ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রেমের গুঞ্জন

২৫তম পর্ব

লেখক: জান্নাত

#প্রেমের_ গুঞ্জন

#পর্ব_২৫

#জান্নাত

চলে যায় বেশ কিছুদিন।

অথচ এই ক’দিনে গুঞ্জন একবারের জন্যও প্রেমকে চোখের সামনে দেখেনি। না ভার্সিটিতে, না বাড়িতে কোথাও নেই সে। যেন হঠাৎ করেই সমস্ত পরিচিত জায়গা থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে কোথাও অদৃশ্য হয়ে গেছে প্রেম।

প্রথমদিকে গুঞ্জনের মনে প্রশ্ন জাগত কোথায় গেল সে? কেন আসছে না? কোনো অঘটন ঘটেনি তো?

কিন্তু দিন যত গড়াতে থাকে, ততই সেই প্রশ্নগুলো যেন অভিমানের আড়ালে চাপা পড়ে যায়।

একসময় ঠোঁটের কোণে ফুটে ওঠে এক টুকরো তাচ্ছিল্যের হাসি।

মনে মনে গুঞ্জন নিজেকেই বলে ওঠে,

এই তাহলে উনার ভালোবাসা! এতদিনের ভালোবাসা বুঝি এতটাই গভীর ছিল?”

কথাটা ভাবতেই বুকের ভেতরটা অদ্ভুত এক শূন্যতায় ভরে ওঠে। তবুও গুঞ্জন নিজের মনকে শক্ত করে।

তারপরই বিষণ্ণ হাসি হেসে মনে মনে বলে,

আর ডিভোর্সি একটা মেয়েকে কেই-বা ভালোবাসবে? তার পরিবারই বা মেনে নেবে কেন?

কথাগুলো নিজেকেই বোঝানোর চেষ্টা মাত্র।

কারণ হৃদয়ের গহীনে কোথাও একটা বিশ্বাস তখনও জেদ করে বলে যাচ্ছিল প্রেম তাকে ছেড়ে যায়নি।

কিন্তু বাস্তবতা যে বড় নির্মম।

কখনো কখনো ভালোবাসার মানুষটাকে হারানোর আগেই মানুষ নিজেকে বোঝাতে শুরু করে সে কখনোই তার ছিল না।

____

কিন্তু গুঞ্জন যা ভাবছে, সত্যিটা মোটেও তেমন নয়।

প্রেম সত্যিই গুঞ্জনকে ভালোবাসে। শুধু ভালোবাসে বললে হয়তো কম বলা হবে সে ধীরে ধীরে গুঞ্জনের মায়ায় এমনভাবে জড়িয়ে পড়েছে, যে মায়ার বন্ধন চাইলেও কোনোদিন ছিন্ন করতে পারবে না।

গুঞ্জনের কঠিন মুখের আড়ালে লুকিয়ে থাকা নরম মনটাকে প্রেম খুব ভালো করেই চিনে গেছে। তার অভিমান, তার নীরবতা, এমনকি তার তাচ্ছিল্যের আড়ালে লুকিয়ে থাকা অপ্রকাশিত অনুভূতিগুলোও যেন প্রেমের চোখ এড়ায় না।

তবুও গত কয়েকটা দিন ইচ্ছে করেই সে গুঞ্জনের সামনে আসেনি।

কেন?

কারণ প্রেম জানতে চায় তার অনুপস্থিতি কি আদৌ গুঞ্জনের মনে কোনো শূন্যতা তৈরি করে?

এই কঠিন মানবীটা কি সত্যিই তার জন্য একটুখানি হলেও ব্যাকুল হয়?

তার দেখা না পেলে কি গুঞ্জনের বুকের ভেতরটাও অকারণে ভারী হয়ে আসে? রাতের নির্জনতায় কি একবার হলেও তার কথা মনে পড়ে?

প্রেম দেখতে চায়, তার ভালোবাসা শুধু একতরফা নয় তো?

তাই দূরে থেকেও প্রতিটি মুহূর্তে সে গুঞ্জনকেই ভাবছে। নিজেকে আড়াল করে অপেক্ষা করছে সেই একটিমাত্র সত্যের জন্য যেদিন গুঞ্জন নিজের অজান্তেই স্বীকার করে নেবে, প্রেমের অনুপস্থিতি তার জীবনেও নিছক কোনো অনুপস্থিতি নয়।

কারণ কিছু মানুষকে ভালোবাসা যায়, আবার কিছু মানুষকে ভালোবাসার চেয়েও বেশি মায়ায় জড়িয়ে ফেলা যায়।

আর গুঞ্জন?

সে যে প্রেমের সেই মায়াতেই আটকে গেছে, তা হয়তো গুঞ্জন নিজেও এখনো জানে না।

______

পুরো পনেরো দিন পর নিজের বাড়িতে ফিরছে প্রেম।এই পনেরোটা দিন সে কাটিয়েছে নিজের বাগানবাড়িতে। সেদিন গুঞ্জনের সঙ্গে দেখা হওয়ার পর ঠিক সেই সকালেই কোনো এক অজানা অস্থিরতা নিয়ে বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছিল সে। কাউকে কিছু জানানোরপ্রয়োজনও বোধ করেনি।

তবে এই পনেরোটা দিন প্রেমকে একটা বিষয় খুব ভালোভাবেই বুঝিয়ে দিয়েছে

গুঞ্জনের হৃদয়েও তার জন্য অনুভূতির জন্ম হয়েছে।মেয়েটা যতই কঠিন হওয়ার ভান করুক, যতই মুখে তাচ্ছিল্য ছুড়ে দিক, তার চোখ কিন্তু বারবার প্রেমকেই খুঁজেছে। সবার ভিড়ে তাকে খুঁজে বেড়িয়েছে গুঞ্জন। আর যখন কোথাও তাকে পায়নি, তখন সেই তীব্রময়ী মেয়েটার চোখে নেমে এসেছে বিষণ্ণতার ছায়া।প্রেমের ঠোঁটের কোণে অজান্তেই হাসি ফুটে ওঠে।

তার গুঞ্জন তাকে মিস করেছে।হয়তো স্বীকার করেনি, কিন্তু অনুভব করেছে।

এইটুকুই যেন প্রেমের কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় পাওয়া।সেই আনন্দ নিয়েই আজ বাড়ি ফিরছে সে।গাড়ি থেকে নেমে বাড়ির ভেতরে পা রাখতেই পেছন থেকে গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে আসে

দাঁড়াও প্রেম! এতদিন তুমি কোথায় ছিলে?

প্রেম থেমে যায়।

পেছনে ফিরে তাকিয়ে দেখে তার বাবা, আশিকুল চৌধুরী, কঠিন মুখে দাঁড়িয়ে আছেন।

প্রেমের মুখে কোনো ভাবান্তর নেই। নির্বিকার ভঙ্গিতে উত্তর দেয়,

বাগানবাড়িতে ছিলাম।

আশিকুল চৌধুরীর ভ্রু কুঁচকে যায়।

ফ্রেশ হয়ে এসো। তোমার সঙ্গে জরুরি কথা আছে।

প্রেম এক মুহূর্ত বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে।

প্রেম ভেবেছে হয়তো ব্যবসা কিংবা কোনো কাজের ব্যাপারে কথা বলবেন।

তাই আর কিছু না বলে নিজের ঘরের দিকে চলে যায়।

কিছুক্ষণ পর ফ্রেশ হয়ে নিচে ফিরে আসে প্রেম। এসে সোফায় বসতেই আশিকুল চৌধুরী তার দিকে তাকান। মুখে সেই চিরচেনা কঠোরতা।

কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর তিনি শান্ত অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বলে ওঠেন,

আমি তোমার বিয়ে ঠিক করেছি। মেঘার সঙ্গে।

কথাটা শুনে প্রেম যেন মুহূর্তের জন্য বাকরুদ্ধ হয়ে যায়।তার চোখ দুটো স্থির হয়ে যায় বাবার মুখের দিকে।

কী বলছো বাবা?

আশিকুল চৌধুরীর কণ্ঠে বিন্দুমাত্র দ্বিধা নেই।

ঠিকই বলছি। কাল তোমার আর মেঘার এনগেজমেন্ট।

প্রেম ধীরে ধীরে সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়।

চোয়াল শক্ত হয়ে আসে তার।

সরি বাবা। আমি মেঘাকে বিয়ে করতে পারব না।

আশিকুল চৌধুরীর চোখ সরু হয়ে আসে।

পারবে না?

প্রেম এবার দৃঢ় গলায় বলে,

না। কারণ আমি অন্য একজনকে ভালোবাসি।

কয়েক সেকেন্ডের জন্য ঘরটা নিস্তব্ধ হয়ে যায়।

তারপর আশিকুল চৌধুরী তাচ্ছিল্যের হাসি হাসেন।

কাকে? ওই অজপাড়া গাঁয়ের ডিবোর্সি মেয়েটাকে?

প্রেমের চোখের দৃষ্টি মুহূর্তেই কঠিন হয়ে ওঠে।, কিছু টা চমকেও যায় তার বাবা কী করে জানলো?

তার বাবা আবারো বলেন

যার বাবা নাকি দিনমজুর? যে নিজের খাবারটুকুও ঠিকমতো পায় না? সেই মেয়েকে তুমি ভালোবাসো?

প্রেম নিশ্চুপ হয়ে বাবার দিকে তাকিয়ে থাকে।

বাবার কথাগুলো যেন তার কানে নয়, সরাসরি হৃদয়ে আঘাত করছে।এটাই কি তার বাবা?এতটা অহংকার!এতটা শ্রেণিবৈষম্য!মানুষের মূল্য কি শুধু তার অর্থ আর বংশের পরিচয়ে?প্রেম ধীরে ধীরে নাক ছিটকায়।

অদ্ভুত এক উপলব্ধি হয় তার।হয়তো এই অহংকার, এই ঔদ্ধত্য, এই মানুষকে তার অবস্থান দিয়ে বিচার করার স্বভাব এসব সে উত্তরাধিকার সূত্রেই পেয়েছে।কিন্তু একটা জায়গায় এসে সেই উত্তরাধিকার ভেঙে দিয়েছে একজন।

গুঞ্জন।

যে মেয়েটা তার অহংকারকে ভয় পায়নি।তার দাম্ভিকতাকে পাত্তা দেয়নি।বরং তার সেই অহংকারকে একদিন এমনভাবে মাটিতে মিশিয়ে দিয়েছে, যেন প্রেম নামের মানুষটার ভেতরে লুকিয়ে থাকা আসল মানুষটাকে সে চোখের সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে।যে প্রেম নিজের শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে গর্ব করত, সেই প্রেমই আজ এক সাধারণ মেয়ের ভালোবাসার কাছে অসহায়।

প্রেম বাবার চোখের দিকে তাকিয়ে ধীর অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বলে ওঠে,

আপনি হয়তো ওর পরিবারের অবস্থান দেখছেন বাবা। কিন্তু আমি ওর মনটা দেখেছি।

একটু থেমে তার ঠোঁটে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে ওঠে।

আর বিশ্বাস করুন, সেই মনটা আপনার এত বড় প্রাসাদের চেয়েও অনেক বেশি দামী।

প্রেমের বাবা কঠিন মুখে বলে উঠলেন,

আমি কিছুতেই ওই মেয়েকে মেনে নেব না। কোনোভাবেই না।

কথাগুলো যেন পাথরের মতো ভারী হয়ে রুমের বাতাসকে থমকে দিল। অথচ প্রেমের কণ্ঠে বিন্দুমাত্র উত্তেজনা নেই। সে বাবার চোখের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে স্বাভাবিক গলায় বলল,

আমি সংসার করব বাবা। আর আমার সংসারে কে মানল, কে মানল না সেটার পরোয়া আমি করি না।

ছেলের এমন নির্লিপ্ত জবাবে মুহূর্তেই রাগে বাবার মুখ লাল হয়ে উঠল।

প্রেম! আমি যা বলছি, তাই হবে। কালই তোমার সঙ্গে মেঘার এনগেজমেন্ট হবে। আর এই মাসের মধ্যেই তোমাদের বিয়ে দেব।

প্রেম এবার ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটিয়ে বলল,

বিয়ে যদি করতেই হয়, তাহলে গুঞ্জনকেই করব। আর এই মাসেই করব।

কথাটা শেষ হতেই ঘরের পরিবেশ যেন আরও ভারী হয়ে গেল।

প্রেমের বাবা কয়েক মুহূর্ত ছেলের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর দাঁতে দাঁত চেপে বললেন,

তুমি যদি ওই মেয়েকে বিয়ে করো, তাহলে আজ থেকে তুমি আমার ত্যাজ্যপুত্র!

শব্দগুলো শুনে যেন প্রথমবারের মতো থমকে গেল প্রেম।

এতক্ষণ যে ছেলে বুক চিতিয়ে বাবার প্রতিটি কথার বিরুদ্ধে দাঁড়াচ্ছিল, সেই প্রেমের চোখে মুহূর্তের জন্য নেমে এলো অদৃশ্য এক দ্বিধা। বাবার মুখ থেকে ‘ত্যাজ্যপুত্র’ শব্দটা শুনবে হয়তো সে প্রস্তুত ছিল না।

ঘরের এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা প্রেমের মা এতক্ষণ স্বামী আর সন্তানের কথোপকথন নীরবে শুনছিলেন। এবার আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না। কাঁপা হাতে মুখ ঢেকে ফেললেন তিনি। ছলছল চোখে একবার স্বামীর দিকে, আরেকবার সন্তানের দিকে তাকালেন।

একজন তার স্বামী, অন্যজন তার সন্তান।

দুজনেই সমান জেদী।

একজন নিজের সিদ্ধান্ত থেকে একচুলও নড়বেন না, অন্যজন ভালোবাসার মানুষটাকে ছেড়ে এক পা-ও পিছিয়ে যাবে না।

মায়ের বুকের ভেতরটা হাহাকার করে উঠল।

তিনি কাকে সামলাবেন?

স্বামীর জেদ, নাকি সন্তানের ভালোবাসা?

আর মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা প্রেমের চোখে তখন এক অদ্ভুত নীরবতা বাবাকে হারানোর ভয় আর গুঞ্জনকে হারানোর আতঙ্ক, দুটোই যেন একসঙ্গে এসে তার বুকের ভেতরটাকে ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছে।

চলবে,,,

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২৫তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন