#তুমি_আসবে_বলে_বসন্ত_এসেছে '৫৭'
#জেরিন_আক্তার_নিপা
তাওয়াফ পেখমকে রুমে এনে বিছানায় বসিয়ে দিল। পেখমের একটু একটু লজ্জা লাগছে আবার ভয়ও হচ্ছে। তাওয়াফ ভাই পুকুর ঘাটে যেতে মানা করেছিল। তারপরও গেছে। তাওয়াফ ভাইয়ের কথা না শোনার জন্য এখন নিশ্চয় অনেক রাগ করবে। বকবেও নিশ্চয়। কিন্তু পুকুর পড়ে গিয়ে তো লাভই হয়েছে। নাহলে তো বুঝত না সে যে তাওয়াফ ভাইকে ভালোবাসে। তাওয়াফ নিজেই উঠে গিয়ে তোয়ালে এনে পেখমের মাথা মুছে দিতে লাগল। পেখম শুধু ড্যাবড্যাব করে তাওয়াফ ভাইকে দেখে যাচ্ছে। এই মানুষটাকে নিয়ে ভালোলাগা অনেক আগেই তৈরি হয়েছিল। কিন্তু ভালোবাসা কবে তৈরি হলো?
আজকের মতো ভয় তাওয়াফ জীবনে কখনও পায়নি। পেখমের কিছু হয়ে গেলে সে কী করত নিজেও জানে না।
-তোকে যেন আমি আর পুকুরের ধারের কাছেও না দেখি।
পেখম চুপ করে রইল। এইতো বকাবকি মাত্র শুরু হয়েছে।
-পুকুরের পানি খেয়ে নিশ্চয় পেট ভরেছে। একারণেই তোকে বলেছিলাম সবসময় আমার সাথে সাথে থাকতে।
তাওয়াফ ভাই তাকে বকছে নাকি বোঝাচ্ছে পেখম ঠিক বুঝতে পারছে না। মাথা নিচু করে রেখে ভয়ে ভয়ে বলল,
-আমি কি ইচ্ছে করে পড়েছি নাকি? পা পিছলে গেলে আমি কী করব?
মাথা মুছানো শেষ করে তাওয়াফ পেখমের মুখের দিকে তাকিয়ে ছোট্ট একটা দম ফেলে নরম গলায় বলল,
-আজ যদি ওই ছেলেটা ওখানে না থাকত। কেউ যদি তোকে পুকুরে পড়তে না দেখত, তখন কী হতো ভাবতে পারছিস?
কথাটা বলতে গিয়ে তাওয়াফের গলা কেঁপে উঠল। আরেকটু সময় গেলেই পেখম পুকুরে তলিয়ে যেত ভাবতেই গায়ে কাঁটা দিচ্ছে। পেখম এতক্ষণ এত বেশি ভয় না পেলেও তাওয়াফ ভাইয়ের বিষাদ মাখা মুখের দিকে তাকিয়ে ভয় পেলো। মরে গেলে এই মুখটা সে আর দেখতে পেত না।
-আমি আর কখনও আপনার কথার অবাধ্য হবো না। এখন থেকে সবসময় আপনার সাথে সাথেই থাকব। একা কোথাও যাব না।
তাওয়াফ হাসল। পেখমের হাত ধরে বলল,
-আমি তোকে কোথাও যাওয়া থেকে আটকাচ্ছি না। যেখানে যাবি শুধু আমাকে বলে যাবি।
পেখম মনে মনে বলল,
-আমি যাবই না।
-যা এবার গিয়ে চেঞ্জ করে নে। নয়তো ঠান্ডা লেগে যাবে।
ওয়াশরুমে ঢুকতে ঢুকতেও পেখম ঘাড় ঘুরিয়ে তাওয়াফকে দেখছে। তাওয়াফের নজর সেদিকে গেলে ভ্রু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করল,
-কী?
পেখম লজ্জা পেয়ে 'কিছু না' বলে ভেতরে ঢুকে গেল। ওয়াশরুমের দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে নিজেকেই বলল,
-তোর আজ কী হয়েছে পেখম? কেন এমন নির্লজ্জের মতো বারবার তাওয়াফ ভাইকেই দেখে যাচ্ছিস? আগে কি কখনও উনাকে দেখিসনি?
সাথে সাথে পেখমের ভেতর থেকে যেন কে বলে উঠল, দেখেছি। কিন্তু আগে তো উনাকে ভালোবাসিনি।
পেখম অবাক হয়ে গেল। তার মনও এত জোরে কথা বলে! পেখম মনকে বলল,
-আগেও ভালোবেসেছিস। বোকা ছিলি বলে এতদিন বুঝতে পারিসনি।
ওয়াশরুমের আয়নার দিকে তাকিয়ে পেখম নিজেকে দেখেই লজ্জা পেয়ে দু'হাতে মুখ লুকালো।
****
ছেলের বাড়ি থেকে হলুদ নিয়ে মোটামুটি অনেকজন মানুষই এসেছে। ফুপুর থেকে শাড়ি পরে এসে তৈরি হতে হতে পেখমের একটু দেরি হয়ে গেছে। এতক্ষণে মানুষ চলে এসেছে। সবাই ফুল, মিষ্টি হাতে নিয়ে গেটে গিয়ে দাঁড়ালেও পেখম গেল না। সে তাওয়াফ ভাইকে খুঁজে বের করে তাওয়াফ ভাইয়ের পাশে এসে দাঁড়িয়ে পড়ল। তাওয়াফ পেখমকে দেখে আশেপাশে কী হচ্ছে ভুলে গিয়ে ওর দিকেই মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে রইল। পেখমের পরনে হলুদ রঙের শাড়ি। খুব বেশি সাজেনি। অলংকার বলতে কাঁচা ফুলের গহনা। এতেই এত বেশি সুন্দর লাগছে যে তাওয়াফ চোখ সরাতে পারছে না। পেখম দূরে দাঁড়িয়ে আছে দেখে দৃষ্টি ডাকল।
-ওখানে দাঁড়িয়ে আছিস কেন তুই? এদিকে আয়।
দৃষ্টির ডাকে তাওয়াফের ধ্যান ভাঙল। পেখমকে দেখা থেকে নিজেকে সামনে নিল সে। দৃষ্টির ডাকাডাকিতে পেখম বিরক্ত হলো। তাকে কেন ডাকছে? সে আজ তাওয়াফ ভাইকে রেখে কোথাও যাবে না। হলুদ পাঞ্জাবিতে তাওয়াফ ভাইকে যা সুন্দর লাগছে! ইরিন আপুর শ্বশুরবাড়ির মেয়েরা নিশ্চয় তাওয়াফ ভাইয়ের সাথে লাইন মারতে চাইবে। না না বাবা, একটু আগেই নিজের ভালোবাসা উপলব্ধি করেছে। এখন তাওয়াফ ভাইকে একা ছেড়ে গিয়ে অন্য মেয়েদের সুযোগ করে দেওয়ার মতো রিস্ক সে নিতে পারবে না। দৃষ্টির সাথে এবার আকৃতিও ডাকছে। পেখম যাচ্ছে না দেখে তাওয়াফ ভাবল হয়তো তার ভয়ে যাচ্ছে না। সাথে সাথে থাকতে বলেছিল বলে এখানে দাঁড়িয়ে আছে। তাওয়াফ বলল,
-ওদের কাছে যেতে মন চাইলে যা।
পেখম বলল,
-না। আমি এখানেই ঠিক আছি।
তাকে পেখম কতটা ভয় পায় আন্দাজ করে তাওয়াফ হাসল।
-আমি যেতে বলেছি। যা এবার।
পেখম চোখা চোখে তাওয়াফ ভাইকে দেখল। নিজের থেকে দূরে কেন সরাতে চাচ্ছে? বিবাহিত হয়ে বউ পাশে নিয়ে ঘুরতে সমস্যা কী? পেখম শক্ত গলায় বলল,
-আমি যাব না।
তাওয়াফ মনে মনে বলল, আমিও চাই না তুই ওখানে যা। মহিলাদের সাথে অনেক গুলো ছেলেও এসেছে। ওদেরকে একটু বেশিই উৎসুক মনে হচ্ছে।
ছেলের বাড়ির মানুষ ইরিনকে হলুদ লাগিয়ে, খাওয়াদাওয়া করে চলে গেছে। এবার এখান থেকে হলুদ নিয়ে ছেলের বাড়ি যাবে। এ পক্ষের মানুষ ছেলের বাড়ির মানুষদের হলুদের সাথে কালি, মাটি মাখিয়ে লাগিয়েছে। ওরা গেলে নিশ্চয় ওদের থেকেও প্রতিশোধ নিবে। এই ভয়েই অনেকে যেতে চাচ্ছে না। দৃষ্টি মুখ বাঁকিয়ে জানতে চাইল,
-তুই কি দুলাভাইদের বাড়িতেও যাবি না? সবাই কত আনন্দ করল অথচ তুই দূরে দাঁড়িয়ে রইলি। পুকুরে পড়ে কি সিস্টেম উলটপালট হয়ে গেছে? তুই হঠাৎ এত শান্ত কীভাবে হয়ে গেলি?
আকৃতি যতটুকু আন্দাজ করতে পেরেছে তাতে বোঝা যাচ্ছে তাওয়াফ ভাই হয়তো বকেছে। তাই বেচারির মন খারাপ। আকৃতি পেখমের হাত ধরে জোর দিয়ে বলল,
-যাবে না কেন হ্যাঁ? পেখমও যাবে।
পেখম যেতে চায়। কিন্তু যদি তাওয়াফ ভাই যায় তো। তাওয়াফ ভাই না গেলে যাবে না। কিন্তু তাওয়াফ ভাই যাবে কি-না এটাই তো জানে না। পেখম আকৃতি আপুকে জিজ্ঞেস করল,
-তাওয়াফ ভাই যাবে?
-যাবে। যেতে না চাইলেও আমরা জোর করে নিয়ে যাব।
পেখম মনে মনে বলল, তাহলে ঠিক আছে।
*****
ছেলের বাড়িতেও তাদের ভালোই আপ্যায়ন করা হলো। এখানে এসেও পেখম তাওয়াফের সাথে সাথেই থাকছিল। একটু আগেই একটা কল এলে তাওয়াফ কথা বলতে দূরে গেল। পেখম তখন একাই দাঁড়িয়ে ছিল। হুট করে একটা ছেলে এসে জিজ্ঞেস করল,
-আপনি কি মেয়ে পক্ষের মানুষ?
পেখম জানাল,
-জি।
ছেলেটা ঠোঁটে দুষ্টুমি হাসি নিয়ে বলল,
-আপনাদের ওখানে গিয়ে তো আপনাকে দেখিনি। কোথায় লুকিয়ে ছিলেন?
পেখম বুঝতে পারছে ছেলেটা তার সাথে খাতির জমাতে চাচ্ছে। কিন্তু সে ছেলেটার সাথে কথা বলতে একটুও আগ্রহী না।
-আপনি আমাদের ভাবীর কী হোন?
পেখম অনাগ্রহে জানতে চাইল,
-কে আপনার ভাবী?
-ইরিন ভাবী।
-ইরিন আপু আমার ফুপুর মেয়ে।
-তাহলে তো আপনি আমাদের বেয়াইন। এত সুন্দরী একটা বেয়াইনকে তো একস্ট্রা খাতিরযত্ন করতে হয়। চেয়ার আনব, বসবেন?
-জি না। ধন্যবাদ। আমাকে নিয়ে আপনার ব্যস্ত না হলেও চলবে। আপনি আপনার নিজের কাজে যান।
-বিয়েতে যতদিন আছি ততদিন আমাদের একটাই কাজ। বেয়াইনদের সাথে হাসি আনন্দ আর খোশগল্প করা।
ছেলেটা অতিরিক্ত গায়ে পড়া স্বভাবের। পেখমের বিরক্ত লাগছে। সে আশেপাশে দৃষ্টি, আকৃতি আপুকে খুঁজছে। ওই ছেলেটা কি কম ছিল? এর মাঝেই অন্য আরেকটা এসে জুটলো।
-এতক্ষণ ধরে কার সাথে কথা বলছিস রে শালা?
-আরে ভাবীর বোন। আমাদের বেয়াইন।
-তা বেয়াইনের গাল দেখি পরিষ্কার। কেউ হলুদ লাগায়নি? আহারে বেইয়াইন এটা তো আপনার সাথে না-ইনসাফি হয়ে গেল। দাঁড়ান আপনার গালও হলুদ করে দিচ্ছি।
কথাটা বলে ছেলেটা চলে গেলেও একটু পরে সত্যিই হলুদ নিয়ে ফিরল। পেখম কড়া গলায় ছেলেটাকে সাবধান করে দিয়ে বলল,
-আমাকে হলুদ লাগাবেন না। এসব আমার পছন্দ না।
-কেন পছন্দ না বেয়াইন? বিয়েতে তো সবাই সবাইকে হলুদ লাগায়। আপনাকে একটু লাগাতে অন্যায় কী হবে?
দ্বিতীয় ছেলেটা বাড়াবাড়ি করছে। পেখম নিষেধ করার পরেও হলুদ লাগাতে এলে পেখম পেছনে সরে গেল। তবুও ছেলেটা এগিয়ে আসছে। পেখম ভাবল এবার সে কাউকে ডাকবে। কিন্তু তার আগেই তাওয়াফ এসে ছেলেটার হাত ধরে ফেলল। তাওয়াফ ভাইকে দেখে পেখম স্বস্তির দম ফেলল। তাওয়াফ পেখমের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর মুখে জিজ্ঞেস করল,
-ছেলেটা কি তোকে বিরক্ত করছিল?
তাওয়াফ ছেলেটার হাত এত শক্ত করে ধরেছে যে ছেলেটা ব্যথা পেয়ে হাত ছাড়িয়ে নিতে চাচ্ছে। প্রথম ছেলেটা বুঝতে পারল তারা একটু বেশিই করে ফেলেছে। তাই সে অনুতপ্ত হয়ে বলল,
-সরি ভাইয়া। আমরা উনাকে বিরক্ত করছিলাম না। বিয়ে বাড়িতে সবাই সবাইকে হলুদ মাখাচ্ছে তাই,,
ছেলেটার কথার মাঝখানে তাওয়াফ প্রায় গর্জে উঠে বলল,
-তাই কী? তাই তোমরাও একটা মেয়েকে একা পেয়ে হলুদ মাখাতে চলে এসেছ। মেয়েটার গালে হলুদ মাখানোর আগে তোমরা তার অনুমতি নিয়েছ?
তাওয়াফ পেখমের দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করল,
-তোকে হলুদ লাগানোর অনুমতি দিয়েছিস তুই?
পেখম তাওয়াফ ভাইয়ের চোখের দিকে তাকিয়ে ভয় পেয়ে গেল। পেখম কখনোই তাওয়াফ ভাইয়ের চোখ এত লাল হতে দেখেনি। বেচারি ঢোঁক গিলে বলল,
-না।
-একটা মেয়ের থেকে অনুমতি না নিয়ে তাকে ছোঁয়ার সাহস তোমাদের কে দিয়েছে?
তাওয়াফের ধমকে ছেলে দু'জনের সাথে পেখমও ভয় পেয়ে গেল। আশেপাশের মানুষও এতক্ষণে বুঝতে পেরেছে এখানে কোন ঝামেলা হচ্ছে। প্রথম ছেলেটা হয়তো ঝামেলা এড়ানোর জন্যই ক্ষমা চাইতে লাগল।
-আমাদের ভুল হয়ে গেছে ভাইয়া। প্লিজ এটাকে প্রথম এবং শেষ ভুল মনে করে ক্ষমা করে দিন। আমরা জাস্ট ফান করছিলাম। সত্যিই বুঝতে পারিনি আমাদের ফান এত বেশি হয়ে যাবে। প্লিজ ভাইয়া, আমাদের ভাইয়ের বিয়েতে কোন মেয়ের অসম্মান হোক এটা আমরাও চাইনি।
পেখমের এবার ছেলে দুইটার উপর সত্যিই মায়া হচ্ছে। কিন্তু তাওয়াফ ভাইকেও সে এদের ক্ষমা করে দেওয়ার কথা বলতে পারছে না। বললে নিশ্চয় তাকেই ধমক দিয়ে চুপ করিয়ে দিবে।
তাওয়াফের রাগ না কমলেও সে পরিস্থিতি বুঝে নিয়ে ছেলে দুইটাকে বেশি কিছু করল না। তাওয়াফ মেয়ে পক্ষের হয়ে এসেছে। সে এখানে ঝামেলা করলে এর জন্য বিয়ের পর হয়তো ইরিনকে কথা শুনতে হবে।
ছেলেটার হাত ছেড়ে দিয়ে শীতল কণ্ঠে বলল,
-কখনও নিজেদের আনন্দের জন্য কোন মেয়ের সাথেই অসভ্যতায় নেমে এসো না। তোমার কাছে হয়তো ফান মনে হচ্ছে। কিন্তু মেয়েটার কাছে তোমার ফান ভালো না-ও লাগতে পারে। তুমি যে-ই হও মেয়েটা না বলেছে মানে তোমাকে সেটা মেনে নিতে হবে। তুমি মেয়েটার উপর জোর খাটাতে পারবে না।
দ্বিতীয় ছেলেটা সত্যিই এবার নিজের ভুল বুঝতে পারল। মাথা নিচু করে অপরাধী কন্ঠে বলল,
-সরি ভাইয়া। আপু আপনাকেও সরি।
ছেলে দুইটা চলে গেলে তাওয়াফ পেখমের দিকে ফিরে ছোট্ট একটা দম ফেলে বলল,
-কেন তোকে আমার সাথে সাথে থাকতে বলি এবার বুঝেছিস তো?
পেখম ভেবেছিল তাওয়াফ ভাই তাকেও বকবে। কিন্তু তাওয়াফ ভাই তাকে কিছুই বলেনি। তারপরও পেখম গাল ফুলিয়ে বলল,
-এবার কি আমি কোথাও গিয়েছি? আপনিই তো কল তুলতে গিয়েছিলেন। নাহলে তো আমি আপনার সাথেই ছিলাম।
তাওয়াফ হতাশ গলায় বলল,
-হু। এবার থেকে কল তুলতে গেলেও তোকে সাথে নিয়ে যেতে হবে দেখছি।
চলবে