#প্রেমের _গুঞ্জন
#পর্ব_১০
#জান্নাত
প্রেমকে এভাবে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকতে দেখে নৌরিন ভ্রু কুঁচকে মুচকি হেসে বলল,
কীরে ভাই, এভাবে কী দেখছিস?
হঠাৎ বোনের কথায় বাস্তবে ফিরে এল প্রেম। আমতা আমতা করে বলল,
ই... ইয়ে মানে... এমনিই আপু। আমি... আমি গেলাম।
কথা শেষ করেই আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না সে। প্দ্রুত পায়ে নিজের রুমের দিকে চলে গেল।
এদিকে নিজের রুমে ঢুকেই প্রেম অস্থির হয়ে উঠে। এক মুহূর্তও দেরি না করে টেবিলের ওপর রাখা গাড়ির চাবিটা হাতে তুলে নিল। তারপর তাড়াহুড়ো করে আবার বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ল।
অন্যদিকে গুঞ্জন রাস্তার ধার ধরে হাঁটছে। মুখে স্বাভাবিক ভাব রাখলেও ভেতরে ভেতরে অস্বস্তি কাজ করছে।
মনে মনে বিড়বিড় করে বলল,
অবশেষে বাঘের গুহায় পা দিলাম! হায় আল্লাহ, এটাই বুঝি আমার কপালে লেখা ছিল! পৃথিবীতে আর কোনো বাড়ি পেলাম না, শেষ পর্যন্ত ওই অহংকারী মানুষটার বাড়িতেই টিউশনি করতে হলো!
একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল তার বুক চিরে।
আল্লাহ, তুমি শুধু আমাকে ধৈর্য দিও। যেন উনার সঙ্গে অহেতুক কোনো ঝামেলায় না জড়াই।
এসব ভাবতে ভাবতেই গুঞ্জন আপনমনে পথ চলতে লাগল।
হঠাৎ গুঞ্জনের চোখ পরে একটি মেয়ের দিকে
রাস্তার একপাশে, ধুলো-মাখা ফুটপাথের কিনারায় পাঁচ-ছয় বছরের একটি ছোট্ট মেয়ে বসে আছে। জীর্ণশীর্ণ পোশাক, এলোমেলো চুল, শরীরজুড়ে ধুলোময়লার আস্তরণ। দু'হাত দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে সে কাঁদছে। সেই অসহায় কান্না যেন মুহূর্তেই গুঞ্জনের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল।
কোনো দ্বিধা না করে সে দ্রুত মেয়েটির কাছে এগিয়ে গেল। হাঁটু গেড়ে বসে মাথায় স্নেহভরা হাত বুলিয়ে কোমল কণ্ঠে বলল,
কী হয়েছে ? তুমি এভাবে কাঁদছো কেন?
মেয়েটি ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলল,
আমার... আমার খুব খিদে লেগেছে। কিন্তু আমার কাছে টাকা নেই। তাই কোনো দোকানে গেলেও কেউ খাবার দেয় না... সবাই আমাকে তাড়িয়ে দেয়।
মেয়েটির কথাগুলো তীক্ষ্ণ তীর হয়ে গুঞ্জনের হৃদয়ে গিয়ে বিঁধল। তার চোখ দুটো ছলছল করে উঠল।
সে চারপাশে একবার তাকাল। কত মানুষ ব্যস্ত নিজেদের নিয়ে! কেউ দামী পোশাকে, কেউ দামি গাড়িতে, কেউ আবার মোবাইলের পর্দায় ডুবে আছে। অথচ এই ক্ষুধার্ত শিশুটির দিকে একবারও কেউ ফিরে তাকানোর প্রয়োজন মনে করেনি।
গুঞ্জন মনে মনে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
হায়রে দুনিয়া! এই পৃথিবী যেন আজ টাকার হিসাবই শুধু বোঝে। যার হাতে অর্থ আছে, তার জন্য সম্মান, যত্ন, ভালোবাসা সবই প্রস্তুত। আর যার কাছে দু'মুঠো খাবার কেনার সামর্থ্য নেই, তার ভাগ্যে জোটে অবহেলা আর তাড়িয়ে দেওয়া।
মানুষ দুনিয়ার চাকচিক্য আর সম্পদের মোহে এতটাই ডুবে গেছে যে, অনেকেই ভুলে বসেছে মহান আল্লাহর শিক্ষা মানুষের প্রতি দয়া ও সহমর্মিতাই তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের অন্যতম পথ।
গুঞ্জনের মনে ভেসে উঠল প্রিয় নবী( স:)এর সেই মহৎ শিক্ষা যে মানুষ অন্যের প্রতি দয়া করে, আল্লাহও তার প্রতি দয়া করেন। আর যে তৃষ্ণার্তকে পানি পান করায় বা অভুক্তকে আহার করায়, আল্লাহ তার সেই সামান্য আমলকেও অশেষ রহমতের মাধ্যমে কবুল করে নেন।
এসব ভাবতেই গুঞ্জনের চোখে দৃঢ়তা ফুটে উঠল। সে মেয়েটির ছোট্ট হাতটা নিজের হাতে তুলে নিল।
আর বলল
চলো তোমাকে কিছু কিনে দেই।
মেয়েটি অবিশ্বাসভরা চোখে গুঞ্জনের দিকে তাকাল। হয়তো জীবনে প্রথমবার কোনো অচেনা মানুষ তাকে অবহেলা নয়, নিঃস্বার্থ মমতার হাত বাড়িয়ে দিল।
___
অন্যদিকে গুঞ্জনের এমন নিঃস্বার্থ উদারতা দেখে প্রেম যেন বারবার নতুন করে বিস্মিত হচ্ছে। মেয়েটাকে যত দেখছে, ততই গুঞ্জনের প্রতি তার বাজে ধারণা ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে।
তখন প্রেম গাড়ির চাবিটা হাতে নিয়েও কী যেন ভেবে আর গাড়ি বের করল না সে।সেও হেঁটে গুঞ্জনের থেকে বেশ খানিকটা দূরত্ব বজায় রেখে হাঁটতে শুরু করলো।সে নিজেও জানে না কেন এমন করছে সে?
সে শুধু তাকিয়েই আছে গুঞ্জনের দিকে।
তার চোখে যেন একের পর এক নতুন গুঞ্জনের আবির্ভাব ঘটছে।
সে মনে মনে বলল,
একজন মানুষের ভেতরে এতগুলো রূপ কীভাবে লুকিয়ে থাকতে পারে? কখনো সে ঝড়ের মতো তীব্র, কখনো শান্ত নদীর মতো কোমল। কখনো প্রতিবাদের আগুন, আবার কখনো নিঃস্বার্থ মমতার ছায়া। গুঞ্জন... তুমি আসলে কোন রূপে সবচেয়ে সুন্দর?”
প্রশ্নের উত্তর সে নিজেও জানে না।
তবে একটা বিষয় আজ খুব স্পষ্ট হয়ে উঠছে তার কাছে।
সে ধীরে ধীরে গুঞ্জনকে অনুভব করতে শুরু করেছে।
মেয়েটার প্রতিটি আচরণ, প্রতিটি কথা, প্রতিটি ছোট ছোট কাজ অদৃশ্য কোনো সুতোয় বেঁধে ফেলছে তাকে। যতই নিজেকে দূরে রাখতে চায়, ততই যেন অদৃশ্য টানে গুঞ্জনের দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে তার মন।
প্রেম এক দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ঠোঁটের কোণে অজান্তেই এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল।
মনে মনে স্বীকার করল,
হয়তো এটাই সেই অনুভূতি, যেটাকে মানুষ ভালো লাগা বলে... আর সেই ভালো লাগাই একদিন ভালোবাসায় রূপ নেয়। আমি জানি না ভবিষ্যতে কী আছে, তবে এতটুকু বুঝতে পারছি গুঞ্জন নামের এই মেয়েটা প্রতিটা মুহূর্তে আমাকে তার প্রতি আরও একটু করে দুর্বল করে দিচ্ছে।
কথাগুলো শুধু তার মনের ভেতরেই রয়ে গেল। আর সে আগের মতোই গুঞ্জনের থেকে দূরত্ব বজায় রেখে গুঞ্জনের পিছু পিছু হাঁটতে লাগল যেন সে গুঞ্জন কে দেখছেনা,এক অপূর্ব মনের সৌন্দর্যকে দেখে যাওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেছে সে।
প্রেম এই মুহূর্তে নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করছে।
____
রাতে প্রেম ড্রয়িংরুমের সোফায় বসে ছিলো
ইরিন হঠাৎই দৌড়ে এসে প্রেমের সামনে দাঁড়াল। তার ছোট্ট মুখজুড়ে উচ্ছ্বাসের ঝিলিক।
জানো মামা, আমার মিষ্টি খুব ভালো!
প্রেম ভ্রু কুঁচকে মুচকি হেসে ইরিনকে কোলে তুলে নিল।
তোমার মিষ্টি? সেটা আবার কে? আমি তো জানি তুমি মিষ্টি খেতে খুব পছন্দ করো। কিন্তু তোমার মিষ্টি যে মানুষ হয়ে গেল, সেটা তো আজই জানলাম!
ইরিন বিরক্ত হয়ে ঠোঁট ফুলিয়ে বলল,
আহা মামা, তুমি না একদমই বোকা! আজ আমাকে পড়াতে এসেছিল না? সেই আমার মিষ্টি।
কথাটা শুনে প্রেম নিজের জিহ্বায় হালকা কামড় দেয়। মুহূর্তেই বুঝে গেল, ইরিন গুঞ্জনের কথাই বলছে।
প্রেম বলে
ওহ! সরি মামনি, আমারই ভুল হয়েছে। কিন্তু তুমি তো সহজে কাউকে পছন্দ করো না। হঠাৎ এমন কী হলো?
ইরিনের চোখদুটো আনন্দে চিকচিক করে উঠল।
কারণ উনি দেখতে একদম মিষ্টির মতো। তাই তো আমি ওনার নাম দিয়েছি ‘মিষ্টি’। উনি খুব সুন্দর করে গল্পও বলে, আমার সঙ্গে খেলেও। আমার ওনাকে খুব ভালো লেগেছে।
ইরিনের কথাগুলো শুনে প্রেম কয়েক মুহূর্ত নিশ্চুপ হয়ে রইল। অজান্তেই তার চোখের সামনে ভেসে উঠল গুঞ্জনের শান্ত, মায়াবী মুখটা।
মৃদু হেসে, বিড়বিড় করে বলে
আসলেই... মিষ্টি।
___
পরদিন...
ভার্সিটির ক্যাম্পাস আজও যথারীতি সরগরম। কোথাও আড্ডা, কোথাও হাসির রোল, আবার কোথাও ক্লাসে যাওয়ার ব্যস্ততা।
প্রেম বন্ধুদের সঙ্গে বসে আছে ঠিকই, কিন্তু তার মন যেন সেখানে নেই।
বারবার অজান্তেই তার দৃষ্টি চলে যাচ্ছে ভার্সিটির প্রধান গেটের দিকে। যেন কাউকে খুঁজছে সে।
সে আর কেউনা গুঞ্জন।
প্রতিবার গেট দিয়ে কোনো মেয়ে ভেতরে ঢুকলেই প্রেমের চোখ দুটো আশায় জ্বলে ওঠে। কিন্তু পরক্ষণেই সেই আলো নিভে যায়।
প্রেমের এমন অস্বাভাবিক আচরণ নজর এড়াল না শাওনের।
সে দুষ্টু হেসে প্রেমের কাঁধে হাত রেখে বলল,
কিরে প্রেম, আজ তোকে এমন লাগছে কেন? বারবার গেটের দিকে কী দেখছিস? তোর লাইলি তো তোর পাশেই বসে আছে!
শাওনের কথা শেষ হতেই বাকিরা হো হো করে হেসে উঠল।
প্রেম বিরক্ত চোখে শাওনের দিকে তাকাল।
একদম বাজে কথা বলবি না।
শাওন ঠোঁট চেপে হাসি আটকে রাখার ব্যর্থ চেষ্টা করে।
এদিকে মেঘা প্রেমের আরও একটু কাছে এসে ন্যাকামো স্বরে বলল,
বেবি... তোমার কী হয়েছে? সেই কখন থেকে দেখছি তুমি খুব অন্যমনস্ক। কোনো সমস্যা হয়েছে? আমাকে বলো ।
প্রেম এক মুহূর্তের জন্য মেঘার দিকে তাকিয়ে আবার চোখ ফিরিয়ে নিল গেটের দিকে।
স্বাভাবিক ভাবেই বলে
কিছু হয়নি।
ঠিক সেই মুহূর্তেই দূরে দুটি পরিচিত অবয়ব চোখে পড়তেই তার বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠল।
ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল।
গুঞ্জন আসছে
তার পাশেই সাজিয়া। দুজন গল্প করতে করতে ডিপার্টমেন্টের দিকে এগিয়ে আসছে।
আজও গুঞ্জনের পরনে খুবই সাধারণ একটি সালোয়ার-কামিজ। মাথায় পরিপাটি করে জড়ানো হিজাব, মুখে কোনো সাজগোজ নেই, নেই দামী অলংকারের বাহুল্য।
তবুও প্রেমের চোখে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দরী মেয়ে মনে হচ্ছে এই মেয়েটাকে।
সে বিস্মিত হয়ে মনে মনে বলল,
আসল সৌন্দর্য কখনো চেহারা কিংবা পোশাকে থাকেনা,আসল সৌন্দর্য লুকিয়ে থাকে মনের ভেতরে। আর তোমার ভেতরের সেই সৌন্দর্যটাই আমাকে প্রতিদিন নতুন করে মুগ্ধ করে, গুঞ্জন...।
গুঞ্জনের প্রতিটি পদক্ষেপ, তার চলার ভঙ্গি, কথা বলতে বলতে মৃদু হাসি সবকিছুই প্রেমের হৃদয়ে আলো জ্বালিয়ে দিচ্ছে।
মুহূর্তের মধ্যেই সে উঠে দাঁড়াল।
হঠাৎ প্রেমকে উঠে দাঁড়াতে দেখে পাশে বসা সৌরভ ভ্রু কুঁচকে বলল,
কিরে? কোথায় যাচ্ছিস?
প্রেম তাড়াহুড়ো করে বলল,
তোরা বস, আমি একটু আসছি।
আর এক সেকেন্ডও দাঁড়াল না সে।
দ্রুত পায়ে সোজা গুঞ্জনের দিকেই এগিয়ে গেল।
প্রেম চলে যেতেই বাকিরা একে অপরের মুখের দিকে তাকাল।
জিসান অবাক হয়ে বলল,
ব্যাপার কী? এই প্রেম আজকাল এমন করছে কেন?
শীলা হেসে বলল,
কোনো কারন তো অবশ্যই আছে।
সবাই হেসে উঠলেও একজনের মুখে হাসি ফুটল না।
মেঘা।
সে স্থির দৃষ্টিতে প্রেমের চলে যাওয়া দিকে তাকিয়ে থাকে।
তার চোখে মুখে স্পষ্ট সন্দেহের ছাপ।
অন্যদিকে গুঞ্জন আর সাজিয়া নিজেদের গল্পে এতটাই মগ্ন ছিল যে, কেউ তাদের দিকে এগিয়ে আসছে সেটা তারা খেয়ালই করেনি।
দুজন নিজেদের ক্লাসরুমের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে
ঠিক তখনই পেছন থেকে ভেসে এল এক পরিচিত, গম্ভীর কণ্ঠস্বর
গুঞ্জন...
কণ্ঠটা শুনেই গুঞ্জনের পা থমকে গেল।
সাজিয়াও বিস্মিত হয়ে তার দিকে তাকাল।
দুজনেই পেছন ফিরে তাকাল...
তাদের থেকে কয়েক হাত দূরে দাঁড়িয়ে আছে প্রেম।
তার চোখদুটো স্থির হয়ে আছে শুধু গুঞ্জনের দিকে।
মুখে একরাশ মৃদু হাসি, অথচ বুকের ভেতরটা প্রচণ্ড জোরে ধুকপুক করছে প্রেমের।
চলবে,,