মুলান" তুষারের সবথেকে প্রিয় জিনিস বধহয়;তবে মুলানের নাম আসলে তা'না তুষার রেখেছে টাইগার। তনুজা বুঝে পায় না মুলান মেয়ে বিড়াল তাকে কেনো টাইগার নাম দিবে?
তুষারের সাথে প্রতিনিয়ত কথা কাটাকাটি হয় এই নিয়ে।
মিউ*
মুলান" মাথাটা তনুজার গালের সাথে ঘষতে লাগল।
তনুজা মুখ ফিরিয়ে নিল।
"তুইও আমার কাছে আসবি না।"
মাফিন আবারও গা ঘেঁষে বসল। তনুজা এবার ওকে আলতো করে সরিয়ে দিয়ে বলল
"যা তোর মালিকের কাছেই যা।"
মুলান কিছু না বুঝেই আবার তার কোলে উঠে বসলো
"তোর মালিক আমায় তোকে ধরতে মানা করে, তাও আমি ধরি।"
"তোর নাম মুলান বলে ডাকতে মানা করে, তাও আমি ডাকি।"
"তোর মালিক আমায় খালি বকে, শাসন করে, ধমক দেয়"
কথা বলতে বলতে তার গলাটা হঠাৎ নরম হয়ে এলো।
"তাও আমি সারাদিন তুষার ভাই, তুষার ভাই করে জান দিই।"
"আর উনি?"
"একটু ভালো করে কথাও বলতে জানে না।"
মুলান এবার তার হাতের সাথে মুখ ঘষতেই তনুজা অজান্তেই তাকে জড়িয়ে ধরল।
তুই একটা প্রাণী হয়েও তার কাছে কত আদর পাস আর আমার মতো একটা কিউট ছোট বাচ্চাকে সে পাত্তাই দেয় না।
এই মুলান আমি কি দেখতে খুব খারাপ আমাকে দেখলেই যেনো তার গা জলে। মুলান নিজের আরামদায়ক জায়গা পেয়ে ঘুমিয়ে পরেছে। তনুজা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সেও মুলান কে জরিয়ে ধরেই ঘুমের দেশে পারি জমালো।
*
*
*
লন্ডনের সকালটা আজ অদ্ভুত রকমের শান্ত।
রাতভর ঝিরিঝিরি বৃষ্টি হওয়ার পর গাছের পাতাগুলোতে এখনো ছোট ছোট পানির ফোঁটা ঝুলে আছে। দূরের রাস্তাগুলো ভেজা, সূর্যের আলো সেগুলোর উপর পড়ে চিকচিক করছে।
সব অভিমান কি এত সহজে শেষ হয়? তনুজার ক্ষেত্রে অন্তত হয়নি। সে এখনো তুষারের উপর ভীষণ রেগে আছে।
গত রাতেই মনে মনে পণ করেছে;
"কথা বলবে না। একদমই না।"
আজ সেই জেদের দ্বিতীয় দিন।
সকালে রুবি বেগম তিনবার এসে ডেকেছেন। রাহাও একবার এসেছিল। কিন্তু তনুজা প্রতিবারই বলেছে
পাঁচ মিনিট*
আর সেই পাঁচ মিনিট মিলিয়ে প্রায় দুই ঘণ্টা ঘুমিয়েছে।
অবশেষে যখন উঠল, উঠেই দেওয়াল ঘড়ির দিকে তাকালো এগারো টা ছুই ছুই। আজ আর ইউনিভারসিটি যাওয়া হলো না। সে রেডি হয়ে নিচে নামলো। বাড়ির সবাই নিজেদের কাজে বেরিয়ে গেছে। আজ সকালে তুষার ডাক দেয়নি তাকে। এই বিষয়টা তনুজার ভালো লাগল নাকি খারাপ লাগল, সে নিজেও বুঝতে পারল না।
নিচে নেমে এসে দেখে। নাস্তার টেবিলও ফাঁকা।
সে নাস্তা শেষ করে ড্রয়িংরুমের কিছু জিনিস পরিষ্কার করছিল।
ঠিক তখনই রাহা দৌড়ে এসে বলল
এই তনু!জানিস?
কী?
সাদ ভাইয়ের নাকি বিয়ে ঠিক হয়েছে! চল যাই!
তনুজা অবাক চোখে তাকাল।
কী বলিস!কে বলল এত তাড়াতাড়ি?
আমিও তো তাই ভাবছি।
তনুজা ভ্রু কুঁচকে বলল
কিছুদিন আগেই না আসমা আন্টি বলল সাদ ভাইয়ের ক্যারিয়ার আগে?
বলেছিল"
তাহলে এখন আবার কী হলো?
রাহা কাঁধ ঝাঁকাল।
ধুর! তাতে আমাদের কী? আমরা তো অন্তত একটা বিয়ের দাওয়াত খাব!ইয়েয়য়য়
তনুজা হেসে ফেলল।
চল তাহলে। আসল খবর টা জেনে আসি।
সাদদের বাড়ি তাদের বাড়ি থেকে মাত্র কয়েকটা বাড়ি পরেই। রুবি বেগমরা লন্ডনে আসার পর থেকেই তাদের পরিবারের সাথে বেশ ভালো সম্পর্ক। আসে পাশে অনেক বাঙালি ফেমেলি আছে। তবে তাদের সাথে আবার এতো কথা হয় না।
কলিংবেল বাজাতেই দরজা খুললেন আসমা বেগম।
তাদের দেখেই খুশি হয়ে বললেন
আরে তনু রাহা তোরা তো আমাদের ভুলেই গেছিস রে মা!
তারপর আদর করে ভেতরে নিয়ে গেলেন।
খাবার, আইসক্রিম, জুস সবকিছু সামনে এনে রাখলেন।কিন্তু তনুজা আর রাহা আজ খেতে আসেনি।
তারা এসেছে গোয়েন্দাগিরি করতে।
রাহা সরাসরি গিয়ে আসমা বেগমের পাশে বসল।
আন্টি, ঘটনা কি সত্যি?
কোন ঘটনা?
সাদ ভাইয়ের বিয়ে!
আসমা বেগম হাসলেন।
হ্যাঁ রে।
তনুজা সঙ্গে সঙ্গে বলল
কিন্তু আন্টি, আপনি না বলেছিলেন আগে ক্যারিয়ার?
"আমার ছেলে বড় হয়েছে না" বিয়ের বয়স পেরিয়ে যাচ্ছে এই আরকি। এমন সম্বন্ধ বারবার আসে নাকি? তাই দেরি না করে রাজি হয়ে গেলাম।
রাহা চোখ বড় বড় করল।
তনুজা মনে মনে ভাবলো। সাদ ভাইয়ের মাএ পঁচিশ বছর হয়েছে তাতেই তার নাকি বিয়ের বয়স পেরিয়ে যাচ্ছে। আর এই দিকে তার তুষার ভাইয়ের আটাশ বছর শেষ হতে চলল। কিন্তু তার বিয়ের বয়স হয়নি কেনো?
এই লোক টা বিয়ে করলে তো একটু বাচা যেতো অন্তত।
মেয়ে কি বাঙালি?
হ্যাঁ
দেখতে?
মাশাআল্লাহ।
তনুজা মুখ টিপে হাসল।
আপনাকে দেখে তো মনে হচ্ছে ছেলে না, মেয়ে বিয়ে দিচ্ছেন।
তাহলে সাদ ভাইয়ের কেরিয়ারের চিন্তা শেষ?
আসমা বেগমও হেসে ফেললেন।
তারপর গর্বের সাথে বললেন
মেয়ের বাবার অনেক বড় ব্যবসা। আর বলেছে সাদের নামে একটা কোম্পানিও করে দিবে। আর যদি কোম্পানি ওর নামে হয়েই যায় তাহলে আর টেনশন কিসের? আমার ছেলে তো মালিক হবেই ওর কেরিয়ার খারা।
তনুজা আর রাহা একসাথে বলে উঠল
ওহহহহ!
ঠিক তখনই কলিংবেল বেজে উঠল।
আসমা বেগম বললেন
দাঁড়া, দেখি সাদ এসেছে মনে হয়।
তনুজা আর রাহা একে অপরের দিকে তাকিয়ে শয়তানি হাসি দিল।
সাদকে একটু জ্বালানো যাবে।
কিন্তু সাদ ভেতরে ঢোকার পর সবকিছু যেন একটু বদলে গেল। তাদের দেখে সে খুশি হলো ঠিকই। কিন্তু হাসিটার ভেতরে যেন কেমন একটা ক্লান্তি লুকানো।
তনুজা সেটা খেয়াল করল রাহাও করল
রাহা বলল
কী সাদ ভাই? জামাই সাজবেন ফিলিংস কি?
সাদের চেহারায় আধার নেমে এলো যেনো না চাইতেও
রাহার প্রশ্নের উত্তর হিসেবে একটু মলিন হাসি দিলো
আসমা বেগম পানি আনতে চলে যেতেই সাদ একবার চুপচাপ তনুজার দিকে তাকাল।সাদ এগিয়ে তনুজা আর রাহার সামনের সোফায় যেয়ে বসতে বসতে মলিন কন্ঠে বলল
কেমন আছো তনু বাসায় আসো না যে?
রাহা বলে উঠলো
সাদ ভাই আমিও তো এসেছি দেখলেন কই আমাকে তো জিজ্ঞেস করলেন না কিছু?
সাদ হাসলো তারপর বলল;
আরে তোমাকেও বলছি রাগ করো না।কেমন আছো বল তাহলে?দুই বোন তো আমাদের বাড়ির রাস্তাই ভুলে গিয়েছো যেনো।
তনুজা আর রাহা এক সাথেই বলল;তারা ভালো আছে পড়ালেখার ব্যস্ততায় কোথাও যাওয়া হয়না।
তনুজা সাদ কে জিজ্ঞেস করলে;
তা সাদ ভাই মেয়ে কেমন নিশ্চয়ই অনেক সুন্দর? আপনার পছন্দ হয়েছে?আপনার সাথে সুন্দর মেয়েই মানাবে কিন্তু তাই না রাহা?
সাদের চোখে সেই অদ্ভুত বিষণ্নতা আরো বেড়ে গেলো।
রাহা ও বলল হ্যাঁ;আমাদের সাদ ভাই যা হ্যান্ডসাম তার সাথে যেনো তেনো মেয়ে মটেও মানাবে না।
সাদ তনুজার দিকে তাকিয়ে করুন কন্ঠে বলল;
তোমার থেকে বেশি না তনু;
আরো কিছু বলতেই যাবে তার আগেই আসমা বেগম এসে যাওয়া তে সাদ উঠে চলে গেলো নিজের ঘরে
তনুজা আর রাহা হেসে উঠল।লজ্জা পেয়েছে বধহয় দুজনের এক জন ও কথার গভীরতা আর বুঝতে পারল না
তনুজার সেই মুহূর্তে মনে হলো;এই বিয়েটা হয়তো সাদ ভাই নিজে খুব একটা চাইছেন না
ঠিক তখনই তার পকেটের ফোনটা হালকা কেঁপে উঠল তনুজা ফোন বের করল
আননোন নাম্বার~
অবাক হয়ে দেখল
গতকাল থেকে অনেকগুলো মেসেজ জমে আছে
এক এক করে খুলতেই চোখ বড় হয়ে গেল
"Reached home?
"আসা কি করা যায়।দিনটা ভালো কেটেছে তোমার লিটল ফাইরি
"এই টেডি বিয়ার টা তোমার পছন্দের তাই না?
"ঘুমিয়ে পড়েছ?
"অনেক ব্যস্ত নাকি?
"Good Morning Little Fairy"
"মন খারাপ নাকি?মেসেজ সিন করলে না যে একটাও?
তনুজা কয়েক সেকেন্ড স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।তার বুকের ভেতর কেমন যেন ধকধক করতে লাগল।টেডি বিয়ার?লোকটা এসব জানল কীভাবে?তাহলে
লোকটা কি সত্যিই তাকে ফলো করে আর কাল ওদের আশেপাশেই ছিল?তার আঙুল দ্রুত কিবোর্ডে নেমে গেল
তখনই রাহার মুঠো ফোনটা বেজে উঠলো তনুজা কীবোর্ডে আঙ্গুলগুলো ছাপতে গিয়েও থেমে পড়ল দৃষ্টি সরিয়ে রাহার পানে তাকালো
রাহা এক মেকি হাসি দিয়ে বলল"আসছি একটু"
তনুজা নিজের খামখেয়ালির তাড়নায় খেয়ালী করল না রাহার ঘাবড়ে যাওয়া চেহারাটা
আসমা বেগম ও বল্লেন বস তনু আমি দেখে আসি সাদের কিছু লাগবে কিনা
তনুজা নাথা কাত করে ঠিক আছে বলল:
নিজের লিখে রাখা মেসেজ টা সেন্ট করলো এইবার
"আপনি টেডি বিয়ার-এর কথা জানলেন কীভাবে?
আপনি আমাকে ফলো করা বন্ধ করুন।না হলে আমি সত্যি পুলিশে যাব।আমি আপনার শর্ত মেনে আপনার সাথে রেগুলার কথা বলে যাচ্ছি তাও আপনি আমাকে ফলো করছেন?
ওপাশ থেকে রিপ্লে আসতে সময় লাগল না
"ফলো কোথায় করলাম,তনু?ফলো করা তো আমার জানা মতে যারা পিছু পিছু লুকিয়ে লুকিয়ে চলে তাদের বলে।কিন্তু এখানে তো"টেডি টা স্বয়ং আমিই ছিলাম টা;
তনুজা স্থির হয়ে গেল
তারপর পরের মেসেজটা আসল
"তোমার সেই হাসি সেই চোখে সেই আনন্দ আমাকে পাগল করে পেলেছে!
আপনি এখন নিজের লিমিট ক্রস করছেন ভালো হচ্ছে না বলে দিলাম
"কেনো তনু তোমার ভালো লাগে নি?
তনুজা স্থির রইল কয়েক সেকেন্ড।ভাবলো খরাপ তো লাগে নি কারন সে সেই সময় এটা ভাবেইনি যে একটা টেডি বিয়ারের ভেতরে কেও আছেও সে এতোটাই মেতেছিল সেই সময় সে শুধুই মুহূর্তগুলো উপভোগ করেছে
তাহলে এই লোক কালকের টেডি বিয়ার-এর ভেতরে ছিল?সে কিছুই বুঝতে পারেনি!
তুমি আমাকে জরিয়ে ধরেছিলে
"আবার একটা কিসও দিয়েছো ছিঃছিঃ তনু তুমি এগুলো কি করেছো আমার সাথে
তনুজার মুখ লাল হয়ে গেল।তার যেনো এইবার রাগে মাথা চারা দিয়ে উঠলো
"আমি না আপনি করেছেন এগুলো।আপনি একটা বদমাইশ লোক আপনি আমার সুযোগের সদ্ব্যবহার করেছেন
ওপাশ থেকে আবার মেসেজ এলো
"আচ্ছা সরি এই বার বলেন তো সত্যি খুব খারাপ লেগেছে আমার সাথে সময় কাটিয়ে?
তনুজা ভাবলো এইলোক কে মোটেও সত্যি বলা যাবে না নয়তো ঘাড়ে চড়ে বসবে
হ্যাঁ বেশ খারাপ লেগেছে।হয়েচে এখন যান তো কাজ টাজ থাকে না আপনার নাকি ফালতু কথা কিভাবে বলবেন তাই ভাবেন সারাদিন?
"ঠিক ধরেছো আমি সারাদিন ভাবি তোমাকে কিভাবে পটানো যায় মিস.তনুজা আয়রা
অদ্ভুতভাবে তনুজার ঠোঁটের কোণে ছোট্ট একটা হাসি ফুটে উঠল।তনুজা কিছুক্ষণ ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল
লোকটার সাথে কথা বলার একটাই কারন তার পরিচয় টা যানার।কিন্তু লোকটার কথা বলা ছোট ছোট কাজ খুব ভলো লাগে মাঝে মাঝে।লেকটার সাথে কথা হলেই যথা সম্ভব চেষ্টা করে আমাকে হাসানোর
তনুজা খুব কঠিন ধাঁচের মানুষ সে সহজে কারো মিষ্টি কোথার জালে ফেসে যাওয়ার মানুষ না
তনুজা কিছুক্ষণ ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল
মাথার ভেতর যেন হাজারটা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে
লোকটার প্রতি আলাদা এক ধরনের অনুভূতি কাজ করে তনুজার এই অনুভূতির নাম কি দেওয়া যায় তনুজা যানে না।
চলবে;
পর্ব সংখ্যা —১৯
অচেনা প্রনয়ের চিরকুট লেখিকা— তাসনিয়া জাহান