#তুমি_আসবে_বলে_বসন্ত_এসেছে '৪৯'
#জেরিন_আক্তার_নিপা
মাঝরাতে পেখমের ঘুম ভেঙে গেছে। বিছানায় বসে চোখ কচলে পুরো ঘরে তাওয়াফ ভাইকে দেখতে পেলো না। হয়তো ওয়াশরুমে গেছে। পেখম অনেকক্ষণ বসে থাকল। কিন্তু ওয়াশরুম থেকেও তাওয়াফ ভাই বের হলো না। পেখম নিজেই উঠে ওয়াশরুমের দরজার সামনে চলে এলো। সংকোচ নিয়ে ডাকল,
-তাওয়াফ ভাই, আপনি কি ভেতরে?
কোন সাড়াশব্দ নেই। পেখম দরজা ধাক্কা দিয়ে বুঝল দরজা তো খোলাই। ভেতরে কেউ নেই। তাহলে তাওয়াফ ভাই এত রাতে কোথায় গেল? ঘরে একা আছে বলেই হয়তো পেখমের মনে ভয় কাজ করছে। নিজের কল্পনা থেকে ব্যালকনিতেও কোনকিছু দেখতে পেলো। বেচারি আত্মা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তখনই পেছন থেকে কাঁধে হাত পড়ল। পেখম ভয়ে চিৎকার করে উঠল,
-ও মা গো, ভূত।
তাওয়াফ বুঝতে পারেনি পেখম এতটা ভয় পেয়ে যাবে। সে পেখমকে তার দিকে ফিরিয়ে বলল,
-ভূত না। আমি। শুধু শুধু কেন ভয় পাচ্ছিস?
পেখম সত্যিই অনেক ভয় পেয়েছে। হার্টবিট থেমে গেছে তার। কোনকিছু না ভেবে সে তাওয়াফকে জড়িয়ে ধরল।
-আপনি কোথায় চলে গিয়েছিলেন তাওয়াফ ভাই? ব্যালকনিতে সত্যিই কেউ ছিল। আমি স্পষ্ট দেখেছি।
পেখম ভীতু এটা জানত। কিন্তু এতটা ভীতু ধারণা ছিল না। তাওয়াফ পেখমের ভয় কাটাতে বলল,
-ব্যালকনিতে কেউ নেই। বিশ্বাস না হলে আমার সাথে চল। নিজেই দেখে নিবি।
-না না না। আমি যাব না। আপনিও যাবেন না।
-ঠিক আছে যাব না।
পেখম এখনও তাওয়াফকে আগের মতোই জড়িয়ে ধরে রেখেছে। তাওয়াফ মুচকি হাসছে। দিনের বেলা সে বাড়িতে থাকলে দেখাই দিতে চায় না। অথচ এখন?
****
তটিনী মামার সাথে কথা বলছিল। ভুলে আজ দরজা লাগিয়ে নেয়নি। এর মাঝে আলিশবা ঘরে চলে এলে তটিনী তাড়াহুড়ো করে ফোন লুকিয়ে ফেলল। আলিশবা তোতলা কন্ঠে বলল,
-কার সাথে কথা বলো?
হায় রে! বাচ্চা হলেও এই মেয়ে ঠিকই বুঝতে পেরেছে সে কারো সাথে কথা বলছিল। এখন যদি এই কথা সবার সামনে বলে বসে তাহলেই তার হাঁটে হাঁড়ি ভেঙে যাবে।
-কারো সাথে কথা বলিনি তো। তুমি কি আমার সাথে খেলতে এসেছ?
খেলার কথা শুনে আলিশবা খুশি হয়ে গিয়ে বলল,
-হ্যাঁ।
এ যাত্রায় তটিনী কোনভাবে ব্যাপারটা ধামাচাপা দিতে পেরেছে। এখন থেকে তাকে আরও সর্তক থাকতে হবে।
তটিনী আলিশবার সাথে কানামাছি খেলতে খেলতে দোতলায় আজানের ঘরে চলে এলো। ছেলেটা প্রচণ্ড অহংকারী। পরেও এই ছেলের জন্য তার মায়া হয়। আজান তটিনীকে দেখে বলল,
-আপনি কি নিচ থেকে এসেছেন?
-হুম।
-আমার মাকে দেখেছেন?
-দেখেছি। কেন জিজ্ঞেস করছেন?
-দরকার আছে।
-কী দরকার আমাকে বলতে পারেন।
আজান প্রথম দিকে মেয়েটাকে সন্দেহ করলেও এখন সন্দেহ কিছুটা কমেছে। তারপরও মেয়েটার থেকে সাহায্য নিবে কি-না ভাবছে।
-সকাল থেকেই আমার ফোনটা খুঁজে পাচ্ছি না। মা কোথাও রেখেছে কি-না।
-আমি কি আপনার ফোন খুঁজে দিব? যদি আপনার আপত্তি না থাকে তবে।
তটিনী ফোন খুঁজতে খুঁজতে নিচে থেকে পল্লব মির্জার চিৎকার চেঁচামেচি ভেসে আসছে। আজান হতাশার দম ফেলে বলল,
-আবার শুরু হয়ে গেছে!
তটিনী বলল,
-আপনাদের বাড়িটা এখন আর বাড়ি নেই। চিড়িয়াখানা হয়ে গেছে। বিশেষ করে পেখম ওই ছেলেটাকে বিয়ে করার পর থেকে আপনার চাচা পাগলা কুত্তা হয়ে গেছে।
-পেখম যা করেছে ঠিকই করেছে। তাওয়াফ ভাইয়ের উচিত পেখমকে আর এবাড়িতে আসতে না দেওয়া। আমার চাচার একটু শিক্ষা হওয়া দরকার।
****
তাওয়াফ ছোট দাদীকে বলে পেখমের বইপত্র আনিয়ে নিয়েছে। কয়দিন পরই মেয়েটার পরীক্ষা। তবে পেখম পরীক্ষা দিতে ভয় পাচ্ছে। প্রতিবার ভালো রেজাল্ট করলেও এবার মনে হয় পাসই করতে পারবে না। সাহায্যের জন্য সে ইলহাম ভাইয়ের কাছে গেল।
-ইলহাম ভাই তুমি কি আমাকে প্রাইভেট পড়াবে? তুমি তো সাইন্স নিয়ে পড়েছ।
ইলহাম পড়াতে পারত কোন সমস্যা নেই। কিন্তু মাথায় একটা দুষ্টুমি বুদ্ধি এলে বলল,
-আমার তো সময় নেই রে। তুই তো তাওয়াফ ভাইয়ের কাছেই পড়তে পারিস। তাওয়াফ ভাই আমার থেকেও ভালো স্টুডেন্ট ছিল।
পেখম ভাবছে তাওয়াফ ভাইয়ের কাছে পড়বে! তাওয়াফ ভাই এখন ধমক টকম দেয় না। কিন্তু বিয়ের পর থেকে সে তাওয়াফ ভাইয়ের সামনে গেলেই লজ্জায় লাল হয়। এত লজ্জা কোত্থেকে এসেছে পেখম নিজেও জানে না।
তাওয়াফ ফোনে ফুপুর সাথে কথা বলছে। ইরিনের খোঁজ নিচ্ছে।
-ইরিন এখন কী করে ফুপু?
-কিছু করে না। ঘরে বসে আছে। তোর কথা মতোই ওকে আমি কিছুই জিজ্ঞেস করিনি। ওর বাবাকেও কিছু জানাইনি। মেয়েটা যে কেন এমন করল! হ্যাঁ রে তাওয়াফ, তোকে কি ইরিন কিছু বলেছে?
ফুপুর সাথে মিথ্যা বলতে না চাইলেও সত্য বলারও উপায় নেই। তাওয়াফ বলল,
-আমি জিজ্ঞেস করিনি। তবে ওকে বুঝিয়েছি। ও যা করেছে সেটা ভুল ছিল।
ইভা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলল। মেয়েদের নিয়ে তার অনেক স্বপ্ন ছিল। কিন্তু এখন ইভা ভয় পাচ্ছে। যদি ছেলে ঘটিত কোন বিষয় হয় আর ওর বাবা জানতে পারে, তাহলে রক্ষে থাকবে না।
-তাওয়াফ তোর থেকে একটা বিষয়ে পরামর্শ নিতে চাই। আমাকে একটু ঠিক পথ দেখা বাবা। আমার এখন কী করা উচিত আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। ইরিনের দাদা দাদী ওর জন্য ছেলে দেখেছে। ছেলেদের বাড়ি গ্রামে হওয়ায় আমি এতদিন মত দিইনি। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে...
ফুপু কথা শেষ করার আগেই তাওয়াফ বলল,
-বিয়ে দিলেই কি সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে ফুপু? ইরিন যদি নিজের ভুল বুঝতে পারে তাহলে কি ওকে একটা সুযোগ দেওয়া উচিত না? ইরিন হয়তো এখন বিয়ে করতে চায় না। ওর মতামত নিয়েছ তোমরা?
তখনই পেখম ঘরে এসেছিল। তাওয়াফের শেষের কয়েকটা কথা শুনেছে। ইরিন আপুর বিয়ের কথা হচ্ছে? পেখমের মনে পড়ল ইরিন আপু তাওয়াফ ভাইকে ভালোবাসতো। যদিও তাওয়াফ ভাই ইরিন আপুকে ভালোবাসে না বলেছে। কিন্তু বেচারির প্রথম ভালোবাসা তো তাওয়াফ ভাই-ই।
তাওয়াফ পেখমকে দেখেছে। ফুপুর সাথে এব্যাপারে পরে কথা বলবে। কল কেটে তাওয়াফ পেখমের দিকে তাকাল। পেখম তাওয়াফ ভাইকে তাকে পড়ানোর কথা বলতে এসেছিল। কিন্তু এখন বলল না।
-ইরিন আপুর কি বিয়ে তাওয়াফ ভাই?
তাওয়াফ ভ্রু কুঁচকিয়ে পেখমের দিকে তাকিয়ে আছে। তার ফোনের কথপোকথন কি পেখম শুনেছে? তাওয়াফ ইরিনের বিষয়টা এড়িয়ে গিয়ে বলল,
-তুই একা ঘরে আমাকে ভাই ডাকিস নাকি অন্য কিছু ডাকিস তা নিয়ে আমার মাথা ব্যথা নেই। কিন্তু বাড়ির লোকের সামনে দয়া করে ভাই ডাকিস না।
তাওয়াফের এই কথা শুনে পেখম মাথা নিচু করে নিল। ভাই না ডাকলে কী ডাকবে? কিছু যদি না ডাকে তাহলে কথা বলবে কীভাবে? তাওয়াফ পেখমকে দেখছে। একটা জিনিস সে অনেক দিন ধরেই লক্ষ্য করছে। পেখম যতক্ষণ তার সামনে থাকে ততক্ষণ ওর গালে অন্যরকম এক লালিমা লক্ষ্য করা যায়। তাওয়াফ পেখমের সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
-আমরা দু'জন নিজেদের ইচ্ছেতে বিয়ে করেছি। পরিবার আমাদের জোর করেনি। তাই এখনও যদি তুই সবার সামনে আমাকে ভাই ডাকিস তাহলে আমাদের বিয়ে নিয়ে স্বাভাবিক ভাবেই সবার মনে খটকা লাগবে।
পেখম তাওয়াফকে তাকে পড়ানোর কথা বলতে না পারলেও ইলহাম রাতে খাবার টেবিলে তাওয়াফের কানে কথাটা তুলে দিল।
-ভাই তুমি ভালো স্টুডেন্ট ছিলে নাকি আমি?
তাওয়াফ তাচ্ছিল্য ভরে হাসল। এই প্রশ্ন কে জিজ্ঞেস করছে!
-এই প্রশ্নের উত্তর জানতে চাস তুই?
-চাই। কারণ তুমি যদি আমার থেকে ভালো স্টুডেন্ট হতে তাহলে তোমার বউ তোমাকে রেখে আমার কাছে পড়তে চাই না।
তাওয়াফ জানত না পেখম ইলহামের কাছে পড়তে চেয়েছে। সে পেখমের দিকে তাকাল।
পেখম যদি জানত ইলহাম ভাই তার পড়তে চাওয়া নিয়েও তাওয়াফ ভাইকে খোঁচাবে তাহলে সে কখনোই ইলহাম ভাইকে পড়ানোর কথা বলত না।
-তোর ভাবী যদি তোর কাছে পড়তে চায় তাহলে পড়াবি।
-আমার তো সময়ই নেই। তাই তোমার ভবিষ্যত তুমিই দেখে নাও।
প্রিয়া মনে মনে ভাবছে, লোকটার সুবুদ্ধি হয়েছে তাহলে। প্রিয়া পাতে মাছ নিয়েছে ঠিকই। কিন্তু মাছ খাচ্ছে না। সাইডে রেখে দিয়েছে। তা দেখে ইলহাম বলল,
-মিস প্রতিবাদী, আপনি কি মাছ বেছে খেতে পারেন না!
-পারি। কিন্তু ইলিশ মাছে অনেক বেশি কাটা।
-আপনি চাইলে কিন্তু আমি এই দায়িত্ব নিতে পারি।
প্রিয়া কপালে ভাঁজ ফেলে জিজ্ঞেস করল,
-কোন দায়িত্ব?
-আপনাকে মাছের কাঁটা বেছে দেওয়ার দায়িত্ব। এই দায়িত্বে তো এখন কেউ নেই। তাই দায়িত্বটা আমি নিতে চাচ্ছি।
প্রিয়া ইলহামের কথার মানে বুঝতে পারলেও এড়িয়ে গিয়ে হেসে বলল,
-কোন দরকার নেই। আপনার উপর নির্ভরশীল হওয়ার বদলে আমি মাছ খাওয়াই ছেড়ে দিব।
খাওয়াদাওয়া শেষে তাওয়াফ রুমে চলে এলো। পেখম একটু পরে এসেছে। পেখম ঘরে আসা মাত্রই তাওয়াফ বলল,
-তুই কি ইলহামের কাছেই পড়তে চাস? নাকি আমি পড়ালে হবে৷ যদিও আমি তোর ভাইয়ের মতো ডাক্তার না।
তাওয়াফ ভাই কি রাগ করেছে? সে কি এতকিছু ভেবে ইলহাম ভাইকে পড়ানোর কথা বলেছে?
-ইলহাম ভাই না। আপনি পড়ালেও হবে। লাস্টের কয়েকদিন কলেজে যাইনি। প্রাইভেটও মিস গিয়েছে। আমার পরীক্ষায় পাস করতে পারলেই হলো। কে পড়িয়েছে সেটা বিষয় না।
তাওয়াফ মুখ গম্ভীর করে রাখলেও মনে মনে হাসল। এই মেয়ে তাকে এত ভয় পায় কেন?
-ঠিক আছে। তোকে পাস করানোর দায়িত্ব আমি নিলাম। আজ থেকে পড়া শুরু করবি? নাকি কাল থেকে?
-আজ থেকেই করি। পরীক্ষার তো খুব বেশি দিন নেই।
তাওয়াফ পেখমকে পড়ালেও পেখম তার সম্পূর্ণ মনোযোগ পড়াশোনায় দিতে পারছে না। কারণ তার মনোযোগ বারবার বই থেকে তাওয়াফ ভাইয়ের উপর চলে যাচ্ছে। পেখম দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে মনে মনে বলল,
-তোর আর পড়াশোনা হয়েছে। বইয়ের থেকে বেশি মনোযোগ যদি স্যারের উপর দিস তাহলে পরীক্ষায় গিয়ে কোন কচুটা লিখবি?
-এই চ্যাপ্টার তো অনেক সোজা। তুই কী বুঝতে পারছিস না সেটা বল।
পেখমের জবাব না পেয়ে তাওয়াফ পেখমের দিকে তাকালে বুঝতে পারল এই মেয়ে কল্পনার রাজ্যে আছে। একে ইলহামকে পড়াতে বলাই উচিত ছিল। তার কাছে পড়ার চক্করে না আবার ফেল করে বসে। তার তাওয়াফও বুঝতে পারছে পেখম তার কাছে পড়তে পারবে না। পড়া বোঝার বদলে এই মেয়ে তাকে দেখায় ব্যস্ত থাকবে।
-পুনম, আমাকে পরেও দেখতে পারবি। আমি কোথাও চলে যাচ্ছি না। একবার পরীক্ষাটা দিয়ে নে তারপর যত মন চায় আমাকে দেখিস।
এই কথা শুনে পেখমের হুঁশ ফিরল। নিজের হ্যাংলামি কাজের জন্য লজ্জায় মরে যেতে ইচ্ছে করল।
চলবে
৪৯ পর্ব চলছে। অথচ আমি এখনও নায়ক নায়িকার মাঝে কেমিস্ট্রি তৈরি করতে পারছি না। জীবনে সিঙ্গেল থাকার ফল এইটা। মনে রোমান্টিক চিন্তাভাবনা আসে না।গল্পে রোমান্টিকতা কোত্থেকে দিব বলেন আমারে। তারপরও যতটুকু লিখতে পারি আমার পাঠক সমাজকে এটুকু নিয়েই সন্তুষ্ট থাকার অনুরোধ জানাচ্ছি। 🌚