ফন্ট সাইজ:
থিম:
অচেনা প্রনয়ের চিরকুট

২৭তম পর্ব

লেখক: তাসনিয়া জাহান

রুবি বেগম কিছুক্ষণ তনুজার দিকে তাকিয়ে রইলেন।

মেয়েটা আবারও সিনেমায় মন দিলেও তারচোখের কোণে জমে থাকা পানিটুকু রুবি বেগমের চোখ এড়ালো না।

রুবি বেগম প্রসঙ্গ এড়াতে তনুজার হাতে থাকা ক্রোশের হুক দেখে বললেন এটাআবার কবে ধরলি?

কি বানাবি এইবার?

তনুজার ক্রোশের খুব পছন্দের কাজের মধ্যে একটা যখনই সময় হয় নিয়ে বসেপরে মন ভালো থাকলে একদিনেই এক বসাতে শেষ করে উঠে

তনুজা ল্যাপটপে দৃষ্টি রেখেই বলল

"একটা সোয়েটার বানাবো ভাবছি।

তিনি ধীরেধীরে উঠে দাঁড়ালেন

"কার জন্য?

তনুজা ভাবলো আসলেই কার জন্য বানাচ্ছে সে?

"দেখি কার জন্য হয়"

"আচ্ছা,আমি নিচে যাচ্ছি।বেশি রাত জাগিস না।

"হুম

রুবি বেগম দরজা বন্ধ করে বেরিয়ে যেতেই পুরো রুম আবার নিস্তব্ধ হয়ে গেল।ল্যাপটপে সিনেমা চলছে

কিন্তু তনুজার মনযেন কোথাও নেই।

ফোনটা চালু করলো সে।

একটার পর একটা নোটিফিকেশন ভেসে উঠতে লাগলো।

“হোয়াটসঅ্যাপ নোটিফিকেশন

তুষার ভাই—মিস কল(৯৫

তন্ময় ভাই—মিস কল(১৭

রোজ—৯+মেসেজেস

তনুজা কোনো কলেই ফিরলো না।সে শুধু দেখলো অপরিচিত মানুষটার কি জোনো মেসেজ আসেনি?

ফোনটা সাইলেন্ট করে বিছানায় ছুড়ে রেখে জানালার

বারান্দায় এসে দাঁড়ালো তনুজা।

রাতের ঠান্ডা বাতাস এসে মুখে লাগতেই চোখ দুটো আস্তে করে বন্ধকরলো সে।দূরে সারিসারি বাড়িগুলোর আলো জ্বলছে।চারপাশটা অদ্ভুত রকম শান্ত।

কেমন যেন একটা অনুভূতি পুরো শরীরে ছড়িয়ে পড়লো।

মনে হলো।কেউ একজন তাকে খুব গভীরভাবে দেখছে।

তনুজার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠলো।

সে দ্রুত চারপাশে তাকালো।বাড়ির সামনের রাস্তাটা একদম ফাঁকা।আশেপাশে কোনো মানুষ নেই। সামনের মাঠটাও নিস্তব্ধ সে আবার চারদিকে তাকালো। না কেউ নেই।

তনুজা নিচু স্বরে নিজেকেই বললো

"অদ্ভুত এমন অনুভূতি হঠাৎ হলো কেন?

নিজেকে বুঝালো সে কিছু নেই এটা শুধুই এতো ভাবনা মাথায় ঘুরছে তার জন্য মনে হয়েছে।আর কিছু না।

কিন্তু কেনো যেনো মনের ভেতরের অস্বস্তিটা কিছুতেই কাটলো না।সে আর দারালো না ঘরে ঢুকে পর্দাগুলো ভালো করে টেনে দিলো।

তারপর বিছানায় এসে বসতেই

ফোনটা কেঁপে উঠলো।

তনুজা ফোনটা হাতে নিয়ে স্ক্রিনের দিকে তাকালো।

স্ক্রিনে ভেসে উঠেছে

হোয়াটসঅ্যাপ কলিং—

*অ্যাংরি ম্যান*

তনুজা ঠোঁট বাঁকিয়ে বললো

"এই লোকটা আবার কোন দুঃখে আমাকে কল দিচ্ছে?

ভাবতে ভাবতেই কলটা কেটে গেল

সে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো।

বাঁচা গেল

কিন্তু সেই স্বস্তি বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না

আবারও ফোনটা কেঁপে উঠলো

তনুজা বড় একটা নিঃশ্বাস ছেড়ে কলটা রিসিভ করলো

"হে

হ্যালোটা পুরো বলারও সুযোগ পেল না

ওপাশ থেকে তুষারের বজ্রকণ্ঠ ভেসে এলো

"কল ধরতে এতক্ষণ লাগে কেন?কী করছিলি?

তনুজা এক কানে আঙুল দিয়ে চোখ বন্ধ করে সব শুনলো

তারপর বিরক্ত মুখে বললো

"ছোটবেলায় কী মামনি আপনাকে মধু খাওয়ায়নি?নাকি মধুর ডেট এক্সপায়ার হয়ে গিয়েছিল,তাই সব মিষ্টি তেতো হয়ে গেছে?

ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা

তারপর তুষার বললো

"মধু খাইয়েছিল"কিন্তু তোকে মানুষ করতে গিয়ে শরীরের সবমিষ্টি শেষ হয়েগেছে।

তনুজা চোখ উল্টালো

উফ

তুষার আবার বললো

"নাটক কম কর কী করছিলি?

জ্বরের জন্য তনুজার শরীরটা ভীষণ দুর্বল লাগছে

সে ক্লান্ত গলায় বললো

"ঘরেই ছিলাম ধরতে ধরতেই কেটে দিলেন।আবার ব্যাক করবোতার আগেই আবার দিয়ে ফেললেন।এতে কী আমার দোষ?

তনুজার কণ্ঠ শুনেই তুষারের কপালে আরও দুটো ভাঁজ পড়লো।চেনা কণ্ঠটা আজ কেমন ভাঙাভাঙা লাগছে

যেন কষ্ট করে কথা বলছে।

সে গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করলো

"কী হয়েছে?এভাবে কথা বলছিস কেন?শরীর খারাপ?

তনুজা বিছানায় শুয়ে পড়লো

গলায় একটু আদুরে ভাব এনে বললো

"হুম"খুব জ্বর এসেছে তুষার ভাই।

ভালো লাগছে না।

মাথাটা খুব ভার হয়ে আছেমুখে কিছুই ভালো লাগছে না তার উপর কোমর ব্যথায় তো মরেই যাচ্ছি।

তুষার চুপ করে সব শুনলো।

শেষের কথাটা শুনে সে নিজের হাতে থাকা ঘড়িটার দিকে তাকালো।আজকের তারিখটা দেখে আবার জিজ্ঞেস করলো

"আম্মু কে জানিয়েছিস?পেইন কিলার খেয়েছিস?

"হ্যাঁ জানে পেইন কিলার খাইনি।ওটা খেলে আমার মাথা ঘুরে

আপনি কিছু বলবেন?এত রাতে কল দিলেন যে?

তুষারের কণ্ঠ মুহূর্তেই শক্ত হয়ে গেল

"ইডিয়ট!খাসনি কেন?তোকে কী এখনও ছোট বাচ্চার মতো মুখেতুলে ওষুধ খাইয়ে দিতেহবে?

তনুজার মুখটা সঙ্গে সঙ্গে মলিন হয়ে গেল

সে আস্তে করে বললো

"বকছেন কেন?এই তো একটু আগেও ভালোভাবে কথা বলছিলেন।

রাখলাম আপনার সঙ্গে কথা বলে আমার মুড খারাপ করতে চাই না

তুষার ঠান্ডা গলায় বললো

"কলটা কেটে দেখ তারপর কী করি

তনুজার বুক ধড়ফড় করে উঠলো

লোকটা যে কথার মানুষ,সেটা সে খুব ভালো করেই জানে

সে তাড়াতাড়ি বললো

"না না কাটবো নাবলুন

তুষারের ঠোঁটের কোণে অদৃশ্য একটা হাসি ফুটলো।

"আগে পেইন কিলার খা।তারপর কথা বলছি।

না পেরে তনুজা উঠে দাঁড়ালো

ফার্স্ট এইড বক্স থেকে একটা ওষুধ বের করে পানি দিয়ে খেয়ে নিলো

তারপর আবার ফোন কানে ধরে বললো

"খেয়েছি এখন বলুন

তুষার সরাসরি প্রশ্ন করলো

"ফোন বন্ধ করে রেখেছিলি কেন?

তনুজা কয়েকবার চোখের পাতাফেললো

"এমনিই চার্জ ছিল না

"কাল রাতে কোথায় ছিলি?

প্রশ্নটা শুনে তনুজার বুকটা ধক করে উঠলো

তার মাথায় একটাই চিন্তা ঘুরপাক খেতে লাগলো কেউ কি কিছু বলে দিয়েছে?

তাহলে তো আজ তার রক্ষা নেই!

ওপাশ থেকে আবার তুষারের গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে এলো।

"কী হলো?কিছু জিজ্ঞেস করছি?কোথায় ছিলি?

একটা মিথ্যা কথাও যেন মুখ থেকে না বের হয়।

তনুজা বুঝে গেল।লোকটা সব জেনেই প্রশ্ন করছে।

মিথ্যা বলে কোনো লাভ নেই

সে খুব আস্তে বললো

"পার্টি..পার্টিতে গিয়েছিলাম

পরের মুহূর্তেই ফোনের ওপাশ থেকে তুষারের গর্জন শোনা গেল

রাগে পাশের দেয়ালে সজোরে ঘুষি মারলো সে

"কেনো?পার্টিতে কেন গিয়েছিলি?কোন সাহসে গিয়েছিলি?

তনুজা ভয়ে কেঁপে উঠলো। তার গলা শুকিয়ে এলো

"তু তুষার ভাই"প্লিজ"রাগ করবেন না।আমার কথাটা শুনুন"

তুষারের গলা আরও কঠিন হয়ে উঠলো

"কী কথা শুনবো?তুই কোন মুখে আমাকে রাগ করতে মানা করছিস?

"কী কাণ্ড ঘটিয়ে এসেছিস, তার ধারণা আছে তোর?যদি একটু এদিক-ওদিক হয়ে যেত যদি একবারও ভেবেছিলি?

তনুজার পুরো শরীর কাঁপছে।

প্রতিটা কথায় যেন বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠছে।

চোখের কোণ বেয়ে নীরবে গড়িয়ে পড়লো কয়েক ফোঁটা নোনাজল।

"তু..তুষার ভাই তুমি আমার কথা টা শুনো আমি যেতে

"তোর আর কোনো কথাই শুনার ইচ্ছে আমার নেই"

*

প্যারিসের হোটেল রুমে দাঁড়িয়ে তুষার মুঠো করে ধরে আছে নিজের হাত। দূরে শহরের আলোয় ঝলমল করছে রাস্তা। সারি সারি গাড়ির হেডলাইট সাপের মতো এগিয়ে যাচ্ছে।

সাদা শার্টের ওপরের দুটো বোতাম খোলা। হাতার অংশ কনুই পর্যন্ত গুটিয়ে রাখা। বাম হাতে স্টিলের ঘড়িটা ঝলসে উঠছে আলোয়। কপালের ওপর এলোমেলো হয়ে পড়ে আছে কয়েক গোছা চুল।

দেয়ালে ঘুষি মারার জায়গাটা লাল হয়ে উঠেছে। গিঁটের চামড়া হালকা ছড়ে গেছে। কিন্তু সে যেন সেটা টেরই পাচ্ছে না।

মুঠো করে ধরা ফোনটার স্ক্রিনে এখনও শেষ কলের নামটা ভেসে আছে

"একটা বিশেষ নাম"

তুষার বিরক্ত হয়ে ঠোঁট শক্ত করলো।

পরের মুহূর্তেই

ফোনটা গিয়ে পড়লো বিছানার ওপর। রাগে তার বুকটা দ্রুত ওঠানামা করছে। চোয়াল শক্ত। কপালে স্পষ্ট কয়েকটা ভাঁজ।

বাথরুমের দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এলো তন্ময়।

হাতে তোয়ালে

ভেজা চুল থেকে এখনও টপটপ করে পানি পড়ছে।

রুমের ভেতরের অস্বাভাবিক নীরবতা দেখে সে একবার তুষারের দিকে,আরেকবার বিছানায় পড়ে থাকা ফোনটার দিকে তাকালো।

তারপর ঠোঁটের কোণে চাপা হাসি টেনে বললো

"মনে হচ্ছে আমার বোনের বিচারসভা এইমাত্র শেষ হলো?"

তুষার কিছু বলল না।কপালটা দুই আগুল ধারা চেপে দাঁড়িয়ে আছে।

"খবরদার ভুলেও ওর সাথে মিষ্টি কথা বলে মাথায় চোরানোর চিন্তা করবি না"

"কিন্তু ভাই আমার প্রিন্সেসের মন টা নিশ্চয়ই...

"সেটা ও বুঝে নিবে শুয়ে পর"

তন্ময় নিজের কোনো কথাই শেষ করতে পারলে না না চাইতেও তনুজার কথাটা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলল

*

*

তনুজা কাঁদতে কাঁদতেই কখন ঘুমিয়ে পড়েছিল

টুং

মেসেজ আসার শব্দে তার ঠোঁটের কোণে অজান্তেই হাসি ফুটে উঠলো।ওই অচেনা মানুষটা নিশ্চয়ই সে মেসেজ দিয়েছে!তাড়াহুড়ো করে ফোনটা হাতে নিতেই ঘুমটা কেটে গেল

তনুজা পিটপিট করে ঘুম জড়ানো চোখে চারপাশে তাকালো

এখনও রাত?

সে ধীরে ধীরে উঠে বসল। বিছানার পাশে রাখা ফোনটা হাতে নিয়ে স্ক্রিন অন করলো

আঙুলটা নিজে থেকেই নোটিফিকেশনের দিকে চলে গেল

কিন্তু কোনো মেসেজ নেই। একটাও না পরক্ষণেই তনুজার মুখটা মলিন হয়ে গেল। ঘুমের মধ্যেই সে ভেবেছিল মানুষটা বুঝি সত্যিই তাকে মেসেজ করেছে

কিন্তু না সবটাই স্বপ্ন ছিল

ফোনটা নিঃশব্দে পাশে রেখে আবার শুয়ে পড়লো সে।

কিন্তু আর ঘুম এলো না

জ্বরের ক্লান্তি যেন আরও জেঁকে বসল শরীরে মাথাটা ভারী হয়ে আছে।সারা রাত কেটে গেল জ্বরে কাঁপতে কাঁপতে। চোখ বন্ধ করলেই বারবার তুষারের কথাগুলো কানে ভেসে আসছে। তনুজা দীর্ঘশ্বাস ফেললো

সে তো যেতে চায়নি। রাহাই জোর করেছিল। সে না গেলে রাহা হয়তো একাই চলে যেত।

আর

সে যদি সত্যিই না যেত তাহলে গত রাতে রাহার কী হতো?

ভাবতেই বুকের ভেতরটা হুহু করে উঠলো তার।

ভোরের নরম আলো ধীরেধীরে জানালার পর্দা ভেদ করে ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়েছে।বাইরে গাছের ডালে বসে ছোট ছোট পাখিরা একে অপরকে ডেকে যাচ্ছে। হালকা সকালের বাতাসে পর্দাগুলো আস্তে আস্তে দুলছে।

এমন শান্ত একটা সকাল

তবুও তনুজার শরীরটা যেন ভেঙে চুরমার হয়ে আছে।

ফজরের নামাজের পর কখন যে চোখ লেগে গিয়েছিল সে নিজেও টের পায়নি।

"তনু শুনছিস?

"এই তনু

পরিচিত কণ্ঠে ঘুম ভাঙলো তনুজার

সে ধীরে ধীরে পিটপিট করে চোখ খুলে সামনে তাকালো।

রাহা

হাতে একটা ট্রে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে

রাহা বিছানার পাশে বসে কপালে হাত রাখলো

"কিরে খুব খারাপ লাগছে?

তনুজা মলিন হেসে মাথা নাড়লো।

না।

তারপর ধীরে ধীরে উঠে বসল

রাহা ট্রেটা সামনে এগিয়ে দিয়ে বললো

"মা খাবার দিয়ে গেছে আগে এগুলো খেয়ে ওষুধ খেয়ে নিস। তারপর ফ্রেশ হয়ে আয়।

তনুজা চুপচাপ মাথা নাড়লো।

রাহা উঠে দরজার দিকে এগিয়ে গেল।

কিন্তু দরজা পর্যন্ত গিয়েও আবার ফিরে তাকালো।

"ও হ্যাঁ তোর মনে হয় একটা পার্সেল এসেছে। নিচে রাখা আছে

তনুজা ভ্রু কুঁচকে তাকালো

"পার্সেল?

কয়েক সেকেন্ড ভেবে হঠাৎ মনে পড়লো

ক্রোশের সুতা! হয়তো সেগুলোই এসেছে।

ফ্রেশ হয়ে নিজের বানানো ক্রোশের সাদা সোয়েটারটা গায়ে দিলো।

তার সঙ্গে একটা স্কার্ট পরে ধীরে ধীরে নিচে নেমে এলো।

এদিকে রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে রান্না করছিলেন রুবি বেগম।

এক হাতে নাড়ছেন হাঁড়ি, অন্য হাতে ফোন কানে।

ওপাশে ছিলেন তাঁর বড় বোন।

ঠিক তখনই সিঁড়ি দিয়ে তনুজাকে নামতে দেখে তিনি ইশারায় বললেন

"আচ্ছা আপা, পরে কথা বলি।"

কলটা কেটে রাখলেন। তনুজা ড্রয়িংরুমের দিকে যেতে নিতেই পিছন থেকে ডাক এলো।

"কিরে?খাবার আর ওষুধ খেয়েছিস?

তনুজা থেমে পিছনে তাকালো।

"না"

"এই পার্সেলটা দেখি। তারপর খেয়ে নিবো।

রুবি বেগম অসহায় হেসে বললেন

"আচ্ছা।

ড্রয়িংরুমে এসে তনুজা দেখলো সুন্দর করে মোড়ানো একটা বক্স রাখা।

সে একটু অবাক হলো। এভাবে তো কখনো পার্সেল আসে না

পরক্ষণেই তার মনে পড়লো

সেই অচেনা মানুষটার প্রথম গিফট বক্সটার কথা।

অজান্তেই ঠোঁটের কোণে ছোট্ট একটা হাসি ফুটে উঠলো।

সে ধীরে ধীরে বক্সটার মোড়ক খুলতে শুরু করলো।

ঠিক তখনই আবার রুবি বেগমের ডাক।

"এই তোর জন্য একটা ফুলের বুকেও এসেছে।

"ওই যে অ্যাকুরিয়ামের ওপর রাখা।

তনুজা ঘুরে তাকাতেই মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে গেল।

সাদা গোলাপ আর গোলাপি লিলি

তার সবচেয়ে প্রিয় দুইটা ফুল দিয়ে বানানো অপূর্ব একটা বুকে। সকালের আলোয় ফুলগুলো আরও সুন্দর লাগছে।

তনুজার চোখদুটো চিকচিক করে উঠলো।

সাদা রঙ আর সাদা গোলাপের সঙ্গে পিঙ্ক লিলি

এমন কম্বিনেশন সে ভীষণ ভালোবাসে।

ঠিক তখনই দৌড়ে এলো মুলান।

তনুজা ধপ করে মেঝেতে বসে তাকে কোলে তুলে নিলো।

তারপর মুলানকে নিয়েই বুকেটার কাছে গিয়ে দু'হাতে তুলে নিলো।

চোখ বন্ধ করে আস্তে করে ফুলের সুবাস টেনে নিলো।

একটা অদ্ভুত শান্তি নেমে এলো তার ভেতরে।

কিন্তু পরক্ষণেই ভ্রু কুঁচকে গেল।

কে পাঠালো এগুলো?

এই সব কিছুই তার অর্ডার করনা তাহলে?

তাড়াতাড়ি আবার বক্সটার কাছে ফিরে এলো।

মুলানকে কোলে বসিয়েই এক এক করে জিনিসগুলো বের করতে লাগলো।

প্রথমে চার বক্স ডার্ক চকলেট

একটা প্যাকেট কয় একটা পিরিয়ড প্যাড।

তনুজা অবাক হয়ে গেল কারণ

গতকালই তার পিরিয়ড শুরু হয়েছে।

এরপর বের হলো ছোট্ট একটা পান্ডা।

পান্ডা তার সবচেয়ে প্রিয় প্রাণী।

শেষে

বক্সের এক কোণে ভাঁজ করে রাখা একটা ছোট্ট চিরকুট।

তনুজা নিঃশব্দে সব জিনিস পাশে রেখে চিরকুটটা হাতে তুলে নিলো

—অচেনা প্রণয়ের চিরকুট—

এই কয়টা দিন আপনার জন্য মোটেও সহজ নয়।

ব্যথা লুকিয়ে রাখতে আপনি খুব পটু... কিন্তু বিশ্বাস করুন ,আপনার হাসির আড়ালের ক্লান্তিটাও কারও কারও চোখ এড়ায় না।

আর একটা ছোট্ট অনুরোধ!

এই কয়েকটা দিন নিজের সঙ্গে একটু নরম থাকবেন । সবাইকে শক্ত থাকতে হয়, নিজের কাছে নয়।

তাই জেদ না করে নিজের যত্ন নিবেন।

ফুলগুলো দেখে নিশ্চয়ই মাথায় প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে আপনার অতিপ্রিয় জিনিসের কথা কিভাবে জানি মাথাটা কে এতো প্রেশার দিবেন না। সব জানি আমি।

চকলেটগুলো আপনার হঠাৎ হঠাৎ বদলে যাওয়া মেজাজের সঙ্গ দিবে আসা করি

শুধু এইটুকু জানিয়ে রাখি— দূরে থেকেও কেউ একজন আপনার ভালো থাকাটাকে খুব গুরুত্ব দিয়ে দেখে।

আর হ্যাঁ

গত দু'দিন আপনাকে কোনো বার্তা দিতে পারিনি। হঠাৎ কিছু অনিবার্য ব্যস্ততা এসে পড়েছে। হয়তো আরও কয়েকটা দিন এমনই থাকবে।

তাই আমার জন্য অপেক্ষা করে নিজের ঘুম নষ্ট করবেন না। ফিরে এসে আবার বিরক্ত করবো।

ততদিন পর্যন্ত

ভালো থাকবেন। নিজের যত্ন নিবেন।

—আপনার অচেনা প্রণয়ের মানুষ

*

*

চিরকুটটা পড়া শেষ করেও কিছুক্ষণ নিশ্চুপ হয়ে বসে রইলো তনুজা।

অজান্তেই ঠোঁটের কোণে একটা মিষ্টি হাসি ফুটে উঠলো।

মেয়েটা নিজেও বুঝতে পারছে না কেন এত ভালো লাগছে।

কেউ একজন দূরে থেকেও তার ছোট ছোট অসুবিধাগুলো খেয়াল রাখছে।

কেউ একজন জানে তার ডার্ক চকলেট পছন্দ। সাদা গোলাপ আর পিঙ্ক লিলি তার দুর্বলতা।

এমনকি এই সময়টায় তার মেজাজ কেমন থাকে, সেটাও!

তনুজা আলতো করে ফুলের তোড়াটা বুকের সঙ্গে জড়িয়ে ধরলো।

তারপর আবার চিরকুটটা খুলে একবার পড়লো।

না

যতবার পড়ছে,ততবারই কেমন যেন বুকের ভেতরটা গরম হয়ে উঠছে।

মুখে কথাটা বললেও হাসিটা আর লুকাতে পারলো না।

পান্ডাটাকে এক হাতে, ফুলের তোড়াটা অন্য হাতে নিয়ে বাকি জিনিসগুলো যত্ন করে আবার বক্সে ঢুকিয়ে নিলো।

এই আনন্দটা একা একা রাখার মানুষ সে নয়।

রাহাকে না দেখালে যেন শান্তিই লাগছে না।

জ্বর,শরীর খারাপ সব যেন মুহূর্তের জন্য উধাও হয়ে গেল। প্রায় দৌড়াতেই উপরের তলায় উঠে গেল তনুজা।

রাহা নিজের রুমের দরজা ভেজিয়ে বিছানায় বসে আছে।

ফোনটা কানের সঙ্গে চেপে ধরে মুখ ফুলিয়ে বললো

"তুমি শুধু শুধু আমায় বকছো।

"বললাম তো সরি.আর কোনোদিন যাবো না। প্লিজ রাগ করো না.দেখো,আমি কিন্তু এখন কেঁদে দিবো!

ওপাশ থেকে কী যেন বলতেই রাহা আরও মিনমিন করে বললো

"আচ্ছা বাবা ভুল হয়ে গেছে"

ঠিক তখনই

দরজাটা খুলে গেল

রাহা চমকে উঠে তড়িঘড়ি করে ফোনটা পেছনে লুকিয়ে ফেললো

তনুজা ভ্রু কুঁচকে তাকালো।

"কিরে কার সাথে কথা বলছিলি?

রাহার বুক ধকধক করছে।

সে তোতলাতে লাগলো

"ক.. কই?"না তো!

"কারও সাথে না

আমি তো রিল.. রিলস দেখছিলাম।

তনুজা দুই হাত কোমরে রেখে সামনে এগিয়ে এলো।

"আমাকে বাচ্চা পেয়েছিস?

"আমি কিন্তু স্পষ্ট শুনেছি তুই কারও সাথে কথা বলছিলি।

"কার সাথে কথা বলছিলি?

রাহার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে গেল।

মাথার ভেতর যেন কোনো উত্তরই আসছে না।

তনুজা সন্দেহ চোখ গুলো শুরু করে জিজ্ঞেস করলো

"তুই কি প্রেম...

রাহা কি করবে বুঝে উঠতে পারছে মা হঠাৎ তার চোখ পড়লো তনুজার হাতে থাকা ফুলের তোড়া আর বিশাল বক্সটার দিকে।

মুহূর্তেই কথার মোড় ঘুরিয়ে দিল সে।

তনুজা নিজের কথা শেষ করতে পারলো না।

"আ...আরে!তোর হাতে ওগুলো কী?

তনুজাও যেন এক সেকেন্ডের জন্য সব ভুলে গেল।

তার মুখটা মুহূর্তেই উজ্জ্বল হয়ে উঠলো।

"আরে দেখ এটাই দেখাতে এসেছিলাম!

সে এক দৌড়ে বিছানার ওপর বক্সটা রেখে একে একে সব বের করতে লাগলো।

ফুল,পছন্দের ডার্ক চকলেট "পান্ডা আর এটা"

হঠাৎ পিরিয়ড প্যাড-গুলো দেখে নিজেই কয়েক সেকেন্ড থেমে গেল।

চোখ দুটো বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল।

তারপর খুব আস্তে বললো

"আচ্ছা উনি জানলো কী করে?"

রাহা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো।

"এসব কে পাঠিয়েছে?

তনুজা চিরকুটটা বুকের কাছে চেপে ধরে রহস্যময় হাসি দিয়ে বললো

একটু থেমে চোখ টিপে বললো

"আমার অচেনা প্রণয়ের মানুষ।"

রাহা ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে থাকলো।

"তুই প্রনয় মানে বুঝিস তনু?

তনুজা কপাল কুঁচকালো ভাবার মতো করে বলল।

"আমি বাঙালি একটু সাহিত্য তো আমিও জানি... হুমমম

প্রনয় মানে.... স্নেহ বা গভীর অনুরাগ হওয়ার কথা।

"তা হয় কিন্তু এটার আরেকটা মানে আছে যা হলো।

প্রেম ভালবাসা" তুই কোনটার কথা বলছিস?

তনুজার গাল গুলো মুহূর্তে লাল বর্ণ ধারণ করল।

"আম আমি... আমি তো স্নেহ বা গভীর অনুরাগ কেই বুঝি তাই বলেছি।

রাহা চোখ গুলো ছোট ছোট করে বলল

"চেহরা দেখে তো মনে হচ্ছে না তা!

"ধুর কি বলছিস গেলাম আমি"

দুই বোনের হাসিতে ঘরটা আবার প্রাণ ফিরে পেল।

কিন্তু হাসিটা বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না।

তনুজা হঠাৎ যেন কিছু মনে পড়তেই মুখটা গম্ভীর হয়ে গেল।

"রাহা"তোর ফোনটা দে তো।"

রাহা আবারো ঘাবড়ে যায়। সে মনে মনে ভাবে ফোন কেনো চাইছে ওকি কিছু টের পেলো নাকি।

"কিরে দে"

রাহা ভাবনা থেকপ বের হয়ে বলল।

"কেন?

"একটা কল করবো।

রাহা দেওয়ার আগেই তবুজা রাহার পাশ থেকপ ফোন টা নিয়ে নিলো।

রাহার শরীর ঘামছে!

তনুজা ফোন নিয়ে মুখস্থ করা নাম্বারটা। কাঁপা আঙুলে টিপলো।

কয়েক সেকেন্ড পেরোতেই সে নিঃশ্বাস আটকে অপেক্ষা করতে লাগলো।

কিন্তু...

"The number you are calling is currently switched off. Please try again later."

যান্ত্রিক মহিলা কণ্ঠটা কানে ভেসে আসতেই তনুজার বুকের ভেতরটা কেমন ধক করে উঠলো।

সে ঠোঁট কামড়ে আবার কল দিল।

কিন্তু প্রতিবারই একই উত্তর।

তনুজা ফোনটা নামিয়ে অনেকক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইলো।

কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ে গেল।

মনে মনে বিড়বিড় করলো,

"কোথায় গেল মানুষটা?

"দুই দিন ধরে একটা মেসেজও নেই"

"এখন আবার ফোনটাও বন্ধ"

"কিছু হয়েছে নাকি?

রাহা উদ্বিগ্ন হয়ে এগিয়ে এলো।

"কী হয়েছে?"কাকে কল দিলি "কে ছিল?"

তনুজা বলল

"সেই মানুষ টা কি জানি কি হয়েছে গত দুইদিন যাবত কোনো খবর নেই। আর আজকে এই গিফট গুলোর সাথে চিরকুট এ বলল কোনো ব্যস্ততা আছে।

"জানিস রাহা লোকটা আমার সব খবর জানে। কে জানে আনতাজেই বলে কিনা সব কথা নাকি সত্যিই নয়তো প্রতি টা কথা মিলে কিভাবে?

ঘরের ভেতর কয়েক মুহূর্ত নীরবতা নেমে এলো।

ঠিক তখনই

নিচতলা থেকে রুবি বেগমের ডাক ভেসে এলো।

"তনু,রাহা নিচে আয় দেখ কে এসেছে।

দুই বোন একে অপরের দিকে তাকালো।

তনুজা নিজের সব চিন্তা আপাতত বুকের ভেতর চেপে রেখে ধীরে ধীরে নিচে নেমে এলো।

ড্রইংরুমে ঢুকতেই সে অবাক হয়ে গেল। সোফায় বসে আছেন আসমা বেগম। তার পাশেই সাদ।

হাতে শপিং ব্যাগ, মুখে পরিচিত হাসি। তবে সেই প্রফুল্ল হাসি সাদের মুখে নেই।

তনুজাকে দেখেই আসমা বেগম হাত বাড়িয়ে বললেন,

"এই যে আমার দুই রাজকন্যা!"এসো মা।"

রাহা দৌড়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরলো তাঁকে। তনুজাও হাসিমুখে সালাম দিলো।

আসমা বেগম তনুজার কপালে হাত দিয়ে বললেন,

"শুনলাম জ্বর হয়েছে?এখন কেমন লাগছে?

তনুজা হেসে বললো

"অনেকটাই ভালো আন্টি।

সাদ এতক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল। একবার শুধু তনুজার দিকে তাকালো। মুখে সেই শান্ত হাসি।

তারপর বললো

"তোমাদের দুজনকে নিতে এসেছি।

রাহা অবাক হয়ে বললো

"কোথায়?"

আসমা বেগম উচ্ছ্বসিত গলায় বললেন

"আজ সাদের এনগেজমেন্ট এর রিং টা কিনবো। ২ দিন পর এনগেজমেন্ট এর আয়োজন রাখা হয়েছে।

"আমার কোনো মেয়ে নেই সাদেরও বোন নেই তোরাই তো ওর বোন। তাই বোনদের যেই কর্তব্য থাকে বিয়েতে তা তোরা পূরণ করবি। এখন সাদের সাথে গিয়ে রিংটা নিয়ে আয়।

তনুজা একটু ইতস্তত করে বললো,

"কিন্তু আন্টি আমার তো শরীর..

কথা শেষ করতে দিলেন না আসমা বেগম।

হেসে বললেন,

"একটু বের হলে শরীরও ভালো লাগবে যা।

রুবি বেগমও তার সাথে তাল মিলিয়ে বল্লেন যেতে।

তনুজা জোর করে একটা হাসি দিল।

চলবে!!

পর্ব সংখ্যা —২৭

লেখিকা—তাসনিয়া জাহান

অচেনা প্রনয়ের চিরকুট

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২৭তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন