#প্রেমের_নির্বাসন - (২৫)
লেখনীতে - #মৃধা_মৌনি
__________
হতভম্ব তৃপ্তির মুখ দিয়ে আর কথা সরছে না। ওদিকে ডিম বাতির ম্লান আলোয় চারপাশটা আরও ভারী হয়ে উঠেছে যেন। বিকেল নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে মুখটা পুনরায় বালিশের ভেতর গুঁজে দিল। অবরুদ্ধ কণ্ঠে বলে উঠল, 'বড় মা আজ আমার বিয়ের কথা বললেন। এই একটু আগে। হয়তো এটাই ফাইনাল, আমার বিয়ে হয়ে যাবে।'
'তো তুই কি বোবা? নিজের পক্ষে কি একটা শব্দও খরচ করতে পারিস না? আশ্চর্য বিকেল!' তৃপ্তির মেজাজটা এবার চড়ে গেল। অহেতুক এই কান্নাকাটি আর কত সহ্য করা যায়? সে গমগমে স্বরে ধমকে উঠল, 'নিজে থেকে কিছু বলতে পারিস না? সব সময় মুখ বুঁজে শুধু মারপ্যাঁচে পড়া আর কাঁদা! তুই রোদ ভাইয়াকে একবারও জানিয়েছিস যে তোকে এভাবে অন্য কোথাও পার করে দেওয়ার তোড়জোড় চলছে?'
বিকেল ঝট করে মুখ তুলে তপ্ত স্বরে পালটা প্রশ্ন করল, 'জানাতে হবে কেন? সে কি জানে না? এ বাড়ির কোথায় কী হচ্ছে না হচ্ছে, তা কি তার অজানা?'
তৃপ্তি ও গলার স্বর আরও এক ধাপ উঁচিয়ে বলল, 'জানবে কী করে? সে কি মাইন্ড রিডার? নাকি বাড়ির সব সিদ্ধান্ত বড় বাবা তাকে আগে ভাগে মেইল করে পাঠান? অদ্ভুত তো তোর যুক্তি!'
বিকেল চুপসে পড়ে। কোনো উত্তর নেই। ভেজা চোখে ঘরের কোণে তাকিয়ে রইল সে। তৃপ্তি ওর কাঁধ ধরে সজোরে একটা ঝাঁকি দিয়ে শাসন করার সুরে বলল, 'কাঁদলে কিচ্ছু হবে না বিকেল, কিচ্ছু না! যা তোর, তা তোকে লড়ে আদায় করে নিতে হবে। যেভাবেই হোক! তুই কি বুঝতে পারছিস না?'
রাগে আর আক্রোশে বিকেলের কপালে দু আঙুলের টোকা দিল তৃপ্তি।
'মাথার ভেতরে আস্ত একটা মগজ আছে, নাকি শুধু শয়তানি বুদ্ধি? বুদ্ধিশুদ্ধি থাকলে বের কর দু-একটা। নিজের অধিকারটা ছিনিয়ে নিতে শেখ। তা না করে খালি ভ্যাঁ করে কাঁদলেই বুঝি সব ঠিক হয়ে যাবে?'
বিকেল বিরক্ত হয়ে সরে বসল। নিচু স্বরে গজরাতে গজরাতে বলল, 'জ্ঞান দেওয়া বন্ধ কর তো। একটুও ভাল্লাগছে না।'
'ভাল্লাগবে না তো বটেই! তিতো কথা তো হজম করা কঠিন।'
তৃপ্তি বিছানা থেকে উঠে দাঁড়াল। হাত ঝেড়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে তাচ্ছিল্যের সুরে বলল, 'যা খুশি কর গে। তবে আমার সামনে এসে আর ঘ্যান ঘ্যান করিস না।'
বিকেলও দমে যাওয়ার পাত্রী নয়। সেও চেঁচিয়ে বলে, 'আমি তোর সামনে গিয়ে ঘ্যান ঘ্যান করছি না, বরং তুই আমার রুমে এসেছিস। মনে আছে তো?'
'হ্যাঁ হ্যাঁ, যাচ্ছি আমি! আর যদি আসি এ রুমে...'
'কে আসতে বলেছে তোকে? ভাগ এখান থেকে!'
ঘর থেকে বেরিয়ে তৃপ্তি একটা লম্বা নিঃশ্বাস ছাড়ল। শরীরটা বড্ড ক্লান্ত লাগছে। তবে তার কাজ এখনো শেষ হয়নি। কিছু জরুরি কথা আর পরিকল্পনা তার মস্তিষ্কে ভিড় করছে। ধীর পায়ে সে নিজের মায়ের ঘরের দিকে এগিয়ে চলল।
★★★
সৌম্যর এই রুক্ষ মূর্তি আগে কখনো দেখেনি কেউ। একসময়ের শান্ত-শিষ্ট ছেলেটা, যে কি না ঘড়ির কাঁটা ধরে বাড়ি ফিরত, সে এখন খ্যাপাটে স্বভাবের এক অচেনা মানুষ। কথায় কথায় মেজাজ হারায়, বড়দের চোখের দিকে তাকিয়ে তর্ক করে। তার সারাক্ষণ অস্থির চাহনি আর চাপা উত্তেজনা দেখে আইরিন বেগমও শিউরে ওঠেন। নিজের সন্তানকে নিজেই চিনতে পারছেন না তিনি। এত কিছুর পরেও সৌম্যর জীবনে শান্তি নেই কেন? জীবন তো এমন হওয়ার কথা ছিল না!
রাত প্রায় এগারোটা পার হয়েছে। আদিবা উৎকণ্ঠা নিয়ে অপেক্ষায় ছিল। সৌম্য ঘরে ঢোকা মাত্রই সে হন্তদন্ত হয়ে এগিয়ে গেল।
'কোথায় ছিলে এতক্ষণ?' আদিবার কণ্ঠে দুশ্চিন্তার রেশ।
সৌম্যর মেজাজ যেন বারুদ হয়েই ছিল। গলার স্বর সপ্তমে চড়িয়ে জবাব দিল, 'কাজে!'
তার গমগমে কণ্ঠের উত্তাপ আদিবার বুকে বিঁধল। অভিমান চেপে মৃদু স্বরে সে আবার শুধায়, 'এত রেগে আছ কেন? মেজাজ কি খারাপ?'
'না, খুব ভালো মেজাজে আছি আদু!' বলেই গায়ের টি-শার্টটা টেনে খুলে একপাশে ছুড়ে মারল সৌম্য। আদিবা ভয়ে কেঁপে ওঠে। কাঁপা গলায় জানতে চায়, 'কী হয়েছে তোমার? এত অস্থির কেন? আমাকে বলো না প্লিজ।'
'কী বলব তোমাকে?' ওর কণ্ঠে তাচ্ছিল্য।
'এভাবে কেন কথা বলছ? আমি কি কিছু করেছি?'
'কিছু করো না কেন? এটা তো তোমার বাপের বাড়ি না! সারাদিন হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকলে তো চলবে না আদু।'
আদিবা আকাশ থেকে পড়ে এই কথা শুনে, চোখ কপালে তুলে শুধাল, 'এই কারণে তুমি আমার ওপর মেজাজ দেখাচ্ছ? এই সামান্য কারণে?'
'এটা তোমার কাছে সামান্য?' সৌম্য এবার মুখোমুখি তার, 'আমি চাকরি করি না, দুটো টিউশনি করে নিজের খরচ চালাই। এই সংসারে আমার কন্ট্রিবিউশন সামান্যই। তার ওপর বিয়েটা করলাম; ভেবেছিলাম তুমি মায়ের নিজের মেয়ে হয়ে উঠবে। তা না করে তুমি নিজেকে গুটিয়ে রাখো, কারো সাথে হাসো না, মাতো না, আমার বোনগুলোর সঙ্গেও খারাপ ব্যবহার করো...'
আদিবা স্তব্ধ হয়ে গেল।
'আমি... আমি খারাপ ব্যবহার করেছি? কার সঙ্গে? বলো আমাকে!'
'বড় মা আমায় কল দিয়ে সব জানিয়েছেন।'
আদিবার ঠোঁটে এবার ফুটে ওঠে তিক্ত হাসি, 'ও আচ্ছা! তার মানে ওনার কানে দেওয়া হয়ে গেছে?'
সৌম্যর মেজাজ আরও বিগড়ে গেল।
'কথা সাবধানে বলবে। কানে দেওয়া মানে কী? উনি কি কোনো কুচক্রী মহিলা নাকি?'
'আমি তা বলিনি সৌম্য! তুমি আজকাল আমার কোনো কথাই বুঝতে চাও না। একবার অন্তত আমার পক্ষ থেকে শোনো আসলে কী হয়েছিল।'
'কী শুনব? বলো।'
'মিশিই আগে আমার সাথে খারাপ ব্যবহার করেছে। আমাকে অপমান করে বলেছে, এই বাড়িতে আমার একমাত্র জোর হলো তোমার স্ত্রী হওয়া। এর বাইরে নাকি আমার কোনো পরিচয় নেই। ও বাড়ির মেয়ে, তাই ওর সাথে নাকি হিসেব করে কথা বলতে হবে...'
জবাবে সৌম্যর নির্লিপ্ত কণ্ঠস্বর, 'ও তো ভুল কিছু বলেনি। মিশির সঙ্গে নিজেকে মেলাতে যেয়ো না। আমাদের বাড়ির মেয়েরা কেউ এভাবে বিয়ে করে বাড়ি ছাড়েনি!'
'সৌম্য!!' এ পর্যায়ে আর্তনাদই করে উঠল মেয়েটা। তার সৌম্য তাকে আজ এই খোঁটা দিল?
সৌম্য নিজেও বুঝতে পারল কথাটা একটু বেশিই রূঢ় হয়ে গেছে। তাই আর কথা না বাড়িয়ে গটগট করে বাথরুমে ঢুকে গেল। আদিবা পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইল মাঝঘরে। চোখের জল গাল বেয়ে কোথায় গিয়ে পড়ছে, সেদিকে তার খেয়াল নেই।
বাবার বাড়ির দরজা তার জন্য চিরতরে বন্ধ, আর এখানে ভালোবাসার মানুষটার সঙ্গেও প্রতিদিন সম্পর্কের দূরত্ব বাড়ছে। আদিবা ভাবছে, ভালোবাসার পরিণতি তো এমন বিষাদময় হওয়ার কথা ছিল না!
★★★
মুঠোবন্দি করে ধরে রাখতে চাওয়া সময়গুলোই যেন বাতাসের চেয়েও দ্রুতগতিতে বয়ে চলে। বিকেলের আজ ঠিক তেমনই মনে হচ্ছে। ক্যালেন্ডারের পাতাগুলো কী করে একে একে উল্টে গেল, তা সে নিজেও জানে না। সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে পেরে ওঠা বড় দায়; সে বুঝি আজ এক অদৃশ্য প্রতিযোগিতায় নেমেছে- অবিরাম ছুটে চলার এক তীব্র নেশা সময়ের গায়ে।
সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসতেই বাড়ির ভেতর একটা সাজ সাজ রব পড়ে গেল। সবাই মিলে মার্কেটে বের হবে। মূল উদ্দেশ্য- রোদ্দুরের বিদেশ যাত্রার প্রস্তুতি। কিছু প্রয়োজনীয় কেনাকাটা আর তার সাথে পুরো পরিবারের একত্রে বাইরে ডিনার।
বিকেলের খুব ইচ্ছে করছে সবার সাথে যেতে, ভিড়ের মাঝে মিশে একটু আনন্দ খুঁজে নিতে। কিন্তু পরক্ষণেই একরাশ বিষণ্ণতা এসে ওকে জাপ্টে ধরল। সে তো এই পরিবারের কেউ না! র:ক্ত বা নামের কোনো বাঁধন নেই যে হুট করে সবার সঙ্গী হওয়া যায়। মনের গহীনে যাওয়ার তীব্র আকুতি থাকলেও, বাস্তবের দেয়ালটা বড্ড উঁচুতে যে!
মন খারাপ করে ছাদে এসে দাঁড়িয়েছে ও তাই। মাথার উপর বিস্তীর্ণ বড় আকাশটা দেখছে। আর চোখ বেয়ে নেমে আসা নোনাজলে ভিজে যাচ্ছে ওর চিবুক, গলার কাছটা। আর দুটোদিন মাত্র! তারপর প্রিয় মানুষটা পাড়ি দিবে অনেক অনেক দূরে...হাজার মাইলের চেয়েও বেশি দূরত্ব তৈরি হবে দু'জনের মাঝখানটায়! কি হবে তারপর? বিকেল জানে না।
'ঘাড়টা উলটে ভেঙে পড়বে তো!'
হঠাৎ করেই চির পরিচিত মানুষের কণ্ঠস্বর ভেসে এলো কানে। বিকেল একটুও চমকালো না। এই মুহূর্তে মানুষটা যে আসবে- তা যেন জানত ওর তৃষার্ত মন। এমনকি, চোখের জল আরও বাড়ল তাতে। চলে গেলে কে তাকে ডাকবে এভাবে, হুটহাট করে? কার সঙ্গেই বা খোশগল্পে মেতে উঠবে বিকেল?
দু'হাতে চোখজোড়া চেপে ধরে মুছে নেওয়ার এক ব্যর্থ চেষ্টা করল সে। রোদ্দুর ততক্ষণে ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে তার পাশের জায়গাটা দখলে নিয়েছে। রেলিংয়ে হাতের কনুই দিয়ে ভর দিয়ে আকাশের গায়েই চোখ রাখল ছেলেটা। বলল, 'বেশি কাঁদলে মানুষ অন্ধ হয়ে যায়।'
বিকেল ও জবাব দিলো ভেজা কণ্ঠেই, 'হলে হোক। ভালো হবে।'
'তাই?' রোদ্দুরের কণ্ঠে মৃদু সংশয়।
বিকেল অপলক চেয়ে থেকে শান্ত স্বরে বলল, 'আপনাকে তো আর দেখতে পাব না এরপর। অন্য কাউকে দেখে আর কী হবে? তার চেয়ে দৃষ্টিহীন হয়ে থাকাই ভালো।'
রোদ্দুর একটু হেসেই বলল, 'আমি কি মারা যাচ্ছি?'
'আমার জন্য তো কিছুটা তেমনই!'
'যেমন?'
'আপনি দূরে চলে যাচ্ছেন, চোখের আড়ালে চলে যাচ্ছেন। আপনার এই প্রস্থান আমার কাছে জীবন্ত দাফনের মতো!'
রোদ্দুর স্থির হয়ে তাকাল অসম্ভব মায়াবতী মুখটার উপর। আবারও মৃদু সংশয়ে শুধাল, 'তাই?'
বিকেলের চোখে শ্রাবণের মেঘ। সে ধরা গলায় বলল, 'এতদিন আপনি ছিলেন, আপনার ছায়ার সাথে আমিও ছিলাম। আপনি চলে যাবেন, আর আমার ভেতর থেকে আত্মাটাও বুঝি আপনার পিছু পিছু চলে যাবে।'
রোদ্দুর দীর্ঘশ্বাস ফেলে শুধাল, 'এত ভালোবাসিস আমায়?'
'আজও কি বুঝতে পারেননি?'
'কই, বলিসনি তো কোনোদিন।'
বিকেল একটু অভিমানে মুখ ফিরিয়ে বলল, 'সব কি মুখ ফুটে বলতে হয়?'
'একবার না হয় ঠোঁট ভেঙে বলেই ফেলতি, ক্ষতি কী ছিল?'
'বলব না। সব অনুভূতি শব্দের জালে বন্দি করলে মানুষ বড্ড সস্তা হয়ে যায়।'
রোদ্দুর বিকেলের খুব কাছে এসে দাঁড়াল এবারে।
'এসব আজেবাজে কথা কোথায় শুনিস তুই?'
'যা চিরন্তন সত্য, আমি তাই বললাম। এতে আজেবাজে কিছু নেই।'
'সবটাই ভুল,' রোদ্দুর মৃদু প্রতিবাদ করল। 'অনুভূতি প্রকাশ করায় কোনো ভুল নেই বিকেল। ভুলটা হয় ভুল মানুষের কাছে মনের আগল খুলে দিলে।'
বিকেল বিষণ্ণ হাসল।
'কিন্তু বুঝব কী করে - কে ঠিক আর কে ভুল? প্রেমে পড়বার সময়ে সবই তো রঙিন!'
রোদ্দুর খানিকক্ষণ নীরব থেকে বিড়বিড় করে, 'তাও ঠিক!'
'আমি সব সময় ঠিক কথাই বলি, আপনিই শুধু বুঝতে চান না।'
রোদ্দুরের কণ্ঠে অদ্ভুত মায়া ঝরে পড়ে, 'আজ বুঝলাম রে।'
বিকেলের চোখ বেয়ে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল। ক্লান্ত স্বরে আওড়ালো, 'এই অসময়ে বুঝে আর কী হবে! আপনি তো চলেই যাচ্ছেন...'
অপেক্ষা করল না রোদ্দুর আর।
টেনে নিলো মেয়েটাকে। তার মায়াবতী, তার পুতুলটাকে। বিকেল একটুও বিরোধ করে না। চুপটি করে ঢুকে পড়ে কিন্তু দু'হাত মুঠো করে একদম ধরে না ওকে....রোদ্দুর বুঝতে পারে অভিমানিনীর মন। শক্ত করে বুকের খাঁচায় ঢুকিয়ে নেয়। বিকেল নিস্তেজ, অসাড়, শরীরে যেন একচিমটি বল নেই। একদম ছেড়ে দিয়েছে নিজেকে। সঁপে দিয়েছে প্রেমিকের গায়ে...
রোদ্দুর ঘাড়ে মুখ ডুবিয়ে দেয় সহসাই। কেঁপে ওঠে বিকেল, কেঁদে ওঠে। হেঁচকি টানে। দু'হাতে খামচে ধরে রোদ্দুরের পিঠের কাছটা। শার্টের জমিন চিঁরে ফেলতে চায় নখের আঘাতে, ভাঙা কণ্ঠে ফিসফিস করে শুধালো, 'কেন যাবেন? কেন, কেন, কেন? পারবেন আমায় ফেলে যেতে? একটুও কষ্ট হবে না, একটুও না?'
রোদ্দুর ঘোরলাগা কণ্ঠে উত্তর করল, 'তোকে নিয়ে যাচ্ছি তো।'
'কই!'
'এই যে, বুকের ভেতর যতন করে। দেখতে পাচ্ছিস না! পাষাণী...'
'পাষাণ আমি না আপনি! আপনি আস্তো নিষ্ঠুর! আমায় কষ্ট দিচ্ছেন, বুকে আগুন ধরিয়ে দিয়েছেন। আমি নিঃশ্বাস নিতে পারি না, আমার কষ্ট হয়।'
রোদ্দুর বিকেলের মুখটা আঁজলা ভরে তুলে ধরে শুধাল, 'অনেক?'
ভিজে থাকা দুই চোখে প্রিয়তমার মুখখানি কি মায়া নিয়েই না দেখে বিকেল। সিক্ত কণ্ঠে আওড়ে, ফিসফিস করে, 'অনেএএক!'
সঙ্গে সঙ্গে অবিশ্বাস্য কান্ড ঘটালো রোদ্দুর। নিচু হয়ে অধর জোড়া মিশিয়ে দিলো প্রেমিকার অধরে। বিদ্যুৎ স্পৃষ্ট হলো বিকেল। কেঁপে উঠেই থমকে গেল সে। চোখজোড়া বুঁজে নেওয়ার আগে দেখল রোদ্দুরের গাঢ় চোখের চাউনি, কত কাছে...তারপরই এক ফোঁটা চিকচিক করতে থাকা জল। মানুষটাও কাঁদছে বুঝি? সব ভুলে গেল বিকেল। সবকিছু....
কোথায় দাঁড়িয়ে, সময়টা কখন, কেউ কি আসবে বা দেখবে? কোনো ভয়, সংশয় কাজ করল না মনের ভেতর। কেবল মেঘের সংখ্যা বাড়তে লাগল মন আকাশে। বৃষ্টি ঝরল নেত্র গড়িয়ে। সময় কাটতেই ধীরে ধীরে ঠোঁট সরালো রোদ্দুর, রক্তিম লাজে রাঙা প্রেমিকা। তার দিকে চোখ খুলে তাকানোর শক্তিটুকুও অবশিষ্ট নেই আর। রোদ্দুর ঠোঁটের কোণে এক চিলতে মিটমিটে হাসির আভাস ফুটিয়ে তুলে শুধাল, 'এখনো কষ্ট হচ্ছে?'
ঠোঁট ভেঙে জবাব দেবার কায়দা জানা নেই। তাই উপর-নীচ মাথাই দোলালো মেয়েটা। হ্যাঁ জানাল, নাকি না- বুঝতে পারল না রোদ্দুর। সুযোগ পেল, আরও একবার মিশিয়ে দিলো অধর তার। নিঃশ্বাস আঁটকে বিকেলের। হাত-পা শিরশির করে ওঠে। পশম কাঁটা দিলো। ঝনঝন করে শব্দ করছে মন বাড়ি। দ্রিম দ্রিম শব্দে ছাতা পিটিয়ে জানান দিতে চায় তারা, এত উত্তেজনা আর নেওয়া যাচ্ছে না যে...
প্রেমিকের সেদিকে হুঁশ কই? চুমু খেতেই ব্যস্ত যে। এক ফাঁকে কামড় ও বসিয়ে দিলো ছোট করে। বিকেল গোঙায় নাকি অজান্তেই 'আহ' শব্দটা ছিটকে বেরোলো, বোঝা যায় না ঠিক। পরমুহূর্তেই সব চুপচাপ আবারও। কেবল দুটি মানুষের নিঃশ্বাস মিশে একাকার... দূর আকাশে দিনের শেষ রেখাটিও মিলিয়ে গেছে। রাত নেমে আসছে ধরণীর বুকে। কোথা থেকে ভেসে আসছে গানের সুরও,
'আমায় ডুবাইলি রে, আমায় ভাসাইলি রে...
অকূল দরিয়ায় বুঝি কূল নাই রে...'
বিকেলের কর্ণকুহর ভেদ করে ছাপিয়ে পড়ে শব্দ ক'খানি। ওর মনে হয়, এই অক্ষর গুলো একত্রে শব্দ হয়ে বাক্যখানি বুনেছিলই বুঝি তার জন্য! সত্যিই...মানুষটা তাকে প্রেমের সাগরে ভাসিয়েছে...এবার বুঝি ডুবিয়েও ছাড়বে...!
(চলবে)
________
একটু আঙুলে চাপ দিয়ে একটা লাভ রিয়েক্ট দিয়েন, রিকোয়েস্ট রইল! ৯০০ রিয়েক্ট করে দিলেই পরবর্তী পর্ব পেয়ে যাবেন...❤️🥀