল দেওয়ার পরও ওই হারামি একটা কলও তুলেনি। সকালেও তাকে কল ব্যাক করেনি।

গোলাপ জানের তিন ছেলের এক ছেলেও খাবার টেবিলে আসেনি। গোলাপ জান বড় বৌমাকে জিজ্ঞেস করলেন,

-হারিশ এখনও উঠে নাই?

-উঠেছে আম্মা। বেরিয়েও গেছে।

-না খেয়েই! পল্লব কই?

জেসমিন শাশুড়িকে জানাল,

-আপনার ছেলে এখনও উঠেনি।

-ডাকো নাই?

-আমি ডেকে ধমক খেতে পারব না। তার সময় হলে সে-ই উঠবে।

গোলাপ জান রাগ করে আর ছোট ছেলের কথা জিজ্ঞেসই করলেন না। তিনবেলার এক বেলায়ও ছেলেদের খাওয়ার টেবিলে পান না। একেকজন একেক সময় বাড়ি ফিরে যার যার মতো খেয়ে নেয়।

-তিন ভাই কি একদিনও একসাথে বইসা খাইতে পারে না?

পেখমের খাওয়া শেষ। সে উঠতে উঠতে বলল,

-বড়ো দাদীর চার ছেলেই সকাল রাত দুই বেলা একসাথে খাবার টেবিলে বসে। ওই বাড়ির নিয়মই অন্যরকম। সেজন্যই ওখানে আমার এত ভালো লাগে।

গোলাপ জান আগুন চোখে নাতনির দিকে তাকালেন। পেখম দাদীর তাকানোকে ভয় পায় নাকি? সে মিথ্যা বলেনি। ওই বাড়ির নিয়মকানুন সত্যিই অন্যরকম। বড়ো দাদী ছেলেদের অনেক ভালো শিক্ষা দিয়েছেন। গোলাপ জান চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন,

-আমার বাড়িতে থাইকা, আমার ছেলের কামাই খাইয়া তুই আমার সতীনের গুণগান করোস!

-মিথ্যা গুণগান করিনি বুড়ী। যা সত্যি তা-ই বলেছি।

-আমার চোখের সামনে থেকে দূর হ বদ। ওই দাদী এত মজা লাগে তাইলে ওই বাড়িতেই থাকতে চইলা যা। আমার বাড়িতে কী করোস?

-এহহ, তোমার বাড়ি কোত্থেকে এসেছে? ইয়াকুব আলী মির্জার বাড়ি এটা।

-তিনি আমার স্বামী। তাই এই বাড়ি আমার।

-তিনি আমার দাদা। তাই এই বাড়ি আমারও।

****

কলেজে যাওয়ার পথে পেখম ওবাড়িতে যেতে পারল না কারণ সে বের হবার সময় বাবার ঘুম ভেঙেছে। বাবা তাকে দেখে জিজ্ঞেস করে,

-কলেজে যাচ্ছ মামনি?

-হু পাপা। আমার লেট হচ্ছে। এখন কথা বলতে পারব না।

-দাঁড়াও না একটু।

বাবা তাকে লেট করিয়ে দিচ্ছে। পেখম অধৈর্য মুখে বাবার দিকে তাকাল। পল্লব মির্জা মেয়ের কাঁধে হাত রেখে দরজার দিকে হাঁটতে হাঁটতে বললেন,

-আমার আম্মাটা বেশিরভাগ সময় কলেজে থাকে। আম্মার সাথে সময় কাটাতে পারি না। তাই আজ আমি তোমাকে কলেজে নামিয়ে দিয়ে আসব।

পেখম মুখে কিছু বলতে পারল না। মনে মনে বলল,

-যাহ!

কলেজে আজকে একটা ক্লাসেও মনোযোগ দিতে পারেনি পেখম। তার একই প্রশ্ন বারবার শুনতে শুনতে দৃষ্টি বিরক্ত হয়ে বলল,

-তোর জানার এত আগ্রহ থাকলে কলেজ শেষে আমার সাথে বাড়ি যাস। তবুও প্রশ্ন করে করে এখন আমার মাথা খাস না।

পেখম বলল,

-সে তো যাবই।

কলেজ ছুটি হলে পেখম তার ড্রাইভারকে চলে যেতে বলে সে দৃষ্টির গাড়িতে গিয়ে বসল। রাগ করে পথে দৃষ্টির সাথে একটা কথাও বলল না।

বাড়ি ফিরলে পেখম দৃষ্টিকে রেখেই আগে নেমে গেল। দৃষ্টি পেখমের রাগ দেখেও বিরক্ত। তাওয়াফ ভাইয়ের বন্ধুর বোনকে নিয়ে এর এত কৌতূহল কেন? পেখম আগে আগে বাড়িতে ঢুকলো। তাকে দেখে ছোট কাকী বলল,

-ও মা, কে এটা? এই মেয়ে ভুল করে আমাদের এখানে চলে এসেছে নাকি!

ছোট কাকী আরও কী কী যেন বলছে। পেখম সেসব কথা শোনায় মনোযোগ দিল না। তার চোখ তাওয়াফ ভাইকে খুঁজছে। দৃষ্টি ভেতরে এসে ছোট চাচীকে পেখমের এখানে আসার কারণ জানাল।

-ভাইয়ার বন্ধুর বোনকে দেখতে এসেছে।

রানি কাছেপিঠেই ছিল। পেখম ওই মেয়েকে দেখতে এসেছে শুনে সে ছুটে এলো। গোপন কথা জানানোর মতো ফিসফিস করে বলল,

-আফা গো, আমি তো প্রথমে ভাইজানের লগে ওই মাইয়ারে দেখে ভাবছি ভাইজান হয়তো বিয়া কইরা বউ লইয়া আইছে৷ কী ভয় যে পাইছিলাম গো আফা!

রানির কথাগুলো শুনে পেখমের কেন ভেতরে ভেতরে রাগ হচ্ছে সে নিজেও বুঝতে পারছে না। মেয়েটাকে এবার তাকে দেখতেই হবে। কোথায় ওই মেয়ে?

চলবে

একটা কথা বলে রাখা ভালো, এই গল্পটা মোটামুটি বড়সড় হবে। এই ধরেন ৭০+ পর্ব। গল্পে একাধিক জুটি থাকবে। যেকোনো এক জুটির উপর ফোকাস যাবে না। সবাইকে সমান গুরুত্ব দেওয়া হবে।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৭তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন