#তুমি_আসবে_বলে_বসন্ত_এসেছে '১৮'
#জেরিন_আক্তার_নিপা
নূর জাহান পেখমকে দেখে খুশিতে আটখানা হয়ে গেলেন। পেখম কলেজ থেকে এখানে চলে এসেছে শুনে বললেন,
-ভালো করেছিস। মাঝে মাঝেই এরকম চলে আসবি।
নূর জাহান নাতনিকে নিজের সাথে নিয়ে এসে সোফায় বসালেন। পেখম দাদীর কাছে জানতে চাইল বাড়িতে কারা এসেছে। নূর জাহান বললেন,
-তাওয়াফের বন্ধুর মা আর বোন।
-মা বোনকে বাড়িতে নিয়ে আসতে হবে!
নূর জাহান হেসে বললেন,
-ওরা তাওয়াফের অনেক আপন।
পেখম মুখ বাঁকিয়ে বলল,
-আপন যে তা তো বোঝাই যাচ্ছে। সেজন্যই তো বাড়িতে থাকতে নিয়ে এসেছে।
তাওয়াফ জানত না পেখম এসেছে। সে কোন একটা কারণে রুম থেকে বেরিয়েছিল। পেখম দাদীর সাথে বেশ জোরে জোরেই কথা বলছে। যে কারণে তাওয়াফও শুনতে পেরেছে। পেখমের গলা শুনে সে প্রথমে সিওর ছিল না এটা পেখমই কি-না। কারণ কোন অনুষ্ঠান ছাড়া ওরা এবাড়িতে আসে না। তাওয়াফের জানামতে বাড়িতে আজ কোন অনুষ্ঠান হচ্ছে না।
নূর জাহান জানেন তার এই নাতনি কতটা হিংসুটে। ভালোবাসায় ভাগ দিতে চায় না। তিনি পেখমের অখুশির কারণ বুঝতে পারছেন। হাসি চেপে বলছেন,
-ওরা থাকলে সমস্যা কী?
-আমার আবার কী সমস্যা থাকবে? তোমাদের বাড়িঘর। তোমরা যাকে খুশি থাকতে দিতে পারো। আমার কী?
-তুই তো মাঝে মধ্যে আসিস। বাড়িতে আরেকটা মেয়ে এসেছে। ওর সাথে আমার সময়টা ভালো কাটবে।
এপর্যায়ে পেখম ক্ষিপ্ত হয়ে ব্যাগ নিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে পড়ল। নূর জাহান আশ্চর্য হয়ে বললেন,
-কোথায় যাচ্ছিস?
-বাড়ি যাচ্ছি। এটা তো আমার বাড়ি না। তোমার এখন ভালো সময় কাটানোর নতুন মানুষ হয়েছে। আমি এখানে থেকে কী করব?
পেখমের জেলাসি দেখে তাওয়াফ দূরে দাঁড়িয়ে নিঃশব্দে হাসছে। পাগল নাতনির কথা শুনে নূর জাহান শব্দ করে হাসতে লাগলেন।
-তুই এত হিংসুটে কেন রে পুনম? তোর জায়গা কি আমি অন্য কাউকে দিতে পারব?
-দিতে পারবেই তো। তুমি সবাইকে ভালোবাসো।
-সবাইকে ভালোবাসার মধ্যে আর তোকে ভালোবাসার মধ্যে অনেক পার্থক্য আছে রে পাগল।
-কোন পার্থক্য নেই। যা আমার তা শুধুই আমার। যে আমাকে ভালোবাসবে সে শুধুই আমাকে ভালোবাসবে। আলু আমার কেন পছন্দ না জানো? কারণ একমাত্র আলুই এমন সবজি যা সব তরকারির সাথে যায়। তুমিও দিনদিন আলু হয়ে যাচ্ছ দাদী।
তাওয়াফের এবার হাসি চাপতে কষ্ট হলো। নূর জাহান পেখমের হাত ধরে টেনে বসিয়ে দিলেন। পেখমের নরম হাত ধরে বললেন,
-তুই যে দাদীর ভালোবাসার ভাগ দিতে চাস না। আমি তাহলে স্বামীর ভালোবাসার ভাগ কীভাবে দিয়েছি?
-তুমি মহান। আমি তোমার মতো এত মহান না। আমার বর দাদাজানের মতো দ্বিতীয় বিয়ে করলে ওই সতীনকে তো মারবোই সাথে হারামজাদা বরকেও মেরে ফেলব। দাদাজানের চরিত্রের এই একটা দিকই আমার অপছন্দ। দাদীকেও আমি এজন্যই তোমার থেকে কম ভালোবাসি। তুমি অনেক ভালো মনের মানুষ বড়ো দাদী। তুমি নিজের বরের ভাগ দিয়েছ। সতীনের নাতি-নাতনীদের ভালোবাসা দিচ্ছ। তুমি সত্যিই গ্রেট।
নূর জাহান এতক্ষণ হাসলেও এবার তার চোখের কোনে পানি দেখা গেল। এখনও তিনি হাসছেন। তবে এ হাসি দুঃখ লুকানোর। পেখমকে বুকে টেনে নিয়ে মাথায় চুমু খেলেন তিনি। পেখমও দাদীকে জড়িয়ে ধরল।
দাদী নাতনির ভালোবাসার মুহূর্তে তাওয়াফ বিঘ্ন ঘটাতে চাচ্ছিল না। কিন্তু মা তাকে ডেকে উঠলে নূর জাহান পেখম দু'জনই সর্তক হয়ে গেল। তাওয়াফ ভাইয়ের নাম শুনে পেখমের ভেতর কেমন যেন অস্থিরতা কাজ করতে লাগল। ঝট করে সে তাওয়াফ ভাইয়ের দিকে ফিরে তাকাল। তাওয়াফ ভাইয়ের উপর তার যেন একটু রাগও হলো। তবে কেন পেখমের সাথে এসব হচ্ছে এর কারণ তার নিজেরও অজানা। তাহমিনা ছেলেকে দেখে বললেন,
-আপা, প্রিয়া সারাদিন ঘরেই থাকে। ওরা তো আমাদের সাথে সহজ হতে পারছে না।
তাওয়াফ শান্ত গলায় বলল,
-কিছুদিন সময় দিতে হবে মা। তারপরও এরকম চললে অন্য ব্যবস্থা করতে হবে।
তাওয়াফ ভাই এখনও বন্ধুর মা বোনকে নিয়ে কথা বলছে দেখে পেখমের রাগ আরও বাড়তে লাগল। দাদী তাকে কিছুতেই এখন যেতে দিবে না।
-কলেজের কাপড় পাল্টে দৃষ্টির থেকে কাপড় নিয়ে পরে নে। ক্ষিধে পায়নি? কখন এসেছিস। কাপড় পাল্টে খেতে আয়।
পেখম ব্যাগ নিয়ে উঠে দাঁড়াল। সে দাদীর সাথে কথা বলার সময় দৃষ্টি রুমে চলে গিয়েছিল। উপরে যাওয়ার সময় পেখম তাওয়াফের সামনে পড়ে গেল। সে ডান দিকে যেতে নিলে তাওয়াফও সেদিকে গেল। তাওয়াফ বামে সরে গেলে পেখমও সেদিকে গেল। যাওয়া নিয়ে দু'জনের মধ্যে প্যাঁচ লেগে গেছে। তাওয়াফ গমগমে গলায় বলল,
-থাম। শান্ত হয়ে দাঁড়া একটু।
পেখম আর কোনদিকে যাওয়ার চেষ্টা না করে দাঁড়িয়ে পড়ল। তাওয়াফ চোখ তুলে মেয়েটাকে দেখে নিল। কলেজ ড্রেস পরলে পেখমকে হাই স্কুলের মেয়েদের মতো ছোট লাগে। মনেই হবে না কলেজে পড়ে। তার উপর আবার চুলে দুই বিনুনি করায় আরও বাচ্চাদের মতো লাগছে। ছোট ছোট চুল গুলো বিনুনি থেকে বেরিয়ে এসে মুখের উপর চলে এসেছে।
পেখম সরাসরি তাওয়াফ ভাইয়ের দিকে তাকাতে না পেরে চোরা চোখে এক দু'বার দেখে নিল। তাওয়াফ ভাই চুল বড় রেখেছে! মুখেও খোঁচা খোঁচা দাড়ি। বড় চুল, দাড়িতে তাওয়াফ ভাইকে আরও সুন্দর লাগছে। পেখম চোখ সরাতে পারছে না।
তাওয়াফ একপাশে সরে দাঁড়িয়ে পেখমকে বলল,
-যা এবার।
পেখম ভাবছিল, সে কি জিজ্ঞেস করবে কেন ওদেরকে বাড়িতে নিয়ে এসেছে। কিন্তু এই কথা জিজ্ঞেস করার মতো সাহস কি তার আছে?
কতকিছু জিজ্ঞেস করার থাকলেও পেখম কিছুই না বলে চুপচাপ চলে গেল। পেখমের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে তাওয়াফ আস্তে করে বলল,
-হিংসুটেদের মহারানী।
কথাটা বলে একা একাই হাসল সে। পেখম দৃষ্টির কাপড় পরে নিচে খেতে এসেছে। দুপুরের খাওয়ার সময় হয়ে গেছে তাই নূর জাহান সবাইকে ডেকে নিলেন। খাবার টেবিলেই পেখম প্রথম বার ওই মেয়েটাকে দেখল। মেয়েটা এত সুন্দরী হবে সে কল্পনা করেনি। লম্বাও মনে হয় তার থেকে বেশি। তাওয়াফ প্রিয়া পাশাপাশি বসেছে। পেখম দেখল, দু'জনকে খুব সুন্দর মানাচ্ছে। তাওয়াফ ভাইয়ের ওই মেয়ের প্রতি এত কেয়ার দেখে পেখমের একটুও ভালো লাগল না।
তাওয়াফ প্রিয়ার প্লেটে খাবার তুলে দিচ্ছে। সকলের সামনে লজ্জা পেয়ে প্রিয়া ঠিকমতো খায় না। তাই সে একপ্রকার জোর করেই খাওয়াচ্ছে। আর তা দেখেই পেখম মনে মনে জ্বলছে। দৃষ্টি পেখমকে ধাক্কা দিয়ে বলল,
-কী দেখছিস অমন করে?
পেখম ওদের দু'জনের উপর থেকে চোখ না সরিয়েই চিবিয়ে চিবিয়ে জবাব দিল,
-তাওয়াফ ভাই ওই মেয়েটাকে এত স্পেশাল ফিল করাচ্ছে কেন? আমরাও তো উনার বোন। আমাদেরকে তো কখনও প্লেটে তুলে তুলে খাওয়া নি।
দৃষ্টি পেখমের আরেকটু কাছে এসে ফিসফিস করে বলল,
-তোর কি হিংসা হচ্ছে?
পেখম কঠিন চোখে দৃষ্টির দিকে তাকাল। যন্ত্রের মতো বলল,
-আমার কেন হিংসা হবে?
দৃষ্টি ঠোঁট কামড়ে হেসে বলল,
-কারণ তুই একটা হিংসুটি ছেমরি। তাওয়াফ ভাই হোক বা অন্য যে কেউ হোক, তোর থেকে কাউকে একটু বেশি গুরুত্ব দিলেই তুই হিংসায় জ্বলতে থাকিস।
-আমি বাকি সবার জন্য হিংসা করলেও তাওয়াফ ভাইয়ের জন্য কখনও কাউকে হিংসা করব না। উনি আমার কে? কথায় কথায় শুধু ধমক দেন।
-হুম দেখতেই পারছি।
তাওয়াফ চোখ তুলে একপলক পেখমকে দেখল। দৃষ্টির সাথে মনে হয় কথা কাটাকাটি হচ্ছে। আজকে বাড়িতে পা দেওয়ার পর থেকেই মেয়েটাকে অন্যরকম লাগছে। মনে হচ্ছে কোনকিছু নিয়ে ভীষণ বিরক্ত। তাওয়াফ খাওয়ায় মনোযোগ দিল। তখনই পেখমের চিৎকার শোনা গেল।
-বলেছি না আমার কিছু যায় আসে না।
সবার চোখ একযোগে পেখমের উপর এসে পড়ল। কথাটা এত জোরে বলে ফেলে পেখমও বোকা বনে গেছে। সকলের প্রশ্নবিদ্ধ দৃষ্টি উপেক্ষা করে ঠোঁট টেনে হাসল। দৃষ্টি তাড়াহুড়ো করে বলে উঠল,
-আমরা কলেজের কথা বলছিলাম।
-হ্যাঁ হ্যাঁ, কলেজের কথাই তো।
পেখম মনে মনে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। যাক হারামিটা তাকে পঁচায়নি। তাওয়াফ ভাইয়ের সামনে বাঁচিয়ে দিয়েছে। নূর জাহান বললেন,
-তোদের কান্ডের শেষ নেই। কী যে করিস!
পেখমের বিকালে যাওয়ার কথা থাকলেও বাবা তাকে নেওয়ার জন্য গাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছে। ড্রাইভার আঙ্কেল পেখমকে জানাল,
-স্যার অনেক রেগে আছে মামনি।
পেখম বাবাকে কথা দিয়েছিল, এবাড়িতে আসার আগে জানিয়ে অনুমতি নিয়ে আসবে। কিন্তু সে না জানিয়েই চলে এসেছে। নূর জাহান পেখমকে থাকতে বললে পেখম বলল,
-না দাদী। আমি এখন চলে যাই? পরে আবার আসব।
নূর জাহান চাইলেও পেখমকে রাখতে পারবেন না। তিন ভাইয়ের থেকে পেখমের বাবাই অন্যরকম। একমাত্র মেয়ে সেজন্যই হয়তো একটু বেশি কড়াকড়ি। পেখম সকলের থেকে বিদায় নিয়ে নিল।
-আসি দাদী।
-আবার আসবি তো?
-হুম।
তার চোখ তাওয়াফ ভাইকে খুঁজছে। কিন্তু সবাই এখানে থাকলেও তাওয়াফ ভাই নেই। গাড়িতে উঠেও পেখম জানালা দিয়ে তাকিয়ে রইল। গাড়ি চলতে শুরু করলে সবাই পেছনে পড়ে রইল। পেখমের একটু মন খারাপ হলো।
***
পল্লব মির্জা আজ বাড়িতে ছিলেন। সকালে মেয়েকে কলেজে দিয়ে এসেছে। দুপুরে মেয়ে ফিরছে না দেখে চিন্তিত হয়ে পড়েছিলেন। ড্রাইভার এসে জানাল পেখম ওই বাড়িতে যাবে তাই তাকে পাঠিয়ে দিয়েছে। পেখম ওবাড়িতে যাবে শুনেই পল্লব মির্জার মেজাজ বিগড়ে গেল। তিনি স্ত্রীর সাথে বাজে ব্যবহার করতে লাগলেন। জেসমিন বারবার বলছে,
-তোমার মেয়ে ওবাড়িতে যাবে আমাকে বলে যায়নি। আমি জানতাম না।
পল্লব মির্জা তুই তুকারিতে নেমে পড়েছেন। বিশ্রী একটা গালি দিয়ে বললেন,
-মেয়ের খবর তুই কেন জানবি? তুই তো সেই জাতের মা না।
-আমি নাহয় মেয়ের খবর রাখি না। তুমি তো সব খবর রাখো। তাহলে তুমি কেন জানলে না মেয়ে ওবাড়িতে যাবে?
-তুই আমার মুখে মুখে তর্ক করিস! অনেক সাহস বেড়ে গেছে তোর?
পল্লব মির্জা হাত তুলে তেড়ে স্ত্রীকে মারতে এলেন। জেসমিন ভয় পেয়ে পিছিয়ে গেছে।
-তোর পিঠের চামড়া তুলে ফেললেই সব ঠিক হয়ে যাবে।
স্বামীর এরূপ আচরণ আজ নতুন না। পান থেকে চুন খসলেই তাকে মারতে আসে। মুখের ভাষা খারাপ করে। জেসমিনের চোখ উপচে পানি এলো। তা দেখে পল্লব মির্জা আরও রেগে গেলেন।
-কথার আগে চোখে পানি চলে আসে! অভিনেত্রী হয়েছে। এত ভালো অভিনয় পারিস তাহলে নাটক সিনেমায় নামছিস না কেন?
জেসমিন নীরবে চোখের পানি ফেলছে। প্রতিবাদ করার সাহস তার নেই। এখন কিছু বললেই মার খেতে হবে। পল্লব মির্জা রাগ করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
চলবে