লন্ডন সময় ভোর ছয়টা
প্রায় পাঁচ ঘণ্টার দীর্ঘ বিমানযাত্রা শেষে অবশেষে প্যারিসের মাটিতে পা রাখলো তুষার।
এয়ারপোর্ট এর কাঁচের দেয়াল ভেদ করে ভোরের নরম আলো ভেতরে এসে পড়েছে। চারপাশে ব্যস্ত মানুষের আনাগোনা, ট্রলি ঠেলে কেউ বের হচ্ছে, কেউ আবার নিজের গন্তব্য খুঁজে নিচ্ছে।
তুষার একবার কব্জির ঘড়িটার দিকে তাকালো।
৬:০৫
ছোট্ট একটা নিঃশ্বাস ফেলে কোটের পকেটে এক হাত ঢুকিয়ে লাগেজটা নিয়ে বেরিয়ে এলো। বাইরে আগে থেকেই কোম্পানির পাঠানো গাড়ি অপেক্ষা করছিল।
ড্রাইভার সম্মান দেখিয়ে দরজা খুলে দিয়ে বলল
"গুড মর্নিং স্যার"
তুষার শান্ত গলায় বললো,
"গুড মর্নিং"
গাড়িটা ধীরে ধীরে বিমানবন্দর ছেড়ে প্যারিস শহরের পথে এগিয়ে চললো। জানালার বাইরে সারি সারি গাছ, পুরোনো স্থাপত্য আর ব্যস্ত রাস্তার দিকে একবার তাকিয়েই আবার চোখ বন্ধ করলো তুষার।
সারারাতের জার্নির ক্লান্তিটা এবার শরীরে টের পাওয়া যাচ্ছে।
আজকে তার তেমন কোনো কাজ নেই।মূল মিটিংটা আগামীকাল। আর তন্ময় সে এখনো আকাশপথেই আছে। বাংলাদেশ থেকে ট্রানজিটসহ প্রায় আঠারো ঘণ্টার জার্নি শেষে বিকেল পাঁচটার দিকে প্যারিসে পৌঁছানোর কথা।
ততক্ষণে তুষার বিশ্রাম নিয়েই তাকে রিসিভ করতে চলে যাবে। হোটেলে পৌঁছে ফ্রেশ হয়ে এক কাপ ব্ল্যাক কফি শেষ করেই বিছানায় শরীরটা এলিয়ে দিলো সে।
মিনিট দশেকের মধ্যেই ঘুম যেন তাকে গ্রাস করে ফেললো।
দীর্ঘ কয়েক ঘণ্টা পর
ঘড়ির কাঁটা তখন বিকেল চারটা পনেরোর ঘরে।
তুষারের ঘুম ভাঙলো অ্যালার্মের শব্দে। সে ধীরে ধীরে উঠে বসলো।
এক গ্লাস ঠান্ডা পানি খেয়ে ফ্রেশ হয়ে নিলো।
কালো টিশার্ট গায়ে চাপিয়ে হাতে নিজের ঘড়িটা পরে নিলো। বিছানার পাশে রাখা গাড়ির চাবিটা হাতে নিয়ে একবার সময় দেখলো।
৪:৩৫ PM.
নিজের মনে বললো,
"পারফেক্ট"
আর পনেরো-বিশ মিনিটের মধ্যেই তন্ময়ের ফ্লাইট ল্যান্ড করবে। তুষার আর দেরি করলো না। কানে ব্লুটুথ গুঁজে।
হোটেলের রুম লক করে নিচে নেমে গাড়িতে উঠে বসল।
গন্তব্য
শার্ল দ্য গল এয়ারপোর্ট।”
প্যারিসের ব্যস্ততম বিমানবন্দরের বাইরে কালো রঙের গাড়িটার সঙ্গে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে তুষার।
এক হাতে ফোন, অন্য হাতটা প্যান্টের পকেটে ঢোকানো।
ফোনের স্ক্রিনে চোখ স্থির তার।
ভ্রু দুটো কুঁচকে আছে। কপালে স্পষ্ট কয়েকটা ভাঁজ।
মনে হচ্ছে কোনো হিসাব মিলাতে গিয়ে কোথাও গরমিল পেয়েছে।
কিছুক্ষণ পরই এয়ারপোর্টের স্বয়ংক্রিয় কাঁচের দরজা খুলে বেরিয়ে এলো তন্ময়। দীর্ঘ আঠারো ঘণ্টার জার্নিতে ছেলেটার চেহারায় ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট। ট্রলি ঠেলে বাইরে বের হয়েই সে চারপাশে চোখ বুলালো।
দূরে গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে থাকা তুষারকে দেখে হালকা হাসলো। তুষারও ফোনটা পকেটে রেখে সোজা হয়ে দাঁড়ালো।
তন্ময় আসেই আগে তুষারের গলা জোরিয়ে ধরলো।
তুষারও তন্ময়কে জোরিয়ে ধরলো
ভাই মিস ইউ। একদম শরীরটাই ভেঙে গেছে।
তুষার হাসলো কিছু বললো না।
সে ট্রলিটা নিজের হাতে নিয়ে গাড়ির ডিকিতে লাগেজ তুলে রাখলো।দুজনেই গাড়িতে উঠে বসল।
প্যারিসের ব্যস্ত রাস্তা ধরে গাড়িটা এগিয়ে চলছে।
তন্ময় ক্লান্তিতে সিটে মাথা এলিয়ে চোখ বন্ধ করে বসে আছে।
হঠাৎ তুষারের গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে এলো
তোর বোনের কপালে চরম দুঃখ আছে, বুঝলি?
তন্ময় চোখ খুলে তাকালো।
তুষার গাড়ির স্টিয়ারিং শক্ত করে ধরে বলেই চললো
তোদের দুই ভাইবোনকে নিয়ে আমি আর পারি না। তুই কোন সাহসে অফিস থেকে লোন নিয়ে বাইক কেনার জন্য টাকা দিলি? তাও আমাকে পর্যন্ত জানাসনি!
একটু থেমে আবার বললো
তোর বোন ঢ্যাং ঢ্যাং করে যা চাইবে তাই দিয়ে দিবি? বাইক রেসের কথা শুনে কীভাবে রাজি হলি?“আই ক্যান্ট থিংক অব এনিথিং।”
তন্ময় দীর্ঘশ্বাস ফেলে সিটে মাথা ঠেকিয়ে রাখলো।
তারপর শান্ত স্বরে বললো
ও আমার ছোট্ট দুনিয়ার ছোট্ট পরী ভাই। ও কিছু চাইবে আর আমি দেবো না।এটা তো হতে পারে না।
তুষার ঠান্ডা গলায় বললো
তাই বলে অফিস থেকে দশ লাখ টাকা লোন নিবি?
তাও আমি জানতামই না।
গত সপ্তাহে ফাইন্যান্স ডিপার্টমেন্টের লোন অ্যাপ্রুভাল রিপোর্ট রিভিউ করতে গিয়ে দেখি তোর নামে দশ লাখ টাকার এমপ্লয়ি লোন পাশ হয়েছে।যে-ই স্টাফ লোন নেয় সেটা মাসিক রিপোর্টে আসে। রিপোর্ট না দেখলে তো জানতেই পারতাম না
তন্ময় ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেললো
আমার কাছে সাত লাখ ছিল।ও বলেছিল পুরো দাম লাগবে না। যেখানে রেস করে সেই রেসের মালিক নাকি পুরো বাইকটাই গিফট করতে চেয়েছিল।
কিন্তু ও কারও ফ্রি জিনিস নিতে পছন্দ করে না।
তাই বলেছিল অর্ধেক টাকা ও দিবে।
তারপর দেখি আমি আর টাকা ম্যানেজ করতে পারছি না।
বাবার কাছে চাইতে গিয়েও চাইনি। ভাবলাম বাবা নিশ্চয়ই কারণ জানতে চাইবেন। আর কারণ বললে মাথা গরম হয়ে যাবে। তাই অফিস থেকেই লোন নিয়ে নিলাম।
আস্তে আস্তে শোধ করে দিতাম।
তুষার বিরক্ত হয়ে মাথা নাড়লো
হুম
কাল রাতে আবার আরেক কাণ্ড ঘটিয়ে বসেছে তোর বোন।
তন্ময় এবার পুরোপুরি সোজা হয়ে বসলো।
কেন?কী হয়েছে আবার?
তুষার বিরক্তিতে হেসে ফেললো।
কী হয়নি বল!
কাল রাতে এমন কাণ্ড ঘটিয়ে এসেছে সামনে পেলে ঠিক পাঁচ-দশটা থাপ্পড় পেতো
তন্ময় হো হো করে হেসে উঠলো
তুমি আর পাঁচ-দশটা থাপ্পড়?ওর এক ধমকের পরই তো বর কিছু বলতে পারো না
ও পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অবিশ্বাস্য কাণ্ড ঘটালেও তুমি কিছু বলতে পারবে না
তুষার এক ঝলক তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ছুঁড়ে মারতেই তন্ময়ের হাসি মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল।
সে ঠোঁট চেপেচুপ করে বসে রইলো।
তুষার আবার বললো
এখন ফোনটা বন্ধ করে রেখেছে
মাকে দিলাম তাও না।মাও ধরছে না
উনি তার মেয়েকে মাথায় চড়িয়ে এমন করেছে যে কোনো কিছুরই ভয় নেই।কাল দুই বোন মিলে একটা পার্টিতে গিয়েছিল।সেখানে রাহার সঙ্গে যা হয়েছে
তুষার এক মুহূর্ত থেমে দাঁতে দাঁত চেপে বললো
ও সময়মতো কিছু না করলে আজ কী হতো,সে সম্পর্কে ওর কোনো ধারণাই নেই।ইডিয়ট একটা!
তন্ময়ের মুখের রঙ মুহূর্তেই বদলে গেল
গলা শুকিয়ে এলো তার।
কী বললে ভাই?
রাহার কী হয়েছে?
তনু ঠিক আছে তো?
কোথায় গিয়েছিল ওরা?ওদের যেতে কে দিয়েছে?
তুষার বিরক্তিতে স্টিয়ারিংয়ে একবার চাপড় মারলো
ওদের আবার যেতে দেওয়া লাগে নাকি?বাসায় ওদের বান্ধবী আছে না।সাহায্য করার জন্য সাক্ষাৎ আমার মা!
সব জেনেশুনেও দুইটা মেয়েকে মাথায় নিয়ে নাচে।
আগে বলো
কী হয়েছে?আমাকে পুরো ঘটনাটা বলো
গাড়িটা তখন প্যারিসের ব্যস্ত রাস্তা পেরিয়ে ধীরে ধীরে হোটেলের দিকে এগিয়ে চলেছে
গাড়িটার ভেতর কয়েক মুহূর্তের জন্য নীরবতা নেমে এলো
তন্ময়ের চোখ স্থির তুষারের দিকে
তুষার দীর্ঘশ্বাস ফেলে ধীরে ধীরে গত রাতের পুরো ঘটনাটা বলতে শুরু করলো
সব শুনে তন্ময়ের বুকের ভেতরটা যেন হঠাৎ করেই শূন্য হয়ে গেল।সে কিছুক্ষণ কোনো কথাই বলতে পারলো না।
জানালার বাইরে তাকিয়ে রইলো
তন্ময় চোখ বন্ধ করে মাথাটা সিটে ঠেকিয়ে দিল
আল্লাহ যদি একটু দেরি হয়ে যেত
তারপর খুব আস্তে বললো
তুমি জানলে কি করে?
"জাস্টিন নিজে আমাকে ফোন করেছে
জাস্টিন টা কে আবার?
তোর বোনের বাইক রেসের আয়োজক
আমরা একই ইউনিভার্সিটিতে পড়তাম
তখন থেকেই ও বাইক চালাতো পরে নিজেই রেসিং ক্লাব খুলেছে বধহয়
তুষার এবার দাঁত চেপে বললো
এবার বাসায় যাই দুবোনের পাকনা আমি কেটে দিবো
জাস্টিন তনু কে কিভাবে চিনে?
ওর সাথে আমার কিছু দিন আগে দেখা হয় পেট্রোল পাম্পএ।একে ওপরের খোজ নিতে নিতে ও নিজের রেসিং ক্লাব এর লাইভ ফিড দেখালো তখনই তোর বোনের গুনো গান বলতে শুরু করলো সাথে পিকচার ও দেখালো
প্রথম প্রথম ও জানতোই না তনুজা আমার কেউ হয়।
পরে ও জানতে পারে তনুজা আমার কাজিন
তারপর থেকে মাঝেমধ্যে ওর খবর দিত
গতকাল রাতের ঘটনার পর ও নিজেই আমাকে ফোন করে সব জানিয়েছে
তন্ময় ধীরে ধীরে মাথা নাড়লো
ওহ"
তারপর তুষার বলল তোর বোন কে কল কর একটা
তন্ময় বলল
আইএম গরিব ভাই এখনো কিছু কিনিনি হোটেল পৌঁছে দিবো
*
*
*
একটা অন্ধকার ঘর।জানালার পর্দাগুলো টানা
আলোর একফোঁটাও ভেতরে ঢুকছে না।ঘরের ভিতরে দরজাটা বন্ধ করলো কেউ সশব্দে।এক কোণে গুটিসুটি মেরে দাঁড়িয়ে আছে দশ-এগারো বছরের ছোট্ট একটা মেয়ে।দুই পাশে বাঁধা বেণী।গায়ে হালকা গোলাপি রঙের ফ্রক
সারা শরীর কাঁপছে তার।চোখ বেয়ে টপটপ করে পানি পড়ছে।সে ভয়ে দেয়ালের সঙ্গে নিজেকে মিশিয়ে ফেলতে চাইছে যেন। তার সামনে একজন মানুষ দাঁড়িয়ে। লোকটা ধীরে ধীরে হাঁটু গেড়ে বসল।
মুখে অদ্ভুত হাসি। নরম গলায় বললো
তনু সোনা এত ভয় পাচ্ছো কেন?
আমি তো কিছু করবো না।এসো আমার কাছে এসো।
ছোট্ট তনুজা না বদক মাথা নাড়তে লাগলো।
লোকটা আরও এগিয়ে এলো। তনুজার বুক ধুকপুক করছে।সে বুঝতে পারছে কিছু একটা ঠিক হচ্ছে না
খুব খারাপ কিছু লোকটা হাত বাড়িয়ে তাকে ধরতে যেতেই তনুজা হঠাৎ ঝাঁপিয়ে পড়ে তার হাতে জোরে কামড় বসিয়ে দিল
আহহহ!
ব্যথায় লোকটা হাত ছেড়ে দিতেই তনুজা এক মুহূর্তও দেরি করলো না
দরজা খুলে প্রাণপণে দৌড়ে বেরিয়ে গেল
দৌড়াতে দৌড়াতেই কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগলো
রবিন ভাই খুব পচা
তুমি খুব পচা
আমি আম্মুকে বলে দিবো
ঘুমের মধ্যেই কেঁপে উঠলো তনুজা।সারা শরীর ঘামে ভিজে গেছে। কপাল জ্বলছে।ঠোঁট শুকিয়ে সাদা হয়ে গেছে।গত রাতে পার্টি থেকে ফেরার পর থেকেই তার জ্বর এসেছে।
নিজের বিছানায় শুয়ে থাকা তনুজা এখনও চোখ বন্ধ করলেই অতীত আর বর্তমানের মাঝখানে আটকে যাচ্ছে।
কিছু কিছু ক্ষত সময় কখনোই পুরোপুরি শুকাতে পারে না
রাহার শরীরটাও ড্রাগের প্রভাবে একেবারে অবসন্ন হয়ে পড়েছিল
রুবি বেগম রাতে গেট খুলে ঘুমিয়ে পরাতে সে যানতে পারেননি কিছু রাতরে
কিন্তু সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতেই হামজার সঙ্গে দেখা হয়ে যায়।রাহাকে ওই অবস্থায় দেখে হামজা ঘাবড়ে গিয়ে প্রশ্ন করেছিল
তখন তনুজা শুধু বলেছিল পরে বলবে
তারপর হামজার সাহায্যে রাহাকে তার রুমে শুইয়ে দিয়ে দু'জন নিজেদের রুমে চলে গিয়েছিল
সেই রাত থেকে তনুজা আর নিজের ফোন হাতে নেয়নি।
ফোনটা বন্ধ হয়েই পড়ে আছে।সারারাত জ্বরে কাঁতরাতে কাতরাতে কেটেছে
ঘুমালেই বারবার সেই পুরোনো দুঃস্বপ্ন। আর গত রাতের ঘটনাটা একসাথে মিশে গিয়ে তাকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে।
তনুজার পুরো শরীরটা যেনঅবশ হয়ে আছে।গলা শুকিয়ে কাঠ,ঠোঁট দুটো ফ্যাকাশে।টিপটিপ করে চোখ খুলে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে রইলোসে।চোখের দুই কোণা বেয়ে নীরবে গড়িয়েপড়ছে নোনাজল।বুকের ভেতরটা কেমন যেন ফাঁকাফাঁকা লাগছে
হাত বাড়িয়ে নিজের ফোনটা খুঁজতে গিয়েই ধীরেধীরে উঠে বসল
ঠিক তখনই দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলেন রুবি বেগম। সকাল থেকে এইনিয়ে কতবার যে ঘরে আসা-যাওয়া করেছেন,তার হিসেব নেই
সকালে রাহা সবকিছু খুলে বলেছিল মাকে।সব শুনেও রুবি বেগম তনুজার উপর একটুও রাগ করেননি।বরং ভয়আরও বেড়ে গেছে।যদি আবার সেই দুইছেলে ওদের ক্ষতি করতে আসে?আল্লাহর রহমতে এবার তনুজা লড়াই করে রাহাকে বাঁচাতে পেরেছে কিন্তু প্রতিবার কি এমনটা পারবে?
তনুজা ম্লান একটা হাসি দিল মনেমনে কাউে কল্পনা করলো।
দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন একেবারে পরিপাটি গৃহিণীর সাজে রুবি বেগম।সাদানীল ছাপার শাড়ি চুলগুলো সুন্দর করে হাতখোঁপা করা।মুখে সেই চিরচেনা মায়াভরা হাসি।হাতে ধোঁয়া ওঠা খাবারের ট্রে
ট্রেটা দেখেই তনুজা নাক কুঁচকে ফেললো
আহহ মামনি আমি খাবো না।আমার একদম ভালো লাগছে না
রুবি বেগম ভ্রুকুঁচকে বললেন
এই একদম বাহানা করবিনা।আমি খাইয়ে দিচ্ছি।তারপর ওষুধ খেয়ে নিবি।দেখবি জ্বর একদম কমে যাবে
তনুজা ঠোঁট ফুলিয়ে মাথা নাড়লো
ভালোই লাগছে না"
ঠিক তখনই রাহা ঘরে ঢুকলো
কী হচ্ছে?জ্বর কী একটুও কমেনি?
তনুজা মুখ বাঁকিয়ে বললো
নারে এই সালা জ্বরটা তোকমার নামই নিচ্ছে না।মুখটা পুরো তেতো হয়ে আছে।আর মামনি আমাকে জোর করে খাবার খাওয়াতে চাচ্ছে
রুবি বেগম আবার বললেন
এইদিকে আয় তনু আমি খাইয়ে দিচ্ছি।একদম তেতো লাগবে না
অনেক বুঝিয়েও যখন পারলেন না,তখন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন
আচ্ছা ঠিক আছে তাহলে বস।আমি তোর জন্য ঝাল ঝাল কিছু বানিয়ে নিয়ে আসছি
বলেই ট্রেটা হাতে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন
রুবি বেগম বের হতেই রাহা এসে বিছানায় বসল
তনুজা উঠে দাঁড়িয়ে বললো
বস,আমি ফ্রেশ হয়ে আসি
রাহা তাড়াতাড়ি তার হাত টেনে ধরলো
এই দাঁড়া কথা আছে
কী কথা?বল তাড়াতাড়ি।গোসল করবো।শরীরটা একদম মেচমেচ করছে
রাহা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললো
রোজ কল করেছিলো সকালে জ্যাক আর অ্যালেক্সকে পুলিশে দেওয়া হয়েছে।তবে কতক্ষণ রাখতে পারবে জানে না।জ্যাকের বাবা নাকি সকাল থেকেই ওকে ছাড়ানোর জন্য লেগে আছে
তনুজা ঠোঁট বাঁকিয়ে বললো
যাক জাহান্নামে।ওদের নামে রেপ কেস লাগবে।এত সহজে কি বের হতে পারবে?অন্তত একটা রাত জেলে থাকুক।তাতেই আমার শান্তি
হঠাৎ রাহা তনুজার হাতটা নিজের দুই হাতে ধরে ফেললো
থ্যাংক ইউ সো মাচ ।ইউ আর দ্য বেস্ট সিস্টার ইন দ্য ওয়ার্ল্ড,ডার্লিং উম্মা
কথা শেষ করেই তনুজার হাতে একটা চুমু খেলো সে
তনুজা সঙ্গে সঙ্গে ভাব নিয়ে বললো
ইশ!একটা জামাই হলে এইভাবে কিস করতো।কর কর ভালোই লাগছে
রাহা সঙ্গে সঙ্গে হাত ছেড়ে দিল
ধুর!সালি জামাইর চুমু খাওয়ার কত শখ"
দু'জনই হেসে উঠলো
হাসির মাঝেই তনুজা আলতো করে রাহার গালে হাত রেখে নরম গলায় জিজ্ঞেস করলো
খুব ভয় পেয়েছিলি তাই না?
রাহার মুখের হাসিটা মলিন হয়ে এলো
ভয়ের থেকেও বেশি গর্ব হচ্ছিল।আমার বোন কাউকে অপেক্ষা না করে,একা ওই দুইটা জানোয়ারের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল শুধু আমার জন্য
সে আবার হাসার চেষ্টা করলো
থ্যাংক ইউ
তনুজা হালকা করে রাহার কপালে একটা টোকা দিয়ে বললো
হ্যাঁ হ্যাঁ,হয়েছে।এবার যা,আমাকে গোসল করতেদে
হুম"
রাহা বেরিয়ে যেতেই তনুজা বিছানার পাশে পড়ে থাকা নিজের ফোনটা হাতে নিলো
স্ক্রিনে চাপ দিতেই বুঝলো ফোনটা পুরোপুরি বন্ধ হয়েআছে
সে চার্জারে লাগিয়ে রেখে ধীরেধীরে আলমারি থেকে কাপড় বের করলো।তারপর ক্লান্ত পায়ে ওয়াশরুমের দিকে এগিয়েগেল
নীরব,শান্ত এক সকাল
জানালার ফাঁক গলে সূর্যের সোনালি আলো এসে আলোকিত করে রেখেছে পুরো রুমটা।বাইরে পাখিদের কিচিরমিচির শব্দে চারপাশ যেন আরও প্রাণবন্ত হয়েউঠেছে
এই নীরবতার মাঝেও শোনাযাচ্ছে কয়েকটা আলাদা শব্দ।খোলা জানালা দিয়ে ঢুকেপড়া বাতাসে টেবিলের উপর রাখা কয়েকটা কাগজ বারবার উড়ে উঠছে।আর তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে ভেসে আসছে কলমের খসখস শব্দ;
একজন নারী নিজের চেয়ারে বসে মনোযোগ দিয়ে কিছু লিখে চলেছেন।পরনে পরিপাটি শাড়ি।তার উপর সাদা রঙের ডাক্তারদের অ্যাপ্রোন চুলগুলো পাঞ্চক্লিপ দিয়ে বাঁধা।চোখে কালো ফ্রেমের চশমা
টক টক টক
আসতে পারি?
মহিলা কলম থামিয়ে মাথা তুললেন
ইয়েস কাম ইন"
দরজা খুলে ভেতরে ঢুকলেন আরেকজন নারী
ক্যাবিনে বসে থাকা মহিলা তাকে দেখেই মৃদু হেসে বললেন
জি,মিসেস ডক্টর সারা আপনার ঘুরাঘুরি শেষ"
সারাও হাসলেন
কেমন আছেন?
হুম শেষ তো আছি ভালোই"
তারপর কলমটা টেবিলে রেখে তাকালেন তার দিকে
তোমার কী খবর?
আমিও ভালোই আছি"
ক্যাবিনে বসে থাকা এই নারীই ডক্টর তমা আশরাফ
বিয়ের আগে এটাই ছিল তার পরিচয়।তবে বিয়েরপর তিনি নিজের স্বামীর পরিচয়ে পরিচিত হন ডক্টর-তমা আজমল মির্জা নামে
তিনি তন্ময় আর তনুজার মা
স্বভাবে ভীষণ রাগী,কঠোর এবং ব্যক্তিত্বসম্পন্ন একজন নারী।হাসপাতালের সবাই তাকে যথেষ্ট সম্মান করলেও তার সামনে দাঁড়ালে অকারণ কথা বলার সাহস খুবকম মানুষেরই হয়
আর তার সামনে বসে থাকা ডক্টর সারা
এই হাসপাতালের চাকরিরও বহু আগের পরিচয় তাদের। ট্রেনিংয়ের সময় থেকে শুরু হওয়া বন্ধুত্বটা সময়ের সাথে আরও গভীর হয়েছে। সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না সবকিছুরই নীরব সাক্ষী তারা দু'জন।
সারা চেয়ারটা টেনে বসতেই ঠোঁট ফুলিয়ে বললেন,
"তা আমি ছুটিতে কী গেলাম,তুমি তো আমাকে" একেবারে ভুলেই গেলে।
তারপর চোখ টিপে দুষ্টু গলায় বললেন,
"হ্যাঁ গো মেয়ে ফিরেছে নাকি?
বলেই হেসে ফেললো
তমা মির্জা ঠোঁটের কোণে হাসি টেনে বললেন,
"তুমি তো দেখি একেবারে চাঁদে গিয়ে ঘরবসতি নির্মাণের কথা বলছো।
সারা হেসে উঠলেন।
"আহা!কী যে বলো না!তুমি তো কখনো আমার সঙ্গে এমন করো না। আমি ছুটিতে বাড়ি গেলেই রোজ ফোন দিতে।এবার একবারও দিলে না। তাই ভাবলাম,নিশ্চয়ই মেয়ের অভিমান ভাঙাতে ব্যস্ত আছো।
তমা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চশমাটা খুলে টেবিলের উপর রাখলেন।
"ম্যাডামের রাগ কবে কমবে,কবে আবার ম্যাডামের দেখা পাবো সেটাই তো জানি না। তার উপর এবার কাজের চাপও অনেক ছিল। কিডস সাইডে এত রোগী এসেছে যে মাথা তোলার সময় পাইনি।
সারা মাথা নেড়ে বললেন
"হুম আচ্ছা,ও গিয়েছে কার উপরে?
তমা নির্লিপ্ত গলায় উত্তর দিলেন,
"কার ওপর আবার ওর বাবার ওপর।
সারা ভ্রু নাচিয়ে একটু বাঁকা হাসলেন।
"বাবার ওপর?
তমা এক ঝলক তাকালেন তার দিকে।
সারা এবার ঠোঁট কামড়ে হাসি চেপে রাখার চেষ্টা করলেন।
তমা গম্ভীর স্বরে বললেন
"তুমি কী বলতে চাইছো,সারা?ও কি আমার মতো হয়েছে?
সারা আর হাসি আটকাতে পারলেন না
তোমার মেয়ে তোমার মতো হলে খারাপটা কোথায়,বলো তো?
তমা এবার হালকা হেসে মাথা নেড়ে দিলেন।
একদম না। আমি অন্তত এত জেদি ছিলাম না।
সারা সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলেন
*
*
*
ডাঃ সারা আর তমা মির্জার আরও বেশ কিছুক্ষণ গল্প হলো।
হঠাৎই তমা মির্জা টেবিলের উপর রাখা নিজের ফোনটা হাতে তুলে সময় দেখলেন। ঘড়ির কাঁটা অনেকটাই এগিয়ে গেছে।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিনি নিচু গলায় বললেন,
—"ম্যাডামের নাকি জ্বর এসেছে।"
সারা ভ্রু কুঁচকে তাকালো।
তমা মির্জা চেয়ারের পিঠে হেলান দিয়ে ফিসফিস করে বললেন,
—"কি করি বলো তো সারা?মেয়েটাকে খুব দেখতে ইচ্ছে করে।খুব কিন্তু ও আমাকে এমনভাবে দূরে ঠেলে দিয়েছে যে নিজের মেয়ের মুখটাও আমি ইচ্ছে মতো দেখতে পারি না।"
একটু থেমে মৃদু হেসে আবার বললেন,
"চোরের মতো ছবি চাইতে হয়। আবার ঘুমিয়ে থাকলে দেখতে হয় জেগে থাকলে তো দেখারও অধিকার নেই।"
"সকালে রুবি ফোন করেছিল। জানো সারা বোনটার এই ঋণ আমি কোনোদিনও শোধ করতে পারবো না।"
সারা অনেকক্ষণ চুপচাপ শুনে বললো,
"আরেকবার চেষ্টা করে দেখো না আপা।"
তমা তার দিকে তাকালেন।
"দেড় বছরেরও বেশি হয়ে গেল। তুমি নিজের জেদ নিয়ে বসে আছো,আর ওর অপেক্ষা করছোও নিজে এসে তোমার কাছে দাঁড়াবে।"
সারা মৃদু হেসে বললো,
"আসার হলে তো এতদিনে এসেই যেত। ছোট মানুষ তোমার এই জেদে ওর অভিমানটা হয়তো আরও বাড়ছে
তমা মির্জা সঙ্গে সঙ্গেই মাথা নাড়লেন।
"না সারা,ওকে ছোট বলো না। ও এখন যথেষ্ট বড় হয়েছে। বুঝতে শিখেছে"
তারপর গলাটা একটু শক্ত করে বললেন,
"আর আমি ওর সঙ্গে কোনো অন্যায় করিনি। হ্যাঁ,আমি একটু রাগী। তাই বলে কি আমি খারাপ মা?
সারা ধীরে ধীরে হাসলো।
"আপা তুমি মা। মা হয়ে একটু নত হলে কিছু কমে যাবে না।"আজ যদি তুমি এক পা এগিয়ে যাও, কাল হয়তো আল্লাহ তোমার সেই এক পা-র সম্মান হাজার গুণ ফিরিয়ে দেবেন।"
তমা মির্জা কিছু বললেন না।জানালার বাইরে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলেন।তার চোখের ভেতরের বরফটা গললো না। তিনি এখনও নিজের সিদ্ধান্তেই অটল।
---
সারার সঙ্গে আরও কিছুক্ষণ গল্প করতে করতেই বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমে এলো।
ডিউটি শেষ
চট্টগ্রামের মেরিন ড্রাইভের রাস্তা ধরে গাড়িটা ধীরে ধীরে এগিয়ে চলেছে। এই রাস্তা তমা মির্জার অসম্ভব প্রিয়।
গাড়ির জানালা দিয়ে ছুটে আসা ঠান্ডা বাতাস তার এলোমেলো চুলগুলো উড়িয়ে দিচ্ছে। তিনি একদৃষ্টিতে বাইরের দিকে তাকিয়ে আছেন।
এটা যেন তার প্রতিদিনের অভ্যাস। এই রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় তিনি কখনো মোবাইল দেখেন না, চোখ বন্ধ করেন না।
প্রতিটা ঢেউ
প্রতিটা বাতাস
প্রতিটা সূর্যাস্ত
আর প্রতিদিন একই প্রশ্নটা নিজেকে করেন
"আমার দোষটা কি সত্যিই এত বড় ছিল?"
"আমি কি সত্যিই ভালো মা হতে পারিনি?"
ফোনের তীক্ষ্ণ রিংটোন তার ভাবনার জাল ছিঁড়ে দিল।
তিনি ফোনটা হাতে তুলে দেখলেন,
"মা"
অর্থাৎ আজমল মির্জার মা, ফাতেমা খাতুন।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কলটা রিসিভ করলেন।
"আসসালামু আলাইকুম মা। কেমন আছেন?"
"ওয়ালাইকুম সালাম।ভালো আছি। তোর কী খবর? কাল না বললি আসবি?আসলি না যে?"
"একটু জরুরি কাজ পড়ে গিয়েছিল মা। তাই আসতে পারিনি। আসবো আমি।"
"ওহ তন্ময় কি চলে গেছে?"
"এখনও কথা হয়নি। বলেছিল পৌঁছে কল করবে। তুষারকেও ফোন দিয়েছিলাম, ধরেনি। মনে হয় ব্যস্ত আছে।"
ফাতেমা খাতুন বিরক্ত গলায় বললেন,
"আমার সাথে দেখা করে গেল না হারামজাদা! বলেছিলাম যাওয়ার আগে একবার দেখা করে যাস।"
তমা হেসে ফেললেন
"তাড়াহুড়ো করে বের হয়েছে তো হয়তো মনে ছিলনা। আমি বলবো আপনাকে ফোন দিতে"
তারপর একটু নরম গলায় বললেন
"ওষুধ খেয়েছেন?
ফাতেমা খাতুন সঙ্গেসঙ্গে মুখ বাঁকালেন
"ওষুধ আর ভালো লাগে না।সকাল থেকে রাত পর্যন্ত শুধু ওষুধ আর ওষুধ"
"আপনি খাবার নিয়ন্ত্রণ করুন।ডাক্তারের কথা শুনুন তাহলে ওষুধও কমেযাবে"
"কার কাছে কি বলছি!তুইতো ডাক্তার"
ফাতেমা আবার বললেন
"বাড়ি কবে আসবি?আমার জন্য পাননিয়ে আসিস আর বেশি নেই কাল-পরশু চলবে মনে হয়।আজমল কে সকালে বলেছিলাম ওতো আমাকে বকে গেলো।ও কি বোঝে!তুই আমার সোনা মা,নিয়ে আসিস"
"আচ্ছা মা এগুলো শেষ হওয়ার আগেই নিয়ে আসবো কিন্তু এগুলো যে বেশি খাওয়া ঠিক না।নিয়ন্ত্রণ আনুন"
"ধুর!রাখতো"
তমা হেসে মাথা নাড়লেন
"ভালো কথা বললেই আপনার ভালো লাগেনা।আচ্ছা রাখি।আমি বাড়ি পৌঁছে গেছি।আপনি খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ুন"
"আচ্ছা তুইও নিজের যত্ননিস"
গাড়ি থেকে নেমে বাড়ির ভেতরে ঢুকলেন তমা মির্জা
ফ্রেশহয়ে কিচেনের দিকে গিয়ে কাজের মেয়ে তুলিকে বললেন
"খাবারটা গরম করো"
তারপর আবার নিজের ফোনটা হাতে তুলে সময় দেখলেন।কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে একটা নাম্বারে কল দিলেন
রুবি বেগম আর আরোশ সাহেব ড্রয়িংরুমে বসে গল্প করছিলেন।পাশে রাখা ফোনটা বেজে উঠলো
স্ক্রিনে নামটা দেখেই রুবি বেগমের মুখেমৃদু হাসিফুটে উঠলো।
তিনি আস্তে করে উঠে চলে গেলেন
আরশাদ সাহেবও বুঝলেন
কে ফোন করেছে।আর কেন করেছে
রুবি কল রিসিভ করলেন।
তোমার অপেক্ষাই করছিলাম।আরেকটু আগে দিলে ভালো হতো।
ওপাশ থেকে তমা মির্জা বললেন
"এইমাত্র ফিরলাম রে ছোট আগে পরে কলদিয়ে কী হবে?দেখতে তো লুকিয়েই হবে"
রুবি মুচকি হেসে বললেন
"দাঁড়াও দেখি আগে
তিনি খুবআস্তে তনুজার রুমের দরজাটা খুললেন
ঘরের ভেতরটা একদম অন্ধকার
রুবি নিচু গলায় বললেন
"হ্যাঁ আপা মনে হয় ঘুমিয়েছে"
কথাটা বলেই তিনি ঘরের ভেতরে ঢুকে সুইচ অন করলেন আর আলো জ্বলার সঙ্গেসঙ্গেই রুবি বেগম থমকে গেলেন
ঘুমিয়ে থাকার বদলে তনুজা বসে আছে কোলের উপর খোলা ল্যাপটপ
চোখ দুটো স্থির হয়ে আছে স্ক্রিনের দিকে
হঠাৎ অন্ধকার এর মধ্যে লাইট জলায় তনুজা মাথা তুলে তাকালো রুবি বেগমের দিকে
মুখে চিপস ভরে চিবোতে চিবোতেই ভ্রু নাচিয়ে ইশারায় জিজ্ঞেস করলো
কি হয়েছে?
রুবি বেগম এক মুহূর্তের জন্য ঘাবড়ে গেলেন
ওপাশে ফোনের এপারে তমা মির্জা নিশ্চুপ হয়ে অপেক্ষা করছেন।কপালে ভাঁজ পড়েছে।কিছু একটা হয়েছে বুঝতে পারছেন
রুবি বেগম তাড়াতাড়ি ফোনটা পেছনে লুকিয়ে সাইলেন্ট করে দিলেন
তারপর স্বাভাবিক গলায় বললেন
কিরে এত রাতে এখনও ঘুমাসনি?
তনুজা মুখভর্তি চিপস নিয়েই উত্তর দিলো
তুমিই তো ঘুমাওনি
রুবি বেগম হেসে বললেন
তোর জ্বরটা আবার বেড়েছে নাকি?
তনুজা মাথা নাড়লো
উমম হুম।জ্বর হাওয়া দেখতেই তো পাচ্ছো,সুস্থতার খুশিতে বসে বসে মুভি দেখছি।আসো,তুমিও দেখো
রুবি বেগম হালকা হেসে ধীরে ধীরে এসে তনুজার পাশে বসলেন।
প্রথমেই কপালে হাত রেখে জ্বরটা দেখলেন
না,তেমন জ্বর নেই।তবে শরীরটা এখনও একটু গরম
নিজেকে সামলে নিয়ে তিনি ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে তাকাতেই ভ্রু কুঁচকে গেল
এই তনু এই সিনেমাটা তুই কতবার দেখিস রে?কত ভালো লাগে তোর?
তনুজা মুচকি হাসলো
এই মুভিটা আমার দেখা শেষ হয় না
রুবি বেগম অবাক হয়ে তাকালেন
মানে?
তনুজা স্ক্রিনের দিকেই তাকিয়ে রইলো
খুব আস্তে বললো
এই মুভির একটা চরিত্র আছে যখন আমার ওই মানুষটার কথা মনে পরে তখনই দেখি
কাকে?
তুমি বুঝবে না
মুভিটার নাম কী?
A..Aa
রুবি বেগম অবাক হয়ে বললেন
এটা আবার কেমন নাম?
তনুজা ম্লান হেসে উত্তর দিলো
রুবি বেগম আবার জিজ্ঞেস করলেন
কাকে দেখতে ইচ্ছে করে তোর?দেখা করলেই তো হয় তার জন্য এক সিনেমা শতবার দেখার কী আছে?
তনুজার ঠোঁটের হাসিটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল
চোখ দুটো স্ক্রিনেই স্থির রেখে বললো
দেখতে পারি না বলেই তো দেখি,মামনি
কথাটা শুনে রুবি বেগমের বুকের ভেতরটা কেমন মোচড় দিয়ে উঠলো
তিনি নিজের কষ্টটা চেপে রেখে হেসে বললেন
আচ্ছা,আমাকে সেই চরিত্রটা দেখ তো দেখি আমি চিনতে পারি কি না
তনুজা কোনো কথা না বলে ল্যাপটপটা একটু ঘুরিয়ে দিল
স্ক্রিনে নাইকার মা'র সিন আসতেই আঙুল রেখে বললো
এই যে উনি"
রুবি বেগম খুব মনোযোগ দিয়ে স্ক্রিনের দিকে তাকালেন
কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে বললেন
এই তনু—
তনুজা হালকা হেসে মাঝপথেই থামিয়ে দিলো
থাক বলতে হবে না।আমি বুঝেছি তুমি বুঝে গেছো
তোমার বোনের মতোই লাগে একদম কপি
রাগ,স্বভাব,সব দিক দিয়েই।
রুবি বেগমের বুকের ভেতরটা হুহু করে উঠলো
মেয়েটা মাকে ভীষণ ভালোবাসে।শুধু প্রকাশ করতে পারে না।কতটা অভিমান জমলে একজন মানুষ সামনে গিয়ে দেখার সুযোগ রেখেও একটা সিনেমার চরিত্রের ভেতর নিজের মায়ের মুখ খুঁজে বেড়ায়?
রুবি বেগমের চোখ ভিজে উঠলো
তিনি দ্রুত মুখ ফিরিয়ে নিলেন।ওপাশে সাইলেন্ট হয়ে থাকা ফোনের স্ক্রিনে এখনও কলটা কেটে যায়নি
তমা মির্জা নিঃশ্বাস আটকে সব শুনছিলেন
দেখতে পারি না বলেই তো দেখি
মেয়ের বলাএই একটি বাক্যযেন ছুরির মতো গিয়ে বিঁধলো তার বুকের গভীরে
চলবে;
পর্ব সংখ্যা—২৬
লেখিকা—তাসনিয়া জাহান
অচেনা প্রনয়ের চিরকুট