#প্রেমের _গুঞ্জন
#পর্ব__১৯
#জান্নাত
সাজিয়া সেদিকে তাকিয়ে দেখল, শাওন দাঁড়িয়ে আছে।
শাওনকে দেখামাত্রই সাজিয়ার মুখের হাসিটা মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল। ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বলল,
আমি যে কারণেই হাসি না কেন, আপনাকে বলব কেন?
শাওন ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটিয়ে বলল,
আমাকেও বলো। আমিও একটু হাসি তোমার সাথে।
সাজিয়া কয়েক সেকেন্ড ভ্রু কুঁচকে শাওনের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর মুখ ভেংচিয়ে কোনো উত্তর না দিয়েই সেখান থেকে চলে গেল।
শাওন হতভম্ব হয়ে তার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল।
মুখ ভেংচি দেওয়ার মতো কী এমন বললাম আমি? আজব! মেয়ে মানুষ আসলেই এক আজব প্রাণী!
অন্যদিকে গুঞ্জন নিজের গন্তব্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু কয়েক পা যেতেই মেঘা হঠাৎ তার পথ আটকে দাঁড়াল। চোখেমুখে স্পষ্ট রাগ, কণ্ঠে বিষ মেশানো তাচ্ছিল্য।
ভার্সিটিতে এসেছিস কী বড়লোক ছেলেদের সাথে লুতুপুতু করে তাদের ফাঁসাতে? প্রেমের সাথে কী সম্পর্ক তোর, হুম? দেখে তো মনে হয় ভাজা মাছটাও উল্টে খেতে পারিস না, অথচ নষ্টামি ঠিকই করতে পারিস! তোদের মতো মেয়েদের কয়েকদিন ব্যবহার করে ছেড়ে দেওয়া যায়, কখনো ভালোবাসা যায় না। প্রেম হয়তো তোর সাথেও সেটাই করছে। আর তুইও তার সাথে তাল দিচ্ছিস! বাহ, বাহ!
গুঞ্জন নির্বাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
কথাগুলো যেন একেকটা তীক্ষ্ণ কাঁটার মতো এসে বিঁধছিল তার মনে। অথচ এই অপবাদের একটিও সত্যি নয়।
ভার্সিটিতে আসার পর থেকেই মেঘা সবার মুখে প্রেম আর গুঞ্জনকে নিয়ে নানা কথা শুনেছে। আর সেই রাগ, ক্ষোভ আর ভুল ধারণার বশেই আজ যা নয়, তাই বলে যাচ্ছে গুঞ্জনকে।
গুঞ্জনের ভেতরটাও ততক্ষণে রাগে জ্বলতে শুরু করেছে। অপমানের তীব্রতায় বুকটা ভার হয়ে এসেছে। তবুও সে নিজের রাগটাকে শক্ত হাতে সামলে নিল।
কারণ সে জানে, রাগের মুহূর্তে বলা একটি কথাও কখনো কখনো সম্পর্ক ভেঙে দিতে পারে, বড় কোনো ঝামেলার জন্ম দিতে পারে।
গুঞ্জন ধীরে একটা গভীর শ্বাস নিল। তারপর শান্ত অথচ ধারালো কণ্ঠে বলল,
অনেক বলেছেন আপনি, আপু। এবার আমাকে একটু বলতে দিন।
মেঘার মুখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে গুঞ্জন আবার বলল,
সত্য-মিথ্যা যাচাই না করে একজন মানুষকে এভাবে মিথ্যে অপবাদ দেওয়ার অধিকার আপনাকে কেউ দেয়নি। আপনি আমার সম্পর্কে যা বললেন, তার একটাও সত্যি নয়। আর মনে রাখবেন, কাউকে মিথ্যা অপবাদ দেওয়া খুব ছোট কোনো বিষয় নয়। একটা মিথ্যা কথা একজন মানুষের সম্মান, চরিত্র আর পুরো জীবনকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিতে পারে।
মেঘা কিছু বলতে যাবে, তার আগেই গুঞ্জন এবার আরও দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
আমি এই ভার্সিটিতে এসেছি পড়াশোনা করতে। নিজের একটা স্বপ্ন আছে, সেই স্বপ্ন পূরণ করতে এসেছি। কোনো বড়লোক ছেলেকে ফাঁসাতে কিংবা কারো টাকার পেছনে ছুটতে আসিনি। আমার পরিবার আমাকে যে শিক্ষা দিয়ে বড় করেছে, সেখানে নিজের সম্মানকে বিক্রি করে কারো পেছনে ছুটে বেড়ানোর শিক্ষা নেই।
একটু থেমে গুঞ্জন চোখ সরু করে বলল,
আর আমার চরিত্র নিয়ে কথা বলার আগে নিজের কথাগুলো একবার ভেবে বলবেন। কারণ কারো মুখে শোনা কয়েকটা কথাকে সত্যি ধরে নিয়ে একটা মেয়ের চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলা খুব সহজ। কিন্তু সেই অপমানটা বয়ে বেড়াতে হয় সেই মেয়েকেই।
মেঘার মুখটা শক্ত হয়ে গেল।
গুঞ্জন এবার এক পা এগিয়ে এসে শান্ত স্বরে বলল,
আপনি যদি সত্যিই প্রেম চৌধুরীকে ভালোবাসেন, তাহলে আমার কাছে এসে আমাকে অপমান না করে আপনার বয়ফ্রেন্ডকে গিয়ে প্রশ্ন করুন। কেন সে আমার নামে এসব আজগুবি কথা ভার্সিটিতে ছড়াচ্ছে? কেন তার কারণে একজন নির্দোষ মেয়েকে মানুষের সামনে অপমানিত হতে হচ্ছে?
তার কণ্ঠে এবার অভিমানের চেয়ে দৃঢ়তা বেশি।
আর একটা কথা মনে রাখবেন, ভালোবাসা কোনো প্রতিযোগিতা নয় যে কাউকে হারিয়ে কাউকে জিততে হবে। ভালোবাসা জোর করে পাওয়া যায় না, কারো সম্মান নষ্ট করে পাওয়া যায় না। আর কাউকে নিজের জীবনে রাখার জন্য অন্য কাউকে ছোট করাও ভালোবাসা নয়।
গুঞ্জন এবার চোখে চোখ রেখে বলল,
আমি কারো ভালোবাসা কেড়ে নিতে চাই না। কারো সম্পর্কের মাঝেও দাঁড়াতে চাই না। কিন্তু নিজের সম্মান রক্ষা করার অধিকার আমার আছে। তাই ভবিষ্যতে আমার নামে এমন কোনো কথা বলার আগে অন্তত একবার সত্যিটা জানার চেষ্টা করবেন।
শেষ কথাটা বলেই গুঞ্জন আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না।
মাথা উঁচু করে নিজের পথ ধরে এগিয়ে গেল সে।
পেছনে দাঁড়িয়ে মেঘা নির্বাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
আর গুঞ্জনের বুকের ভেতর তখনও রাগ জমে আছে, কিন্তু সেই রাগের ওপর জয়ী হয়েছে তার আত্মসম্মান।
কারণ সে জানে নীরব থাকা সবসময় দুর্বলতা নয়, আর প্রতিবাদ করা সবসময় অভদ্রতা নয়। কখনো কখনো নিজের সম্মানের জন্য শান্ত কণ্ঠেই সবচেয়ে শক্ত উত্তর দিতে হয়।
___
গুঞ্জন সারা ভার্সিটি খুঁজেও প্রেমকে কোথাও পেল না। একপ্রান্ত থেকে আরেকপ্রান্ত ক্লাসরুম, করিডোর, ক্যান্টিন সবখানেই খুঁজে বেড়াল সে। কিন্তু প্রেমের কোনো দেখা নেই।
অন্যদিকে সাজিয়া এতক্ষণ হাসিমুখে থাকলেও এখন তার মুখটা একেবারে গম্ভীর। প্রিয়ার বলা প্রতিটি তীক্ষ্ণ কথা সে নিজের কানে শুনেছে। কথাগুলো বারবার তার মনে পড়ছে।
গুঞ্জনের জায়গায় যদি সে থাকত, তাহলে হয়তো এতক্ষণে চোখের পানিতে সব ভাসিয়ে দিত। অথচ গুঞ্জন! মেয়েটা কীভাবে এতটা স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করছে?
ভাবতেই সাজিয়ার চোখ দুটো ছলছল করে উঠল।
এদিকে প্রেমকে অবশেষে খুঁজে পেল গুঞ্জন।
ভার্সিটির পেছনের দিকে ছোট্ট একটা লেক। লেকের পাড়ে কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে বসে আড্ডা দিচ্ছিল প্রেম। গুঞ্জনকে দূর থেকে এগিয়ে আসতে দেখেই তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল মৃদু হাসি।
কিন্তু সেই হাসি বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না।
গুঞ্জন এসে ঠিক প্রেমের সামনে দাঁড়াল। মুখটা কঠিন, চোখে দৃঢ়তা। তারপর শান্ত অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বলে উঠল,
ভাইয়া, আপনাকে আমি আগেও বলেছি। আজ শেষবারের মতো বলছি, আমার পিছু ছেড়ে দিন। আর আমাকে নিয়ে এমন হাবিজাবি খবর রটাবেন না।
এক মুহূর্ত থেমে গুঞ্জন গভীর শ্বাস নিল।
আপনি ছেলে মানুষ। ছেলেরা কোনো একটা ভুল করলে কিংবা কোনো কিছু করলেও অনেক সময় সহজেই পার পেয়ে যায়। কিন্তু একটা মেয়ে সেটা পারে না। একটা মেয়েকে সমাজের কত কটু কথা শুনতে হয়, সেটা হয়তো আপনি বুঝবেন না।
প্রেমের মুখের হাসিটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল।
গুঞ্জন এবার আরও নরম অথচ কষ্টভরা কণ্ঠে বলল,
আমি এখানে পড়াশোনা করতে এসেছি। কারো সঙ্গে ঝামেলায় জড়াতে নয়। দয়া করে আমাকে আমার মতো থাকতে দিন। আমাকে এই ভার্সিটি থেকে বের হতে বাধ্য করবেন না, প্লিজ।
প্রেম নির্বাক হয়ে তাকিয়ে রইল তার দিকে।
গুঞ্জন আবার বলল,
আর নৌরিন আপুকে বলে দেবেন, আমি আর ইরিনকে পড়াতে যেতে পারব না। দয়া করে আমাকে আর ডিস্টার্ব করবেন না। আমার থেকে দূরে থাকবেন।
কথাগুলো শেষ করেই আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না গুঞ্জন। পেছনে ফিরে দ্রুত পায়ে চলে গেল সেখান থেকে।
প্রেম পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল।
তার কানে যেন বারবার গুঞ্জনের শেষ কথাটাই প্রতিধ্বনিত হতে লাগল
আমার থেকে দূরে থাকবেন।
মেয়েটার প্রতিটি শব্দ এসে যেন তার হৃদয়ের গভীরে বিঁধছে। বুকের ভেতরটা কেমন শূন্য হয়ে গেল তার। মনে হলো, কেউ যেন ভেতর থেকে তার হৃদয়টা মুঠো করে চেপে ধরেছে।
গুঞ্জন তাকে দূরে থাকতে বলেছে।
কিন্তু গুঞ্জন কি একবারও ভেবে দেখেছে তাকে ছাড়া প্রেম কীভাবে থাকবে?
মেয়েটা কেন তাকে বুঝতে চায় না?কেন এতটা নিষ্ঠুর?
প্রেমের চোখের সামনে গুঞ্জনের চলে যাওয়ার দৃশ্যটাই বারবার ভেসে উঠতে লাগল।
হঠাৎ পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সাজিয়ার ডাক কানে এলো,
প্রেম ভাইয়া।
কোনো সাড়া নেই।সাজিয়া এবার আরও কাছে এসে ডাকল,
এই প্রেম ভাইয়া
প্রেম যেন হঠাৎ ঘোর থেকে ফিরল। ধীরে ধীরে সাজিয়ার দিকে তাকাল।
সাজিয়া এক মুহূর্ত তার মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে প্রিয়ার বলা কথাগুলো একে একে সব খুলে বলল। কীভাবে মেঘা গুঞ্জনকে অপমান করেছে, কী কী তিক্ত কথা বলেছে কিছুই বাদ দিল না।
সব শুনে প্রেমের চোখের দৃষ্টি মুহূর্তেই বদলে গেল।
কয়েক সেকেন্ড আগেও যে চোখে ছিল কষ্ট, সেখানে এবার জ্বলে উঠল রক্তবর্ণ ক্রোধ।
চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। হাত দুটো মুষ্টিবদ্ধ করে ফেলল সে।
তারপর নিচু স্বরে দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড় করে বলল,
অনেক ছাড় দিয়েছি তোকে... আর নয়।
চলবে,,,,