প্রেমের_ গুঞ্জন
#পর্ব_২৪
#জান্নাত
প্রেম একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার তীব্রময়ীর দিকে। যেন চোখ ফেরানোর কথা তার মনেই নেই। কত মায়া মিশিয়ে রেখেছে মেয়েটা নিজের মাঝে তা শব্দে প্রকাশ করা বোধহয় অসম্ভব।
স্নিগ্ধ, কোমল মুখশ্রীতে অদ্ভুত এক শান্তি। শ্যামলা বর্ণের সেই মুখটায় যেন বিকেলের নরম রোদের মতো মায়া লেগে আছে। আর তার চোখ দুটো...
প্রেমের দৃষ্টি থেমে আছে ঠিক সেই চোখ দুটির মাঝেই।
চোখগুলো বড় নয়, তবুও কী গভীর! কালো মণির চারপাশে যেন একরাশ নীরব গল্প জমে আছে। সেই চোখে তাকালে মনে হয়, মেয়েটা কিছু না বলেও কত কথা বলে ফেলছে। কখনো সেখানে শিশিরভেজা সকালের কোমলতা, কখনো অভিমানী মেঘের ছায়া, আবার কখনো অজানা এক টানের গভীরতা।
চোখের পাতায় মায়াবী ছায়া পড়তেই প্রেমের বুকের ভেতরটা কেমন যেন থমকে যায়। এ কেমন চোখ! যেখানে একবার দৃষ্টি আটকে গেলে ফিরে আসতে ইচ্ছে করে না।
কে বলেছে সুন্দরী হতে হলে ফর্সা হতে হয়?
সৌন্দর্য কি কেবল ত্বকের রঙে আটকে থাকে?
প্রেমের চোখে তো তীব্রময়ীর শ্যামলা মুখটাই পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য। তার রঙে মাটির স্নিগ্ধতা, মুখে মায়া, আর চোখে এমন এক নেশা যার কাছে ফর্সা-কালোর সমস্ত হিসাবই অর্থহীন।
প্রেম নিঃশব্দে তাকিয়ে থেকে মনে মনে বলল
তোমাকে সুন্দর বললে কম বলা হবে, তীব্রময়ী। তুমি সুন্দর নও... তুমি মায়াবতী। তোমার চোখ দুটোই যেন আমার সমস্ত অহংকার ভেঙে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।’
আর তীব্রময়ী?
সে কি বুঝতে পারেনা
তার সেই নিরীহ চোখ দুটোতেই একজন মানুষ ধীরে ধীরে নিজের হৃদয়টা হারিয়ে ফেলেছে।
__
গুঞ্জনও চুপচাপ প্রেমের দিকে তাকিয়ে রইলো। প্রেম কে দেখেই বোঝা যাচ্ছে, ছেলেটা ভীষণ ক্লান্ত। দীর্ঘ জার্নি করে এসেছে বোধহয় চোখেমুখে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট। তবুও আজ কেন যেন প্রেমকে বেশ খুশি খুশি লাগছে।
গুঞ্জন আর কিছু না বলে নিঃশব্দে সরে এলো।
প্রেম ভেতরে এসে ধপ করে সোফায় বসে পড়ল। তারপর মাথাটা সোফার পেছনে এলিয়ে দিয়ে চোখ বন্ধ করল কিছুক্ষণের জন্য। মনে হচ্ছে, শরীরটা ক্লান্ত হলেও মনটা আজ বেশ ফুরফুরে।
কিছুক্ষণ পর গুঞ্জন এক গ্লাস পানি এনে চুপচাপ প্রেমের সামনে ধরল।
প্রেম চোখ মেলে তাকাল।
সামনে দাঁড়িয়ে থাকা গুঞ্জনকে দেখে তার ঠোঁটের কোণে আপনাআপনি এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল।
আজ গুঞ্জনকে কেমন যেন বউ বউ লাগছে!
প্রেম কোনো কথা না বলে মুচকি হেসে গ্লাসটা গুঞ্জনের হাত থেকে নিয়ে নিল। তারপর এক নিঃশ্বাসে ঢকঢক করে পুরো গ্লাস পানি শেষ করে ফেলল।
খালি গ্লাসটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল গুঞ্জন। কী বলবে, কিছুই বুঝতে পারছে না সে।
অথচ তার মনের ভেতর একটা প্রশ্ন বারবার ঘুরপাক খাচ্ছে
প্রেম তাকে একবারও জিজ্ঞেস করল না, সে এখানে কেন?
এতক্ষণ ধরে তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে, অথচ প্রেমের যেন কোনো কৌতূহলই নেই!
বিষয়টা গুঞ্জনের কাছে বেশ আশ্চর্য লাগল।
হঠাৎ প্রেম নরম স্বরে বলে উঠল,
গুঞ্জন, তোমার কাছে আজ একটু সময় চাই। দিবে আমায়?
কথাটা শুনে গুঞ্জন যেন আচমকাই চমকে উঠল। বিস্মিত চোখে তাকাল প্রেমের দিকে। তার কণ্ঠে আজ অন্যরকম এক আকুতি যেন খুব আপন করে কিছু চাইছে।
গুঞ্জনের চোখেমুখে ভয়ের ছাপ দেখে প্রেম মৃদু হেসে বলল,
তোমায় কিছু করব না। ভয় পাওয়ারও কিছু নেই। শুধু... এই রাতের আকাশটা, এই জোছনাটা তোমার সঙ্গে একটু ভাগ করে নিতে চাই। প্লিজ, গুঞ্জন।
শেষ কথাটুকুতে প্রেমের কণ্ঠটা কেমন নরম হয়ে গেল।
গুঞ্জন কিছুক্ষণ নিশ্চুপ হয়ে রইল। তারপর মনে মনে ভাবল,
এই তো সুযোগ। প্রেমকে আমার অতীতের কথা জানাতেই হবে। সে তো আমার অতীতের কিছুই জানে না। অথচ সেই না-জানা সত্যের আড়ালেই আমাকে নিয়ে এতটা পাগলামি করছে। যদি একদিন সবকিছু জেনে যায়? তখন তো হয়তো এই ভালোবাসাটুকুও থাকবে না।
গুঞ্জন ধীরে ধীরে চোখ নামিয়ে নিল।
না, আর লুকিয়ে রাখা ঠিক হবে না। আজই তাকে সবটা জানিয়ে দেব। তারপর সিদ্ধান্ত তার।
কিছুক্ষণ পর গুঞ্জন শান্ত গলায় বলল,
ঠিক আছে।
এক মুহূর্তের জন্য প্রেম যেন বিশ্বাসই করতে পারল না। পরক্ষণেই তার মুখটা আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
সত্যি?
গুঞ্জন মৃদু মাথা নাড়ল।
প্রেমের ঠোঁটে প্রশান্তির হাসি ফুটে উঠল। সে দ্রুত বলল,
তাহলে তুমি এখানে দাঁড়াও। আমি দশ মিনিটের মধ্যে ফ্রেশ হয়ে আসছি।
কথাটা বলেই প্রেম প্রায় ছুটে নিজের ঘরের দিকে চলে গেল।
আর গুঞ্জন?
সে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
চোখের সামনে তখনও ভাসছে প্রেমের হাসিমাখা মুখটা।
কিন্তু তার বুকের ভেতর?সেখানে যেন আসন্ন এক ঝড়ের পূর্বাভাস...
আজকের এই জোছনা রাত কি তাদের দুজনকে আরও কাছে আনবে, নাকি গুঞ্জনের অতীত এসে ভেঙে দেবে প্রেমের সাজানো স্বপ্ন?
______
ছাদের নীরব আকাশজুড়ে তখন পূর্ণিমার মায়াবী আলো। চারপাশের নীরবতাকে আরও গভীর করে তুলেছে রাতের মৃদু বাতাস। সেই জোছনায় পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে দুজন প্রেম আর গুঞ্জন।
চাঁদের রুপালি আলো এসে ছুঁয়ে যাচ্ছে দুজনের মুখ। প্রেম একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার তীব্রময়ীর দিকে। যেন এই মুহূর্তে পৃথিবীর আর কোনো দৃশ্যই তার চোখে ধরা পড়ছে না।
অথচ গুঞ্জনের দৃষ্টি আটকে আছে আকাশের চাঁদে।
কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর হঠাৎ গুঞ্জন মৃদু স্বরে বলে উঠল,
আমি আপনাকে আমার অতীত সম্পর্কে জানাতে চাই, প্রেম।
কথাটা বলেই সে প্রেমের দিকে তাকাল।আর ঠিক তখনই দুজনের চোখে চোখ পড়ল।
প্রেম আগে থেকেই তাকিয়ে ছিল তার দিকে। গুঞ্জনের চোখের গভীরে নিজের দৃষ্টি আটকে রেখে সে নিঃশব্দে তাকিয়ে রইল। কোনো প্রশ্ন করল না, কোনো উত্তরও দিল না।
গুঞ্জন অস্বস্তিতে চোখ সরিয়ে নিল। আবারও তাকাল আকাশের চাঁদের দিকে। তারপর ধীরে ধীরে তার অতীতের গল্প বলতে শুরু করল।
একটা একটা করে খুলে দিল নিজের জীবনের পুরোনো অধ্যায়গুলো। কিছু কথা ছিল কষ্টের, কিছু ছিল অভিমানের, কিছু স্মৃতি ছিল এতটাই ভারী যে উচ্চারণ করতেও তার কণ্ঠ কেঁপে উঠছিল।
প্রেম নীরবে শুনে গেল।অন্তত গুঞ্জনের তাই মনে হলো।
দীর্ঘ সময় পর নিজের কথাগুলো শেষ করে গুঞ্জন ধীরে ধীরে মুখ ঘুরিয়ে প্রেমের দিকে তাকাল।
কিন্তু প্রেমের মাঝে বিন্দুমাত্র অস্থিরতা নেই।
কোনো বিস্ময় নেই। কোনো প্রশ্ন নেই। এমনকি তার চোখেমুখেও এমন কোনো ছাপ নেই, যাতে বোঝা যায় এতক্ষণ সে গুঞ্জনের বলা কথাগুলো শুনেছে।
বরং সে আগের মতোই মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে গুঞ্জনের দিকে।
যেন গুঞ্জনের অতীত নয়, তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এই মানুষটাকেই দেখতেই ব্যস্ত সে।
গুঞ্জন কিছুক্ষণ অবাক হয়ে প্রেমের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ভ্রু কুঁচকে হালকা গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,
কিছু বলছেন না কেন, প্রেম?
প্রেম যেন তখনই বাস্তবে ফিরল।
ঠোঁটের কোণে অতি ক্ষীণ এক হাসি ফুটিয়ে সে গুঞ্জনের চোখের দিকে তাকিয়ে রইল।
আর সেই দৃষ্টিতে ছিল এমন এক নিশ্চয়তা, যা গুঞ্জনের বলা হাজারো অতীতের গল্পকেও যেন মুহূর্তেই তুচ্ছ করে দিতে পারে।
প্রেম কোনো উত্তর না দেওয়ায় গুঞ্জন ধীরে ধীরে সেখান থেকে চলে যেতে উদ্যত হলো। কিন্তু এক পা এগোতেই হঠাৎ প্রেম তার হাতটা শক্ত করে ধরে ফেলল।
গুঞ্জন থমকে দাঁড়াল।
প্রেম ধীরে ধীরে তার দিকে ফিরে তাকাল। দুজনের চোখে চোখ পড়তেই গুঞ্জনের বুকের ভেতরটা কেমন যেন কেঁপে উঠল। প্রেমের চোখে আজ কোনো প্রশ্ন নেই, নেই বিস্ময় কিংবা দ্বিধা আছে শুধু গভীর মায়া আর অটুট ভালোবাসা।
কিছুক্ষণ নীরবে গুঞ্জনের চোখের দিকে তাকিয়ে থেকে প্রেম নরম কণ্ঠে বলল,
আমি সব জানি, গুঞ্জন।
গুঞ্জন প্রথম থমকে যায় পরক্ষনেই গুঞ্জনের চোখ দুটো মুহূর্তেই ছলছল করে উঠল। সে কিছু বলতে চাইল, কিন্তু প্রেম তাকে থামিয়ে দিয়ে আরও মায়াভরা স্বরে বলল,
একটা কথা মনে রেখো, আমি তোমাকে কখনো ছাড়ব না। কখনো না।
গুঞ্জন নিঃশব্দে তাকিয়ে রইল তার দিকে।
তুমি যদি ভেবে থাকো, তোমার অতীতের কথা জানার পর আমি তোমাকে ছেড়ে চলে যাব, তোমাকে ভুলে যাব... তাহলে তুমি ভীষণ ভুল ভেবেছো, গুঞ্জন।
প্রেমের আঙুলগুলো তখনও শক্ত করে আঁকড়ে ছিল গুঞ্জনের হাত।
আমি তোমার অতীতকে ভালোবাসিনি, গুঞ্জন। আমি ভালোবেসেছি তোমাকে। তোমার হাসি, তোমার চোখের মায়া, তোমার সরলতাকে... ভালোবেসেছি এই মানুষটাকে, যে আজ আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
একটু থেমে প্রেম গুঞ্জনের চোখের জল মুছে দিয়ে বলল,
আর যে অতীতের জন্য তোমার কোনো দোষই ছিল না, সেই অতীতের বোঝা তোমার বর্তমানকে বইতে দেব কেন? কিছু মানুষের অন্যায়ের শাস্তি তুমি কেন পাবে?
গুঞ্জনের চোখ বেয়ে এবার নিঃশব্দে দু'ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল।
প্রেম মৃদু হেসে তার হাতটা আরও শক্ত করে ধরে বলল,
তোমার অতীত তোমার পরিচয় নয়, গুঞ্জন। তুমি আমার কাছে আজও সেই মানুষটাই, যাকে আমি ভালোবেসেছি। তাই তোমাকে হারানোর কথা ভাবতেও পারি না। তুমি যতবার ভেঙে পড়বে, আমি ততবার তোমাকে আগলে নেব। আর যতদিন আমার ভালোবাসা তোমার পাশে থাকবে, ততদিন তোমার অতীত তোমাকে ছুঁতেও পারবে না।
তাদের কথোপকথনের প্রতিটি শব্দ ছাদের দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকা একজোড়া কানে পৌঁছে গেল। নীরব রাতের আড়ালে লুকিয়ে থাকা সেই মানুষটি নিঃশব্দে শুনে গেল গুঞ্জন আর প্রেমের ভালোবাসার প্রতিটি স্বীকারোক্তি।
অথচ ছাদের ওপরে দাঁড়িয়ে থাকা দুজনের কেউই টের পেল না তাদের অজান্তেই তাদের ভালোবাসার আকাশে জমে উঠছে কালো মেঘ। সামনে যে ঝড় অপেক্ষা করছে, তার আঁচও যেন পৌঁছায়নি তাদের হৃদয়ে।
প্রেম কি পারবে গুঞ্জনের হাত শক্ত করে ধরে সেই ঝড়ের সামনে দাঁড়াতে?
নাকি কারও ষড়যন্ত্র কিংবা ভাগ্যের নির্মম পরিহাস তাদের ভালোবাসার পথটাকে ছিন্নভিন্ন করে দেবে?
এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা...
দেখার বিষয়, এই ঝড় পেরিয়ে প্রেম আর গুঞ্জন কি সত্যিই এক হতে পারবে? তারা কি রচনা করতে পারবে এক পবিত্র, মায়াময় ভালোবাসার কাহিনি যে ভালোবাসার কাছে হার মেনে যাবে পৃথিবীর সমস্ত বাধা?
নাকি ঝড়ের তাণ্ডবে দুজন দুদিকে ছিটকে গিয়ে হারিয়ে যাবে একে অপরের জীবন থেকে?
উত্তরটা লুকিয়ে আছে সেই আসন্ন ঝড়ের ওপারে...
আর সেই ঝড়ই এবার ঠিক করবে প্রেমের গুঞ্জন মিলনের সুরে বাঁধা পড়বে, নাকি বিচ্ছেদের কান্নায় থেমে যাবে।
চলবে,,,,