#প্রেমের_নির্বাসন - (১৫)
লেখনীতে - #মৃধা_মৌনি
_________
রাতের দ্বিপ্রহর ঘনিয়ে এসেছে। হিমেল স্তব্ধতার চাদরে ঢাকা ঘরটিতে বিছানার ওপর অঘোরে ঘুমিয়ে আছে বিকেল। বুকের ভেতর পরম মমতায় আগলে রাখা মায়ের সেই প্রিয় ছবিটি- ঘুমের ঘোরেও মা’কে হাতছাড়া করতে চায়নি যেন। আজ ঘরের দরজাটা ভেতর থেকে খিল টানা। অন্ধকারের বুক চিরে সেই বন্ধ দরজার ওপর আচমকা কারো হাতের শক্ত থাবা পড়ল। ওপাশ থেকে খোলার জন্য একবার ধাক্কা দিতেই আগন্তুক বুঝতে পারল, আজ অন্য দিনগুলোর মতো অবারিত নয় এই দ্বার।
মুহূর্তেই আগন্তুকের মুখখানা বিষণ্ণতায় ছেয়ে যায়। পকেট থেকে ফোন বের করে সে বিকেলের নাম্বারে কল দিল। রিং বাজল ঠিকই, কিন্তু ফোনের নিস্তব্ধতা ভাঙল না; হয়তো সাইলেন্ট মোডে পড়ে আছে যন্ত্রটা। নিজের ওপর বিরক্তির এক ‘চ’ সূচক শব্দ বেরিয়ে এলো আগন্তুকের ঠোঁট চিরে। ফোনটা পুনরায় পকেটে চালান করে দিয়ে নিভু নিভু চোখে বন্ধ দরজার দিকে চাইল সে। তপ্ত এক দীর্ঘশ্বাস আর অস্ফুট স্বরে ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো নামটা, 'বিকেল..'
এতটা নিচু স্বরে ডাকা, বিকেল কি তা শোনার পাত্রী? রোদ্দুর বুঝতে পারছে না সে এখন কী করবে। দীর্ঘ দুটো দিন কেটে গেছে, মেয়েটাকে একনজর চোখের দেখাও দেখেনি সে। বুকটা ফেটে যাচ্ছে বিকেলের মুখখানি দেখার জন্য; এক মুহূর্তের বেশি এই দূরত্ব আর সইছে না বলেই রাতের অন্ধকার চিরে সে ছুটে এসেছে। কিন্তু পরিস্থিতি বলছে, আজ দেখা হওয়াটা বোধহয় ভাগ্যে নেই। বন্ধ দরজার ওপাশে পৌঁছানোর সব পথই যখন রুদ্ধ, তখন ব্যর্থ পায়ে পেছনে ফিরল সে। কিন্তু চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই আচমকা থমকে দাঁড়াল।
ভেতরে খটখট শব্দ হচ্ছে। কেউ একজন আলো জ্বালিয়েছে ঘরের ভেতর। বিকেল কি তবে উঠল? রোদ্দুর যেন জীবন ফিরে পেল। সে প্রায় হুমড়ি খেয়ে পড়ল দরজার গায়ে। এবার অতি সাবধানে, খুব মৃদুভাবে দরজায় টোকা দিতে লাগল সে। মনেপ্রাণে চিৎকার করে ডাকছে বিকেলের নাম, যদিও ঠোঁট জোড়া কাঁপছে নিশব্দে।
বাইরে হাড়কাঁপানো ঠান্ডা। চারপাশ এতটাই নিঝুম যে একটা পিন পড়ার শব্দও কোথাও নেই। এই গভীর নৈঃশব্দ্য ভেদ করে দরজায় পড়া ওই সামান্য টোকার শব্দ ঠিক ঠিক পৌঁছে গেল বিকেলের কানে। সে কেবলই উঠেছিল ওয়াশরুমের তাগিদে, কিন্তু দরজার দিকে চোখ যেতেই তার কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল। কেউ একজন দরজায় মৃদু চাপড় দিচ্ছে, কিন্তু কে? এই অসময়ে ওপাশে কে থাকতে পারে?
হঠাৎ এক অদ্ভুত ভয়ের শীতল স্রোত বিকেলের শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে গেল। প্রথমেই তার মাথায় এল অতিপ্রাকৃত কোনো চিন্তাভাবনা। নির্ঘাত আজ ভূত-প্রেতের খপ্পরে পড়েছে সে! এই এক মহাবিপদ, ভূতের ভয়েই সে সাধারণত দরজা আটকে ঘুমায় না; যাতে বিপদ দেখলে চট করে উঠে দৌড় দেওয়া যায়। আজ কখন যে অবচেতনে খিলটা টেনেছে, তা তার নিজেরও মনে নেই। বিকেল এখন কিংকর্তব্যবিমূঢ়। বালিশের আশেপাশে হন্যে হয়ে হাতড়ালেও ফোনটা খুঁজে পেল না। এদিকে দরজায় টোকার শব্দ যেন অবিরত বেড়েই চলেছে। কী করবে এখন বিকেল? কার সাহায্য চাইবে সে?
ভয়ে নীল হয়ে গেলেও নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারালো না। বুকের ওপর তিনবার ফুঁ দিয়ে নিজেই নিজেকে সাহস জোগানোর এক ব্যর্থ চেষ্টা করল সে। বিছানা ছেড়ে যখন পা বাড়ালো, তখন প্রতিটি পদক্ষেপে তার হৃৎপিণ্ডটা গলার কাছে এসে ধুকপুক করছে। গুটিগুটি পায়ে, নিঃশব্দে সে দরজার একদম কাছাকাছি এসে দাঁড়ালো। এরপর গলা যতটা সম্ভব শক্ত করে কম্পিত কণ্ঠে জানতে চাইল, 'কে? কে ওপাশে?'
পুরোদস্তুর কোনো এক হাড়হিম করা হরর সিনেমার দৃশ্য যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে বিকেলের সামনে। তার মনে হচ্ছে, এই বুঝি দরজার ধাক্কাধাক্কি থেমে যাবে। আর সে যখন ভাববে আপদ বিদায় হয়েছে এবং আশ্বস্ত হয়ে দরজা খুলবে, ঠিক তখনই ওপাশ থেকে কোনো এক বীভৎস প্রেতাত্মা তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে।
বিকেল আবারও প্রশ্ন ছুড়ে দিল, 'কে ধাক্কা দিচ্ছে? উত্তর দাও!'
আশ্চর্যজনকভাবে বিকেলের গলার স্বর শোনামাত্রই ওপাশ থেকে ধাক্কাধাক্কি একদম বন্ধ হয়ে গেল। এক মুহূর্তের জন্য পুরো পৃথিবী যেন স্থবির হয়ে পড়ল। বিকেল একটা ফ্যাকাশে হাসি হাসল; নিজের এমন শোচনীয় অবস্থাতেও সে নিজের বুদ্ধির তারিফ না করে পারল না। মনে হচ্ছে, সে অলৌকিক কিছু একটাকে কাবু করে ফেলেছে প্রায়।
তাড়াতাড়ি এদিক-ওদিক তাকিয়ে হাতের কাছে কোনো অস্ত্র খুঁজল সে। কিন্তু কিছুই না পেয়ে শেষমেশ মেঝে থেকে ভারী পাপোশটাই হাতে তুলে নিল- ঢাল-তলোয়ারের অভাব মেটাতে বর্ম হাতে নিয়েছে কোনো যোদ্ধা যেন। এবার সে দরজার ওপাশের অদৃশ্য সত্তাকে উদ্দেশ্য করে হুঙ্কার ছাড়ল, 'আমি জানি তুমি কে! আমি দরজা খুলব আর তুমি আমার ঘাড় মটকে দেবে, এটাই তো তোমার ধান্দা? কিন্তু না বাপু, ওসব ডাল গলবে না এখানে। আমি হতে দেব না তেমন কিছু। তোমার সব জারিজুরি আজ আমি ফাঁস করে ছাড়ব... জাস্ট ওয়েট অ্যান্ড ওয়াচ!'
দরজার ওপাশে রোদ্দুরের মুখটা সত্যিই দেখার মতো।
মেয়েটা তার গলার স্বর চিনতে পেরেছে ভেবেই সে দরজায় করাঘাত থামিয়ে দিয়েছিল। কারণ এই কনকনে শীতের নিস্তব্ধ রাতে তাদের এই কথোপকথন অন্য কেউ শুনুক, তা রোদ্দুর অন্তত চায় না। সে এসেছে একান্তে বিকেলের মুখটা একটু দেখতে, দেখে নিঃশব্দে চলেও যাবে। এমনকি রেহনুমাও এই মধ্যরাতে তার আগমনের খবর জানুক, সেটা রোদ্দুরের কাম্য নয়। কিন্তু এই মেয়ে তো পুরাই আস্ত একটা পাগল!
রোদ্দুর রাগে কপাল কুঁচকে বিড়বিড় করে উঠল, 'পাগল-ছাগল একটা! দুনিয়াতে এত মানুষ থাকতে আমার যে কেন এই আপদটাকেই ভালো লাগতে হলো... খোদা জানে!'
সে পুনরায় দরজার নবটা ধরল। এবার নবটা একটু ঘুরিয়ে খুব নিচু আর মোলায়েম স্বরে ডাকল, 'বিকেল, আমি! আমি রে... দরজাটা খোল!'
কিন্তু ওপাশ থেকে বিকেল ততধিক উত্তেজিত আর মারমুখী কণ্ঠে জবাব দিল, 'এই ভূত! আবার দরজা নাড়াচ্ছিস? এখন আবার নব ধরে টানাটানি শুরু করেছিস? আমি যদি একবার দরজা খুলি, তোকে একদম বোতলে পুরে দুনিয়া থেকে গায়েব করে দেব। তুই আমায় ভয় দেখাবি কী, আমি যে কী চিজ তা তো তুই জানিস না! জানলে এ বাড়ির ছায়াও মাড়াতি না।'
বিকেলের এমন হুঙ্কার শুনে রোদ্দুর কপালে হাত দিয়ে বিড়বিড় করে, 'আমি জানি আপনি কী চিজ! ভাইরে ভাই, আস্ত একটা অ্যাটম বোমা...'
কণ্ঠস্বর আরেকটু স্পষ্ট করে রোদ্দুর বলল, 'বিকেল, ওরে বাবা ভূত না! এটা আমি... শুনতে পাচ্ছিস?'
বিকেল শুনল কি শুনল না, বোঝা গেল না সঠিক তবে সে পাল্টা হুঙ্কার ছেড়ে বলে, 'আমাকে দেখে মডার্ন মনে হলে কী হবে? আমি সব সূরা জানি। তোকে যদি আজ আয়াত পড়ে ভস্ম না করেছি তো আমার নামও...'
'এই বাল! দরজা খোল!'
রোদ্দুরের ধৈর্য আর বাঁধ মানে না। সে প্রচণ্ড এক ধমক দিয়ে দরজায় বিকট শব্দে করাঘাত করে উঠল। অসতর্কভাবেই চিৎকার করে উঠল সে। পরমুহূর্তেই চারপাশের নিস্তব্ধতার কথা মনে হতেই ভয়ার্ত চোখে তাকালো, কেউ জেগে গেল না তো? বিকেলের ওপর ওর মেজাজটা এখন তুঙ্গে। নাটকের আর জায়গা পায় না এই মেয়ে! একবার শুধু দরজাটা খুলুক, হাড়ে মাংসে বুঝিয়ে দেবে রোদ্দুর- এই মধ্যরাতে তাকে জ্বালানোর ফল কী হতে পারে!
রোদ্দুরের সেই ধমক আর করাঘাতের রেশ কাটতে না কাটতেই ঝট করে দরজাটা খুলে গেল।
বিস্ময়ে হতবিহ্বল একজোড়া চোখ অবিশ্বাসের দৃষ্টি নিয়ে দরজায় স্থির হয়ে আছে। আপাদমস্তক কম্বল দিয়ে মোড়ানো, অনেকটা গুটি পাকানো এক অদ্ভূত মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে সে। নিজের চোখের সামনে এই মাঝরাতে রোদ্দুরকে রক্ত-মাংসে আবির্ভূত হতে দেখবে, সেটা বোধহয় তার কল্পনাতেও ছিল না।
রোদ্দুর সময় নষ্ট না করে বিকেলকে প্রায় ঠেলে ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়ল। মুহূর্তেই দরজাটা আটকে দিয়ে সেটার সঙ্গে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়াল। একটা দীর্ঘ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল সে, যেন এক মহাযুদ্ধ জয় করে এসেছে। এরপর দৃষ্টি ফেরাল সামনে দাঁড়িয়ে থাকা আধপাগল মেয়েটার দিকে। মনে মনে ভাবল, এই মেয়ে নাকি ভূত ভস্ম করবে! অথচ নিজে কম্বল মুড়ি দিয়ে এমন এক অদ্ভুত ভূত সেজে দাঁড়িয়ে আছে যে, আসল ভূতও একে দেখলে ভিরমি খেয়ে পড়ে যাবে।
রোদ্দুর কপাল কুঁচকে কৃত্রিম রাগ নিয়ে জানতে চাইল, 'ফোন কই তোর?'
বিকেল তখনও ঘোর কাটিয়ে উঠতে পারেনি। সে পলকহীন চোখে রোদ্দুরের অবয়বটা গিলে খাচ্ছে। ঘোরগ্রস্তের মতো একটু এগিয়ে এসে হাত বাড়িয়ে রোদ্দুরের গালটা আলতো করে ছুঁয়ে দেখল। অস্ফুটে প্রশ্ন করল, 'রোদ ভাইয়া? সত্যি তুমি?'
রোদ্দুর এক ঝটকায় ওর হাত সরিয়ে দিয়ে মাথার চাঁদি বরাবর একটা মোক্ষম গাট্টা বসিয়ে দিল। উষ্মাভরা কণ্ঠে বলল, 'এখন বিশ্বাস হয়েছে যে আমি মানুষ, না কি আরও এক-আধটা দেব?'
আঘাতটা বেশ মোক্ষম ছিল, মাথার চামড়াটা ঝিনঝিন করে উঠল বিকেলের। সে মুখটা ভোঁতা করে করুণ স্বরে উত্তর দিল, 'হয়, বিশ্বাস হয়।'
এরপর অপরাধীর মতো সামনে থেকে সরে গিয়ে বিছানার ওপর পা ঝুলিয়ে বসল। কম্বলটা মাথার সঙ্গে আরও খানিকটা চেপে জড়িয়ে নিয়ে নিচু স্বরে শুধাল, 'তা এত রাতে হঠাৎ আমার রুমে এসেছ কেন?'
তাতে ছেলেটা ভ্রু কুঁচকে বিস্ময় আর কিছুটা বিরক্তি নিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করে বসে, 'তোর ঘরে আসতে হলে এখন থেকে কি পারমিশন নিয়ে আসতে হবে নাকি? এটা তো আগে জানতাম না। দু’দিন ঠিকমতো বাড়িতে ছিলাম না বলে এর মাঝে কি নতুন কোনো আইন জারি হলো নাকি?'
বিকেল কম্বলটা আরও একটু জড়িয়ে নিয়ে শান্ত গলায় বলল, 'রাত কটা বাজে খেয়াল আছে তোমার, রোদ ভাইয়া? তার চেয়েও বড় কথা, তুমি এভাবে চোরের মতো মাঝরাতে আমার ঘরে এসেছ, কেউ যদি দেখে ফেলে তবে আমার ওপর দিয়ে কী ঝড় বয়ে যাবে, তা কি জানো তুমি?'
'কী যাবে? আমি জানি না! তুই-ই না হয় আমাকে বুঝিয়ে বল।'
রোদ্দুর ধীর পায়ে বিকেলের দিকে এগিয়ে আসে। তার চোখের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি বিকেলের ভেতরের সবটুকু কথা পড়ে নিতে চায়। বিকেল বেশিক্ষণ সেই গভীর চোখের দিকে তাকিয়ে থাকতে পারল না। চট করে মাথা নিচু করে দৃষ্টি সরিয়ে নিল। একরাশ জমাটবদ্ধ অভিমান গলার কাছে দলা পাকিয়ে উঠল তার।
সে ধরা গলায় বলতে শুরু করল, 'এমনিতেই তোমাকে নিয়ে আমাকে কম কথা শুনতে হয় না। বাড়ির যে যেভাবে পারে, যখন-তখন আমায় শুনিয়ে দেয়। কেউবা রূপক অর্থে মজা করে, কেউবা সরাসরি কটাক্ষ করতে ছাড়ে না। তোমার আর আমার সম্পর্কটার যে কী সব কুৎসিত অর্থ বের করে একেকজন! তোমার সামনে তো ভয়ে কেউ টু শব্দটা পর্যন্ত করে না, যত বিষ ওগলায় সব আমার কানে। সেসব তপ্ত সীসার মতো যন্ত্রণা দিয়ে আমায় শুনে যেতে হয়!'
হঠাৎ করেই বিকেল রোদ্দুরের চোখের দিকে সোজাসুজি তাকাল। এক বুক জ্বালা নিয়ে বলল, 'ওহ! তোমাকে আমি এসব কেন বলছি? আবারও হয়তো তুমি কোনো নতুন কাণ্ড ঘটিয়ে বসবে! আর শেষে সেই সবকিছুর দায়ভারও আমার ঘাড়েই এসে পড়বে। তার চেয়ে বরং তুমি এখন চলে যাও। আমিও একদিন চলে যাব। বড় বাবা তো জানিয়েই দিয়েছেন, আমি বিয়ে করে বিদায় নিলে তবেই নাকি তাঁর শান্তি। আমিও কথা দিয়ে এসেছি, বিয়ে করে নেব। বাপিও তো ফোন করে ধমকালেন, আমার জন্য নাকি এই বাড়ির সবার অশান্তি, আমার কারণেই নাকি তাঁর জীবনটা শেষ হয়ে গেছে! এবার আমি সত্যিই সবাইকে মুক্তি দিয়ে অনেক দূরে কোথাও হারিয়ে যাব।'
রোদ্দুরের গাঢ় শীতল চোখে চোখ রেখে বিকেল ফের দৃঢ় স্বরে বলল, 'অনেক দূরে... তোমার থেকেও অনেক দূরে!'
দৃষ্টি সরিয়ে নিয়ে খুব আলতো করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ও। রোদ্দুরের গভীর চোখের সামনে আর বেশিক্ষণ নিজেকে ধরে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। তাই চটপট বিছানা থেকে উঠে দাঁড়ালো এবং অপ্রয়োজনেই ফোনটা খুঁজতে শুরু করল ঘরের এদিক-সেদিক। কেন যেন তার কিছুই ভালো লাগছে না।
একটু আগেও যার দেখা পাওয়ার জন্য বিকেলের অবচেতন মন হাহাকার করছিল, যাকে সামনে পেলে হাজারটা প্রশ্ন আর অভিমান উজাড় করে দেওয়ার কথা ছিল, আজ তাকে ঠিক সামনে পেয়েও বিকেলের মুখ দিয়ে কোনো কথা সরছে না। কেমন এক অদ্ভুত অসাড়তা গ্রাস করেছে তাকে। ভেতরে ভেতরে একটা অস্বস্তি হচ্ছে, যার কোনো কুলকিনারা সে পাচ্ছে না।
তবে একটা বিষয় সে পরিষ্কার বুঝতে পারল, রোদ্দুরকে এই ঘর থেকে দ্রুত সরাতে হবে। কেউ দেখে ফেলার আগেই ওকে বের করে দেওয়া দরকার। একদিকে রাত এখন গভীর, তার ওপর বন্ধ ঘরে তারা দুজন নিভৃতে একা; এই খবর যদি জানাজানি হয়, তবে কোনো এক নতুন কেলেঙ্কারি যে এই বাড়িতে ধুমকেতুর মতো আছড়ে পড়বে, তা নিয়ে বিকেলের বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। সম্মানের চেয়ে কলঙ্ক যে এ বাড়িতে বেশি দ্রুত ডালপালা মেলে, বিকেল তা ভালো করেই জানে।
রোদ্দুর এক মুহূর্তের জন্য বোবা পাথর হয়ে গেল। নির্লিপ্ত দাঁড়িয়ে থেকে ধীরপায়ে এগিয়ে এসে খাটের ওপর বসল। পিঠটা ঠেকিয়ে দিল খাটের হেডবোর্ডের সাথে। বিকেলের অস্থিরতা, ওর ছটফটানি- সবকিছু সে স্থির দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করছিল। কিছুক্ষণ পর পকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে ধরানোর উপক্রম করতেই বিকেল তড়িৎ বেগে চোখ ঘুরিয়ে তাকাল। নাক কুঁচকে তীব্র বিরক্তি নিয়ে বলল, 'দয়া করে বাইরে গিয়ে খাও। এ ঘরে একদম না।'
'কেন?'
'আমার দমবন্ধ লাগে।'
'জানালা খুলে দে।'
'না, এ ঘরে খেতে পারবে না, ব্যস!' বিকেল একরোখা জবাব দেয়।
সিগারেটটায় একটা টান দেওয়ারও সুযোগ পেল না রোদ্দুর। আগুনের শিখাটা নিভিয়ে দিল সে। হাতের ইশারায় সেটাকে কোণের ময়লার ঝুড়িতে সই করে ফেলার চেষ্টা করল, কিন্তু লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে ওটা মেঝের ওপর গিয়ে পড়ল। বিকেল ফ্যালফ্যাল করে দৃশ্যটা দেখল, তারপর আবার রোদ্দুরের দিকে তাকিয়ে পুনরায় তাগাদা দিল, 'এবার অন্তত তুমি যাও।'
আর ঠিক তখনই রোদ্দুরের ভেতরের চণ্ডালটা জেগে ওঠে। বিকেলের বারবার চলে যাওয়ার জেদ ওকে ক্ষিপ্ত করে তুলল হিতাহিত জ্ঞানশূন্যভাবে। কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই রোদ্দুর প্রায় বাঘের মতো তেড়ে এসে বিকেলকে বিছানার ওপর চেপে ধরে। আকস্মিক এই আক্রমণে মেয়েটা পুরোপুরি স্তব্ধ হয়ে গেল। কিছু বলার বা প্রতিবাদ করার আগেই সে আবিষ্কার করল, রোদ্দুরের শরীরের ভারে সে প্রায় পিষ্ট।
বিকেল যন্ত্রণায় মুখ খুলে চিৎকার করতে চাইল, কিন্তু পরক্ষণেই এক বিশাল পাথরের মতো শক্ত হাত ওর মুখটা সজোরে চেপে ধরল। হাত না যেন আস্ত একটা পাথর- আল্লাহ! কী প্রচণ্ড শক্তি! বাতাসের অক্সিজেনটুকুও এখন বিকেলের নাগাালের বাইরে চলে যাচ্ছে। নিঃশ্বাস নিতে জান বেরিয়ে যাওয়ার উপক্রম। বিকেল শুধু ড্যাবড্যাব করে রোদ্দুরের ওই একরোখা চোখের দিকে চেয়ে রইল। সেই দু'চোখে ধিকিধিকি আগুন জ্বলছে- যার শিখা বিকেলের অস্তিত্বকে জ্বালিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
স্তব্ধতার প্রহরগুলো একে একে পার হয়ে যায়। দুজনেই দুজনের চোখের মণি আর মুখের আদল কোনো এক বিমূর্ত শিল্পীর মতো মুখস্থ করতে ব্যস্ত। নীরবতার সেই গভীর ক্ষণে রোদ্দুর নিজের হাতের বাঁধন সামান্য আলগা করতেই বিকেল ফিসফিসিয়ে আকুল কণ্ঠে শুধাল, 'কেন এমন করছ?'
রোদ্দুর কোনো উত্তর দিল না। উত্তর দেওয়ার কোনো তাগিদও ওর মাঝে নেই। বিকেলের প্রশ্নটাকে স্রেফ উপেক্ষা করে ও আরও খানিকটা ঝুঁকে এল ওর দিকে; তারপর আচমকাই নিজের তপ্ত ঠোঁট ডুবিয়ে দিল বিকেলের গলার ভাঁজে। মুহূর্তেই বিকেলের বুকের পাঁজরে যেন এক প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক তরঙ্গ বইতে শুরু করে। দীর্ঘ এই জীবনে এমন শিহরণ জাগানিয়া অনুভূতির সাথে ওর কোনোদিন পরিচয় হয়নি- আজই প্রথম! বিকেলের শরীর ভীষণভাবে দুলে উঠল, এক অজানা সংকোচে ও নিজেকে সরিয়ে নেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করে। খুব ক্ষীণ আর মিনতিভরা স্বরে বলল, 'প্লিজ, এমন করো না...'
ঠিক সেই মুহূর্তেই রোদ্দুর অদ্ভুত এক ফুঁ দিয়ে নিজেকে সরিয়ে নেয়। ওর ঠোঁটের কোণে খেলে গেল বক্র হাসি। বিম্মিত বিকেলকে পাথরের মতো স্তব্ধ করে দিয়ে ও বিদ্রূপের সুরে বলে উঠল, 'কী ভাবলি? তোকে চুমু খাব? ইশ...!'
বিকেল ঝটপট বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। অপমানে আর রাগে ওর শরীর রি রি করে উঠেছে। যদি বয়সে ও রোদ্দুরের চেয়ে বড় হতো, তবে হয়তো আজ কষে কয়েকটা থাপ্পড় বসিয়ে দিত মানুষটার গালে। গলার স্বর সপ্তমে চড়িয়ে ও শাসাল, 'বের হও আমার ঘর থেকে! এক্ষুনি বের হও!'
রোদ্দুর বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে পাল্টা প্রশ্ন ছুঁড়ল, 'আমায় বের হতে বলার তুই কে রে?'
'কোনো ড্রামা করবে না একদম। জাস্ট গেট লস্ট!'
'এই যে আস্তানা গেড়ে বসলাম, দেখি তুই আমার কী করিস?' রোদ্দুর নির্বিকার ভঙ্গিতে খাটের ওপর পা ছড়িয়ে বসল।
বিকেলের দুচোখ তখন আগুনের ফুলকি ঝরাচ্ছে। ও দাঁতে দাঁত চিপে বলল, 'রোদ ভাইয়া... কাজটা কিন্তু মোটেও ভালো হচ্ছে না!'
'না হোক! সব সময় ভালো হওয়াও স্বাস্থ্যের জন্য ভালো না। এবার নাহয় একটু খারাপ কিছুই হোক!'
তারপর আরও বেপরোয়া হতে পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট টেনে বের করে আনে। ধরায় ফটাফট। অভ্যস্ত ভঙ্গিতে দুটো টান দিয়ে ধোঁয়া গুলি ছাড়ল মেয়েটার মুখ বরাবর, কেশে উঠল বিকেল। রোদ্দুরের যেন তাতে কিচ্ছু আসে যায় না।
বরং দ্বিতীয় টান দিয়ে ওর লাল হওয়া মুখপানে চেয়ে শুধাল, 'অভ্যেস করে না। বিয়ের পর তো সইতে হবে।'
কাশতে কাশতে চোখে পানি চলে এসেছে প্রায়। নাসিকাপথ ভেদ করে ডিরেক্ট ব্রেইনে গিয়ে ধরেছে।কেমন লাগছে, তার ভেতরই বিস্ময় মাখাবড় বড় চোখ করে রোদ্দুরের দিকে তাকিয়ে হতবাক হয়ে শুধাল, 'কার বিয়ে! কার কথা বলছ?'
রোদ্দুর সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়ে তাচ্ছিল্যের সুরে বলল, 'ওমা, এই না মাত্র নিজের মুখে স্বীকার করলি- তুই বিয়েতে মত দিয়েছিস। এখন আবার ন্যাকামি করছিস কেন?'
বিকেল নিজেকে সামলে নিয়ে একটু ত্যাড়ামি করেই বলল, 'তাতে তোমার কী? আমি বিয়ে করলে তোমার তো খুশি হওয়ার কথা। আর একটা কথা শোনো, আমার হবু হাজবেন্ড মোটেই তোমার মতো এমন চেইন-স্মোকার কিংবা কুৎসিত মেজাজের হবে না। হি উইল বি এ জেন্টলম্যান, নট লাইক ইউ!'
রোদ্দুর এক ভ্রু নাচিয়ে বিদ্রূপ করল, 'তাই নাকি? তো কী হবে শুনি? কোনো সাধু-সন্ন্যাসী হবে নাকি?'
'হতেও তো পারে! অন্তত তোমার চেয়ে ভালো হবে।'
'তবে তো পোড়া কপাল তোর...' রোদ্দুর বেশ রসিয়ে বলে, 'ওসব সাধুরা কি আর আদর-সোহাগ বোঝে রে পাগলি? দেখবি সারাদিন বনে-বাঁদাড়ে তসবিহ জপছে আর গাছতলায় বসে আছে। তুই তখন ঘরের কোণে একা একা বিরহে জ্বলে-পুড়ে খাক হবি।'
বিকেল কানে হাত দিয়ে আঁতকে ওঠে সঙ্গে সঙ্গে, 'ইশ ছিঃ! রোদ ভাইয়া, তোমার কি কোনো কাণ্ডজ্ঞান নেই? এসব কী ধরনের অসভ্য কথা!'
'আরে যা ধ্রুব সত্য, তাই তো বললাম। আজকালকার দিনে মানুষের মঙ্গল চাইলেও দোষ।'
বিকেল দুই হাত জোড় করে মিনতি জানাল, 'এই যে দেখো, আমি হাত জোড় করছি, আমার আর মঙ্গলের দরকার নেই। তুমি দয়া করে এখন বের হও। প্লিজ ভাইয়া! আমার সত্যিই ভালো লাগছে না। কখন যেন ভোর হয়ে যাবে...
রোদ্দুর জবাবে কিছু বলল না, হাতের জ্বলন্ত সিগারেটটা ছুঁড়ে দিল ঘরের কোণে। বিছানার চাদরের ওপর সামান্য ছাই পড়ে এক চিমটি জায়গাও পুড়ে গেল। বিকেল সেটা খেয়াল করার আগেই রোদ্দুর প্রায় এক ঝটকায় ওকে টেনে নিজের সামনে মূর্তির মতো বসাল। এক হাতে বিকেলের দুই গাল চেপে ধরে দাঁতে দাঁত চিপে শাসাল, 'শোন, ঘরে আসলাম বিশ মিনিটও হয়নি, এর ভেতর তুই বিশ হাজার বার যাওয়ার কথা বলেছিস। স্রেফ বাড়িতে একটা বড় ঝামেলা চলছে বলে এড়িয়ে যাচ্ছি, নইলে আজ তোর হাড্ডি-গুড্ডি গুঁড়ো করে তবেই যেতাম। কথাটা মাথায় গেঁথে রাখিস।'
বিকেলের বুকের ভেতরটা ধক করে ওঠে। সে আমতা-আমতা করে বলল, 'তার মানে তুমি স্বীকার করলে যে বাড়িতে ঝামেলা চলছে?'
রোদ্দুর নিরুত্তর। বিকেল পুনরায় গাঢ় স্বরে বলে উঠল, 'আর এই সব ঝামেলার মূলে আমি, তাই তো? বিকেল মির্জা- বাবার লাইফের লস প্রজেক্ট! তুমি মুখে না বললেও সত্যিটা তো এটাই।'
'বেশি বকিস না তো!' রোদ্দুরের গলায় চাপা গর্জন।
'বেশি কই বললাম? যেটুকু বলি, তা-ই তো বিষ হয়ে দাঁড়ায়। তুমি কেন ওই টিচারকে মারতে গেলে? আমি কি তোমায় মারপিট করতে বলেছিলাম?' বিকেল মাথা নিচু করে একটা তপ্ত দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল।
রোদ্দুর বিকেলের চিবুকটা ধরে উঁচু করে বলল, 'শোন, যে যা পাওয়ার যোগ্য, আমি তাকে তাই দিয়েছি। তাতে দুনিয়া উল্টে গেলেও আমার আক্ষেপ নেই। তুই অযথাই নিজেকে অপরাধী ভাবছিস। এই বিষয়টা আমি কাল বাবাকেও বুঝিয়ে বলব।'
কথাটা শোনামাত্রই বিকেলের শরীর হিম হয়ে আসে। সে তীব্রভাবে মাথা নেড়ে বাধা দিয়ে বলে, 'না, না! খবরদার! বড় বাবাকে তুমি কিচ্ছু বলতে যাবে না। দোহাই তোমার, কোনো সাফাই গাইবে না আমার নামে।'
রোদ্দুর অবাক হয়ে শুধাল, 'কেন?'
'এমনিই।'
'না, এমনি না। সঠিক কারণটা বল।'
বিকেল অস্বস্তিতে উশখুশ করতে লাগল। সে আর অত ছোট বিকেল নেই; আজকাল বড়দের সম্পর্কের মারপ্যাঁচ স্পষ্ট বুঝতেও পারে। উমেদ মির্জা এমনিতেই তার ওপর বিষিয়ে আছেন। এখন যদি রোদ্দুর গিয়ে বিকেলের হয়ে ওকালতি করে, তবে হিতে বিপরীত হবে। উমেদ মির্জা ভাববেন বিকেলই রোদ্দুরকে উসকে দিচ্ছে। ক্লান্ত চোখ দুটি মেলে ও রোদ্দুরের দিকে চাইল। ওর ভাষাভাণ্ডারে কোনো উত্তর অবশিষ্ট নেই। ও এখন ভীষণ কাহিল। বাকবিতণ্ডার চেয়েও বেশি ওর এক চিলতে বিশ্রাম প্রয়োজন।
রোদ্দুর হয়তো বিকেলের চোখের সেই অব্যক্ত হাহাকার পড়তে পারল। তাই ধীরপায়ে উঠে দাঁড়ায়। এবার আর কোনো জেরা করল না। শুধু নিচু স্বরে বলল, 'ঘুমিয়ে পড় এবার।'
বিকেল অর্ধনিমীলিত চোখে শুধাল, 'তুমি?'
'চলে যাব।'
'কোথায় যাবে?'
'জেনে লাভ নেই।'
'আবার কবে আসবে?'
'তাও জেনে লাভ নেই।'
বিকেল এক মুহূর্তের জন্য বিমর্ষ হয়ে বলল, 'তুমি এমন কেন রোদ ভাইয়া? সব সময় এত আড়াল কেন রাখো?'
রোদ্দুর দরজার দিকে যেতে যেতে ছোট করে হাসল, 'কেমন আমি?'
বিকেল বালিশে মাথা এলিয়ে দিয়ে অস্ফুটে বলল, 'কিছু না।'
সে গুটিশুটি মেরে কম্বলটা গায়ে টেনে নিল। দুচোখের পাতা সীসার মতো ভারী হয়ে আসছে। হাড়কাঁপানো ঠান্ডার ভেতর একরাশ তন্দ্রা ওকে গ্রাস করছে। রোদ্দুর তখনো দরজার কাছে স্থির দাঁড়িয়ে। বিকেলের চেতনা লুপ্তপ্রায়। ঘুমের ঘোরে ও বিড়বিড়িয়ে উচ্চারণ করে, 'রোদ ভাইয়া... তুমি কি আমার কোনো সুন্দর স্বপ্ন, নাকি নিষ্ঠুর বাস্তবতা?'
কোনো উত্তর এল না। শুধু একটা যান্ত্রিক শব্দ হলো, ঘরের বাতিটা নিভে গেল। অন্ধকারের বুক চিরে দরজা খোলার আর বন্ধ হওয়ার একটা ক্ষীণ আওয়াজ পাওয়া গেল। তারপর সব চুপচাপ। নিস্তব্ধতায় ডুবে গেল চারপাশ। বিকেল তন্দ্রার অতল গহ্বরে তলিয়ে যেতে যেতে শেষবারের মতো ডাকল, 'রোদ ভাইয়া... রো...দ... ভাই...য়া...'
আর কোনো সাড়া মিলল না। গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল এক অবাধ্য কিশোরীর অভিমানী মন।
(চলবে)
______
গল্পটি ভালো লাগছে? জানাবেন!