#প্রেমের_ গুঞ্জন
#পর্ব_১৩
#জান্নাত
সাদা ক্যানভাসের সামনে দাঁড়িয়ে তুলি হাতে রঙের জাদু ছড়িয়ে দিচ্ছে গুঞ্জন। নিখুঁত মনোযোগে একের পর এক আলপনা, ফুল-লতা আর নকশা ফুটিয়ে তুলছে। রঙে রঙে যেন তার মনের সৌন্দর্যও ক্যানভাসে ধরা পড়ছে।
প্রায় ঘণ্টাখানেকের নিরবচ্ছিন্ন পরিশ্রমের পর অবশেষে শেষ হলো গুঞ্জনের কাজ। কপালের পাশে জমে থাকা ছোট ছোট ঘামের বিন্দু হাতের উল্টো পিঠে মুছে নিয়ে সে একবার নিজের আঁকা ছবিটার দিকে তাকাল। ঠোঁটের কোণে তৃপ্তির এক মৃদু হাসি ফুটে উঠে।
প্রেমের দিকে তাকিয়ে শান্ত স্বরে বলে
ভাইয়া, কাজ শেষ।
আবারও ভাইয়া শব্দটা কানে আসতেই প্রেমের ভ্রু কুঁচকে গেল। মেয়েটার মুখে এই সম্বোধনটা তার একদমই ভালো লাগে না। প্রতিবারই মনে হয়, অদৃশ্য কোনো তীর এসে বুকের কোথাও গেঁথে যাচ্ছে। তবু মুখের বিরক্তিটুকু আড়াল করে স্বাভাবিক গলায় বলে
আচ্ছা, দেখি... কেমন এঁকেছো।
ধীর পায়ে এগিয়ে এসে ছবিটার সামনে দাঁড়াতেই প্রেম যেন মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। তার দৃষ্টি স্থির হয়ে রইল ক্যানভাসের ওপর। চোখে স্পষ্ট বিস্ময়, আর একরাশ মুগ্ধতা।
দূর থেকে প্রেমকে এভাবে নির্বাক দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে শাওনের কৌতূহল জেগে উঠে। সে দ্রুত এগিয়ে এলো। তার পেছন পেছন শীলাও এসে দাঁড়ায়।
ছবিটার দিকে তাকিয়েই শীলার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল। কয়েক মুহূর্ত যেন ভাষাই হারিয়ে ফেলল সে। তারপর মুগ্ধ কণ্ঠে বলে উঠল,
মাশাআল্লাহ! এ তো যেন কোনো আঁকা ছবি নয়, বাস্তবেরই এক জীবন্ত দৃশ্য। গুঞ্জন, তুমি এত সুন্দর করে আঁকতে পারো?
গুঞ্জন লাজুক হেসে নিচের দিকে তাকিয়ে রইল। প্রশংসা শুনে তার গাল দুটো হালকা লালচে আভায় রঙিন হয়ে উঠে।
অন্যদিকে প্রেম এখনও ছবিটার দিকেই তাকিয়ে আছে। তার চোখে বিস্ময়ের রেশ এখনও কাটেনি। মনে মনে সে বলে
মেয়েটার প্রতিভা সত্যিই অসাধারণ। এত অল্প সময়ে এমন নিখুঁত, প্রাণবন্ত একটি শিল্পকর্ম তৈরি করা যে কারও পক্ষে সম্ভব নয়। সত্যি মেয়েটা সাধারণের মাঝে অসাধারণ।
কিন্তু মুখে সে কিছু বলে না। শুধু গভীর দৃষ্টিতে একবার গুঞ্জনের দিকে তাকিয়ে আবার ছবিটার দিকে চোখ ফেরায়।
গুঞ্জনের আঁকা শেষ হতেই চারপাশে যেন প্রশংসার ঢেউ বয়ে গেল।
অসাধারণ! সত্যি খুব সুন্দর হয়েছে,যা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।
সবার মুখে প্রশংসা শুনে গুঞ্জন মুচকি হাসে।অথচ মেঘার কানে সেইসব প্রশংসা বিষের মতো বিঁধছিল। ঈর্ষায় তার বুকটা জ্বলে-পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছিল। দু হাত শক্ত করে মুঠো বানিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে গুঞ্জনের দিকে তাকিয়ে রইল সে।
মনে মনে বলে
এই হাসি বেশিদিন থাকবে না গুঞ্জন তোমার।
তার চোখে তখন শুধুই প্রতিশোধের আগুন। গুঞ্জনের দেওয়া সেই থাপ্পড়ের অপমান সে এক মুহূর্তের জন্যও ভুলতে পারেনি। সুযোগের অপেক্ষায় আছে সে। আর সুযোগ পেলেই এমন আঘাত করবে, যাতে গুঞ্জন সারাজীবন সেই দিনের কথা মনে রাখে।
মেঘার ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে ফুটে উঠে এক রহস্যময়, বিষাক্ত হাসি। সেই হাসিই যেন জানিয়ে দিচ্ছে ঝড় এখনও আসেনি, আসল খেলাটা এখনো বাকি।
________
বিকেলে গুঞ্জন রওনা হয় প্রেমদের বাড়ির উদ্দেশ্যে,চারপাশে শান্ত, প্রশান্ত পরিবেশ। গুঞ্জন ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে হাটা ধরে।
বাড়িতে যেতেই ছোট্ট ইরিন দৌড়ে আসে, গুঞ্জন কে দেখে ছোট্ট ইরিনের মুখে ফুটে উঠে নির্মল হাসি। সেই হাসিতে মনে হচ্ছে সারাদিনের প্রতীক্ষার অবসান ঘটেছে অবশেষে।
ইরিন ছুটে এসে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলল,
মিষ্টি, তুমি এসেছো? জানো, তোমার জন্য কতক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছি আমি!
গুঞ্জনের ঠোঁটেও ফুটে উঠে মুচকি হাসি। স্নেহভরা দৃষ্টিতে ইরিনের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে
সরি বুড়ি, আসতে একটু দেরি হয়ে গেল।
আর দেরি করবে না কিন্তু!
ঠোঁট ফুলিয়ে অভিমানী গলায় বলে উঠে ইরিন।
গুঞ্জন হেসে মাথা নাড়তেই ভেতর দিক থেকে এগিয়ে এল নৌরিন। তার মুখেও মৃদু হাসির রেখা।
এই প্রথম দেখছি, মিষ্টি তার টিচারের জন্য এত অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। অন্য কেউ পড়াতে এলে তো ওর মুখটা সবসময় ভার হয়ে থাকতো।
নৌরিনের কথায় গুঞ্জন হেসে তাকাতেই তার চোখ পড়ল নৌরিনের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক মধ্যবয়স্ক ভদ্রমহিলার দিকে।
মহিলার ব্যক্তিত্বে ছিল রাজকীয় সৌন্দর্য আর অভিজাত্যের ছাপ। বয়স পঁয়তাল্লিশের আশেপাশে হলেও মুখে বয়সের রেখা খুব একটা স্পষ্ট নয়। দুধে-আলতা গায়ের রঙ, টানা টানা দুটি চোখ, সুঠাম নাক আর ঠোঁটে মমতামাখা মৃদু হাসি সব মিলিয়ে তাকে দেখলেই এক ধরনের শ্রদ্ধা জন্মায়।
নৌরিন হাসিমুখে পরিচয় করিয়ে দিল,
গুঞ্জন, উনি আমার আম্মু,এই কয়দিন আম্মু বাসায় ছিলোনা,নানি বাড়ি গিয়েছিলো।আর আম্মু, এই হলো গুঞ্জন। ইরিনের নতুন টিচার।
গুঞ্জন সঙ্গে সঙ্গে সম্মান জানিয়ে সালাম করল।
শেলিনা বেগম স্নেহমাখা দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললেন,
মাশাআল্লাহ! তোমার কথা অনেক শুনেছি। আজ সামনাসামনি দেখে বুঝলাম, নৌরিন একটুও বাড়িয়ে বলেনি।আর ইরিন তো তুমি বলতে পাগল।
গুঞ্জন মুচকি হাসে, প্রেমের মায়ের কাছে গুঞ্জন কে খুব ভালো লেগেছে।মেয়েটার চেহারায় যেন অন্যরকম এক মায়া আছে।তিনি কিছুক্ষন তাকিয়ে থাকেন গুঞ্জনের দিকে।এরপর কিছুক্ষণ কথা বলে উনারা চলে যান।
_______
এরপর কেটে যায় প্রায় এক ঘণ্টা। পুরোটা সময় জুড়ে গুঞ্জন ধৈর্য আর যত্ন নিয়ে মিষ্টিকে পড়াতে থাকে। তবে পড়াশোনার মাঝেও পরিবেশটা একেবারে গম্ভীর হয়ে উঠতে দেয় না সে। কখনো কোনো মজার গল্প বলে, কখনো আবার ইচ্ছে করেই ছোট্ট ছোট্ট প্রশ্ন করে মিষ্টিকে হাসিয়ে তোলে। মিষ্টিও খিলখিল করে হেসে ওঠে, আর সেই হাসির রেশ ছড়িয়ে পড়ে পুরো ঘরজুড়ে।
গুঞ্জন ভালো করেই জানে, ছোট্ট শিশুদের শুধু বইয়ের অক্ষর শেখালেই হয় না; আগে জয় করতে হয় তাদের ছোট্ট মনটা। একবার সেই মন জয় হয়ে গেলে পড়াশোনার প্রতি আগ্রহও আপনাআপনিই জন্ম নেয়। তাই সে কখনো শিক্ষিকার মতো কঠোর না হয়ে, বরং বন্ধু হয়ে ধীরে ধীরে মিষ্টির সাথে মিশার চেষ্টা করছে। আর গুঞ্জনের এই আন্তরিকতায় মিষ্টিও যেন অল্প সময়েই ওর সঙ্গে এক অদৃশ্য স্নেহের বন্ধনে জড়িয়ে পড়ছে।
____
গুঞ্জন বিদায় নিয়ে ধীর পায়ে বেরিয়ে এলো। গেটের কাছাকাছি পৌঁছাতেই তার পা থেমে গেল। সামনেই দাঁড়িয়ে আছে প্রেম। দু'হাত বুকের ওপর ভাঁজ করে, ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসি ।তাকে দেখে মনে হচ্ছে যেন সে গুঞ্জনের জন্যই অপেক্ষা করছিল।
গুঞ্জন একবার তাকিয়েই চোখ সরিয়ে নিল।
প্রেম মুচকি হেসে বলল,
চলে যাচ্ছো?
প্রশ্নটা শুনে গুঞ্জনের ভ্রু কুঁচকে গেল। লোকটা কি দেখছে না? সে তো স্পষ্টই বেরিয়ে যাচ্ছে। তবুও এমন প্রশ্ন!
ঠোঁট বাঁকিয়ে খানিকটা টেরা ভঙ্গিতে উত্তর দিল,
তাহলে কী এখানে থাকতে এসেছি নাকি?
প্রেম বিন্দুমাত্র বিচলিত হয় না,বরং ঠোঁটের হাসিটা আরও একটু গভীর করে বলে
থাকতে পারো। নিষেধ করেছে কে?
গুঞ্জন বিরক্তিতে চ শব্দ করে মুখ ফিরিয়ে নিল। এক মুহূর্তও আর সেখানে দাঁড়াতে ইচ্ছে করল না তার। প্রেমকে পাশ কাটিয়ে দ্রুত পা বাড়াল।
কিন্তু ঠিক তখনই প্রেমের কণ্ঠ ভেসে এলো পেছন থেকে
তোমার হাতে সত্যিই যাদু আছে, গুঞ্জন।
প্রেমের কথায় গুঞ্জনের চলার গতি থেমে যায়।
প্রেম এবার ভিড়ভিড় করে বলে
সেই যাদুতেই বোধহয় আমাকে বন্দী করে ফেলেছো...
কথাগুলো এতটাই নিচু স্বরে বলা যে গুঞ্জনের কানে পৌঁছাল না।
তবে প্রথম কথাটুকুই তাকে থামিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল। কয়েক সেকেন্ড স্থির দাঁড়িয়ে রইল সে। পেছনে ফিরে তাকানোর ইচ্ছে হলেও নিজের মনকে শক্ত করে দমন করল।
সে জানে, প্রেম কেন এমন কথা বলেছে।
মুখে কোনো উত্তর না দিয়ে গুঞ্জন আবার হাঁটা শুরু করল। আর প্রেম স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল তার দূরে সরে যাওয়া অবয়বের দিকে।
প্রেম মনে মনে বলে
আজ বুঝলাম, মানুষ শুধু চোখে নয়... মন দিয়েও বন্দী হয়। আর সেই বন্দিত্বের নাম যদি গুঞ্জন হয়, তাহলে আমি আজীবন এই বন্দিত্বেই থাকতে রাজি।
একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো তার বুকের ভেতর থেকে। আশ্চর্য! যে মেয়েটা তাকে দেখলেই রাগে চোখ-মুখ লাল করে ফেলে, কথায় কথায় ঝাঁঝালো উত্তর দেয়, সেই মেয়েটাই কবে যে তার মনের সমস্ত জায়গা দখল করে নিয়েছে, সে নিজেও টের পায়নি।
প্রেম আকাশের দিকে একবার তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল,
তুমি যতই দূরে সরে যাওয়ার চেষ্টা করো, গুঞ্জন... আমার মন ঠিক ততটাই তোমার দিকেই ছুটে যায়। মনে হয়, তোমার সঙ্গে আমার কোনো অদৃশ্য বন্ধন জড়িয়ে আছে।
প্রেম আজ নিজের কাছেই নিজে স্বীকার করছে
সে গুঞ্জনের প্রেমে পড়েছে। খুব গভীরভাবে, অপ্রকাশিত এক ভালোবাসায় সে বন্দী হয়েছে।
_____
গুঞ্জন রাস্তায় পা রাখতেই হঠাৎ একটা রিকশা এসে তার সামনে থামল।
রিকশাওয়ালা ছেলেটা বিনয়ের সঙ্গে বলল,
"উঠে পড়েন আপা। আপনাকে পৌঁছে দিয়ে আসি।
গুঞ্জন ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
আমি যাব না। হেঁটেই যেতে পারব। আর আমি কি তোমাকে ডেকেছি?
ছেলেটা অপ্রস্তুত হেসে মাথা নাড়ল।
না আপা। কিন্তু আপনাকে একা হেঁটে যেতে দেখে মনে হলো পৌঁছে দিই। ছোট ভাই মনে করে আমার রিকশায় উঠেন না, প্লিজ।
গুঞ্জনের দৃষ্টি এবার ছেলেটার মুখে গিয়ে আটকে গেল। বয়স খুব বেশি হলে সতেরো-আঠারো। যে বয়সে কাঁধে বইয়ের ব্যাগ থাকার কথা, সেই বয়সে ছেলেটার কাঁধে সংসারের দায়িত্ব। রোদে পুড়ে গায়ের রং তামাটে হয়ে গেছে, কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। তবু মুখে এক টুকরো ভদ্র হাসি।
মুহূর্তের জন্য গুঞ্জনের বুকটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল।
এই সমাজটা বড় অদ্ভুত। কত ছেলেমেয়ে আছে, যারা ভালো ফল করে পড়াশোনা শেষ করেও বছরের পর বছর একটা চাকরির জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়ায়। আর কতজনের ভাগ্যে সেই সুযোগটুকুও জোটে না। সংসারের অভাব তাদের বই-খাতা কেড়ে নিয়ে হাতে তুলে দেয় রিকশার হ্যান্ডেল, ইটভাটার কোদাল কিংবা দিনমজুরের ঝুড়ি।
জীবন তাদের স্বপ্ন দেখার অবকাশ দেয় না; বেঁচে থাকাটাই যেখানে প্রতিদিনের লড়াই, সেখানে স্বপ্ন যেন বিলাসিতা।
ছেলেটা এখনও অসহায় চোখে তাকিয়ে আছে।
গুঞ্জন আর না বলতে পারল না। নীরবে রিকশায় উঠে বসল।
ছেলেটার মুখে সঙ্গে সঙ্গে এক চিলতে তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল। সে ধীরে ধীরে প্যাডেলে চাপ দিল। রিকশাটা মৃদু শব্দ তুলে সামনের দিকে এগিয়ে চলল।
আর একটু দূরে, রাস্তার পাশের বড় আমগাছটার আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকা প্রেমের ঠোঁটের কোনে হাঁসি ফুটে ওঠে।গুঞ্জনের মুখে কঠোরতা থাকলেও তার কোমল মনটা যে মানুষের কষ্টে সহজেই গলে যায়, সেটা প্রেম আগেই বুঝেছিল।
প্রেম মনে মনে বলে
মেয়েটা এমনই... বাইরে যতটা শক্ত, ভেতরে ঠিক ততটাই নরম।
রিকশা এসে হোস্টেলের সামনে এসে থামে, গুঞ্জন নামতেই ছেলেটা চলে যায় দেখে মনে হলো যেন পালিয়ে গেলো। গুঞ্জন পিছন ডাকলেও সারা দেয়নি। গুঞ্জন আহাম্মকের মতো দাঁড়িয়ে আছে।
এটা কী হলো ভাড়া না নিয়েই চলে গেলো আশ্চর্য।
গুঞ্জনের সবকিছু যেন মাথার উপর দিয়ে গেলো।
________
আজ নবীন বরন অনুষ্ঠান, সাজিয়া গুঞ্জন রেডি হচ্ছে।
গুঞ্জন শাড়িটা পরিপাটি করে পরে নেয়। তারপর চুলগুলো খোঁপা করে নিয়ে হিজাব বাঁধতে থাকে।
তা দেখে সাজিয়া মুচকি হেসে বলল,
আজকের দিনটা তো বিশেষ। অন্তত আজ চুলগুলো খোলা রাখ না! হিজাব না পরলেও তো চলবে।
গুঞ্জন আয়না থেকে দৃষ্টি সরিয়ে সাজিয়ার দিকে তাকায়। ঠোঁটে ফুটে উঠে প্রশান্ত এক হাসি। কোমল কণ্ঠে বলে
না রে, সাজিয়া। আমি চাই না আমার চুল গায়রে মাহরাম কেউ দেখুক। ইসলাম আমাদের যে সীমারেখা শিখিয়েছে, আমি অন্তত আমার সাধ্য অনুযায়ী সেটুকু মেনে চলার চেষ্টা করি। আমি দাবি করি না যে আমি পরিপূর্ণ পর্দানশীন। আমারও অনেক ভুল-ত্রুটি আছে। তবে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য যতটুকু পারি, ততটুকু আমল করার চেষ্টা করি।
একটু থেমে নিজের হিজাবটা ঠিক করে নিয়ে আবার বলল,
মানুষের চোখে সুন্দর লাগার চেয়ে আল্লাহর কাছে প্রিয় হওয়াটাই আমার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আমার বিশ্বাস, নারীর আসল সৌন্দর্য তার লজ্জাশীলতা, শালীনতা আর তাকওয়ায়। হিজাব সেই সৌন্দর্যকে আরও মর্যাদা দেয়। তাই বিশেষ দিন হোক কিংবা সাধারণ দিন আমি চাই আমার রবের বিধানকেই সবার আগে প্রাধান্য দিতে।
গুঞ্জনের কথাগুলো শুনে সাজিয়া আর কিছু বলেনা।তবে সাজিয়া গুঞ্জনের কথায় প্রতিবারেই মুগ্ধ করে। আল্লাহ যেন সব রকম গুন দিয়ে গুঞ্জন কে সৃষ্টি করেছেন।
________
ভার্সিটির পুরো প্রাঙ্গণ আজ উৎসবের রঙে রঙিন। নবীনবরণ উপলক্ষে চারদিকে বর্ণিল সাজসজ্জা, রঙিন ফুল, আলোকসজ্জা আর ব্যানারে মুখর হয়ে উঠেছে পুরো ক্যাম্পাস। কোথাও সিনিয়ররা ব্যস্ত আয়োজন সামলাতে, কোথাও আবার নবীনদের উচ্ছ্বাসে জমে উঠেছে হাসি-আড্ডা। চারপাশে ভেসে বেড়াচ্ছে আনন্দ আর তারুণ্যের এক মিষ্টি আমেজ।
প্রায় সব মেয়েই আজ শাড়িতে সেজে এসেছে। কারও মুখে হালকা সাজ, কারও চোখে গাঢ় কাজল, কারও হাতে রঙিন কাঁচের চুড়ি। যেন প্রত্যেকেই আজ নিজেকে সবচেয়ে সুন্দর করে তুলে ধরার নীরব প্রতিযোগিতায় নেমেছে।
অন্যদিকে মেঘা আজ নিজের সাজে কোনো কমতি রাখেনি। শরীরের সঙ্গে লেপ্টে থাকা পাতলা শাড়ি, নিখুঁত মেকআপ, খোলা চুল আর দামি পারফিউমের সুবাসে সে নিজেকে যতটা সম্ভব আকর্ষণীয় করে তুলেছে। সেই সঙ্গে সুযোগ পেলেই প্রেমের আশপাশে ঘুরঘুর করছে, কখনো কথা বলার চেষ্টা করছে, কখনো বা ইচ্ছে করেই তার সামনে এসে দাঁড়াচ্ছে।
কিন্তু এসবের কিছুই যেন প্রেমের চোখে পড়ছে না। বরং মেঘার এই অকারণ ঘোরাঘুরি তাকে ভীষণ বিরক্ত করে তুলছে। তার দৃষ্টি বারবার মানুষের ভিড় চিরে একজনকেই খুঁজে ফিরছে।
হঠাৎ করেই তার চোখ স্থির হয়ে যায়।
ধীর পায়ে এগিয়ে আসছে গুঞ্জন,তার পাশেই সাজিয়া।
প্রেম যেন কয়েক মুহূর্তের জন্য নিঃশ্বাস নিতেও ভুলে গেল।
মুখে নেই একফোঁটা মেকআপ, ঠোঁটে নেই কোনো গাঢ় লিপস্টিক, হাতে নেই কাঁচের চুড়ির ঝংকার। একেবারে সাদামাটা একটি শাড়ি, পরিপাটি করে জড়ানো হিজাব আর মুখজুড়ে লাজুক, স্নিগ্ধ প্রশান্তি।
কোনো কৃত্রিম সাজ নেই, কোনো বাড়তি আড়ম্বর নেই। তবুও আজ সবার মাঝে গুঞ্জনকেই সবচেয়ে আলাদা লাগছে।
প্রেমের মনে হলো, সৌন্দর্য হয়তো প্রসাধনীর রঙে নয়; সৌন্দর্য লুকিয়ে থাকে ব্যক্তিত্বে, লজ্জাভরা চোখে, আর সরলতার অপার্থিব দীপ্তিতে।
তার চোখে এই মুহূর্তে গুঞ্জনকেই পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দরী মেয়ে মনে হচ্ছে।
অন্যদিকে সাজিয়াকে দেখেও একজনের হার্টবিট দ্রুত বেগে ছুটছে।সেও মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সাজিয়ার দিকে।
চলবে,,,,