ফন্ট সাইজ:
থিম:
তুমি আসবে বলে বসন্ত এসেছে

৩৫তম পর্ব

লেখক: জেরিন আক্তার নিপা

#তুমি_আসবে_বলে_বসন্ত_এসেছে '৩৫'

#জেরিন_আক্তার_নিপা

দৃষ্টি পেখমকে দেখে অবাক গলায় জিজ্ঞেস করল,

-পেখম কী হয়েছে তোর! তোকে এমন বিধ্বস্ত দেখাচ্ছে কেন?

পেখম ভাষাহীন চোখে দৃষ্টির দিকে তাকাল। আজ তার কী হয়েছিল? তাওয়াফ ভাইকে ওরকম একটা ব্যক্তিগত প্রশ্ন কেন করেছে সে? গাড়ির দৃশ্য মনে করল পেখম।

পেখমের প্রশ্ন শুনে তাওয়াফ সহজভাবেই উত্তর দিল,

-আমার পছন্দের মানুষের নাম জেনে কী করবি তুই?

-আপনার কি সত্যিই পছন্দের মানুষ আছে!

-আছে।

-আপনি কি তাকে ভালোবাসেন?

-যদি বলি বাসি?

-আপনি তাকে কেন ভালোবাসেন?

প্রশ্নটা কি সত্যিই পেখম করেছে? কেন করেছে? এটা কি ইলহাম ভাই বা আজান ভাই? এটা তাওয়াফ ভাই। এই কথা কীভাবে ভুলে গিয়েছিল!

পেখম দৃষ্টির হাত চেপে ধরে শুকনো মুখে বলল,

-আমার মুখ এত বেশি কেন চলে দৃষ্টি? আমি কেন এত বেশি কথা বলি?

দৃষ্টি কিছুই বুঝতে পারছে না। কী হয়েছে এই মেয়ের? আজ আবার নতুন নাটক!

পেখম ভাবছে আজকের পর সে কীভাবে তাওয়াফ ভাইয়ের সামনে পড়বে। তাওয়াফ ভাই নিশ্চয় তার উপর অনেক রেগে গেছে। দৃষ্টি পেখমের সমস্যা গুরুত্ব না দিয়ে মনে করিয়ে দিল।

-এই মাসে আমার জন্মদিন মনে আছে তো? নাকি ভুলে গিয়েছিস? ভুলে গেলেও এখন মনে করিয়ে দিয়েছি। প্রতিদিন একবার করে মনে করাব। ঠিক রাত বারোটার সময় উইশ করবি। আর আমাকে কী গিফট দিবি? এখন থেকেই সারপ্রাইজ প্ল্যান করতে থাক।

দৃষ্টি কী কী বলছে এসব কথা পেখমের কানে ঢুকছে না।

****

আজকে কলেজ শেষে পেখম বড়ো দাদীদের ওখানে যায়নি। বাড়ি চলে এসেছে। বাড়ি এসে পেখম দেখল বাবা মা'র মধ্যে ঝগড়া হচ্ছে। পেখমের জন্য এই দৃশ্য অকল্পনীয়ই ছিল। সে বোকার মতো দাঁড়িয়ে বাবা মা'র কথাগুলো শুনতে লাগল। জেসমিন বলছে,

-আজ পেখম বাড়ি ফিরুক। মেয়ের সামনে তোমার সব ভণ্ডামি ফাঁস করব। এতদিন সব লুকিয়েছি।

পল্লব মির্জা তেড়ে গেলেন। স্ত্রীর চুলের গোছা চেপে ধরে দাঁতে দাঁত চেপে বললেন,

-কীভাবে বলবি? তোর মুখে জবান থাকলে তো বলবি। আমি তোর জিভ উগড়ে ফেলব।

-এটাই তো পারো তুমি। বউয়ের গায়ে হাত তোলা ছাড়া আর কী পারো?

-আরও অনেককিছু পারি। দেখবি তুই? দাঁড়া দেখাচ্ছি।

বন্ধ ঘরের ভেতর থেকে জেসমিনের চিৎকারের শব্দ ভেসে আসছে। দরজার বাইরে গোলাপ জান বিলাপ করছেন। নাজমা, সানজিদা পল্লব মির্জাকে দরজা খুলে দেওয়ার জন্য ডাকছে। গোলাপ জান বলছেন,

-আল্লাহ দোহাই লাগে দরজা খোল পল্লব। বউটারে আর মারিস না।

-এই মাগির বাচ্চার অনেক সাহস বেড়েছে। আজ এর একদিন কী আমার একদিন।

পেখম ফিরেছে এটা কেউ দেখেনি। মা'র চিৎকার শুনে পেখম দৌড়ে উপরে চলে এলো। ওকে দেখে সকলে আরও বেশি করে পল্লব মির্জাকে ডাকছে। নাজমা বলছে,

-পল্লব দরজা খোলো। পাগলামি কোরো না।

পেখমকে ছোট চাচী নিয়ে যেতে চাইলেও সে গেল না। মা'র চিৎকার তার কলিজার ভেতর গিয়ে গিধছে। কাঁদতে কাঁদতে পেখম ডাকল,

-মা। ও মা! দরজা খোলো।

মেয়ের কন্ঠ শোনা মাত্র ভেতরে সব নিশ্চুপ হয়ে গেল। পেখম ডেকেই যাচ্ছে।

-মা আমি এসেছি। দরজা খোলো।

জেসমিন মুখে হাত চেপে কাঁদছে। পল্লব মির্জাকে বিধ্বস্ত দেখাচ্ছে। পেখম সমানে দরজা ধাক্কাচ্ছে।

পল্লব মির্জা দরজা খুলে দিয়ে মেয়ের দিকে তাকাতে পারলেন না। পেখম বাবাকে দেখল না। আগে মা'র কাছে ছুটে গেল। মায়ের ঠোঁটে রক্ত দেখে মা'কে জড়িয়ে ধরে কেঁদে কেঁদে বলল,

-মা তোমার কী হয়েছে?

মেয়ে সব নিজের চোখে দেখেছে জেনেও জেসমিন বলল,

-আমার কিছুই হয়নি মা। তুই ঘরে যা।

-মিথ্যা কথা। তুমি মিথ্যা বলছো। পাপা তোমাকে মেরেছে। আমি তোমার চিৎকার শুনেছি। তোমার ঠোঁট কেটে রক্ত বের হচ্ছে। তারপরও কেন বলছো তোমার কিছু হয়নি?

এতকিছুর পরও পল্লব মির্জা মেয়েকে মায়ের দোষই দেখাতে চেয়ে বললেন,

-আমি তোমার মাকে মারতে চাইনি মামণি। দোষ তোমার মায়েরই। সে খামটা সব সময় আমাকে সন্দেহ করে।

এই কথা শুনে জেসমিন মেয়ের থেকে আজ আর কোনকিছু লুকাল না। এই নিকৃষ্ট মানুষের আসল রুপ মেয়ের সামনে নিয়ে এসে বলল,

-যাকে তুই সুপারহিরো ভাবিস তার আসল চেহারার কথা জানতে চাস? এই লুচ্চা আমাকে তো ঠকিয়েছেই সাথে আমার মেয়েটাকেও ঠকাচ্ছে। তোর বাপ কোন সুপারহিরো না। এর মতো দুশ্চরিত্র লোক ভালো মানুষের মুখ পরে থাকে।

পল্লব মির্জা স্ত্রীর দিকে আবারও তেড়ে আসছিলেন। পেখম চিৎকার করে বাবাকে থামিয়ে দিল।

-খবরদার পাপা। আমার মাকে তুমি মারবে না।

পল্লব মির্জা স্তব্ধ চোখে মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। এতদিনের চেপে রাখা রাগ, ক্ষোভ জেসমিন আজ প্রকাশ করছে।

-তোর বাপের সাথে এক মহিলার সম্পর্ক আছে। ওই মহিলা তোর বাপের মোবাইলে ফোন দেয়। এতদিন আমার সন্দেহ হলেও ধরতে পারিনি। আজ ধরেছি। আমি কেন ফোন ধরে ওই মহিলাকে কথা শুনিয়েছি সেজন্য তোর বাপ আমাকে মারছে। তুই যে বাপকে ফেরেশতা মনে করিস সে আসলে একটা শয়তান।

পেখম কোনভাবেই এসব কথা বিশ্বাস করতে পারছে না। কিন্তু মা যে মিথ্যা বলছে না এটাও সে জানে। ফাঁকা দৃষ্টিতে পেখম বাবার দিকে তাকাল। তার চোখ দিয়ে অঝোরে পানি পড়ছে। তার বাবা কি সত্যিই এমন!

মেয়ের চোখে সন্দেহ দেখে পল্লব মির্জাও ভেতর থেকে নড়ে গেলেন। ওই চোখে মেয়ে কোনদিন তার দিকে তাকায়নি। নরম গলায় তিনি বলার চেষ্টা করলেন,

-তোমার মা'র কথা শোনো না মামণি। আমি তোমাকে বলছি। তুমি আমার কথা শোন।

বাবাকে পেখম আর বিশ্বাস করতে পারছে না। বাবার সব কথাই এখন তার কাছে মিথ্যা মনে হচ্ছে। বাবা তার দিকে এগিয়ে আসছে দেখে চিৎকার করে পেখম বলল,

-আমার কাছে আসবে না। আমি তোমার কোন কথা শুনতে চাই না। তুমি মিথ্যেবাদী। ভালো মানুষ নও তুমি। আমার মা কখনও মিথ্যা বলে না। তুমি সত্যিই আমাদের ঠকিয়েছ। এতদিন আমাকে বোকা বানিয়েছ। তুমি কোনদিন ভালো বাবা ছিলে না।

গোলাপ জান জানতেন এমন একটা দিন আসবে। তিনি মনে মনে তৈরিই ছিলেন। এজন্যই পেখমের বিয়ের জন্য ছেলেকে তাড়া দিতেন। এই মেয়ে বাপ ভক্ত। বিয়ে পর বাপ ভক্তি একটু হলেও কমত। তখন সত্য সামনে এলেও এতটা কষ্ট পেত না।

জেসমিন মেয়েকে আরও বলছে,

-তোর বাপের মোবাইল কোনদিনও ধরেছিস তুই? আজ ওই লুচ্চা, কাপুরুষটাকে মোবাইল দিতে বল। দেখ ওই মহিলার সাথে ছবি আছে কি-না।

পরিস্থিতি খারাপের দিকেই যাচ্ছে। নাজমা বলল,

-জেসমিন চুপ কর। কেন ওর সামনে এসব কথা বলছিস!

-বলতে দাও ভাবী। আজ আমাকে চুপ থাকতে বোলো না। তোমাদের চোখের দেখা। অনেকদিন তো চুপ থেকেছি। এই লোক কি ভালো হয়েছে?

পেখম বাবার সামনে এসে দাঁড়াল। টলমল চোখে বাবার চোখে চোখ রাখল। হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল,

-তোমার ফোন দাও।

পল্লব মির্জা অসহায় চোখে মেয়েকে দেখছেন। পেখম তার কথায় অটল। বাবার ফোন আজ সে চেক করবেই।

-যদি তুমি এমন কিছু না করে থাকো তাহলে ফোন কেন দিচ্ছ না? তুমি কি চাও আমি নিজেকে শেষ করে দিই?

আর কোন উপায় থাকল না। পল্লব মির্জাকে ফোন দিতেই হলো। ফোন হাতে নিয়ে গ্যালারি ঘাঁটতেই মা'র কথা সত্যি প্রমাণ হলো। পেখম সহ্য করতে পারল না। ফোনটা ছুঁড়ে ফেলে চিৎকার করে বলতে লাগল,

-তুমি কেন এমন করেছ পাপা? কেন আমার মা'কে ধোঁকা দিয়েছ? আমাকে কেন বোকা বানিয়েছ? আমাদের বিশ্বাস কেন ভেঙেছ পাপা? আমাদের তিনজনের পরিবারটা কি ভালো ছিল না? দাদাজানের মতো তুমিও কেন আরেকটা বিয়ে করেছ? তুমি জানো না দাদাজানকে আমি কতটা অপছন্দ করি। এখন আমি তোমাকে কীভাবে ঘৃণা করব?

পেখম ঘরের জিনিস ভাঙতে লাগলে পল্লব মির্জা এসে মেয়েকে ধরলে বাবাকে ধাক্কা দিয়ে দূরে সরিয়ে দিয়ে পেখম বলল,

-খবরদার তুমি আমার কাছে আসবে না। আমার চোখের সামনে থেকে চলে যাও তুমি। নাহলে আমি কিন্তু কিছু একটা করে ফেলব। আমি কেন তোমার মেয়ে হয়ে জন্ম নিলাম? নিজের উপর আমার ঘৃণা হচ্ছে।

গোলাপ জান ছেলেকে নাতনির চোখের আড়ালে পাঠিয়ে দিলেন। তারপরও পেখমের পাগলামি কমছে না। সে নিজের ক্ষতি করার চেষ্টা করছে। বড়মা, ছোট চাচী দু'জন মিলেও তাকে সামলাতে পারছে না। ধস্তাধস্তি করে ক্লান্ত হয়ে পেখম মেঝেতেই শুয়ে পড়ল। এখন আর গলা দিয়ে চিৎকার বেরুচ্ছে না।

-বোঝ হওয়ার পর থেকে পারফেক্ট কাপল বলতে আমি আমার পাপা মাকেই বুঝতাম। সবসময় পাপার মতো একজন মানুষকে লাইফ পার্টনার হিসেবে চাইতাম। যেই মানুষটাকে আমি সবার থেকে বেশি বিশ্বাস করেছি সে-ই আজ এত জঘন্য ভাবে আমার বিশ্বাস ভেঙে দিল! আমি কীভাবে বাঁচব দাদী? তোমার ছেলের কোন দোষ কেন কখনও আমার চোখে পড়েনি। তোমার ছেলে দিনের পর দিন আমার মা'কে কষ্ট দিয়েছে। আমি চোখের সামনে দেখেও কিছুই বুঝতে পারিনি। আমি এত বোকা কেন ছিলাম দাদী?

নাতনির সাথে গোলাপ জানও কাঁদছেন। ছেলে বউয়ের সাথে ভালো ব্যবহার করে না, বউকে মারে এটা তিনি জানতেন। কিন্তু ছেলের চরিত্র নিয়ে তিনি কখনও সন্দেহ করেননি। তার নিজেরই তো বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে।

-কাঁদিস না বু। আমি তোর দাদী এখনও মরে যাইনি। আ'ম সব ঠিক করে দিব।

-তুমি কি ঠিক করবে দাদী? আমার আঠারো বছরের জীবনটাই এখন আমার কাছে মিথ্যা মনে হচ্ছে। তুমি আমার বিশ্বাস কীভাবে জোড়া লাগাবে? আমি কি আর কখনও কোন পুরুষকে বিশ্বাস করতে পারব! আমার নিজের বাবা আমার সাথে এমন করেছে। আমি আর কাকে বিশ্বাস করব?

*****

বাড়িতে কিছু একটা ঘটছে। আজান ঘরে বসে বুঝতে পারছে। কিন্তু সে অনেকক্ষণ ধরে ডাকার পরও কেউ আসছে না। সে যে দেখতে যাবে এই উপায়ও নেই।

-মা। মা, পেখম কোথায় তোরা? কেউ কেন আমার ডাক শুনছে না!

সবাই নিচে পেখমকে সামলাতে ব্যস্ত। আজানের ডাক শুনে তটিনীর মেজাজ খারাপ হচ্ছে। ছেলেটা কি নিচে আসতে পারছে না? কখন থেকে মা মা করে যাচ্ছে। সে দোতলায় উঠে আজানের ঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বলল,

-সমস্যা কী আপনার? মা মা না করে নিজেও তো একটু নিচে যেতে পারেন। বাড়িতে কী হচ্ছে আপনার কোন ধারণা আছে?

আজান হতবাক হয়ে তাকিয়ে থেকে জিজ্ঞেস করল,

-কী হচ্ছে?

-আপনার চাচার ফুলের মতো পবিত্র চরিত্র তার মেয়ের সামনে চলে এসেছে। পেখম তার মাকে নিয়ে বাড়ি ছেড়ে চলে যাচ্ছে। ঘরে বসে মাকে না ডেকে পারলে নিচে গিয়ে বোনকে থামান।

আজান বাকরুদ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল। পেখম বাড়ি ছেড়ে চলে যাচ্ছে! এগুলো কথা শোনার পরও ছেলেটা বসে আছে। তটিনী বিরক্ত মুখে চলে যাওয়া ধরলে আজান ডাকল,

-দাঁড়ান। আমাকে একটু সাহায্য করুন। আমার হুইলচেয়ারটা একটু বিছানার কাছে এনে দিন।

হুইলচেয়ার! তটিনী ঝট করে পেছনে তাকাল। বিছানা থেকে কিছুটা দূরেই একটা হুইলচেয়ার। তটিনী ভাবল ছেলেটা হয়তো তার সাথে মজা করছে। সে মুখ ফসকে জিজ্ঞেস করে ফেলল,

-হুইলচেয়ার দিয়ে কী করবেন? আপনার কি পা নেই? ওই পা জোড়া কাজে লাগিয়ে উঠে আসুন।

-আমার পা কাজ করে না। হুইলচেয়ারটা যদি আমার কাছে দিয়ে যান তাহলে উপকৃত হবো।

তটিনী ঠাঁই দাঁড়িয়ে রইল। কেনই যেন বুকের ভেতর তোলপাড় শুরু হয়ে গেছে। এই ছেলে কি সত্যিই হাঁটতে পারে না! আল্লাহ এত সুন্দর একটা ছেলেকে এত বড় খুঁত দিয়ে রেখেছে!

চলবে

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩৫তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন