বাইকটা সামান্য স্লাইড করলেও তনুজা কন্ট্রোল হারাল না। বরং ড্রিফট শেষ করে আরও স্প্রিট তুলে সামনে চলে গেল। তুষারের বুকটা ধক করে উঠল।
রাগে তার চোয়াল শক্ত হয়ে গেল।
“বাসায় যা আজকে তারপর দেখাচ্ছি তোকে”
কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার
রাগের মাঝেও তার ঠোঁটের কোণে চাপা হাসি ফুটে উঠল।
ভয়ংকর ট্যালেন্টড ওর।
শেষ ল্যাপ এ এসে পুরো রোড যেন আগুন হয়ে উঠল।
চারপাশে শুধু বাইক-এর গর্জন,মানুষের চিৎকার আর বাতাস চিরে ছুটে চলার শব্দ। তনুজা এবার পুরোপুরি নিজের জোন এ চলে গেছে।
তার সামনে এখন শুধু ফিনিশ লাইন। হেলমেট-এর বিসর-এর উপর ঠান্ডা বাতাস এসে আছড়ে পড়ছে।চোখ দুটো তীক্ষ্ণ হয়ে আছে সামনের দিকে।
পেছনে কে আছে, কে নেই সেটা দেখার সময়ও নেই তার।
শেষ বাঁকটা নিয়েই সে এক্সিলারেটর পুরো ঘুরিয়ে দিল।
BMW S1000RR ভয়ংকর শব্দ তুলে সামনে ছুটল।
আর পরের মুহূর্তেই"ফিনিশ লাইন চারপাশে হৈচৈ পড়ে গেল।
“AYRA WON AGAINNN!”
“NO WAYYYY!”
“SHE DID IT"
তনুজা ধীরে ধীরে বাইক থামালো।
হেলমেট খুলতেই এলোমেলো চুলগুলো মুখের উপর এসে পড়ল। তার বুক দ্রুত উঠানামা করছে। কিন্তু ঠোঁটের কোণে সেই পরিচিত জয়ের হাসি। গত ছয় মাসে একবারও হারেনি সে।
দ্বিতীয় ও তৃতীয় পজিশন বদলেছে বহুবার।
কখনো রোজ, কখনো অদিতি কখনো জ্যাক বা অন্যান্য মানুষ। কিন্তু ফার্স্ট প্লেস তনুজা জয় করেছে আসার পর থেকে সবসময়।
চারপাশে হইহুল্লোড়ে মেতে উঠেছে পুরো জায়গাটা
সব মিলিয়ে রাতের পরিবেশটা অদ্ভুত সুন্দর লাগছে।
ঠান্ডা বাতাসে ভেসে আসছে মানুষের চেঁচামেচি, বাইক এর এক্সহস্ট এর গর্জন আর বিজয়ের উল্লাস।
তনুজা জীবনে শখের বসে অনেক কিছুই করেছে। তার সাথে সফলতাও পেয়েছে।কখনো কেউ তাকে কিছু তে বাধা দেয়নি বরং সাপোর্ট করেছে তাই হয়তো কখনো পরাজিত হয়নি।
কিন্তু এবার তার নতুন স্বপ্নটা একটু ভিন্ন ছিল।
এইবার সে সবার মন জয় করতে চেয়েছিল আড়ালে থেকে। কোনো আলো ঝলমলে স্টেজে নয়, কোনো ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে নয় বরং রাতের অন্ধকারে, হেলমেটের আড়ালে লুকিয়ে।
বাইক রাইডিং এর কথা প্রথম যখন রোজের মুখে শুনেছিল তখন থেকেই যেন মাথায় একরকম নেশা চেপে বসেছিল তার। সে এটা করবেই যেভাবেই হোক শিখবে নাম করবে। তবে এত দ্রুত মানুষ তাকে চিনতে শুরু করবে, সেটা তনুজা নিজেও ভাবেনি। এখন মাঝেমধ্যেই ইউনিভার্সিটি কিংবা রাস্তাঘাটে অপরিচিত কেউ তাকে চিনে ফেলে।
হাসিমুখে বলে ওঠে;
“rider girl Ayra?!”
কেউ আবার উত্তেজিত হয়ে বলে
“আন্ডারগ্রাউন্ড লেডি বাইকার!”
আর এই কথাগুলো শুনলেই তনুজার বুকের ভেতর অদ্ভুত এক ভালো লাগা ছড়িয়ে পড়ে।
মনে হয় "হ্যাঁ,সে পেরেছে।
নিজের মতো করে,নিজের একটা পরিচয় তৈরি করতে পেরেছে। তনুজা রেস শেষ করা মাত্রই আদিতি আর রোজ দুজন একসাথে ঝাঁপিয়ে পড়ল তার উপর।
“That’s my girl!”
“Uff! You just killed it baby!”
"তুই তো একদমই সবার হোস উড়িয়ে ফেলেছিস.. I was seriously scared during your last bike turn!”
তাদের এক্সাইটমেন্ট দেখে তনুজা হেসে ফেলল। চুলগুলো ঠিক করতে করতে বলল;
“Thanks pretty girls”
ঠিক তখনই মাইকে এনাউন্সমেন্ট করা শুরু হলো।
প্রথম পজিশন তো সবার জানাই ছিল। কারণ পুরো রেস জুড়েই দর্শকদের চোখ ছিল শুধু তনুজার দিকেই। সে কোন টার্ন কিভাবে নিচ্ছে, কতটা স্পিড তুলছে এসব দেখতেই যেন সবাই ব্যস্ত ছিল। তাই দ্বিতীয় আর তৃতীয় পজিশন কারা পেয়েছে, সেটা কেউ ঠিকমতো খেয়ালই করেনি।
হঠাৎ মাইকে ভেসে এলো
প্রথম পজিশন তনুজা আয়রা!”
মুহূর্তের মধ্যেই চারপাশে চিৎকার পড়ে গেল।
“Yeeaaahhh!”
“Fairy Rider!”
“Queen!
তনুজা,আদিতি আর রোজ একসাথে হেসে উঠল। তাদের কখনো মনে হিংসা হয়নি তনুজাকে নিয়ে তারা দুইজন কোনো পজিশনে না আসলেও আফসোস করেনি বরং তনুজার জিতে তারাও খুশি হয়েছে।
তারপরই এনাউন্স হলো;
“দ্বিতীয় পজিশনে" তুষার হায়দার মির্জা”
“তৃতীয় পজিশনে "অদিতি ইসলাম”
তনুজা যেন হঠাৎ করেই জমে গেল। সে একদম ভুলেই গিয়েছিল তুষারও আজ রেস এ ছিল। আর সবচেয়ে বড় কথা। তার সাথেই রাইট করছিল। তনুজা ধীরে ধীরে চারপাশে তাকাতে লাগল তুষারকে খুঁজে বের করার জন্য।
একপর্যায়ে চোখ আটকে গেল দূরে দাঁড়িয়ে থাকা একটা পরিচিত অবয়বে। তুষার সে একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে।
এক হাতে হেলমেট কোমরের পাশে ঝুলিয়ে রেখেছে।
অন্য হাতটা আকস্মিকভাবে বাইক এর উপর রাখা।
কালো জেকেটের জিপারঅর্ধেক খোলা। চুলগুলো এলোমেলো হয়ে কপালের উপর পড়ে আছে।
দূরের নিয়ন বাতি এসে পড়েছে তার মুখের একপাশে।
আর সেই আলোতেই তার ঘন কালো ভ্রুর সাথে কালো চোখের মনি দুটো আরও ভয়ংকর সুদর্শন লাগছে। সে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তনুজার দিকে। চাহনিটা দেখে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে;
লোকটা ভীষণ রেগে আছে। তনুজা সাধারণত কাউকে ভয় পায় না তার জানামতে তুষারকেও না।কিন্তু কোনো দুষ্টুমি বা ঝামেলার মধ্যে ধরা পড়ে গেলে।সবার আগে যাকে ভয় লাগে, সে হলো তুষার। কারণ পৃথিবীর সবাই চুপ থাকলেও।তুষার কখনো চুপ থাকে না।
চলবে;
পর্ব সংখ্যা —১৫
অচেনা_প্রনয়ের_চিরকুট লেখিকা :তাসনিয়া জাহান