তনুজার চোখে আর ঘুম এলো না।চোখ বন্ধ করেও বারবার সেই স্বপ্নটাই মনে পড়তে লাগলো।
এর আগে কয়েকবার তুষারকে নিয়ে স্বপ্ন দেখেছে সে। কিন্তু সেসব স্বপ্নে তুষার সবসময় আগের মতোই ছিল কখনো ধমক দিচ্ছে,কখনো খোঁচা মেরে কথা বলছে কখনো নিজের কঠিন স্বভাব দেখাচ্ছে
কিন্তু আজকের স্বপ্নটা।এটা যেনো অন্যরকম
তনুজার মনে হচ্ছিলো,সে যখন স্বপ্নটা দেখছিলো তখন সবকিছু সত্যি সত্যি অনুভব করছিলো।যেনো ঘুমের মধ্যে নয়,বাস্তবেই তুষার তার সামনে ছিল।কিন্তু যদি সত্যিই হতো.তাহলে ঘুম ভাঙার পর নিশ্চয়ই কোনো না কোনো
কিছু দেখতে পেতো।কিন্তু না কিছুই তো নেই।
এসব ভাবনার মাঝেই হঠাৎ তার ফোনে আজানের সময় হওয়ার অ্যালার্ম বেজে উঠলো।তনুজা ভাবনা থেকে বেরিয়ে এসে ফোনটা হাতে নিলো।অ্যালার্ম বন্ধ করতে গিয়ে খেয়াল করলো
একটা ইনকামিং মেসেজ এসেছে।সে সঙ্গে সঙ্গে মেসেজটা ওপেন করলো।তনুজার প্রশ্নের উত্তরে লোকটা লিখেছে
"থাকুক না কিছু পরিচয়হীন সম্পর্ক। কিছু সম্পর্কে পরিচয় আনা ঠিক না,মিস।কিছু সম্পর্ক পরিচয়হীন থাকাটাই মাঝে মাঝে ভালো হয়।আপনি আমাকে বন্ধু হিসেবে মেনে নিতে পারেন। পরিচয়হীন সম্পর্কে নিঃশর্তে সবকিছু করা যায়। মন খুলে কথা বলা যায়। ভয় থাকে না কেউ জানার।
"আমার কাছে এই সম্পর্কটা এক অচেনা ভালোবাসা যে ভালোবাসা নিঃশব্দে প্রতিদিন আমার হয়"
মেসেজটার দিকে বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো তনুজা।
কেনো যেনো তার ঠোঁটের কোণে হালকা একটা হাসি ফুটে উঠলো।কিন্তু পরমুহূর্তেই সেই হাসি মিলিয়ে গেলো।
মনটা কেমন যেনো খারাপ হয়ে গেলো তার
কেনো?সে নিজেও জানে না।তনুজা পাশ ফিরে তাকালো রাহার দিকে।
হালকা করে ঝাঁকুনি দিয়ে ডাক দিলো
কোনো সাড়া নেই। রাহা গভীর ঘুমে ডুবে আছে। তনুজা আর ডাকলো না।নিজেই উঠে পড়লো। রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নামাজ পড়লো। কিন্তু কেনো যেনো আজ সিজদায় গেলেই তার চোখে পানি চলে আসছিলো।
হয়তো কাউকে দেখার আকাঙ্ক্ষায়।নাকি কাউকে কাছে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষায়।সে নিজেও জানে না।
সকালের পাখির কিচিরমিচির শব্দে ভোরের নরম আলো ঘরটাকে এক অন্যরকম মায়ায় ভরে তুলেছে।জানালার পর্দা ভেদ করে সূর্যের আলো পুরো ঘরে ছড়িয়ে পড়েছে।
উপুড় হয়ে শুয়ে আছে তুষার।কমফোর্টারটা কোমর পর্যন্ত টানা।বাতাসের সাথে পর্দাগুলো নড়ছে,আর সূর্যের আলো এসে সরাসরি পড়ছে তার মুখের উপর। আলোর স্পর্শে তুষারের ঘুম ভেঙে গেলো।ঘুম ঘুম চোখে হাতড়ে নিজের ফোনটা খুঁজলো।
পেয়েও গেলো। এক চোখ খুলে সময় দেখলো পাঁচটা বিশ বাজে। তারপর ধীরে ধীরে উঠে বসল।খাটের সাথে হেলান দিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো।ছুটির দিন হোক কিংবা কাজের দিন।সারা রাত না ঘুমালেও মাত্র এক ঘণ্টার জন্য চোখ বন্ধ করলেও এই সময়টায় তার ঘুম আর আসে না।
ফ্রেশ হয়ে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামলো তুষার। তার গন্তব্য জিম রুম।লিভিং রুমের এক পাশে ছোট একটা রুম আছে। ছোট বললে ভুল হবে।একজন মানুষের থাকার মতো যথেষ্ট জায়গা। তুষারের প্রতিদিনের সকাল শুরু হয় এখান থেকেই।
লিভিং রুম পার হয়ে স্লাইডিং দরজাটা খুলতে হাত বাড়িয়েছিলো সে।কিন্তু খেয়াল করলো
দরজাটা আগে থেকেই খোলা। তুষার ভেতরে ঢুকলো।
রুম টার দুই সাইড জুরেই খোলা কাচের দরজা বড় বারান্দার মতো।দরজাটা মূলত বাড়ির পিছনের বাগানের দিকে খোলে।
আর সেখানে সাদা রঙের থ্রি-পিস পরা এক নারী বসে আছে। মাথায় ঘোমটা।পিঠ জুড়ে ছড়িয়ে আছে তার ঘন কালো চুল। তার পাশে বসে আছে মুলান তার টাইগার।
অন্য পাশে রাখা ধোঁয়া ওঠা এক কাপ চা। আর হাতে একটা বই।
তনুজা এক হাতে মুলানের মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।
তুষার দুই হাত টাউজা এর পকেটে রেখে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলো।
তারপর গলা খাঁকারি দিয়ে নিজের উপস্থিতি জানান দিলো।তনুজা পেছনে ফিরে তাকালো। সকালের নরম রোদ তার মুখে পড়েছে।
তনুজা ফের বই পড়তে মনোযোগ দিলো।
তুষার বললো
"আজ দুপুরে পাখি ভোরে হাজিরা দিলো কীভাবে?
তনুজার মুখে কোনো পরিবর্তন হলো না
সে শান্ত গলায় বললো
"এমনিই ঘুম আসছিলো না
তুষার ডাম্বেল হাতে নিয়ে ব্যায়াম করতে শুরু করলো
"ঘুম কে কেড়ে নিলো শুনি?
তনুজা মনে মনে বললো
"আপনি নিয়েছেন। অসহ্য পুরুষ কোথাকার।নিজেই ঘুম কেড়ে নিয়ে নিজেই জিজ্ঞেস করছে।
কিন্তু মুখে বলল
"কেউ না
তুষার হালকা ঝুঁকে তনুজার পাশে রাখা চায়ের কাপটা তুলে নিলো
এক চুমুক দিতেই
"আরে!ওটা আমার চা!
তুষার শান্ত গলায় বললো
"বহুদিন পর সকালে চা কপালে জুটলো।
তনুজা ভ্রু কুঁচকে তাকালো
"ওটা আমার ছিল,আপনি খেলেন কেনো?
"তো আমারটা কথা নিয়ে বসতে পারলি না?
"আমি কি জানি তুমি আকাশ থেকে টপকে এখানে এসে পড়বে?
তুষার থেমে তাকালো
"এইইই তুই যেকোনো একটা সম্পর্কে এসে কথা বল হয় তুমি বল নয় আপনি ডিসাইড কর আগে।
তনুজা থতমত খেয়ে গেলো
ছোটবেলা থেকেই তুষারকে সে এভাবেই সম্বোধন করে আসছে। কারণ সম্পর্কটাই এমন
চাচাতো ভাই হিসেবে"তুমি"আবার খালাতো ভাই হিসেবে "আপনি
তনুজা মুখ বাঁকিয়ে বললো
"না পারবো না। আপনি সমস্যা হলে নদীতে গিয়ে ঝাঁপ দিন।
তুষার ভ্রু তুললো
"তুই আমাকে মারতে চাস?
"কই?এমন তো কোনো কথা বলিনি
"মাত্রই তো বললি
তনুজা আর কোনো উত্তর দিলো না।
কিছুক্ষণ পর তুষার কয়েকটা পুশআপ দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে বললো
"আমি জগিংয়ে যাচ্ছি।এসে যেনো আমার কফি পাই
তনুজা মুখ বাঁকিয়ে বললো
"ইশশ মামার বাড়ির আবদার পেয়ে গেছে। পারবো না আমি কি সকালে উঠেছি আপনার কামলা খাটার জন্য নাকি?
তুষারের কপালে ভাঁজ পড়লো।
গেট আউট'
তনুজা অবাক হয়ে তাকালো।
এই লোক কোথা থেকে তাকে বের হতে বলছে?
এটা কি তার দাদার বাড়ি নাকি?
সে বললো
"কেনো?কেনো যাবো আমি?আপনি যান।
"আমি তোর জান না।বের হতে বলেছি বের হ।
তনুজা চোখ পাকিয়ে বললো
"আমার জীবনে জানোয়ারের অভাব নেই। সে এসেছে তাকে আমি জান বলবো বয়ে গেছে আমার।
তুষার কিছু বলার আগেই তনুজা দৌড়ে পালালো।
তুষার কোমরে দুই হাত রেখে দরজার দিকে তাকিয়ে রইলো।
তনুজা রুবি বেগম কে আজ সাহায্য করছে সকালের নাস্তা বানাতে।রুবি বেগম প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারছিল না। তনুজা এতো সকালে নিজে নিজে উঠে বসে আছে?
তার পর শরীর মুখ গলা ছুঁয়ে দেখলো। তনুজার জোর এসেছে কিনা।কিন্তু না তার তো কিছু হয়নি। তাহলে এতো সকালে মেয়েটার ঘুম ভাঙলো কিভাবে?
তনুজা নিজেই বেশি অর্ধেক কাজ করে ফেলেছে। লন্ডন এ আসার পর থেকেই সে রুবি বেগম এর পাশে বসে বসে রান্না করা দেখতো।আস্তে আস্তে সবই শিখা শেষ।
টেবিলে দুইজন মিলে খাবার সাজাতে সাজাতে। সিড়ি বেয়ে নেমে এলেন।আরোশ সাহেব।আর দরজা দিয়ে ঢুকলো তুষার।আরোশ সাহেবও বেশ অবাক তনুজাকে রান্না ঘরে দেখে।
কিরে মা শরীর ভালো না?
তনুজা খুব ভলোই বুঝতে পেরেছে তাকে কেনো এই প্রশপ্রশ্ন করা হলো।প্রথম প্রথম সে সকাল সকালই উঠতো।কিন্তু এখন বেশিরভাগ সময় রাত জেগে পড়ার কারনে সে সকালে উঠতে পারে না।
তনুজা আড় চোখে একবার তুষারের দিকে তাকালো। তুষার সোজা নিজের রুমে চলে যাচ্ছে
জ্বি ছোট আব্বু ভালো।আসলে রাতরে ঘুম হয়নি তাই আজানের পর আর শুইনি। ভাবলাম অনেকদিন হলো তোমাদের নাস্তা করে খাওয়ানো হয়না। তাই আজকে বানিয়ে ফেললাম?
ওওওহো তাই নাকি আমার মা"টা বড় হয়ে গিয়েছে দেখছি। তা কি কি বামিছো দেও তারাতাড়ি।
সবাই এক সাথে নাস্তা করছে।খাওয়ার মাঝে আরোশ সাহেব তুষারকে জিজ্ঞেস করলেন।
টিকেট কেটেছিলে?
তুষার তার শান্ত কন্ঠ উত্তর দিলো
জ্বি,কালই কেটে ফেলেছিলাম।
তা ফ্লাইট কয়টায় পরলো?
আজকে রাত একটায়;
তন্ময় এর টা?
ওরটা দশটার দিকে পরেছে বোধহয়।
কিসের ফ্লাইট?কোথায় যাচ্ছে তুষার?
তাদের কথার মধ্যে রুবি বেগম প্রশ্ন করলেন। সে তো কিছুই যানে না এই বিষয়ে।
আরোশ সাহেব বললেন কাজের জন্য যাচ্ছেও আর তন্ময়।
কোথায়?
প্যারিস
"আাবার প্যারিসসসস??
তনুজা,রাহা,এক প্রকার চিল্লিয়ে উঠলো!
"প্যারিস যাবেন তুষার ভাই?
তনুজা খুব করুন কন্ঠ জিজ্ঞেস করলো
তুষার একবার রাহা,তনুজার দিকে তাকালো। তারা বেশ আশাহত নজরে তাকিয়ে আছে।যেনো বলতে চাচ্ছে তাদেরও সঙ্গে নিয়ে যেতে।
তুষার ছোট করে বলল—হুম
তনুজার ড্রিম কান্ট্রি।প্যারিসের আইফেল টাওয়ারটা তার বেশ পছন্দের।
রাহা বলল
তুষার ভাই আমাদেরও নিয়ে।
"নো;
আরে ভাই আমার কথাটা তো শুনো
নো
ভাই;
রাহা চুপ করতো;রুবি বেগম থামিয়ে দিলেন রাহা কে। তনুজা কিছু বলছে না সে জানে তার বলে লাভ নেই।
হেরে তুই ফিরবি কবে?
বলা যাচ্ছে না মা।
তাহলে তুই সাদের বিয়েতে থাকবি না?আগামী সাপ্তায়ই তো ওর বিয়ে।
আমি এইসব পছন্দ করি না মা তুমি জানো।
তোমরা যেও
তা না হয় গেলাম।ওদের তো এইখানে তেমন কেউ নেই আসমা ভাবি বলছিলেন তোরা দুই ভাই থাকলে একটু উপায় হতো।
আমি কাউর হেলপিং হ্যান্ড না মা।
আচ্ছা বাদ দেও তো রুবি।
তা অফিস যাবে আজকে নাকি রেস্ট নিবে বাসায় থেকে?
জ্বি অফিস যাবো কিছু দরকারী ফাইল রিচেক দিতে হবে।
ঠিক আছে।
যে যার খাবার শেষ করে উঠে বের হলো যার যার গন্তব্যে।
মে আই কামিং?
এক মেয়েলি কন্ঠে কেউ তুষারের ক্যাবিনে ঢুকার অনুমতি চাইলো। তুষার নিজের দৃষ্টি ল্যাপটপে রেখেই অনুমতি দিলো।
ইয়েস কামিং!
উচু হিল জুতার খট খট আওয়াজ তুলে মেয়েটা যেনো জানান দিচ্ছে তুষার কে সে প্রবেশ করেছে। তুষার এক সেকেন্ডের জন্য উপরে নজর তুললো।সাথে সাথে তার কপালে দুই থেকে তিনটা ভাজ পরে গেলো।
মেয়েটা হাঁটুর উপরে একটি লাল রঙের বেবি ফ্রক পড়ে আছে।গায়ের রঙ ফর্সা হওয়ার কারনে লাল রঙটা বেশ মানিয়েছে তবে তুষারের বিন্দু মাএ মাথা ব্যাথা নেই সেই শবে
তুষার বেশ তীক্ষ কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো।
কি চাই?
জুমানা একটু ঝুঁকে দুইহাত বলল তুষারের টেবিলে রেখে বলল
আপানে স্যার।আপনি আমার কল করছেন না মেসেজের রিপ্লাই দিচ্ছেন না কেনো?
আমার কি এইাব করার কথা ছিলো?
জুমানা ঠোঁটের কনে হাসি রেখে বলল
আপনি আমাকে এড়িয়ে চলছেন কেন?
কি বলতে চাচ্ছেন আপনি তা বলে বের হতে পারেন মিস।
“আই লাভ ইউ।ডোন্ট ইউ নো?মি.তুষার?
তো তাতে আমি কি করতে পারি?আপনাকে কলে নিয়ে বসে থাকার কথা ছিলো আমার?
জুমানা খুব অসহায়ের মতো কন্ঠ করে বলল৷
মি.তুষার আপনি আমাকে ভালোবাসেনা?
নো"
জুমানার মুখের উপরে এই ভাবে রিজেক্ট করে দিবে তুষার তা হয়তো জুমানা ভাবেইনি।
তুসার ফের বলল।
“মিস জুমানা,লিভ অল দিস অ্যান্ড ফোকাস অন ইয়োর ওন ম্যারেজ।
তনুজা রাহা আর অদিতি ইউনিভার্সিটি থেকে বের হলো।
রোজ আসেনি আজকে।
রোজ এর কি সমস্যা বলতে আসলো না কেনো?আজকের এমন গুরুত্বপূর্ণ ক্লাস টা মিস করলো।
অদিতি বলল
গ্রুপ এ মেসেজ দেখিসনি?
রাহা বলল আমি দেখেছি।
আমি সকাল থেকে ফোন দেখার সময় পায়নি রে।
অদিতি বলল
পার্টি রাখা হয়েছে।রোজ আমাকে বলেছে তোকে আর রাহা কে আজ নিয়েই যেতে
দেখ বোন না করিস না প্লিজ সেখানে তোদের ছাড়া ভালো লাগে না চল না প্লিজ।
তনুজা কখনো এই পার্টিতে যেতে রাজি হয় না প্রতি মাসেই হয় এটা কিন্তু সে যায় না।তনুজার কারনে রাহা ও রাজি হয়নি এতদিন।কিন্তু এইবার না করার সুযুগই মিলল না অদিতি একদম নাছোরবান্দা সে নিয়েই যাবে শেষে তনুজা রাজি হলো
*
তুষারের ক্যাবিনে তখন পরিবেশটা একদম অন্যরকম।
জুমানা দাঁড়িয়ে আছে সামনে।মুখে রাগ
তুষারের কথা তার একদম পছন্দ হয়নি।
জুমানা কিছুক্ষণ চুপ থেকে হেসে ফেললো,তবে সেই হাসিতে মিশে ছিল অন্য কিছু
"আমি এই বিয়েটা নিজের ইচ্ছায় করছি না মি.তুষার?
তুষার তাকালো না
জুমানা বললো
"বাবার ইচ্ছায় করতে হচ্ছে।আমি আমার কাজ শেষ করেই তাকে ডিভোর্স দিয়ে দিবো।
তারপর একটু এগিয়ে এসে নিচু গলায় বললো,
"প্লিজ ততদিন আপনি আমার হয়ে থাকুন।আমি কথা দিচ্ছি,তার সাথে আমি এক বিছানাতেও ঘুমাবো না।
তুষারের মুখের ভাব এক মুহূর্তে বদলে গেলো।সে ঠান্ডা গলায় বললো,
"সে আপনার হালাল পুরুষ হয়ে যাবে।তারপরও বলছেন তার সাথে শুবেন না?
একটু থেমে আবার বললো,
"আর এভাবে কত হারাম মানুষের সাথে ঘুমিয়েছেন,তার হিসাব কীভাবে দিবেন?
জুমানা থমকে গেলো।
তারপর হঠাৎ উল্টো প্রশ্ন ছুড়ে দিলো
"মি.তুষার,এইবার বেশি বেশি হচ্ছে।এমন ভাব করছেন যেন আপনি কখনো কোনো নারীর সাথে শোননি?
তুষারের চোখ কঠিন হয়ে উঠলো।
,মিস জুমানা হোসাইন।মাইন্ড ইয়োর ল্যাঙ্গুয়েজ।ভুলে যাবেন না আপনি আমার ক্যাবিনে দাঁড়িয়ে আমার চরিত্র নিয়ে কথা বলছেন।"
তারপর একটু ঝুঁকে ঠান্ডা হাসি দিয়ে বললো,
"আর কী বললেন?আমি কখনো কোনো নারীর সাথে শুয়েছি কিনা?
কিছুক্ষণ নীরব থেকে বললো
"আমার জীবনে একজন নারীই আছে,যার জন্য হাজার নারীকে আমি পায়ের নিচে রাখি।আর তাকে রাখি মাথার তাজ করে।
জুমানার কপালে ভাঁজ পড়লো
"তার মানে আপনার জীবনে কেউ আছে?
তুষারের চোখে অদ্ভুত এক দৃঢ়তা
"আমার পুরো পৃথিবী জুড়ে শুধু সেই একজনই আছে"
জুমানা আর কিছু বলার আগেই দরজায় শব্দ হলো
সাইফ,আবির,জুমানার বাবা নাজমুল হোসেন এবং আরোশ সাহেব ভিতরে ঢুকলেন।
তুষার সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়িয়ে নাজমুল হোসেনকে সম্মান দিয়ে সালাম দিলো।
নাজমুল হোসেন তুষারদের খুব পুরনো ডিলার।যার সুবাদে আরোশ সাহেব এর সাথে তার বেশ ভালো সম্পর্ক রয়েছে।নাজমুল হোসেন মূলত এসেছেন আজকে তার মেয়ের বিয়ের দাওয়াত দিতে
আবির,সাইফকে যেহেতু জুমানা চিনে তাই তাদেরও দাওয়াত দেওয়া হলো
কিছুক্ষণ কথাবার্তার পর সবাই বের হওয়ার প্রস্তুতি নিলো।আবির তুষারকে জিজ্ঞেস করলো
কিরে বের হবি কখন?
তুষার বলল
বস এক ঘন্টার মধ্যেই বের হয়ে যাবো।
জুমানা সবার পিছনে বের হলো যাওয়ার সময় একবার পিছনে তাকিয়ে তুষারকে চোখ মেরে মাঝের আঙুল দেখিয়ে বের হয়ে গেলো।
তুষারের কপালের দুই পাশের শিরা ফুলে উঠলো
*
*
*
বাসায় ফিরে তুষার তার ব্যাগ গুছালো।ফ্রেশ হয়ে নিচে এসে খেতে বসলো।হঠাৎ গলা ছেড়ে ডাকদিলো
"তনুউউউ
উপরে রাহার সাথে কথা বলছিলো তনুজা।পার্টি তেকি পরে যাবে সেই নিয়ে আলোচনা বসেছে।
তুষারের গলা পেয়ে নিজের নাম শুনেসে অবাক হলো। সে কি ভুল শুনলো?
তুষারের ফের ডাক এলো
"তনুউউ..ব্রেইন এর সাথে কি কানটাও বাতিল করেছিস?
এবার রাহা আর তনুজা দুজনেই দৌড়েনিচে নামলো।নামতে নামতে।
তুষার আবার ডাকলো
তনুউউ
তনুজা বিরক্ত হয়ে সামনে দাঁড়িয়ে বললো
"কি হয়েছে?এভাবে ডাকছেন কেন?
তুষার শুধু একবার তার মুখের দিকে তাকালো।তারপর আবার খাবারের দিকে মন দিলো।বাম হাত দিয়ে একটা কাগজ এগিয়ে দিলো।তনুজা কাগজটা হাতে নিয়ে দেখলো;একটা চেক।
আর সেখানে লেখা অঙ্ক দেখে তার চোখ বড়হয়ে গেলো তনুজা তুষারের দেওয়া চেকটার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো।
তনুজার মাথায় কিছুই ঢুকছে না।
সে চেকটা হাতে নিয়ে অবাক চোখে তাকিয়ে বললো
"আমি এটা দিয়ে কি করবো?
তুষার খেতে খেতেই শান্ত গলায় বললো
"তন্ময়কে দিবি।
তনুজার নিজের সোজাসাপ্টা প্রশ্ন করলো
"তা আপনার হাতে কি হয়েছে আপনি দিতে পারবেন না?
তুষার রাগী দৃষ্টিতে একবার তাকালো তবে কিছু বলল না।রাহা সোফায় বসে তাদের কান্ড দেখছে আর ফোন চালাছে।
তনুজা আবারও চেকটার দিকে তাকালো।
সংখ্যাটা কেনো যেনো তার চিনা চিনা লাগলো
সতেরো লাখ টাকা।
তার চোখ দুটো বড় হয়ে গেলো।
"তন্ময় ভাইকে কেনো দিবেন এতো গুলো টাকা?
তুষার এবার তার দিকে তাকালো।
"বাইক কেনার সময় যে টাকা ওর থেকে নিয়েছিলি, সেটার টাকা এটা।"
তনুজার মুখটা ধীরে ধীরে নিচু হয়ে গেলো।
কিছুক্ষণ চুপ থেকে আস্তে করে বললো
"এই টাকা আমি দিয়ে দিবো। সময় হলে আপনার দিতে হবে না।
তুষার ভ্রু কুঁচকালো।
নিজে দিতে পারলে অবশ্যই ওর থেকে ধার নিতি না? রাইট? আর বাকি টাকা কোথায় পেয়েছিলি?
আর বাকি টাকা কোথায় পেয়েছিলি?
তনুজা এবার একটু স্বাভাবিক হয়ে বললো
"বাকি পুরো টাকা তো লাগেনি।বাকি টাকা বাইক রেসের মালিক দিয়েছিল।
তুষার থেমে গেলো
"কেন?তোর উপরে এতো দয়া হলো কেনো তার?পয়ত্রিশ লাখ টাকার বাইক অর্ধেক দামে দিয়ে দিলো কেনো?
তনুজা একটু হেসে বললো
"টানা চার মাস আমি ফার্স্ট হয়েছিলাম বলে উনি গিফট দিতে চেয়েছিল।আমি নিতে চাইনি।তখন তো আমি রোজের বাইক দিয়ে রেস করতাম।তাই ভাবলাম নিজের একটা বাইক কিনি।এই বাইকটাই পছন্দ হয়েছিল,কিন্তু টাকার সাথে মিলছিল না।
একটু থেমে বললো
"না পেরে ভাইকে সব বলেছিলাম।ভাই সাথে সাথেই টাকা পাঠিয়ে দিয়েছিল।
তুষার শান্ত গলায় প্রশ্ন করলো
"তো ওর টাকা ওকে রিটার্ন করবি না?
তনুজা মাথা নাড়িয়ে বললো
"হ্যাঁ, বলেছিলাম তো দিয়ে দিবো।কিন্তু অন্যভাবে।"
তুষার তাকালো
"অন্যভাবে মানে?
তনুজা একটু লজ্জা মেশানো স্বরে বললো
"মানে বলেছিলাম যখন আমার একটা জামাই হলে,তখন তার সব টাকা দিয়ে দিবো। আপনার এই টাকা লাগবে না তুষার ভাই।
তুষার কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো
তারপর ঠান্ডা গলায় বললো
"ওকে, বুঝেছি। এই টাকা তন্ময়কে দিয়ে দিবি। আর আমার টাকা তোর জামাই হলে তখন দিয়ে দিস।
তনুজা আর কোনো উত্তর দিলো না
*
তুষার বের হয়ে যেতেই রাহা এসে হাজির।
কিছুক্ষণ আগেও পার্টিতে যাওয়ার কথা শুনে রুবি বেগম রাজি হচ্ছিলেন না।কিন্তু অনেক বোঝানোর পর শেষ পর্যন্ত অনুমতি দিয়ে দিয়েছেন
অবশেষে রাতে তারা বের হওয়ার জন্য প্রস্তুত হলো।
তনুজা আজ যেন একটু অন্যরকম
গায়ে কালো রঙের লেদার জ্যাকেট, ভেতরে লং লাল রঙের ড্রেস। চুলগুলো খোলা,হাতে YSL-এর ব্যাগ,পায়ে হাই হিল
আর রাহা পরেছে তনুজার মতোই লম্বা কালো ড্রেসের সাথে ডেনিম জ্যাকেট
দুজনকেই আজ বেশ অন্যরকম লাগছে।
বাড়ির বাইরে গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করছে রোজ আর অদিতি
তারা দুজনকে দেখে রোজ হেসে বললো
"অবশেষে আজ পার্টি টা জমবে"
রাতের শহর,আলো ঝলমলে রাস্তা আর অজানা এক পার্টির দিকে রওনা হলো তারা
পার্টিতে পা রাখতেই চারপাশ থেকে চিৎকার আর উল্লাসের শব্দ ভেসে এলো
বাইকাররা তনুজাকে দেখেই যেন আরও বেশি উৎসাহিত হয়ে উঠলো।আজকের পার্টি তে থাকা মানুষ গুলো শুধু মজা করতে আসেনি সাথে লেডি বাইকার তনুজা কেও দেখার জন্য উসাহিত হয়ে আছে,বাইরের অনেক মানুষও এসেছে।জ্যাক,অ্যালেক্সও উপস্থিত আছে এখানে।
কিন্তু সবার নজর যেন আটকে গেলো এক জায়গায় তনুজার দিকে
চারপাশে একেক রকমের ডিজে মিউজিক বাজছে। কেউ নাচছে,কেউ হাতে ড্রিঙ্ক নিয়ে ঘুরছে, কেউ বন্ধুদের সাথে হাসি-আড্ডায় ব্যস্ত।পুরো পার্টির পরিবেশটাই যেন উচ্ছ্বাসে ভরে উঠেছে
তবে এক কর্নারের টেবিলে বসে থাকা রোজ,অদিতি তনুজা আর রাহা বেশ শান্ত।
রোজ ছোট থেকেই এসবের সাথে পরিচিত। অদিতিও রোজের সাথে পরিচয় হওয়ার পর ধীরে ধীরে এই পরিবেশের সাথে মানিয়ে নিয়েছে।
কিন্তু তনুজা আর রাহা কখনোই এসবের মধ্যে নিজেদের খাপ খাওয়াতে পারেনি।
তনুজা মনে মনে ভাবলো
হয়তো এখানে আসার জন্য রাজি হয়ে সে বেশ বড় ভুল করে ফেলেছে
এই ভাবনার মাঝেই হঠাৎ তার ফোনটা ভাইব্রেট করে উঠলো তনুজা ফোন হাতে নিয়ে দেখলো সেই অচেনা মানুষটার মেসেজ
আসার আগে লোকটার সাথে তার কথা হয়েছিল।
সকালের সে মেসেজের উত্তরে তনুজা একটা শর্ত রেখেছিল
লোকটা শর্তের কথা জানতে চাইলে তনুজা জানিয়েছিল
তার সাথে দেখা করতে হবে,নয়তো ফোনে কথা বলতে হবে
লোকটার উত্তর ছিল
“আমি যদি আপনাকে দেখাই দিই আর ফোনে কথাও বলি,তাহলে আর অপরিচয়হীন কীভাবে হলাম?
“সময় হলে সব হবে।ধৈর্য ধরুন মিস তনু
এখনও সময় হয়নি
তনুজার ইদানীং বেশ বিরক্ত লাগছে লোকটার উপর।
লোকটা এমন কেন করে?
এত কথা বলে,এত কিছু করে,কিন্তু নিজের পরিচয় দিতে চায় না
“কি করেন আপনি?
তনুজা কিছুক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থেকে উত্তর দিলো
“কিছু না।এক বন্ধুর পার্টিতে এসেছি। আপনি কী করেন?
কিন্তু এরপর অনেকক্ষণ আর কোনো উত্তর এলো না
তনুজা ফোনটা নামিয়ে রাখলো
এর মধ্যেই রাহা,রোজ,অদিতি আর আরও কয়েকজন মিলে জোর করে তাকে ডান্স ফ্লোরে নিয়ে গেলো।
তনুজা প্রথমে না করলেও শেষে বাধ্য হয়ে দাঁড়ালো।
গানের তালে সবাই নাচছে। তনুজাও দুই একবার হাত নাড়ালো,কিন্তু কিছুক্ষণ পর তার আর ভালো লাগলো না।
সে আবার আগের জায়গায় এসে বসলো।
হাতে ফোন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লো
জ্যাক একটা ড্রিঙ্কের গ্লাস হাতে নিয়ে চেয়ারে বসে আছে।
পাশে অ্যালেক্স বসে নাচতে থাকা একেকটা মেয়েকে লক্ষ্য করছে
হঠাৎ জ্যাকের চোখ গিয়ে আটকালো ওপাশে বসে থাকা তনুজার দিকে
তনুজাকে দেখেই জ্যাক বুকের বাঁ পাশে হাত রেখে বললো
“ওহহ সুইটহার্ট ইউ লুকিং সো হট
জ্যাকের দৃষ্টি অনুসরণ করে অ্যালেক্সও তাকালো।
তনুজাকে দেখার সাথে সাথেই তার চোখের দৃষ্টি বদলে গেলো
সে জিভ দিয়ে নিচের ঠোঁট ভিজিয়ে নিলো
তারপর পাশে থাকা ছোট গ্লাসের সাদা রঙের পানীয় একসাথে কয়েক ঢোক খেয়ে ফেললো
আবার নাচতে থাকা মেয়েদের দিকে তাকাতে গিয়েই হঠাৎ তার চোখ আটকে গেলো এক রমনির দিকে
সে নিজের শকুনির মতো দৃষ্টি দিয়ে মেয়েটাকে মাথা থেকে পা পর্যন্ত লক্ষ্য করতে লাগলো
চলবে;
পর্ব সংখ্যা —২৪
লেখিকা —তাসনিয়া জাহান
অচেনা প্রনয়ের চিরকুট