#প্রেমের _গুঞ্জন
#পর্ব_৮
#জান্নাত
প্রেমের ডাকে সাড়া না দিয়ে গুঞ্জন যখন আসেনি।ভেতরে ভেতরে রাগে ফুঁসছিল প্রেম। চোয়াল শক্ত হয়ে আসে, কপালের রগ ফুলে উঠেছে। চোখে যেন দাউদাউ করে জ্বলছে অপমানের আগুন।
সে দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড় করে বলল,
এই মেয়ের সাহস দেখছি দিন দিন সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে! আমার ডাকে না এসে আমাকে অপমান করার ফল কী হয়, সেটা আজই বুঝিয়ে দেব।
কথাগুলো বলেই ঝড়ের গতিতে গুঞ্জনের ক্লাসের দিকে হাঁটতে শুরু করল সে। তার পেছন পেছন ছুটে এলো শীলা,শাওন,জীসান,সৌরভ,ইতি আর মেঘা।
শাওন পিছন থেকে ডাকছে
এই প্রেম! একটু থাম তো! আবার কী করতে যাচ্ছিস তুই?
কিন্তু প্রেমের কানে যেন কারও কথা পৌঁছাচ্ছিল না। রাগে অন্ধ হয়ে সে শুধু সামনে এগিয়ে যাচ্ছিল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা গুঞ্জনের ক্লাসরুমের সামনে এসে পৌঁছাল।
ঠিক তখনই ভেতর থেকে ভেসে এল গুঞ্জনের শান্ত, গভীর আবেগময় কণ্ঠ।
প্রেম দরজার সামনে এসে থেমে গেল।
ভেতরে উঁকি দিতেই সে দেখল পুরো ক্লাস নিস্তব্ধ। কেউ কথা বলছে না। সবাই একদৃষ্টিতে গুঞ্জনের দিকে তাকিয়ে আছে।
গুঞ্জন বলছিল,
তার প্রতিটি কথা যেন উপস্থিত সবার হৃদয়ে গিয়ে আঘাত করছিল।
প্রেমের চোখে মুহূর্তের জন্য বিস্ময় ফুটে উঠল।
যে মেয়েটাকে সে উদ্ধত আর অহংকারী ভাবছিল, সেই মেয়েটার কথার ভেতরে এত গভীরতা, এত কষ্ট আর এত সুন্দর উপলব্ধি লুকিয়ে আছে তা সে কল্পনাও করেনি।
তার রাগ অজান্তেই একটু একটু একটু করে কমে আসে।
এদিকে কথা বলতে বলতেই হঠাৎ গুঞ্জনের হুঁশ ফিরল।
সে বুঝতে পারল, নিজের অজান্তেই আবেগের বশে অনেক কিছু বলে ফেলেছে।
চারদিকে তাকাতেই দেখল, পুরো ক্লাসের সবাই তার দিকেই তাকিয়ে আছে।
মুহূর্তেই অস্বস্তিতে লাল হয়ে উঠে তার মুখ।
সে নিচের দিকে তাকিয়ে আস্তে বলল,
সরি... আমি হয়তো একটু বেশিই বলে ফেলেছি। আসলে ইমোশনাল হয়ে পড়েছিলাম।
ঠিক তখনই সামনের বেঞ্চ থেকে একটি ছেলে দাঁড়িয়ে মুচকি হেসে বলল,
সরি বলার কী আছে? তুমি অসাধারণ বলেছো। সত্যি বলতে, ভালোবাসাকে আমরা কখনো এভাবে ভাবিইনি। আজ নতুন করে একটা দৃষ্টিভঙ্গি পেলাম।
পাশ থেকে আরেকজন বলে উঠল,
হ্যাঁ, একদম ঠিক। তোমার কথাগুলো শুনে মনে হলো, ভালোবাসার মানে শুধু পাওয়া নয়... বোঝাও।
আরেকজন মুগ্ধ হয়ে বলল,
তোমার কথা শুনে মনে হচ্ছিল, যেন কোনো গল্প নয়... নিজের জীবনের অনুভূতিগুলো বলছিলে।"
পুরো ক্লাসজুড়ে মৃদু করতালির শব্দ ছড়িয়ে পড়ল।
গুঞ্জন শুধু লাজুক হাসি হেসে মাথা নিচু করে ফেলল।
আর দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা প্রেম...
সে আর ভেতরে ঢুকল না।
নীরবে কয়েক সেকেন্ড গুঞ্জনের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর কোনো কথা না বলে ঘুরে হাঁটতে শুরু করল।
যে ছেলেটা কয়েক মিনিট আগেও আগুনের মতো জ্বলছিল, সে এখন এতো নীরব হয়ে গেলো।
পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা বন্ধুরা একে অপরের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
শাওন বিস্মিত হয়ে ফিসফিস করে বলল,
ব্যাপারটা কী হলো?
জীসান ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে বলল,
আসলেই তো! আসছিল আগুন হয়ে... আর ফিরে যাচ্ছে বরফ হয়ে!
শীলা মুচকি হেসে বলল
মনে হচ্ছে, যুদ্ধ করতে এসে নিজেই বন্দী হয়ে গেল!
সবাই অবাক চোখে প্রেমের চলে যাওয়া দেখছে।
কিন্তু মেঘার এসব সহ্য হচ্ছে না,তার মনে হচ্ছে প্রেম কিছু একটা লুকাচ্ছে।
এক মুহূর্তও দেরি না করে মেঘা দ্রুত পা বাড়াল প্রেমের পিছু পিছু।
___
গুঞ্জনের জীবনে যেন অবশেষে একটু স্বস্তির বাতাস বইতে শুরু করেছে। এতোদিনের দুশ্চিন্তা, অনিশ্চয়তা আর টানাপোড়েনের মাঝেও আজ তার মুখে ফুটে উঠেছে এক চিলতে প্রশান্তির হাসি।
অবশেষে সে দুটি টিউশনি পেয়ে গেছে।
এর মধ্যে একটি হোস্টেল থেকে প্রায় আধাঘণ্টার পথ, আর অন্যটি মাত্র দশ মিনিটের দূরত্বে। দুটি টিউশনি মিলিয়ে প্রতি মাসে চার হাজার টাকা পারিশ্রমিক পাবে সে। টাকার অঙ্কটা হয়তো খুব বেশি নয়, কিন্তু এই মুহূর্তে গুঞ্জনের কাছে এটাই অনেক বড় প্রাপ্তি। নিজের খরচ, পড়াশোনা আর সামনের দিনগুলোর কথা ভেবে সে মনে মনে হিসাব কষে নিল। আপাতত এই টাকায় কোনোভাবে চলা যাবে। পরে সময় সুযোগ বুঝে আরেকটি টিউশনির খোঁজ করবে। ধীরে ধীরে সবকিছুই ঠিক হয়ে যাবে এই বিশ্বাসটুকু সে এখনো বুকে আগলে রেখেছে।
এই দুটি টিউশনি অবশ্য সে নিজের চেষ্টায় পায়নি।সাজিয়াই অনেক খোঁজখবর নিয়ে এগুলো জোগাড় করে দিয়েছে। সাজিয়ার এই নিঃস্বার্থ সাহায্যে গুঞ্জনের মন কৃতজ্ঞতায় ভরে উঠে। জীবনের কঠিন সময়ে এমন একজন মানুষ পাশে থাকা সত্যিই আশীর্বাদের মতো।
বিকেল থেকেই তার নতুন পথচলা শুরু হবে। আজই প্রথম দিন পড়াতে যাবে সে। নতুন ছাত্রছাত্রী, নতুন পরিবেশ সব মিলিয়ে মনে হালকা উত্তেজনা কাজ করছে। তবে তার একটি টিউশনি সন্ধ্যা ছয়টা থেকে সাতটা পর্যন্ত। ফলে হোস্টেলে ফিরতে ফিরতে কিছুটা রাত হয়ে যাবে। একা পথ চলতে কিছুটা কষ্ট হবে।
তবুও গুঞ্জনের মনে কোনো অভিযোগ নেই।
সে জানে, জীবনে নিজের স্বপ্নকে ছুঁতে হলে এই কষ্টগুলোকে আপন করে নিতেই হবে। ভাগ্যের কাছে হার মানার মেয়ে সে নয়। প্রতিটি ঘামের ফোঁটা, প্রতিটি ক্লান্ত সন্ধ্যা, প্রতিটি নির্ঘুম রাত সবই একদিন তার সুন্দর ভবিষ্যতের ভিত্তি হয়ে দাঁড়াবে।
নিজের মনে দৃঢ় কণ্ঠে সে ফিসফিস করে বলল,
কষ্ট তো করতেই হবে, গুঞ্জন। কেউ এসে তোমার স্বপ্নগুলো পূরণ করে দেবে না। নিজের লড়াইটা নিজেকেই লড়তে হবে। আজকের এই পরিশ্রমই একদিন তোমাকে মাথা উঁচু করে বাঁচতে শেখাবে।"
ভাবনাটা মনে আসতেই গুঞ্জনের ঠোঁটের কোণে একটুখানি হাসি ফুটে উঠল। চোখে আবারও জ্বলে উঠল নতুন স্বপ্নের আলো। জীবন তাকে যতবারই পরীক্ষার মুখোমুখি দাঁড় করাক না কেন, সে হার মানবে না। কারণ সে জানে, অন্ধকার রাতের পরই একদিন সবচেয়ে সুন্দর ভোরের সূচনা হয়।
___
প্রেম তখন আর ভার্সিটিতে থাকেনি। অদ্ভুত এক অস্থিরতা তাকে গ্রাস করে ফেলেছিল। তাই কাউকে কিছু না বলেই গাড়ি নিজের গাড়ি নিয়ে সোজা বাড়ির পথে রওনা দেয় সে।
পেছন পেছন মেঘাও এসেছিল। বারবার প্রেমকে থামানোর চেষ্টা করেছে, কিছু বলতে চেয়েছে, কিন্তু প্রেম যেন আজ সম্পূর্ণ অন্য এক জগতে হারিয়ে গেছে। মেঘার কোনো ডাক, কোনো কথাই তার কানে পৌঁছায়নি। একবারের জন্যও সে পেছন ফিরে তাকায়নি।
বাড়িতে ফিরে নিজের রুমে ঢুকেই দরজাটা বন্ধ করে দেয় প্রেম। তারপর ধীরে ধীরে এসে বিছানার কিনারায় বসে পড়ে। অথচ বসে থাকলেও তার ভেতরে যেন এক প্রচণ্ড ঝড় বইছে। বারবার অস্থির হয়ে উঠছে সে। কখনো দুই হাত দিয়ে চুল এলোমেলো করছে, কখনো মুঠো করে ধরছে বিছানার চাদর। মনে হচ্ছে বুকের ভেতরটা কেউ অদৃশ্য হাতে শক্ত করে চেপে ধরেছে।
তার চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠছে গুঞ্জনের মুখটা।
আর কানে অনবরত প্রতিধ্বনিত হচ্ছে সেই কথাগুলো...
গুঞ্জনের প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি বাক্য যেন তীরের মতো এসে বিদ্ধ হচ্ছে তার হৃদয়ে।
সেই কণ্ঠে ছিল না কোনো অভিযোগ, ছিল না কারও প্রতি ঘৃণা। বরং ছিল বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা হাজারো না-বলা কষ্ট, অসংখ্য অপূর্ণ স্বপ্ন, বুকভরা অভিমান আর গভীর এক বিষণ্নতা। বাইরে থেকে শক্ত, আত্মসম্মানী আর নির্লিপ্ত দেখানো মেয়েটার হৃদয়ের ভেতর এতটা যন্ত্রণা লুকিয়ে আছে এ কথা প্রেম কখনো কল্পনাও করেনি।
প্রেম দু'হাতে নিজের মুখ ঢেকে গভীর একটা নিঃশ্বাস ফেলল।
নিজের অজান্তেই বিড়বিড় করে বলে উঠল,
কেন... কেন তোমার কথাগুলো আমাকে এতটা নাড়া দিচ্ছে, গুঞ্জন? তোমার কষ্ট শুনে আমার বুকটা এত ভারী হয়ে যাচ্ছে কেন? আমি তো কখনো কারও চোখের জল নিয়ে ভাবিনি। তাহলে আজ তোমার কষ্টগুলো আমাকে কেন এতোটা তাড়া করে বেড়াচ্ছে?
প্রেম নিজের প্রশ্নের কোনো উত্তর খুঁজে পেল না।
শুধু অনুভব করল, গুঞ্জনের বলা প্রতিটি শব্দ যেন তার হৃদয়ের দেয়ালে গভীর দাগ কেটে দিয়েছে। সেই দাগ হয়তো এত সহজে আর মুছে যাবে না।
রুমজুড়ে তখন নেমে এসেছে নিস্তব্ধতা। দেয়ালে ঝোলানো ঘড়ির টিকটিক শব্দটাও আজ অস্বাভাবিকভাবে স্পষ্ট শোনাচ্ছে। কিন্তু প্রেমের কানে কেবল একটাই কণ্ঠস্বর বারবার ফিরে আসছে
গুঞ্জনের কণ্ঠ...
যে কণ্ঠে লুকিয়ে ছিল এক জীবনের না-বলা গল্প, আর সেই গল্পই অজান্তেই কঠিন হৃদয়ের প্রেমকে ভেতর থেকে বদলে দিতে শুরু করেছে।
____
বিকেলের দিকে
হোস্টেলের গেট পেরিয়ে ধীর পায়ে হাঁটছে গুঞ্জন। আজ তার প্রথম টিউশনি। বুকের ভেতর অজানা এক উত্তেজনা, সঙ্গে একটু নার্ভাসনেসও কাজ করছে। নতুন জায়গা, নতুন মানুষ সবকিছুই তার জন্য নতুন।
হাতে পর্যাপ্ত সময় নিয়েই বেরিয়েছে সে। টিউশনির বাড়িটা হোস্টেল থেকে প্রায় আধা ঘণ্টার পথ। রিকশা বা অটোতে গেলেই কয়েক মিনিটে পৌঁছে যাওয়া যায়, কিন্তু গুঞ্জনের কাছে প্রতিটি টাকাই মূল্যবান।
সে মনে মনে হিসাব কষে নিল।
যেহেতু হেঁটেই যেতে পারব, তাহলে অযথা ভাড়া খরচ করার কী দরকার? প্রতিদিন যদি কিছু টাকা বাঁচানো যায়,তাহলে এই টাকাটাই হয়তো মাসের শেষে অনেক কাজে লাগবে।
মৃদু হেসে নিজের ওড়নাটা ঠিক করে নিল সে। তারপর রাস্তার পাশ ধরে আপনমনে হাঁটতে শুরু করল।
চারপাশে মানুষের ব্যস্ত চলাফেরা, ছোট ছোট দোকান, ফুটপাতে বসা ফলওয়ালা, ভাজাপোড়ার গন্ধ, দূরে শিশুদের হাসির শব্দ সব মিলিয়ে শহরটা যেন নিজস্ব ছন্দে বেঁচে আছে।
গুঞ্জন কখনো আকাশের দিকে তাকাচ্ছে, কখনো রাস্তার দু'পাশের গাছগুলো দেখছে। তার মুখে এক তৃপ্তির হাসি।
আজ থেকে সে নিজের উপার্জন শুরু করবে।
এই অনুভূতিটাই যেন তাকে নতুন এক সাহস দিচ্ছে।
ঠিক সেই সময় রাস্তা দিয়ে নিজের কালো গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছিল প্রেম। গাড়ির কাঁচের ওপার থেকে হঠাৎই তার দৃষ্টি আটকে গেল এক পরিচিত অবয়বে।
স্টিয়ারিংয়ে রাখা হাতটা অনিচ্ছাকৃতভাবেই শক্ত হয়ে এলো।
গুঞ্জন!
মেয়েটা রাস্তার একপাশ ধরে একা একা হেঁটে যাচ্ছে।
প্রেম ভ্রু কুঁচকে তাকাল। চোখেমুখে স্পষ্ট বিস্ময়।
মনে মনে বিড়বিড় করে বলল,
এই সময়ে কোথায় যাচ্ছে মেয়েটা? ভার্সিটি তো অনেক আগেই শেষ হয়েছে... তাহলে?
অকারণেই বুকের ভেতর কেমন একটা অস্থিরতা জন্ম নিল।
সে কয়েক সেকেন্ড গাড়ি চালিয়েই ভাবল, তারপর সিদ্ধান্ত নিল।
একটু না হয় দেখি মেয়েটা কোথায় যায়?
গাড়ির গতি কমিয়ে বেশ খানিকটা দূরত্ব বজায় রেখে ধীরে ধীরে গুঞ্জনের পিছু নিল প্রেম।
গুঞ্জন অবশ্য কিছুই টের পেল না। সে নিজের মতো করেই হাঁটতে লাগল।
একটা মোড় পেরোল।
তারপর আরেকটা।
সময় গড়িয়ে প্রায় আধা ঘণ্টা কেটে গেল।
প্রেমের কপালের ভাঁজ ক্রমশ গভীর হতে লাগল।
এত দূর হেঁটে যাচ্ছে মেয়েটা?
অবশেষে গুঞ্জন একটি বড়, সুদৃশ্য তিনতলা বাড়ির সামনে এসে থামল।
বাড়িটার চারপাশে উঁচু সীমানা প্রাচীর। কালো রঙের বিশাল লোহার গেট। ভেতরে চোখে পড়ছে পরিচ্ছন্ন বাগান আর নানা রঙের ফুলের সারি।
গুঞ্জন একবার চারপাশে তাকাল। ঠিকানাটা মিলিয়ে নিয়ে ধীরে ধীরে গেট ঠেলে ভেতরে ঢুকে পড়ল।
আর ঠিক সেই মুহূর্তেই প্রেম যেন নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারল না।
সে হঠাৎ ব্রেক কষে গাড়িটা রাস্তার পাশে থামিয়ে দিল।
চোখদুটো বিস্ফারিত হয়ে গেল।
চলবে,,,