#প্রেমের_ গুঞ্জন
#পর্ব_৩
#লেখিকা_জান্নাত
গুঞ্জন আজ ওর বাবাকে সঙ্গে নিয়ে একজন অভিজ্ঞ আইনজীবীর সঙ্গে দেখা করে এসেছে। দীর্ঘ আলোচনা শেষে আইনজীবী তাদের পুরো আইনি প্রক্রিয়াটা বুঝিয়ে দেন। গুঞ্জন সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে,এ সম্পর্ক আর টেনে নিয়ে যাওয়ার কোনো অর্থ নেই। যে সম্পর্কে ভালোবাসা, বিশ্বাস আর একসঙ্গে পথ চলার ইচ্ছেটুকুই নেই, সে সম্পর্ক শুধু কাগজে-কলমে বাঁচিয়ে রাখার মানে হয় না।
আইনজীবীর পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত করা হবে। এরপর গুঞ্জন সেগুলোতে স্বাক্ষর করে রিয়াদের ঠিকানায় পাঠিয়ে দেবে, যাতে আইন অনুযায়ী পরবর্তী কার্যক্রম শুরু করা যায়।
চিঠিতে অবশ্য রিয়াদ লিখেছিল, সময় হলে সে নিজেই ডিভোর্সের কাগজপত্র পাঠিয়ে দেবে। কিন্তু সেই কাগজ আর কোনো দিনই আসেনি। হয়তো সময়ের স্রোতে সে নিজের কথাটাই ভুলে গেছে, কিংবা ইচ্ছে করেই আর বিষয়টি গুরুত্ব দেয়নি।
আর গুঞ্জন? সে এতদিন অপেক্ষা করেছে। বুকের ভেতর এক চিলতে আশাকে আগলে রেখেছিলো হয়তো একদিন রিয়াদ ফিরে আসবে, হয়তো সব কিছুর অবসান হবে। কিন্তু প্রতিটি দিন সেই আশাটাকে একটু একটু করে নিভিয়ে দিয়েছে। আজ আর অপেক্ষা করার মতো কোনো স্বপ্ন অবশিষ্ট নেই।
তাই গুঞ্জনও সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে সম্পর্ক বহু আগেই ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে, সেই সম্পর্কের নামের ভার আর বয়ে বেড়াবে না সে। এবার সবকিছুর ইতি টানবে, আইনসম্মতভাবেই।
__
গুঞ্জনের স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করেছে খবরটা যেন বাতাসের বেগে চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। কেউ দীর্ঘশ্বাস ফেলে আফসোস করছে, কেউ এসে গুঞ্জনকে সান্ত্বনা দিচ্ছে, আবার কেউ কটাক্ষের তীর ছুড়ে কথা শুনিয়ে যাচ্ছে।
তবে গুঞ্জন এসব কথায় আর কান দেয় না। কারণ গত দুই বছরে সে এসবের সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। মানুষের কত অপমান, কত তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য যে সহ্য করেছে তার হিসাব নেই। কেউ কেউ তো তাকে অপয়া বলতেও দ্বিধা করেনি।
পাড়া-প্রতিবেশীদের কাজই যেন এমন। নিজেদের ভুল-ত্রুটি না দেখে অন্যের জীবন নিয়ে বিচার-বিশ্লেষণ আর সমালোচনা করতেই তারা বেশি ব্যস্ত।
গুঞ্জন বারান্দায় চুপচাপ বসে দূরে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল। ঠিক তখনই ওর ছোট ভাই ফোয়াদ এসে বোনের পাশে বসে পড়ে। ফোয়াদের বয়স মাত্র দশ বছর। কিন্তু ছোট্ট এই ছেলেটা যেন সবার আগে বুঝে ফেলে তার আপুনির বুকের ভেতরে লুকিয়ে থাকা কষ্ট, হতাশা।
ফোয়াদ গুঞ্জনের হাতটা নিজের ছোট্ট হাতে মুঠো করে ধরে শান্ত স্বরে বলে
আপুনি, তুমি একদম কষ্ট পেয়ো না। আল্লাহ সব দেখেন। যারা তোমাকে কষ্ট দিয়েছে, একদিন তারা নিজেদের ভুল ঠিকই বুঝবে। তুমি কাঁদলে আমার খুব খারাপ লাগে। তুমি শুধু হাসো, দেখবে একদিন আল্লাহ তোমাকে এত সুখ দেবেন যে আজকের সব কষ্ট ভুলে যাবে। আমি বড় হয়ে তোমার সব দুঃখ দূর করে দেব, ইনশাআল্লাহ।
ফোয়াদের কথা শুনে গুঞ্জনের চোখ দুটো জলে ভরে ওঠে। সে ফোয়াদকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে কপালে আলতো করে একটি চুমু খেয়ে বলে,
আমি কষ্ট পাচ্ছি না, সোনা। তোর মতো এত লক্ষ্মী ভাই যার আছে, তার কি কোনো কষ্ট থাকতে পারে?
কথাটা বলেই গুঞ্জন ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে তোলে।
দুই ভাইবোনের এমন ভালোবাসাময় দৃশ্য দেখে দরজার আড়াল থেকে আয়শা বেগমের ঠোঁটের কোণেও মৃদু হাসি ফুটে ওঠে। তিনি মনে মনে প্রার্থনা করেন,
আল্লাহ, আমার ছেলেমেয়ে দুটোকে তুমি সব সময় ভালো রেখো।
____
বিকেলের শেষ রোদের ঝলকানি ধীরে ধীরে উঠোন জুড়ে নেমে এসেছে। মাঠ থেকে ক্লান্ত শরীর নিয়ে বাড়ি ফিরলেন গুঞ্জনের বাবা। সারাদিন রোদে পুড়ে জমিতে চাষাবাদ করেছেন। কাঁধে লাঙল, শরীরে ঘামের গন্ধ, পায়ে শুকিয়ে থাকা কাদামাটি এই মানুষটার কঠোর পরিশ্রমেই চলে তাদের ছোট্ট সংসার।
বাবাকে উঠোনে ঢুকতে দেখেই গুঞ্জন তাড়াতাড়ি রান্নাঘর থেকে এক গ্লাস ঠান্ডা পানি এনে তাঁর হাতে ধরিয়ে দেয়।
গুঞ্জনের বাবা পানির গ্লাসটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ চুপচাপ মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকেন।
শ্যামবর্ণ মেয়েটার মুখে আলাদা কোনো চাকচিক্য নেই, তবুও তার মধ্যে এক অদ্ভুত মায়া লুকিয়ে আছে। বড় বড় টলমলে চোখ, শান্ত মুখশ্রী আর ঠোঁটের কোণে লাজুক হাসি ,যে একবার গুঞ্জনের দিকে তাকাবে, সে দ্বিতীয়বার না তাকিয়ে পারবে না। তার সৌন্দর্য রূপের জৌলুসে নয়, বরং সরলতা আর কোমল মায়ায়। যেন গ্রামের ভোরের শিশিরভেজা শিউলি ফুল নিরাভরণ, অথচ হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়ার মতো সুন্দর।
মেয়ের মুখের দিকে তাকাতেই বুকের ভেতরটা হাহাকার করে ওঠে তাঁর।
আজ গুঞ্জনের জীবনের এই পরিণতির জন্য তিনি নিজেকেই দোষী মনে করেন। সেদিন যদি মেয়েটার কথাটা শুনতেন! গুঞ্জন তো পড়তে চেয়েছিল, নিজের স্বপ্নগুলো পূরণ করতে চেয়েছিল। অথচ সমাজের কথা ভেবে, মানুষের কথায় বিশ্বাস করে তাড়াহুড়ো করে বিয়ে দিয়ে দিয়েছিলেন। আজ সেই ভুলের বোঝা যেন প্রতিদিন তাঁর বুকের ওপর পাথরের মতো চেপে বসে।
একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে তাঁর বুক চিরে।
মেয়ের মাথায় স্নেহভরে হাত রেখে তিনি নরম কণ্ঠে জিজ্ঞেস করেন,
তোর পরীক্ষার রেজাল্ট কবে দিবো রে মা।
প্রশ্নটা শুনে গুঞ্জনের হঠাৎই রেজাল্টের কথা মনে পড়ে। গত কয়েক দিনের ঝড়ঝাপটায় সে যেন পুরোপুরি ভুলেই গিয়েছিল এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টা।
মুখে হালকা দুশ্চিন্তার ছাপ ফুটে ওঠে।
এই তো বাবা, আর তিন দিন পরেই রেজাল্ট প্রকাশ হবে।
মেয়ের চোখেমুখের উদ্বেগটা বাবার দৃষ্টি এড়ায় না। তিনি মৃদু হেসে আশ্বাসের সুরে বলেন,
এইডা নিয়া এত চিন্তা করস ক্যান মা? আমার মন কইতাছে, তুই অনেক ভালো রেজাল্ট করবি। আল্লাহ তোর পরিশ্রম কখনো ফালাইয়া দিব না। দেখিস, তোরে নিয়া একদিন আমাগো বুক গর্বে ভইরা যাইবো মা।
বাবার কণ্ঠে থাকা অগাধ বিশ্বাস আর ভরসা যেন গুঞ্জনের অস্থির মনটাকে একটু হলেও শান্ত করে দেয়।
গুঞ্জন বাবার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসে। সেই হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকে অসংখ্য কষ্ট, আবার নতুন করে স্বপ্ন দেখার একফোঁটা সাহসও।
___
অন্যদিকে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক প্রধান ফটক পেরিয়ে গর্জন তুলে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করল একটি কালো স্পোর্টস বাইক। বাইকের ওপর বসে থাকা ছেলেটিকে দেখেই চারপাশে ফিসফাস শুরু হয়ে যায়। সব মেয়েরা মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে।
সে আর কেউ নয় প্রেম চৌধুরী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন (BBA) বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র। বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে আলোচিত এবং বহুল পরিচিত মুখগুলোর মধ্যে অন্যতম।
"প্রেম" নামটা যেন পুরো ক্যাম্পাসে এক আলাদা পরিচয় বহন করে। নতুন থেকে পুরোনো অসংখ্য মেয়ের ক্রাশ সে। তাকে এক নজর দেখার জন্য অনেকেই অকারণে বিভাগ বা ক্যাম্পাসে ঘোরাঘুরি করে। তবে প্রেম এসবের কোনো কিছুকেই গুরুত্ব দেয় না।
ধনী পরিবারের একমাত্র ছেলে হওয়ায় ছোটবেলা থেকেই নিজের ইচ্ছামতো চলতে অভ্যস্ত। ভীষণ রাগী, অহংকারী আর বেপরোয়া স্বভাবের। যা একবার চাইবে, সেটা না পাওয়া পর্যন্ত থামে না। তাকে ভুলেও কেউ বাধা দেওয়ার
সাহস করে না।
কারণ, তার রাগ যেমন ভয়ংকর, তেমনি তার প্রভাব-প্রতিপত্তিও কম নয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে অনেক সিনিয়র পর্যন্ত প্রেমকে সমীহ করে চলে। শুধু বিশ্ববিদ্যালয়েই নয়, শহরের প্রভাবশালী মহলেও চৌধুরী পরিবারের নাম যথেষ্ট পরিচিত। আর সেই পরিবারের উত্তরাধিকারী হওয়ায় প্রেমের ক্ষমতা ও প্রভাব নিয়ে কেউ প্রশ্ন তোলার সাহস পায় না।
তবে শুধু প্রভাবশালী পরিবারের সন্তান বলেই নয়, নিজের যোগ্যতাতেও সে আলাদা। পড়াশোনায় অত্যন্ত মেধাবী প্রেম। প্রতিটি সেমিস্টারেই ঈর্ষণীয় ফলাফল করে সে। তাই শিক্ষকরা যেমন তার মেধার প্রশংসা করেন, তেমনি তার একরোখা স্বভাব নিয়ে চিন্তিতও থাকেন।
প্রেম বাইকটা পার্ক করে হেলমেট খুলে কাঁধে ঝুলিয়ে বন্ধুদের দিকে এগিয়ে যায়। কালো ডেনিম জিন্স, সাদা টি-শার্টের ওপর আনবাটন করা ব্ল্যাক লেদার জ্যাকেট, হাতে দামি ঘড়ি, চোখে কালো সানগ্লাস। এলোমেলো চুলে এক হাত বুলিয়ে সে স্বভাবসুলভ উদাস ভঙ্গিতে বন্ধুদের দিকে তাকাল।
প্রেমকে দেখেই ওর এক বন্ধু সায়ন ঠোঁট বাঁকিয়ে বলে উঠল,
কী রে, এত দেরি করলি কেন? আমরা কখন থেকে তোর জন্য অপেক্ষা করছি। আর তোর লাইলি তো আমাদের জ্বালিয়ে মারছে! তার এক কথা প্রেম আসছে না কেন? প্রেম কখন আসবে?
সায়নের কথা শুনে প্রেম বিরক্তিতে মুখ কুঁচকে ফেলল। কপালে ভাঁজ ফেলে গম্ভীর স্বরে বলল,
স্টপ! আমি কি এখানে এসব আজেবাজে কথা শুনতে এসেছি? যতসব!
প্রেমের কথা শেষ হতে না হতেই হঠাৎ কেউ একজন ঝড়ের গতিতে এসে প্রেম কে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে।
চলবে,,,