#প্রেমের _গুঞ্জন
#পর্ব_১১
#জান্নাত
প্রেম গুঞ্জনের সামনে এসে দাঁড়ায়।
গুঞ্জন স্বাভাবিক গলায় বলল,
কিছু বলবেন, ভাইয়া?
ভাইয়া শব্দটা কানে যেতেই প্রেমের বুকের ভেতরটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল। কেন যেন সম্বোধনটা তার একদম ভালো লাগল না। তবুও নিজেকে স্বাভাবিক রেখে
কিছুক্ষণ ইতস্তত করে, গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,
আ... আসলে... সেদিনের আচরণের জন্য আমি সত্যিই সরি। আমার ওইভাবে রিয়্যাক্ট করা উচিত হয়নি।
কথাগুলো বলতে প্রেমের যেন বেশ কষ্টই হচ্ছিল। এতদিনের অহংকারে অভ্যস্ত মানুষটির কাছে সরি শব্দটি উচ্চারণ করাও যেন এক কঠিন যুদ্ধ।
গুঞ্জন আর সাজিয়া দু'জনেই বিস্ময়ে একে অপরের মুখের দিকে তাকাল।
সাজিয়ার তো নিজের কানকেই বিশ্বাস হচ্ছিল না।
সে মনে মনে ভাবল,
আমি কি ঠিক শুনছি? এই সেই প্রেম চৌধুরী? যে নিজের অহংকারের কারণে কারও সঙ্গে ঠিকমতো কথা বলে না! যে সবসময় নিজেকে সবার ঊর্ধ্বে ভাবত! সেই মানুষটাই আজ নিজে থেকে এসে সরি বলছে? এত বড় পরিবর্তন...! নাকি এর পেছনেও কোনো নতুন চাল লুকিয়ে আছে?
গুঞ্জন অবশ্য আগের মতোই শান্ত রইল।
তার ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটিয়ে বলল
আপনি নিজের ভুলটা বুঝতে পেরেছেন, এটাই অনেক বড় বিষয়। আশা করি ভবিষ্যতে আর এমন হবে না।
একটু থেমে আবার বলল,
আচ্ছা, আমরা তাহলে আসি।
আর কোনো কথা না বলে গুঞ্জন আর সাজিয়া সামনে হাঁটতে শুরু করল।
প্রেম স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।তার দৃষ্টি গুঞ্জনের যাওয়ার দিকে।তারও বোধগম্য হচ্ছে না,তার মনে কী হচ্ছে? কীভাবে এতো পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে সে?
এই মেয়েটা যেন প্রতিটা পদক্ষেপে তার মনটাকেও নিজের সঙ্গে নিয়ে চলে যাচ্ছে।
কিছুদূর এগোতেই সাজিয়া বলল
কিরে, ওই অহংকারী প্রেম চৌধুরীর এত বড় পরিবর্তন কীভাবে হলো বল তো? আমার তো মনে হচ্ছে, ভদ্রলোক তোর প্রেমে পড়ে গেছে!
গুঞ্জন হঠাৎ থেমে গেল।
তার ঠোঁটে তাচ্ছিল্যের একফালি হাসি ফুটে উঠল।
সে মাথা নেড়ে বলল,
প্রেম চৌধুরী... আর প্রেমে পড়বে? তাও আবার আমার মতো একটা সাধারণ মেয়ের?
তারপর হালকা হেসে বলল,
হাসালি রে সাজিয়া! ওর মতো অহংকারী মানুষের হৃদয়ে ভালোবাসা নয়, শুধু অহংকারই বাস করে।
সাজিয়া এবার একটু গম্ভীর হয়ে গেল।
এমনভাবে বলছিস কেন? মানুষের মন কখন, কোথায়, কীভাবে বদলে যায়, সেটা কি কেউ বলতে পারে? আজ যা অসম্ভব মনে হচ্ছে, কাল সেটাই সম্ভব হয়ে যায়। আমার কথা কিন্তু মিথ্যে নাও হতে পারে।
সাজিয়ার কথায় গুঞ্জনের মুখের হাসিটা মিলিয়ে যায়।
কয়েক মুহূর্ত নীরব থেকে সে আকাশের দিকে তাকাল।
তার চোখে ভেসে উঠল সেই তিক্ত স্মৃতি।
গভীর এক নিঃশ্বাস ফেলে শান্ত কণ্ঠে বলল,
এই জীবনে আমি আর কাউকে চাই না, সাজিয়া।
আমি আর কাউকে আমার জীবনের সঙ্গে জড়াতে চাই না। ভালোবাসা, সম্পর্ক এসবের প্রতি আমার আর কোনো আকর্ষণ নেই।
একটু থেমে দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
আমি এভাবেই থাকতে চাই। নিজের স্বপ্ন, নিজের পরিবার আর নিজের রবকে নিয়েই বাকি জীবনটা কাটাতে চাই। আমার জীবনে আর কোনো পুরুষের জন্য কোনো জায়গা হবে না... ইনশাআল্লাহ।
গুঞ্জনের কণ্ঠে ছিল অটল দৃঢ়তা।
_____
গুঞ্জনের ছোটবেলা থেকেই আরবি ক্যালিগ্রাফির প্রতি ছিল এক অদ্ভুত টান। অক্ষরের ভাঁজে ভাঁজে যেন সে খুঁজে পেত এক অনির্বচনীয় প্রশান্তি। অবসর পেলেই রঙ, কালি আর ক্যানভাস নিয়ে বসে পড়ত। নিছক কিছু অক্ষর নয়, বরং হৃদয়ের সমস্ত ভালোবাসা, মুগ্ধতা আর শ্রদ্ধা মিশিয়ে প্রতিটি রেখাকে জীবন্ত করে তুলত সে। তার নিপুণ হাতের ছোঁয়ায় সাধারণ অক্ষরগুলো যেন রূপ নিত সৌন্দর্যে মোড়া একেকটি শিল্পকর্মে, মনে হতো কালির আঁচড়ে ফুটে উঠেছে ইবাদতের ভাষা।
আজ শুক্রবার। ভার্সিটি বন্ধ। তাই গুঞ্জন নিজের প্রিয় ক্যালিগ্রাফির সরঞ্জামগুলো গুছিয়ে নিয়ে বসল।
কিছুক্ষণ গভীর মনোযোগে চোখ বন্ধ করে ভাবল। তারপর ধীরে ধীরে তুলির ডগায় কালি ছুঁইয়ে সাদা কাগজের বুকে আঁকতে শুরু করল পবিত্র নাম
(আল্লাহ)।
প্রতিটি আঁচড়ে ছিল তার ভালোবাসা, প্রতিটি বাঁকে ছিল ভক্তি, আর প্রতিটি রেখায় ছিল একান্ত নিবেদন। কাজ শেষ করে একটু দূরে সরে দাঁড়াতেই সে নিজেও কয়েক মুহূর্ত
তাকিয়ে রইল।
সাদা কাগজের বুকে কালো কালির সেই পবিত্র নামটি যেন আলো ছড়াচ্ছিল। এমন অপার্থিব সৌন্দর্য ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। মনে হচ্ছিল, এটি কোনো মানুষের হাতে আঁকা নয় বরং এক শান্ত, পবিত্র অনুভূতির নিখুঁত প্রতিচ্ছবি, যা দেখলে অজান্তেই হৃদয় থেকে বেরিয়ে আসে
সুবহানাল্লাহ!
গুঞ্জনের ঠিক পাশেই এসে দাঁড়াল সাজিয়া। সামনে রাখা সাদা ক্যানভাসে কালো কালি আর সোনালি রঙের ছোঁয়ায় ফুটে উঠেছে অপূর্ব এক আরবি ক্যালিগ্রাফি। অক্ষরগুলো যেন নিছক কিছু রেখা নয়, বরং প্রতিটি বাঁকে বাঁকে লুকিয়ে আছে ভালোবাসা, ধৈর্য আর আল্লাহর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।
এক মুহূর্তের জন্য সাজিয়া নির্বাক হয়ে তাকিয়ে রইল। তারপর বিস্ময়ে তার ঠোঁট ফাঁক হয়ে গেল।
মাশাআল্লাহ।
তার কণ্ঠে ছিল মুগ্ধতা।
তুই… তুই এত সুন্দর ক্যালিগ্রাফি করতে পারিস? আল্লাহ! এটা কতটা সুন্দর হয়েছে, আমি ভাষায় প্রকাশ করতে পারবোনা। মনে হচ্ছে অক্ষরগুলো যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে।
গুঞ্জনের ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক প্রশান্ত হাসি। সে ক্যালিগ্রাফিটার দিকে একবার তাকিয়ে মৃদু স্বরে বলল,
আলহামদুলিল্লাহ। সবই আল্লাহর দয়া। আমি শুধু চেষ্টা করি।
সাজিয়া আবার কেলিগ্রাফিটার দিকে তাকাল। যতই দেখছে, ততই যেন মুগ্ধ হয়ে যাচ্ছে।
হঠাৎ তার মাথায় একটা ভাবনা এল। উত্তেজিত কণ্ঠে সে বলল,
শোন, আমার মাথায় একটা আইডিয়া এসেছে।
গুঞ্জন ভ্রু তুলে তাকাল।
কী আইডিয়া?
তুই একটা ফেসবুক পেজ খুল। তারপর প্রতিদিন একটা করে তোর ক্যালিগ্রাফি আপলোড কর। আয়াত বা হাদিসের সুন্দর অর্থও লিখে দিবি। বিশ্বাস কর, মানুষ এগুলো খুব পছন্দ করবে।
একটু থেমে গুঞ্জনের চোখের দিকে তাকিয়ে দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
আমি নিশ্চিত, একদিন তোর এই শিল্প হাজার হাজার মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে যাবে। আল্লাহ চাইলে এই ক্যালিগ্রাফিই তোর রিজিকের মাধ্যম হবে। মানুষ তোর কাজ চিনবে, তোর নাম জানবে। বিভিন্ন জায়গা থেকে অর্ডার আসবে, আর তুই নিজের মেধা দিয়েই একটা সুন্দর পরিচয় গড়ে তুলতে পারবি।
গুঞ্জন কিছুক্ষণ নীরব রইল। তার চোখে ভেসে উঠল অজানা এক স্বপ্নের ঝিলিক।
সে মৃদু হেসে বলল,
জানিস, আমারও অনেক স্বপ্ন ছিলো এই কেলিগ্রাফি নিয়ে, কিন্তু কখনো সাহস করে শুরু করা হয়নি।
সাজিয়া সঙ্গে সঙ্গে তার হাতটা ধরে বলল,
প্রতিটা বড় স্বপ্নের শুরু হয় একটা ছোট পদক্ষেপ থেকে। তুই শুধু শুরু কর। বাকিটা আল্লাহর উপর ছেড়ে দে। ইনশাআল্লাহ, একদিন তোর এই ক্যালিগ্রাফিই হবে তোর পরিচয়।
___________
পরদিন গুঞ্জন, সাজিয়া ভার্সিটিতে যায়
কিছুক্ষণ পর ক্লাসরুমে প্রবেশ করেন বিভাগের একজন অধ্যাপক। তাঁর পেছন পেছন ঢোকে প্রেম চৌধুরী এবং তার পুরো টিম। সবাই কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাদের দিকে তাকিয়ে থাকে।
অধ্যাপক গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,
আগামী সপ্তাহে আমাদের বিভাগের নবীনবরণ অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে। প্রতি বছরের মতো এবারও অনুষ্ঠান পরিচালনার সম্পূর্ণ দায়িত্বে থাকবে প্রেম চৌধুরী এবং তার টিম। অনুষ্ঠান সংক্রান্ত সব সিদ্ধান্ত ওরাই নেবে। তোমাদের পোশাক থেকে শুরু করে বিভিন্ন আয়োজন সবকিছু ওদের নির্দেশনা অনুযায়ী হবে। আর যারা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নিতে চাও, তারা প্রেমদের কাছে নিজেদের নাম লিখিয়ে দেবে।
কথা শেষ করে স্যার ক্লাসরুম থেকে বেরিয়ে যেতেই সামনে এগিয়ে এলো। এক পলক তাকায় গুঞ্জনের দিকে। গুঞ্জন নির্বিকার ভঙ্গিতে অন্যদিকে তাকিয়ে থাকে
প্রেম ঠোঁটের কোণে হাসি টেনে সবার উদ্দেশে বলল,
আচ্ছা, সবাই একটু মনোযোগ দাও।
ক্লাসরুম মুহূর্তেই চুপচাপ হয়ে গেল।
ফার্স্ট ইয়ার স্টুডেন্টদের জন্য ড্রেস কোড ঠিক করা হয়েছে। সব মেয়েরা সাদা শাড়ির সঙ্গে রয়্যাল ব্লু বর্ডার পরবে। চুলে সাদা ফুল থাকলে ভালো লাগবে। আর ছেলেরা সাদা পাঞ্জাবির সঙ্গে রয়্যাল ব্লু ওড়না বা গামছা ক্যারি করবে।
সে হাতে থাকা ফাইলের দিকে একবার তাকিয়ে আবার বলল,
সেকেন্ড ইয়ার মেয়েরা পরবে হলুদ শাড়ি, ছেলেরা কালো পাঞ্জাবি। থার্ড ইয়ার মেয়েদের জন্য আকাশি রঙের শাড়ি, আর ছেলেদের সাদা পাঞ্জাবি। ফোর্থ ইয়ার মেয়েরা পরবে লাল শাড়ি, ছেলেরা কালো পাঞ্জাবি।
একটু থেমে সে চারদিকে তাকিয়ে বলল,
আর যারা গান, নাচ, আবৃত্তি, অভিনয় কিংবা অন্য কোনো পারফরম্যান্সে অংশ নিতে চাও, তারা আজকের মধ্যেই আমার টিমের কাছে নাম লিখিয়ে দিও। পরে কিন্তু আর কোনো আবেদন নেওয়া হবে না।
প্রেমের কথা শেষ হতেই ক্লাসজুড়ে গুঞ্জন শুরু হয়ে গেল। কেউ পোশাক নিয়ে উচ্ছ্বসিত, কেউ আবার কোন প্রোগ্রামে অংশ নেবে তা নিয়ে আলোচনা করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। আর সেই কোলাহলের মাঝেই প্রেমের দৃষ্টি বারবার ছুটে যায় গুঞ্জনের দিকে ।কিন্তু গুঞ্জন যেন ইচ্ছে করেই তার সেই দৃষ্টি এড়িয়ে যাচ্ছে।
প্রেম মৃদু হেঁসে তার টিম নিয়ে বেড়িয়ে যায়।
সাজিয়া গুঞ্জন কে বলে
আমার মনে হচ্ছে সত্যি প্রেম ভাইয়া তোর প্রেমে পড়েছে,দেখছিলি বারবার তোকে কীভাবে দেখছিলো?
গুঞ্জন বলে
আমি এসব দেখতে চাইনা,তাই এসব নিয়ে আমার কানের কাছে প্যানপ্যানানী করবিনা।
____
রাতের খাবার শেষ করে গুঞ্জন নিজের বিছানায় বসেছিলো
সাজিয়া গুঞ্জনের সামনে এসে কোনো কথা না বলে একটি বড় শপিং ব্যাগ গুঞ্জনের দিকে বাড়িয়ে দিল।
গুঞ্জন অবাক হয়ে ভ্রু কুঁচকে বলল,
কী আছে এতে?
সাজিয়া ঠোঁটের কোণে মিষ্টি হাসি টেনে বলল,
খুলেই দেখ না।
গুঞ্জন অনিচ্ছাসত্ত্বেও ব্যাগটা হাতে নিল।ব্যাগটা খুলতেই মুহূর্তেই তার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল।
একটা অপূর্ব সুন্দর শাড়ি!
দেখেই বুঝা যাচ্ছে এই শাড়িটা বেশ দামী।
কয়েক সেকেন্ড সে শুধু নির্বাক হয়ে শাড়িটার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর মাথা তুলে সাজিয়ার দিকে তাকিয়ে বিস্মিত কণ্ঠে বলল,
সা... সাজিয়া! এটা... এটা তুই আমার জন্য কিনেছিস?
সাজিয়া হাসি দিয়ে মাথা নাড়ল।
হ্যাঁ।
গুঞ্জন যেন বিশ্বাসই করতে পারছিল না।
তুই পাগল হয়ে গেছিস? দেখেই বুঝা যাচ্ছে শাড়িটা অনেক দামি? এত টাকা নষ্ট করার কী দরকার ছিল?
সাজিয়া ঠোঁট ফুলিয়ে বলল,
বন্ধুর জন্য খরচ করলে সেটা নষ্ট হয় নাকি?
আজ দুপুরে তোকে কত বললাম আমার সঙ্গে চল। তুই গেলি না। আমি জানতাম তুই নিজের জন্য কিছু কিনবি না। তাই আমি নিজেই কিনে এনেছি।
গুঞ্জনের চোখে অস্বস্তি স্পষ্ট।
সে শাড়িটা আবার ভাঁজ করে ব্যাগে রাখতে রাখতে বলল,
আমি এটা নিতে পারব না।
সাজিয়ার মুখের হাসিটা ম্লান হয়ে গেল।
কেন?
গুঞ্জন নিচু স্বরে বলল,
কারণ আমি এত দামী উপহার নিতে শিখিনি। ছোটবেলা থেকে আব্বু একটা কথাই শিখিয়েছেন যেটা নিজের সামর্থ্যে কেনা যায় না, সেটা অকারণে কারও কাছ থেকে নেওয়াও ঠিক নয়।তুই আমার বন্ধু, তাই তোকে কষ্ট দিতে চাই না। কিন্তু এটা আমি নিতে পারব না।
সাজিয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
তারপর ধীরে ধীরে গুঞ্জনের সামনে এসে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল।
গুঞ্জনের দুই হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে নরম বলল,
তুই জানিস, আল্লাহ আমাকে অনেক কিছু দিয়েছেন। কিন্তু তোর মতো একটা মানুষ খুব কমই দিয়েছেন।তোর সঙ্গে আমার পরিচয়টা হয়তো খুব বেশি দিনের নয়। ক্যালেন্ডারের পাতায় সেই সময়টুকু নিতান্তই ক্ষণিক। অথচ কিছু মানুষ থাকে, যারা বছরের পর বছর পাশে থেকেও আপন হয়ে উঠতে পারে না; আবার কিছু মানুষ আসে, আর অল্প কয়েকটা দিনেই হৃদয়ের গভীরতম কোণে নিজের জন্য এক চিলতে আশ্রয় বানিয়ে ফেলে। তুই ঠিক তেমনই একজন।
বিশ্বাস কর, এই অল্প সময়েই তুই আমার মনের গহীনে এমন এক জায়গা করে নিয়েছিস, যেখানে খুব সহজে কাউকে স্থান দেওয়া যায় না।
তোকে যতটুকু চিনেছি, ততটুকুতেই বুঝেছি তুই এক নীরব যোদ্ধা। বুকের ভেতর জমে থাকা হাজারো না-বলা কষ্ট, অগণিত অপূর্ণতা আর অশ্রুকে নিজের মাঝেই বন্দি রেখে ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে রাখতে জানিস। সবাই শুধু তোর হাসিটাই দেখে, কেউ বুঝতে পারে না সেই হাসির আড়ালে লুকিয়ে আছে কত শত নির্ঘুম রাত, কত না-বলা গল্প আর কত শত দীর্ঘশ্বাস।
হয়তো এটাই তোর সবচেয়ে সুন্দর দিক নিজে ভেঙে পড়েও অন্য কাউকে নিজের ভাঙনের শব্দ শুনতে না দেওয়া। আর সেই কারণেই তোকে যতটা চিনছি, ততটাই শ্রদ্ধা করতে শিখছি, আরও বেশি আপন মনে হচ্ছে।
একটু থেমে আবার বলল,
এই শাড়িটা আমি দয়া করে কিনিনি, করুণা করেও কিনিনি। এটা আমার ভালোবাসা। একজন বন্ধুর জন্য আরেকজন বন্ধুর ছোট্ট উপহার।
গুঞ্জনের ভিজে উঠে
সাজিয়া আবার বলল,
আজ তুই বলেছিলি, 'গরীবদের কোনো শখ-আহ্লাদ থাকতে নেই।' কথাটা শুনে আমার খুব কষ্ট লেগেছিল। গরীব হলে কি মানুষ সুন্দর একটা দিন কাটানোর স্বপ্নও দেখতে পারবে না?
গুঞ্জন চুপ করে রইল।
তার গলায় যেন শব্দ আটকে গেছে।
সাজিয়া শাড়িটা তুলে গুঞ্জনের হাতে দিয়ে মুচকি হেসে বলল,
এই শাড়িটা তুই আমার জন্য পরবি। নবীন বরণ অনুষ্ঠানের দিন আমরা দু'জন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে ছবি তুলব। বহু বছর পরে ছবিটা দেখে যেন বলতে পারি এই দিনটা কত সুন্দর ছিল।
গুঞ্জনের চোখের কোণ বেয়ে টপটপ করে কয়েক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল।
গুঞ্জন হঠাৎ করেই সাজিয়াকে জড়িয়ে ধরল।
কাঁপা গলায় বলল,
আল্লাহ তোকে সবসময় ভালো রাখুক। তোর মতো বন্ধু পাওয়া সত্যিই ভাগ্যের ব্যাপার।
সাজিয়াও তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ঠোঁটের কোণে তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠেছে। দ্রুত কীবোর্ডে আঙুল চালিয়ে একটি ছোট্ট বার্তা লিখল
আমি পেরেছি, ভাইয়া।
মাত্র তিনটি শব্দ। কিন্তু সেই তিনটি শব্দের মাঝেই লুকিয়ে ছিল একরাশ স্বস্তি, আনন্দ আর প্রতিশ্রুতি পূরণের তৃপ্তি।
চলবে,,,,