#প্রেমের_ গুঞ্জন
#পর্ব__১৪
#জান্নাত
শাওনের দৃষ্টি স্থির হয়ে আছে সাজিয়ার ওপর। প্রথম যেদিন তাকে দেখেছিল, সেদিনই বুকের কোথাও অচেনা এক টান অনুভব করেছিল সে। কিন্তু আজ,
আজ এই সর্বনাশা সাজে সাজিয়াকে দেখে তার বুকের ভেতর যেন ঝড় বইতে শুরু করেছে। হৃদস্পন্দন অকারণেই দ্রুত হয়ে উঠেছে। মনে হচ্ছে, এই মেয়েটাই বুঝি তার সমস্ত স্থিরতা ভেঙে চুরমার করে দিতে এসেছে। সে বুঝতে পারে।তার সর্বনাশের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এই মেয়ে।
অন্যদিকে প্রেম যেন সম্পূর্ণ ডুবে আছে গুঞ্জনের মায়ায়। চারপাশে এত মানুষ, এত কোলাহল, অথচ তার চোখে পড়ছে শুধু একজনই। গুঞ্জন ছাড়া যেন আর কিছুই তার দৃষ্টিতে ধরা দিচ্ছে না।
প্রেমের দৃষ্টির অনুসরণ করে শীলাও তাকাল গুঞ্জনের দিকে। এক মুহূর্তেই সব বুঝে ফেলল সে। ঠোঁটের কোণে দুষ্টু এক হাসি ফুটিয়ে প্রেমের কানের কাছে ঝুঁকে ফিসফিসিয়ে বলল,
কী রে দোস্ত, তুইও শেষমেশ হারিয়ে গেলি? এই অহংকারী মানুষটাও তাহলে অবশেষে প্রেমে পড়ে গেল!
অন্য সময় হলে এমন কথা শুনে প্রেম নিশ্চয়ই প্রেম রেগে যেতো।কিন্তু আজ সে কিছুই বলল না। বরং ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটিয়ে তোলল। সেই হাসিটুকুই যেন শীলার কথার স্বীকৃতি হয়ে দিলো।
___________
মেঘা গুঞ্জনকে দেখে দাঁড়ায়। পরমুহূর্তেই তার ঠোঁটের কোণে ভেসে ওঠে এক বিদ্রূপমাখা হাসি। সে এগিয়ে আসে গুঞ্জনদের দিকে। তার চোখজোড়া বারবার গুঞ্জনের পরিপাটি শাড়ি আর মাথায় বাঁধা হিজাবের ওপর ঘুরে বেড়াচ্ছে, যেন খুঁত খুঁজে বের করাই তার উদ্দেশ্য।
মেঘাকে এগিয়ে আসতে দেখে গুঞ্জন আর সাজিয়া দাঁড়িয়ে পড়ে। সাজিয়ার চোখেমুখে স্পষ্ট বিরক্তি। এই মেয়েটা যে ভালো কিছু বলবে না, সেটা সে আগেই বুঝে গেছে।
দু'হাত বুকের কাছে ভাঁজ করে দাঁড়িয়ে মেঘা ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
বাহ! আজও হিজাব পরে এসেছো? তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে যেন কয়েক যুগ আগের মানুষ। এই আধুনিক সময়েও কেউ এভাবে নিজেকে ঢেকে রাখে নাকি? সত্যি বলতে কী, তোমাকে দেখলেই আমার গা ঘিনঘিন করে। সবকিছু কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখার মানেটা কী? জীবনটা উপভোগ করতে শেখো।
সাজিয়ার রাগ মুহূর্তেই মাথায় উঠে গেল। সে কিছু বলতে যাবে, তার আগেই গুঞ্জন হাত বাড়িয়ে তাকে থামিয়ে দিল।
গুঞ্জনের মুখে কোনো রাগ নেই, নেই অপমানের ছাপ। বরং তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক প্রশান্ত হাসি। সে শান্ত দৃষ্টিতে মেঘার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,
আমি তো কখনো আপনাকে বলিনি আমাকে দেখতে। তাহলে আমাকে দেখে আপনার এত অস্বস্তি হওয়ার কারণটা ঠিক বুঝলাম না।
মেঘা তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলল,
কারণ তোমার এই সাজটাই হাস্যকর লাগছে আমার কাছে।
গুঞ্জন মৃদু হেসে বলল,
একটা কথা কী জানেন?মানুষের মনমতো কখনোই হওয়া যায় না। আপনি যদি হিজাব পরেন, কেউ বলবে আপনি সেকেলে। আবার হিজাব না পরলে সেই একই মানুষ বলবে আপনার লজ্জা-শরম নেই। আপনি চুপ থাকলে বলবে অহংকারী, বেশি কথা বললে বলবে বেহায়া। তাই মানুষকে খুশি করার চেষ্টা করতে গিয়ে নিজের সত্তাটাকেই হারিয়ে ফেলতে হয়।
একটু থেমে সে শান্ত কণ্ঠে আবারো বলল,
তাই আমি মানুষের মন জয় করার চেয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করি। কারণ মানুষের মন আজ একরকম, কাল আরেক রকম। কিন্তু সৃষ্টিকর্তার বিধান কখনো বদলায় না।
গুঞ্জনের কণ্ঠে ছিল না কোনো তর্কের সুর, ছিল শুধু দৃঢ় বিশ্বাসের প্রশান্তি।
আর হিজাব... এটা শুধু মাথায় একটা কাপড় জড়িয়ে নেওয়ার নাম নয়। এটা আমার পরিচয়, আমার আত্মমর্যাদা, আমার বিশ্বাসের প্রতীক। আমি হিজাব পরি কাউকে দেখানোর জন্য নয়, কাউকে ছোট করার জন্যও নয়। আমি এটা পরি কারণ এতে আমার অন্তর শান্তি খুঁজে পায়।
গুঞ্জন মেঘার চোখের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল,
আপনি বললেন আমাকে খ্যাত লাগে। এতে আমার কোনো কষ্ট হয়নি। কারণ আমি জানি, মানুষের চোখে সুন্দর হওয়ার সংজ্ঞা একেকজনের কাছে একেক রকম। কেউ বাহ্যিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়, কেউ চরিত্রে। আমি চাই না সবাই আমাকে পছন্দ করুক। আমি শুধু চাই, আমার চরিত্র, আমার ব্যবহার আর আমার বিশ্বাস যেন আমাকে সম্মানিত করে।
তার কণ্ঠ আরও কোমল হয়ে আসে
আর একটা কথা বলি? মানুষকে তার পোশাক দিয়ে বিচার করা খুব সহজ, কিন্তু তার চরিত্র বুঝতে একটা জীবনও কম পড়ে যায়। কাপড় শরীর ঢাকে, কিন্তু উত্তম চরিত্র মানুষের মর্যাদা ঢেকে রাখে। তাই কারও বিশ্বাস বা পোশাক নিয়ে বিদ্রূপ করার আগে তার হৃদয়টা কেমন, সেটা জানার চেষ্টা করাই শ্রেয়।
গুঞ্জনের ঠোটে তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল।
পৃথিবীর সবাইকে খুশি করা অসম্ভব। তাই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, মানুষের প্রশংসার জন্য নয়, নিজের বিবেক আর আমার রবের সন্তুষ্টির জন্যই বাঁচব। কেউ আমাকে আধুনিক বলুক বা সেকেলে, তাতে কিছু যায় আসে না। কারণ আত্মসম্মান নিয়ে বাঁচতে পারাটাই আমার কাছে সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য।
গুঞ্জন এবারও শান্ত কণ্ঠেই বলল,
হতে পারে আপনার কাছে হাস্যকর। কিন্তু আমার কাছে এটা সম্মানের। মানুষের রুচি যেমন এক হয় না, তেমনি বিশ্বাসও এক হয় না। আমি আমার বিশ্বাসকে লজ্জা নয়, গর্বের সঙ্গেই ধারণ করি।
চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকজন শিক্ষার্থীও তাদের কথোপকথন শুনছিল।
গুঞ্জন আবার বলল,
হিজাব আমাকে ছোট করে না, বরং আমাকে মনে করিয়ে দেয় আমি কে, আমার মূল্য কোথায়। এটা কারও চাপিয়ে দেওয়া শিকল নয়, এটা আমার নিজের সিদ্ধান্ত। কেউ যেমন নিজের পছন্দের পোশাক পরে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে, আমিও তেমনি হিজাব পরে শান্তি খুঁজে পাই। তাই আমার পছন্দ নিয়ে বিদ্রূপ করার অধিকার কাউকেই আমি দিই না।
মেঘার মুখের হাসিটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে যেতে লাগল। সে ভেবেছিল গুঞ্জন হয়তো রেগে যাবে, অপমানিত হবে। কিন্তু এত শান্ত দৃঢ় জবাবের জন্য সে মোটেও প্রস্তুত ছিল না।
সাজিয়া মুচকি হেসে গুঞ্জনের দিকে তাকাল। তার বুকটা গর্বে ভরে উঠে। কারণ সে জানে, গুঞ্জনের সৌন্দর্য শুধু তার চেহারায় নয়,তার চিন্তায়, তার ব্যবহারে আর তার আত্মমর্যাদায়।
প্রেমসহ বাকিরা এতক্ষণ গুঞ্জনের প্রতিটি কথা শুনছিল। চারপাশে যেন নীরবতা নেমে এসেছিল যেন। কেউ কিছু বলেনি,কারণ গুঞ্জনের প্রতিটি যুক্তি ছিল আত্মসম্মানের দৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড়ানো।
প্রেমের ঠোঁটের কোণে অজান্তেই এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। সে জানত, গুঞ্জন অন্যায়ের সামনে মাথা নত করার মেয়ে নয়। তবে আজ যেভাবে সে নিজের মর্যাদা বজায় রেখে মেঘাকে জবাব দিল, তাতে প্রেম যেন নতুন করে হারিয়ে গেল তার প্রেমে। বুকের ভেতর শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা মিলেমিশে এক অদ্ভুত অনুভূতির জন্ম দিল। কিন্তু সেই সঙ্গে মেঘার প্রতি জমে উঠল তীব্র ক্ষোভ। ইচ্ছে হচ্ছিল সবার সামনে মেঘার এই নোংরা মানসিকতার জন্য দু-চার কথা শুনিয়ে দিতে। কিন্তু সে নিজেকে সংযত রাখল। কারণ সে জানে, গুঞ্জন নিজের লড়াই নিজেই লড়তে ভালোবাসে।
ঠিক তখনই শীলা আর ইতি দ্রুত এগিয়ে এল গুঞ্জনের কাছে।
শীলা মিষ্টি হেসে বলল, বাহ গুঞ্জন! আজ তো একদম ফাটিয়ে দিয়েছ। সত্যি বলতে, আমরা এভাবে কখনো ভাবেনি।
ইতি মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে বলল, আমি তো তোমার কথার ফ্যান হয়ে গেলাম। সবাই যেখানে চুপ করে সহ্য করে, সেখানে তুমি মাথা উঁচু করে নিজের সম্মানের কথা বলেছ। সত্যিই দারুণ লেগেছে।
গুঞ্জন শুধু মৃদু হাসল। প্রশংসার উত্তরে কোনো কথা বলল না। কারণ সে জানে, সত্য কথা বলার জন্য বাহবা পাওয়ার চেয়ে নিজের বিবেকের কাছে পরিষ্কার থাকাটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু এইসব মেঘার গায়ে আগুন ধরিয়ে দিচ্ছিলো।
চারপাশের মানুষের প্রশংসা, গুঞ্জনের প্রতি বাড়তে থাকা সম্মান সবকিছুই তার সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছিল। রাগে তার চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। নখগুলো নিজের হাতের তালুতেই বসিয়ে দিল সে।
পরক্ষণেই ঠোঁটের কোণে ধূর্ত এক হাসি ফুটিয়ে মনে মনে বলল,
একটু পরেই হবে আসল খেলা,তখন দেখবো কী করো।
কিছুক্ষণ পর শুরু হয়ে গেল নবীনবরণ অনুষ্ঠানের মূল পর্ব।
অডিটোরিয়ামজুড়ে করতালির শব্দ, আলো আর উৎসবের আমেজ। গুঞ্জন, সাজিয়া, শীলা, ইতি আর বাকিরা মাঝের সারিতে পাশাপাশি বসে অনুষ্ঠান উপভোগ করছিল।
একে একে নাচ, আবৃত্তি, গান সব পরিবেশনা চলতে লাগল। দর্শকরাও হাততালি দিয়ে উৎসাহ দিচ্ছিলো।
হঠাৎ মঞ্চে দাঁড়িয়ে থাকা উপস্থাপিকা মেঘা মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলল,
এবার আপনাদের সামনে গান পরিবেশন করতে আসছে আমাদের ভার্সিটির নবীন ছাত্রী... গুঞ্জন!
মুহূর্তের মধ্যেই পুরো অডিটোরিয়ামে চাপা গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ল।
নিজের নাম শুনে গুঞ্জন আর সাজিয়া দুজনেই বিস্ময়ে একে অপরের দিকে তাকাল।
সাজিয়া ফিসফিস করে বলল, তুই তো কোনো গানের জন্য নামই দিসনি!
গুঞ্জনের ভ্রু কুঁচকে এল। সে চোখ তুলে তাকাল মেঘার দিকে।
মেঘার ঠোঁটে ঝুলে থাকা রহস্যময়, বিজয়ী হাসিটাই সব বলে দিচ্ছিল। গুঞ্জনকে সবার সামনে অপদস্থ করার জন্যই এই পুরো পরিকল্পনা।
প্রেমও যেন আচমকা একটা ধাক্কা খেল। বিস্ময়ে তার চোখ বড় হয়ে গেল। সে জানত, গুঞ্জন গান গাওয়ার তালিকায় নিজের নাম দেয়নি।
মেঘা আবারও মাইক্রোফোনে বলল,
গুঞ্জনকে অনুরোধ করছি মঞ্চে এসে তার সুন্দর পরিবেশনা দিয়ে আমাদের অনুষ্ঠানকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলতে। সবাই করতালির মাধ্যমে তাকে স্বাগত জানাই।
চারদিকে হাততালির শব্দ উঠতে লাগল।
প্রথম মুহূর্তে গুঞ্জন খানিকটা অবাক হলেও পরের মুহূর্তেই সব বুঝে গেল। মেঘার উদ্দেশ্য তার কাছে আর অজানা রইল না।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, তার মুখে বিন্দুমাত্র ভয়ের ছাপ দেখা গেল না।
বরং ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক রহস্যময়, আত্মবিশ্বাসী হাসি।
সাজিয়া উদ্বিগ্ন চোখে তার হাত চেপে ধরল। সেই চোখে স্পষ্ট আতঙ্ক যদি গুঞ্জন আজ অপমানিত হয়!
গুঞ্জন শুধু তার দিকে তাকিয়ে আশ্বাসভরা একটুখানি হাসি দিল। সেই হাসিটাই যেন বলছিল,
চিন্তা করিস না... আমাকে ফাঁদে ফেলতে গিয়ে আজ কে নিজেই সেই ফাঁদে পড়বে, একটু পরেই সবাই দেখবে।
তারপর মাথা উঁচু করে, অবিচল পদক্ষেপে গুঞ্জন মঞ্চের দিকে হাঁটতে শুরু করল। পুরো অডিটোরিয়ামের অসংখ্য কৌতূহলী দৃষ্টি তখন স্থির হয়ে আছে শুধু তার দিকেই। কেউ অপেক্ষা করছে তার ব্যর্থতা দেখার জন্য, আর কেউ অপেক্ষা করছে আজও কি গুঞ্জন সবাইকে অবাক করে দেবে?
_________
গুঞ্জন ধীর পায়ে স্টেজের দিকে এগিয়ে গেল। চারপাশে তখন নিস্তব্ধতা। অসংখ্য জোড়া চোখ তার দিকেই নিবদ্ধ। মাইক্রোফোনটা হাতে নিয়ে সে প্রথমে সবাইকে সালাম জানাল।
আসসালামু আলাইকুম।
আজকের এই অনুষ্ঠানে গান গাওয়ার আগে একটা কথা বলতে চাই।
আমরা বড় হতে হতে অনেক মানুষকে ধন্যবাদ জানাতে শিখি, অনেক সম্পর্ককে মূল্য দিতে শিখি। কিন্তু এমন একজন মানুষ আছেন, যিনি নিজের স্বপ্ন, নিজের ইচ্ছা, নিজের ক্লান্তি সবকিছু নিঃশব্দে বিসর্জন দিয়ে আমাদের স্বপ্নগুলোকে বাঁচিয়ে রাখেন। তিনি হচ্ছেন বাবা।
একজন বাবা হয়তো সব সময় মুখে ভালোবাসি বলতে পারেন না। কিন্তু তার প্রতিটি ঘামের ফোঁটা, প্রতিটি দুশ্চিন্তা, প্রতিটি নির্ঘুম রাত বলে দেয় সন্তানের জন্য তার ভালোবাসার কোনো পরিমাপ হয় না।
আমাদের মাথার ওপর যে ছায়াটা সব সময় নীরবে দাঁড়িয়ে থাকে, সেই ছায়ার নামই বাবা। পৃথিবীর সব বাবাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা, ভালোবাসা আর কৃতজ্ঞতা জানিয়ে আজকের গানটা উৎসর্গ করছি। আল্লাহ যেন পৃথিবীর প্রতিটি বাবাকে সুস্থ রাখেন, আর যারা আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন, তাদের জান্নাতের সর্বোচ্চ মর্যাদা দান করেন। আমিন।
শেষ কথাটা বলতে গিয়েই গুঞ্জনের কণ্ঠ কেঁপে উঠল। চোখের কোণে চিকচিক করে উঠল অশ্রু। এক মুহূর্তের জন্য পুরো অডিটোরিয়াম নীরব হয়ে গেল। কারও মুখে কোনো শব্দ নেই। যেন প্রত্যেকে নিজের বাবার মুখটাই মনে মনে দেখতে শুরু করেছে।
গুঞ্জন গভীর একটা শ্বাস নিয়ে মাইক্রোফোনটা আরও শক্ত করে ধরল। তারপর আবেগে ভেজা কণ্ঠে গাইতে শুরু করল
বাবা মানে হাজার বিকেল আমার ছেলে বেলা,বাবা মানে রোজ সকালে পুতুল পুতুল খেলা।বাবা মানে কাটছে ভালো, যাচ্ছে ভালো দিন,বাবা মানে জমিয়ে রাখা আমার অনেক ঋণ।আমি যত এলোমেলো, ভুলেরও অভিধান,বাবা, তুমি সময়মতো সহজ সমাধান...।
গুঞ্জনের কণ্ঠে ছিল না কোনো কৃত্রিমতা, ছিল শুধু অনুভূতির গভীরতা। প্রতিটি শব্দ যেন সরাসরি গিয়ে ছুঁয়ে দিচ্ছিল উপস্থিত সবার হৃদয়। অডিটোরিয়ামের পরিবেশ মুহূর্তেই আবেগে ভারী হয়ে উঠল। অনেকেই অজান্তেই চোখের জল মুছে নিচ্ছে। কেউ মাথা নিচু করে বসে রইল, কেউ আবার মৃদু হাসির আড়ালে নিজের কান্না লুকানোর ব্যর্থ চেষ্টা করছে।
আর সামনের সারিতে দাঁড়িয়ে থাকা প্রেম একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে গুঞ্জনের দিকে। আজ সে শুধু গুঞ্জনের কণ্ঠ শুনছিল না, তার হৃদয়ের গভীরতাও অনুভব করছিল।
চলবে,,,,