#প্রেমের _গুঞ্জন
#পর্ব_১৫
#জান্নাত
গুঞ্জনের গান শেষ হতেই চারপাশ করতালির শব্দে মুখর হয়ে উঠে। সবাই গুঞ্জনের প্রশংসা করছে।
গুঞ্জনের ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠে এক রহস্যময় হাসি। মাইক্রোফোনে বলে ওঠে
আমি যতটুকু পেরেছি, আপনাদের শোনানোর চেষ্টা করেছি। এবার আমি অনুরোধ করব আমাদের মেঘা আপুকে, তিনি যেন তাঁর সুরেলা কণ্ঠে একটি গান শোনান। কী বলেন আপনারা?
সঙ্গে সঙ্গে চারদিক থেকে একসাথে আওয়াজ উঠল,
অবশ্যই!
মুহূর্তেই মেঘার মুখের রঙ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। মনে হলো যেন মাথার ওপর আকাশ ভেঙে পড়েছে। একটু আগেই গুঞ্জনকে বিব্রত করার জন্য যে ফাঁদ সে পেতেছিল, এখন সেই ফাঁদেই নিজেকে বন্দি মনে হচ্ছে।
সবার জোরাজুরিতে বাধ্য হয়ে কাঁপা হাতে মাইক্রোফোন তুলে নিল সে।
গুঞ্জন মৃদু হেসে বলল,
অল দ্য বেস্ট, আপু।
কথাটা বলেই সে ধীর পায়ে স্টেজ থেকে নেমে আসে।
নিচে দাঁড়িয়ে থাকা প্রেম গুঞ্জনের কথাগুলো গভীর আগ্রহ নিয়ে দেখছিল। গুঞ্জনের এমন ঠান্ডা মাথায়, একটুও রাগ না দেখিয়ে পাল্টা জবাব দেওয়ার কৌশল দেখে তার ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠে।
এদিকে মেঘা গান শুরু করল। কিন্তু উত্তেজনা আর ভয়ের কারণে তার কণ্ঠ কাঁপছে। সুরের বদলে যেন বেসুরো শব্দই বেরিয়ে আসছে। অডিটোরিয়ামে উপস্থিত অনেকেই মুখ চেপে হাসি লুকানোর চেষ্টা করছে, কেউ আবার নিচু স্বরে নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করছে।
কোনোমতে গান শেষ করতেই চারপাশে নানা রকম মন্তব্য ভেসে এলো।
এটা নাকি সুরেলা কণ্ঠ?আরো অনেক কিছু বলতে থাকে।
প্রতিটি কথাই যেন তীরের মতো এসে বিঁধছিল মেঘার বুকে। অপমানে তার মুখ টকটকে লাল হয়ে উঠেছে। চোখ দুটোও রাগ আর লজ্জায় জ্বলজ্বল করছে। দাঁড়িয়ে থাকার শক্তিটুকুও যেন হারিয়ে ফেলেছে সে।
সবকিছু দেখে সাজিয়া আর নিজেকে সামলাতে পারল না। হাসতে হাসতে গুঞ্জনের কাঁধে হালকা একটা চাপড় মেরে বলল,
গুঞ্জন রে, তুই আজ মেঘা ডাইনিটাকে এমন ডোজ দিয়েছিস যে বেচারির মুখ দেখার মতো অবস্থায় নেই।
সাজিয়ার কথা শুনে গুঞ্জন শুধু মুচকি হাসে। কিন্তু কোনো উত্তর দিল না।
মেঘা রাগে, দুঃখে অপমানে স্টেজ থেকে নেমে যায়, গুঞ্জনের দিকে একবার রাগী দৃষ্টিতে তাকিয়ে চলে যায়।
_____
অনুষ্ঠান শেষ হতেই সবাই যে যার বাড়ির পথে রওনা দেয়। চারপাশের কোলাহল মুহূর্তেই যেন স্তিমিত হয়ে এলো। গুঞ্জনও আর সাজিয়াও হোস্টেলে ফিরে আসে। হোস্টেলে ফিরে নৌরিন কে জানিয়ে দিল, আজ সে ইরিনকে পড়াতে যাবে না। অনুষ্ঠান আর সারাদিনের ব্যস্ততায় শরীরটা ভীষণ ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। তবে সন্ধ্যা ছয়টার টিউশনটা তাকে যেতেই হবে।
ফ্রেশ হয়ে জানালার পাশে এসে দাঁড়ায় গুঞ্জন।
ঠিক তখনই পিছন থেকে এসে দাঁড়ায় সাজিয়া।
মুচকি হেসে কৌতূহলী গলায় বলল,আচ্ছা গুঞ্জন, প্রেম ভাইয়া যদি তোকে সত্যিই ভালোবাসে... তাহলে তুই কী করবি?
প্রশ্নটা শুনে গুঞ্জন এক মুহূর্তের জন্য নিশ্চুপ হয়ে যায়। তার চোখের দৃষ্টি জানালার বাইরের আকাশ ছুঁয়ে কোথায় যেন হারিয়ে যায়। ঠোঁটের কোণে এক চিলতে তিক্ত হাসি ফুটে ওঠে।
কয়েক মুহূর্তের নীরবতার পর সে ধীরস্বরে বলল,
ভালোবাসার অধ্যায়টা আমার জীবন থেকে অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে, সাজিয়া। এখন আর কারও হাত ধরে সারাজীবন হাঁটার স্বপ্ন দেখি না। কারও চোখে নিজের জন্য একটা নিরাপদ ঠিকানাও খুঁজি না।
একটু থেমে দীর্ঘশ্বাস ফেলল সে।
একবার বিশ্বাস করে ভেঙে পড়েছিলাম। সেই ভাঙনের শব্দ আজও কানে বাজে। মানুষ ভাবে সময় সব ক্ষত সারিয়ে দেয়, কিন্তু কিছু ক্ষত শুধু শুকিয়ে যায়, ব্যথাটা থেকে যায়। আমি একবার ঠকে গিয়েও কোনোভাবে বেঁচে আছি। দ্বিতীয়বার যদি একই ভুল করি... তাহলে হয়তো 'গুঞ্জন' নামে আর কোনো অস্তিত্বই বাকি থাকবে না।
গুঞ্জনের কণ্ঠে জমে থাকা কষ্টের ভার স্পষ্ট টের পেল সাজিয়া। সে আর কোনো কথা বলল না। শুধু এসে গুঞ্জনের পাশে দাঁড়ায়।
_________
অন্যদিকে হঠাৎ করেই প্রেমের বন্ধুরা শুধু মেঘা বাদে সবাই এসে হাজির হয় প্রেমদের বাড়িতে।
হঠাৎ সবাইকে একসাথে দেখে অবাক হয়ে প্রেম ভ্রু কুঁচকে বলে উঠল,
কিরে, তোরা হঠাৎ?
শাওন ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে বলল,কেন রে মজনু, আসতে পারি না নাকি?
প্রেম ভান করা বিস্ময় নিয়ে বলল,
আসতে পারিস, তবে মজনু কে?
শীলা সঙ্গে সঙ্গে কথার মাঝেই ঢুকে পড়ে।
ভাবখানা এমন করছে যেন ভাজা মাছটাও উল্টে খেতে জানে না! মনে করছে আমরা কিছুই বুঝিনি।
ইতি মুচকি হেসে বলল,
চল, তোর রুমে যাই। তোর সঙ্গে একটু জরুরি কথা আছে।
সবাই প্রেমের রুমে চলে গেল। কিছুক্ষণ পর নৌরিন এসে সবার সামনে নাস্তা দিয়ে গেল। গল্প করতে করতেই নাস্তা শেষ করে সবাই সোফায় গা এলিয়ে বসল।
সৌরভ গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
কয়েকদিন ধরে তোকে খুব অন্যমনস্ক লাগছে। আগের মতো আমাদের সঙ্গে আড্ডা দিস না, ঠিকমতো কথাও বলিস না। কী হয়েছে বল তো?
জীসানও আর দেরি না করে বলে উঠল,
আর একটা জিনিস আমরা সবাই খেয়াল করেছি। গুঞ্জনের দিকে তুই কেমন প্রেম প্রেম নজরে তাকিয়ে থাকিস। তাহলে কি আমরা ধরে নেব... তুই সত্যিই গুঞ্জনের প্রেমে পড়েছিস?
প্রেম কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটিয়ে বলে
ভালোবেসেছি...
একটি মাত্র শব্দ। অথচ সেই একটি শব্দের ভেতর যেন হাজারটা অনুভূতির ভার লুকিয়ে আছে।
ইতি বিস্মিত হয়ে বলে
এই অল্প সময়েই? দুই দিন আগেও তো গুঞ্জনকে তুই শুত্রু মনে করতি তাহলে।
প্রেম জানালার দিকে তাকিয়ে হালকা হেসে বলল,
ভালোবাসা কখনো সময় মেপে আসে না। এটা কোনো দীর্ঘ হিসাবের গল্প নয়। কখনো কখনো মাত্র এক পলক... এক সেকেন্ড... একবার চোখে চোখ পড়াই যথেষ্ট। সেই এক মুহূর্তেই একটা হৃদয় নিঃশব্দে আরেকটা হৃদয়ের ঠিকানায় পৌঁছে যায়।
প্রথমে আমি গুঞ্জনকে নিজের খেলায় হারাতে চেয়েছিলাম। ভেবেছিলাম ওকে আমার অনুভূতির জালে আটকে ফেলব, ওর হাসি, ওর জেদ, ওর আত্মবিশ্বাস সবকিছুকে ভেঙে দেব। কিন্তু ভাগ্য বোধহয় আমার জন্য অন্য অন্য কিছু রেখেছিলো
ওকে ফাঁদে ফেলতে গিয়েই বুঝলাম... অজান্তেই আমি নিজেই ওর মায়ার জালে বন্দি হয়ে গেছি।
এমন এক বন্ধনে আটকে গেছি, যেখান থেকে মুক্তি পাওয়ার কোনো ইচ্ছেও নেই।
জানিস, আমি ওর চোখের ভেতর লুকিয়ে থাকা এক অদ্ভুত মায়া দেখেছি। এমন এক মায়া, যা হয়তো আর কেউ দেখতে পায় না। ওর চোখ দুটোতে যেন হাজারটা না-বলা গল্প ঘুমিয়ে থাকে। ও যখন চুপ করে থাকে, তখনও মনে হয় ওর নীরবতা আমার সঙ্গে কথা বলে।
ওকে দেখলেই আমার বুকের ভেতর অদ্ভুত এক প্রশান্তি নেমে আসে। মনে হয়, পৃথিবীর সব কোলাহল থেমে গেছে। আবার ওকে না দেখলে সেই একই বুকের ভেতর অকারণ শূন্যতা জন্ম নেয়।
আজ বুঝতে পারছি, ভালোবাসা আসলে জয়-পরাজয়ের খেলা নয়। এখানে জিততে গিয়েই মানুষ সবচেয়ে সুন্দরভাবে হেরে যায়। আর আমি... আমি সেই হেরে যাওয়া মানুষগুলোর একজন।
শীলা বলে
গুঞ্জন যদি তোকে না চায়
প্রেম ঠোঁটের কোণে ম্লান হাসি ফুটিয়ে শান্ত কণ্ঠে বলল,
যদি ও আমাকে না-ও চায়, তবুও আমি ওকেই চাই। গুঞ্জন আমার জীবনের এমন এক অনুভূতি, যাকে কোনোদিন অন্য কারও সঙ্গে তুলনা করা সম্ভব নয়। ওর জায়গাটা শুধু ওরই।
আমি হয়তো আমি জানি না ওর জীবনের সবচেয়ে প্রিয় মানুষ হতে পারবো কীনা কিন্তু ও আমার প্রতিটি প্রার্থনায় থাকবে।ওকে ছাড়া অন্য কোনো নারীর দিকে ভালোবাসার চোখে তাকানোর ক্ষমতা আমার নেই।
আমার হৃদয়ের প্রতিটি স্পন্দন, প্রতিটি স্বপ্ন, প্রতিটি অপেক্ষার সঙ্গে জড়িয়ে আছে শুধু গুঞ্জনের নাম।
আমার ভালোবাসা কখনো বদলাবে না। কারণ সত্যিকারের ভালোবাসা কখনো নতুন কাউকে খুঁজে নেয় না, বরং সারাজীবন একজনকেই নিজের হৃদয়ের সিংহাসনে বসিয়ে রাখে। আমার সেই সিংহাসনে আজও, কালও, শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত থাকবে শুধু গুঞ্জন।
প্রেমের কথাগুলো ওর ফ্রেন্ড রা ছাড়াও দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকা একজনেও শুনতে পায়।যা ওদের অজানা।
চলবে,,