লন্ডনে আসার পর এই প্রথম কোনো অচেনা নাম্বার থেকে মেসেজ এসেছে তার কাছে। এই সিমটা তুষার ভাই এনে দিয়েছিল। পরিবার আর কয়েকজন বন্ধু ছাড়া এই নাম্বার কারও জানার কথা নয়। এতো বছরেও কোনো দিন এরকম মেসেজ আসেনি।
তার উপর মানুষটা বাংলায় কথা বলছে।
কী অদ্ভুত! তনুজার মুখের পরিবর্তিত ভাব দেখে রাহা কৌতূহলী হয়ে উঠল।
“কীরে? ভূত দেখার মতো মুখ করে আছিস কেন? কী দেখছিস ফোনে?”
তনুজা চোখ তুলে একবার রাহার দিকে তাকাল।
মুহূর্তের জন্য ভেবেছিল মেসেজটা দেখাবে। কিন্তু পরক্ষণেই মনে পড়ল। সে এখনও রাহার উপর রাগ করে আছে।
তাই ঠোঁট ফুলিয়ে বলল
“তাতে তোর কী? যা ইচ্ছা দেখছি। আমার কথা বলতে ইচ্ছে করছে না। আমি বাসায় যাব।”
কথাটা বলেই উঠে দাঁড়াল সে।
রাহাও তার পিছু নিল। তবে মাথা থেকে মেসেজের বিষয়টা কিছুতেই সরাতে পারল না।
বাসায় ফিরে রাহা চলে গেল নিজের রুমে। আর তনুজা ফ্রেশ হয়ে নিচে নেমে সরাসরি রুবি বেগমের কাছে রাহার নামে নালিশ শুরু করে দিল।
“আমি না হয় ঘুম থেকে উঠতে পারি না, তাই লেট করি। কিন্তু রাহা তো সময়মতো উঠেই রেডি হয়ে বসে থাকে! ও কেন আমার সাথে দেরি করে যাবে?
অন্তত ও ক্লাসটা করলে আমার জন্য নোটস আনতে পারত!”
রুবি বেগমও মেয়েটার কথায় সায় দিলেন।
“সেটাই তো! সব দোষ তোর না, রাহারও আছে।”
ব্যস, তারপর আর রাহার রক্ষা হলো না। ভালোই বকা খেল সে।
আর তনুজা বিজয়ীর হাসি নিয়ে আবার নিজের রুমে ফিরে গেল।
রুমে এসে বিছানার উপর বসতেই আবার ফোনটা হাতে নিল সে।
অপরিচিত নাম্বার;
মেসেজটা আরেকবার পড়ে কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল। তারপর ধীরে ধীরে টাইপ করতে শুরু করল;
“Excuse meee… Who are you? আর আমার সমস্যা মানে কী বলতে চাচ্ছেন?”
প্রায় পাঁচ মিনিট পর আবারও টুং করে শব্দ হলো। তনুজা এতক্ষণ ফোনের দিকেই তাকিয়ে ছিল। শব্দ হতেই তাড়াতাড়ি মেসেজটা খুলল।
“আপনার কী সমস্যা আপনি জানেন না? আপনি আমাকে মেসেজ করে ডিস্টার্ব করছেন না কেন?”এটাই আপনার সমস্যা;
তনুজা এবার পুরোপুরি অবাক।
“আজব মানুষ তো!” বিড়বিড় করে বলল সে।
তারপর বিরক্ত হয়েই আবার টাইপ করল
“মানে কী বলছেন আপনি? আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। খুলে বলুনতো ”
সাথে সাথেই রিপ্লাই এলো।
“কী কী খুলবো বলুন তো মেডাম…? কী দেখতে চান?”
মেসেজটা পড়তেই তনুজার চোখ বড় বড় হয়ে গেল।
সে তাড়াহুড়ো করে লিখল
“কীসব আজেবাজে কথা বলছেন! অসভ্যের মতো আচরণ করছেন কেন? আগে নিজের পরিচয় দিন। আর আমার নাম্বার কোথায় পেয়েছেন?”
ওপাশের মানুষটা যেন মুচকি হাসল।
তারপর আবার টাইপ করল
“হ্যাঁ ম্যাডাম, অসভ্য তো আমি। তবে শুধু আপনার সাথে।আপনি তো দেখি লজ্জাও পেলেন…
আচ্ছা বলেন, কী খুলব? শার্ট নাকি পেন্ট নাকি অন্য কিছু?”
তনুজা বিরক্তিতে চোখ বন্ধ করে ফেলল।মনে মনে বলল
“পাগল নাকি লোকটা!”
কে হতে পারে এই মানুষটা? কিছুতেই মাথায় আসছে না।
সে আবার লিখল;
“দেখুন, ভালোভাবে বলছি।এসব ফাজলামো বন্ধ করুন। আগে বলুন আপনি কে। না হলে আর মেসেজ দিবেন না। আর বেশি বাড়াবাড়ি করলে আমি কিন্তু সরাসরি আমার তুষার ভাইকে বলে দিব।”সে আপনাকে আচ্ছা মতো দিবে কিন্তু।
মেসেজটা পড়েই ওপাশের মানুষটার হাসি যেন আরও চওড়া হলো।
“ওহ হো" আমাকে থ্রেট দেওয়া হচ্ছে নাকি, ম্যাডাম?
আমার কি আপনার তুষার ভাইকে ভয় পাওয়া উচিত?”
তনুজা আরও কিছু লিখতে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই দরজায় টোকা পড়ল।
সে বিরক্ত হয়ে ফোনটা পাশে রেখে উঠে দরজা খুলল।
দেখল বাইরে হামজা আর রাহা দাঁড়িয়ে আছে।
তনুজা মুখ গোমড়া করে আবার দরজা বন্ধ করতে নিতেই দুই ভাইবোন একসাথে ধাক্কা দিয়ে ভেতরে ঢুকে।
ভাইবোনকে একসাথে রুমে ঢুকতে দেখে তনুজা বিরক্ত মুখে বিছানার উপর গিয়ে বসল। ফোনটা তাড়াতাড়ি উল্টো করে পাশে রেখে দিল সে।
রাহা সেটা খেয়াল করলেও কিছু বলল না।
বরং ঠোঁট চেপে হাসি আটকানোর চেষ্টা করল।তনুজার চেহরার ভঙ্গিমা দেখে।
হামজা দরজাটা চাপিয়ে দিয়ে নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল
“আচ্ছা রাজকুমারী, আপনার রাগ কি এখনো কমেনি?”
তনুজা চোখ পাকিয়ে তাকাল।
“না। আর তোমাদের সাথে কথা বলারও ইচ্ছে নেই।”
“কিন্তু আমাদের তো আছে,” হামজা নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল।
রাহা ধপ করে এসে তনুজার পাশে বসে পড়ল।
“এই তনু, সরি না বলেছি? এতটুকু বিষয় নিয়ে পরে আছিস, আমরা একটু হেসেছি এতেই এমন ভাব নিচ্ছিস যেন তোকে আমরাই সিড়ি থেকে ফেলে দিয়েছি!”
তনুজা সাথে সাথে কুশন তুলে মারল রাহার গায়ে।
“আমি ব্যথা পেয়েছি!”
“কোথায়?” হামজা ভ্রু তুলে জিজ্ঞেস করল।
“মনে!”
তনুজা নাটকীয় গলায় বলতেই হামজা আর রাহা একসাথে হেসে উঠল।
চলবে!
পর্ব সংখ্যা —৩
#লেখিকা-তাসনিয়া_জাহান
#অচেনা_প্রনয়ের_চিরকুট