#প্রেমের_নির্বাসন - (২৩)
লেখনীতে - #মৃধা_মৌনি
___________
(বর্তমান)
পরদিন সকাল। তুষারধবল আলোয় ঘর ভরে গেছে বিকেলের। জানালার ওপাশে আকাশ থেকে ঝরে পড়ছে পেঁজা তুলোর মতো মিহি তুষারকণা। ঘড়ির কাঁটা আটটার ঘরে স্থির। শরীরের ওপর এক অদ্ভুত আলস্য আর ভারী ভাব, গতরাতের স্মৃতির দহন নাকি হাড়কাঁপানো এই শৈত্যপ্রবাহ, ঠিক বুঝে ওঠা দায়।
ভারী উলের কোট আর ধূসর মাফলার গলায় জড়িয়ে লিভিং রুমে এসে দাঁড়াল বিকেল। সোফায় অগোছালো পড়ে আছে জুলিয়ান। লালচে অবিন্যস্ত চুলগুলো কপাল ছুঁয়ে আছে ওর, ঠোঁটের কোণে সেই পরিচিত ফিচেল হাসির রেশ, দেখে মনে হয় ঘুমের ঘোরেও কোনো দুষ্টুমিতে মগ্ন ছেলেটা। আইরিশ এই ছেলেটা স্থাপত্যবিদ্যার পাঠ নিতে এ দেশে এলেও বিকেলের নির্লিপ্ত চাউনি আর রহস্যময় চোখের অতলেই ওর আগ্রহ বেশি। স্থাপত্যের নকশার চেয়ে বিকেলের মনের মানচিত্র খুঁড়তেই ওর যত আনন্দ।
বিকেল নিঃশব্দে কফি মেকারটা অন করল। জুলিয়ানের এই গায়ে-পড়া উপস্থিতি এখন ওর কাছে এক ধরনের অস্বস্তিকর অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। ঘরের নিস্তব্ধতা ভেঙে কফি মেকারের ঘড়ঘড় শব্দ ওঠে। জানালার বাইরে ধূসর আকাশ। সেদিকে তাকিয়ে অন্যমনস্ক হয় ও।
দরজা খুলে বাইরে পা রাখতেই কনকনে হাওয়া চাবুকের মতো আছড়ে পড়ল মুখে। সেন্ট মেরি’স চার্চের পথটা আজ বড্ড অচেনা লাগছে। দুপাশের পাইন গাছগুলো বরফের ভারে কুঁজো হয়ে দাঁড়িয়ে আছে মূর্তির মতো। ধবধবে সাদা এই পথে বিকেলের বুট জুতোর মচমচ শব্দ ছাড়া আর কোনো প্রাণের স্পন্দন নেই।
পনেরো মিনিটের নিরবচ্ছিন্ন হাঁটা শেষে দৃশ্যমান হলো চার্চের সেই প্রাচীন গথিক মিনার। পাথুরে দেয়ালে বরফ আর শ্যাওলার মিতালী। ভেতরে ঢুকতেই নাকে এল ওল্ড চার্চের সেই বিশেষ ঘ্রাণ, মোম আর শতাব্দী প্রাচীন কাঠের মিশেল। কোনো ক্লাস নেই আজ, নেই শিশুদের কোলাহল। হলঘরের এক কোণে সিস্টার আগাথাকে দেখা যাচ্ছে। শুভ্র পোশাকে ঢাকা বৃদ্ধার মুখাবয়বে বছরের পর বছর ধরে জমা হওয়া প্রশান্তি।
বিকেল এগিয়ে গেল। সিস্টার আগাথা মৃদু হেসে চাইলেন ওর দিকে।
'ঈশ্বর তোমার মঙ্গল করুন। এই বরফ ঠেলে আসার কী খুব প্রয়োজন ছিল?'
জবাবে ম্লান হাসল বিকেল, 'অফিসিয়াল কিছু কাজ আছে সিস্টার। আর... পেয়িং গেস্টের ব্যাপারে একটু আলাপ ছিল আপনার সাথে।'
সিস্টার ওর চোখের ভাষা পড়তে চাইলেন। শান্ত গলায় বললেন, 'চলো, আমার অফিসে বসে কথা বলি।'
সিস্টার আগাথার ছোট অফিস ঘরটি পাইন কাঠের সুবাসে আমোদিত। টেবিলের ওপর রাখা বাইবেল আর একগুচ্ছ শুকনো ল্যাভেন্ডার। জানালার বাইরে তুষারাবৃত গোরস্থানটা ধূসর মলাটের কোনো বিষণ্ন ছবির মতো স্থির হয়ে আছে। সিস্টার আগাথা তামাটে রঙের একটা সিরামিক কাপে গরম পানীয় এগিয়ে দিলেন বিকেলের দিকে।
'জুলিয়ানের ওপর তুমি বড্ড ত্যক্ত, তাই না বার্বি?' সিস্টারের কণ্ঠে মায়ার প্রলেপ।
বিকেল চায়ের কাপে চুমুক না দিয়ে জানালার ওপাশে তাকিয়ে রইল। স্বরে ঝরে পড়ল এক ধরণের ক্লান্তিকর বিরক্তি, 'সিস্টার, জুলিয়ান ছেলেটা খারাপ নয়, কিন্তু ওর একরোখা স্বভাবটা আমার নিঃশ্বাস বন্ধ করে দিতে যথেষ্ট। আমি ওকে স্পষ্ট বলেছি আমি বিবাহিত। অথচ ও সেটাকে একটা সস্তা নাটক মনে করে। ওর চোখের চাউনিতে যে গায়ে-পড়া অধিকারবোধ দেখি, তা আমাকে প্রতিনিয়ত দহন করে। ও মনে করে আমার একাকীত্ব মানেই আমি কারো জন্য অপেক্ষা করছি, যে আর ফিরে আসবে না। আমার ঘরের পবিত্রতা, আমার নিভৃত স্মৃতিগুলোকে ও ওর চটুল আলাপ আর ফিচেল হাসি দিয়ে প্রতিদিন কলুষিত করছে। আমি এমন একজন পেয়িং গেস্ট চাই সিস্টার, যে দেয়ালের ওপাশে থেকেও অদৃশ্য থাকবে। যার কোলাহল আমার নির্জনতাকে ক্ষতবিক্ষত করবে না।'
সিস্টার আগাথা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। টেবিলের ওপর রাখা বিকেলের ফ্যাকাশে হাতটার ওপর নিজের কুঁচকানো হাতটা রাখলেন তিনি। পরম মমতায় বললেন, 'এভাবে আর কতদিন বার্বি? বয়স তো কম হলো না। তুষারপাতের এই দেশে একাকীত্ব খুব ভয়ংকর ব্যধি। তোমার এখন সেটেল্ড হওয়া প্রয়োজন। জীবনটা তো বয়ে যাওয়ার জন্য, থমকে থাকার জন্য নয়।'
বিকেল সিস্টারের চোখের দিকে চাইল। চোখের কোণে খেলা করছে ধ্রুবজ্যোতি। জলহীন স্বরে দৃঢ়ভাবে শুধাল, 'সেটেল্ড বলতে আপনি কী বোঝাতে চাইছেন সিস্টার? আবার কারো ঘরনি হওয়া? আবার নতুন করে কাউকে চেনা? আমার জীবনে তো ভালোবাসা আছেই। সে হয়তো কয়েক হাজার কিলোমিটার দূরে, হয়তো এক অন্ধকার কুঠুরিতে অথবা কোনো অচিন দেশে- কিন্তু সে তো আছে। আমার তো এক মুহূর্তের জন্যও মনে হয় না আমি একা।'
একটু থেমে বুক ভরে শ্বাস টানে বিকেল। পুনরায় আওড়ে চলে, 'ভালোবাসা কি কেবল শরীরী উপস্থিতি সিস্টার? মানুষটা একদিন আমায় বলেছিল, ‘মন থেকে কাউকে ভালোবাসলে সে কোনোদিন দূরে সরে যায় না, তখন নিঃশ্বাসে মিশে থাকে।’ বিশ্বাস করুন, এই হাড়কাঁপানো শীতে যখন আমি একা বিছানায় শুই, আমি ওর গায়ের ঘ্রাণ পাই। যখন খুব বিপদে পড়ি, মনে হয় কেউ একজন অদৃশ্য থেকে আমার মাথায় হাত রাখল। আট বছর সাত মাস আঠারো দিন ধরে আমি ওকে ছাড়া এক মুহূর্তও কাটাইনি। ও আমার রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে আছে। যে মানুষটা আমার আত্মায় মিশে আছে, তাকে ছাড়া আমি অন্য কাউকে নিজের জীবনে জায়গা দেব কীভাবে? ওটাই তো আমার একমাত্র ধ্রুবতারা।'
বিকেলের কথাগুলো ঘরের দেয়ালের গায়ে প্রতিধ্বনিত হয়। সিস্টার আগাথা অবাক হয়ে এই তরুণীর অটল বিশ্বাসের দিকে তাকিয়ে রইলেন। এই বস্তুবাদী পৃথিবীতে এমন আদিম আর বিশুদ্ধ প্রেম বিরল। সিস্টারের চোখে এক ফোঁটা জল চিকচিক করে ওঠে সহসা। তিনি উঠে এসে বিকেলের মাথায় পরম স্নেহে হাত বুলালেন।
'তোমার বিশ্বাস বড় অটল বার্বি। এমন ভালোবাসা মানুষ আজীবন খুঁজেও পায় না, যা তুমি বয়ে বেড়াচ্ছ। আমি তোমার জন্য প্রার্থনা করব। আমার ঈশ্বর তোমার সহায় হোন। তোমার প্রতীক্ষার অবসান হোক, অথবা এই প্রতীক্ষাই যেন তোমাকে পরম শান্তি দেয়।'
বিকেল চোখ বুঁজে আশীর্বাদ গ্রহণ করে। ওর মনে হলো, কয়েক হাজার মাইল দূর থেকে ঠিক এই মুহূর্তেই কেউ একজন ওর কপালে সেই পুরনো উষ্ণ চুমুটি এঁকে দিল চুপেচাপে।
সেন্ট মেরি’স চার্চের নিস্তব্ধ ঘরটিতে আবেগের পারদ যখন তুঙ্গে, ঠিক তখনই দরজায় সজোরে করাঘাত পড়ে। অস্থির পায়ে ভেতরে ঢুকলেন তরুণী সিস্টার ক্লারা। হাঁপাচ্ছেন তিনি, চোখেমুখে তার তীব্র আতঙ্কের ছাপ।
'সিস্টার আগাথা! জলদি আসুন... চার্চের সামনের পাইন বনে... সর্বনাশ হয়ে গেছে!'
কথাটা শেষ হতে না হতেই সিস্টার আগাথা আর বিকেল দুজনেই প্রায় দৌড়ে বাইরে বেরিয়ে পড়ে। কনকনে ঠান্ডার ঝাপটা উপেক্ষা করে তারা যখন পাইন বনের ছায়ায় পৌঁছে, বিকেলের হৃৎপিণ্ড এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল যেন। সাদা তুষারের ওপর পড়ে আছে ছোট্ট একটা প্রাণ।
ঈষৎ শ্যামবর্ণের একটি শিশু, বয়স বড়জোর চার কি পাঁচ। এই হাড়কাঁপানো তুষারপাতের মধ্যে তার গায়ে শুধু একটা জীর্ণ পাতলা সোয়েটার। শিশুটির টানা টানা বড় বড় চোখ দুটো ভয়ে পাথর হয়ে গেছে। কাঁপছে থরথর করে, ঠোঁট দুটো নীল হয়ে আসায় কোনো শব্দ বেরোচ্ছে না গলা দিয়ে। কে বা কারা এই নিষ্ঠুর পৃথিবীর বুকে এমন দেবশিশুকে মৃত্যুর মুখে ফেলে রেখে গেছে, তার উত্তর কেবল ওই ধূসর আকাশটাই জানে।
বিকেল আর এক মুহূর্ত দেরি করল না। নিজের গায়ের দামী উলের কোটটা খুলে পরম মমতায় জড়িয়ে নিল বাচ্চাটিকে। উষ্ণ বুকের কাছে চেপে ধরতেই বাচ্চাটা বিড়বিড় করে এক অবোধ্য শব্দ করল। বিকেলের দু’চোখ ভেঙে জল নেমে আসে সঙ্গে সঙ্গে। হৃদয় বাড়ি সিক্ত হয় হঠাৎ করেই।
সিস্টার আগাথা বাচ্চাটিকে ভেতরে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন, বিকেল হঠাৎ-ই তাঁর হাতটা শক্ত করে ধরল। কম্পিত কণ্ঠে শুধাল,
'সিস্টার, আপনি সবসময় বলতেন না আমায় কিছু একটা উপহার দিতে চান? আজ যদি আমি নিজের জন্য কিছু চেয়ে নেই, আপনি কি খুব রাগ করবেন?'
সিস্টার আগাথা অবাক হয়ে বিকেলের অশ্রুসিক্ত মুখের দিকে তাকালেন। তিনি নিঃশব্দে মাথা নাড়লেন- না, তিনি রাগ করবেন না।
বিকেল বাচ্চাটির কপালে নিজের মুখটা ঠেকিয়ে ধীর স্বরে বলল, 'আমি এই শিশুটির দায়িত্ব নিতে চাই সিস্টার। ওর ভরণ-পোষণ, ওর ভবিষ্যৎ—সব। ও আজ থেকে আমার পরিচয়ে বড় হবে। ও আমার একাকীত্বের ঘরে এক পশলা প্রাণ হয়ে থাকবে।'
সিস্টার আগাথা যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারলেন না। এক মুহূর্ত আগেও যে মেয়েটি এক অদৃশ্য মানুষের অপেক্ষায় নিজেকে গুটিয়ে রেখেছিল, সে আজ এক অচেনা শিশুর মা হওয়ার দায় নিতে চাইছে! সিস্টার বিস্ময়ভরা কণ্ঠে শুধালেন, 'তুমি কি নিশ্চিত বার্বি? এটা কিন্তু অনেক বড় এক জীবনযুদ্ধ।'
বিকেল বাচ্চাটির গাল ছুঁয়ে ম্লান হাসল।
'আমি প্রস্তুত সিস্টার। আমি ওর নাম রাখব শ্যামাঙ্গিনী। সংক্ষেপে ডাকব শ্যামা।'
সিস্টার আগাথা ভ্রু কুঁচকালেন। বিদেশি এই নামটির উচ্চারণ আর গাম্ভীর্য তাঁর কাছে একেবারেই অচেনা। তিনি দ্বিধাভরে জানতে চাইলেন, 'শ্যামাঙ্গিনী? এই নামের অর্থ কী বার্বি? বড্ড অদ্ভুত শোনাচ্ছে যে!'
ছোট্ট দেবশিশুটির ঘন পাপড়িদ্বয় যেন এক বিষণ্ণ সন্ধ্যে নামায়। সেদিকে নির্নিমেষ চেয়ে থেকে বলে ওঠে ও,
'It means ‘The Dark Beauty’ or ‘The Golden Dusky One’, Sister. In my language, it describes someone with the complexion of a beautiful late afternoon or a dark cloud that brings rain to a thirsty land. It represents the elegance of the night and the strength of the earth.'
সিস্টার আগাথা মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনলেন। নামের ব্যাখ্যাটা যেন এই শিশুটির শান্ত চোখের চাউনির সাথে মিলেমিশে এক হয়ে গেল। তিনি বিকেলের কাঁধে হাত রেখে বললেন, 'তবে তাই হোক। ঈশ্বর হয়তো এই পাইন বনের তুষারেই তোমার জীবনের নতুন বসন্ত লিখে রেখেছিলেন। আজ থেকে ও তোমারই — শ্যামাঙ্গিনী।'
বিকেল বাচ্চাটিকে বুকে জড়িয়ে চার্চের ভেতরে হাঁটতে শুরু করল। ওর মনে হলো অদৃশ্য মানুষটি দূর থেকে হাসছে আর বলছে, 'তুই পেরছিস বিকেল, তুই ভালোবাসাকে ছড়িয়ে দিতে পেরেছিস।'
শ্যামার কচি হাতের স্পর্শ বিকেলের গলার মাফলারে আটকে থাকতেই, চার্চের ধূপ সোঁদা গন্ধ আর তুষারপাতের ঝাপসা দৃশ্যটা হঠাৎ মিলিয়ে গেল। চারপাশটা যেন দ্রুত পাল্টে যেতে শুরু করে। বরফের শীতলতা হারিয়ে গিয়ে সেখানে জেঁকে বসল এক মায়াবী ওঁম।
স্মৃতিপট বদলে গিয়ে উন্মুক্ত হলো অতীতের সেই সোনালি জলরঙা পাতা...
(অতীত)
চারপাশে মাইলের পর মাইল বিস্তৃত সবুজ ঘাসের গালিচা। মাথার ওপর অসীম নীল আকাশটা আজ বড্ড নিচু হয়ে এসেছে যেন। পড়ন্ত বিকেলের সূর্যটা টকটকে লাল আভা ছড়িয়ে দিগন্তে বিলীন হওয়ার অপেক্ষায়। সেই মায়াবী আলোয় চারপাশটা দেখতে অপার্থিব...স্নিগ্ধ - কোমল!
বিকেল শুয়ে আছে রোদ্দুরের চওড়া বুকের ওপর। কান পাতলেই শোনা যাচ্ছে তার পরিচিত হৃদস্পন্দন— যা বিকেলের গোটা পৃথিবীটা নিয়ন্ত্রণ করে। ঘাসের সতেজ ঘ্রাণ আর রোদ্দুরের শরীরের আদিম নেশা ধরানো সুবাস মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। আকাশের বুক চিরে একঝাঁক পাখি উড়ে যাচ্ছিল ঘরের টানে, সেদিকে অনিমেষ চোখে চেয়ে বিকেলের মনে হয়, সময়টা যদি ঠিক এই বিন্দুতেই থমকে যেত! বেশ হতো!
ওর চুল গুলো অবাধ্য কিশোরীর ন্যায় উড়ছে। আবার আছড়ে পড়ছে প্রেমিকের চোখে-মুখে। বেশ লাগছে রোদ্দুরের। প্রেমময় ভাব- রোদ্দুর সহসা আঙুল চালিয়ে দিলো বিলির ভাঁজে। গাঢ় গলায় ডাকল, 'বিকেইইইইল, কি ভাবছিস?'
বিকেল ধ্যানমগ্ন ছিল। রোদ্দুরের ডাকে উঠে বসল ঝটপট। তার দিকে ফিরে চেয়ে গালে এক হাত চেপে ধরে শুধাল, 'ভাবছি....তুমি কেমন করে এলে...আমার জীবনে?'
রোদ্দুর ও নড়ে পাশ ফিরে। এক হাতে মাথাটা ভর রেখে দাঁত বের করে হাসল। বলে, 'পা পিছলে চলে এসেছি।'
'তাই?'
'তাই তো! নাহয় তোর মতো পাগলের সাথে থাকে কে!'
ভেবেছিল রেগে যাবে মেয়েটা, কিন্তু না,
ভাবুক গলায় বলল উলটো, 'তা ঠিক! আমার মতো লাগামছাড়া ঘোড়ায় দড়ি টানা- সবার কম্ম নয়!'
'তার মানে আমার অনেক ট্যালেন্ট, বলছিস?'
মানুষটার ঝিলিক দেওয়া চোখ দুটিতে তাকিয়ে বিকেল সম্মতি প্রদান করে, 'বলছি।'
পরমুহূর্তেই আবার ভাবনায় ডুবে পড়ে।
রোদ্দুর বুঝতে পারে না বলেও। ছেলেটা যে এমনই, কিছু প্রকাশ করতে হয় না। তার আগেই সব পড়ে ফেলে। কীভাবে, কোন জাদুতে, কে জানে!
হ্যাঁচকা টানে নিজেকে সরিয়ে মাথাটা ছেড়ে দেয় বিকেলের কোলের ভেতর। চমকায় বিকেল, কেঁপে ওঠে ঈষৎ। তারপর হাসে মৃদু। এক হাতে পাগলটার সিল্কি চুলে হাত বোলাতে থাকে।
রোদ্দুর অনুভব করে। তৃপ্তি পায়।
তারপর গাঢ় গলায় শুধালো, 'যা হবে, দেখে নেওয়া যাবে। এত চিন্তা করে হবেটা কি?'
বুকের মাঝে দোল খাচ্ছিল উত্তরের বাতাস।
হঠাৎ করেই বন্ধ হয়ে গেল এ কথায়। আকাশ জুড়ে উড়ে এলো এক দলা কালো মেঘ, এরা ঝুম বৃষ্টি নামাতে চায় না, চায় ঝড় তুলতে...
বিকেলের বুকের ভেতরটা হু হু করে উঠছে। কয়েকটা দিন মাত্র বাকি, তারপর এই মানুষটা পাড়ি দেবে সাতসমুদ্র তেরো নদীর ওপাড়ে। ভাবতেই ওর দমবন্ধ হয়ে আসে, হৃদপিণ্ডটা কেউ যেন শক্ত হাতে মুচড়ে দেয়। রোদ্দুরের মুখের উপর নিজের মুখটা নামিয়ে আনে ও। একফোঁটা জল গড়িয়ে টুপ করে পড়ে প্রিয়তমের ঠোঁটের কোণে। দেড়ি করে না রোদ্দুর। অশ্রু ফোঁটাটি শুষে নেয় সংকোচ ছাড়াই। তারপর প্রিয়তমার মনের অবস্থাটা বুঝতে পেরে বিকেলের থুতনি ধরে মুখটা আলতো করে উঁচিয়ে ধরে। ওর অশান্ত, গভীর চোখে তাকিয়ে শাসন মেশানো আদুরে গলায় বলতে থাকে,
'একদম মন খারাপ করবি না। আমি না থাকা মানে এই নয় যে আমি নেই। সাবধানে চলবি সবসময়। একা একা ওই নদীর পাড়ে বিকেলের পর আর একদম যাবি না, মনে থাকবে? আর হ্যাঁ, পড়াশোনাটা ঠিকঠাক করবি, সামনেই কিন্তু এডমিশন। সবার সাথেই হেসে খেলে কথা বলবি, কিন্তু কেউ যদি একটু বেশি স্মার্টনেস দেখাতে আসে বা উল্টাপাল্টা কথা বলে, তবে চুপ করে থাকবি না একদম। কড়া করে যোগ্য জবাবটা দিয়ে দিবি। পারবি না?'
বিকেলের দু’চোখ বেয়ে নোনা জল গড়িয়ে পড়ে স্রোতহীন ঝর্ণার ন্যায়। রোদ্দুরের কথাগুলো ওর কানে তীরের মতো এসে বিঁধে। অভিমানে ভেতরটা রি রি করে উঠল। ও ঝট করে রোদ্দুরের উপর থেকে মাথা সরিয়ে নেয়। কপালের সামনে দিয়ে পড়া একগোছা চুল কানের পেছনে সরাতে সরাতে ত্যাড়া গলায় বলে, 'না, পারব না! আমি কিছুই করব না। আমি ওই নদীর পাড়েই যাব, রাত পর্যন্ত বসে থাকব। পড়াশোনা? একদম করব না, বই ছুঁয়েও দেখব না আমি। আর কারোর সাথেও মিশব না। সারাদিন ঘরের কোণে বসে থাকব, কিচ্ছু খাব না- দেখব তুমি কী করো!'
রোদ্দুর মৃদু হাসে তাতে। আবার বিকেলকে নিজের কাছে টেনে নিতে চাইল, কিন্তু বিকেল ওর হাতটা ঠেলে সরিয়ে দেয়। উঠতে চাইলে রোদ্দুর ডেকে ওঠে, 'কেন সরাচ্ছিস? শোন পাগলি...'
'একদম পাগলি বলবে না!' বিকেলের গলায় গাঢ় অভিমান আর জেদ মাখামাখি, 'তুমি তো চলেই যাচ্ছ। যাওয়ার পর কি তোমার মনে থাকবে এই বিকেলের কথা? ওখানে গিয়ে তো সুন্দর সুন্দর সব মেয়েদের সাথে ঘুরবে, আমায় তো পাত্তাই দেবে না। যাও না, এখনই চলে যাও!'
রোদ্দুর হো হো করে হাসল এবারে। বিকেলের গাল দুটো টিপে দিয়ে বলল, 'তুই তো আস্ত একটা কার্টুন!'
পরপরই গলার স্বরে চিরচেনা মাদকতা মিশিয়ে ধীরস্থির ভাবে গভীর কণ্ঠে জানাল, 'ওই নীল আকাশটা যেমন সূর্যের আড়ালে গিয়েও হারিয়ে যায় না, আমিও তেমন তোর থেকে দূরে গিয়েও হারাব না। চোখের আড়াল হলেই মনের আড়াল হয় না। কিছু মানুষের জন্মই হয়, আরও কিছু মানুষের হৃদয়ে চুপটি করে ঘাপটি মারার জন্যে...যেমন তুই। আমার প্রতিটি নিঃশ্বাসে তুই থাকবি।'
নিজেকে আর ধরে রাখতে পারল না বিকেল। রোদ্দুরের শার্টের কলারটা খামচে ধরে ওর কাঁধে মাথা রাখল। চোখের জলে নাকের জলে একাকী করে দিয়ে রাগী স্বরে বলল, 'তুমি বড্ড খারাপ! কেন যেতে হয় তোমার? আমাকে কার কাছে রেখে যাচ্ছ তুমি?'
রোদ্দুর ওর চুলে একটা দীর্ঘ চুমু খেয়ে ফিসফিস করে শুধাল, 'তোর নিজের কাছেই তোকে রেখে যাচ্ছি সোনা। তুই বড় হবি, শক্ত হবি। মনে রাখবি, এই পৃথিবীর কেউ তোকে ছোট করতে পারবে না, যদি তুই নিজে নিজেকে ছোট না করিস।'
একটু থেমে আবার যোগ করল, 'কি? বুঝতে পারছিস?'
একরোখা গলায় প্রত্যুত্তরে বলে ওঠে মেয়েটা, 'পারছি না।'
'আবার ত্যাড়ামি!' রোদ্দুরের ভ্রু কুঁচকে যায়। এবার সে একটু শক্ত হলো। বিকেলকে নিজের থেকে সরিয়ে মুখোমুখি বসাতেই কেঁপে উঠল হৃদজমিন। এভাবে কাঁদে কেউ! এই কান্না চোখজোড়া সঙ্গে করে নিয়ে যাবে রোদ্দুর? একচিলতে হাসি কি নিতে পারবে না?
নরম হলো রোদ্দুর। মায়া জেগেছে মনে।
বিকেল ফোঁসফোঁস করছে। ফোঁপাচ্ছে। আবার রাগ দেখিয়ে কান্না আঁটকানোর চেষ্টা করে বেশি জোরে কেঁদে ফেলছে। হাসি পেল ছেলেটার। একই সঙ্গে অসহায় ও লাগল খুব। বিদেশ বিভূঁইয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত আজকের নয়, অনেক বছর আগের, যখন প্রথম কলেজে উঠেছিল ছেলেটা! কথা দিয়েছিল বাবার হাত ধরে...উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হবে সে। মির্জা পরিবারের বড় ছেলের দায়িত্বের এক কণা ভাগ অবমূল্যায়ন হতে দেবে না কিছুতেই। সেই কথার জের ধরেই আজ বিদায় ঘণ্টা বেজেছে। যেতে যে হবেই। তবে এবার শুধু নিজের জন্যেই না, এই পাগলিটার জন্যেও! তাকে ভালো রাখতে, ভালো ভবিষ্যৎ দিতে, পৃথিবীর সব সুখ তার পায়ের সামনে এনে রাখতে....কিন্তু এভাবে কাঁদলে কি যেতে পারবে রোদ্দুর? সম্ভব?
কান্নার তোড়ে বিকেলের দু’চোখ ভিজে একাকার। রোদ্দুর পরম মমতায় দু’হাত বাড়িয়ে যেই না মেয়েটার চোখজোড়া মুছিয়ে দিতে চায়, বিকেল অমনি হাত ঝামটা দিয়ে ওর হাত সরিয়ে দেয়।
উষ্মা মেশানো গলায় ও বলে উঠল, 'লাগবে না। আমারটা আমিই মুছতে পারি।'
অভিমানী বিকেল নিজের ওড়নার খুঁট দিয়ে চোখ ডলতে লাগল। কিন্তু হিতে বিপরীত হলো। চোখের কাজল লেপ্টে গিয়ে সারা মুখে ছড়িয়ে একাকার। সুন্দর মুখটা মুহূর্তেই এক বিচ্ছিরি জগাখিচুড়ি পাকিয়ে ফেলল ও।
রোদ্দুর এতক্ষণ গম্ভীর থাকার চেষ্টা করছিল, কিন্তু বিকেলের এই দশা দেখে আর নিজেকে সামলাতে পারল না। ও সশব্দে হেসে ওঠে।
বিকেল এক ভ্রু উঁচিয়ে সরু চোখে চাইল তাতে, 'কী? হাসার কী হলো এখানে? খুব মজা পাচ্ছেন, না?'
রোদ্দুর ঠোঁট কামড়ে হাসি চেপে এদিক-ওদিক মাথা নাড়ল।
'উম, কিছু না। আচ্ছা, একটা কথা বলি? রাগ করবি না তো?'
বিকেল ভেংচি কেটে বলল, 'কী? বলেন!'
'শোন,' রোদ্দুর বেশ গাম্ভীর্য নিয়ে শুরু করল, 'বিজ্ঞানে পড়েছি মানুষের আদি জাত নাকি বানর বা হনুমান থেকে এসেছে। কিন্তু তোকে দেখে আমার ধারণা বদলে যাচ্ছে। তোর পূর্বপুরুষরা বোধহয় পান্ডা গোত্রের ছিল।'
বিকেল আকাশ থেকে পড়ে, 'আজব তো! কেন? আমি পান্ডা হতে যাব কেন?'
রোদ্দুর কোনো কথা না বলে পকেট থেকে ফোন বের করে। ফ্রন্ট ক্যামেরাটা অন করে বিকেলের মুখের সামনে ধরল। বিকেল ফোনের স্ক্রিনে নিজের প্রতিচ্ছবি দেখেই আঁতকে উঠল। দুই চোখ আঙুল দিয়ে ডলে ডলে ও এমন সর্বনাশ করেছে যে, চোখের চারপাশ জুড়ে কালো কালির গাঢ় বৃত্ত তৈরি হয়েছে। সাদা চামড়ার ওপর লেপ্টে যাওয়া কাজল দেখে সত্যিই ওকে একটা মিনি পান্ডার মতোনই লাগছে।
বিকেলের এবার কান্না আর রাগ একসাথে পেল। ও ঝট করে দু’হাতে মুখ ঢেকে নেয়। অভিমানে গলা বুজে আসা স্বরে ফুঁপিয়ে ওঠে বলে, 'ফালতু! আপনি একটা আস্ত ফালতু মানুষ!'
'এখন সব আমার দোষ! আমি ফালতু!' মেকী অভিমান দেখিয়ে রোদ্দুর পকেট থেকে রুমাল বের করে আনলো, 'আচ্ছা বাবা, সরি! আমার পান্ডাটা বড্ড বেশি কিউট, তাই হাসছিলাম। হইছে? আয়, এবার আমি ঠিক করে দিই।'
এলো না বিকেল, নাকি সরে গেল।
তবে রোদ্দুরকে মুছতে দিলো। গুছিয়ে নিতে দিলো নিজেকে। সেই সাথে একদৃষ্টে ওর দিকে তাকিয়ে থেকে উপলব্ধি করল— এই মানুষটা কোনোদিন যদি হারিয়ে যায়, তবে চলবে না...কিছুতেই না!
হঠাৎ করেই বলে উঠল বিকেল, 'আমাদের বিয়ে হবে না?'
থমকাল ছেলেটা, এক সেকেন্ডের জন্যে, পরপর বলে উঠল দ্রুততার সঙ্গে, 'আলবাত হবে! এটা কেমন প্রশ্ন?'
সে জবাবের ধার দিয়েও হাঁটল না বিকেল, পুনরায় প্রশ্ন বাণ ছুঁড়ে দেয় মেয়েটা, 'কবে হবে?'
'আমি ফিরে আসি, তারপর?'
'না।'
'তাহলে?'
'যদি বলি, আজ? এক্ষুনি?'
অবাক হয় রোদ্দুর।
দু'চোখ জুড়ে ছাপিয়ে বসে বিস্ময়তা।
নিজের অনুভূতি প্রকাশ্যে বড্ড কাচা মেয়েটা কি সুন্দর নিজের অধিকার দাবি করতে চাইছে!
'কি হলো? জবাব দিন...যদি আমি এক্ষুনি আপনার নামের সঙ্গে আমার নামটা জুড়তে চাই। তবে কি? কি করবেন আমি?'
একদণ্ড ভাবল রোদ্দুর। কিছু একটার হিসেব মেলালো ঝটপট করে। তারপর বলল, ঠোঁটের কোণে একচিলতে নাই নাই হাসি ফুটিয়ে তুলে, 'করব না, বলব।'
'কি বলবেন?'
'কবুল...'
ধক করে উঠল বিকেলের হৃদয়।
ভাষাহীন হয়ে এবার চেয়ে রয় সে.. ঠোঁটের হাসিটা আরেকটু টেনে বড় করে রোদ্দুর, উচ্চারণ করে, 'কবুল...'
দ্রিম দ্রিম করে হাতুড়ি দিয়ে পেটায় কেউ হৃদযন্ত্রটাকে। উত্তেজনায় অবশ লাগছে শরীর, রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছুটে চলছে কিছু একটা.... সেই মুহূর্তে ছেলেটা আরও একবার ঘোষণা করে, আওড়ায় জাদুকরী সেই শব্দটি, 'কবুল...মিসেস রোদ!'
লুটিয়ে পড়ে বিকেল, লাজুক লতার মতো।
সামলে নেয় রোদ্দুর তাকে। চুলের পিঠে গাঢ় চুমু বসিয়ে দিয়ে শুধাল, 'আমায় পরীক্ষা করিস না বিকেল। আমি প্রেমে পাগল এক যুবক— প্রেমিকাকে পেতে গোটা দুনিয়াটা হাতের মুঠোয় নিয়ে পিষ্ট করে ফেলতে পারি। আমার ভালোবাসার আকাশ যদি কখনো ভেঙে পড়ে, তবে সেই ধ্বংসস্তূপের নিচে এই পৃথিবীটাকেও আমি সমাধি দিয়ে দেব।'
(চলবে)
_______
৯০০ লাইক করলেই পরের পর্ব পেয়ে যাবেন। যদি কাল করে দেন, তবে কাল-ই!!