#প্রেমের _গুঞ্জন
#পর্ব_১৮
#জান্নাত
ফোনটা হাতে নিয়ে গুঞ্জন কলটি রিসিভ করে কানে ধরতেই ওপাশ থেকে ভেসে এলো এক পরিচিত পুরুষালি কণ্ঠস্বর
গুঞ্জন?
কণ্ঠস্বরটা শুনেই যেন মুহূর্তের জন্য থমকে গেল গুঞ্জন। চোখ দুটো বিস্ময়ে বড় হয়ে এলো। বুকের ভেতরটা অকারণেই কেঁপে উঠল।
প্রেম চৌধুরী!
কিন্তু প্রেম তার নাম্বার পেল কোথায়?
গুঞ্জন তাকায় সাজিয়ার দিকে। সাজিয়া তখনও ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসি ধরে রেখেছে। গুঞ্জনের দৃষ্টি নিজের ওপর পড়তেই সাজিয়া অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে নেয়।
ব্যাপারটা বুঝতে গুঞ্জনের আর এক মুহূর্তও লাগল না।
নিশ্চয়ই সাজিয়াই তার নাম্বার দিয়েছে!
গুঞ্জন রাগে চোখ সরু করে সাজিয়ার দিকে তাকাল। যেন চোখ দিয়েই বলে দিল তোর খবর আছে!
কিন্তু ওপাশ থেকে আবারও প্রেমের কণ্ঠ ভেসে এলো
তীব্রময়ী, কথা বলছো না কেন?
‘তীব্রময়ী’ সম্বোধনটা শুনে গুঞ্জনের ভ্রু কুঁচকে গেল। কয়েক সেকেন্ড নীরব থেকে শান্ত গলায় বলে উঠল
সরি, আমি আপনার তীব্রময়ী নই। মনে হচ্ছে আপনি ভুল নাম্বারে ফোন করেছেন।
কথাটা শেষ করেই আর কোনো সুযোগ না দিয়ে
ফোনটা কেটে দিল গুঞ্জন।
ফোনটা নামিয়ে সঙ্গে সঙ্গে সাজিয়ার দিকে ঘুরে রাগী চোখে তাকিয়ে বলল
তুই আমার নাম্বার কেন দিলি?
সাজিয়া সঙ্গে সঙ্গে মুখটা অসহায় করে ফেলল। দুহাত তুলে আত্মপক্ষ সমর্থনের ভঙ্গিতে বলল
বিশ্বাস কর, আমি দিইনি!
গুঞ্জন চোখ সরু করে তাকিয়ে রইল।
সাজিয়া এবার একটু মায়াকাড়া মুখ করে বলল
উনি আমার ফোনটা চেয়েছিল। আমি দিয়েছি। ব্যাস! এরপর যা করার উনিই করেছে। এখন এখানে আমার কী দোষ বল?
সাজিয়ার মুখের এমন অসহায় ভঙ্গি দেখে গুঞ্জন আর নিজের হাসিটা আটকে রাখতে পারল না।
শব্দ করে হেসে উঠল সে।
সেই হাসিটা ছিল একেবারে নির্মল। কোনো কৃত্রিমতা নেই, কোনো লুকোনো বিষাদ নেই শুধুই স্বচ্ছ, প্রাণখোলা একটা হাসি।
সাজিয়া অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল গুঞ্জনের দিকে।
মেয়ে হয়েও গুঞ্জনের হাসিতে সে মুগ্ধ হয়ে গেল।
কত সুন্দর এই মেয়েটার হাসি!অথচ মেয়েটা হাসেই না।
সবসময় যেন নিজের চারপাশে এক অদৃশ্য দেয়াল তুলে রাখে গুঞ্জন। মুখে হাসি থাকলেও চোখের গভীরে লুকিয়ে থাকে অজস্র না বলা চাপা কষ্ট আর এক শূন্যতা।
সাজিয়া মুগ্ধ চোখে বন্ধুর হাসিমাখা মুখটার দিকে তাকিয়ে মনে মনে ভাবল
এই হাসিটা যদি সবসময় এমনই থাকতো। ইনশাআল্লাহ প্রেম ভাইয়া তোকে সর্বোচ্চ সুখি করবে।
গুঞ্জনের হাসির মাঝেই হঠাৎ ফোনটা পরপর দু’বার বেজে উঠল।
হাসির রেশটা যেন মুহূর্তেই থেমে গেল। গুঞ্জনের দৃষ্টি চলে গেল ফোনের স্ক্রিনের দিকে। স্ক্রিনে ভেসে উঠেছে প্রেমের নাম্বার,প্রেম দুইটা মেসেজ পাঠিয়েছে।
কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকার পর অবশেষে মেসেজটি খুলল গুঞ্জন।
মেসেজটা সিন করতেই তার চোখ আটকে গেল কয়েকটি শব্দে।
তুমিই আমার তীব্রময়ী।
আমার অস্থিরতার কারণ, আমার নীরবতার ভাষা, আমার প্রতিটি অসমাপ্ত কবিতার সবচেয়ে সুন্দর পঙক্তি তুমি।
আরেকটায় লেখা
তুমি আমার সেই মায়াবিনী, যাকে একবার চোখে দেখলে মন আর অন্য কোথাও স্থির হতে চায় না।
তুমি আমার রাতজাগা চাঁদ, নিঃশব্দ প্রার্থনা আর বুকের ভেতর লুকিয়ে রাখা একান্ত অনুভূতি।
গুঞ্জন লেখাগুলো পড়ে কিছুক্ষণ নিঃশব্দে স্থির হয়ে বসে রইল। লোকটা সত্যিই বড্ড বেশি পাগলামি করছে।
গুঞ্জন এর কোনো প্রতিউত্তর করেনা।
_______
রাত প্রায় বারোটা।
টলমল পায়ে ভেতরে প্রবেশ করল ইশিতা। এক নজরেই বোঝা গেল সে ড্রিংক করেছে। হাঁটার মধ্যে কোনো স্থিরতা নেই, চোখেমুখেও মাতলামির স্পষ্ট ছাপ।
ড্রয়িংরুমে বসে থাকা রিয়াদের চোখ মুহূর্তেই কঠিন হয়ে উঠল। এত রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করতে করতে তার ভেতরের জমে থাকা রাগ এবার কণ্ঠে বিস্ফোরিত হলো।
এত রাত পর্যন্ত তুমি কোথায় ছিলে?
ইশিতা কোনো উত্তর না দিয়ে হেলতে-দুলতে সামনে এগিয়ে যেতে লাগল।
রিয়াদ উঠে দাঁড়িয়ে আবারও বলল,
তুমি তো সবসময় আমার আগেই বাসায় আসো। তাহলে আজ এত রাত পর্যন্ত কোথায় ছিলে তুমি?
ইশিতা থেমে ধীরগতিতে রিয়াদের দিকে তাকাল। মাতাল চোখে ফুটে উঠল একরাশ বিরক্তি। ঠোঁট বাঁকিয়ে সে বলল,
আমার যেখানে ইচ্ছে সেখানে যাব। তোমাকে কেন বলতে হবে? কে হও তুমি আমার?
কথাটা শুনে রিয়াদ যেন মুহূর্তের জন্য আকাশ থেকে পড়ল।
তার চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। দাঁতে দাঁত চেপে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,
কে হই মানে? আমি তোমার স্বামী, ইশিতা। আর ভদ্র ঘরের একটা মেয়ে কখনো এত রাতে এভাবে বাইরে থাকে না। তার ওপর তোমাকে দেখে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, তুমি ড্রিংক করেছো!
ইশিতা ঠোঁটে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটিয়ে বলল,
আমার যা মন চায়, আমি তাই করব। তোমার ভালো না লাগলে ডিভোর্স দিয়ে দাও।
কথাগুলো ছুড়ে দিয়েই আর এক মুহূর্ত দাঁড়াল না ইশিতা। হেলতে-দুলতে নিজের ঘরের দিকে চলে গেল।
রিয়াদ নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
হঠাৎ করেই রিয়াদের চোখের সামনে ভেসে উঠল আরেকটা মুখ।
গুঞ্জন।
মেয়েটার সেই কান্নাভেজা মুখটা যেন এতদিন পর প্রথমবারের মতো তার চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে উঠল। ভেজা চোখ, অভিমানী দৃষ্টি, আর বুকের ভেতর জমে থাকা অসহায় কষ্ট
সবকিছু একসঙ্গে মনে পড়তেই রিয়াদের বুকটা ধক করে উঠে।
সে কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
তবে কি...
সে ভুল করেছে?
এই প্রথমবার প্রশ্নটা তার নিজের কাছেই এতটা তীব্র হয়ে ফিরে এলো।
কিন্তু পরক্ষণেই রিয়াদ নিজের চিন্তাকে থামিয়ে দিল।
না।সে ভুল করেনি।নিজেকেই বোঝাতে লাগল,
আমি যা করেছি, ঠিকই করেছি। ওই কালো মেয়েটার সঙ্গে সংসার করে কী-ই বা পেতাম?’
কথাটা মনে আনতেই ঠোঁটে কঠিন হাসি ফুটে উঠে তার।
অথচ বোকা রিয়াদ তখনও বুঝতে পারল না সৌন্দর্যের মোহে পড়ে সে কতটা মূল্যবান কিছু নিজের হাতেই হারিয়ে ফেলেছে।
সোনা খুঁজতে গিয়ে যে হীরেটা তার হাতেই ছিল, সেটাকেই সে অমূল্য ভেবে দূরে ঠেলে দিয়েছে।
ফর্সা আর কালোর পার্থক্য করতে গিয়ে সে ভুলে গিয়েছিল
মানুষের রঙ চোখকে আকৃষ্ট করতে পারে, কিন্তু একজন মানুষের হৃদয়ের মূল্য তার চেহারায় লেখা থাকে না।
আর সেই সত্যটা বুঝতে বুঝতেই হয়তো রিয়াদের অনেক দেরি হয়ে যাবে।
কারন সে তখনো বুঝতে পারছেনা গুঞ্জনকে সে হারায়নি শুধু।
সে হারিয়েছে এমন একজন মানুষকে, যে তাকে সত্যি করে ভালোবেসেছিল।
আর বুঝেই বা কী হবে,যা হাবার তো হয়েই গেছে,সে তার ভুল বুঝলেও সে কখনো গুঞ্জন কে পাবেনা।
_______
পরদিন সকালেই গুঞ্জন আর সাজিয়া একসঙ্গে ভার্সিটিতে এসে পৌঁছায়।
কিন্তু ভার্সিটির গেট পেরিয়ে কয়েক পা এগোতেই গুঞ্জনের ভ্রু কুঁচকে যায়। আশপাশের পরিবেশটা কেমন যেন অস্বাভাবিক লাগছে তার কাছে।
যার সাথেই দেখা হচ্ছে ছেলে হোক কিংবা মেয়ে সবাই কেমন যেন দাঁত বের করে হাসছে। আর তাকে দেখলেই বিনয়ের সঙ্গে মাথা নত করে বলছে,
ভাবী, কেমন আছেন?
গুঞ্জন থমকে দাঁড়ায়।
একবার ডানে তাকায়, একবার বামে।
তারপর বিরক্তিতে চোখ দুটো সরু করে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা একটা ছেলের দিকে তাকিয়ে বলে,
এই! আমি তোমাদের কোন জন্মের ভাবী?
ছেলেটা গালভরা হাসি দিয়ে জবাব দেয়,
কেন ভাবী? এই জন্মের ভাবী।
গুঞ্জনের চোখ কপালে উঠে যায়।
কোমরে এক হাত রেখে দাঁত কিড়মিড় করে বলে,
তোমাদের কোন ভাইয়ের বউ আমি যে সকাল সকাল আমাকে ভাবী ডাকতে ডাকতে ফেনা তুলে ফেলছো?
ছেলেটা আবারো হেঁসে বলে
প্রেম ভাইয়ার বউ। আমাদের ভাবী।
গুঞ্জনের মুখ মুহূর্তেই থমথমে হয়ে যায়।
ছেলেটা যাওয়ার সময় আবারও পেছন ফিরে হাত নেড়ে বলে,
আচ্ছা ভাবী, আসি। আসসালামু আলাইকুম, ভাবী!
ওয়ালাইকুম
জবাবটা শেষ করার আগেই গুঞ্জনের মাথায় যেন আগুন জ্বলে ওঠে।
একজন নয়, দুজন নয় যেদিকেই তাকাচ্ছে, সেদিকেই একই ডাক।
ভাবী!
ভাবী, কেমন আছেন?
ভাবী, সালাম!
গুঞ্জনের মনে হচ্ছে, আর একবার কেউ তাকে ভাবী ডাকলেই সে ভার্সিটির মাঝখানে বসে চিৎকার করে কান্না শুরু করে দেবে!
পাশে দাঁড়িয়ে সাজিয়া এতক্ষণে হাসতে হাসতে প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। নিজের হাসি থামানোর ব্যর্থ চেষ্টা করতে করতে সে বলল,
গুঞ্জন, তুই রাগ করিস না। ব্যাপারটা কিন্তু বেশ মজার!
গুঞ্জন ঘুরে তার দিকে তাকায়।
চোখেমুখে তখন রীতিমতো আগ্নেয়গিরির লাভা।
তোর কাছে মজার লাগছে?
সাজিয়া মুখ চেপে ধরে,মাথা নাড়ায়
না।
গুঞ্জন?সে হনহন করে হাঁটা শুরু করে। লক্ষ্য একটাই প্রেম চৌধুরী।
আজ এই ছেলেটার একটা হেস্তনেস্ত না করে সে শান্ত হবে না।
মনে মনে দাঁত কিড়মিড় করে বলে,
বড্ড বাড় বেড়েছে প্রেম চৌধুরীর! ভার্সিটির সবাইকে দিয়ে আমাকে ভাবী ডাকাচ্ছে? কত বড় সাহস।
এদিকে গুঞ্জনের রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে চলে যাওয়া দেখে সাজিয়া পেছন থেকে তাকিয়ে আবারও হেসে ফেলে।
ঠিক তখনই তার পেছন থেকে ভেসে আসে পরিচিত এক পুরুষালি কণ্ঠ
কী সুন্দরী রমণী, এত হাসছো কেন?
চলবে,,,