ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রেমের নির্বসন

২৪তম পর্ব

লেখক: মৃধা মৌনি

#প্রেমের_নির্বাসন - (২৪)

লেখনীতে- #মৃধা_মৌনি

(প্রথম কমেন্টটা পড়ে নিবেন সকলে)

__________

রেহনুমার ক্লান্ত হাতে ঘরের কাজগুলো আজ যেন শেষ হতেই চাইছে না। শরীরের দুর্বলতা ছাপিয়ে মনের ভেতর যখন একরাশ বিষণ্ণতা, ঠিক তখনই মিশি এসে খবরটা দিল, 'তোমায় বাবা ডাকছে।'

রেহনুমা কিছুটা চমকে উঠলেন। অস্ফুটস্বরে বললেন, 'হঠাৎ?'

মিশি দায়সারাভাবে উত্তর দিল, 'তার আমি কী জানি?' বলেই সে চলে গেল নিজের পথে।

রেহনুমা তড়িঘড়ি করে ভেজা হাত দুটো শাড়ির আঁচলে মুছে নিলেন। আজ কতগুলো দিন মানুষটার সঙ্গে ঠিকমতো কথা হয় না। উমেদ মির্জা এক পাহাড় অভিমান নিয়ে স্ত্রীর সঙ্গে নীরবতার দেয়াল তুলে রেখেছেন। অপরাধ? অপরাধ একটাই- ছেলের বিদেশ যাওয়ার ব্যাপারে অভাগী মায়ের মন বারবার বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল, ব্যস!

তিনি কম্পিত পায়ে উমেদ মির্জার ঘরের সামনে এসে দাঁড়ালেন। দরজাটা সামান্য ভেজানো। একবার ভাবলেন সরাসরি ঢুকে পড়বেন, কিন্তু পরক্ষণেই দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে দুবার মৃদু টোকা দিলেন। ওপাশ থেকে চিরচেনা গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে এল, 'এসো।'

ভেতরে প্রবেশের আগে রেহনুমা নিজের ধুকপুক করতে থাকা হৃদযন্ত্রটাকে যেন জোর করে সামলে নিলেন। দরজা ঠেলে পা রাখতেই আমতা আমতা করে শুধালেন, 'ডাকছিলে?'

কিন্তু ভেতরে যা দেখলেন, তার জন্য তিনি একেবারেই প্রস্তুত ছিলেন না। মুহূর্তেই বিস্ময়ে নির্বাক হয়ে গেলেন তিনি।

উমেদ মির্জা বিছানার ওপর সারি সারি টাকার বান্ডিল সাজিয়ে রেখেছেন। এত টাকা একসঙ্গে রেহনুমা এর আগে কোনোদিন দেখেননি। তাদের বিশাল কিং সাইজ বিছানাটার প্রায় পুরোটাই এখন নগদ টাকার বান্ডিলে ঢাকা পড়ে গেছে।

বিস্ময় কাটিয়ে কোনোমতে রেহনুমা অস্ফুট স্বরে বললেন, 'এসব... এসব কী?'

উমেদ মির্জা স্ত্রীর হতভম্ব চোখমুখ দেখে মুচকি হাসলেন, 'এসো রেনু, এদিকে এসো।'

ডাকলেন কোমল কণ্ঠে।

আরও চমক খেলেন তিনি। জড় পদার্থের ন্যায় টেনে টেনে পা দুটি এগিয়ে নিয়ে চললেন কেবল। স্বামীর পাশে দাঁড়িয়ে একবার নিগূঢ় চোখে বিছানার উপরটা দেখে তারপর তাঁর চোখের তারায় চোখ রাখলেন। চাউনিতে বিস্ময় নিয়ে শুধালেন, 'এত টাকা!'

উমেদ মির্জা স্ত্রী'র হাতদুটো ধরে বিছানার উপর বসিয়ে দিলেন। রেহনুমা জড়ো পদার্থ যেন কিংবা কোনো কাঠপুতলি- স্বামীর নির্দেশ মোতাবেক বসে পড়ল। সঙ্গে সঙ্গে শরীর জুড়ে বয়ে গেল এক অদ্ভুত বৈদ্যুতিক শিহরণ। সহ্য করতে না পেরে আবার উঠে দাঁড়ালেন তিনি। কণ্ঠে অসম্ভব আশ্চর্য নিয়ে জানতে চাইলেন পুনরায়, 'এসব কি? এত টাকা কোথায় পেলেন আপনি?'

উমেদ মির্জা ভ্রু যুগল কুঁচকে ফেললেন, চোখেমুখে মেকী রাগ নামিয়ে বললেন, 'এই জন্য ভালো লাগে না। তোমাদের স্ত্রী-স্বভাব....খালি প্রশ্ন, আর প্রশ্ন! এত টাকা জীবনে একসাথে দেখেছো কোনোদিন রেনু?'

রেহনুমা এপাশ ওপাশ মাথা নাড়লেন, 'দেখিনি।' কণ্ঠে তিরতির করে কাঁপন টের পাওয়া যায়।

'কি ব্যাপার? তুমি কি ভয় পাচ্ছ নাকি? কাঁপা-কাঁপি করছ কেন?' উমেদ মির্জা হেসে বললেন, 'কালো টাকা ভাবছ? অন্যায় পথে কামিয়েছি? উমম, না! এগুলো সব তোমার স্বামীর হক আর সঞ্চয়!'

রেহনুমা আরও অবাক হলেন। ভারী আঁখিপল্লব দুটি বারকয়েক ঝাপটে বিস্ময় প্রকাশ করে শুধালেন, 'আপনি এতসব কিছু...কবে? কখন?'

'তোমার না জানলেও চলবে তা।'

বলে বিছানার উপর বসলেন উমেদ মির্জা। তারপর আচানক বাচ্চাদের মতো শুয়ে পড়লেন টাকার উপর। চোখের চাউনিতে অন্য কিছুর আভাস, রেহনুমা শিউরে উঠলেন কেন যেন। এই উমেদ মির্জা কে তিনি চিনতে পারছেন না। এঁকে দেখাচ্ছে একজন অপ্রকৃতস্থ মানসিক ভারসাম্যহীন মানুষের মতোন!

'জানো রেনু...' আশ্চর্য রকমের শীতল কণ্ঠে বলতে শুরু করলেন তিনি, 'আমার বাবার কিন্তু অনেক টাকাপয়সা ছিল না। সম্বল বলতে এই বাড়িটাই ছিল শেষ ভরসা। আমার মা এই যে এত খিটখিটে মেজাজের, অথচ আমি তাকে কখনো কিছু বলি না। কেন বলি না জানো? কারণ চোখের সামনে আমি আমার মা'কে অসম্ভব ভাতের কষ্ট করতে দেখছি। বাবা তো দু'দিন পর পর এই আমাদের সবাইকে একসঙ্গে রেখেই হাওয়া হতেন। কি খাবো, কি করব, একে তো ঢাকা শহর, উপরন্তু আশপাশের মানুষের সঙ্গেও আমাদের আহামরি মিল মহব্বত ছিল না। বাবার কারণেই, তার খিচমিচ স্বভাবের কারণে আমাদের সঙ্গে, বিশেষ করে মায়ের সঙ্গে কারোই সখ্যতা ছিল না। ঘরে চাল নেই, বাজার নেই, মা কীভাবে যে কী করতেন....আমি ওসব ভাবতেও পারি না জানো! অথচ মানুষ মনে করত, আমাদের অনেক টাকা...অনেক! এই এতবড় বাড়ি...জমিদারি গোছের, বাবা চলতেন ও ঠাট-বাট বজায় রেখে। কার সাধ্যি বোঝে, পকেটের পয়সা ও ফুটো! যখন বুঝতে শিখলাম, নিজের কাছেই প্রতিজ্ঞা করলাম, একদিন আমার অনেক টাকা হবে, অনেক! এত যে...আমি যে টাকায় শুয়ে গড়াগড়ি খাবো। মায়ের সব কষ্ট দূর করে দেবো। আমার পরিবারকে আর যাইহোক, ভাত-কাপড়ের কষ্ট হতে দেবো না কিছুতেই...আমার সন্তানেরা মানুষের মতো মানুষ হবে। মাথা উঁচু করে চলবে ওরা, যেভাবে আমার বাবা চলতেন! পার্থক্য থাকবে এইটাই যে, তাঁর পকেট শূন্য থাকলেও আমার সন্তানদের পূর্ণ থাকবে...'

উমেদ মির্জার দুই চোখ ভরে এসেছে জলে।

রেহনুমা এতদিনকার চেনা পরিচিত মানুষটার আজ এই রূপ দেখে বিস্মিত! কথা সরছে না মুখ দিয়ে। নাকি নড়তে পারছেন তিনি। পা দুটো কেউ পেরেক দিয়ে গেঁথে দিয়েছে বোধহয়। এক চুল পরিমাণ নড়বার ক্ষমতা নেই...চেয়ে চেয়ে দেখছেন আধপাগল একজন মানুষকে, শুনছেন তার প্রলাপ বাক্য গুলি।

উমেদ মির্জা দুই হাতে যতগুলো বান্ডিল তোলা যায় তুললেন, তারপর ছুঁড়ে মারলেন শূন্যে। চোখ বন্ধ করে কান দিয়ে শব্দ শুনলেন। ধাম ধাম করে পড়ছে টাকার বান্ডিল, তোশকের উপর, কি সুন্দর ছন্দ! এরচেয়ে মধুর সুর আর কিছু কি পৃথিবীতে আছে?

উমেদ মির্জা উঠে বসলেন হঠাৎ।

চোখজোড়া ডলে নিলেন, র:ক্তের ন্যায় লাল দেখাচ্ছে তা। রেহনুমার সম্বিৎ ফিরে। তিনি কিছু একটা খুঁজতে খুঁজতে বলতে লাগলেন, 'চোখে কি পড়ল আবার? টিস্যু বক্স টা কোথায়?'

উমেদ মির্জা হাত ধরে টেনে তাকে থামিয়ে নিজের পাশে বসান। স্ত্রীর বিমূর্ত মুখখানা মেপে নিয়ে বলেন, 'খুশি মনে যেতে দাও। যা হয়, হতে দাও। আর বাঁধা দিও না রেনু। দোহাই তোমার....আমাদের দিন ফিরছে।'

প্রত্যুত্তরে কি বলবেন তিনি? ঠিক ঠাহর করতে পারলেন না। কেবল ফ্যালফ্যাল নেত্রে চেয়ে রইলেন স্বামীর মুখপানে....

উমেদ মির্জা বলে উঠলেন আবারও, 'তিন দিন মাত্র! এরপর তোমার ছেলেকে তুমি হাসিমুখে বিদায় দিবে। ওর মন টলানোর চেষ্টা করবে না, একদম না! যদি কোরো....আমি ওয়াদা করছি, তুমি আমাকে আর কোথাও খুঁজে পাবে না।'

সঙ্গে সঙ্গে স্বামীর মুখটা চেপে ধরলেন তিনি, দু'ধারে মাথা নাড়লেন, 'এরকম কখনো বলবেন না।'

'তাহলে ওয়াদা দাও, আমি যা বলব, যা করব, তাই তুমি মেনে নিবে?'

'কিন্তু রোদ্দুর যে...'

স্ত্রীকে থামিয়ে দিলেন তিনি, ঘাড় নেড়ে শান্ত গলায় বললেন, 'আমি জানি।

আর তুমিও জানো, আমি কথা দিয়েছিলাম!

বিনিময়ে....আমার মান, সম্মান, সম্পদ- অনেক কিছুর বিসর্জন দিতে হবে। তাই কি চাও? আমি ছোট হই?'

রেহনুমা অস্থির চিত্তে দুই ধারে মাথা নাড়ান ঝটপট, 'চাই না।' বললেন তিনি, পরমুহূর্তেই উশখুশ করে জানালেন, 'কিন্তু ওর খুশিটাও তো দেখবেন আপনি।'

'দেখবো বলেই এই সিদ্ধান্ত নিলাম।

দূরে যাবে, ভুলে যাবে, ভালো থাকবে।

এবং একদিন ঠিকই বুঝতে পারবে, আমি ওর ভালো বৈ খারাপ চাইনি কখনোই। তুমি শুধু তাই করবে যা আমি বলব। আমার কথার বাইরে একটা কথাও যেন উত্তর থেকে দক্ষিণ না হয়। মনে রেখো।'

উমেদ মির্জা উঠে দাঁড়ালেন। আলমারি খুলে কিছু কাগজপত্র বের করে খুব মন দিয়ে দেখার ভান করতে লাগলেন, যদিও তার উদ্দেশ্য আসলে অর্থহীন। ওদিকে রেহনুমা পাথরের মতো নিথর হয়ে বসে আছেন। বাইরের জগতের কোনো স্পন্দন তাকে ছুঁতে পারছে না; তার মানসপটে কেবল বিকেলের মায়াবী মুখখানি বারবার ভেসে উঠছে। মেয়েটিকে তার ভীষণ মিষ্টি লাগে। কিন্তু ভাগ্যের কী এক নির্মম পরিহাস! একপাশে আভিজাত্যের লড়াই আর অন্যপাশে সম্পদের মোহ- এই দুইয়ের যাতাকলে পিষ্ট হয়ে মেয়েটিকে আবারও পুরনো হৃদয়ভাঙা যন্ত্রণা বুকে চেপেই বিদায় নিতে হবে বুঝি।

★★★

দোতলার এক কোণে নিরিবিলি এই জায়গাটি মিশির বড্ড প্রিয়। মুখোমুখি বসানো দুটো তিন-সিটের সোফা আর মাঝখানে ছোট্ট একটি সেন্টার টেবিল— সব মিলিয়ে ছিমছাম নির্জনতা। এখানে বসে বইয়ের পাতায় ডুব দেওয়া কিংবা ক্যানভাসে রঙ ছড়ানোতেই মিশি সবচেয়ে বেশি আনন্দ পায়। ছবি আঁকা তার প্রিয় শখ হলেও, তার সেই সৃষ্টিগুলো খুব কম মানুষের দেখার ভাগ্যেই জুটেছে।

সামনে খোলা বইয়ের পাতা, সেদিকেই একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে মিশি। তবে সে আসলেও পড়ছে কি না, তা বোঝা মুশকিল। ঠিক সেই মুহূর্তে সেখানে আদিবা এসে হাজির হলো। পরনের শাড়িটা আলুথালু, ভঙ্গিতে চরম বিশৃঙ্খলা। আদিবা সামনে এসে দাঁড়ালেও মিশি একবার চোখের পলক ফেলে সেদিকে তাকিয়ে দেখার প্রয়োজন বোধ করল না। এক মনে পূর্বের ধ্যান ধরে রইল। আদিবাই গলা খাঁকড়ে বলে উঠল যেন তেন ভাবে, 'একটু সাহায্য করো না!'

মিশি চোখ তুলে তাকাল। আদিবা একটু অবাকই হলো। এমন প্রাণহীন, নির্জীব কোনো মানুষের চাহনি হয়! হতে পারে!

তাকিয়েই রইল শুধু, কি সাহায্য কিংবা কি বৃত্তান্ত, জানতে প্রশ্ন করল না একটিও! সেকেন্ড তিনেক সময় অপেক্ষা করে পুনরায় বলল মেয়েটি, 'কি হলো? শুনতে পাওনি? একটু সাহায্য করবে?'

'কি সাহায্য?' ভীষণ নিস্তরঙ্গ কণ্ঠে জানতে চাইল মিশি এবারে। পরপরই চোখ নামিয়ে আঁটলো বইয়ের খোলা পাতায়।

আদিবা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। বাড়িতে কেউ নেই। তৃপ্তি, স্বস্তি, দু'জনেই কোথাও একটা বেরিয়েছে। শাড়িতে সে একদমই অভ্যস্ত নয়, তবুও আজ পরা। কারণটা বিশেষ- আজ সৌম্যর জন্মদিন। প্রিয় মানুষটাকে একটু চমকে দেওয়ার জন্যই এই আয়োজন। কিন্তু ইউটিউব দেখে দেখে সবটা সামলাতে পারলেও কুঁচিগুলো বারবার অবাধ্য হয়ে খুলে যাচ্ছে। নিচ থেকে কেউ একজন ধরে না দিলে এটা ঠিক করা অসম্ভব। তাই মিশিকে নির্জনে দেখতে পেয়েই সে আশার আলো দেখল।

কিন্তু মিশি মেয়েটা বড় অদ্ভুত। এ বাড়ির সবাই আদিবার সাথে সহজ হলেও, মিশি যেন এক দুর্ভেদ্য দেয়াল তুলে রেখেছে। সেই দূরত্বের কারণ আদিবার কাছে একটা রহস্যই বটে।

আদিবা গুটিগুটি পায়ে গিয়ে মিশির পাশে বসল। শাড়ির এলোমেলো কুঁচিগুলো দেখিয়ে একটু অনুনয়ের সুরে বলল, 'একটু ধরে দেবে? আমার কুঁচিগুলো বারবার কেমন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে।'

মিশি বই থেকে চোখ না তুলেই নির্লিপ্ত স্বরে বলল, 'আমি শাড়ি পরাতে জানি না। দুঃখিত।'

'আরে, পরাতে হবে না তো। তুমি শুধু একটু ধরলেই আমি ঠিক করে নেব।'

এবার মিশি সরাসরি তাকাল, তার চোখেমুখে বিরক্তি।

'আমি এসবে আগ্রহী নই। তুমি অন্য কাউকে খুঁজে নাও।'

আদিবা ভ্রু কুঁচকে অবাক হয়ে বলল, 'একটা শাড়ির কুঁচি ধরায় আগ্রহের কী আছে? আর কেউ নেই বলেই তো তোমার কাছে এলাম, মিশি!'

মিশির কণ্ঠ এবার বেশ কঠোর শোনাল, 'আদৌ শাড়ি পরার দরকারটা কী? এটা তো বাসা, আর তোমাকে তো কখনো এসব আলগা ন্যাকামি করতে দেখিনি।'

আদিবা রীতিমতো হতভম্ব।

'এতে ন্যাকামির কী হলো? আগে পরিনি বলে কি আজ পরতে পারব না? আজ ওর জন্মদিন বলেই তো...'

কথা শেষ করতে দিল না মিশি। গলার স্বর আরও এক পর্দা চড়িয়ে বলল, 'তাই বলে শাড়ি পরে সারপ্রাইজ দিতে হবে? কী বোরিং একটা প্ল্যান! আমি এখন ব্যস্ত, দয়া করে যাও তো এখান থেকে।'

আদিবা চলে যাওয়ার বদলে সোফায় আরও চেপে বসে। তার কণ্ঠেও এবার উত্তাপের ছোঁয়া মিশলো, 'আমার সাথে সারাক্ষণ এমন ব্যবহার কেন করো মিশি? আসার পর থেকেই দেখছি তুমি যা খুশি তা-ই আচরণ করছ। এটাই কি তোমার পারিবারিক শিক্ষা?'

পরিবার শব্দটা শুনেই মিশি যেন বারুদে আগুন লেগে জ্বলে উঠল।

গমগমে সুর তুলে শুধালো, 'কথার মাঝখানে পরিবার টানছ কেন? আমি তোমার সাথে এমন কী খারাপ ব্যবহার করলাম? দেখতেই পাচ্ছ আমি ব্যস্ত, আর এসব আদিখ্যেতা আমার সহ্য হয় না। না করার পরেও কেন জোর করছ?'

'আমি জোর করছি?' আদিবার চোখমুখ অপমানে লাল।

'তা নয়তো কী? একবার না শোনার পরই তোমার চলে যাওয়া উচিত ছিল। আর শোনো, আমি সবার সাথে মিশতে পারি না। আমার স্ট্যাটাস অত সস্তা নয়!'

'উফ, কী আমার স্ট্যাটাস-ওয়ালা রে!' আদিবা ঝটকা দিয়ে উঠে দাঁড়াল, 'নেহাত তুমি আমার আপন ননদ নও, নইলে আজ তোমাকে বুঝিয়ে দিতাম স্ট্যাটাস কত প্রকার ও কী কী!'

মিশিও পাল্লা দিয়ে উঠে দাঁড়াল, তার দুচোখে রাগের আগুন, 'আমিও বুঝিয়ে দিতাম, উড়ে এসে জুড়ে বসলে তার সাথে আসলে কী করা উচিত...'

'আমি মোটেও উড়ে এসে জুড়ে বসিনি! তোমার ভাই আমাকে বিয়ে করে এ বাড়িতে এনেছে। যেখানে আমার শাশুড়ি, তোমার বাবা মা কিংবা এ বাড়ির বড়রা আমাকে নিয়ে আজেবাজে কথা বলার সাহস করেন না, সেখানে তুমি কোন হরিদাস পাল? হুঁ?'

'কত বড় মুখ তোমার!' মিশি চিৎকার করে উঠল।

'মুখের আর দেখলে কী!'

মিশি এবারে চরম আঘাতটা করে বলল, 'সৌম্য মোটেই তোমাকে সাধ করে বিয়ে করেনি। তুমি ওর ঘাড়ে চেপেছ। তারপর কত নাটক করে, নিজের পরিবার বিসর্জন দিয়ে এখানে এসে উঠেছ। যার নিজের কোনো চালচুলো নেই, সে কিনা এসেছে আমাকে জ্ঞান দিতে!'

'মিশি!!' আদিবার আর্তনাদ দেয়ালগুলোতে আছড়ে পড়ে।

মিশি এক চুলও নড়ল না, বরং তর্জনী উঁচিয়ে হিসহিস করে জানাল, 'গলার স্বর নামিয়ে কথা বলো। তুমি এ বাড়িতে যার জোরে এসেছ, সে না থাকলে তোমার এক কানাকড়িও মূল্য নেই। আর আমি এই বাড়ির মেয়ে! আমার মান-মর্যাদা তোমার চেয়ে বহুগুণ বেশি... আশা করি সেটা মাথায় থাকবে!'

আদিবার মনের ভেতরটা মুহূর্তেই হাহাকার করে উঠল। শব্দগুলো তীরের মতো তার বুকে বিঁধছে। ঘটনাটা তো মিথ্যে নয়! এই বিশাল অট্টালিকায় তার অস্তিত্ব কতটুকু? কেবল সৌম্যর স্ত্রী, এইটুকুই তার পরিচয়। এই তকমাটুকু সরিয়ে দিলে তাকে চেনার বা গুরুত্ব দেওয়ার মতো কেউ কি এখানে আছে? কক্ষনো না!

এক নিমিষেই আদিবার মাথায় এক আকাশ জেদ চেপে বসল। সেই সাথে বুক ফেটে আসা কান্না আর অসহ্য অপমান। মিশি কী নিদারুণ তাচ্ছিল্য আর বিষাক্ত দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছে! কেন? কিসের এত দম্ভ ওর? এই কি আদিবার প্রাপ্য ছিল? বিনা কারণে এত বড় লাঞ্ছনা?

আধখোলা শাড়িটা কোনোমতে হাতে পেঁচিয়ে ধরে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে নিজের ঘরের দিকে ছুটল আদিবা। এই ঘরটা এখন অনেক বদলেছে। সৌম্যর অগোছালো ঘরে আইরিন একটা নতুন ওয়ারড্রোব আর ড্রেসিং টেবিল বসিয়েছেন। জানালার পর্দা থেকে শুরু করে বিছানার চাদর- সবই এখন পরিপাটি, নতুন। পড়ার টেবিলের ওপর সবসময় একটা কাঁচের জগ আর গ্লাস রাখা থাকে।

ঘরে ঢুকেই রাগের মাথায় টেবিল থেকে গ্লাসটা এক ঝটকায় ফ্লোরে ছুঁড়ে মারল সে। ঝনঝন শব্দে কাঁচের টুকরোগুলো ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে। পরমুহূর্তেই নিজের কাণ্ড দেখে শিউরে উঠল।

'হায় হায়, একি করলাম!' বিড়বিড় করে বলতে বলতে সে নিচু হয়ে ভাঙা কাঁচগুলো সরাতে গেল। কিন্তু কাঁপতে থাকা আঙুলে বিঁধে গেল ধারালো এক টুকরো কাঁচ।

তীব্র যন্ত্রণায় আঙুলটা কেটে গিয়ে ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটল। কয়েক ফোঁটা লাল রক্ত টুপটুপ করে সাদা ফ্লোরে আছড়ে পড়তেই আদিবা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না, হু হু করে কেঁদে ফেলল। এই কান্না শরীরের ব্যথার জন্য নয়; এ কান্না চরম লজ্জা আর অপমানের। নিজেকে তার বড্ড তুচ্ছ আর একা মনে হতে লাগল। চারদিকের এত চাকচিক্যের মাঝেও সে যেন এক নিরাশ্রয় পথিক। এক চিলতে শান্তির খোঁজে এসে কেন তাকে বারবার এভাবে ক্ষতবিক্ষত হতে হচ্ছে?

★★★

সন্ধ্যার রেশ কাটতে না কাটতেই পৃথিবীর বুকে রাতের প্রথম প্রহর নেমে এসেছে। চারপাশটা এখন আবছা অন্ধকারে ঢাকা। বাড়ির সামনের রাস্তায় বিকেলকে নামিয়ে দিয়ে রোদ্দুর নিজের পথে চলে গেল; ঘণ্টাখানেক এদিক-সেদিক ঘুরে তারপর সে ফিরবে।

বিকেল বাড়ির ভেতরে পা রাখতেই একদম মুখোমুখি হয়ে গেল রেহনুমার। তিনি সম্ভবত সদর দরজার দিকেই আসছিলেন। হুট করে তাঁকে সামনে দেখে বিকেলের বুকটা ধক করে উঠল; এক অদ্ভুত তটস্থতায় সে সেখানেই থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল।

রেহনুমা থামলেন। তাঁর দৃষ্টি স্থির এবং শীতল। হিমশীতল কণ্ঠে প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন, 'এত রাত পর্যন্ত কোথায় ছিলি তুই?'

'এই বড় মা...একটু বেরিয়েছিলাম।' আমতা আমতা স্বরে বুলি আওড়ালো বিকেল।

'কোথায়?'

'ফ্রেন্ডসদের সঙ্গে। শপিং মলে।'

'তোর হাতে তো কোনো ব্যাগপত্র দেখছি না।'

রেহনুমার প্রশ্নের মুখে বিকেলের ভেতরটা অস্বস্তিতে কাঁটা হয়ে বিঁধল। একইসাথে মনের কোণে এক অদ্ভুত বিস্ময় দানা বাঁধল। এমন কড়া জবাবদিহির মুখোমুখি সে আগে কখনো হয়নি। বিশেষ করে বড় মার কাছ থেকে তো নয়ই! এ বাড়ির বড় গিন্নি হিসেবে রেহনুমা সবসময়ই প্রভাবশালী, কিন্তু বিকেলের মুক্তভাবে ঘোরাফেরার ওপর কোনোদিন তিনি এমন কঠিন পাহাড়াদারি কিংবা কৈফিয়ত তলব করেননি। আজ তবে হঠাৎ করে হলো টা কি?

বিকেল একটা দীর্ঘশ্বাস লুকানোর চেষ্টা করে। ঠিক তখনই রেহনুমার কণ্ঠস্বরে আবার ভেসে আসে, 'এত রাত করে বাইরে ওভাবে ঘোরাঘুরি করিস না। যেখানেই যাস না কেন, সন্ধ্যার আগে আগে বাড়ি ফিরবি।'

কথাটা বলে সামান্য থামলেন তিনি। পরের কথাগুলি উশখুশ ভাব নিয়েই আওড়ালেন, 'বিয়ের আগে এভাবে ছটফটিয়ে বেড়ানোটা বাইরের কেউ ভালো চোখে দেখবে না। একবার বিয়েটা হয়ে যাক, তখন না হয় জামাইকে সাথে নিয়ে ইচ্ছেমতো ঘুরে বেড়াস।'

হতবাক দেখালো বিকেলের চোখ-মুখ। এ বাড়ির কারো আচরণই ওর বোধগম্য হয় না আজকাল। রেহনুমা চলে গেলেন। বিকেলের যতটুকু মন ভালো ছিল, সবটুকু ফুঁশ হয়ে গেল। একরাশ মেঘাচ্ছন্ন অন্ধকার নিয়েই সে এগিয়ে চলল নিজের ঘরে দিকে।

তৃপ্তি আগে থেকেই বিকেলের ঘরে ছিল। পড়ার টেবিলের ওপর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বইখাতাগুলো সে আপনমনেই গোছাচ্ছিল। হঠাৎ বিকেলকে ঘরে ঢুকতে দেখে কিছুটা চমকে গিয়ে বলে উঠল, 'কিরে! তুই?'

বিকেলের মেজাজ এমনিতেই চড়ে ছিল, তৃপ্তির কথায় তার ভ্রু জোড়া কুঁচকে গেল। বিরক্তির স্বরে বলল, 'আমার ঘরে আমি আসব না তো কি ভূত আসবে?'

তৃপ্তি ঠোঁটের কোণে এক চিলতে ম্লান হাসি ফুটিয়ে বলল, 'আরে না। হঠাৎ যেভাবে ঝড়ের বেগে এলি, ভয়ই পেয়ে গিয়েছিলাম।'

বলেই সে আবার বইপত্র আলাদা করতে লাগল। বিরক্তি মাখা গলায় বলল, 'তোর বই-খাতাগুলো আলাদা শেলফে রাখবি, কতবার বলেছি তোকে! যতবার আসি, দেখি সব হ য ব র ল হয়ে আছে।'

বিকেল গলার স্বর চড়িয়ে বলল, 'তোকে কে আসতে বলেছে শুনি?'

'এগুলো কি এভাবেই থাকবে?'

'থাকুক না। এত গুছিয়ে কী হবে? সেই তো আবার এলোমেলো হবে!'

'তাই বলে কি মানুষ গোছাবে না? আজাইরা কথা! আর আমি গুছিয়ে দিচ্ছি, তোর গায়ে লাগছে কেন?'

বিকেলের অস্থিরতা এবার চরমে পৌঁছাল।

'বেশি আদিখ্যেতা করিস না তো! কে বলেছে আমার ঘরে এসে আমার কাজ করে দিতে? তুই কি আমার ব্যক্তিগত চাকরানি? ফালতু সব!'

তৃপ্তি কোনো উত্তর দিল না। বিকেল ধপ করে বিছানার ওপর বসে পড়ল, তার পায়ে বাইরের ধুলোমাখা জুতো। তাই দেখে তৃপ্তি নরম স্বরে বলল, 'জুতোটা খুলে বস বিকেল, বিছানা নোংরা হচ্ছে।'

'হোক।'

'একটু পানি খাবি?'

'না।'

'বিকেল?'

'কী?'

তৃপ্তি বিকেলের একদম সামনে এসে দাঁড়ায়। ওর চোখের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে গভীর মমতায় জিজ্ঞেস করে, 'কী হয়েছে বল তো?'

হঠাৎ করেই বিকেলের চোখের কোণে জল জমে ওঠে। কোনো কারণ ছাড়াই বুকটা হাহাকার করে উঠল তার। ভেজা গলায় অস্ফুট স্বরে বলে, 'কিছু না তো।'

'তাহলে কাঁদছিস কেন?'

'কই কাঁদছি?' বলতে বলতে মেয়েটা দুই হাতে চোখ মুছতে শুরু করে। কিন্তু অবাধ্য অশ্রুগুলো বাধ মানল না, টপটপ করে গড়িয়ে পড়ল গাল বেয়ে।

তৃপ্তি বিকেলের খুব কাছে এসে গা ঘেঁষে বসল।

'এই বিকেল? কাঁদছিস কেন এভাবে? কী হয়েছে বলবি তো? রোদ ভাইয়া কিছু বলেছে?'

'সে কী বলবে?'

'তাহলে কী? আমাকে বল না...'

'কিছু না।'

'আবার মিথ্যে বলছিস!'

বিকেল আর সহ্য করতে পারল না। তৃপ্তিকে সরিয়ে দিয়ে বালিশে মুখ গুঁজে ডুকরে কেঁদে উঠল। ভাঙা গলায় বলল, 'লাইট নিভিয়ে দিয়ে চলে যা এখান থেকে। আমি কিছুক্ষণ একা থাকতে চাই।'

'বলবি না আমায়?' হতাশ সুর তৃপ্তির গলায়।

'বলার মতো কিছু হয়নি।'

'কিন্তু আমার মন বলছে তুই কিছু একটা লুকাচ্ছিস।'

'তোর মনে হলে আমি কী করব? আমি ঠিক আছি। তুই যা এখন।'

তৃপ্তি আর কথা বাড়াল না। দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়িয়ে জানালার পাল্লা ভেজাতে গেল। অমনি বিকেল বলে উঠল, 'আঁটকাস না জানালা। সব খুলে দে। শুধু ঘরের লাইট নিভিয়ে দিয়ে যাওয়ার সময় দরজাটা টেনে দিয়ে যাস।'

তৃপ্তি তাই করল। বারান্দার দরজাটা হাট করে খুলে দিয়ে সেখানে একটা ডিম বাতি জ্বালিয়ে দিল। ঘরের মূল আলোটা নিভিয়ে সে দরজার দিকে পা বাড়াল। কিন্তু যাওয়ার আগে বিকেলের উবু হয়ে থাকা মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে ফিসফিস করে বলল, 'কাঁদিস না রে। রোদ ভাইয়া স্বাধ করে বিদেশে পড়তে যাচ্ছেন না। যাচ্ছেন মূলত তোর জন্যই। তোকে একটা সুন্দর জীবন দিতে চায় সে। তুইও একদিন বুঝবি এটা, যেদিন সত্যি ভালো থাকবি।'

তৃপ্তি কথাটি শেষ করে চলে যেতে উদ্যত হতেই তার হাতটা শক্ত করে চেপে ধরে বিকেল। বালিশ থেকে মুখ তুলে অশ্রুসিক্ত লাল চোখে তৃপ্তির দিকে তাকাল। চোখ জুড়ে রাজ্যের হাহাকার। ধরা গলায় শুধাল, 'আমার আর রোদ ভাইয়ার কোনোদিন বিয়ে হবে না, জানিস?'

মুহূর্তের মধ্যে ঘরটা পুরোপুরি নিস্তব্ধ হয়ে যায়। তৃপ্তি যেন আকাশ থেকে পড়ল। বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো তার মুখ থেকে বেরিয়ে এল একটি মাত্র শব্দই, 'কী!'

(চলবে)

_______

৯০০ লাইক এবং ২০০ কমেন্ট পূর্ণ করে দিলেই পরবর্তী পর্ব পেয়ে যাবেন। এছাড়াও প্রথম কমেন্টটা পড়বেন আমার। ধন্যবাদ।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২৪তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন