#প্রেমের _গুঞ্জন
#পর্ব_১২
#জান্নাত
প্রীতির আলোয় ভরা ভোর। ফজরের নামাজ আদায় করে কিছুক্ষণ কোরআন তেলাওয়াত করেছিল গুঞ্জন। তেলাওয়াত শেষ হতেই তার হৃদয়ে নেমে এলো এক অপার্থিব প্রশান্তি, যেন প্রতিটি আয়াত তার ক্লান্ত আত্মাকে আলতো করে ছুঁয়ে দিয়েছে।
ধীর পায়ে সে জানালার কাছে এসে দাঁড়াল। পূর্ব দিগন্তে সূর্যের প্রথম আলো তখন আকাশের গায়ে সোনালি আর গোলাপি রঙের তুলির আঁচড় এঁকে দিচ্ছে। ভোরের শীতল বাতাস এসে তার হৃদয়কে আরো প্রশান্তিতে মোরিয়ে দিচ্ছে। দূরে পাখিদের কলতান, গাছের পাতায় জমে থাকা শিশিরবিন্দুর ঝিলিক সব মিলিয়ে প্রকৃতি যেন রবের প্রশংসায় মগ্ন।
গুঞ্জন নিশ্চুপ হয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। তার মুখে কোনো কথা নেই ।তবুও চোখের গভীরে জমে থাকা অনুভূতিগুলো যেন একে একে পৌঁছে যাচ্ছিল মহান রবের দরবারে। মনে হচ্ছিল, সে ভাষায় নয় হৃদয়ের নীরবতায় আল্লাহর সঙ্গে কথা বলছে। নিজের স্বপ্ন, না-পাওয়ার বেদনা, অজানা ভবিষ্যতের শঙ্কা আর বুকভরা আশা সবকিছুই সে নিশ্চুপে সঁপে দিচ্ছে সেই মহান সত্তার কাছে, যিনি অন্তরের প্রতিটি গোপন আর্তনাদও শুনে নেন।
তার ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে ফুটে উঠে এক প্রশান্তির হাসি।
হাসবিয়াল্লাহু ওয়া নি'মাল ওয়াকিল...
মৃদু স্বরে উচ্চারিত এই বাক্যটির সঙ্গে সঙ্গে যেন তার বুকের সব ভার হালকা হয়ে গেল। কারণ সে জানত, পৃথিবীর সব দরজা বন্ধ হয়ে গেলেও আসমানের মালিকের দরজা কখনো বন্ধ হয় না।
জীবন যতই ব্যস্ত হয়ে উঠুক না কেন, দিন শেষে আমাদের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় সময়টুকু হওয়া উচিত আল্লাহর জন্য। পৃথিবীর অসংখ্য ব্যস্ততা, দায়িত্ব, ক্লান্তি আর অস্থিরতার মাঝেও যদি কয়েকটি মুহূর্ত আমরা রবের উদ্দেশ্যে আলাদা করে রাখতে পারি, তবে সেই মুহূর্তগুলোই হয়ে ওঠে আত্মার সবচেয়ে বড় প্রশান্তি।
সব কথা উচ্চস্বরে বলতে হয় না। কিছু কথা থাকে, যা শুধু আল্লাহই শুনে নেন। তাই প্রতিদিনের ব্যস্ততার ফাঁকেও একটু থেমে, নীরবে আকাশের দিকে তাকিয়ে কিংবা সিজদায় মাথা রেখে আল্লাহর সাথে কথোপকথন করা উচিত। নিজের কষ্ট, অপূর্ণতা, ভয়, স্বপ্ন আর না-বলা অনুভূতিগুলো তাঁর কাছেই উজাড় করে বলা উচিত। কারণ মানুষের কাছে সব কথা বলা যায় না, কিন্তু আল্লাহর কাছে কোনো কথাই লুকিয়ে থাকে না।
হয়তো সেই নীরব কথোপকথনের কোনো শব্দ থাকে না, তবুও তাতেই লুকিয়ে থাকে অদ্ভুত এক প্রশান্তি। যে প্রশান্তি হৃদয়ের ক্ষত সারিয়ে তোলে, ক্লান্ত মনকে আশার আলো দেখায় এবং মানুষকে আবার নতুন করে বাঁচার শক্তি দেয়। তাই পৃথিবীকে সময় দেওয়ার আগে, নিজের রবকে সময় দিতে শিখি। কারণ আল্লাহর সঙ্গে কাটানো কয়েকটি নীরব মুহূর্তই কখনো কখনো পুরো জীবনটাকে বদলে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
__________
গুঞ্জন ফোনটা হাতে নিয়ে বাবার নম্বরে কল দেয়।
কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ওপাশ থেকে ফোন রিসিভ হয়। পরিচিত সেই স্নেহমাখা কণ্ঠ কানে আসতেই গুঞ্জনের মুখে অজান্তেই এক টুকরো হাসি ফুটে উঠে। মিষ্টি স্বরে বলল,
আসসালামু আলাইকুম, আব্বা।
ওপাশ থেকে ভেসে এলো ভালোবাসায় জড়ানো উত্তর,
ওয়া আলাইকুমুস সালাম, আম্মা।
গুঞ্জন জিজ্ঞেস করল,
আব্বা, কেমন আছো? আম্মু আর ফোয়াদ কেমন আছে?
তিনি স্নেহভরা হাসি নিয়ে বললেন,
আলহামদুলিল্লাহ, আমরা সবাই ভালো আছি, আম্মা। তুমি কেমন আছো? পড়াশোনা ঠিকমতো করছ তো? নিজের যত্ন নিচ্ছ তো?
গুঞ্জনের চোখের কোণে অদৃশ্য এক প্রশান্তি নেমে এলো। মৃদু হেসে উত্তর দিল,
আলহামদুলিল্লাহ, তোমাদের দোয়ায় খুব ভালো আছি, আব্বা। তোমরা আমার জন্য দোয়া কোরো।
এরপর বেশ কিছুক্ষণ আম্মু আর ফোয়াদের সঙ্গে গল্পে মেতে উঠলো সে। সব মিলিয়ে কয়েক মিনিটের সেই কথোপকথন যেন দূরত্বের সব দেয়াল ভেঙে এক নিমিষেই তাকে আপন ঠিকানায় ফিরিয়ে নিয়ে গেল।
ফোনটা কেটে দেওয়ার পরও গুঞ্জনের ঠোঁটে লেগে রইল এক তৃপ্তিমাখা হাসি। মনে হচ্ছিল, বুকের ভেতর জমে থাকা সব ক্লান্তি, সব না-বলা কষ্ট যেন বাবা-মায়ের কণ্ঠস্বরেই গলে গেছে।
আসলে জীবন যতই ব্যস্ত হোক, মানুষ যতই বড় হয়ে উঠুক না কেন, দিন শেষে তার হৃদয় ফিরে যেতে চায় সেই দুটি মানুষের কাছেই, যাঁদের ভালোবাসায় কোনো স্বার্থ নেই, কোনো শর্ত নেই। বাবা-মা এমন এক ছায়াবৃক্ষ, যাঁদের স্নেহের নিচে দাঁড়ালেই জীবনের তপ্ত রোদও সহনীয় হয়ে ওঠে।
পৃথিবীর অসংখ্য সম্পর্ক সময়ের সঙ্গে বদলে যেতে পারে, অনেক আপন মানুষও একদিন দূরে সরে যেতে পারে। কিন্তু একজন বাবা-মায়ের দোয়া, তাঁদের নিঃস্বার্থ ভালোবাসা আর সন্তানের জন্য নির্ঘুম দুশ্চিন্তা কখনো ফুরিয়ে যায় না। সন্তান যত দূরেই থাকুক, তাঁদের প্রতিটি দোয়ায়, প্রতিটি মোনাজাতে সন্তানের নামই সবার আগে উচ্চারিত হয়।
হয়তো এ কারণেই দিন শেষে সবচেয়ে বড় প্রশান্তির নাম বাড়ি, আর সেই বাড়ির সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের নাম মা ও বাবা।
গুঞ্জন আকাশের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলে
আল্লাহ, আমার বাবা-মাকে সবসময় সুস্থ রাখুন, নিরাপদ রাখুন। তাঁদের হায়াতে বরকত দান করুন। তাঁরা যেমন নিঃস্বার্থভাবে আমাকে আগলে রেখেছেন, তেমনি আপন রহমতের ছায়ায় তাঁদেরও আগলে রাখুন। তাঁদের মুখের হাসিটুকু কখনো কেড়ে নেবেন না। আর আমাকে এমন সন্তান হওয়ার তাওফিক দিন, যেন তাঁদের চোখের শীতলতা হতে পারি।
______
ভার্সিটিতে পা রাখতেই পুরো ক্যাম্পাস যেন উৎসবের রঙে রঙিন হয়ে উঠেছে। চারদিকে ব্যস্ততার এক মধুর কোলাহল। কেউ স্টেজ সাজাচ্ছে, কেউ রঙিন বেলুন আর ফুল দিয়ে প্রবেশপথ সজ্জিত করছে। কোথাও সিনিয়ররা নবীনদের জন্য স্বাগত ব্যানারে শেষ মুহূর্তের রঙের আঁচড় বসাচ্ছে, আবার কেউ বিশাল ক্যানভাসে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতীক আর ঐতিহ্য ফুটিয়ে তুলতে ব্যস্ত।
এক পাশে কয়েকজন শিক্ষার্থী কাঠের ফ্রেমে হাতে আঁকা Welcome Freshers ক্যালিগ্রাফি ঝুলিয়ে দিচ্ছে। আরেক কোণে তৈরি হচ্ছে একটি সুন্দর ফটো কর্নার, যেখানে নতুন শিক্ষার্থীরা স্মৃতি ধরে রাখবে ক্যামেরার ফ্রেমে। স্টেজের বিশাল ব্যাকড্রপে বিশ্ববিদ্যালয়ের লোগো, বই, কলম, উড়ন্ত পায়রা আর সবুজ-লালের ছোঁয়ায় আঁকা হচ্ছে নতুন স্বপ্নের প্রতিচ্ছবি।
এই ব্যস্ততার মাঝেই একজন জুনিয়র এসে বিনয়ের সঙ্গে বলল,
গুঞ্জন আপু, প্রেম ভাইয়া আপনাকে ডাকছেন।
গুঞ্জন সাজিয়ার দিকে একবার তাকিয়ে তার সঙ্গে এগিয়ে যায়।সাথে সাজিয়াও যায়।
প্রেম তখন কয়েকজনের সঙ্গে অনুষ্ঠান নিয়ে আলোচনা করছিল। গুঞ্জন কাছে যেতেই সে কথোপকথন থামিয়ে তাদের দিকে তাকাল।
গুঞ্জন মিষ্টি হেসে সালাম দিল,
আসসালামু আলাইকুম, ভাইয়া।
প্রেমও হাসিমুখে সালামের উত্তর দিল,
ওয়া আলাইকুমুস সালাম।
গুঞ্জন বিনয়ের সঙ্গে জিজ্ঞেস করল,
ভাইয়া, আমাকে ডেকেছেন?
উত্তর দেওয়ার আগে প্রেম একবার সাজিয়ার দিকে তাকাল। চোখের কোণে ফুটে উঠে কৃতজ্ঞতার হাসি। যেন কিছু না বলেও অনেক কিছু বলে দিল সেই দৃষ্টি। সাজিয়াও মুচকি হেসে নির্বিকার ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকে।
প্রেম আবার গুঞ্জনের দিকে তাকিয়ে বলল,
শুনেছি তুমি খুব সুন্দর আর্ট আর আরবি ক্যালিগ্রাফি করতে পারো। নবীনবরণ অনুষ্ঠানের জন্য তোমার সাহায্য দরকার।
গুঞ্জন অবাক হয়ে ভ্রু কুঁচকে পাশ ফিরে সাজিয়ার দিকে তাকাল। তার সেই দৃষ্টিতেই স্পষ্ট এই খবরটা সাজিয়াই দিয়েছে।
সাজিয়া যেন কিছুই জানে না এমন ভঙ্গিতে কাঁধ ঝাঁকিয়ে অন্য দিকে তাকিয়ে থাকে। ঠোঁটের কোণে লুকিয়ে থাকা দুষ্টু হাসিটুকু অবশ্য গুঞ্জনের চোখ এড়াল না।
গুঞ্জন মনে মনে বলল,
আজ বাসায় গিয়ে তোর খবর আছে!
কিন্তু মুখে কিছু না বলে শান্ত স্বরে বলল,
জি, ভাইয়া। চেষ্টা করব।
প্রেম টেবিলের ওপর রাখা কয়েকটি ডিজাইনের খসড়া এগিয়ে দিয়ে বলল,
স্টেজের মূল ব্যাকড্রপের জন্য একটা বড় ক্যানভাসে বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্য আর জ্ঞানচর্চার প্রতীক ফুটিয়ে তুলতে হবে। প্রবেশপথের জন্য হাতে আঁকা স্বাগত বোর্ড, ফটো কর্নারের ক্যালিগ্রাফি, আর ডিপার্টমেন্টের নামফলকগুলোও তোমাকেই ডিজাইন করতে হবে। এমন কিছু চাই, যেটা দেখলে সবার চোখ আটকে যায়।
কথাগুলো শুনে গুঞ্জনের চোখে এক আশার আলো জ্বলে উঠলো।শিল্প তার কাছে শুধু শখ নয়, যেন ইবাদতের মতো ভালোবাসার একটি মাধ্যম।
সে মৃদু হেসে মাথা নাড়ল।
ইনশাআল্লাহ, ভাইয়া। সর্বোচ্চ চেষ্টা করব।
প্রেমও আশ্বস্ত হয়ে হাসল।
তাহলে আর দেরি কেন? কাজে লেগে পড়ো। আমি চাই এবারের নবীনবরণে সবাই তোমার হাতের কাজের প্রশংসা করুক।
গুঞ্জন কিছু না বলে ক্যানভাস, রঙ আর তুলি হাতে তুলে নিল। তার চোখে তখন এক শিল্পীর আত্মবিশ্বাস যে আত্মবিশ্বাস কেবল সৃষ্টির মুহূর্তেই জন্ম নেয়। দূরে দাঁড়িয়ে সাজিয়া মুচকি হেসে ফিসফিস করে বলল,
এবার দেখ, পুরো ভার্সিটি তোর হাতের জাদু দেখবে, গুঞ্জন।
_____
প্রেমকে গুঞ্জনের সঙ্গে এতটা স্বাভাবিক, নির্ভার ভঙ্গিতে কথা বলতে দেখে উপস্থিত প্রত্যেকের চোখে স্পষ্ট বিস্ময়। কেউ বিশ্বাসই করতে পারছিল না ,এই কি সেই প্রেম চৌধুরী? যে
নাকী দুই দিন আগেও গুঞ্জন কে সহ্য করতে পারতোনা।আজ সেই প্রেম চৌধুরীই এতটা স্বাভাবিকভাবে তার সঙ্গে কথা বলছে?
ফিসফিস করে নানা প্রশ্ন ভেসে বেড়াতে লাগল চারপাশে। সবার মনেই একই কৌতূহল হঠাৎ এমন পরিবর্তনের কারণ কী?
তবু সেই কৌতূহল মুখ ফুটে প্রকাশ করার সাহস কারও হলো না। কারণ, সামনে দাঁড়িয়ে আছে প্রেম চৌধুরী। তার ব্যক্তিত্ব আর কঠোর উপস্থিতির সামনে অযথা প্রশ্ন করার দুঃসাহস কারও নেই। তাই সবাই শুধু নীরব দর্শক হয়ে রইল।
মেঘা বাইরে থেকে নিজেকে যতটা স্বাভাবিক দেখানোর চেষ্টা করছে, ভেতরে ভেতরে ততটাই জ্বলছে হিংসার আগুনে। প্রেমের চোখে গুঞ্জনের জন্য কোমলতা, তার কণ্ঠের স্বাভাবিক উষ্ণতা এসব যেন মেঘার বুকের ভেতর কাঁটার মতো বিঁধছে মেঘার।
অজান্তেই তার দুই হাত মুঠো হয়ে এলো। চোয়াল শক্ত করে সে একদৃষ্টিতে গুঞ্জনের দিকে তাকিয়ে থাকে। তার চোখে তখন স্পষ্ট ঈর্ষা, ক্ষোভ।
মনে মনে বলে
আমার জায়গা কখনো তোমায় দেবোনা গুঞ্জন।
চলবে,,