ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রেমের গুঞ্জন

৯ম পর্ব

লেখক: জান্নাত

#প্রেমের _গুঞ্জন

#পর্ব_৯

#জান্নাত

প্রেমের একটি বড় বোন আছে নৌরিন। শান্ত, মায়াবতী আর ভীষণ পরিবারপ্রেমী একটি মেয়ে।বিয়ের পর স্বামী ইয়াসীনের সঙ্গে লন্ডনেই সংসার গড়েছিল সে। তাদের পাঁচ বছরের একমাত্র মেয়ে ইরিন দুষ্টুমিতে যার কোনো জুড়ি নেই। সারাক্ষণ ছুটোছুটি, হাজারো প্রশ্ন, আর নতুন নতুন কাণ্ড ঘটিয়ে পুরো বাড়িটাকে মাতিয়ে রাখাই যেন তার একমাত্র কাজ।

ইয়াসীন লন্ডনে নিজের একটি প্রতিষ্ঠিত কোম্পানি পরিচালনা করে। বছরের পর বছর কঠোর পরিশ্রম করে সে সেখানে নিজের অবস্থান তৈরি করেছে। তবে এত সাফল্যের মাঝেও তার মনে একটাই স্বপ্ন একদিন সব গুছিয়ে নিজের দেশেই স্থায়ীভাবে ফিরে আসবে। সেই লক্ষ্যেই ধীরে ধীরে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য, সবকিছু গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে সে।

কিন্তু বিদেশের চাকচিক্য সবসময় সুখের সমার্থক হয় না।

অনেকেই দূর থেকে ভাবে, বিদেশ মানেই বিলাসিতা, সুখ আর স্বাচ্ছন্দ্যে ভরা জীবন। অথচ বাস্তবতা অনেক ভিন্ন। নিজের জন্মভূমির মাটি, আপন মানুষ, পরিচিত আকাশ এসব থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে কাটানো প্রতিটি দিন যেন বুকের ভেতর এক টুকরো শূন্যতা বয়ে বেড়ায়।

প্রবাসে থাকা মানুষগুলো হয়তো মুখে হাসি রাখে, সুন্দর ছবি তুলে সামাজিক মাধ্যমে ভাগ করে নেয়, কিন্তু সেই হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকে অসংখ্য না বলা গল্প। বাবা-মায়ের অসুস্থতার খবর শুনেও পাশে থাকতে না পারার অসহায়ত্ব, ঈদের সকালে আপনজনকে জড়িয়ে ধরতে না পারার কষ্ট, কোনো পারিবারিক আনন্দ-উৎসবে অংশ নিতে না পারার আক্ষেপ সবকিছুই নীরবে বয়ে বেড়ায় তারা।

পেটের দায়ে, ভবিষ্যতের স্বপ্নে কিংবা পরিবারের ভালো থাকার আশায় তারা নিজের ইচ্ছেগুলোকে প্রতিদিন একটু একটু করে বিসর্জন দেয়। অচেনা দেশের নিয়ম, ভাষা আর সংস্কৃতির সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে গিয়ে কতবার যে নিজের মনকে বোঝাতে হয়, তার হিসাব কেউ রাখে না।

তাই তো নৌরিনেরও একসময় মনে হতে লাগল এই বিদেশি শহরটা যেন তার জন্য সোনার খাঁচা। চারপাশে সবকিছু থাকলেও কোথাও যেন নিজের বলে কিছু নেই। জানালার ওপাশে বরফ পড়ে, রাস্তা ঝকঝকে, জীবনও সাজানো... তবু বুকের ভেতরটা ফাঁকা লাগে। সন্ধ্যা নামলে গ্রামের উঠোন, বৃষ্টির গন্ধ, আত্মীয়-স্বজনের হাসিমুখ, আর নিজের দেশের কোলাহলকে ভীষণভাবে মনে পড়ে।

অবশেষে আর থাকতে পারল না নৌরিন।

ইয়াসীনের সঙ্গে কথা বলে ছোট্ট ইরিনকে নিয়ে দেশে ফিরে এল সে। ইয়াসীনের বাবা-মা অনেক আগেই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন। আপন বলতে এখন শুধু নৌরিন আর তাদের মেয়েই। দেশে অবশ্য তাদের নিজস্ব একটি সুন্দর বাড়ি রয়েছে, কিন্তু একা একা সেখানে থাকতে ইচ্ছে করে না নৌরিনের।

তাই আপাতত বাবার বাড়িতেই উঠে এসেছে সে। নিজের মানুষগুলোর কোলাহল, মায়ের স্নেহ, বাবার আদর আর ভাইবোনদের সঙ্গে গল্পে যেন আবার প্রাণ ফিরে পেয়েছে নৌরিন। ইয়াসীনও কথা দিয়েছে, দেশের সব কাজ শেষ করেই স্থায়ীভাবে ফিরে আসবে। তারপর সবাই মিলে নিজেদের বাড়িতেই নতুন করে সংসার সাজাবে।

এদিকে ইরিনকে সামলানো যেন এক বিশাল যুদ্ধ!

পাঁচ বছরের ছোট্ট মেয়েটা এতটাই চঞ্চল যে, এক জায়গায় পাঁচ মিনিটও বসে থাকতে পারে না। পড়তে বসলে বইয়ের চেয়ে পেন্সিল দিয়ে দেয়ালে ছবি আঁকতেই তার বেশি আগ্রহ। কোনো টিচার এলে কখনো হাজারটা প্রশ্ন করে বিরক্ত করে, কখনো লুকিয়ে থাকে, আবার কখনো এমন সব দুষ্টুমি করে যে শেষ পর্যন্ত টিচাররাই হাল ছেড়ে দেন।

তাই ইরিনের জন্য একজন ধৈর্যশীল, শান্ত স্বভাবের শিক্ষক খুঁজে পাওয়াটা নৌরিনের কাছে যেন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সৌভাগ্যবশত, নৌরিনের সঙ্গে সাজিয়ার সামান্য পরিচয় ছিল। খুব ঘনিষ্ঠ না হলেও একে অপরকে চিনত। সেই সূত্র ধরেই নৌরিন নিজের সমস্যার কথা বলেছিল সাজিয়াকে। আর সাজিয়াও বেশি দেরি না করে গুঞ্জনের কথা মনে করে।

গুঞ্জন পড়াশোনায় ভালো, দায়িত্বশীল, ধৈর্যশীল সব মিলিয়ে ছোট বাচ্চাদের পড়ানোর জন্য একদম উপযুক্ত। তাই কোনো দ্বিধা না করেই সাজিয়া এই টিউশনটার ব্যবস্থা করে দিল গুঞ্জনের জন্য।

তবে নৌরিন যে প্রেমের আপন বড় বোন এইটা সাজিয়ার সম্পূর্ণ অজানা ।

___

গুঞ্জন বাড়িটা ভেতরে পা রাখে। মুহূর্তেই তার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল। যেন কোনো বাড়িতে নয়, রাজপ্রাসাদে এসে পড়েছে সে।

বিশাল লোহার গেট পেরিয়ে দু'পাশে সারি সারি বিদেশি ফুলের বাগান। মাঝখান দিয়ে পাথর বসানো প্রশস্ত পথ সোজা গিয়ে মিলেছে দৃষ্টিনন্দন অট্টালিকার সামনে। পাঁচতলা বাড়িটার দেয়ালে সাদা আর হালকা ধূসর রঙের অপূর্ব মিশেল, বারান্দাজুড়ে নকশা করা রেলিং, বড় বড় কাঁচের জানালায় বিকেলের সূর্যের আলো ঝলমল করে উঠছে। সামনের ফোয়ারা থেকে ছিটকে পড়া পানির ফোঁটাগুলো মুক্তোর মতো চিকচিক করছে। চারপাশে এমন নিখুঁত পরিচ্ছন্নতা, যেন ধুলোরও এখানে প্রবেশের অনুমতি নেই।

ভেতরে ঢুকতেই শীতল বাতাস গায়ে এসে লাগল। ঝাড়বাতির আলোয় পুরো হলরুম যেন সোনালি আভায় ভেসে যাচ্ছে। দামি আসবাবপত্র, দেয়ালে আঁকা শিল্পকর্ম, সুগন্ধি ফুলের সুবাস সব মিলিয়ে বাড়িটার প্রতিটি কোণেই যেন বিলাসিতার ছাপ।

গুঞ্জন নীরবে চারপাশে তাকিয়ে রইল। চোখেমুখে বিস্ময়, অথচ বুকের ভেতর কোথাও যেন অদৃশ্য এক ব্যথা কাঁটার মতো বিঁধে উঠল। অজান্তেই তার বুক চিরে বেরিয়ে এল এক দীর্ঘশ্বাস।

মনে মনে ভাবল, পৃথিবীটা সত্যিই কত অদ্ভুত!

কেউ পাঁচতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে নিচের পৃথিবীকে দেখে, আর কেউ গাছতলায় বসে দু'মুঠো ভাতের জন্য সারাদিন ঘাম ঝরায়। কারও কাছে হাজার হাজার টাকার জিনিস সামান্য শখ, আবার কারও কাছে কয়েকশো টাকা জোগাড় করাটাই দিনের সবচেয়ে বড় যুদ্ধ। কেউ বিলাসিতার মাঝেও অপ্রাপ্তির হিসাব মেলায়, আর কেউ অভাবের সঙ্গে লড়াই করেও মুখে একচিলতে হাসি ধরে রাখে।

ধন-সম্পদের এই বিশাল ব্যবধান কখনো কখনো মানুষকে অবাক করে দেয়। একই আকাশের নিচে, একই পৃথিবীতে থেকেও মানুষের জীবন যেন দুই ভিন্ন গল্প একটিতে প্রাচুর্যের রঙিন অধ্যায়, অন্যটিতে সংগ্রামের বিবর্ণ পৃষ্ঠা।

গুঞ্জন নিজের ওড়নাটা শক্ত করে মুঠোয় চেপে ধরল। চোখে এক মুহূর্তের জন্য কষ্টের ছায়া নেমে এল। তবে পরক্ষণেই সে নিজেকে সামলে নিল। সে জানে, মানুষের আসল পরিচয় তার অর্থে নয়, তার চরিত্রে। আজ সে হয়তো অভাবের পথের পথিক, কিন্তু পরিশ্রম আর আত্মসম্মানকে সঙ্গী করে একদিন নিজের ভাগ্যও সে নিজেই লিখবে।

___

গুঞ্জন এসবি ভাবছিলো ঠিক তখনই সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামার শব্দে তার ভাবনায় ছেদ পড়ল।

মার্বেলের সিঁড়ি দিয়ে ধীর পায়ে নেমে আসছে একটি মেয়ে। গাঢ় নীল রঙের সিল্কের শাড়ি, গলায় হালকা হীরের নেকলেস, মুখে মায়াময় হাসি। তাঁর উপস্থিতিতেই যেন পুরো বাড়িটা আরও প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে।

মেয়েটি গুঞ্জনের সামনে এসে কোমল স্বরে বলল

তুমিই কি গুঞ্জন?

গুঞ্জন দ্রুত সালাম জানাল।আর বলল

জি... আমি গুঞ্জন।

নৌরিন মুচকি হেঁসে বলল

আমি নৌরিন,যাকে পড়াতে এসেছো মানে ইরিনের আম্মু আমি।

এসো ভয় পেয়ো না। এই বাড়িটাকে নিজের বাড়ির মতোই ভাববে।

নিজের বাড়ি...

শব্দ দুটো শুনে গুঞ্জনের বুকটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল। নিজের বাড়ির কথা মনে পড়তেই ভেসে উঠল টিনের ছাউনি, বৃষ্টির রাতে ছাদ চুইয়ে পড়া পানি, মায়ের চিন্তাভরা মুখ আর হাজারো অভাবের মাঝেও হাসিমাখা ছোট্ট সংসার।

চোখের কোণে জমে ওঠা জলটুকু লুকিয়ে ফেলে সে আস্তে করে বলল,

জি... ধন্যবাদ।

___

প্রেম গাড়ির স্টিয়ারিং শক্ত করে ধরে কয়েক সেকেন্ড স্থির বসে রইল । তারপর গভীর একটা শ্বাস নিয়ে নিজেকে সামলে নিল।

ধীরে ধীরে গাড়িটা বাড়ির লোহার গেট পেরিয়ে ভেতরে ঢুকে।

পার্কিংয়ে গাড়ি রেখে দ্রুত পায়ে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করে সে।

কিন্তু ড্রয়িং রুমে কেউ নেই,চারদিকে তাকিয়েও কাউকে দেখতে পেল না। ভ্রু সামান্য কুঁচকে গেল প্রেমের।

তারপর কিছু না ভেবে একটু জোরেই ডাকল,

খালা...!

রান্নাঘরের দিক থেকে তাড়াহুড়ো করে বাড়ির কাজের বুয়া এগিয়ে এল।

জি, ছোট স্যার?

প্রেম গম্ভীর স্বরে বলল,

আমার রুমে এক কাপ ব্ল্যাক কফি দিয়ে যেও।"

"আচ্ছা স্যার।

আর কোনো কথা না বলে সোজা সিঁড়ি বেয়ে নিজের রুমের দিকে চলে গেল প্রেম।

দরজা বন্ধ করেই কোটটা খুলে বিছানার ওপর ছুড়ে দিল। তারপর ধপ করে বিছানায় বসে পড়ল। দু'হাত দিয়ে চুল এলোমেলো করে চোখ বন্ধ করল এক মুহূর্তের জন্য।

কিন্তু চোখ বন্ধ করতেই আবারও ভেসে উঠল সেই মুখ।

সাদামাটা পোশাকে, কোনো আড়ম্বর নেই, কোনো কৃত্রিমতা নেই... অথচ কী অদ্ভুত এক সৌন্দর্য! গুঞ্জনের বড় বড় মায়াভরা চোখ, কথার মধ্যে লুকিয়ে থাকা অভিমান, ঠোঁটের কোণে চাপা বিষণ্নতা সবকিছু যেন বারবার এসে হৃদয়ের কোথাও ধাক্কা দিয়ে যাচ্ছে।

প্রেম বিরক্ত হয়ে চোখ খুলে ফেলল।

ধুর! এটা কী হচ্ছে আমার?"

নিজেকেই প্রশ্ন করল সে।

আজ সকাল পর্যন্ত যে মেয়েটার নাম শুনলেও তার বিরক্তি লাগত, যে মেয়েটাকে দেখলেই রাগে গা জ্বলে উঠত, সেই মেয়েটাকেই এখন একবার দেখার জন্য বুকের ভেতর এমন অস্থিরতা কেন?

কয়েক ঘণ্টা আগেও তো সবকিছু স্বাভাবিক ছিল। তাহলে হঠাৎ এত পরিবর্তন কেন?

সে নিজেই যেন নিজের কাছে অচেনা হয়ে উঠছে।

ঘড়ির কাঁটার দিকে তাকাল।

মাত্র কিছুক্ষণ আগে তো গুঞ্জনকে দেখলো সে। অথচ মনে হচ্ছে যেন বহু বছর তাকে দেখেনি। বুকের ভেতর অকারণে এক শূন্যতা তৈরি হয়েছে, আর সেই শূন্যতা যেন শুধু একজন মানুষই পূরণ করতে পারে গুঞ্জন।

প্রেম ঠোঁট কামড়ে মাথা নাড়ল।

অসম্ভব... এটা হতে পারে না।

সে নিজেকেই বোঝানোর চেষ্টা করল।

আমি প্রেম চৌধুরী! একটা সাধারণ মেয়ের জন্য এভাবে অস্থির হব? যাকে আমি এতদিন সহ্যই করতে পারতাম না?

কিন্তু হৃদয় কি কখনও যুক্তির ভাষা বোঝে?

যতই নিজেকে বোঝাতে চাইছে, ততই গুঞ্জনের মুখটা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে তার চোখের সামনে। অদ্ভুত এক অনুভূতি জন্ম নিচ্ছে প্রেমের মনে।

ঠিক তখনই দরজায় টোকা পড়ল।

প্রেম ভাবনা থেকে ফিরে এসে গম্ভীর গলায় বলল,

কাম ইন।

বাড়ির কাজের বুয়া কফির কাপটা টেবিলের ওপর রেখে চলে গেল।

প্রেম ধীরে ধীরে কফির কাপটা হাতে তুলে নিল। ধোঁয়া ওঠা তেতো কফিতে চুমুক দিলেও আজ তার কোনো স্বাদই লাগছে না।

কারণ তার সমস্ত অনুভূতি, সমস্ত চিন্তা, সমস্ত মনোযোগ আটকে আছে একজনাতেই

প্রেম বুঝতে পারছে, জীবনে প্রথমবারের মতো তার হৃদয়ের দরজায় কেউ কড়া নেড়েছে। সে এখনও সেই অনুভূতির নাম জানে না। হয়তো এটাকে আকর্ষণ বলা যায়, হয়তো মোহ... কিংবা হয়তো এটাই সেই অনুভূতি, যার নাম প্রেম।

____

নৌরিন তখন গুঞ্জন কে নিজের রুমে নিয়ে যায়।রুমে ঢুকতেই বিছানার ওপর বসে থাকা ছোট্ট ইরিন কৌতূহলী চোখে তাকিয়ে রইল গুঞ্জনের দিকে।

নৌরিন মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে মৃদু স্বরে বলল,

ইরিন, এ হলো তোমার নতুন মিস,আজ থেকে তোমাকে পড়াবে।

ইরিন কোনো উত্তর দিল না। বড় বড় চোখ মেলে একদৃষ্টে গুঞ্জনের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। যেন নিজের ছোট্ট মন দিয়ে গুঞ্জন কে পড়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে।

হঠাৎ করেই সে নিষ্পাপ কণ্ঠে বলে উঠল,

তুমি কী মিষ্টি দেখতে! জানো,আমার মিষ্টি খুব পছন্দ। আমি তোমাকে 'মিষ্টি' বলে ডাকব, কেমন?

কথাটা শুনে গুঞ্জন মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে গেল।

তার বুকের ভেতরটা যেন কেমন করে উঠল। এই মুখ... এই চেহারার জন্যই তো সে এতদিন মানুষের অবহেলা, অপমান আর তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের শিকার হয়েছে। কেউ কখনো তাকে সুন্দর চোখে দেখেনি, বরং বারবার তার আত্মসম্মানে আঘাত করেছে।

আর আজ...

একটি নিষ্পাপ শিশু কোনো বিচার না করেই তাকে বলছে 'মিষ্টি দেখতে।'

অজান্তেই গুঞ্জনের চোখের কোণে একফোঁটা জল চিকচিক করে উঠল। তবে পরক্ষণেই সে নিজের আবেগ সামলে নিল। ঠোঁটে এক চিলতে কোমল হাসি ফুটিয়ে ইরিনের গোলাপি গালে আলতো করে হাত রাখল।

নরম স্বরে বলল,

তুমি আমাকে যে নামে ডাকতে চাও, সেভাবেই ডাকতে পারো।

কথাটা শুনেই ইরিনের মুখ জুড়ে উচ্ছ্বাস ছড়িয়ে পড়ল।

সে দু'হাত তালি দিয়ে হেসে উঠল।

ইয়েই! আমার মিষ্টি এসে গেছে!

ইরিনের সেই নির্মল হাসি আর অকৃত্রিম ভালোবাসা দেখে গুঞ্জনের বুকের ভেতর জমে থাকা বহু বছরের কষ্ট যেন একটু একটু করে গলতে শুরু করল। সে বুঝতে পারল, পৃথিবীতে এখনো এমন কিছু হৃদয় আছে, যারা মানুষকে রূপ দিয়ে নয়, অনুভূতি দিয়ে চিনতে জানে।

___

গুঞ্জন মৃদু হেসে

পড়বেনা ইরিন বুড়ি?

ইরিন সঙ্গে সঙ্গে মাথা নেড়ে বলল,

নাআ! পড়তে আমার একদম ভালো লাগে না। তুমি আমাকে একটা সুন্দর গল্প শোনাও।

—তাই নাকি? তাহলে, গল্প শোনার আগে একটা শর্ত আছে।

ইরিন কৌতূহলী চোখে তাকাল।

কী শর্ত?

গল্প শুনতে হলে আগে একটা হাসি দিতে হবে।

ইরিন ঠোঁট গোল করে বলল,

—এই যে... দিলাম।

বলেই এমন মিষ্টি করে হেসে উঠল যে গুঞ্জনেরও অজান্তেই মুখে হাসি ফুটে উঠল।

আচ্ছা, এবার শুরু করি...

গুঞ্জন রাজকন্যা আর ছোট্ট এক পাখির গল্প বলতে লাগল। গল্পের মাঝে মাঝে ইরিন বিস্ময়ে চোখ বড় বড় করছে, কখনো হাততালি দিচ্ছে, কখনো আবার প্রশ্নের পর প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছে।

তারপর কী হলো?

একদিন পাখিটা রাজকন্যাকে ছেড়ে দূরে কোথাও গেছে?

ইরিন প্রশ্ন করে

রাজকন্যা খুব কষ্ট পেয়েছে তাইনা?আচ্চা রাজকন্যা কী কেঁদেছিলো?

হুম রাজকন্যা খুব কেঁদেছিলো।

গুঞ্জন ধৈর্য নিয়ে প্রতিটা প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে। অনেকদিন পর এভাবে প্রাণ খুলে গল্প বলতে তারও ভালো লাগছে।

গল্প শেষ হতেই ইরিন হঠাৎ গুঞ্জনের খুব কাছে সরে এসে গম্ভীর মুখে জিজ্ঞেস করল,

আচ্ছা মিষ্টি...

হুম?

তোমার বাসা কোথায়?

গুঞ্জন এক মুহূর্ত থেমে নরম স্বরে বলল,

অনেক দূরে।

অনেক দূরে মানে? আকাশের ওপারে?

গুঞ্জন হেসে ফেলল।

না রে পাগলি, আকাশের ওপারে না। অন্য একটা জেলায়।

ইরিন আবার প্রশ্ন করল,

তোমার আব্বু কোথায়?

প্রশ্নটা শুনে গুঞ্জনের হাসিটা একটু থেমে যায়। চোখের কোণে একফোঁটা বিষণ্নতা নেমে আসে। তবুও সে নিজেকে সামলে মৃদু হেসে বলল,

আমার আব্বু... অনেক দূরে আছেন।

লন্ডনে?

না।

তাহলে দুবাইয়ে?

না।

ইরিন ঠোঁট ফুলিয়ে বলল,

উঁহু! তুমি কিছুই ঠিকঠাক বলছোনা কেন?। সবাই তো কোথাও না কোথাও থাকে।

গুঞ্জন এবার ইরিনের নাকটা আলতো চেপে ধরে বলল,

তুমি না একদম গোয়েন্দা!

ইরিন গর্ব করে বুক ফুলিয়ে বলল,

হ্যাঁ! আমি ইরিন গোয়েন্দা। আমি সব খোঁজে বের করে ফেলি।

তাই নাকি? তাহলে বলো তো, আমার বয়স কত?

ইরিন অনেকক্ষণ গুঞ্জনের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর খুব আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিতে বলল,

বারো!

গুঞ্জন হো হো করে হেসে উঠল।

আরে! আমি দেখতে এত ছোট?

গুঞ্জন মুচকি হেসে বলল,

আচ্ছা, এবার তুমি বলো, তোমার সবচেয়ে প্রিয় কে?

ইরিন এক মুহূর্তও দেরি না করে বলল,

আম্মু... তারপর মামা... পাপা,,তারপর...

সে একটু থেমে গুঞ্জনের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হেসে বলল,

তারপর তুমি... আমার মিষ্টি।

কথাটা শুনে গুঞ্জনের বুকের ভেতরটা অদ্ভুত উষ্ণতায় ভরে উঠল। এত সহজে, এত নিঃস্বার্থভাবে তার বাবা,মা আর ছোট্ট ভাই ছাড়া কেউ তাকে শেষ কবে নিজের মানুষ বলে জায়গা দিয়েছিল, তার মনে পড়ল না।

ইরিন হঠাৎ দু'হাত বাড়িয়ে বলল,

এই মিষ্টি, কোলে নাও তো!

গুঞ্জন হেসে তাকে কোলে তুলে নিতেই ইরিন গলা জড়িয়ে ধরে ফিসফিস করে বলল,

তুমি কিন্তু কালও আসবে। শুধু পড়াতে না... আমার সঙ্গে গল্প করতেও। আমি অন্য কারো কাছে পড়বোনা।

গুঞ্জনের তার ছোট্ট ভাইটির কথা মনে পড়ে যায়।

গুঞ্জন চোখের জল লুকিয়ে মৃদু হাসল। ছোট্ট এই দুষ্টু মেয়েটা অজান্তেই তার হৃদয়ের গভীরে এক টুকরো আপন জায়গা করে নিয়েছে।

এরই মধ্যে নৌরিন গুঞ্জনের জন্য নাস্তা নিয়ে এল। ট্রেতে সাজানো ছিল নানা রকম খাবার। কিন্তু গুঞ্জন এক গ্লাস পানি ছাড়া আর কিছুই মুখে তুলল না।

নৌরিন একটু ভ্রু কুঁচকে বলল,এভাবে না খেয়ে গেলে হবে? অন্তত একটু খেয়ে যাও।

গুঞ্জন মৃদু হেসে মাথা নাড়ল

না আপু, আজ থাক। এখন তো রোজই আসতে হবে। অন্যদিন নিশ্চয়ই খাব।

নৌরিনও আর জোর করল না। গুঞ্জন ওদের থেকে বিদায় নিয়ে রুমের বাইরে পা বাড়াল।

কিন্তু দরজা পেরোতেই হঠাৎ কারও সঙ্গে ধাক্কা খেল সে।

চমকে মাথা তুলে তাকাতেই মুহূর্তেই থমকে গেল।

সামনেই দাঁড়িয়ে আছে প্রেম।

গুঞ্জনের চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে উঠল। যেন এমন কাউকে এখানে দেখবে, তা কল্পনাতেও ছিল না। অন্যদিকে প্রেমের ঠোঁটের কোণে তখন দুষ্টু এক চিলতে হাসি। চোখদুটো স্থির হয়ে আছে শুধু গুঞ্জনের মুখের ওপর।

ঠিক তখনই সেখানে এসে হাজির হলো নৌরিন।

প্রেমকে দেখে অবাক হয়ে বলল,আরে প্রেম! তুই এখানে?"

এরপর হাসিমুখে গুঞ্জনের দিকে তাকিয়ে বলল

গুঞ্জন, এ হলো প্রেমআমার একমাত্র ছোট ভাই।

আবার প্রেমের দিকে ফিরে বলল,

আর প্রেম, এ হলো গুঞ্জন। ইরিনের নতুন টিউটর।

গুঞ্জন ভদ্রতার খাতিরে গুঞ্জন সালাম দিলো

আসসালামু আলাইকুম।

প্রেমও মিষ্টি হেসে উত্তর দিল,

ওয়া আলাইকুমুস সালাম।

এক মুহূর্তের জন্য তাদের চোখে চোখ পড়ল। কিন্তু পরের মুহূর্তেই গুঞ্জন দৃষ্টি সরিয়ে নিল।

সে প্রেমের দিকে আর একটি কথাও না বলে নৌরিনের দিকে তাকিয়ে বলল,

তাহলে আমি আসি, আপু।

নৌরিন হেসে সম্মতি জানাতেই গুঞ্জন প্রেমকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে পাশ কাটিয়ে চলে গেল।

প্রেম স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার দৃষ্টি গুঞ্জনের চলে দিকে।

মেয়েটা একবারও পেছন ফিরে তাকাল না।

প্রেম মনে মনে বলল,

কী মেয়ে রে বাবা! আমাকে তো একেবারেই পাত্তা দিল না। দেখে তো মনে হলো, যেন আমাকে চিনেই না।

চলবে,,,

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৯ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন