#প্রেমের_ গুঞ্জন
#পর্ব_৫
#জান্নাত
গুঞ্জন ধীরে ধীরে পা রাখে তার বহুদিনের স্বপ্নের ভার্সিটির বিশাল ক্যাম্পাসে। মুহূর্তেই বুকের ভেতরটা অদ্ভুত এক অনুভূতিতে ভরে ওঠে। এতদিন যে জায়গাটাকে শুধু কল্পনায় দেখেছে, আজ সে সত্যিই সেই ক্যাম্পাসে দাঁড়িয়ে।
চারপাশে চোখ বুলিয়ে দেখতে থাকে সে।
কোথাও বড় বড় গাছের ছায়ায় কয়েকজন শিক্ষার্থী গোল হয়ে বসে আড্ডা দিচ্ছে। কেউ প্রাণ খুলে হাসছে,একটু দূরে বেঞ্চে বসে কয়েকজন ল্যাপটপ খুলে গ্রুপ প্রজেক্ট নিয়ে আলোচনা করছে। কেউ লাইব্রেরির দিকে দ্রুত হাঁটছে, কারও হাতে মোটা মোটা বই। পুরো ক্যাম্পাস যেন এক ব্যস্ত অথচ প্রাণবন্ত পৃথিবী।
প্রশস্ত হাঁটার রাস্তার দু'পাশে সারি সারি গাছ, মাঝেমধ্যে রঙিন ফুলের বাগান। বাতাসে ভেসে আসছে তরুণ-তরুণীদের হাসির শব্দ। দূরে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশাল একাডেমিক ভবন মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। পাশেই ক্যাফেটেরিয়ার সামনে ছোট্ট ভিড় কেউ নাস্তা করছে, কেউ বন্ধুদের জন্য অপেক্ষা করছে।
সবকিছুই গুঞ্জনের কাছে নতুন। বিস্ময়ভরা চোখে চারপাশ দেখছে সে। মনে হচ্ছে যেন এক নতুন জীবনের দরজা তার সামনে খুলে গেছে।
কিন্তু কিছুক্ষণ পরই গুঞ্জন একটা বিষয় খেয়াল করল।
যেদিকেই সে হাঁটছে, অনেকের দৃষ্টি বারবার তার ওপর এসে থেমে যাচ্ছে। কেউ পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সময় একবার ঘুরে তাকাচ্ছে, কেউ আবার নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করে কী যেন বলছে। কয়েকজন মেয়ে অবাক চোখে তার দিকে তাকিয়ে হাসছে,আবার কেউ কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকে পর্যবেক্ষণ করতে লাগল।
প্রথমে গুঞ্জন বুঝতেই পারল না ব্যাপারটা কী। নিজের পোশাকের দিকে একবার তাকাল সে।
তার পরনে ছিল হালকা সাদা নীল রঙের সুতির ঢিলেঢালা সালোয়ার-কামিজ, সাদা ওড়না সুন্দরভাবে গুছিয়ে নেওয়া। মাথায় পরিপাটি করে পরা সাদা হিজাব। মুখে কোনো সাজগোজ নেই, শুধু চোখেমুখে এক ধরনের শান্ত, স্নিগ্ধ সরলতা।
আর চারপাশে থাকা অধিকাংশ শিক্ষার্থীর পোশাক ছিল আধুনিক। কেউ জিন্স আর টপ, কেউ ওয়েস্টার্ন পোশাক, কেউ টি-শার্ট আর জ্যাকেট পরে এসেছে। ছেলেদেরও বেশিরভাগের পরনে ছিল স্টাইলিশ পোশাক।
নিজেকে হঠাৎ যেন একটু আলাদা মনে হতে লাগল গুঞ্জনের।
অজান্তেই তার আঙুলগুলো ব্যাগের স্ট্র্যাপ শক্ত করে চেপে ধরল। বুকের ভেতরটা কেমন ধুকপুক করতে লাগল।
তবুও সে নিজেকে সামলে নিল। বাবা সবসময় বলতেন, মানুষের পরিচয় তার পোশাকে নয়, তার চরিত্র আর শিক্ষায়।
বাবার সেই কথাটাই মনে করে গুঞ্জন গভীর একটা শ্বাস নিল। কারও দৃষ্টিকে গুরুত্ব না দিয়ে মাথা উঁচু করে নিজের বিভাগের ভবনের দিকে হাঁটতে শুরু করল। সে এখানে কারও মন জয় করতে নয় নিজের স্বপ্ন পূরণ করতে এসেছে।
কয়েক কদম এগোতেই পেছন থেকে কয়েকজন সিনিয়রের ডাক ভেসে এলো।
এই যে... হীজাব ওয়ালী, একটু এদিকে আসো তো!
গুঞ্জন আর সাজিয়া একে অপরের দিকে তাকায় তারপর
ধীরে ধীরে তাদের দিকে ফিরে তাকাল। চার-পাঁচজন ছেলে-মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সবার মুখে কৌতূহলী হাসি, তবে সেই হাসিতে
বিদ্রূপের ছাপ স্পষ্ট।
একজন ছেলে গুঞ্জনের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
তুমি কি সত্যিই এই ইউনিভার্সিটির স্টুডেন্ট? নাকি ভুল করে গ্রামের কোনো স্কুল থেকে চলে এসেছ?
আরেকজন হেসে বলল,
এই পোশাক পরে কেউ এখন ক্যাম্পাসে আসে নাকি? মনে হচ্ছে দশ বছর আগের ফ্যাশন!
একজন মেয়ে মাথা থেকে পা পর্যন্ত গুঞ্জনকে দেখে তাচ্ছিল্যের সুরে বলল,
ওড়নাটা আরেকটু বড় নিলে ভালো হতো। পুরো দাদির মতো লাগছে!
কথা শেষ হতেই সবাই হো হো করে হেসে উঠল।
গুঞ্জন একবার নিজের সাদামাটা সালোয়ার-কামিজ আর পরিপাটি করে জড়ানো ওড়নার দিকে তাকাল। তারপর শান্ত অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
আমার পোশাক নিয়ে আপনাদের এত মাথাব্যথা কেন? আমি কী পরব, সেটা আমার ব্যক্তিগত বিষয়।
এক মুহূর্ত থেমে সবার চোখে চোখ রেখে আবার বলল,
যে পোশাক আমার শালীনতা, আত্মসম্মান আর ব্যক্তিত্বকে রক্ষা করে, সেই পোশাক পরতেই আমি গর্ববোধ করি। আধুনিক হওয়া মানে শরীর দেখানো নয়, আধুনিক হওয়া মানে মানুষের চিন্তা-চেতনা আর ব্যবহারে ভদ্রতা থাকা।
গুঞ্জন আবার বলল,
মানুষকে তার পোশাক দিয়ে নয়, তার চরিত্র, শিক্ষা আর ব্যবহার দিয়ে বিচার করতে শিখুন। তাহলে হয়তো সত্যিকারের শিক্ষিত হওয়ার মানেটা বুঝতে পারবেন।
কথাগুলো বলে গুঞ্জন মাথা উঁচু করে সেখান থেকে চলে গেল। আর তার দৃঢ় কণ্ঠের সামনে কয়েক মুহূর্তের জন্য সবাই নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে থাকলো গুঞ্জনের যাওয়ার দিকে।
সাজিয়া গুঞ্জনকে হেঁসে বলে ওঠে
সবাইকে এভাবে জবাব দেওয়ার সাহস খুব কম মানুষেরই থাকে গুঞ্জন। সত্যি বলতে, তোর কথাগুলো আমার হৃদয়ে লেগেছে।আয় বোন তুই আমার বুকে আয়।
সাজিয়ার এমন কথায় গুঞ্জন মুচকি হেঁসে দেয়।
____
গুঞ্জন আর সাজিয়া একসাথে ক্লাসরুমে ঢুকে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই স্যার ক্লাসে ঢুকেন
তিনি মুচকি হেসে সবার উদ্দেশ্যে বললেন
তোমাদের জন্য একটা সুখবর আছে। আগামী সপ্তাহে আমাদের বিভাগে বার্ষিক মেধা প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছে। এই প্রতিযোগিতায় যে প্রথম স্থান অর্জন করবে, তার জন্য থাকবে দশ হাজার টাকা নগদ পুরস্কার, সম্মাননা ক্রেস্ট এবং 'বেস্ট পারফর্মার সার্টিফিকেট।
কথাটা শুনেই পুরো ক্লাসে গুঞ্জন শুরু হয়ে গেল।
গুঞ্জনের চোখ দুটো হঠাৎই জ্বলে উঠল। টাকার লোভে নয়, বরং নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করার এক অদম্য ইচ্ছা তার ভেতরে কাজ করতে লাগল।সে মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল এই প্রতিযোগিতায় সে অংশ নেবেই।
সে সাজিয়ার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল,
চল, স্যারের কাছে যাই। আমি আমার নামটা নিবন্ধন করতে চাই।"
সাজিয়া অবাক হয়ে বলল,
তুই সত্যিই অংশ নিবি?
গুঞ্জন দৃঢ় কণ্ঠে উত্তর দিল,
জয়-পরাজয় পরে দেখা যাবে। চেষ্টা না করে পিছিয়ে আসার মানুষ আমি নই।
দু'জনে স্যারের কাছে গিয়ে গুঞ্জনের নাম নিবন্ধন করে দিল। স্যারও তার আত্মবিশ্বাস দেখে প্রশংসা করলেন এবং মনোযোগ দিয়ে প্রস্তুতি নেওয়ার পরামর্শ দিলেন।
____
অবশেষে অপেক্ষার প্রহর শেষ হলো।
এসে গেল সেই বহুল প্রতীক্ষিত প্রতিযোগিতার দিন।
প্রতিযোগিতার দিন সকাল থেকেই পুরো বিশ্ববিদ্যালয় যেন উৎসবের রূপ নিয়েছে। অডিটোরিয়ামের সামনে শিক্ষার্থীদের ভিড়, চারদিকে ব্যানার, মাইকে ঘোষণার শব্দ আর সবার চোখে-মুখে উত্তেজনার ছাপ।
গুঞ্জন শান্ত মুখে সাজিয়ার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখে কোনো ভয় নেই, আছে শুধু আত্মবিশ্বাস।
অন্যদিকে ক্যাম্পাসের সবচেয়ে মেধাবী ও টানা তিন বছরের চ্যাম্পিয়ন প্রেম চৌধুরী আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিতে অডিটোরিয়ামে প্রবেশ করতেই চারদিকে করতালির ঝড় ওঠে।
দেখ, প্রেম ভাইয়া এসে পড়েছেন,এবারও উনিই জিতবেন!প্রেমকে হারানো? অসম্ভব!
এসব কথা শুনেও গুঞ্জনের মুখে কোনো পরিবর্তন দেখা গেল না। সে শুধু মুচকি হেসে নিজের ফাইলটা আরও শক্ত করে ধরল।
মঞ্চে উঠে সঞ্চালক ঘোষণা দিলেন,
এবারের চূড়ান্ত পর্বে মুখোমুখি হতে চলেছেন আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনবারের চ্যাম্পিয়ন প্রেম চৌধুরী এবং নতুন প্রতিযোগী... গুঞ্জন ইসলাম!
ঘোষণা শেষ হতেই পুরো হলরুম করতালিতে কেঁপে উঠল।
প্রেম প্রথমবারের মতো গুঞ্জনের দিকে তাকাল।
সাদামাটা পোশাক, মাথায় পরিপাটি করে ওড়না, চোখে অদ্ভুত এক আত্মবিশ্বাস। তাকে দেখে প্রেমের ঠোঁটের কোণে হালকা তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠল।
মনে মনে বলল,
এ মেয়েটা আমার প্রতিদ্বন্দ্বী? পাঁচ মিনিটও টিকতে পারবে না ও আমার সামনে।
অন্যদিকে গুঞ্জন একবারও প্রেমের দিকে তাকিয়ে সময় নষ্ট করল না। তার সমস্ত মনোযোগ ছিল প্রতিযোগিতায়।
প্রথম রাউন্ড শুরু হলো।
একটার পর একটা কঠিন প্রশ্ন, যুক্তি, বিশ্লেষণ দুজনেই অসাধারণ উত্তর দিল। দর্শকেরা মুগ্ধ হয়ে দেখছিল।
দ্বিতীয় রাউন্ডে গুঞ্জনের যুক্তির গভীরতা দেখে বিচারকদের মুখেও প্রশংসার হাসি ফুটে উঠল।
প্রেম প্রথমবারের মতো বুঝতে পারল, প্রতিপক্ষকে সে যতটা সহজ ভেবেছিল, সে তার চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী।
শেষ রাউন্ডে একটি জটিল বিষয় নিয়ে তাৎক্ষণিক বক্তব্য দিতে বলা হলো।
প্রেম সুন্দরভাবে বললেও, গুঞ্জনের বক্তব্য ছিল তথ্যসমৃদ্ধ, সাবলীল এবং হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়ার মতো। তার প্রতিটি যুক্তিতে ছিল আত্মবিশ্বাস, ভদ্রতা আর অসাধারণ বিশ্লেষণ।
বক্তব্য শেষ হতেই পুরো অডিটোরিয়াম দাঁড়িয়ে করতালি দিতে শুরু করল।
কয়েক মিনিট পর বিচারকদের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হলো।
এবারের আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় প্রতিযোগিতার প্রথম স্থান অর্জন করেছে... গুঞ্জন ইসলাম
সাজিয়া খুশিতে লাফিয়ে উঠলো।আর বাকি সবাই অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে।
গুঞ্জনের চোখ ভিজে উঠল আনন্দে। সে মঞ্চে উঠে সম্মাননা স্মারক ও দশ হাজার টাকার পুরস্কার গ্রহণ করল।
অন্যদিকে প্রেম স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
তার হাতে থাকা ট্রফিটা এবার আর উঠল না।
টানা তিন বছরের অপরাজিত রেকর্ড আজ ভেঙে গেছে... তাও এক গ্রামের সাধারন মেয়ের কাছে।
চারদিকে সবাই গুঞ্জনের প্রশংসা করছে।
কেউ বলছে, মেয়েটা সত্যিই অসাধারণ!
কেউ বলছে, আজ প্রেমের এতো বছরের রেকর্ড ভেঙে দিল!
প্রেম মুঠো করে হাত চেপে ধরল। চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। চোখে জ্বলে উঠল প্রতিশোধের আগুন।
সে দূর থেকে গুঞ্জনের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল,
আজ তুমি আমার কাছ থেকে শুধু একটা ট্রফি কেড়ে নাওনি... আমার তিন বছরের সম্মানও কেড়ে নিয়েছ। এই অপমান আমি কখনো ভুলব না, গুঞ্জন। আজ থেকে তুমি শুধু আমার প্রতিদ্বন্দ্বী নও... তুমি আমার সবচেয়ে বড় শত্রু।
গুঞ্জন তখনও জানত না, তার এই একটি জয়ই ভবিষ্যতে তার জীবনের সবচেয়ে বড় ঝড়ের সূচনা করবে।
চলবে,,,