ফন্ট সাইজ:
থিম:
অচেনা প্রনয়ের চিরকুট

২১তম পর্ব

লেখক: তাসনিয়া জাহান

—অচেনা প্রনয়ের চিরকুট—

শাড়িটা কিনতে গিয়ে বুঝলাম,রঙেরও মানুষ পছন্দ হয়।

নয়তো শত রঙের ভিড়ে এই রঙটাই কেন আপনাকে মনে করাবে?

বইগুলো দিলাম কারণ আপনি উপন্যাস ভালোবাসেন।

আর আমি সেইসব উপন্যাসের নায়কদের দলে

যারা নিজের গল্প বলতে পারে না,শুধু দূর থেকে কারো গল্প হয়ে বেঁচে থাকতে চায়।

—আপনার অচেনা মানুষ!

চিরকুটটা পড়ে কিছুক্ষণ নিশ্চুপ হয়ে রইল তনুজা

কেন জানি বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা অনুভূতি হচ্ছে

না,এটা প্রেম না।কিন্তু ভালো না লাগাও না।অচেনা একজন মানুষ।যে তাকে এতটা খেয়াল করে।এতটা মনে রাখে।কেন?

রাহা চিরকুটটা তার হাত থেকে প্রায় ছিনিয়েই নিয়ে পড়তে শুরু করল।

পুরোটা পড়ে সে হাঁ করে তনুজার দিকে তাকাল।

"হায় আল্লাহ!তুই প্রেম করছিস আর আমাকে বললি না?

তনুজা বিরক্ত মুখে বলল

ধুর চুপ করতো,প্রেমিক টেমিক কেউ না এটা ওই লোকটা!

কিছুক্ষণ আগেই বলেছিল সে নাকি আমার জন্য সারপ্রাইজ রেখেছে।তবে এমন কিছু হবে ভাবতে পারিনি।

"ওওওও আমি হলে এতক্ষণে উষ্টা খেয়ে প্রেমে পড়ে যেতাম

তুই পাঁচ মিনিট পরপর প্রেমে পড়িস

ওটাও ঠিক! এই বই গুলো আমি আগে পরি?

তনুজা সাথে সাথে জোর গলায় বলল

না একদম না আমি আগে পরবো;

রাহা গম্ভীর মুখ করে মাথা নেড়ে বলল।তনুজা না চাইলেও হেসে ফেলল।

তারপর বইগুলো,শাড়িটা আর ছোট্ট চুরির বক্সটা আবার বড় বক্সের ভেতর গুছিয়ে নিল।

বক্সটা বুকে জড়িয়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে লাগল।

মাথার ভেতর তখনও ঘুরছে চিরকুটের কয়েকটা লাইন।

"শুধু দূর থেকে কারো গল্প হয়ে বেঁচে থাকতে চায়"

হঠাৎ

ঠাস!

কঠিন কিছুর সাথে ধাক্কা খেল সে।

উফফ কিরে

তনুজা কপাল চেপে ধরে বলল

এখানে খাম্বা আসল কবে আবার?

কথাটা বলেই উপরে তাকালো। তারপর জমে গেল।

সাথে রাহা ডেব ডেব করে তাকিয়ে আছে তনুজার পিছন থেকে!

এটা খাম্বা না তুষার কালো রঙের টি-শার্ট। কালো ট্রাউজার পরে দাড়িয়ে আছে।চুলগুলো একটু এলোমেলো।চোখ দুটো অস্বাভাবিক লাল।মনে হচ্ছে চোখ না আগুনের গোলা এখনই ছুরে মারবে গোলা গুলো মনে হচ্ছে।

তুষারও চুপচাপ তার দিকে তাকিয়ে আছে।

তুষারের চোখ একবার বক্সটার দিকে গেল।তারপর আবার তনুজার দিকে।

কয়েক মুহূর্ত পর সে শান্ত গলায় বলল

সামনে দেখে হাঁটতে পারিস না চোখ কি পকেটে নিয়ে ঘুরিস?

তনুজা ভ্রু কুঁচকাল।

"খাম্বার মতো দাঁড়িয়ে থাকলে তো ধাক্কা খাবই

তুষারের চোয়াল শক্ত হলো।কিন্তু কিছু বলল না

পাশ কাটিয়ে চলে যেতে নিল।তনুজা হঠাৎ খেয়াল করল।

তুষারের চোখের নিচে হালকা কালচে ছাপ।

মনে হচ্ছে রাতেও ঠিকমতো ঘুমায়নি। মুখখানাও ফ্যাকাসে দেখা যাচ্ছে কি হয়েছে এই লোকের?

কিন্তু সে নিজেই সঙ্গে সঙ্গে নিজের মাথা ঝাঁকাল।

তার কী

ঘুমাক বা না ঘুমাক। তার তো কিছু যায় আসে না।

কেন যেন সিঁড়ির মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় কয়েক সেকেন্ড তুষারের চলে যাওয়া পিঠটার দিকেই তাকিয়ে রইল সে।

রাহা তনুজার বিছানার উপর পা গুটিয়ে বসে প্লান করছিল সাদের বিয়েতে তারা কি কি করবে।

রাহা বলল চল ডান্স প্র্যাকটিস করি একদম নেচে ধামাকা দেখিয়ে দিবো

তনুজাও এক মত দিলো

চল!কি গানে নাচা যায়?

"দাঁড়া দেখছি আমি

তনুজা রাহার দিকে তাকিয়ে বলল

আচ্ছা তোর ভাই এই সময় বাসায় কী করছে?অফিস যায়নি আজ?

রাহা অবাক হয়ে তাকালো

"কেনো তুই জানিস না?

"কী?

ভাইয়ার জ্বর এসেছে।কাল রাত থেকেই

তনুজার হাত থেমে গেল

"জ্বর?

হুম"

তাই আব্বু আজ অফিসে যেতে মানা করেছে

তনুজা অজান্তেই ভ্রু কুঁচকে ফেলল

তুষার আর অফিস কামাই?অসম্ভব প্রায়। জ্বরটা তাহলে বেশ ভালোই হয়েছে।মুহূর্তের জন্য বুকের ভেতর কেমন যেন খচখচ করে উঠল।অদ্ভুত একটা মায়া।

এই মানুষটার জন্য মায়া কেন যে এত সহজে কাজ করে, সেটা আজও বুঝতে পারে না সে।

তবে সেই মায়াটা প্রকাশ্যে আসার আগেই তার জেদ এসে গলা চেপে ধরে।

শুধু স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করে জিজ্ঞেস করল,

ওষুধ খায়নি নিশ্চয়ই?

রাহা এবার হো হো করে হেসে উঠল।

ভাইয়া আর ওষুধ খাওয়া? মা সকালে তুলসীপাতা,মধু, আদা কী কী দিয়ে এক জঘন্য জিনিস বানিয়ে দিয়েছিল।

খায়নি।আমাকে মা কফি বানিয়ে পাটিয়ে ছিলো সেটা নাকি চিনির জন্য খাওয়া যায় না।এক চুমুক খেয়ে বিদায় করে দিয়েছে আমাকে।

তনুজা চুপ করে গেল

তুষার কফিতে কখনো চিনি খায় না। তনুজা মানে এই লোকের মুখের তিক্ততা এই বদতিতা কফির জন্যই হয়েছে।

এখানে আসার পর থেকে তনুজাই তুষারের কফি বানায়। তার আগে সে নিজেই বানিয়ে খেতো এবং সুগার ট্যাবলেট দিয়ে।তাহলে সে বানানোর পর থেকে কেনো খায় না?

তনুজার মনে হলো;

সে কি একটা কফি বানিয়ে নিয়ে যাবে?পরক্ষণেই নিজেকে ধমকালো।ধুর!

রাহার বানানোটা খায়নি,তারটা খাবে?অসম্ভব

তবুও কেন যেন বিষয়টা মাথা থেকে নামল না

এরপর তারা আবার শাড়ি আর উপহারের আলোচনা শুরু করল

শাড়িটা হাতে তুলে নিয়ে তনুজা বলল

সাদ ভাইয়ার বিয়ের দিন এটা পরব ভাবছি।

কেমন?

রাহা নাটকীয় ভঙ্গিতে মাথা নাড়ল।

হ্যাঁ পরেন নিজের টা তো বুঝে নিলি আমি কি পরবো?

কেনো তোর জামা কাপড় নেই?

রাহা আমতা আমতা করে বলল

ওগুলো তো সব পরে পোস্ট করে ফেলেছি

তনুজা হেসে বালিশ ছুড়ে মারল তার দিকে

বাংলাদেশ—

অফিসের বাবার কেবিন রুমে বসে ফাইল দেখছিল তন্ময়

সামনে বসে আছেন আজমল মির্জা তনুজা এবং তন্ময় এর বাবা

হঠাৎ নিরাপত্তা ভঙ্গ করে গলা ঝেড়ে কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে জিজ্ঞেস করলেন,

"তোমার বোনের সাথে কথা হয়?

টনময় মুখ তুলে তাকাল

জি,আব্বু হয়েছিল

কেমন আছে?

ভালো আছে।

আজমল সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেললেন

দিন তো অনেক হলো"

একবার গিয়ে দেখে আসো সময় করে

টনময় চুপ করে রইল

তারপর বলল

এই প্রজেক্টটার ঝামেলা শেষ হলেই যাব ভাবছি।

আজমল সাহেব ছোট করে বল্লেন

"হুম

কিছুক্ষণ নীরবতা

টনময় ইতস্তত করে বলল,

আব্বু তুমিও চলো না আমার সাথে?

আজমল সাহেব মৃদু হেসে মাথা নেড়ে দিলেন।

তোমাড বোন আমার সাথে দেখা দিবে?ওর দেখা পাওয়া এখন চাঁদ হাতে পাওয়ার মতো।তুমি বরং তোমার মা কে বলে দেখতে পারো।

"আম্মুকেও বলেছিলাম

কী বলল?

একই কথা

আজমল সাহেব চেয়ারটায় হেলান দিলেন।

তারপর খুব আস্তে বললেন,

মেয়েটা এত রাগী হবে কোনোদিন ভাবিনি।একদম তার মায়ের স্বভাব পেয়েছে।

টনময় ম্লান হাসল। সে বড় বিপদে আছে।এদিকেও থাকতে পারে না,ওদিকেও না।তার বাবা মা যদি আগুন হয়।তাহলে তার বোন পুরো আগ্নেয়গিরি।সারাক্ষণ টগবগ করছে।কখন বিস্ফোরণ হবে সেই অপেক্ষা।

সন্ধ্যার কিছু পরে।

বাড়িটা তখন অস্বাভাবিক নীরব।রুবি বেগম গিয়েছেন আসমা বেগম এর সাথে শপিংমলে।বিয়ের কিনা কাটা শুরু হয়েছে।বিয়ের তারিখ এখনো নির্ধারণ হয়নি।মেয়ের বাড়ি থেজে মানুষ এসে তারপর ঠিক করবে।

তনুজা রাহা দুপুরের খাওয়ার শেষে বিকাল থেকে নাচের প্র্যাকটিস করছিলো।এখন বেশ খিদে পেয়েছে তাদের দুইজনই নিচে নামলো।কিছু খওয়ার জন্য।

টেবিলের এক পাশে তনুজা আরেক পাশে রাহা বসে আছে সামনে তাদের নুডুলস রাখা।তবে তনুজা খেতে পারছে না।নিচে আসার সময় তুষারের ঘরের দিকে একবার নজর দিয়েছিল।ঘরটা অন্ধকার তিমিরে ঢাকা। দুপুরে তাদের সাথে খেতে নিচে নামেনি।

তুষার ভাই কিচু খায়নি এখনো?

রাহা ফোন এ মগ্ন হয়ে ছিলো তনুজার কন্ঠে তার হুশ ফিরে এলো যেনো।

"না বধহয় আম্মু ও তো যেতে সময় কিছু বলল না।

তনুজা রান্নাঘর এর দিকে গেলো ট্রেতে ধোঁয়া ওঠা কফি

সাথে স্যুপ রান্না করে একটা ট্রে হাতে রান্না ঘর থকে বের হলো।

রাহা মুখ টিপে হাসলো।তবে কিছু বলল না।

নিজেকে হাজারবার বোঝানোর পরেও শেষ পর্যন্ত হার মেনেছে সে।কেউ অসুস্থ থাকলে তাকে এড়িয়ে চলা তার দ্বারা হয় না।যতই রাগ থাকুক।

তুষারের দরজার সামনে এসে দাঁড়াল সে।কয়েক সেকেন্ড ইতস্তত করল।

তারপর ধীরে বলল

তুষার ভাই আসবো?

ভেতর থেকে গম্ভীর গলা ভেসে এলো

আয়;

তনুজা দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল

ঘরটা আধো অন্ধকার

তুষার কম্বল মুড়িয়ে শুয়ে আছে।এক হাত চোখের উপর রাখা।মুখটা ফ্যাকাসে।অদ্ভুতভাবে ক্লান্ত দেখাচ্ছে তাকে।

তনুজার বুকের ভেতর কেমন যেন করে উঠল।

সে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল

আপনার জন্য কফি এনেছি

তুষার হাতটা চোখের উপর থেকে সরিয়ে তাকাল

কয়েক সেকেন্ড শুধু তাকিয়েই রইল

তারপর ধীরে ধীরে উঠে বসল

তনুজা ট্রেটা সাইড টেবিলে রেখে ফার্স্ট এইড বক্স থেকে ওষুধগুলো বের করে সামনে রাখল

তুষার কফির মগটা হাতে তুলে নিল

কাপে চুমুক দিতে দিতে তাকিয়ে থাকলো তনুজার দিকে।

তবুজার পায়ের নখ থেকে শুরু করে মাথার চুল পর্যন্ত পরোক্ষ করলো।

তনুজা কালো জামা পরেছে আজ। ফর্সা গায়ে যেন তা মহনীয় লাগছে।চুলগুলো পাঞ্চ ক্লিপ দিয়ে আটকানো। বাম হাতের তাড়ি দেওয়া সোনালী রঙের ব্রেসলেটটা। কানে পরেছে ছোট সাদা পাথরের টপ কানের দুল চেহেরা বাড়তি কিছু দেয়নি কিন্তু ঠোট টা গোলাপি গোলাপের পাপরির মতো ফুটে আছে।তাতেই যেনো মুগ্ধকর লাগছে তনুজাকে

কেন এসেছিস?

তনুজা ভ্রু কুঁচকাল

মানে?

এগুলো নিয়ে আমার উপর দয়া দেখাতে?

তনুজা এবার সরাসরি তাকাল।

দয়া দেখাতে আসব কেন?আপনি কি ভিক্ষুক?

তুষারের মুখের ভাব বদলালো না

মনে তো তাই হচ্ছে।না হলে তুই এসব নিয়ে আসবি কেন?

নিশ্চয়ই শুনেছিস কিছু খাইনি।তাহলে তুই কেন এলি?

তনুজা চুপ

তুষার আবার বলল

ভেবেছিস তুই আসলে তোকে মাথায় নিয়ে নাচব?সব ভলে যাবো?

তারপর সম্পূর্ণ শান্ত স্বরে বলল,

বের হয়ে যা

তনুজা হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইল

কী?

I said get out of my room.

মুহূর্তেই তার মুখের রং বদলে গেল

অপমান বোধ হলো।নিজের উপরই রাগ হলো। আজ কাল কাউর অপকারই করতে নেই!

কেন এসেছিল সে?

সে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল

ঠিক আছে

আমারই ভুল হয়েছে। আপনার কাছে সব রাগ-অভিমান ভুলে আসা উচিত হয়নি।আর আসব না

কথাগুলো বলেই দরজার দিকে হাঁটতে শুরু করল

ঠিক তখনই পেছন থেকে তুষারের ডাক এলো

শোন

তনুজার পা থেমে গেল

বুকের ভেতর আশার ক্ষীণ আলো জ্বলে উঠল

হয়তো অনুতপ্ত হয়েছে নিশ্চয়ই সরি বলবে!

কিন্তু সে পেছনে ফিরল না

তুষারের পরের কথাটা শুনেই সেই আশাটুকুও মারা গেল।

দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে যাস।আর পরে এসে আমার রুমটা পরিষ্কার করে দিয়ে যাবি

কয়েক সেকেন্ড স্থির দাঁড়িয়ে রইল তনুজা

তারপর দাঁত চেপে বলল,

আপনার মাথায় সত্যিই গিলু নেই

ধপাস করে দরজা বন্ধ করে বেরিয়ে গেল সে

আর তুষার

মগটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ বন্ধ দরজার দিকেই তাকিয়ে রইল।

তারপর খুব আস্তে করে কফিতে আরেকটা চুমুক দিল।

চলবে;

পর্ব সংখ্যা —২১

অচেনা প্রনয়ের চিরকুট লেখিকা— তাসনিয়া জাহান

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২১তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন