ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রেমের নির্বসন

১৬তম পর্ব

লেখক: মৃধা মৌনি

#প্রেমের_নির্বাসন - (১৬)

লেখনীতে - #মৃধা_মৌনি

_________

মিঠাপাতা রোদের এক ঝলক তপ্ত চুম্বনে বিকেলের ঘুম ভাঙে। খোলা জানালা দিয়ে অবাধ্য রোদের ছটা এসে লুটোপুটি খাচ্ছে ঘরের ভেতর। খানিকটা মেঝের শ্বেতপাথরে, আর খানিকটা বিছানার ওপর। বিকেলের হিম হয়ে থাকা পায়ের পাতায় রোদের সেই ওমটুকু লেপটে যেতেই এক অদ্ভুত আলস্যমাখা আরাম শরীরজুড়ে ছড়িয়ে পড়ল। সে চোখ মেলে। দেয়াল ঘড়ির কাঁটা তখন দশটা তেইশের ঘরে।

প্রথমেই মনে হলো, এই উষ্ণ ওমটুকু গায়ে মেখে আরও কিছুক্ষণ অলসভাবে বিছানায় গড়াগড়ি করা যাক। কিন্তু পরক্ষণেই বিবেক দংশন করল- না, সামনে পরীক্ষা, পড়তে বসা উচিত। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল সকালের সমস্ত প্রশান্তি। মগজের কোণে হাতুড়ির মতো ঘা দিল গতকালের প্রতিটি বিষাদময় স্মৃতি। বড় চাচ্চুর সেই রূঢ় কণ্ঠস্বর, বিকেলের সেই অসহায় আত্মসমর্পণ, পড়াশোনার পাঠ চুকিয়ে বিয়ের পিঁড়িতে বসার কঠিন প্রতিশ্রুতি - সবকিছু এক নিমেষে সকালের রোদ্দুরকে ফিকে করে দিল মুহূর্তেই। যে শরীরটা একটু আগে আরাম খুঁজে পাচ্ছিল, মুহূর্তেই তা নীল বিষণ্ণতায় ছেয়ে গেল; শরীরের সবটুকু শক্তি যেন হাওয়াই মিঠাইয়ের মতো মিলিয়ে গেল শূন্যে।

বিকেল বিছানা ছেড়ে নিচে নেমে আসে। একটা মানুষের মুখ বারবার তার চোখের সামনে ভেসে উঠছে। লোকটা এখন কোথায়? বাড়িতে কি সে আছে, নাকি আবারও কোথাও নিরুদ্দেশ হয়ে গেছে? গতকাল রাতের সেই রুদ্ধশ্বাস মুহূর্তগুলো কি তবে সত্যিই ঘটেছিল, নাকি পুরোটাই ছিল বিরহী মনের সাজানো এক রঙিন স্বপ্ন? মানুষের স্বপ্ন কি এতটাও বাস্তব হয়? বিকেলের মনের ভেতর এক ঘোর লাগা ধন্দ কাজ করে।

সে পাগলের মতো ছুটে গেল ঘরের কোণে থাকা ময়লার ঝুড়িটার কাছে। কাল রাতে রোদ্দুর একটা সিগারেট লক্ষ্যভ্রষ্ট করে এখানেই ফেলেছিল, তার স্পষ্ট মনে আছে। সে তো নাকমুখ কুঁচকে ঘৃণাভরে চেয়েছিল সেদিকে। কিন্তু একি! এখানে তো কিচ্ছু নেই। কোনো ছাই নেই, কোনো পোড়া অবশেষ নেই। তবে কি সবটাই বিভ্রম? মরীচিকা? তার অবচেতন মনের কোনো কারসাজি?

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিকেল বিড়বিড় করে উঠল, 'তবে কি তুমি কেবল আমার স্বপ্নই হয়ে রইলে রোদ ভাই? বাস্তবের রুক্ষতায় তোমার নেই কোনো ঠাঁই?'

পরাজিত সৈনিকের মতো ধীর পায়ে সে আবারও বিছানায় ফিরে আসে। গুটিসুটি মেরে শুয়ে পড়ল আবারও। শরীরটা বড্ড ভারী লাগছে। মনের গহীনে এক তীব্র অস্থিরতা আর কাতরতা তাকে কুরে কুরে খাচ্ছে। ভেতরটা কেমন ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে তার। একেবারে লো ফিল যাকে বলে। তার খুব ইচ্ছে করল কোনো এক ধূসর অজানায় হারিয়ে যেতে, যেখানে কোনো সম্পর্কের মারপ্যাঁচ নেই, নেই কোনো কঠিন শর্ত কিংবা ধিক্কারজনক কথাবার্তা। কিন্তু হায়! বিকেলের জীবনে আজ হারিয়ে যাওয়াটাও এক নিষিদ্ধ বিলাসিতা। শিকলপরা এই জীবনে শান্তির খোঁজ করা এক বৃথা আস্ফালন। বিষণ্ণ বিকেল শুধু এক আকাশ হাহাকার নিয়ে জানালার রোদের দিকে চেয়ে রইল।

জানালার পর্দা ভেদ করে আসা রোদে ঘরের ভেতর দীর্ঘ ছায়া পড়েছে। কক্ষের স্তব্ধতা ভেঙে ভেতরে ঢুকল তৃপ্তি, তার পেছনে স্বস্তি আর দীপ্র। এই তিন মূর্তিকে একসাথে ঘরে ঢুকতে দেখে বিকেলের বুকের ভেতরটা অজানা এক শঙ্কায় ধক করে উঠল। সে বিছানায় আধশোয়া হয়ে বসে চোখেমুখে উৎকণ্ঠা ফুটিয়ে শুধাল, 'কী ব্যাপার? কিছু হয়েছে নাকি?'

তৃপ্তি যেন আকাশ থেকে পড়ে, 'কই না তো! কেন, কী হবে?'

'না, মানে... তোরা সবাই এভাবে একসাথে হঠাৎ করে এলি যে?'

তৃপ্তি বাকি দুজনের দিকে অর্থবহ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রসিকতা করে বলল, 'কীভাবে এলাম? পা দিয়েই তো হেঁটে হেঁটে এসেছি! এখন থেকে কি আসার আগে তোকে মেইল করতে হবে? কয়জন আসছি, কত স্পিডে হেঁটে আসছি- সব ডিটেইলস দেব?'

স্বস্তি আর দীপ্র মুখ টিপে হাসছে দেখে বিকেলের পিত্তি জ্বলে গেল। সে চড়া গলায় বলল, 'সকাল সকাল ফাজলামি করিস না তো তৃপ্তি! এমনিতেই মেজাজ খারাপ হয়ে আছে, সব রাগ তোর ওপর গিয়ে পড়বে কিন্তু।'

তৃপ্তি নির্বিকার ভঙ্গিতে বিছানায় পা তুলে বসে, স্বস্তিও তার পাশে জায়গা নিল। দীপ্র খাটের এক কোণে দাঁড়িয়ে রইল শান্তভাবে। বিকেলের কপাল থেকে উদ্বেগের ভাঁজ সরছে না। ওর মনে হচ্ছে, ওরা অন্যরকম চোখে ওকে দেখছে; যেন কোনো গোপন রহস্যের সন্ধান ওরা জানে। এই রহস্যময় নীরবতায় বিকেল প্রায় আর্তনাদ করে উঠল, 'তোদের ভাবগতিক আমার ভালো লাগছে না। কী হয়েছে বল না রে, প্লিজ!'

তৃপ্তি এবার কৃত্রিম বিস্ময়ে বলল, 'কী আজব! পথে এই দুটোর সাথে দেখা হলো তাই একসাথে এলাম। তুই অহেতুক প্রশ্ন করে কানের পোকা নাড়িয়ে দিচ্ছিস ভাই। চল চল, সবাই চল, এই মেয়ের কাছে আসলেও জ্বালা, না আসলেও জ্বালা!'

তৃপ্তি বিছানা থেকে নামার উপক্রম করতেই বিকেল ওর হাতটা খপ করে ধরে ফেলে শুকনো মুখে করুণ স্বরে বলল, 'আচ্ছা বস না, রাগ করিস কেন?'

তৃপ্তি বিকেলের ফ্যাকাসে মুখটার দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকাল। একটু পর নরম গলায় বলল, 'সকালে একবার তোর রুমে এসেছিলাম। দেখলাম তুই ঘুমের ঘোরে ছটফট করছিস। ঘরটা ঠান্ডায় বরফ হয়ে ছিল, তাই পর্দা টেনে জানালা খুলে দিয়ে গিয়েছিলাম। এখন শুধু দেখতে এলাম ঘুম ভেঙেছে কি না। তোকে ঠিক স্বাভাবিক লাগছে না রে- কিছু নিয়ে টেনশনে আছিস?'

বিকেল মুখ নামিয়ে নিয়ে অস্ফুটে জানায়, 'না, তেমন কিছু না। এমনিই।'

'আপার ঘুম ভেঙেছে ঠিকই, কিন্তু হুঁশ ফিরতে তো এখনো ঘণ্টা দুই বাকি, জানো না তুমি?' স্বস্তির এই টিপ্পনীতে তৃপ্তি হাসল ঠিকই, কিন্তু পরক্ষণেই বিকেলের দিকে তাকিয়ে অভিমানের সুরে বলল, 'সেটা তো জানিই। কিন্তু তোর আপা যে আজকাল আমায় আপন ভাবে না, সেটাও কিন্তু আমি জানি।'

বিকেল ভ্রু কুঁচকায়, 'এটা কেমন কথা? তোকে আপন ভাবব না কেন?'

'যেটা সত্যি সেটাই বললাম। তুই কি এখন আমায় সবকিছু বলিস? বলিস না।'

বিকেল চুপ করে রইল। তৃপ্তি পুনরায় বলতে শুরু করল, 'তুই আমায় পর ভাবতে পারিস, কিন্তু আমার কাছে তুই আগের মতোই আছিস। তোর কোন বাড়া ভাতে আমি ছাই দিয়েছি কিনা জানি না, কিন্তু তুই যে চরম ডিপ্রেশনে আছিস- তা আমি ঠিকই জানি। আর জানি বলেই সকাল সকাল খোঁজ নিতে এসেছি।'

স্বস্তি যোগ করল, 'আপু আজ কোচিং ক্লাসটাও মিস দিয়েছে।'

তৃপ্তি এবার বিকেলের হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে গাঢ় স্বরে বলল, 'বড়দের ওপর অভিমান করে আমাদের সাথে দূরত্ব বাড়াস না রে। আমরা তোকে জাজ করতে আসিনি। তুই আমাদের বোন, আমাদের পরিবারের একটা অবিচ্ছেদ্য অংশ- ছিলি, আছিস আর থাকবি। কী রে দীপ্র, ঠিক বললাম না?'

এতক্ষণ চুপ করে থাকা দীপ্র এবার মুখ খুলল। তার কিশোর কণ্ঠে আজ এক অদ্ভুত পরিপক্বতা, 'আপু, এই বাড়ির চঞ্চলতা তো তুমি। তুমিই যদি চুপ হয়ে যাও, তবে বাড়িটা তো শ্মশান হয়ে যাবে। আমি ছোট হতে পারি, কিন্তু ভালো-মন্দ বুঝি। প্লিজ, এভাবে আপসেট থেকো না... আমাদের খুব কষ্ট হয়।'

স্বস্তি এবার লাজুক হাসির আড়ালে এক আকাশ মমতা নিয়ে বলল, 'কাল রাতে আমি ভাত খাইনি। কয়েকবার তোমার দরজায় এসে উঁকি দিয়েছি। দেখেছিলাম তুমি ছোট চাচীর ছবিটা জড়িয়ে ধরে কাঁদছিলে। দেখে আমার খুব কান্না পাচ্ছিল, কিন্তু রেগে যাবে ভেবে ডাকার সাহস পাইনি।'

তৃপ্তি যোগ করল, 'স্বস্তি ছুটে আমার কাছে গিয়েছিল। আমিই মানা করেছিলাম বিরক্ত করতে। বলেছিলাম কাঁদতে দে, কাঁদলে চোখ পরিষ্কার হয়, মন হালকা হয়। বিষণ্ণতা কমে যায়।'

'আর তাই আমরা কেউ তোকে সান্ত্বনা দিতে আসিনি। তার মানে এই নয় যে আমাদের চিন্তা হয়নি। উই লাভ ইউ আপু!' দীপ্রর এই কথায় ঘরের গুমোট ভাবটা মুহূর্তেই এক পশলা বৃষ্টির মতো ধুয়ে গেল।

বিকেল আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। চোখের কোণ জ্বালা করে উঠল ওর। দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসে। সে মাথা নিচু করে কান্না লুকানোর চেষ্টা করতেই টের পেল তৃপ্তির মমতাভরা হাতটা ওর চুলে বিলি কেটে দিচ্ছে। অভিমানের যে বিশাল পাথরটা বুকের ভেতর চেপে বসেছিল, তা যেন মুহূর্তেই গলতে শুরু করল। সে বড্ড একা ভেবেছিল নিজেকে, অথচ ভুলে গিয়েছিল এই প্রিয় মুখগুলোর কথা।

তৃপ্তি মায়াবী স্বরে বলতে নেয়, 'কাঁদিস না রে...'

বলা মাত্রই বিকেল ভ্যা করে কেঁদে উঠল। এতক্ষণের সবটুকু বাঁধ ভেঙে গেছে। স্বস্তি হেসেই ফেলল, 'ধুর, মানা করলা কেন? এখন তো থামানোই যাবে না!' দীপ্রও ফোড়ন কাটল, 'আপুকে যেটা করতে মানা করা হয়, উনি সেটাই সবার আগে করবেন।' তৃপ্তি ও না হেসে পারে না।

তিনজনের এই নির্মল হাসির ঝর্নার মাঝে বিকেল একাই কেঁদে গেল। নাক-ঠোঁট ফুলিয়ে, ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে চলল তার পাঁচ মিনিটের মুক্তিস্নান। একরাশ ভালোবাসা আর পরম মমতায় ভরে উঠল বিকেলের বিষণ্ণ সকাল।

কম্বলের কোণটা তুলে বিকেলের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে আদুরে শাসনে বলল তৃপ্তি, 'অনেক হয়েছে, এবার চোখ মোছ তো।'

বিকেল আলতো হাসল। চোখ মুছতে মুছতে হঠাৎ মনের এক কোণে জমে থাকা প্রশ্নটা করেই ফেলল, 'মিশি কোথায় রে? মেয়েটা একটুও আসে না আমাদের কাছে। সারাক্ষণ কী নিয়ে যে থাকে!'

তৃপ্তি একটু নিঃশ্বাস ফেলে বলল, 'এখন আবার ওটা নিয়ে মন খারাপ করে বসিস না। ও তো বরাবরই এমন, একলা থাকতে আর নিজের মতো চলতেই পছন্দ করে। তুই তো জানিস ওকে।'

'হুঁ, জানি। তাই বলে মাঝে মাঝেও কি আসতে পারে না?' বিকেলের কণ্ঠে ক্ষীণ এক আক্ষেপ ঝরে পড়ল।

'ওসব নিয়ে পরে ভাবা যাবে। এখন চুপচাপ ওঠ, ফ্রেশ হয়ে নাশতা করবি চল।' তৃপ্তির কণ্ঠে বড় বোনের মতো দৃঢ়তা।

বিকেল ম্লান মুখে জবাব দিল, 'ইচ্ছে করছে না রে তৃপ্তি।'

'ইচ্ছে করলেই কী, আর না করলেই কী? খাবি এক চড়! রাতেও তো কিছু মুখে দিসনি। এভাবে না খেয়ে থাকলে কি পৃথিবীর সব সমস্যা মিটে যাবে? বড় মা নিজেই এখন হাজারটা চিন্তায় জর্জরিত, ফুপুর মনের অবস্থাও তো বুঝিস। তোকে আগলে রাখা বা যত্ন করার মতো এখন আমরা ছাড়া আর কেউ নেই। তাই আমরা যা বলব, তোকে সেটাই শুনতে হবে।'

তৃপ্তির এই মাতৃসুলভ আচরণ দেখে বিকেলের মনটা হালকা হয়ে গেল। সে হেসে তৃপ্তির গায়ের ওপর গড়িয়ে পড়ল, 'তুই তো দেখি একদম মা হয়ে গেছিস! চাচিকে বলব নাকি তোর বিয়ে দিয়ে দিতে?'

তৃপ্তি নাক সিটকে বলল, 'ইশ, কী যে বলিস! কে করে বিয়ে? আমি তো জীবনেও এই ঝামেলার পথে পা বাড়াব না।'

পাশ থেকে স্বস্তি অমনি ফোড়ন কাটল, 'আমিও না! আমিও কক্ষনো বিয়ে করব না।'

বিকেল ভ্রু কুঁচকে স্বস্তির দিকে চেয়ে মশকরা করে বলল, 'তোকে বিয়ে দেবেটা কে রে? তুই তো আস্ত এক আধপাগলি! কোন ছেলে নিজের পায়ে কুড়াল মেরে তোকে ঘরে নেবে শুনি?'

স্বস্তি দমে যাওয়ার পাত্রী নয়। সে চটপটে গলায় পাল্টা জবাব দিল, 'তোমায় যদি কেউ নিতে পারে, তবে আমায়ও ঠিক কেউ না কেউ নেবে!'

স্বস্তির এই চটজলদি উত্তর শুনে তৃপ্তি হো হো করে হেসে উঠে। হাসতে হাসতে বলল, 'সাক্ষাৎ দুই বোন! বিকেল তুই বড় পাগল, আর স্বস্তি হলো জুনিয়র ভার্সন। একদম পাগলে পাগলে টক্কর লেগেছে তোদের!'

বিকেল কপট রাগ দেখিয়ে স্বস্তির দিকে চেয়ে রইল। আর স্বস্তি জুবুথুবু হাসি হাসি মুখ নিয়ে বিকেলের চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। পরাজিত হলো বিকেলই, চোখ সরিয়ে নিতেই স্বস্তি একটা জিতে যাওয়া টাইপ ভাব নিয়ে দীপ্রর দিকে তাকাতেই ওর মাথায় গাট্টা দিয়ে চোখের ইশারায় চুপ থাকতে বলল দীপ্র।

'নে, চটপট ওঠ। হাত-মুখ ধুবি।' তৃপ্তি তাড়া দিয়ে উঠল।

বিকেল বলল, 'যাই। বড় বাবা কোথায়?'

'বাড়ি নেই।'

'ওহ।' একটু শান্তিই লাগল নেই শুনে, একই সঙ্গে আরও একটি প্রশ্ন মাথা উঁচিয়ে জাগল হৃদয়ের কোণে, জিজ্ঞেস করবে কিনা ভাবছে বিকেল।

তৃপ্তি ওকে ভাবুক হতে দেখে ধাক্কা দিয়ে শুধাল, 'এই, আবার কি নিয়ে ভাবতে বসে গেলি?'

'না, কিছু না রে।' বলেই বিকেল অল্প একটু হাসল। বিছানা ছেড়ে নেমে এল ঝটপট, 'আমি হাত-মুখ ধুয়ে নেই, তোরা নাশতা করেছিস, না করলে একসাথে সবাই করব।'

বলতে বলতে ও নিজের ভাবনাকে পাশ কাটাতে চায়। মনকে শাসায়, ভুলেও ওই মানুষটির নাম ওর ঠোঁট দিয়ে উচ্চারণ করা যাবে না। এমনিতেই ওর কারণে বাড়ির পরিবেশ এত উত্তপ্ত, আর নষ্ট হোক, ও চায় না। তাছাড়া গত রাতে যা হয়েছিল, তার পুরোটাই স্বপ্ন। স্বপ্ন বৈ আর কিইবা হবে? রোদ্দুর ভাইয়াকে তার খালামনির বাসায় পাঠিয়ে দিয়েছে বড় বাবা, নিজের কানে শুনেছিল বিকেল, সে এখানে আসবে কোথা থেকে তাও অত রাতে! তবু কেন যেন অবাধ্য মনটা বারবার না না করেই চলেছে। কথাগুলো আমলেই নিতে চাইছে না। বিকেলের নিজের প্রতিই নিজের রাগ ধরে। জাহান্নামে যাক ওই লোক, যা হওয়ার হোক, তাতে তোর কি রে- জিজ্ঞেস করে মনকে, শক্ত করে। এবার আর উত্তর নেই বেচারার। আঁকুপাঁকু করে শেষমেশ চুপটি করে রইল।

একটা গাঢ় নিঃশ্বাস ফেলে বাথরুমের দিকে পা বাড়াতেই তৃপ্তির ডাকে আচমকা থমকে দাঁড়াল। পেছন ফিরে দেখল, তৃপ্তি বিছানার এক কোণে আঙুল দিয়ে কিছু একটা ঘষছে। অত্যন্ত সন্দিহান গলায় জানতে চাইল, 'এ জায়গাটা পুড়ল কীভাবে? এই বিকেল, এটা তো নির্ঘাত আগুনের পোড়া দাগ! তুই কি উল্টাপাল্টা কিছু করেছিস নাকি?'

তৃপ্তির প্রশ্নে বিকেলের মস্তিষ্কের কোষে কোষে যেন দাবদাহ শুরু হলো। গত রাতের প্রতিটি মুহূর্ত স্মৃতিপটে ঝড়ের বেগে ভেসে উঠতে লাগল; ঠিক যেমন প্রবল বাতাসে বইয়ের পাতা ওল্টাতে থাকে। এক জায়গায় গিয়ে তার স্মৃতি স্থবির হয়ে গেল- বিছানার ওপর ছাই পড়েছিল, জ্বলন্ত গরম ছাই!

বিকেল আর এক মুহূর্ত দেরি না করে হুড়মুড়িয়ে তৃপ্তির কাছে ছুটে আসে। তাকে প্রায় সরিয়ে দিয়ে পোড়া জায়গাটার ওপর ড্যাবড্যাব করে চাইল। এই তো, স্পষ্ট দাগ! চাদরের সুতো পুড়ে কুঁচকে আছে। তার মানে কি রোদ ভাইয়া সত্যিই এসেছিল? গত রাতের সেই রুদ্ধশ্বাস ঝগড়া, জেদ, অভিমান, অত কাছাকাছিতে দু'জনের নিঃশ্বাসের মাপঝোঁখ করা- সবই কি তবে ধ্রুব বাস্তব?

বিকেল কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। পাশে দাঁড়ানো তিনটি কিশোর প্রাণ তখন তাকে আপাদমস্তক খুঁটিয়ে দেখছে। তৃপ্তি বিকেলের কাঁধে হাত রেখে পরম বিস্ময়ে ডাকল, 'বিকেল...?'

বিকেল দিকবিদিকশূন্য। কী বলে নিজেকে সামলাবে, তা ভেবে পাচ্ছে না। তার মনে হচ্ছে, সব গোপন কথা বুঝি ফাঁস হয়ে গেছে। সবাই হয়তো বুঝে ফেলেছে এ ঘরে কাল রাতে অন্য কেউ ছিল। একরাশ লজ্জা আর অস্বস্তি তাকে আষ্টেপৃষ্টে জাপটে ধরে। কপালে জমে ওঠা বিন্দু বিন্দু ঘাম তৃপ্তির নজর এড়ালো না।

পরিস্থিতি সামলাতে এবং নিজের অস্বস্তি ঢাকতে বিকেল হঠাৎ এক উদ্ভট কৌতুকের আশ্রয় নিল। সে জোর করে হাসার চেষ্টা করে বলে উঠল, 'আরে, এটা তো আমিই পুড়িয়েছি। নতুন নতুন সিগারেট খাওয়া ধরেছি তো, তাই অভ্যাস নেই। যেখানে সেখানে ছাই পড়ে যায়! তোরা এভাবে অবাক হয়ে দেখছিস কেন? ছেলেরা যদি মানসিক চাপ কমাতে সিগারেট খেতে পারে, তবে মেয়েরা কেন পারবে না? মেয়েরা কি কোনো অংশে পিছিয়ে আছে নাকি? বিশ্বাস হচ্ছে না? যা, গিয়ে একটা সিগারেট নিয়ে আয়, আমি এখনই তোদের সামনে টেনে দেখাচ্ছি। টাশকি খেয়ে যাবি আমার সিগারেট টানা দেখলে... হা হা হা!'

বিকেল একাই হাসল। কিন্তু ঘরের নিস্তব্ধতা ভাঙল না। তৃপ্তি, স্বস্তি আর দীপ্র- কারো মুখেই হাসির রেখা নেই; বরং তাদের চোখেমুখে জমাটবদ্ধ বিস্ময় আর উদ্বেগ। নিজের হাসির প্রতিধ্বনি নিজেই সহ্য করতে না পেরে বিকেল থেমে গেল। সে আবার ওই পোড়া দাগটার দিকে অপলক চোখে চাইল। অবচেতন মনে আর্তনাদ করে বিড়বিড়ায়, 'তুমি আসলে আমার কে? সত্যি করে বলবে কি! তুমি কি কেবলই এক সুখময় স্বপ্ন, নাকি দহনমাখা এক নিষ্ঠুর বাস্তবতা, রোদ ভাইয়া? নাকি শুধুই রোদ্দুর?'

★★★

ক্ষিপ্র গতিতে ঝড়ের বেগে ঘরের ভেতর এসে ঢুকল সৌম্য। তার বুকটা হাপরের মতো ওঠানামা করছে, সে হাহাকার করে হাঁপাচ্ছে। ওকে দেখে মনে হচ্ছে, বাইরের ঝড়ের চেয়েও বড় কোনো প্রলয় ওর মনের ভেতর দিয়ে বয়ে গেছে। আইরিন নিজের কাজ ফেলে আতঙ্কিত হয়ে ছেলের সামনে ছুটে এলেন। বড় বড় চোখে চেয়ে রুদ্ধশ্বাসে শুধালেন, 'কী হয়েছে? এই সৌম্য! এমন করছিস কেন বাপ?'

সৌম্য মায়ের মুখের দিকে তাকাল না, কোনো উত্তর দেওয়ার মতো মানসিক অবস্থায় সে নেই। তার হাতের মুঠোয় থাকা কিছু একটা শরীরের সবটুকু শক্তি উজাড় করে দেয়ালের দিকে ছুঁড়ে মারল সে। আইরিন আর্তনাদ করে উঠলেন, 'করছিস কী! এই সৌম্য! কী হয়েছে বলবি তো মা’কে!'

দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া কাগজটা দেয়ালের সাথে সজোরে আঘাত খেয়ে মেঝেতে পড়ে রইল। আইরিন নিচু হয়ে সেটা তুলে নিতে নিতেই ব্যাকুল হয়ে শুধালেন, 'কিসের কাগজ এটা? এত রাগ কার ওপর করে আছিস? কিছুই তো বলছিস না!'

সৌম্য ধপ করে বিছানার ওপর নিজের শরীরটাকে ছেড়ে দিল। কোনোভাবেই সে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। চারপাশের সবকিছু ওলটপালট হয়ে যাচ্ছে, পৃথিবীটা যেন তার পায়ের নিচ থেকে সরে যাচ্ছে। তার পবিত্র ভালোবাসার জীবনটাকে নিয়ে ওই মেয়েটা কি স্রেফ পুতুল খেলা শুরু করেছে? হাহ!

মায়ের দিকে র'ক্তলাল চোখে তাকিয়ে এবার তীব্র আক্রোশে ফেটে পড়ল সৌম্য, 'ওর কত বড় দুঃসাহস মা... তুমি ভাবতেও পারবে না!'

'কার দুঃসাহস? খুলে বল আমায়!' আইরিনের কণ্ঠে অজানা আশঙ্কা।

'ও আমায়... ও আমায় ডিভোর্স লেটার পাঠিয়েছে মা! আমাকে ও ত্যাগ করেছে!'

আইরিনের হাত যেন অবশ হয়ে এল। হাতে ধরা সেই দুমড়ানো-মুচড়ানো কাগজটির ওপর এবার তিনি স্থির দৃষ্টি নিবদ্ধ করলেন। দলিলের ওপর বড় বড় অক্ষরে লেখা—‘তালাকনামা’। সূক্ষ্ম চোখে তিনি নামগুলো পড়লেন; একদিকে ‘সৌম্য মির্জা’, আর তার ঠিক পাশেই লেখা ‘আদিবা রহমান’।

আইরিন আর ছেলের মুখের দিকে তাকানোর সাহস পেলেন না। তার সাজানো-গোছানো সংসারটায় যেন হঠাঠ করেই এক কালবৈশাখী ঝড় এসে আছড়ে পড়ল। চোখের পলকে তছনছ হয়ে গেল সব বিশ্বাস, সব স্বপ্ন। একরাশ নিস্তব্ধতা আর হাহাকার নিয়ে আইরিন সেই কাগজের দিকে চেয়ে রইলেন, যেখানে একটি কলমের টানে দুটি জীবনের ভবিষ্যৎ চিরতরে ধূসর হয়ে গেছে।

সৌম্য স্থির থাকতে পারছে না। সর্ব অঙ্গ তিরতির করে কাঁপছে তার। রাগে, ক্ষোভে, আক্রোশে- এই মুহূর্তে চোখের সামনে পেলে ওই মেয়েকে পিষে গুড়িয়েই দিত বুঝি....উঠে এসে মায়ের হাত থেকে প্রায় টেনে কাগজটি নিয়ে নিলো। বেরিয়ে যাওয়ার জন্য উদ্যত হতেই আইরিন ওর হাত টেনে ধরে। শুধান, 'কোথায় যাচ্ছিস?'

'ওকে জ্যান্ত কবর দিতে মা।' সৌম্যর এই রূপ সম্পর্কে বড্ড অচেনা আইরিন। ছেলেকে ওই একদিনই আগ্নেয়গিরি হতে দেখেছিল, আর তারপর আজ....কি বলবেন, কি ভাবে সামলাবেন, কোনোটাই এই মুহূর্তে মাথায় আসছে না। তবে এই মুহূর্তে তাকে বাইরে না বেরোতে দেওয়াই উচিত- রাগের বশবর্তী হয়ে কি না কি করে বসে...

আইরিন ওর হাত টেনেই খাটের দিকে নিলেন। বসতে ইশারা করে বললেন, 'তুই বস তো, আমি দেখছি। তোকে কিছু করতে হবে।'

সৌম্য ধাপ করে দাঁড়িয়ে পড়ে, 'না, তুমি কেন দেখবে? এটা আমার আর ওর ব্যাপার। আমিই বুঝব।'

'আমি, তোর বড় চাচা- আমরা দেখছি তো বাপ। তুই শান্ত হ।' বলে আবার বসিয়ে দিতেই সৌম্য পুনরায় উঠে দাঁড়াল অস্থির ভাবে, 'জীবনটা আমার তো মা। আমাকে বুঝতে দাও। আমি তো ওকে বিয়ের জন্য চাপ দেইনি, ও দিয়েছিল। ওর মনে চেয়েছিল আমার জীবনে আসবে, এসেছে, আর আজ মনে চাইছে আমাকে সরিয়ে দেবে- ব্যস ডিভোর্স পেপার পাঠিয়ে দিলো? এটা কি একটা খেলা? যা খুশি তাই করা যায়?'

আইরিন অপলক চোখে সৌম্যর বিধ্বস্ত মুখটার দিকে চেয়ে রইলেন। বুকের ভেতরটা হাহাকার করে উঠল তার। এই তো তার ছেলে- বড্ড নরম মনের, বড্ড সহজ-সরল আর বোকা কিসিমের একটা মানুষ। অথচ এই সরল জীবনের গল্পেই বিধাতা কেন যে এত জটিল এক চরিত্রকে পাঠালেন, তা আইরিনের বোধগম্য নয়। সৌম্যর হৃদয়টা যে কাঁচের মতো ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে, তা তার চোখের কোণ দেখলেই বোঝা যায়। বিধাতা কি দেখছেন না এই হাহাকার? তবে কেন এমন হতে দিচ্ছেন?

ছেলের এই যন্ত্রণাবিদ্ধ চোখের দিকে বেশিক্ষণ চেয়ে থাকার শক্তি আইরিনের নেই। তিনি নিঃশব্দে সরে দাঁড়ালেন। সৌম্যও আর এক মুহূর্ত সেখানে স্থির থাকল না; ধপধপ পা ফেলে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল সে।

ছেলের চলে যাওয়ার পথের দিকে চেয়ে আইরিন চোখের কোণে আঁচল টানলেন। হুট করেই মানুষটার কথা বড্ড মনে পড়ছে আজ। মানুষটা চলে গিয়ে তাদের শুধু শারীরিকভাবেই একা করে দিয়ে যাননি, মানসিকভাবেও এক বিশাল শূন্যতায় ফেলে গেছেন। আজ যদি তিনি পাশে থাকতেন, তবে অন্তত আইরিন তার কাঁধে মাথা রেখে একটু কাঁদতে পারতেন, এই অসহ্য ভার কিছুটা হলেও ভাগ করে নিতে পারতেন। কিন্তু আজ চারপাশটা বড্ড নিঝুম, বড্ড একাকীত্বে ডোবা।

★★★

'কে, কে সিগারেট খাওয়া ধরেছে, শুনি?'

বিকেলের বুকের ভেতরটা যেন হঠাৎ করেই এক প্রবল ধাক্কা খেল। পরিচিত গম্ভীর কণ্ঠস্বরটা কানে আসতেই সে দরজার দিকে তাকাল এবং স্তম্ভিত হয়ে গেল। রোদ্দুর! সে তবে বাড়িতেই আছে! এবার বিকেলের মনে আর কোনো দ্বিধা রইল না; গতরাতের প্রতিটি মুহূর্ত কোনো রঙিন স্বপ্ন ছিল না, কোনো মরীচিকা ছিল না- ছিল ধ্রুব বাস্তব।

বিকেল দ্রুত একটা ছোট দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করে। তার মন বলছে, এই মানুষটার সামনে বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা ঠিক হবে না। কেমন যেন বুকের বাম পাশটা চিনচিন করে ওঠছে, অবাধ্য এক ব্যথা দানা বাঁধছে। নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছে সে; এক মুহূর্তের জন্যও রোদ্দুরের ওপর থেকে নজর সরিয়ে নেওয়া যাচ্ছে না।

দু’দিনের নিখোঁজ সংবাদ কাটিয়ে ফিরে আসা এই মানুষটা কি তবে আরও বেশি সুন্দর আর সুদর্শন হয়ে উঠেছে? বিকেলের চোখে ধরা পড়ল রোদ্দুরের তীক্ষ্ণ অবয়ব। চুলগুলো নিখুঁতভাবে ট্রিম করা, চাপ দাড়িগুলো যেন আরও ঘন আর কালো হয়ে উঠেছে। গতকালই খুব কাছ থেকে রোদ্দুরের দাড়ির একটু ওপরে ডান দিকের সেই ছোট্ট তিলটা প্রথম দেখেছিল বিকেল- যখন তাদের মাঝখানের দূরত্বটুকু এক হাতেরও কম ছিল!

আজ রোদ্দুরের পরনে একটি বেবি পিংক জ্যাকেট। গোলাপি রঙের সাজপোশাকে যে একজন পুরুষকে এতটা চমৎকার আর পুরুষালি দেখাতে পারে, তা এই বান্দাকে না দেখলে কোনোদিন বিশ্বাসই হতো না বিকেলের। রোদ্দুর এক অচেনা মোহমায়ায় আচ্ছন্ন করে রেখেছে চারপাশটা যেন। চোখ কিংবা মন- দুটোই হাতের নাগালের বাইরে...বহু কষ্টে নিজেকে সামলে সুমলে নত হয় বিকেল। তড়িঘড়ি লাগায়, 'আমি ফ্রেশ হতে যাই।'

'এই দাঁড়া!' রোদ্দুর গম্ভীর মুখে আদেশ স্বরুপ বলে উঠতেই বিকেলকে বাধ্য হয়ে দাঁড়াতেই হলো। তবে সে তাকাল না। কিছুতেই না। প্রাণপণে নজর এঁটে রাখল টাইলসের দিকে। যেন এরচেয়ে মনোমুগ্ধকর কোনো দৃশ্য এই মুহূর্তে হতেই পারে না। তাই তো, রোদ্দুরের ঠোঁটের কোণ বেয়ে নেমে আসা এক চিলতে হাসি চোখ এড়িয়ে গেল মেয়েটার।

কাচা ঘুম ভাঙা এলোমেলো চুল আর আলুথালু সাজপোশাকে কি প্রিটিই না লাগছে মেয়েটিকে...একদম যেন বারবি ডল, মুখখানির উজ্জ্বলতা অন্যান্য সময়ের চাইতেও বেশি! ওই বাসী মুখেই একটা কিস ছুঁড়ে দিতে ইচ্ছে করল রোদ্দুরের, ভীষণ, ভীষণ... তবে সে নিজেকে সামলাতে জানে। আশেপাশে আরও তিন তিনটে প্রাণ ওর দিকে দ্বিধাদ্বন্দ্ব নিয়ে চেয়ে..তাই নিজেকে খোলসে মুড়িয়ে নিয়ে পুনরায় জানতে চাইল, 'কি রে, বলছিস না কেন কেউ? কে সিগারেট খাওয়া শুরু করেছে, শুনি!'

তৃপ্তি বলতে চাইল, 'কেউ না।'

তার আগেই স্বস্তি বলে ফেলল, 'বিকেল আপু।'

বলেই দাঁত দিয়ে জিভ কাটল সে। একই সঙ্গে পায়ের উপর পাড়াও খেল একটা। দীপ্র দিয়েছে। স্বস্তি চোখের ইশারায় সরি জানাল। ভুলে মুখ ফসকে বেরিয়ে গেছে আসল কথাটা...

বিকেলের মনে হলো, মাটি ফাঁক হয়ে গেলে ও ঢুকে যায়। এটা নিয়ে এখন আবার নতুন কোন সিনেমা শুরু হয়, কে জানে। তবে মনে মনে প্রস্তুত ও রইল। সিনেমা হলে হোক- সেও দেখে নেবে এক চোট!

কাকে বাঁচাতে এই মিথ্যে উগড়েছে ওদের সামনে, তা কি ওই বাছাধন জানে না?

রোদ্দুরের পেট ফেটে হাসি বেরিয়ে আসতে চাইল।

কি ভীষণ ইনোসেন্ট হু! দোষ ঢাকার আর বাহানা খুঁজে পেল না। কি লেইম একটা এক্সকিউজ তুলেছে এদের সামনে আর এরাও সব ক'টা গর্দভের দল, ওটাকেই মনে-প্রাণে বিশ্বাস করে নিয়েছে!

জিন্সের পকেটে দু'হাত ঢুকিয়ে একটু কায়দা করেই দাঁড়াল ছেলেটা। বিকেলের নত জানু মুখটির দিকে লম্বা দৃষ্টি ফেলে শুধাল, 'কিরে, তুই সিগারেট খাওয়া ধরেছিস, কই আমাকে তো কোনোদিন বললি না? বললে দু'ভাই-বোনে একসঙ্গে সিগারেট টানতে পারতাম...আমিও একা একা খেয়ে আর আরাম পাই না রে।'

বিকেল মাথা তুলে চাইল, ক্যাবলার মতো দাঁত গুলি বের করে একটা হাসি দেওয়ার চেষ্টা করে বলল, 'আসলে রোদ ভাইয়া...হয়েছে কি....'

'তুই বড় হয়ে গেছিস, লুকিয়ে অনেক কিছু করতে শিখে গেছিস। তাই তো?' কথা টেনে নিয়ে রোদ্দুর বলতেই বিকেল থম ধরল, 'না, আমি কি সেটা বলেছি?' মনে মনে দাঁত কিড়মিড় করল ও। শালা হাড়বজ্জাত ছেলে!! নিজে সিগারেট খেয়ে ছাই ফেলে আমার বিছানার চাদর পুড়ানো- আর এখন আমাকেই জাজ করা! তোর জাজ করা আমি ছুটাচ্ছি...দেখ না!

মুখে বলল, 'আজকাল সিগারেট খাওয়া একটা ফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছে একচুয়ালি। আর আমি তো অত তামাক ওয়ালা সিগারেট টানি না। যেটা খাওয়া শিখেছি, ওটা অনেকটাই সেইফ। মেয়েদের সিগারেটই বলে ওটাকে। এসব শিখতে হয়। দেশের বাইরে এসবের অনেক চল...ওখানে চলতে গেলে আমাকেও ওদের মতোই মেইনটেইন করা শিখতে হবে না?'

'তুই দেশের বাইরে যাবি?' ভ্রু কুঁচকে গেল রোদ্দুরের, 'কেন? কবে?'

বিকেল ঠোঁটের হাসি চওড়া করে, 'যাবোই তো...' লজ্জা লজ্জা ভাব করে শুধায়, 'আগে ভেবেছিলাম পড়াশোনার জন্য যাব। বাট এখন ভাবছি...' আরও লজ্জা টেনে এনে গালে - নাকে বসালো, ঢংয়ী গলায় বলল, 'স্পাউস ভিসায় যাব। বাপি তো এমনিতেও আমাকে বিয়ে দিতে চায়। সো আমিও ভেবেছি, বাহিরের কাউকেই বিয়ে করব৷ ইউ নো...রিচ ড্যুড, মানি পাওয়ার, ল্যাভিশিং লাইফ....উফফফফ!'

কথাগুলো স্রেফ জ্বালানোর জন্য বলা।

ফলাফল হলোও তাই। রোদ্দুরের বুকের ভেতরটা কেউ কাচি দিয়ে গুতিয়ে র:ক্তাক্ত করে তুলল মুহূর্তেই। চোখের সামনে ভেসে ওঠল, অন্য কেউ বিকেলের ওই নরম তুলতুলে মাখনের মতো হাতখানা শক্ত করে চেপে ধরে আছে। দু'জনে হাঁটছে সমুদ্রের পাড়ে....উফ, কি যন্ত্রণা, কি অসহ্য ব্যথা!

এগিয়ে এসে ওকে চেপে ধরতে চাইল রোদ্দুর, ছটফট করে উঠল, কিন্তু ভুলে গেল না এখানে সে আর বিকেল- একলা নয়; চোখ ঘুরিয়ে বাকি সবার দিকেও চাইল। সকলেই বিস্ময় নিয়ে বিকেলকে দেখছে। মেয়েটার মাঝে মাঝে যে কি হয়, এই ভালো তো এই পাগল পাগল কথা- ভাবছে সবাই!

রোদ্দুর আড়ালে গরম চোখে ওর দিকে উষ্মা মিশ্রিত দৃষ্টি ছুঁড়ে দিলো। দেখে নিলো বিকেল, হাসি লম্বা করে তীব্র কটাক্ষ ছুঁড়ে দিলো বিনিময়ে।

গলা খাঁকড়ে ওঠে রোদ্দুর, 'দেখছিস তৃপ্তি, তোরা আসলেই জন্মের বোকা! মেয়ে হলে ওর মতো হ। ওর একটাই aim in life - বড়লোক রিচ কিড বিয়ে করে সেটেল্ড হওয়া। আর তোরা কি গণ্ডমূর্খের মতো বইয়ের খাতায় মুখ গুঁজে দিনরাত পড়ে থাকিস, ছিঃ!'

সঙ্গে সঙ্গে মুখটা ভোঁতা করে বলল বিকেল, 'মজা নিচ্ছো রোদ ভাইয়া? নাও নাও! শোনো, আমি কোথাও একটা পড়েছিলাম, বিয়ের পর কান্নাকাটিই করতে হবে। সাংসারিক লাইফের নানান প্যারা, কোনো সীমা-পরিসীমা নেই নাকি। তো কাঁদবোই যখন, বাংলাদেশে বসে কাঁদা আর আমেরিকা বসে কাঁদা- দুটোই বিস্তর ফারাক না?'

'উরি বাপরে বাপ...তুই দেখি ইন ডিটেইলে বহুদূর চলে গেছিস!' রোদ্দুর অবাক হওয়ার চূড়ান্ত ভান করল, 'আসলেই তো, আমিও এভাবে কোনোদিন ভাবিনি। তাহলে আমাকেও একটা ফরেইন মেয়ে বিয়ে করা উচিত, কি বলিস?'

'করো গে...কে মানা করছে?' মুখটা লটকে গেল বিকেলের, ভেংচি কাটল আড়ালে, 'বড় বাবা তো এমনিতেও তোমাকে এড়ে গেড়ে কারো সাথে বিয়ে দেবে না। দিলে রিচ দেখেই দিবে।'

'না না, আমি সুগার মাম্মি চাই না, রিচ চাই তবে অনেক প্রিটি একটা মেয়েকে আমার লাইফে চাই।'

'প্রিটি না পেত্নী..অতি সুন্দর ছেলেদের কপালে পেত্নী জোটে...হুহ!' মনে মনে বললেও মুখে হাসল বিকেল, একটা থাম্বস আপ সাইন দেখাল হাত তুলে, 'বেস্ট অফ লাক ফর ইউর প্রিটি লিটেইল বেইবি...'

মেজাজটাকে টুট টুট করে দিয়েছে এই মেয়ে...

কি গা ছাড়া ভাব! যেন রোদ্দুর অন্য কোথাও বিয়ে করে নিলে তার বিন্দুমাত্র যায় আসে না...হাহ! আর এর জন্য কেঁদে কেঁদে হয়রান হয় এই পাষাণ হৃদয়!

ইচ্ছে করছে গলা ছেড়ে গান ধরে ও, 'মাইয়া ও মাইয়ারে, তুই অপরাধী রে..

আমার যত্নে গড়া ভালোবাসা দে ফিরাইয়া দে...'

তৃপ্তির দিকে তাকাল রোদ্দুর, বলে উঠল, 'নে, তুইও বইখাতায় আগুন দিয়ে দে। একটা তো গেছে ওই লাইনে, তুইও চলে যা। সব গুলো রিচ ড্যুড খুঁজে বিয়ে শাদি করে এই মির্জা পরিবারকে মুক্ত কর...'

তৃপ্তি হাসল, 'তোমাদের এই আজাইরা ক্যাচালে আমরা নেই, একদম নেই। এই চল তো সবাই...পেটে ইঁদুর দৌড়াচ্ছে। নাশতা না করলে চলছেই না এখন...চল,চল।'

স্বস্তি, দীপ্র দু'জনকে নিয়েই বেরিয়ে পড়ল তৃপ্তি। রোদ্দুর খুশি হলো। যাক, একা পাওয়া গেছে শেষ পর্যন্ত, এবার দেখে নেবে, কত হাত কলিজা বেড়েছে এই মেয়ের...তার সামনে দাঁড়িয়ে বিয়ের ঘটকালি শোনায়!

পেছন ঘুরে বিকেল ডাকতেই দেখে কেউ নেই, হাওয়া বিকেল! রোদ্দুর ছুটে বাথরুমের কাছে আসলো, দরজায় সিংহের ন্যায় থাবা দিয়ে বলে ওঠে, 'এই বেয়াদব, বের হ, দরজা আঁটকেছিস কেন ভয়ে এখন? ম্যারিড লাইফের বিবরণ শুনব আমি। কাকে বিয়ে করা উচিত, কেমন বিস্তারিত সব শুনব এখন। বের হ, কুইক!'

ওপাশ থেকে ভেংচে ভেংচে প্রত্যুত্তর করে মেয়েটা, 'কেন? আমার কাছে কি? যাও না যাও, তোমার ওই রিচ প্রিটি লিটেইল বেইবির কাছেই যাও। তার থেকে শুনে নাও। আমি এই দরজা খুলব না।'

'না খুললে ভেঙে ফেলব আমি।'

'ফেলো। তবুও আমি খুলব না।'

'বিকেইইইইল!'

'খুলবোই নাআয়ায়া....'

তারপর গলা ছেড়ে গানের সুর ধরে,

'you can ask whatever,

i will sit here for hours,

Telling all the কাউয়া বার্ড,

Also the গুউউউ বার্ড;

প্রিটি লিটেইল পেত্নীইইইইই,

আ'ম সো ইন হেইট উইথ ইউউউউউউউউ উউউউউউ উউউউউউ....'

রোদ্দুর হেসে কুটিকুটি হলো।

পেত্নী পেত্নী করছে... অথচ জানেই না, নিজেই নিজেকে পেত্নী হিসেবে আখ্যায়িত করছে এই মেয়ে! ইশ....

(চলবে)

________

যেহেতু ধর্ম নিয়ে অনেক কথা উঠছিল, তাই আসিফ-আদিবার বিয়ের পার্ট টুকু কে অন্য ভাবে গোছাবো। এই পর্বটা নতুন করে লিখে দেওয়া হলো।

★যারা পড়বেন, সকলের রেসপন্স কাম্য।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৬তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন