#প্রেমের_ গুঞ্জন
#পর্ব_২০
#জান্নাত
প্রেম কাউকে কিছু বলল না,বুকের ভেতর জমে থাকা আগুনটা চোখেমুখে নিয়ে সে সোজা হাঁটা ধরল।
পেছন থেকে সৌরভ, শাওন আর শীলা বারবার ডাকতে লাগল
প্রেম! দাঁড়া!
প্রেম, কোথায় যাচ্ছিস?
একটু থাম!
কিন্তু প্রেম কারও কথাই শুনল না। ওরা একে অপরের মুখের দিকে তাকাল। প্রেমকে তারা রাগতে দেখেছে,কিন্তু আজকের মতো উন্মত্ত রাগ কখনো দেখেনি।
ওরা বুঝে গেছে এই মুহূর্তে প্রেমকে থামানোর ক্ষমতা কারও নেই।
প্রেম সোজা ক্লাসরুমে ঢুকে পড়ল।
ক্লাসের সবাই তখন নিজেদের মতো ব্যস্ত। প্রেম দরজায় দাঁড়িয়ে একবার পুরো ক্লাসের ওপর চোখ বুলিয়ে নিল।
তারপরই থমকে গেল তার দৃষ্টি।মেঘা।একটা মেয়ের সঙ্গে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হেসে কথা বলছে।
মুহূর্তেই প্রেমের চোখের রক্তিম আগুন যেন আরও দাউদাউ করে জ্বলে উঠল।
সে দ্রুত এগিয়ে গেল মেঘার দিকে।
কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই প্রেম মেঘার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। মেঘা অবাক হয়ে তাকানোর সঙ্গে সঙ্গেই
ঠাস!
একটা চড় গিয়ে পড়ল মেঘার গালে।
মেঘা কিছু বুঝে ওঠার আগেই দ্বিতীয় চড়টাও পড়ল।
চড়ের আঘাতে মেঘার ঠোঁটের কোণে কেটে সামান্য রক্ত বেরিয়ে এলো।
পুরো ক্লাস যেন মুহূর্তের জন্য নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
কারও মুখে কোনো কথা নেই।
মেঘা গালে হাত দিয়ে অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল প্রেমের দিকে।
কিন্তু প্রেমের চোখে তখন শুধু রাগ নয় ছিল কষ্ট, অপমান আর গুঞ্জনকে নিয়ে সীমাহীন ভালোবাসার তীব্রতা।
মেঘা কাঁপা গলায় কিছু বলতে যাচ্ছিল
প্রেম, তুমি
প্রেম হাত তুলে তাকে থামিয়ে দিল।
তার কণ্ঠস্বর কাঁপছিল, কিন্তু প্রতিটা শব্দ ছিল আগুনের মতো তীক্ষ্ণ।
তোর সাহস কী করে হয় গুঞ্জনকে এত নোংরা ভাষায় কথা বলার? একটা মেয়ে হয়ে আরেকটা মেয়েকে কীভাবে এতটা অপমান করতে পারলি তুই?
প্রেম এক পা এগিয়ে গেল।
তোর এই ন্যাকামো, তোর এসব কথা আমি এতদিন মুখ বুজে সহ্য করেছি। অনেকবার চেয়েছি তোকে কিছু বলি, কিন্তু বলিনি। ভেবেছি, সময় গেলে তুই নিজেই বুঝবি। কিন্তু আজ তুই সীমা পার করে দিয়েছিস।
তার চোখ দুটো আরও লাল হয়ে উঠল।
তুই শুধু গুঞ্জনকে অপমান করিসনি, তুই একটা মেয়ের সম্মানে আঘাত করেছিস। ওর নামে মিথ্যা অপবাদ দিয়েছিস। এমন একটা মেয়েকে কলঙ্কিত করার চেষ্টা করেছিস, যার কোনো দোষই নেই!
মেঘা চোখের পানি মুছে দাঁত চেপে বলল
আরে, যা করেছি বেশ করেছি! ও তোমার দিকে নজর দিয়েছে।আর তুমি এতোটা রেগে যাচ্ছো কেন?তুমি ওকে ভালোবাসো নাকী?
প্রেম হঠাৎ তীব্র হেসে উঠল। সেই হাসিতে কোনো আনন্দ ছিল না; ছিল অদ্ভুত এক যন্ত্রণা।
সে ঘুরে পুরো ক্লাসের দিকে তাকাল।তারপর গলা উঁচু করে বলল
হ্যাঁ! ভালোবাসি!
ক্লাসের সবাই চমকে তাকাল।
প্রেম বুকের ওপর হাত রেখে চিৎকার করে বলল
শুনতে পাচ্ছিস সবাই? আমি ভালোবাসি গুঞ্জনকে!
তার কণ্ঠে এবার আর রাগ নেই। আছে এমন এক ভালোবাসা, যেটা এতদিন বুকের ভেতর লুকিয়ে রেখেছিল সে।
আই লাভ গুঞ্জন।
কথাটা বলতেই তার চোখের কোণে জল চিকচিক করে উঠল।
হ্যাঁ, আমি ওকে ভালোবাসি। এমন ভালোবাসি, যেটা মুখে কয়েকটা শব্দে বোঝানো সম্ভব না। গুঞ্জন আমার কাছে শুধু একটা মেয়ে নয়। ও আমার শান্তি, আমার অস্থিরতা, আমার হাসি, আমার কান্না... আমার প্রতিটা অনুভূতির সঙ্গে ও মিশে আছে।
প্রেম কিছুক্ষণ থামল।
গলা ভারী হয়ে এলো।
তোমরা হয়তো ভাবো, ভালোবাসা মানে শুধু কাউকে পাওয়ার ইচ্ছা। কিন্তু আমার কাছে গুঞ্জনকে ভালোবাসা মানে ওর সম্মানকে নিজের সম্মানের মতো আগলে রাখা। ওর চোখে এক ফোঁটা পানি দেখলে আমার বুকটা কেন জানি ভার হয়ে আসে। ও কষ্ট পেলে আমার ভেতরটা ছটফট করে। আর কেউ ওকে অপমান করলে মনে হয়, সেই অপমানটা যেন আমার গায়েই এসে লাগে।
সে চোখ বন্ধ করে গভীর শ্বাস নিল।
গুঞ্জন আমার জীবনে কখন কীভাবে এসে এতটা জায়গা করে নিয়েছে, আমি নিজেও জানি না। শুধু জানি, ওকে ছাড়া আমার আগামী দিনের ছবিটা অসম্পূর্ণ লাগে। ওকে ছাড়া হাসতে পারব কি না জানি না, কিন্তু ওকে ছাড়া বাঁচার কথা ভাবলেই বুকের ভেতরটা ফাঁকা হয়ে যায়।
প্রেম এবার মেঘার দিকে তাকাল।
তুই গুঞ্জনকে অপবাদ দিয়েছিস। কিন্তু মনে রাখিস, কারও চরিত্র নিয়ে মিথ্যা কথা বলার আগে একবার ভাবা উচিত সেই কথাগুলো একটা মানুষের জীবনকে কতটা ভেঙে দিতে পারে।
তারপর ধীরে ধীরে বলল
গুঞ্জনকে আমি ভালোবাসি। আর এই ভালোবাসার জন্য যদি পুরো পৃথিবীর সামনে দাঁড়িয়ে বলতে হয়, তবুও বলব
গুঞ্জন আমার ভালোবাসা। গুঞ্জন আমার সবচেয়ে প্রিয় মানুষ। আর ওর সম্মানের বিরুদ্ধে একটা কথাও আমি আর সহ্য করব না।
ক্লাসরুমের নীরবতার মাঝে প্রেমের শেষ কথাগুলো যেন দীর্ঘক্ষণ প্রতিধ্বনিত হতে থাকল।
আর দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা সৌরভ, শাওন আর শীলা তিনজনই নির্বাক হয়ে তাকিয়ে রইল প্রেমের দিকে।
কারণ আজ প্রথমবার প্রেম শুধু নিজের রাগ প্রকাশ করেনি
নিজের ভালোবাসাটাও সবার সামনে স্বীকার করে নিয়েছে।
প্রেম এবার ধীরে ধীরে মেঘার দিকে তাকাল।
চোখ দুটো লাল হয়ে আছে। সেই চোখের কোণে জমে থাকা পানিগুলো যেন এতক্ষণ বুকের ভেতর আটকে রাখা সমস্ত কষ্টের সাক্ষ্য দিচ্ছে। ঠোঁট দুটো কাঁপছে, অথচ মুখে হাসি নেই আছে শুধু হারিয়ে ফেলার আতঙ্ক।
কয়েক মুহূর্ত মেঘার দিকে নির্বাক তাকিয়ে থেকে প্রেম করুণ কণ্ঠে বলে উঠল,
জানিস মেঘা... শুধু তোর জন্যই আমার গুঞ্জন আমাকে বলেছে ওর থেকে দূরে থাকতে।
কথাটা বলতে গিয়েই প্রেমের কণ্ঠটা ভেঙে গেল। সে চোখ নামিয়ে নিল, কিন্তু চোখের পানি আর আটকে রাখতে পারল না। একটা অশ্রুবিন্দু গড়িয়ে পড়ল গাল বেয়ে।
ঐ নিষ্ঠুর রমণীটা একবারও ভাবল না, ওর থেকে দূরে থাকা আমার পক্ষে কতটা অসম্ভব! একবারও ভাবল না, ওকে ছাড়া আমি কীভাবে নিঃশ্বাস নেব... কীভাবে একটা একটা মুহূর্ত পার করব?
প্রেম বুকের ওপর হাত রেখে যন্ত্রণায় চোখ বন্ধ করল।
ও তো আগে থেকেই আমার প্রতি কঠিন ছিল। আর এখন... এখন তোর জন্য ও আমার প্রতি আরও কঠিন হয়ে গেছে। আমি যতবার ওর কাছে যেতে চাই, ততবার ও আমাকে দূরে ঠেলে দেয়। যেন আমি ওর জীবনের সবচেয়ে বড় অপরাধ!
কণ্ঠটা ক্রমশ ভারী হয়ে আসছে।
বল তো মেঘা, আমি কী করলে আমার নিষ্ঠুর রমণীকে ফিরে পাব? কোথায় গেলে ওকে পাব? কার পায়ে পড়ে মিনতি করলে ও আমাকে আর একবার নিজের কাছে আসতে দেবে?
প্রেম মেঘার দিকে তাকিয়ে অসহায়ের মতো মাথা নাড়ল।
আমি তো ওর কাছে কোনো রাজত্ব চাই না... কোনো অধিকার চাই না... শুধু চাই ও আমার সামনে দাঁড়িয়ে একবার বলুক, ‘প্রেম, তুমি আমার।’
তার চোখ থেকে এবার অবিরত পানি ঝরতে লাগল।
আমি কী করে থাকব ওর থেকে দূরে? বল মেঘা, কী করে থাকব? প্রতিটা মুহূর্তে ওর মুখটা চোখের সামনে ভাসে। ওর কণ্ঠ শুনতে ইচ্ছে করে, ওর রাগ দেখতে ইচ্ছে করে, এমনকি ওর নিষ্ঠুর কথাগুলোও শুনতে ইচ্ছে করে। কারণ ওর রাগের মধ্যেও তো আমি আমার গুঞ্জনকে খুঁজে পাই।
প্রেম হঠাৎ বুকের কাছে মুঠো করে চেপে ধরল।
আমার বুকটা ভীষণ ব্যথা করছে রে... মনে হচ্ছে কেউ ভেতর থেকে আমার বুকটা ছিঁড়ে ফেলছে। আমি জানি না এই যন্ত্রণা আর কতদিন সহ্য করতে পারব।
কিছুক্ষণ থেমে কাঁপা কণ্ঠে বলল,
আমি পারব না মেঘা... সত্যিই পারব না। আমার তীব্রময়ীর থেকে দূরে থাকার মতো শক্তি আমার নেই। পৃথিবী আমাকে ওর থেকে হাজারবার দূরে সরিয়ে দিক, তবুও আমি বারবার ওর কাছেই ফিরে যাব।
প্রেম চোখ মুছে ফিসফিস করে বলল,
কারণ আমি ওকে শুধু ভালোবাসি না... আমি ওর মধ্যে বেঁচে আছি। ওকে হারানো মানে শুধু আমার ভালোবাসাকে হারানো নয়, মেঘা... ওকে হারানো মানে আমার নিজের একটা অংশকে চিরদিনের জন্য হারিয়ে ফেলা।
ক্লাসের সবাই স্তব্ধ, হতবিহ্বল হয়ে তাকিয়ে আছে প্রেমের দিকে।
যে ছেলেটাকে তারা এতদিন অহংকারী, রাগী আর অনুভূতিহীন বলে জানত, সেই ছেলেটাই যে কাউকে এভাবে গভীরভাবে ভালোবেসে ফেলতে পারে এটা যেন তাদের কল্পনারও বাইরে ছিল।
আজ তারা যেন প্রেমের ভেতরের এক সম্পূর্ণ অচেনা মানুষটাকে দেখছে।
ওর চোখে আজ কোনো অহংকার নেই, নেই রাগের সেই তীব্রতা। আছে শুধু হারিয়ে ফেলার ভয়। আছে ভালোবাসার মানুষটাকে নিজের করে পাওয়ার এক অসহায় আকুলতা। চোখের কোণে জমে থাকা পানির ফোঁটাগুলো যেন নিঃশব্দে বলে দিচ্ছে এই ছেলেটা সত্যিই ভালোবাসে। ভীষণভাবে ভালোবাসে।
ভালোবাসা বোধহয় এমনই।
এটা কোনো নিয়ম মেনে মানুষের জীবনে আসে না। দরজায় কড়া নাড়ে না, অনুমতি নেয় না। কখন, কীভাবে, কোন মুহূর্তে একজন মানুষের হৃদয়ের সবচেয়ে গভীর জায়গাটুকু দখল করে নেয় তা কেউ বুঝতেই পারে না।
সত্যিকারের ভালোবাসা যেন এক অদৃশ্য ছোঁয়াচে রোগ।
একবার যার হৃদয়ে ছড়িয়ে পড়ে, তাকে আর আগের মানুষটা হয়ে থাকা যায় না।
যে মানুষটা একদিন বলেছিল, ‘আমি কাউকে ভালোবাসি না,’
সেই মানুষটাই একদিন কারো একটুখানি অভিমানে অস্থির হয়ে ওঠে।
যে মানুষটা কারো চলে যাওয়াকে পাত্তাই দিত না,
সেই মানুষটাই প্রিয় মানুষটার একটুখানি দূরত্বে রাতের পর রাত নির্ঘুম কাটায়।
যে মানুষটা নিজের অনুভূতিকে শক্ত করে বুকের ভেতর আটকে রাখত,
সেই মানুষটাই একদিন ভালোবাসার মানুষটাকে হারানোর ভয়ে সবার সামনে ভেঙে পড়ে।
ভালোবাসা মানুষকে দুর্বল করে না, বরং নিজের ভেতরের সবচেয়ে সত্য মানুষটার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়।
ভালোবাসা মানে শুধু পাশাপাশি হাঁটা নয়।
ভালোবাসা মানে দূরে থেকেও কারো উপস্থিতি অনুভব করা।
ভালোবাসা মানে শুধু হাসির মুহূর্ত ভাগ করে নেওয়া নয়।
ভালোবাসা মানে প্রিয় মানুষটার চোখের একফোঁটা জল নিজের বুকের ভেতর হাজারগুণ বেশি ব্যথা হয়ে অনুভব করা।
ভালোবাসা মানে অধিকার নয়, অথচ হারানোর ভয় থাকে।
ভালোবাসা মানে কাছে পাওয়া নয়, তবুও দূরত্ব সহ্য হয় না।
ভালোবাসা মানে হাজার মানুষের ভিড়েও শুধু একজনকেই খুঁজে বেড়ানো।
আর সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপারটা হলো
যাকে একবার সত্যি ভালোবেসে ফেলা যায়, তাকে চাইলেও আর মন থেকে মুছে ফেলা যায় না।
মানুষটা পাশে থাকুক কিংবা দূরে চলে যাক,
কথা বলুক কিংবা অভিমান করে নীরব থাকুক,
ভালোবাসার মানুষটা সুখে থাকলেই যেন নিজের ভেতরটাও একটু শান্ত হয়।
প্রেমের চোখের দিকে তাকিয়ে ক্লাসের সবাই আজ বুঝতে পারল
ভালোবাসা আসলে মানুষকে বদলে দেয়।
অহংকারী প্রেম আজ একজন অসহায় প্রেমিক।
রাগী প্রেম আজ অপেক্ষায় থাকা এক ব্যাকুল হৃদয়।
আর যে প্রেম কখনো কারো সামনে মাথা নত করত না, সেই প্রেম আজ ভালোবাসার কাছে নিজের সমস্ত অহংকার বিসর্জন দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
হয়তো এটাই সত্যিকারের ভালোবাসা।
যেখানে ‘আমি’ শব্দটা ধীরে ধীরে হারিয়ে যায়,
আর তার জায়গা দখল করে শুধু একজন মানুষ
‘তুমি।’
আর সেই ‘তুমি’কে হারানোর ভয় যখন হৃদয়ের সমস্ত সাহস কেড়ে নেয়, তখন পৃথিবীর সবচেয়ে শক্ত মানুষটাও চোখের পানিতে ভেসে যায়।
প্রেমও আজ ঠিক তেমনই ভেসে যাচ্ছে
তার ভালোবাসার মানুষটাকে হারিয়ে ফেলার আশঙ্কায়।
চলবে,,