#প্রেমের _গুঞ্জন
#পর্ব_২৩
#জান্নাত
পরদিন সকালে গুঞ্জন আর সাজিয়া একসাথেই ভার্সিটির উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ে। প্রতিদিনের মতো আজও চারপাশে শিক্ষার্থীদের ব্যস্ততা, হাসি-আড্ডায় মুখরিত ক্যাম্পাস। অথচ আজকের দিনটা যেন গুঞ্জনের কাছে একটু অন্যরকম।
অদ্ভুতভাবে, আজ কেউ তাকে কিছু বলছে না। গতকালের মতো কোনো ফিসফাস কিছুই নেই।
গুঞ্জনও আর কিছু না ভেবে চুপচাপ ক্লাসরুমের দিকে এগিয়ে যায়।
কিন্তু তার চোখ দুটো অজান্তেই কাউকে খুঁজতে থাকে।
প্রেমকে।
অন্যদিন হলে এতক্ষণে প্রেম এসে ঠিক তার সামনে দাঁড়িয়ে যেত। কখনো মুচকি হেসে তাকিয়ে থাকত, কখনো দু-একটা কথা বলে গুঞ্জনকে অস্বস্তিতে ফেলত। কিন্তু আজ?
আজ প্রেম কোথাও নেই।গুঞ্জন একবার চারপাশে তাকাল। তারপরও প্রেমের দেখা মিলল না।
অজান্তেই বুকের ভেতর থেকে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস বেরিয়ে এলো।
ভালোই হয়েছে... আজ অন্তত শান্তিতে থাকা যাবে।
নিজেকেই যেন কথাটা বোঝাল গুঞ্জন।
কিন্তু কয়েক মুহূর্ত পরই সেই স্বস্তির আড়ালে অন্য এক অনুভূতি এসে উঁকি দিল।
প্রেম কোথায়?কেন আসেনি?কিছু হয়েছে নাকি?
মুহূর্তেই গুঞ্জনের ভ্রু কুঁচকে গেল। নিজের ভাবনাতেই সে বিরক্ত হয়ে উঠল।
সে তো প্রেমকে এড়িয়ে চলতে চায়। তাহলে আজ তাকে দেখতে না পেয়ে বুকের ভেতরটা এমন ফাঁকা ফাঁকা লাগছে কেন?
কেন বারবার চোখ দুটো দরজার দিকে চলে যাচ্ছে?
গুঞ্জন নিজেই নিজের প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেল না।
তবে একটা সত্য ধীরে ধীরে তার অজান্তেই স্পষ্ট হয়ে উঠছিল
সে না চাইতেও প্রেমের মাঝে কোথাও একটা আটকে যাচ্ছে।
ভাবনাটা মাথায় আসতেই গুঞ্জন আঁতকে উঠল।
না!
এটা হতে দেওয়া যাবে না।
পরক্ষণেই অতীতের সেই তিক্ত স্মৃতিগুলো একে একে চোখের সামনে ভেসে উঠল। পুরোনো কষ্ট, ভেঙে যাওয়া বিশ্বাস আর সেই দিনের কথা মনে পড়তেই গুঞ্জনের চোখের দৃষ্টি কঠিন হয়ে গেল।
নিজেকেই মনে মনে শাসিয়ে বলল
নিজেকে সামলাও গুঞ্জন। আবার কোনো মায়ায় জড়িয়ে পড়বে না। অতীত ভুলে গেছো নাকি?’
চোখ নামিয়ে নিল সে।
কিন্তু হৃদয় কি আর এত সহজে মস্তিষ্কের শাসন মানে?
মনের গহীনে তখনও একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল
প্রেম আজ কোথায়?
_________
ক্লাস শেষ হতেই গুঞ্জন ধীর পায়ে ক্লাসরুম থেকে বেরিয়ে এলো। বের হওয়ার পরও অজান্তেই চারপাশে চোখ বুলিয়ে নিল সে। কিন্তু কোথাও প্রেমকে দেখা গেল না।
গুঞ্জনের ভ্রুযুগল কুঁচকে গেল।তাহলে কি প্রেম আজ ভার্সিটিতেই আসেনি?
অদ্ভুত একটা অনুভূতি হলো তার মনে। প্রতিদিনই তো প্রেম কোনো না কোনোভাবে তার সামনে এসে দাঁড়ায়। কখনো কথা বলার অজুহাতে, কখনো নিছক বিরক্ত করার জন্য। অথচ আজ ছেলেটার কোনো দেখাই নেই!
গুঞ্জন নিজের মনেই বিড়বিড় করে উঠল,
আজ হলোটা কী?
ঠিক তখনই তার হাতে থাকা ফোনটা বেজে উঠল।
স্ক্রিনে ভেসে উঠল নৌরিন আপু।
গুঞ্জন দ্রুত ফোনটা রিসিভ করে কানে ধরল।
আসসালামু আলাইকুম আপু।
ওপাশ থেকে সালামের উত্তর দিয়ে নৌরিন একটু ব্যস্ত ও উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলল,
গুঞ্জন, তুমি ইরিনকে পড়াতে আসছো না কেন?
গুঞ্জন কিছুটা অবাক হয়ে বলল,
কেন আপু? কী হয়েছে?
নৌরিনের কণ্ঠে এবার মায়া মেশানো অভিযোগ।
দেখো না, আমার মেয়েটা কাল থেকে শুধু তোমার জন্য কান্নাকাটি করছে। সারাক্ষণ একটাই কথা
আমার মিষ্টিকে চাই, মিষ্টিকে এনে দাও।তোমাকে ছাড়া কিছুতেই শান্ত হচ্ছে না। কাল থেকে ঠিকমতো কিছু খাওয়াতেও পারছি না। প্লিজ গুঞ্জন, তুমি একটু আসো না।
কথাগুলো শুনে গুঞ্জনের বুকের ভেতরটা কেমন নরম হয়ে গেল।
ইরিনের মুখটা চোখের সামনে ভেসে উঠল। ছোট্ট মেয়েটার মায়াভরা মুখ আর তাকে জড়িয়ে ধরে মিষ্টি বলে ডাকার কথা মনে পড়তেই গুঞ্জনের মুখে অজান্তেই মায়াবী হাসি ফুটে উঠল।
ইরিনের অনুরোধ সে কীভাবে আর ফেলতে পারে?
কিছুক্ষণ নীরব থেকে গুঞ্জন মৃদু কণ্ঠে বলল,
ঠিক আছে আপু। আমি আসছি।
ওপাশ থেকে যেন স্বস্তির নিঃশ্বাস শোনা গেল।
সত্যি আসবে তো ।
গুঞ্জন হেসে বলল,
হ্যাঁ আপু, সত্যিই আসছি। ইরিনকে আর কাঁদতে হবে না।
ওকে তাড়াতাড়ি এসো।
জি আপু।
ফোনটা কেটে দিল গুঞ্জন।
গুঞ্জন সাজিয়ার দিকে তাকিয়ে ধীর কণ্ঠে বলল,
তুই চলে যা। আমাকে ইরিনের কাছে যেতে হবে।
সাজিয়া এতক্ষণ নৌরিনের বলা কথাগুলো নীরবে শুনছিল। তাই আর কোনো প্রশ্ন করল না। শুধু মাথা নেড়ে সম্মতি জানিয়ে বলল,
আচ্ছা। সাবধানে যাস।
গুঞ্জনও মৃদু হেসে মাথা নাড়ল। তারপর সাজিয়াকে বিদায় জানিয়ে দ্রুত পা বাড়াল প্রেমদের বাড়ির উদ্দেশ্যে।
কিছুক্ষণ পর গুঞ্জন গিয়ে দাঁড়াল প্রেমদের বাড়ির দরজার সামনে। একবার গভীর শ্বাস নিয়ে হাত বাড়িয়ে কলিংবেল চাপল।
ভেতর থেকে কিছুক্ষণের মধ্যেই পায়ের শব্দ ভেসে এলো। তারপর দরজা খুলতেই সামনে দাঁড়িয়ে থাকা প্রেমের মাকে দেখে গুঞ্জনের ঠোঁটের কোণে মিষ্টি হাসি ফুটে উঠল।
সে বিনয়ের সঙ্গে সালাম দিয়ে বলল,
আসসালামু আলাইকুম, আন্টি।
প্রেমের মা-ও হাসিমুখে সালামের উত্তর দিলেন। তারপর গুঞ্জনের দিকে মায়াভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন,
তুমি এসেছো মা? যাও, রুমে যাও। ইরিন তোমার জন্য কেঁদে কুটে একাকার হয়ে যাচ্ছে। কতক্ষণ ধরে শুধু তোমার কথাই বলছে!
কথাটা শুনে গুঞ্জনের মুখের হাসি মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল। বুকের ভেতরটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল।
ইরিন...
অস্থির কণ্ঠে নামটা উচ্চারণ করেই গুঞ্জন দ্রুত ভেতরে এগিয়ে গেল।
দরজা পেরিয়ে কয়েক পা এগোতেই হঠাৎ ভেতর থেকে ছুটে এলো ইরিন। গুঞ্জনকে দেখামাত্রই আর এক মুহূর্ত দেরি না করে তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।
গুঞ্জনও সঙ্গে সঙ্গে ইরিনকে নিজের বুকে আগলে নিল।
ইরিনের চোখ বেয়ে তখন অবিরাম পানি গড়িয়ে পড়ছে। কান্নায় কণ্ঠ ভারী হয়ে গেছে। বুকের ভেতর জমে থাকা অভিমান যেন এতক্ষণে বাঁধ ভেঙে বেরিয়ে এলো।
কাঁদতে কাঁদতেই ইরিন অভিযোগের সুরে বলল,
তুমি আসলেনা কেন? কতক্ষণ ধরে তোমার জন্য অপেক্ষা করেছি!
গুঞ্জনের বুকটা কেঁপে উঠল। ইরিনের মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিয়ে সে মায়াভরা কণ্ঠে বলল,
কেঁদো না ইরিন পাখি। আমি তো চলে এসেছি।
কিন্তু ইরিন যেন আজ কিছুতেই শান্ত হতে রাজি নয়। গুঞ্জনকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে সে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল।
আর গুঞ্জন নীরবে তার পিঠে হাত বুলিয়ে যেতে লাগল। ইরিনের চোখের প্রতিটি অশ্রু যেন তার নিজের বুকেও কাঁটার মতো বিঁধছিল।
_______
বেশ কিছুক্ষণ সময় কেটে যাওয়ার পর গুঞ্জন ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। মনে হলো, এবার তার চলে যাওয়া উচিত।
কিন্তু সে কথাটা মুখে আনতেই ইরিন সঙ্গে সঙ্গে মাথা নেড়ে বলল,
না না, তুমি এখন কোথাও যাবে না। আজকে থেকে যাও।
গুঞ্জন কিছুটা ইতস্তত করে বলল,
না ইরিন, আজকে যাই। অনেক রাত হয়ে যাচ্ছে।
পাশ থেকে নৌরিনও এগিয়ে এসে গুঞ্জনের হাতটা আলতো করে ধরে মায়াভরা কণ্ঠে বলল,
আজ তুমি থেকে যাও, প্লিজ। কোনো সমস্যা হবে না তোমার। এত রাতে একা একা যাওয়াটাও ঠিক হবে না।
গুঞ্জন এবারও রাজি হতে চাইলো না। কিন্তু ইরিনের অনুরোধের পাশাপাশি প্রেমের মাও যখন তাকে থেকে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করলেন, তখন আর না করতে পারল না।
অগত্যা মৃদু হেসে মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল গুঞ্জন।
আচ্ছা, থাকব।
সঙ্গে সঙ্গে ইরিনের মুখটা আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
নৌরিনও যেন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। কিছুক্ষণ পর সে নিজের ঘর থেকে একটি সুন্দর শাড়ি এনে গুঞ্জনের হাতে ধরিয়ে দিল।
এই নাও। যাও, ফ্রেশ হয়ে নাও। তারপর এটা পরে নিও।
হঠাৎ শাড়িটা হাতে পেয়ে গুঞ্জন কিছুটা অস্বস্তিতে পড়ে গেল। সে শাড়িটার দিকে তাকিয়ে আবার নৌরিনের দিকে তাকাল।
তার মুখের সেই সংকোচ চোখ এড়াল না নৌরিনের। মুচকি হেসে সে বলল,
এভাবে তাকাচ্ছ কেন? আমার বোনটাকে ভালোবেসে দিলাম। প্লিজ, নাও।
কথাটার মধ্যে এমন এক আন্তরিকতা ছিল যে গুঞ্জনের আর কিছু বলার রইল না।
সে নীরবে শাড়িটা হাতে নিয়ে মৃদু হেসে বলল,
ধন্যবাদ।
তারপর ধীর পায়ে ওয়াশরুমের দিকে চলে গেল।
হাঁটতে হাঁটতেই গুঞ্জন অনুভব করল, শরীরটা কেমন যেন ভারী লাগছে। সারাদিনের ক্লান্তিতে শরীরটা অবসন্ন হয়ে আছে। একটা গোসল করলে হয়তো বেশ ভালো লাগত।
কথাটা নৌরিনকে বলতে চেয়েছিল সে। কিন্তু অকারণ এক জড়তা এসে কণ্ঠটা আটকে দিল।
তাই আর কিছু না বলে শাড়িটা বুকে জড়িয়ে নিয়ে ওয়াশরুমের দরজা বন্ধ করে দিল গুঞ্জন।
_________
রাত প্রায় বারোটা।
পুরো বাড়িটা নিস্তব্ধ হয়ে আছে। চারপাশে কেবল নীরবতার রাজত্ব। সবাই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, অথচ গুঞ্জনের চোখে যেন ঘুমের কোনো ছোঁয়াই নেই।
এপাশ-ওপাশ করেও যখন ঘুম এলো না, অবশেষে ইরিনের পাশ থেকে ধীরে ধীরে উঠে বসলো গুঞ্জন। ইরিনের ঘুমের কোনো ব্যাঘাত না ঘটিয়ে নিঃশব্দে রুমের বাইরে বেরিয়ে এলো।
করিডোর ধরে হাঁটতে লাগলো সে। অন্ধকারে নিজের পায়ের শব্দটুকুও যেন কানে বেশ জোরে বাজছে।
হঠাৎ কলিং বেলের শব্দে গুঞ্জন থমকে দাঁড়ালো।
এতো রাতে কে এলো?
ভয়ে বুকের ভেতরটা কেমন ধক করে উঠলো তার। ইতিমধ্যেই তো বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। তাহলে এই রাতে কে এলো? প্রেম নয়তো,সে আসছে থেকে প্রেম কে দেখেনি।
গুঞ্জন স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো কয়েক মুহূর্ত।
আবারও কলিং বেল টা বেজে উঠলো।
এবার গুঞ্জনের বুকের ধুকপুকানি যেন আরও বেড়ে গেল।
ধীরে ধীরে নিজেকে সামলে দরজার দিকে এগিয়ে গেল সে। প্রতিটি পদক্ষেপে অজানা এক শঙ্কা তাকে ঘিরে ধরছে।
দরজার কাছে পৌঁছে কিছুক্ষণ ইতস্তত করলো গুঞ্জন। তারপর কাঁপা হাতে ছিটকিনি খুলে দরজাটা মেলে ধরতেই
সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটাকে দেখে মুহূর্তেই পাথরের মতো স্থির হয়ে গেল সে।
অন্যদিকে, দরজার অপাশে গুঞ্জনকে নিজের সামনে দেখতে পেয়ে প্রেমও থমকে গেল।
চলবে,,,,,