প্যারিস—
স্বচ্ছ নীল আকাশের নিচে শহরটা ধীরে ধীরে জেগে উঠছে।কাঁচে মোড়ানো উঁচু উঁচু ভবনগুলোর গায়ে সকালের সোনালি রোদ ঝিলমিল করছে।দূরে ব্যস্ত রাস্তায় সারি সারি গাড়ি ছুটে চলছে নিজ নিজ গন্তব্যে।শহরের কোলাহল এখনও পুরোপুরি জেগে ওঠেনি হালকা ঠান্ডা বাতাস জানালার কাঁচে এসে বারবার আছড়ে পড়ছে
একটি ফাইভ-স্টার হোটেলের বিশাল কনফারেন্স স্যুট
দেওয়ালজুড়ে বড় LED স্ক্রিন।সামনে কাঁচের লম্বা টেবিল।টেবিলের উপর ছড়িয়ে রয়েছে নানান নকশা প্রজেক্ট ফাইল আর ল্যাপটপ
স্ক্রিনে একের পর এক ডিজাইন বদলে যাচ্ছে
সবার সামনে দাঁড়িয়ে আছে তুষার
পরনে চারকোল ব্ল্যাক প্যান্ট সাদা শার্ট, উপর থেকে দুটো বোতাম খোলা।হাতার অংশ কনুই পর্যন্ত গুটিয়ে রাখা
এক হাতে লেজার পয়েন্টার,অন্য হাতে প্রজেক্টের ফাইল
শান্ত অথচ দৃঢ় কণ্ঠে একের পর এক বিষয় বুঝিয়ে যাচ্ছে সে।
তার প্রতিটি কথায় আত্মবিশ্বাস স্পষ্ট।অন্যদিকে টেবিলের পাশে বসে গভীর মনোযোগ দিয়ে সবকিছু শুনছে তন্ময়
মিটিংটা প্রায় দেড় ঘণ্টা ধরে চললো শেষে সবাই একে একে উঠে দাঁড়ালো।করমর্দন করে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে গেল সবাই
পুরো কনফারেন্স রুমে শুধু তুষার আর তন্ময়
তন্ময় ফাইলগুলো গুছাতে গুছাতে বললো
"এত তাড়াহুড়ো করছো কেন ভাই?সবকিছু এত দ্রুত করলে ঝামেলা হতে পারে। জোর করে করা কাজ খুব কমই নিখুঁত হয়।
তুষার ল্যাপটপ বন্ধ করতে করতেই উত্তর দিল
"আমাদের যত দ্রুত সম্ভব লন্ডনে ফিরতে হবে।কাজটা তারাতারি শেষ করে ফেল
তন্ময় ভ্রু কুঁচকে তাকালো
"কেন?প্রজেক্টটা খুব বড়।আমার তো মনে হচ্ছে একটু সময় নিয়ে করলে আরও ভালো হবে। তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে যদি কোনো ভুল হয়ে যায়,ছোট আব্বু আর আব্বুর মনটাই খারাপ হবে।
একটু থেমে আবার বললো
"তোমার যদি এতই তাড়া থাকে,তুমি চলে যাও।আমি এখানে থেকে সব সামলে নেব সমস্যা নেই ভাই।
তুষার মাথা নাড়লো।
"না।যখন এসেছি,একসাথেই ফিরবো। কাজ শেষ করেই লন্ডন ব্যাক করবো
তন্ময়ের মুঠোফোনটা তীব্র আওয়াজে বেজে উঠলো।
স্ক্রিনে ভেসে উঠলো পরিচিত একটি নাম
ঠোঁটের কোণে অজান্তেই ছোট্ট হাসি ফুটে উঠলো তার
তুষারের চোখ এড়ায়নি বিষয়টা।
তন্ময় ফোনটা হাতে নিয়ে বললো
"আমি একটু আসছি ভাই"
কথাটা বলেই কয়েক কদম দূরে কাঁচের জানালার পাশে গিয়ে কল রিসিভ করলো।
★
★
লন্ডন
শহরের সবচেয়ে বড় শপিং মলগুলোর একটি
উইকএন্ড হওয়ায় পুরো মলটা মানুষের ভিড়ে মুখর। কোথাও নতুন অফারের ঘোষণা,কোথাও ব্যস্ত পায়ের শব্দ মিলেমিশে এক অদ্ভুত প্রাণচাঞ্চল্য তৈরি করেছে
এসকেলেটর দিয়ে উপরে উঠছে তিনজন
সাদ, রাহ,আর তনুজা
জ্বর প্রায় ছেড়েছে, তবুও তনুজার মুখে এখনও ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট
তবুও আজ তাকে অদ্ভুত সুন্দর লাগছে।
পরনে ক্রিম-সাদা রঙের নরম শিফনের ফুল-স্লিভ টপ। হাতার প্রান্তে হালকা ফ্রিল, টপটির সঙ্গে গাঢ় কফি-ব্রাউন হাই-ওয়েস্ট ওয়াইড-লেগ প্যান্ট যেন তাকে আরও লম্বা আর মার্জিত দেখাচ্ছিল।লম্বা চুলগুলো খোলা। কাঁধে ছোট্ট স্লিং ব্যাগ। স্বাভাবিক সৌন্দর্য আলাদা করেই চোখে পড়ছে
পাশেই হাঁটছে রাহা। পরনে বেবি-পিংক টপ সাদা ওয়াইড-লেগ জিন্স আর সাদা স্নিকার্স। মুখভরা চঞ্চলতা যেন এখনও আগের মতোই আছে।
তাদের সামনেই হাঁটছে সাদ
সাদা প্যান্টের সঙ্গে স্কাই-ব্লু ফুল-স্লিভ শার্ট। হাতার অংশ ভাঁজ করা। লম্বা, সুঠাম দেহ। গায়ের রং উজ্জ্বল শ্যামলা। চওড়া কাঁধ আর শান্ত ব্যক্তিত্ব তাকে ভিড়ের মধ্যেও আলাদা করে তুলেছে। হাঁটার ভঙ্গিতেই এক ধরনের পরিণত সৌন্দর্য ফুটে উঠছে
সাদ দু'হাত পকেটে ঢুকিয়ে হালকা হেসে পিছনে তাকালো
চলো তোমাদের দু'জনের ড্রেস কিনি আগে। তারপর রিংটা দেখি।
রাহা মাথা নারালো
"ঠিক আছে"
তনুজা শুধু মৃদু হেসে তাদের দু'জনের পেছন পেছন হাঁটতে লাগলো
★
শপিং মলের ব্যস্ত ভিড়ের মাঝেও তনুজা যেন সম্পূর্ণ অন্য এক জগতে হাঁটছে।
রাহা আর সাদ অনেকটা সামনে। তাদের পেছন পেছন ধীর পায়ে হাঁটছে সে।
চারপাশে মানুষের কোলাহল, দোকানিদের ডাক বাচ্চাদের হাসি—সবকিছুই যেন তার কানে পৌঁছাচ্ছে না।
তার মাথাজুড়ে ঘুরছে শুধু একজন মানুষ
সেই অচেনা মানুষটা
যার নাম জানে না পরিচয় জানে না কোথায় থাকে তাও জানে না
তবুও অদ্ভুতভাবে মানুষটা গত কয়েকদিনে তার ভাবনার একটা বড় অংশ দখল করে নিয়েছে
মানুষটার কথা ভাবতেই নিজের অজান্তেই ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠলো
মনে মনে বিড়বিড় করে বলল
"নাম নেই ঠিকানা নেই মুখটাও কোনোদিন দেখিনি তবুও মানুষটা দিব্যি মাথার ভেতর বসে আছে! উফ কী সাংঘাতিক লোক! না থেকেও কী সুন্দর করে নিজের অস্তিত্ব টের পাইয়ে দিচ্ছে।আর যদি সত্যি চোখের সামনে ঘুরঘুর করতো তাহলে কি করতো?
হঠাৎ সামনে এসে দাঁড়ালো সাদ।
"কী হয়েছে তোমার?
তনুজা চমকে উঠলো
"হ্যাঁ?
"সেই কখন থেকে দেখছি অন্যদিকে তাকিয়ে হাঁটছো। শরীর খারাপ লাগছে?
তনুজা হেসে মাথা নাড়ল
"না কিছু হয়নি দোকান পেয়েছেন?
সাদ মাথা নেড়ল হ্যাঁ বুঝালো আর কিছু না বলে হালকা করে তনুজার কব্জিটা ধরলো।
"চলো"
তনুজা কিছু বুঝে ওঠার আগেই সে তাকে নিয়ে ঢুকে গেল একটি বড় ভারতীয় বুটিকে।
চারদিকে সারি সারি ঝুলছে শাড়ি, লেহেঙ্গা, গাউন সালওয়ার-কামিজ নানা রঙের জমকালো পোশাক।
রাহা ঢুকেই একেকটা ড্রেস হাতে নিয়ে উল্টেপাল্টে দেখতে শুরু করলো। সে নিজের পছন্দ মতো ড্রেস নিয়ে ট্রাই রুমে ঢুকলো।
আর তনুজা চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো।
সাদ তার হাত ছেড়ে দিয়ে পোশাকের র্যাকগুলোর দিকে এগিয়ে গেল।
কিছুক্ষণ খুঁজে কয়েকটা হালকা রঙের অপূর্ব ড্রেস বের করে নিয়ে এসে তনুজার সামনে ধরলো।
"এগুলা কেমন?"
ড্রেসটা সত্যিই সুন্দর। তনুজার চোখে পছন্দের ছাপ ফুটে উঠলেও সে সেটি হাতে নিতে ইতস্তত করলো।
কেমন যেন অস্বস্তি লাগছে।
আসমা বেগম তাদের দুই বোনকে নিজের মেয়ের মতো আগলে রেখেছেন সব সময়।
প্রতি ঈদে রাহা আর তনুজার জন্য নতুন জামা পাঠানো পছন্দের রান্না করলেই বাসায় পাঠানো।
সবকিছুই তিনি নিজের সন্তানের মতো করেই করেছেন।
প্রতিবেশী শব্দটা তাদের সম্পর্কের সঙ্গে কোনোদিনই মানায়নি।
যে-ই দেখবপ, বলতে বাধ্য —রুবি বেগম আর আসমা বেগম বুঝি আপন দুই বোন।
কিন্তু
আজ ব্যাপারটা আলাদা।
সাদের বিয়ে উপলক্ষে তার কাছ থেকে কিছু নিতে তনুজার মন চাইছে না। সে ড্রেসটার দিকে চুপচাপ তাকিয়ে রইলো।
সাদ হাত বাড়িয়ে খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে তনুজার গাল ছুঁয়ে দিল।
"কী হলো? পছন্দ হয়নি?
স্পর্শটা লাগতেই পুরো শরীর কেঁপে উঠলো তনুজার।
অজানা এক অস্বস্তি বুকের ভেতর ছড়িয়ে পড়লো।
সে অপ্রস্তুত হয়ে দুই পা পিছিয়ে গেল।
সাদ এবার তনুজার বাহু আলতো করে ধরে বললো
"তোমার কী সত্যিই শরীর খারাপ লাগছে, তনু?"
তনুজা তাড়াতাড়ি নিজের বাহুটা ছাড়িয়ে নিয়ে ঠোঁটে কষ্ট করে হাসি টানলো।
"না বললাম তো।"
সাদও আর জোর করলো না। হয়তো সে তনুজার অস্বস্তি হওয়ার ব্যাপারটা বুঝতে পেরেছি। সে হেসে ড্রেসটা তার হাতে দিয়ে বললো
"তাহলে যাও ট্রায়াল দিয়ে এসো। আমার মনে হয় এগুলা তোমার ওপর খুব সুন্দর মানাবে।"
তনুজা নিঃশব্দে মাথা নাড়লো।
হাতে থাকা ফোনটা বাইরে সোফার ওপর রেখে ড্রেসটা নিয়ে ট্রায়াল রুমের দিকে হাঁটতে লাগলো।
পর পর সাদের দেওয়া চারটা ড্রেস ট্রায়াল দেওয়ার পর শেষবার ট্রায়াল রুমের দরজাটা খুলে বাইরে বেরিয়ে এলো তনুজা।
এবার তার পরনে অফ-হোয়াইট আরসফট পিঙ্কের মিশেলে ভারী কাজ করা একটি লেহেঙ্গা। কাঁধ বেয়ে নেমে থাকা ওড়নাটার সূক্ষ্ম এমব্রয়ডারি আলো পড়তেই চিকচিক করে উঠছে। কোমর পর্যন্ত নেমে আসা খোলা চুলের ফাঁক দিয়ে মুখটা যেন আরও কোমল লাগছে।
কয়েক সেকেন্ডের জন্য সাদ স্থির হয়ে তাকিয়ে রইলো।
মুখে অজান্তেই ফিসফিস করে বেরিয়ে এলো
"বিউটিফুল"
রাহা নিজের ড্রেসটা পড়ে ট্রায়াল রুম থেকে বের হয়ে ঘুরে তাকিয়ে লাফিয়ে উঠে বললো,
"ওহ মাই গড! সো প্রিটি"এটা একদম পারফেক্ট "
তনুজা হেসে ফেললো।
সাদও ধীরে ধীরে সামনে এসে দাঁড়ালো।
কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থেকে মৃদু হেসে বললো,
"ইউ লুক লাইক এ ব্রাইট"
তনুজা লজ্জা পেয়ে চোখ নামিয়ে ফেললো।
"ধুর কী যে বলেচেন আপনারা আমার লজ্জা লাগছে!"
রাহা আর তনুজা মিলে মোট চারটা ড্রেস ফাইনাল করল।
তনুজার ফোনটা বের করচিলো পেমেন্ট করার জন্য তবে ফোন এর স্ক্রিন অন করতেই চোখে পরলো
হোয়াটসঅ্যাপ এ ইনকামিং ভিডিও কল অ্যাংরি ম্যান নামটা থেকে চারটা মিসড কল আসেছে।
তনুজার কপালে ভাঁজ পড়ে গেল।
এই লোকটা তো দেশের বাইরে গেলে কখনো এত ফোন দেয় না। কাল রাত থেকে কী হয়েছে ওনার?
তনুজা কাউন্টার থেকে একটু সরে কল ব্যাক করলো
দুইবার রিং হতেই ওপাশ থেকে কল রিসিভ হলো।
স্ক্রিনে ভেসে উঠলো তুষারের গম্ভীর মুখ।
"ভিডিও অন কর মা কোথায় কল দরছে না কেনো?
তনুজা বিরক্ত মুখ করলো ভিডিও অন করলো না;
"আমি বাইরে আছি"মামণি বাসায় আছে।
"কোথায় আছিস?
"মলে"
'মল' শব্দটা শুনতেই তুষারের মুখের রঙ বদলে গেল।
চোয়াল শক্ত হয়ে এলো।
"মলে কী করছিস?সেদিনের বিপদটা কি কম পড়েছিল যে আজ আবার আরেকটা বিপদ ডেকে বাসা থেকে বের হয়েছিস?"
"তোকে রাহা কে কয়দিন বাইরে বের হতে মানা করিনি?
তনুজা ঠোঁট ফুলিয়ে বললো,
"আমরা কি আসতে চেয়েছি নাকি? মামণিই পাঠিয়েছে।"
"কার সাথে?
"সাদ ভাই আছে"
তুষারের কণ্ঠ আরও শক্ত হয়ে গেল।
"ওর সাথে কী?"
"এনগেজমেন্টের রিং কিনতে এসেছে।"
সাদ তনুজার সামনে এসে বলল
"তনু এড্রেস গুলি ফাইনাল?
তনুজা মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলল
সাদ বলল
"তাহলে পেমেন্ট করে দিলাম?
সাদের কথা গুলো শুনা মাএই তুষার গর্জে উঠলো
"এক থাপ্পড়ে দাঁত ফেলে দিবো যদি ওর কাছ থেকে এক পয়সারও কিছু নিস!"
তনুজা এবার সত্যিই বিরক্ত হয়ে গেল।
ভ্রু কুঁচকে বললো,
"তুমি এমন করো কেন তুষার ভাই?"নিবো না ওনার থেকে কিছু। সেটা ভালো করে বললেই তো হয়।"
তুষার দাঁত চেপে বললো
"তোর ভালোর কথার ভাত কুত্তায় খায়!অত্যাচারী কোথাকার!বের হয়ে আয় ওখান থেকে। কিছু কেনা লাগবে না।
তনুজাও কম গেল না। গাল ফুলিয়ে বললো
"আমার ড্রেসগুলো পছন্দ হয়েছে।এইগুলো কিনেই বের হবো।
তুষারের চোখ সরু হয়ে এলো।
"যা পছন্দ আমি কিনে দিবো
"এইগুলো কিনেই বের হবো।"
"আমি কী বলেছি?
তনুজা নির্বিকার গলায় উত্তর দিলো
"আপনি যা বলেছেন সেই ভাত আপনি খান।"আমি এইগুলো কিনবোই।
"তনু!"
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে তুষার আবার বললো,
"ওকে। টাকা আছে সাথে?
"আছে কিন্তু তা আমার ড্রেস কিনতেই চলে যাবে।
"দশ মিনিটের মধ্যে একাউন্ট এ টাকা চলে যাবে। সাদ যদি না-ও নেয়, তাও আমি যেন না শুনি ওর কাছ থেকে এক টাকাও নিয়েছিস।"মাথায় ঢুকেছে ?
তনুজা ঠোঁট বাঁকিয়ে বললো,
"হুম... বুঝেছি।"
তুষার আবার বললো,
"সোজা বাসায় যাবি।"
"হ্যাঁ হ্যাঁ, ঠিক আছে। রাখুন এখন।"
আর কিছু না শুনেই তনুজা কলটা কেটে দিলো।
ফোনটা নামিয়ে নিজের মনেই বিড়বিড় করে বললো,
"উফফ! মানুষটা না... কথা কম বলে, হুকুম বেশি করে!"
*
তনুজা বিল দেওয়ার সময় সাদ নাছোড়বান্দা সে কিছুতেই তনুজা কে বিল দিতে দিবে না। তনুজাও কম যায় না সে কখনো এইভাবে সাদ থেকে কিছুই নিতে পারবে না। তাই সে শেষে আরো দুইটা জামা কমিয়ে একটা নিয়েছে আর রাহা দুইটা কিন্তু বিল সেই দিয়েছে। সাদ তনুজার উপরে আর কিছু বলতে পারেনি।
তিনজনই বুটিক থেকে বেরিয়ে পাশের জুয়েলারি শোরুমে ঢুকলো।
কাঁচে মোড়া বিশাল শোরুম। চারদিকে সাদা আলোয় ঝলমল করছে হীরের আংটি, নেকলেস, ব্রেসলেট।
রাহা একের পর এক রিং দেখতে দেখতে বললো,
"সাদ ভাই, ভাবির রিংয়ের সাইজ কত?"
সাদ যেন শুনেও শুনলো না।সে অন্যদিকে তাকিয়ে কী যেন ভাবছিল
রাহা আবার ডাকলো,
"সাদ ভাই?"
চমকে উঠে সাদ বললো,
"হুম?
"রিংয়ের সাইজ কত?"
সাদ কপালে হাত দিয়ে হালকা হেসে বললো,
"এক মিনিট... আম্মুকে ফোন দেই। মনে নেই।"
রাহা দুষ্টুমি করে হেসে বললো,
"আন্টিকে কেন? ভাবিকেই তো ফোন দিতে পারেন।"নাকি লজ্জা লাগছে?"
সাদ হেসে মাথা নাড়লো।
"সমস্যা নেই আম্মুকেই জিজ্ঞেস করি।"
বলে ফোন হাতে নিয়ে বাইরে চলে গেল।
ওদিকে...
তনুজা কাঁচের ভেতর সাজানো আংটিগুলোর দিকে তাকিয়ে আছে। কিন্তু চোখ আংটিতে থাকলেও মনটা একদম অন্য কোথাও।
সকাল থেকেও সে কয়েকবার সেই নম্বরে কল দিয়েছে।
প্রতিবারই একই যান্ত্রিক নারী কণ্ঠ ভেসে এসেছে
হঠাৎ এভাবে উধাও হয়ে গেল কেন?
লোকটার নামটাও তো জানা নেই
মোবাইলে কতদিন আর "আননোন নাম্বার" লিখে রাখবে?
একটা নাম দেওয়া উচিত।
কিন্তু কী নাম দেবে?
"অচেনা মানুষ?"
না "চিরকুটওয়ালা?"
উঁহু..
কেমন যেন মানাচ্ছে না। তনুজা বিরক্ত হলো সে কি খুব বেশি ভাবছে না লোকটা কে নিয়ে? সেই তো চাইতো লোকটার থেকে কিভাবে মুক্তি পাবে। তাহলে একন কেনো এমন লাগছে?
রাহা একটা রিং তুলে বললো,
"এইটা দেখ।"
তনুজা তাকিয়ে বললো,
"হুম সুন্দর"
সেও দেখা শুরু করলো— দেখতে দেখতে একটা রিং এর উপরে তনুজার নজর পরলো। সে সেটা দোকানের স্টাফ দিয়ে বের করে হাতে নিলো
"দেখ এই রিং টার ডিজাইন টা সুন্দর না?
রাহা তনুজার হাতে থাকা রিংটা দেখলো
সত্যিই রিংটা খুব সুন্দর। পাতলা প্লাটিনামের ব্যান্ডের মাঝে ছোট্ট একটা ডায়মন্ড। খুব বেশি জমকালো নয়।
কিন্তু অদ্ভুত একটা সৌন্দর্য আছে।
তনুজা মুগ্ধ হয়ে বললো,
"আমার খুব ভালো লাগছে।"
রাহা সঙ্গে সঙ্গে হেসে বললো,
"এখানে তোর জন্য রিং কিনতে আসিনি কিন্তু।"সাদ ভাইয়ের বউয়ের জন্য।
"থাক তোর বিয়ের সময় আমি তোকে এমন একটা রিং গিফট করবোনে ময়না।
তনুজা ঠোঁট ফুলিয়ে বললো,
"আমি কি কিনতে বলেছি?"আমি তো শুধু বললাম, আমার ভালো লেগেছে।"
সাদ ফিরে এলো। তবে যেই ভাবে গিয়েছিল সেই ভাবে না হাতে দুইটা শপিং ব্যাগ ও ছিলো।
রাহা তনুজা দুজনকে একসাথে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে হেসে বললো,
"কোনটা নিয়ে এত আলোচনা হচ্ছে?"
রাহা সঙ্গে সঙ্গে রিংটা তুলে ধরলো।
"এইটা। তনুর খুব পছন্দ হয়েছে।"
তনুজা চাট্টি মারলো রাহা কে
না সাদ ভাই আপনার যেটা পছন্দ হয় সেটাই দেখেন
সাদ রিংটার দিকে একবার তাকিয়ে আবার তনুজার দিকে তাকালো।
তারপর হালকা হেসে বললো,
"তোমার পছন্দ ভালো।"আমারও এই ডিজাইনটা ভালো লাগলো।"তুমি চাইলে এটা ট্রাই করে দেখতে পারো।"
তনুজা সঙ্গে সঙ্গে মাথা নেড়ে বললো
"না না! অন্যের এনগেজমেন্টের রিং আমি পরবো কেন?"
সাদ কোনো কথা না শুনেি তনুজার হাত নিয়ে রিংটা পরালো।তার মুখে একটা সূক্ষ্ম হাসি টেনে রাখা
তনুজা কিছু বলল না তবে এই ভাবে কাউর হাতে রিং পরা ব্যাপারটা মোটেও ভালো লাগলো না।
রিংটা তনুজার হাতে একদম ফিট হয়েছে তার হাতেও বেশ মানিয়েছে।
সাদ মুখে হাসি বোজিয়ে রেখেই বলল
"দেখো খুব সুন্দর মানিয়েছে তোমার হাতে তনু!
তারপর দোকানের স্টাফ তাকে জিজ্ঞেস করল এটার সাইজ কত?
দোকানি বলল
"দ্য সাইজ ইজ সিক্স, স্যার।
রাহাও বলল
"হ্যাঁ সুন্দর লাগছে তো তোর হাতে তুই নিবি এটা?
তনুজা রিংটা খুলতে খুলতে বলল
"না ভালো লাগছে না।
রাহা কপাল কুঁচকালো
" মাএই না বললি ভালো লেগেছে!
"হ্যাঁ কিন্তু পরার পর আর লাগছে না।
"সাদ বলল এটাই ফাইনাল করি সাইজ টাও ম্যাচ করেছে"
রাহা বলল ভাবির সাইজ কত ছিল?
"ওনার ছয় আর লেটার M ছিল। তনুজারও তো তাই দেখছি সেম সাইজ।
শেষে এই রিংটাই তারা নিয়েছে।
চলবে।
পর্ব সংখ্যা —২৮
লেখিকা—তাসনিয়া জাহান
অচেনা প্রনয়ের চিরকুট