#প্রেমের _গুঞ্জন
#পর্ব_২২
#জান্নাত
ছেলের এমন বেহাল দশা দেখে প্রেমের মায়ের বুকটা ধক করে উঠল। কিছুক্ষণ আগেই ছেলের মুখে শোনা কথাটা বারবার কানে বাজছে
আমি ওকে হারাতে চাই না
তাহলে কি সত্যিই তার ছেলে কাউকে ভালোবাসে?
প্রেমকে এভাবে কখনো দেখেননি তিনি। রাগি গম্ভীর ছেলেটা আজ যেন এক মুহূর্তেই ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে।
তিনি ধীরে ধীরে প্রেমকে নিয়ে বিছানায় বসালেন। তারপর ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে আদুরে কণ্ঠে বললেন,
কী হয়েছে আমার বাবাটার? কেন এভাবে ভেঙে পড়েছিস? মাকে বলবি না বাবা? কী হয়েছে তোর?
মায়ের সেই মমতাভরা কণ্ঠটা যেন প্রেমের বুকের ভেতর জমে থাকা কষ্টের বাঁধটা ভেঙে দিল।
আর নিজেকে সামলে রাখতে পারল না সে।
হঠাৎ মাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল প্রেম। কান্নায় তার কণ্ঠ ভারী হয়ে এসেছে, বুকের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছে অসহায় আর্তনাদ।
মা… ও আমাকে ভালোবাসে না মা। ও বলেছে, ওর থেকে দূরে থাকতে। বলেছে, আমি যেন আর ওর কাছে না যাই।
কথাগুলো বলতে বলতে প্রেম আরও শক্ত করে মাকে আঁকড়ে ধরল।
কিন্তু মা… আমি কীভাবে ওর থেকে দূরে থাকব? আমি যে পারব না মা! ওকে ছাড়া আমি নিঃশ্বাস নিতে পারব না। দম বন্ধ হয়ে আসবে আমার। আমি মরে যাবো মা… সত্যিই মরে যাবো।
প্রেমের কান্না যেন ঘরের নীরবতাটুকুও কাঁপিয়ে দিল।
সে মায়ের কাঁধে মুখ লুকিয়ে আবারও কাঁদতে কাঁদতে বলল,
মা, তুমি ওকে আমার কাছে এনে দাও। প্লিজ মা… ওকে এনে দাও। আমি ওকে ছাড়া থাকতে পারব না। আমি ওকে হারাতে চাই না মা… একদমই না।
ছেলের এমন অসহায় আকুতি শুনে প্রেমের মা নির্বাক হয়ে গেলেন। ছেলের মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে তাঁর বুকটাও কেমন ভারী হয়ে উঠল।
আজ প্রথমবার তিনি বুঝতে পারলেন তাঁর ছেলে সত্যিই কাউকে ভালোবেসেছে।
আর সেই ভালোবাসার মানুষটাকে হারানোর ভয়েই তাঁর ছেলে এভাবে ভেঙে পড়েছে।
প্রেমের মা ছেলের চোখের পানি মুছে দিয়ে স্নেহভরা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন,
মেয়েটা কে বাবা?
প্রেম কিছুক্ষণ নীরব থেকে ভারী কণ্ঠে বলল,
গুঞ্জন... আমি গুঞ্জনকে খুব ভালোবাসি মা।
মুহূর্তেই মায়ের চোখে-মুখে আনন্দের ঝিলিক ফুটে উঠল। যে মেয়েটিকে তিনি নিজের পছন্দে ছেলের জন্য বেছে রেখেছিলেন, সেই মেয়েকেই তার ছেলে এতটা ভালোবাসে এটা ভাবতেই বুকটা আনন্দে ভরে গেল। কিন্তু পরক্ষণেই সেই আনন্দের মাঝে দুশ্চিন্তার ছায়া নেমে এলো।
তাহলে প্রেম এমন ভেঙে পড়েছে কেন? গুঞ্জনের সঙ্গে কি কিছু হয়েছে?
তিনি ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে নরম গলায় বললেন,
কী হয়েছে বাবা? তুমি এমন করছো কেন? মাকে সব খুলে বলো।
মায়ের স্নেহমাখা কণ্ঠে প্রেম আর নিজেকে সামলে রাখতে পারল না। চোখের পানি মুছতে মুছতে গুঞ্জনের সঙ্গে ঘটে যাওয়া প্রতিটি ঘটনা একে একে মাকে খুলে বলল।
সবটা মনোযোগ দিয়ে শুনে প্রেমের মা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটিয়ে বললেন,
ওহ্, এই কথা! এই জন্য আমার ছেলেটা কেঁদে-কেটে নিজের এমন হাল বানিয়ে ফেলেছে?
তিনি ছেলের গালে হাত রেখে আশ্বস্ত করার ভঙ্গিতে বললেন,
হয়তো গুঞ্জন রাগের মাথায় এসব বলেছে। দেখবে, সব ঠিক হয়ে যাবে। তুমি শুধু একটু ধৈর্য ধরো। আর গুঞ্জনের সঙ্গে আমি নিজেই কথা বলব।
প্রেম অসহায় চোখে মায়ের দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে বলল,
মা, ও আর আসবে না ইরিনকে পড়াতে...
কথাটা বলতেই তার কণ্ঠ আবার ভারী হয়ে গেল।
কিন্তু প্রেমের মা এবার দৃঢ় কণ্ঠে বললেন,
সেটা আমি দেখে নেব। তোমাকে এসব নিয়ে ভাবতে হবে না। আর একটা কথা মনে রেখো, গুঞ্জন তোমারই হবে। আমার ছেলের ভালোবাসা এভাবে হারিয়ে যেতে দেব না আমি।
মায়ের দৃঢ় কথাগুলো যেন প্রেমের অস্থির বুকটাকে একটু শান্ত করে দিল। এতক্ষণ ধরে যে বুকটা ভয়ে আর কষ্টে ভারী হয়ে ছিল, সেখানে যেন সামান্য আশার আলো জ্বলে উঠল।
মায়ের কথায় ভরসা রেখে প্রেম ধীরে ধীরে চোখের পানি মুছে নিল।
হয়তো সত্যিই সব ঠিক হয়ে যাবে..হয়তো গুঞ্জন তার কাছেই ফিরে আসবে।
_____
রাত তখন গভীর। চারপাশ নীরবতায় ডুবে আছে। দিনের সমস্ত কোলাহল থেমে গেছে, মানুষগুলোও যে যার ঘুমের রাজ্যে হারিয়ে গেছে। অথচ সেই নিস্তব্ধ রাতেই গুঞ্জনের হৃদয়টা কেমন অস্থির হয়ে উঠল।
ঘুম নয়, আজ তার প্রয়োজন তার রবের সান্নিধ্য।
ধীরে ধীরে বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ল গুঞ্জন। পা টিপে টিপে অযু করে নিল। ঠান্ডা পানির স্পর্শে যেন শরীরের ক্লান্তির পাশাপাশি মনের ভারটাও কিছুটা ধুয়ে গেল।
জায়নামাজটা বিছিয়ে দাঁড়িয়ে গেল সে।
এই সময়টাতে পৃথিবীর কেউ তাকে দেখছে না। কেউ জানে না তার মনের ভেতর কত কথা জমে আছে। কিন্তু একজন জানেন যিনি তার চোখের পানির ভাষাও বোঝেন, মুখে উচ্চারণ না করা কথাগুলোও জানেন।
তার রব।
অতি বিনয়ের সঙ্গে নামাজ আদায় করল গুঞ্জন। প্রতিটি সিজদায় যেন নিজেকে আরও একটু করে তাঁর কাছে সমর্পণ করে দিল।
নামাজ শেষে জায়নামাজেই বসে রইল কিছুক্ষণ। তারপর ধীরে ধীরে দুই হাত তুলে নিল আকাশের দিকে।
চোখের কোণে জমে থাকা পানিগুলো এবার আর আটকে রাখতে পারল না।
প্রথমেই নিজের ভুলগুলোর জন্য ক্ষমা চাইল। তারপর একে একে প্রিয় মানুষগুলোর কথা মনে করে তাদের জন্য দোয়া করল।
সবশেষে থেমে গেল সে।
মনের গভীরে যে কথাটা সবচেয়ে বেশি জায়গা নিয়ে আছে, সেটাই তো বলতে হবে আজ তার রবকে।
কাঁপা কণ্ঠে গুঞ্জন বলল,
ইয়া রব... সবই তো তোমার ইচ্ছে। তুমি আমার অন্তরের খবর আমার থেকেও ভালো জানো। আমি জানি না কোনটা আমার জন্য ভালো, কোনটা খারাপ। আমি শুধু জানি, তুমি যা করো, আমার ভালোর জন্যই করো।
কয়েক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল তার গাল বেয়ে।
ইয়া আল্লাহ, যদি উনার ভালোবাসা সত্যি হয়, যদি উনি আমার জন্য কল্যাণকর হন, তাহলে তুমি আমাদের ভাগ্যটা একসাথে লিখে দিও। আমাদের জন্য এই পথটা সহজ করে দিও। আর যদি উনি আমার জন্য অমঙ্গলজনক হন, যদি এই সম্পর্কের মধ্যে আমার জন্য কোনো ক্ষতি লুকিয়ে থাকে, তাহলে তুমি নিজ হাতেই আমাকে সেই পথ থেকে ফিরিয়ে দিও। আমার মনকে তুমি বুঝিয়ে দিও, আমার হৃদয়কে তুমি শক্ত করে দিও।
গুঞ্জন একটু থামল।
তারপর আরও নরম হয়ে এলো তার কণ্ঠ।
আর যদি সে আমার জন্য শুভ হয়, তাহলে আমার হৃদয়েও তার জন্য অনুভূতি জাগিয়ে দিও। এমন অনুভূতি দিও, যেটা তোমার সন্তুষ্টির পথে থাকবে। এমন ভালোবাসা দিও, যে ভালোবাসা আমাকে তোমার কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দেবে না; বরং তোমার আরও কাছে নিয়ে যাবে।
কথাগুলো বলতে বলতে গুঞ্জনের বুকটা ভারী হয়ে এল।
ইয়া রব, আমি মানুষকে সব কথা বলতে পারি না। সবাই আমার চোখের পানি বুঝবে না, সবাই আমার নীরবতার অর্থ বুঝবে না। কিন্তু তুমি তো বোঝো। আমার মুখ বন্ধ থাকলেও তুমি আমার হৃদয়ের প্রতিটি শব্দ শুনতে পাও। তাই আজ আমার সমস্ত কষ্ট, সমস্ত ভয়, সমস্ত আশা, সমস্ত চাওয়া তোমার কাছে রেখে দিলাম। তুমি আমার জন্য যা ভালো মনে করো, সেটাই দিও।
আরও কিছুক্ষণ মোনাজাত করল গুঞ্জন।
তারপর ধীরে ধীরে হাত নামিয়ে চোখ মুছে নিল।
জায়নামাজ থেকে উঠে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল সে।
চাঁদের মায়াবী আলোয় পুরো রুমটা আলোয় ভেসে আছে। বাইরে রাতের নিস্তব্ধতা, আর ভেতরে গুঞ্জনের মনে অদ্ভুত এক প্রশান্তি।
সমস্যাগুলো তো এখনও আছে।প্রশ্নগুলোর উত্তরও সে পায়নি।
কিন্তু তবুও মনটা হালকা লাগছে।
কারণ তার কষ্টগুলো এখন আর শুধু তার নিজের নয়। সে সেগুলো তার রবের কাছে দিয়ে এসেছে।
গুঞ্জন জানালার কাঁচে হাত রাখল।
মনে হলো, পৃথিবীতে এমন একজন আছেন, যার কাছে নিজের ভাঙাচোরা অবস্থায় যেতে কোনো লজ্জা নেই। যার কাছে কাঁদতে কোনো সংকোচ নেই। যার কাছে একই কথা বারবার বললেও তিনি বিরক্ত হন না।
তিনি মানুষ নন।তিনি তার রব।
আল্লাহর সঙ্গে বান্দার সম্পর্কটাই যে এমন এখানে দূরত্ব নেই। বান্দা যতবার ফিরে আসে, রবের দরজা ততবারই তার জন্য খোলা থাকে। বান্দা ভুল করে দূরে সরে গেলেও তওবার দরজা বন্ধ হয় না। মানুষ মুখ ফিরিয়ে নিলেও আল্লাহ মুখ ফিরিয়ে নেন না।
গুঞ্জনের চোখ আবার ভিজে উঠল।
সত্যিই তো
যখন বুকের ভেতরটা ভেঙে যায়, অথচ কাউকে কিছু বলা যায় না, তখন নির্জনে সিজদায় পড়ে যাওয়া যায়।
যখন সবাই ঘুমিয়ে থাকে, তখন নিঃশব্দ রাতের অন্ধকারে রবকে ডাকা যায়।
যখন চোখের পানি লুকানোর মতো কেউ থাকে না, তখন সেই পানিগুলো আল্লাহর কাছে ফেলে দেওয়া যায়।
তাঁর কাছে নিজের কষ্ট বলতে কোনো সুন্দর ভাষার প্রয়োজন হয় না। সাজানো কথা লাগে না। শুধু একটি সত্যিকারের হৃদয়ই যথেষ্ট।
কারণ তিনি তো অন্তরের খবর জানেন।
বান্দা যখন বলে, ‘ইয়া রব, আমি পারছি না’ তখনও তিনি জানেন তার সামর্থ্য কতটুকু।
বান্দা যখন বলে, ‘ইয়া আল্লাহ, আমাকে সাহায্য করুন’ তখনও তিনি জানেন সাহায্যটা কোন পথে পাঠাতে হবে।
আর বান্দা যখন চোখের পানি ফেলে শুধু বলে, ‘তুমি আমার জন্য যথেষ্ট তখন সেই নির্ভরতাই হয়ে ওঠে ঈমানের সবচেয়ে সুন্দর আশ্রয়।
গুঞ্জন ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করল।
তার ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ এক প্রশান্তির হাসি ফুটে উঠল।
আজ তার সব সমস্যার সমাধান হয়নি।
কিন্তু তার রবের ওপর ভরসাটা আরও একটু বেড়েছে।
আর কখনো কখনো, সমস্যার সমাধানের চেয়েও বড় প্রাপ্তি হয় এই বিশ্বাসটা ফিরে পাওয়া যে,
আমি একা নই। আমার রব আমার সঙ্গে আছেন।’
সেই বিশ্বাস নিয়েই গুঞ্জন আবার বিছানায় ফিরে গেল।
বাইরে চাঁদ তখনও জ্বলছে।
আর তার হৃদয়ের আকাশেও যেন ধীরে ধীরে প্রশান্তির আলো ফুটে উঠছে।
চলবে,,,,,