#প্রেমের_ গুঞ্জন
#পর্ব_১৬
#জান্নাত
দরজার আড়াল থেকে সরে আসে প্রেমের মা,তিনি প্রেমের রুমেই আসছিলেন তবে প্রেমের কথা শুনে থেমে যান।উনার ঠোঁটের কোণে ফুটে ওঠে মুচকি হাসি। গুঞ্জন কে দেখে উনারও ভীষন পছন্দ হয়েছে।এখন গুঞ্জন রাজি হলেই হলো।
এদিকে ঘরের ভেতর আড্ডা আরও জমে উঠেছে।
শীলা দুষ্টু হেসে বলে: গুঞ্জনকে আমারও খুব ভালো লাগে। আমি যদি ছেলে হতাম, তাহলে ওকে নিয়ে পালিয়ে যেতাম!
শীলার কথা শেষ হতেই ঘরজুড়ে হাসির রোল পড়ে গেল।
প্রেম সঙ্গে সঙ্গে ভ্রু কুঁচকে গম্ভীর মুখে বলল, একদম না! আমার গুঞ্জনকে নিয়ে কেউ টানাটানি করবে না।
ইতি মুখ চেপে হেসে উঠল।
ও মাগো! একেবারে টুরু লাভ!
মুহূর্তেই আবারও হো হো করে হেসে উঠল সবাই। প্রেমের মুখের অভিব্যক্তি দেখে যেন তাদের হাসি আরও বেড়ে গেল।
হাসির রেশ কাটতেই সৌরভ একটু গম্ভীর হয়ে বলে:আচ্ছা, মেঘা যদি এসব জানতে পারে, তখন কী হবে ভেবে দেখেছিস?
প্রেম নির্বিকার ভঙ্গিতে কাঁধ ঝাঁকাল আর বলে:আমি এসব নিয়ে একটুও ভাবি না। আমি থাকতে গুঞ্জনের কোনো ক্ষতি হতে দেব না। যাই হোক না কেন, ওর পাশে আমি সবসময় থাকব।
প্রেমের কণ্ঠে ছিল দৃঢ়তা। তার চোখেমুখে ফুটে উঠেছিল গুঞ্জনের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা আর অটুট বিশ্বাস।
বন্ধুরা একে অপরের মুখের দিকে তাকাল। চিরচেনা দুষ্টু, হাসিখুশি প্রেমকে তারা বহুবার দেখেছে, কিন্তু আজকের প্রেমটা যেন একেবারেই অন্যরকম। গুঞ্জনের প্রসঙ্গ উঠলেই ছেলেটার চোখে-মুখে যে অধিকার, সুরক্ষা আর নিঃস্বার্থ ভালোবাসা ফুটে ওঠে, তা দেখে সবাই অবাক হয়ে গেল।
প্রেমকে গুঞ্জনের প্রতি এতটা দুর্বল হতে দেখে সবাই যেন কিছুক্ষণের জন্য নির্বাক হয়ে যায়। যে ছেলেটা একসময় ভালোবাসা শব্দটাকেই উপহাস করত, আজ সেই ছেলেটাই একজন মানুষের হাসি, কান্না আর নিরাপত্তাকে নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব মনে করছে। সময় সত্যিই অদ্ভুত। সে মানুষকে বদলে দেয়, আর ভালোবাসা সেই বদলে যাওয়াকে পরিপূর্ণতা দেয়।
আসলে ভালোবাসা বড়ই রহস্যময় এক অনুভূতি। এর কোনো নির্দিষ্ট সংজ্ঞা নেই, নেই কোনো বাঁধাধরা নিয়ম। ভালোবাসা কখনও কঠিন হৃদয়কে মোমের মতো নরম করে দেয়, আবার কখনও ভেঙে চুরমার করে দেয় একটি হাসিখুশি জীবন। এই একটি অনুভূতিই মানুষকে স্বপ্ন দেখতে শেখায়, অসম্ভবকে সম্ভব করার সাহস জোগায়, হাজার কষ্টের মাঝেও বেঁচে থাকার কারণ খুঁজে দেয়। আবার এই ভালোবাসাই ভুল মানুষের হাতে পড়লে কেড়ে নেয় হাসি, শান্তি, এমনকি বেঁচে থাকার ইচ্ছেটুকুও।
তবু পৃথিবী আজও ভালোবাসার ওপরই টিকে আছে। কারণ সত্যিকারের ভালোবাসা কখনও শুধু কাউকে নিজের করে পাওয়ার নাম নয়; বরং তার সুখ, তার সম্মান আর তার নিরাপত্তাকে নিজের সুখের চেয়েও বড় করে দেখার নামই ভালোবাসা। আর প্রেমের চোখে আজ সেই নিঃস্বার্থ ভালোবাসারই স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠছে।
_________
সন্ধ্যা ঠিক ছয়টা। প্রতিদিনের মতোই টিউশনি পড়াতে বেরিয়েছে গুঞ্জন। হোস্টেল থেকে মাত্র দশ মিনিটের পথ। কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে ধীর পায়ে হাঁটছে সে।
হঠাৎই রাস্তার ওপাশে পরিচিত একটি মুখে গিয়ে থেমে যায় তার দৃষ্টি।
রিয়াদ!
কয়েক মুহূর্তের জন্য সময় যেন স্থির হয়ে যায়। ঠিক সেই মুহূর্তেই রিয়াদের চোখও এসে আটকে যায় গুঞ্জনের চোখে। দুজনের দৃষ্টি একে অপরকে ছুঁয়ে যায় ক্ষণিকের জন্য।
কিন্তু পরের মুহূর্তেই গুঞ্জন নির্বিকার ভঙ্গিতে চোখ নামিয়ে নেয়। তার মুখে না বিস্ময়, না অভিমান, না কোনো অভিযোগ। যেন রাস্তার ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটিকে সে কোনোদিন চিনতই না। একবারও পেছনে না তাকিয়ে আগের মতোই ধীর পায়ে নিজের গন্তব্যের দিকে হাঁটতে থাকে।
গুঞ্জনের এই নির্লিপ্ত আচরণে রিয়াদ যেন হতভম্ব হয়ে যায়। সে ভেবেছিল, হয়তো গুঞ্জন থেমে যাবে, হয়তো তার সাথে কথা বলবে এসে। কিন্তু কিছুই হলো না। এতটা উদাসীনতা, এতটা অচেনা হয়ে যাওয়ার জন্য তো সেই দায়ী।
রিয়াদ আর ইশিতা দুজনেই এখন ঢাকায় থাকে। একই প্রতিষ্ঠানে চাকরি পাওয়ার সুবাদেই কয়েক মাস আগে এখানে এসেছে তারা। তবে এই বিশাল শহরে এভাবে হঠাৎ গুঞ্জনের সঙ্গে দেখা হয়ে যাবে, সেটা কখনো ভাবেনি রিয়াদ।
অদ্ভুত ব্যাপার হলো, যাকে একসময় পাওয়ার জন্য গুঞ্জন দিনের পর দিন অপেক্ষা করেছিলো আজ সেই মানুষটার চোখে নিজের অস্তিত্বের কোনো ছাপই খুঁজে পেল না।
অন্যদিকে, ইশিতার সঙ্গে তার সম্পর্কও আগের মতো নেই। বিয়ের আগে যে ভালোবাসা, উচ্ছ্বাস আর স্বপ্নে তাদের দিন কেটেছে, বিয়ের পর যেন সেসব ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে গেছে। ছোট ছোট ভুল বোঝাবুঝি, অকারণ তর্ক আর দূরত্ব তাদের সম্পর্কটাকে অদৃশ্যভাবে গ্রাস করে ফেলেছে।
এসব ভাবতে ভাবতেই রিয়াদের বুকের ভেতর থেকে অজান্তেই একটি দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে।
সে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, আর দূরে মিলিয়ে যেতে থাকা গুঞ্জনের অবয়বের দিকে অপলক তাকিয়ে থাকে।
কিছু মানুষ জীবনে ফিরে আসে না তারা শুধু একদিন সম্পূর্ণ অচেনা হয়ে সামনে দিয়ে হেঁটে চলে যায়। আর তখনই সবচেয়ে বেশি উপলব্ধি হয়, হারিয়ে ফেলা মানুষগুলোর মূল্য ঠিক কতটা ছিল।
_________
গুঞ্জন আর কোনোদিনও অতীতের অন্ধকার গলিতে ফিরে যেতে চায় না। যে অতীত তাকে বিশ্বাসের বিনিময়ে প্রতারণা উপহার দিয়েছে, যে স্মৃতিগুলো প্রতিবার মনে পড়লেই বুকের ভেতরটা রক্তাক্ত হয়ে ওঠে সেই অতীতের আজ তার বর্তমান জীবনে আর কোনো স্থান নেই।
সেই অতীতকে সে অনেক আগেই নিজের জীবন থেকে নির্বাসন দিয়েছে।
গ্রামে থাকাকালীনই নিজের কাঁপা হাতে ডিভোর্সের কাগজে স্বাক্ষর করে পাঠিয়ে দিয়েছিল সে। সেদিন শুধু একটি সম্পর্কেরই ইতি টানেনি গুঞ্জন, চিরদিনের জন্য বিদায় জানিয়েছিল এক বিষাক্ত অধ্যায়কে। কাগজে লেখা সেই কয়েকটি স্বাক্ষরের সঙ্গে যেন ঝরে পড়েছিল বুকভরা অভিমান, হাজারো না-বলা কান্না আর ভেঙে যাওয়া স্বপ্নের শেষ অবশিষ্টটুকুও।
আজ সে অতীতের সব শৃঙ্খল ছিন্ন করে মুক্ত। যে মেয়েটা একদিন রাতের পর রাত বালিশ ভিজিয়ে কেঁদেছে, আজ সেই মেয়েটাই নিজের চোখের জলকে শক্তিতে রূপ দিতে শিখেছে। জীবনের কঠিন শিক্ষা তাকে শিখিয়ে দিয়েছে সব সম্পর্ক আগলে রাখতে হয় না, কিছু সম্পর্ক ছেড়ে দেওয়াই নিজের প্রতি সবচেয়ে বড় ন্যায়বিচার।
তাই আজ অতীত যদি হাজারবার তার সামনে আসে।গুঞ্জন আর একবারও পিছন ফিরে তাকাবে না। কারণ সে জানে, মৃত স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখলে জীবন্ত স্বপ্নগুলো একদিন মরে যায়।
এখন তার জীবনের প্রতিটি সকাল নতুন আশার আলো নিয়ে আসে। অতীতের কালো ছায়া নয়, সে নিজের ভবিষ্যৎকে আঁকড়ে ধরেই এগিয়ে যেতে চায়। যে বাঁধন একদিন তাকে শ্বাসরুদ্ধ করে রেখেছিল, আজ সেই বাঁধনের প্রতিটি গিঁট খুলে সে স্বাধীনতার স্বাদ পেয়েছে। আর সেই স্বাধীনতাই এখন গুঞ্জনের সবচেয়ে বড় শক্তি।
__________
টিউশনি শেষ করে বাসার নিচে নেমে আসে গুঞ্জন। গেটের বাইরে এসে স্বভাববশত চারপাশে একবার চোখ বুলাতেই তার দৃষ্টি গিয়ে থামে রাস্তার ওপাশে।
সেখানে দাঁড়িয়ে আছে প্রেম।
দুই হাত প্যান্টের পকেটে ঢুকিয়ে, স্থির দৃষ্টিতে শুধু তাকিয়েই আছে গুঞ্জনের দিকে। যেন অনেকক্ষণ ধরেই অপেক্ষা করছে।
প্রেম এগিয়ে আসে গুঞ্জনের দিকে,প্রেম কে দেখে গুঞ্জন কে দেখে বলে
আপনি এখানে?
প্রেমের ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটে ওঠে।
তোমাকে দেখতে এসেছি।
কথাটা শুনে মুহূর্তের জন্য থমকে যায় গুঞ্জন। বুকের ভেতরটা কেমন যেন কেঁপে ওঠে। কিন্তু পরের মুহূর্তেই নিজেকে সামলে নিয়ে মুখে এনে ফেলে আগের সেই নির্লিপ্ত ভাব।
শীতল কণ্ঠে বলল,
এসব কী বলছেন আপনি? আর আমাকে দেখার জন্য আপনি আসবেন কেন?
প্রেম এক পা এগিয়ে আসে। তার চোখে ছিল এক প্রশান্তি,তার দৃষ্টি দিয়েই যেন উত্তর দিয়ে দিচ্ছে।
মৃদু স্বরে বলল,
আমার চোখের ভাষা কী তুমি বুঝতে পারো না, গুঞ্জন?
প্রেমের গভীর দৃষ্টির সামনে এক মুহূর্তের জন্য গুঞ্জনের চোখ কেঁপে উঠলেও সে দ্রুত নিজেকে সামলে
মুখ শক্ত করে দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
আপনার এসব কথা নিজের কাছেই রাখুন। যতটুকু এগিয়েছেন, আমি বলব এখানেই থেমে যান। কারণ আমি চাই না আমার জন্য কেউ তার মূল্যবান সময় নষ্ট করুক। আমার পেছনে ছুটে আপনার সময় নষ্ট করা ছাড়া আর কিছুই হবে না।
কথাগুলো বলার সময় গুঞ্জনের কণ্ঠ ছিল কঠোর।
প্রেমের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বিষণ্ন হাসি ফুটে উঠে। গুঞ্জনের কঠিন কথাগুলো যেন তার বুক চিরে ভেতরে গিয়ে বিঁধল, তবুও মুখে বিরক্তি কিংবা রাগের কোনো ছাপ নেই।
সে কয়েক মুহূর্ত গুঞ্জনের দিকে তাকিয়ে থেকে শান্ত কণ্ঠে বলল,
তুমি কী করে এত নিশ্চিত হলে, আমি সময় নষ্ট করছি? মানুষ তো সেই কাজেই সময় দেয়, যেটা তার কাছে সবচেয়ে মূল্যবান। আমার কাছে সেই মূল্যবান মানুষটা তুমি, গুঞ্জন।
গুঞ্জন বিরক্ত দৃষ্টিতে তাকাল।
দএসব আবেগী কথা বলে লাভ নেই। আমি এসব বিশ্বাস করি না।
প্রেম মৃদু হেসে মাথা নাড়ল।
বিশ্বাস করো না, তাতে কোনো সমস্যা নেই। ভালোবাসা তো বিশ্বাস করিয়ে নেওয়ার বিষয় নয়, অনুভব করানোর বিষয়।
গুঞ্জন এবার গম্ভীর হয়ে বলল,
আপনি আমার সম্পর্কে কিছুই জানেন না। আমার অতীত সম্পর্কে আপনি জানতে পারলে আর এমন মিষ্টি মিষ্টি কথা বের হবেনা আপনার মুখ থেকে।তাই বলছি আমার থেকে দূরত্ব বজায় রাখুন।এটা আপনার জন্যও ভালো আর আমার জন্যও।
মানুষের অতীতকে আমি সম্মান করি, বিচার করি না। কারণ অতীত কারও পরিচয় নয়, তা কেবল জীবনের একটা অধ্যায়। আমি তোমার অতীত নয়, বর্তমানকে দেখেছি। আর এই বর্তমানের গুঞ্জনকে... আমি অসম্ভব শ্রদ্ধা করি।
গুঞ্জন দৃঢ় স্বরে বলল,
শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা এক জিনিস নয়। আর আমার জীবনে ভালোবাসার জন্য কোনো জায়গা নেই।
বলেই গুঞ্জন প্রেম কে পাশ কাটিয়ে হাঁটা ধরে।
চলবে,,,