#প্রেমের_নির্বাসন - (১৩)
লেখনীতে- #মৃধা_মৌনি
________
কি করে এল রোদ্দুর, জানা গেল না।
ফিরে এল পরদিন, রাতভর বাইরে কাটিয়ে একদম ভোর ভোর থাকতেই বাড়ি এল মানুষটা। বিকেলেরও ঘুম হয়নি ভালো করে। কি যেন একটা ভার হয়ে চেপে বসেছিল বুকে; ছাড়া ছাড়া ঘুম রাত্রি জেগে অপেক্ষা করছিল রোদ্দুরের জন্য। তারপর ঘুম জমল যখন, তখন তার বাড়ি ফিরবার সময় হয়েছে। বিকেল আর খোঁজ নিতে পারল না। পরদিন যখন দুপুরের অনেক পরে ঘুম থেকে জেগে উঠল সে, সারা শরীরে রাজ্যের আলস্য নিয়ে, ততক্ষণে রোদ্দুর হাওয়া। গোসল সেড়ে খেয়েদেয়ে বেরিয়ে গেছে কোথাও একটা। বিকেল খোঁজ নিলো, কেউ বলতে পারল না কোথায়।
রেহনুমা তো জিজ্ঞেসই করে বসলেন, 'এত করে খুঁজছিস কেন? কি দরকার?'
বিকেল আমতা আমতা করে সরে পড়ে। জবাব দেবার মতো কিছু জমা নেই ভাষা ভাণ্ডারে। তবে মজা লুটল তৃপ্তি। খুব করে চেপে ধরল ওকে। বিছানায় পা ঝুলিয়ে বসে ঠোঁটে এক চিলতে গাঢ় হাসি ফুটিয়ে তুলে শুধাল, 'হ্যাঁরে, ঘুম থেকে উঠেই তোর নায়ককে খুঁজে বেড়াচ্ছিস। কেন রে, কি দরকার হুঁ?'
লজ্জায় মুচড়ে উঠল বিকেল। পারে না, চপাট চপাট করে দু ঘা বসিয়েই দেয়। নাক-মুখ কুঁচকে আওড়ে, 'আরে ধুর, এমনিতেই।'
'এমনিতেই? হুম? কই, কোনোদিন তো এত উতলা হতে দেখিনি...হঠাৎ কি জাদু করল?' তৃপ্তি ভ্রুকুটি করে। হাসে।
তাতে বিকেল চেতে ওঠে। গলার পারদ তুলে শাসায়, 'থাপ্পড় খাবি। ফাজলামো করবি না, চুপ!'
তৃপ্তি কি থামবার পাত্রী? আরও ক্ষেপাতে হেসেই চলে দাঁত বের করে। বিকেল ভীষণ লজ্জায় গুটিয়ে যায়। একপ্রকার পালাতেই তাড়াহুড়ো কণ্ঠে জানায়, 'আর সে মোটেই আমার হিরো না। উই আর জাস্ট কাজিন! ওকে? কবে কি একবার বলেছিলাম, তাই ধরে রোজ রোজ আমায় ক্ষ্যাপানো, না? একবার আমার সুযোগ আসুক, তোকে কাঁদিয়ে ছাড়বো, দেখিস!'
তারপর পালিয়ে যায়।
বাথরুমের দেয়ালে পিঠ দিয়ে দাঁড়িয়ে ভেবে চলে, হঠাৎ করে সেইবা এত উতলা হচ্ছে কেন? শুধুই কি গত রাতে যা যা বলেছিল আর ওভাবে বেরিয়ে যাওয়ার পর কি হয়েছিল- তা জানবার জন্য? নাকি এর বাইরে আর কোনো কারণ আছে- যা তার অবচেতন মন জানলেও সে জানে না?
ঝর্ণা বেয়ে নেমে আসা জলের ধারারাও আজ ব্যর্থ হলো। বিকেলের সমস্ত অস্থিরতা তারা শুষে নিতে পারল না। কেমন উশখুশ করতে করতেই গোসলটা সেড়ে বেরিয়ে এল ও। তারপরের সময়টা কাটলো ভীষণ অস্থিরতায়। সময় যায় না। কতবার ফোন নিয়ে একটা কল বা ম্যাসেজ করবার কথা ভেবেও আবার গুটিয়ে নিয়েছে নিজেকে। যাকগে জাহান্নামে, তার কি তাতে? করুক যা খুশি- ওই বুড়ো ভামকে তো সেই এনে দিয়েছিল! নষ্ট, চরিত্রহীন একটা লোক... বিকেল চড় দিয়েছে, বেশ করেছে। লাগলে আরও দুটো দেবে। তাতে যা বিচার করাক করুক রাক্ষসে....এসব বেফাত্রা লোকের বিন্দুমাত্র দাম বা সম্মান নেই তার কাছে, হুহ!
নিজেই যেন নিজেকে বুঝিয়ে শান্ত করবার প্রাণপণ চেষ্টা করে মেয়েটা। বিকেল গড়ায়, সন্ধ্যে নামে। অন্ধকারের রাতে তারাও ফুটে ওঠে। চাঁদের দেখা পাওয়া যায়। পাওয়া যায় না কেবল রোদ্দুরের দেখা...কোথায় যে গেল ছেলেটা! কেন ফিরছে না এখনো বাড়ি?
★★★
আদিবার দিনরাত সব একটা বদ্ধ ঘরে কাটে আজকাল। খাওয়াদাওয়া সব ছেড়ে দিয়ে, ঘুমকে হারাম ঘোষণা করে মেয়েটা যেন নিজের জীবন নিজেই বিপন্ন করতে উঠেপড়ে লেগেছে। আশফাকুল রহমান এসেছিল দু'দিন আগে, যখন প্রায় শয্যাশায়ী হয়ে পড়েছিল ও। ওই করুণ মুখটা দেখেও পাষণ্ডের হৃদয় সামান্য গলেনি। বরং এসে সাফ সাফ ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে, যত যাই হয়ে যাক, মরে গেলেও তিনি আর ওই বাড়িতে মেয়েকে ফিরতে দিবেন না। তার পছন্দকে মেনে নিলে ভালো, নইলে তিনি এমন কিছু করবেন, আদিবা কল্পনাতেও ভাবতে পারবে না তা....
কোনোপ্রকার উচ্চবাচ্য করেনি আদিবা।
করে লাভ নেই- তা তো জানা কথা। বরং নিজের নসীবকে স্বীকার করে নিয়েছে সে। মনেপ্রাণে নিজের মৃত্যু কামনা করে বেড়ায়। এটা যে পাপ- তাও জানে ও। তবু...আজকাল বেঁচে থাকবার ১% ইচ্ছাও ওর মনে জাগে না।
একটা ডায়েরি আছে হাতের কাছে।
সেটায় লিখে চলে মনে দাফনকৃত সব কথা।
ওর কথা, সৌম্যর কথা, ওর দেখা সব স্বপ্নের কথা-
যেগুলি পূরণ হওয়ার আগেই ফুরিয়ে গেল!
তবু ওটার পাতা খুলে বারবার পড়ে। নতুন কিছু লেখে- যা হঠাৎ হঠাৎ বলতে মনে পড়ে সৌম্যকে! মাঝে মাঝে লিখতে গিয়ে দু'চোখের পানি গড়িয়ে পাতা ভিজে যায়। আদিবা বুঝতেই পারে না, কোন দোষে তাকে এ রকম একটা পরিবারে দেওয়া হলো!
ছোট বেলা থেকেই দেখে আসছে এ পরিবারের দশা। বাহির থেকে দেখতে আর দশটা স্বাভাবিক পরিবারের মতোই লাগে কিন্তু ভেতরের খবর ঘরের মানুষেরাই জানে। এ বাড়িতে তাই হয়, যা বাড়ির পুরুষেরা চায়। আর একেকটা পুরুষের হৃদয় যেন পাথর দিয়ে গড়া। কিংবা কোনো ভারী বড় পুরু দেয়ালের প্রাচীর দিয়ে ঘেরা ওদের হৃদপিণ্ডের চারপাশ - কোনোভাবেই দেয়াল টপকে কারো চোখের এক ফোঁটা পানি পৌঁছাতে পারে না। এই বাড়ির কর্তারা যা সিদ্ধান্ত নেবে, তাই...সবার জীবনই তার পাঁচ আঙুলের আড়ালে বন্দী। এমনকি কতক্ষণ কে নিঃশ্বাস নেবে, তাও তারাই ঠিক করে দেবে...শিক্ষা ছাড়া আজকাল ভালো ঘরে ছেলে-মেয়ে বিয়ে দেওয়া যায় না বলেই এ ঘরের প্রতিটি মেয়েকে প্রাথমিক, মাধ্যমিক পর্যন্ত পড়ানো হয়। তারপর বিয়েটাও দেওয়া হয়, তাদেরই ব্যবসায়িক প্রীতি বাড়াতে....আদিবার বড় বোন তানিবা- তারও একই অবস্থা! কুয়েতে এক আমিরের ঘরে বিয়ে দিয়েছে। কেমন আছে, কীভাবে আছে- তাতে কারো মাথাব্যথা নেই। সেই আমিরের আরও দুটো বউ আগের ঘরের, এসব তানিবাকে না জানিয়েই বিয়ে দিয়ে দেশান্তরি করা হয়েছে। এরপর আর তার মানসিক খোঁজখবর কেউ নেয়নি, নিয়েছে শুধু জামাই কি দিল, কত দিল, ক'টা বাড়ি দিবে, ক'টা গাড়ি দিবে- এসবের হিসেব!
আচ্ছা, মনের যদি কোনো গুরুত্বই না থাকত, তবে এটাকে কেন দিলো আল্লাহ? পকেট আর পয়সাই এই দুনিয়াতে সব? নিজের স্বার্থটাই বড়? অন্যের চাওয়া, চোখের পানি কিংবা চাহিদাটা এত কেন ক্ষীণ? অনেক কিছু জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করে আদিবার- পারে না সে....তার জিভকে লাগাম টেনে ধরে রাখতে হয়। এই শিক্ষাই দিয়েছে তার পরিবার।
আদতে শিক্ষা না ভয়!
আদিবা দ্রুত হাতের পিঠে চোখ মুছে নিল। দরজার ওপাশে কারো পরিচিত পায়ের শব্দ এসে থমকে দাঁড়িয়েছে। আদিবা জানে মানুষটা কে। পরক্ষণেই দরজা খুলে আসিফ ভেতরে ঢুকতেই আদিবা ফেটে পড়ল। লাল হয়ে থাকা চোখ জোড়া আরও বড় বড় করে সে প্রায় চিৎকার করে উঠল, 'বলেছি না আমি খাব না? আবার কেন খাবার নিয়ে এসেছিস তুই?'
আসিফ হকচকিয়ে যায়। সে তড়িঘড়ি করে ভেতরে ঢুকে দরজাটা টেনে আটকে দিল। চাপা কণ্ঠে সাবধান করে বলল, 'আস্তে বলো! গলার স্বরটা একটু নামাও, বাড়িতে সবাই আছে কিন্তু।'
'থাকুক! কাউকে আর আমার ডর-ভয় লাগে না,' আদিবার কণ্ঠে অবাধ্য এক জেদ।
আসিফ একটা লম্বা শ্বাস ফেলে বলল, 'যত চিল্লাপাল্লা সব তো দেখি আমার সামনেই। কই, তাদের সামনে তো তোমার এই ধারালো জিভটা বের হয় না।'
আদিবা অগ্নিচোখে আসিফের দিকে তাকিয়ে রইল। আসিফ মোটেও দমে গেল না, বরং ভ্রুকুটি করে শান্ত গলায় যোগ করল, 'আমার দিকে ওভাবে তাকিয়ে থেকে কোনো লাভ নেই। যা সত্যি, আমি ঠিক সেটাই বলেছি।'
এরপর হাতের খাবারের প্লেটটা টেবিলের ওপর রেখে আদিবার ঠিক মুখোমুখি এসে বসে। বসতেই তার বুকের ভেতরটা হু হু করে উঠল। কী অবস্থা করে রেখেছে মেয়েটা নিজের! এই তো কদিন আগেও যে মেয়েটা ছিল অসম্ভব চঞ্চল, দুরন্ত আর হাসিখুশি- আজ তার চোখ-মুখ সব বসে গেছে। চোখের নিচে গাঢ় কালি, অযত্নে আর অনাহারে গলার হাড়গুলো অকালপক্ক মানুষের মতো ভেসে উঠেছে। চেহারাটা কেমন কালো আর মলিন দেখাচ্ছে।
আসিফকে ওভাবে একদৃষ্টে করুণাভরে তাকিয়ে থাকতে দেখে আদিবা আরও বিরক্ত হলো। সে ঝট করে মুখ সরিয়ে অন্যদিকে তাকায়। কপালের ভাঁজগুলো গভীর করে সে কড়া গলায় জানিয়ে দিল, 'আমার দিকে ওরকম মায়া মায়া চোখে তাকিয়ে কোনো লাভ নেই আসিফ। তুই যতই বোঝাস না কেন, আমি এক দানাও মুখে তুলব না।'
আসিফ নিজের দীর্ঘশ্বাসটা সন্তর্পণে আড়াল করে।মুখটা একটু বাঁকিয়ে নির্বিকার ভঙ্গিতে বলে উঠল, 'ঠিক আছে, খেয়ো না। আমিও তাহলে বাইরে যে কথাগুলো কানে এলো, সেসব আর তোমায় বলছি না।'
'কী শুনেছিস তুই?' ঝট করে ওর দিকে ফিরে বসল ও। এক মুহূর্তের ভেতর ওর সমস্ত জেদ উবে গিয়ে সেখানে জায়গা করে নিল তীব্র কৌতূহল। আসিফের দুই হাত শক্ত করে চেপে ধরে আকুল হয়ে শুধাল, 'বল না আসিফ, কী শুনেছিস তুই? আবার আমার পেছনে নতুন কী ষড়যন্ত্র চলছে? কী প্ল্যান করছে ওরা?'
খবরটা শোনার জন্য আদিবা রীতিমতো মরিয়া হয়ে উঠেছে। কিন্তু আসিফও বড় গোঁয়ার্তুমি জানে। সে খাবারের প্লেটটা দেখিয়ে ভাবলেশহীন গলায় বলল, 'শর্ত একটাই- আগে খেয়ে নাও, তবেই বলব। তার আগে একটা শব্দও মুখ দিয়ে বের হবে না।'
শুনে আদিবার মেজাজ এক লাফে আকাশ ছুঁল। ইচ্ছে করল চড় কষিয়ে ছেলেটার সব কটা দাঁত নড়িয়ে দেয়। ও দাঁতে দাঁত চেপে কটমট করে তাকিয়ে বলল, 'ব্ল্যাকমেইল করছিস আমায়? এইটুকু পিচ্চি বাঁদর হয়ে এত সাহস তোর!'
আসিফ মোটেও দমল না। নিজের উচ্চতাটা একটু জাহির করে বলল, 'আমি মোটেই এইটুকু নই! তোমার চেয়ে মাত্র বছর দুয়েকের ছোট হতে পারি, কিন্তু লম্বায় তো তোমায় অনেক আগেই ছাড়িয়ে গেছি।'
'তাতে এমন কোনো রাজা-বাদশাহ হয়ে যাসনি তুই!' আদিবা মুখ ঝামটা দিল।
'আমি তো নিজেকে রাজা বলিনি। শুধু বলেছি, খেয়ে নিলে সব বলব। আর না খেলে এই চললাম আমি, আমার অনেক কাজ আছে।' আসিফ সত্যি সত্যি উঠে দাঁড়িয়ে চলে যাওয়ার ভঙ্গি করল।
তাই দেখে আদিবা হন্তদন্ত হয়ে চেঁচিয়ে উঠল, 'এই দাঁড়া! দাঁড়া বলছি।' আসিফ থামতেই আদিবা রাগে ফোঁস ফোঁস করতে করতে বলল, 'ফাজিলের বাপ... খাব আমি। কিন্তু খাওয়ার পর এক বিন্দু না লুকিয়ে সব কিছু বলবি। একদম সব! প্রমিস?'
আসিফের গেঁজ দাঁতের ফাঁক দিয়ে এক চিলতে বিজয়ের হাসি বেরিয়ে এল। সে মাথা নেড়ে সায় দিয়ে জানাল, 'হান্ড্রেড পারসেন্ট প্রমিস!'
আদিবা প্রায় নাকে-মুখে খাবারগুলো গিলছে। দৃশ্যটা দেখে আসিফের বুকের ভেতরটা হাহাকার করে উঠল। মায়া আর করুণা- দুটো অনুভূতি মিলেমিশে একাকার ওর মনে। আসিফ প্রায়ই ভাবে, ও বড় কপাল করে এই পরিবারে ছেলে হয়ে জন্মেছে। যদি আদিবার মতো মেয়ে হতো, তবে না জানি কত ত্যাগ আর তিতিক্ষার আগুনে পুড়ে ছারখার হতে হতো ওকে! কত চাওয়াকে জ্যান্ত দাফন করতে হতো, আর না-চাওয়ার কত বোঝা আজীবন ঘাড়ে বয়ে বেড়াতে হতো।
বাপ-চাচারা চায় আসিফও যেন তাদের মতোই পাষাণ আর রুক্ষ হয়, কিন্তু বিধাতা ওর মনে একরাশ নরম মোম ঢেলে দিয়েছেন। রাস্তায় একটা কুকুরকে খাবারের জন্য হাপিত্যেশ করতে দেখলেও ওর মন সিক্ত হয়ে আসে, গলার কাছে কান্না দলা পাকিয়ে ওঠে। এই সংবেদনশীলতার জন্য ওকে কম গঞ্জনা সইতে হয় না। বাবা-মায়ের ধমক তো আছেই, এমনকি আড়ালে কেউ কেউ ওকে 'মেয়েলি' বলেও বিদ্রূপ করে। কিন্তু আসিফ নিরব থাকে, প্রতিবাদ করে না।
'খাওয়া শেষ, এবার বল কী হয়েছে?' আদিবার কণ্ঠস্বরে আসিফের ভাবনায় ছেদ পড়ল।
আদিবা দু-পা আসন গেঁথে বসেছে। ঢকঢক করে এক গ্লাস পানি খেয়ে খাওয়া-দাওয়ার পালা চুকিয়ে সে আসিফের উত্তরের অপেক্ষায় স্থির হলো। আসিফ স্মিত হেসে টিপ্পনী কাটল, 'এখন তো ঠিকই খেলে! তা পেটটা কার ভরল শুনি?'
আদিবা চোখ রাঙিয়ে বলল, 'বেশি কথা না বলে কাজের কথা বল। অন্যদিকে মোড় ঘোরানোর চেষ্টা করবি না একদম, খবরদার!'
'বলছি রে বাবা!' আসিফ একটু দম নিয়ে নিজেকে স্থির করল। তারপর নিচু স্বরে শুরু করল, 'এই বৃহস্পতিবার ওরা তোমায় দেখতে আসবে। সব ঠিক থাকলে সেদিনই বিয়ে। কোনো ধুমধাম হবে না, শুধু দুই পক্ষের গুটিকয়েক লোক থাকবে। শুক্রবার তোমার বিদায় আর শনিবার ভোর চারটা পঁচিশে তোমার ফ্লাইট। তারা নাকি আরও পনেরো দিন আগেই বিয়েটা করতে চেয়েছিল, কিন্তু বড় চাচাই তালবাহানা করে সময়টা এমনভাবে পিছিয়েছেন যাতে বিয়ের রেশ কাটতে না কাটতেই তুমি দেশ ছাড়তে পারো। তোমার পাসপোর্ট আর ভিসাও রেডি করে রাখা হয়েছে। গতকাল রাতে মায়ের কাছে সব শুনেছি আমি।'
আদিবা পাথর হয়ে গেল। আসিফের কথার পিঠে কী বলা উচিত, তা ভেবে পেল না। চোখের সামনে কেবল সৌম্যর সেই মায়াবী, সরল মুখটা ভেসে উঠছে। ওর ভেতরটা ভেঙেচুরে যাচ্ছে কান্নায়। এখনো তো সৌম্যর সাথে ওর ডিভোর্স হয়নি! একজনের স্ত্রী থাকা অবস্থায় আরেকজনের সাথে বিয়ে- এটা কি অপরাধ নয়? ঘোরতর অন্যায় নয়?
বিপর্যস্ত আদিবা আসিফের দিকে তাকিয়ে কাতর কণ্ঠে অনুনয় করল, 'আসিফ, আমার একটা কাজ করে দিবি?'
আসিফ ওর চোখের ভাষা পড়তে পারল। ও শান্ত গলায় বলল, 'আমি জানতাম তুমি এমন কিছু একটা বলবে। আর সেই সুযোগ করে দিতেই আজ খাবারের বাহানা করে আসা। তোমার যা লিখার তাড়াতাড়ি লিখে ফেলো। আমি বিকেলের দিকে আরেকবার আসব। তবে ভেতরে ঢুকব না। দরজার বাইরে থেকে তিনবার টোকা দেব। তুমি দরজার নিচ দিয়ে কাগজটা বের করে দেবে। মনে রেখো, তিনবার টোকা। কমও না, বেশিও না। এর ভেতর কাগজ না পেলে আমি চলে যাব।'
আচমকা আদিবা ওকে জড়িয়ে ধরে ছোট বাচ্চাদের মতো ডুকরে কেঁদে উঠল। সেই কান্নায় আসিফের হৃদয় বিগলিত হলো, চোখের কোণ ভিজে ওঠে। ও আদিবাকে শক্ত করে আগলে ধরে। মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে ফিসফিস করে বলল, 'সব ঠিক হয়ে যাবে, শান্ত হও। আপাতত নিজের ভাগ্যটাকে মেনে নেওয়া ছাড়া পথ নেই।'
★★★
সন্ধ্যার আগ থেকেই আকাশের ক্যানভাসে শোকাতুর মেঘের আনাগোনা। বিকেলের মায়াভরা আকাশটি একটু একটু করে কুয়াশার চাদর সরিয়ে আজ যেন এক ঘোলাটে মেঘের অবগুণ্ঠনে ঢাকা পড়ল। আবহাওয়া দপ্তরের পূর্বাভাস ছিলই- অকাল ঝমঝমে বৃষ্টি আর হাড়কাঁপানো শৈত্যপ্রবাহে আজ রাত থেকেই কাঁপবে দেশ। মির্জা বাড়ির আনাচে-কানাচেও সেই আগাম শীতের তাণ্ডব থেকে বাঁচার প্রস্তুতি চলছে।
বিকেলও ব্যস্ত। নিজের ঘরের নিস্তব্ধতা কাটাতে সে কাপড় গোছানোর কাজ বেছে নিয়েছে। এই সময়টাতে আগে উঠানে বসে সবাই মিলে মাটির ভাঁড়ে গরম চা, মুড়ি ভর্তা আর ধোঁয়া ওঠা ভাজাপোড়া দিয়ে দারুণ আড্ডা জমত। অথচ আজ সবটাই একরাশ বিষণ্ণতায় ঢাকা যেন। তৃপ্তি বাড়ি নেই, স্বস্তি আর দীপ্র এই অবেলায় পড়ার টেবিলে মুখ গুঁজেছে। মিশি নিজের চিরচেনা গাম্ভীর্য নিয়ে এক কোণে পড়ে আছে। রোদ্দুরও ফেরেনি। ওর ফেরার প্রতীক্ষায় ছটফট করতে করতে শেষমেশ বিকেল ওয়ারড্রব গোছাতে বসল। ন্যাপথলিনের তীব্র গন্ধে ভরা ভারী সোয়েটারগুলো বের করে আনল সে। অদ্ভুত সব জিনিসের গন্ধ বিকেলকে ভীষণ টানে। এই যেমন, নতুন দেয়ালের রঙের গন্ধ, কেরাসিন কিংবা তারপিন, কিংবা নতুন বইয়ের ভাঁজে লুকিয়ে থাকা ঘ্রাণ। আজ এই চেনা ঘ্রাণগুলোও কেন যেন বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস বের করে আনছে।
হঠাৎ করেই ফোনটা বাজল ওর।
স্ক্রিনে ওসমান মির্জার নামটি ফুটে ওঠেছে।
আগে 'বাপি' লিখে সেভ ছিল, সেদিনের পর নামটা কেটেকুটে 'ওসমান এম' লিখে সেভ করে রেখেছে ও। ধরবে না ভাবল, ফের ধরল রিং কেটে আবারও কল বাজার কারণে। কণ্ঠ গম্ভীর করে শুধাল, 'বলো?'
হাই-হ্যালোর বালাই নেই কোনো।
মেয়ের অভিমান টের পান ওসমান, কিন্তু তার তরফ থেকেও তিনি নির্লিপ্ত। এই সংসারে আজকাল আর মনই টানে না তার। বরং কীভাবে দিশা এবং তার সন্তানদের সামাজিক স্বীকৃতি দেওয়া যায়- আজকাল সেই চিন্তাই তাকে কুড়ে কুড়ে খায়।
তিনিও ওপাশ থেকে শুধালেন, 'তুমি নাকি কাকে চড় থাপ্পড় মেরেছ শুনলাম?'
বিস্ময়ে ভ্রু জোড়া কুঁচকে গেল ওর, 'কার থেকে?' পালটা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলো বাবার উদ্দেশ্যে।
'তার মানে কথাটা ঠিক?'
বিকেল উত্তর দিলো না। ভদ্রলোকের গলায় চরম বিরক্তি।
'কী দরকার ছিল এসব ঝামেলার? টিচার রাখা হয়েছে, পড়লে পড়বে, না পড়লে নেই। তোমাকে কি আমি কোনোদিক দিয়ে কম রেখেছি? যা চেয়েছ, খোলা হাতে দিচ্ছি। তবুও কেন সব সময় সমস্যা বাঁধাও?'
'আমি... আমি সমস্যা বাঁধাই?' বিকেলের কণ্ঠস্বর কাঁপছে।
'তা নয়তো কী? চড় মেরেছ সেটা বড় কথা নয়, বড় কথা হলো তুমি এতে রোদ্দুরকে ইনভলভ করেছ। তুমি জানো ও কী করেছে? ওই ভদ্রলোককে পিটিয়ে আধমরা করে দিয়েছে। তিনি রোদ্দুরের ফ্রেন্ডের বাবা! ফ্রেন্ডের সাথে সম্পর্ক তো শেষই, উল্টো তারা রোদ্দুরের নামে মারপিটের মামলা করেছে। ভদ্রলোক এখন হাসপাতালে, উচ্চ রক্তচাপ আর ডায়াবেটিস নিয়ে তিনি আইসিইউতে। আল্লাহ না করুক যদি কিছু নেতিবাচক হয়, রোদের কী হবে ভেবেছ? সরাসরি মার্ডার কেস!'
খবরটা শুনে বিকেলের পায়ের তলার মাটি সরে গেল। রোদ্দুর ওর অপমানের শোধ নিতে এতটা হিংস্র হয়ে উঠবে, তা সে কল্পনাও করেনি। ভাবছিল রোদ্দুর বড়জোর একটু শাসন করবে, কিন্তু রক্তারক্তি? পুলিশ? জেল? বিকেলের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে।
ওপাশ থেকে ওসমান মির্জা হাহাকার করে উঠলেন, 'বড় ভাই ফোন করে আমায় সব ঘটনা জানাল। ছেলের চিন্তায় তিনি আধমরা হয়ে গেছেন। আমার সঙ্গে রাগারাগি করছেন। তুমি কি আমায় একটু শান্তি দেবে না হুঁ? দেবে না শান্তি? তোমার পিছনে এত এত টাকাপয়সা, তোমার ভরণপোষণ, এসব এতদিন করে আসাটাই আজ তুমি বৃথা প্রমাণিত করলে। তুমি একটা লস প্রজেক্ট, ফেইল প্রজেক্ট আমার লাইফের!!'
বিকেলের চোখ বেয়ে জলের ধারা নেমে চিবুক ভিজে যাচ্ছে। সে এক অক্ষরও বলতে পারছে না। ওসমান মির্জা চিৎকার করে চললেন, 'তোমার মা আমায় জীবনে শান্তি দেয়নি। মরে গিয়েও আমাকে শান্তি দিলো না। তোমার মতো একটা ফালতু জিনিস আমার লাইফে রেখে গেছে। তোমার পিছুটানে আমি নতুন ভাবে কিচ্ছু শুরু করতে পারিনি। এখনো পারছি না। জাস্ট বিকজ অফ ইউ, সবাই আমাকেই ব্লেম করবে, আমি ভালো না, আমি কেন এতবড় মেয়ে রেখে অন্যত্র কিছু.. বাট নোবডি কেয়ার এবাউট মাইসেল্ফ! মাই মেন্টাল পিস, মাই লাইফ!
প্লিজ বিকেল, প্লিজ, লেট মি লিভ আলোন...
বাবা হয়ে রিকোয়েস্ট করে বলছি, আমি একটু শান্তি চাই...শান্তি!
মাসের অর্ধেক দিনই আমি বাড়ির বাইরে পালিয়ে পালিয়ে বেড়াই, কেবলমাত্র একটু শান্তির জন্যে! সেটাও আমার কপালে সইছে না। তোমার কারণে আজ বড় ভাইয়ের আঙুল আমার দিকে উঠেছে। আমি তোমায় সঠিক শিক্ষায় শিক্ষিত করতে পারিনি, না কি পেরেছি তোমাকে মানুষ হিসেবে গড়তে..এত এত ব্যর্থতা আমার! তোমার কারণে..তোমার জন্যে আজকে আমি কৈফিয়ত দেবার ভাষাটাও খুঁজে পাচ্ছি না....আই উইশ, এমন একটা দিন আসুক, যেদিন আমি জানব, তুমি নেই...আমার লাইফে তোমার কোনো এক্সিস্টই নেই....'
খট করে ফোনটা কেটে গেল। ওপাশের মানুষটা যেন কথাগুলো বলে হাঁপাতে হাঁপাতে বিদায় নিলেন। আর এপাশে জ্যান্ত এক মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইল বিকেল। ফোনের রিং কাটার শব্দটা ওর কানে তপ্ত সিসার মতো বিঁধল। অনেকটা সময় কেটে গেল, কিন্তু ও ফোনটা কান থেকে নামাতে পারল না। হাত-পা ঝিনঝিন করছে। বুকের ঠিক বাম পাশে কেউ যেন ধারালো নখ বসিয়ে টেনে ধরছে।
'লস প্রজেক্ট'... 'ফালতু জিনিস'... বাবার বলা শব্দগুলো ওর কানের পর্দায় বারুদ হয়ে ফাটছে। ও নেই, ওর কোনো অস্তিত্ব নেই- বাবা কি সত্যিই ওর মৃত্যু কামনা করলেন? বিকেল চারদিকের বাতাসের দিকে তাকাল। বাতাসে কি বিষ মেশানো? নিঃশ্বাস নিতে এত কষ্ট হচ্ছে কেন?
(চলবে)
_______
দুঃখীত, দু'দিন অপেক্ষা করিয়েছি।
চেষ্টা করব এই সপ্তাহের প্রতিটি দিন দিয়ে যেতে- তা হোক ছোট কিংবা বড় পর্ব! শর্ত একটাই- প্রতি পর্বের লাইক ৮০০ চাই...এইটুকু আবদার রাখাই যায়, যায় না?