#প্রেমের_নির্বাসন - (২৭) [ধামাকা পর্ব]
লেখনীতে - #মৃধা_মৌনি [রোদ-বিকেল স্পেশাল]
(নোটটা পড়ে নিবেন)
_________
দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে আকাশের ক্যানভাসে আজ চাঁদ উঠল বটে, তবে সে এক অসম্পূর্ণ জ্যামিতি। যেন মহাকালের ক্ষুধার্ত কোনো গ্রাস তার অর্ধেকটা শরীর শুষে নিয়েছে। সেই আধখাওয়া চাঁদের ফ্যাকাশে জোছনা চুইয়ে পড়ছে পৃথিবীর গায়ে। সে আলোয় কোনো সজীবতা নেই, কেবল এক মৃতপ্রায় লাবণ্য মিশে। অথচ এই ইট-কাঠের অরণ্যে ওই মরা আলোকেও চেনার উপায় নেই। এখানে রাত্রি নামে কৃত্রিম রূপটান মেখে; সোডিয়ামের হলদেটে আভা আর নিওন আলোর ভিড়ে আকাশের নিজস্ব বিষণ্নতা ম্লান হয়ে যায়।
অমাবস্যার গাঢ় অন্ধকার কিংবা পূর্ণিমার ঐশ্বর্য —এদের প্রকৃত রূপ তো কেবল প্রকৃতির সেই আদিম সান্নিধ্যেই ধরা দেয়, যেখানে যান্ত্রিক কোলাহলের কোনো হরতাল নেই। যেখানে রাজপথের স্ট্রিট ল্যাম্পগুলো মিছিল করে দাঁড়িয়ে থেকে অন্ধকারকে খু ন করে না।
শহরের এক কোণে একটি সরু ধোঁয়ার কুণ্ডলী অলস ভঙ্গিতে আকাশের দিকে হাত বাড়াচ্ছে। কিন্তু শূন্যতা ছোঁয়ার আগেই সে বাতাসের আলিঙ্গনে মিলিয়ে যাচ্ছে নামহীন কোনো গন্তব্যে। আজ হাওয়ার মেজাজটা বড্ড খামখেয়ালি। শীতের আয়ু বোধহয় ফুরিয়েই এল। বিদায়ী সুর বাজছে চারদিকে। তবে যাওয়ার আগে সে তার শেষ কামড়টুকু বসিয়ে দিয়ে যেতে চায়; হাড়কাঁপানো এক হিমেল পরশে জানান দিতে চায় নিজের অস্তিত্ব।
ওই দাপটটুকু সইতে না পেরে ফিনফিনে পাতলা চাদরের দু'ধার চেপে ধরে বিকেল। খানিকটা মাথায় ও তুলে দিয়েছে ঘোমটার ন্যায়। কান জোড়া বরফ শীতল। প্রাণের স্পন্দন হু হু করে কাঁপছে।
রোদ্দুর আধক্ষয়া চাঁদটার থেকে মুখ ফিরিয়ে ভীষণ বিরক্তি নিয়েই চাইলো। বলল, 'সোয়েটার ছাড়া আসে কেউ? কমনসেন্স লেস!'
উত্তরে চুপ করে থাকে না মেয়েটি। বরং তীব্র উত্তাপ মেশানো কণ্ঠে ছুঁড়ে দেয়, 'কে জানত, এমন জায়গায় নিয়ে আসবেন! বুঝতে পারলে কম্বল পেঁচিয়ে বেরোতাম।'
'বা ল পরতি।' খামখেয়ালি মেজাজ তার।
পুনরায় সিগারেট ফুঁকতে আরম্ভ করে।
বিকেলের মেজাজ এমনিতেই আসমান ছুঁয়ে আছে, আরেকটু বেড়ে না সপ্তমেই পৌঁছায় এবার। আশপাশে তাকিয়ে কোনো প্রাণের সন্ধান পায় না, সামনে দাঁড়ানো এই হেয়ালি মানুষটি ছাড়া। কেমন আতংকিত ও লাগে। ঘড়ির কাঁটায় সময় কত'র ঘরে ঘুরছে, কে জানে! নির্ঘাত বাড়িতে এতক্ষণে এক দফা হল্লা হয়ে গেছে। অথচ সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়ানো উনার কোনো চিন্তা আছে? নেই!
ওকে এভাবে কটমট চোখে তাকিয়ে থাকতে দেখে রোদ্দুর আবারও মুখ ফিরিয়ে আনলো। এক ভ্রু নাচিয়ে জানতে চাইল, 'কি দেখছিস?'
'একটা মানুষের মাথার তার কতটুকু ছেঁড়া থাকতে পারে, সেটাই...' উত্তরটা দিতে এক মিনিট ও সময় নিল না ও।
ভাবল, তার এই রূঢ় বা অপ্রিয় সত্যটুকু শুনে মানুষটা হয়তো রাগে ফেটে পড়বে, কিন্তু তাকে হতভম্ব করে দিয়ে অন্ধকারের বুক চিরে হো হো শব্দে হেসে উঠল রোদ্দুর। ওই অট্টহাসি এই নিস্তব্ধ, নিগূঢ় রজনীর গাম্ভীর্যকে কোনো ধারালো ফলার মতো এফোঁড়-ওফোঁড় করে দিল যেন। হাসির প্রতিটি তরঙ্গ বিকেলের বুকে এসে আছড়ে পড়ল এক একটা তীব্র ভয়ের ঢেউয়ের মতো; ধড়াস করে উঠল হৃৎপিণ্ড।
ভয়ে আর বিস্ময়ে বিকেল আবারও আতিপাতি করে চারপাশে তাকাল, যদি কোনো একটা ছায়া বা মানুষের দেখা মেলে! কিন্তু অদ্ভুত এক নিঃশব্দতায় ডুবে আছে চারপাশ। জনমানবহীন এই নিথর রাস্তায় একটি প্রাণের স্পন্দনও নেই। আশ্চর্য তো!
'বার বার এদিক ওদিক কি দেখিস?'
'কি...কিছু না!'
'ভয় পাচ্ছিস?'
'পাওয়ার কথা নয়?'
চুপ করে রইল রোদ্দুর। চোখ জুড়ে তার দুষ্টুমি খেলা করছে। একবার আপাদমস্তক পরখ ও করে নিল মেয়েটাকে। পায়ে ঘরের স্যান্ডেল, ট্রাউজার, টি-শার্ট। চাদরটা জুবুথুবু ভাবে পেঁচিয়ে পরা। মাথায় দুটো বেনী। মুখে একফোঁটা মেকাপের আস্তরণ নেই। শুকনো ঠোঁটজোড়া কেমন করে চেয়ে আছে...তিরতির করে কাঁপছেও বুঝি! ভ্রু যুগল কোঁচকানো, চোখের তারায় আতংক। একটা হাত উঁচু করল স্পর্শ করবে বলে- অমনি মেয়েটা চট করে সরল জায়গা থেকে। চোখের তারায় রাগ মিশিয়ে শুধাল, 'দয়া করে বলবেন, এখানে কেন এনেছেন আমাকে? আপনি না সবার সঙ্গে বেরোলেন, কখন এলেন, কেন এলেন? বাসায় যদি সবাই জানতে পারে, আমি আপনার সঙ্গে আছি, কি হবে, একবার ভেবে দেখেছেন?'
রোদ্দুর ঠোঁট কামড়ে ধরল, 'অত হিসেব কষে কি হবে?'
'কিছু হবে না বলছেন?' বিকেল এগিয়ে এল নিজে থেকেই, 'আপনার সঙ্গে আমায় দু দন্ড একখানে দেখলেই যেখানে সবার এত সমস্যা হয়ে যায়, সেখানে এত রাতে আপনি সবাইকে ফেলে আমাকে নিয়ে এই নির্জন রাস্তায় এসে দাঁড়িয়ে আছেন। এটা জানলে বোমা ফাটতে বাকি থাকবে?'
'ফাটলে ফাটুক। তুই না পুড়লেই হলো।' দু'হাত ভাঁজ করে দায়সারাভাবে বলে ও।
বিকেলের খুব রাগ লাগল। একে তো বাড়ি থেকে এভাবে বের করিয়ে বাইকে চাপিয়ে হাওয়ায় উড়ে এখানে এসে শুধু শুধু দাঁড় করিয়ে রাখা, উপরন্তু এই গা ছাড়া ভাব! কতক্ষণ ভালো লাগে!
প্রায় চিৎকারই করে উঠল মেয়েটা, 'মোটিফ কি আপনার? প্লিজ, স্পিক আপ..'
রোদ্দুরের ভীষণ মজা লাগছে। যত বিকেলের রাগ বাড়ছে, ততই পাল্লা দিয়ে ওর ফূর্তি হচ্ছে। কত অনায়াসে চেতে একাকার! অথচ আসল কারণটা যদি জানত, তবে এতক্ষণে দুটো চুমুই খেতো নিজে থেকে... হুহ!!
'কি হলো? কথা বলছেন না কেন? ওই যে, ঠোঁটের কোণে আবার হাসি!! রোদ ভাইয়া!!' চিল্লাতে লাগল বিকেল, দাঁত কিড়মিড় করে শুধাল, 'প্লিইইইইজ! আমার একদম ভালো লাগছে না! প্লিইইইইইজ...'
চোখে পানি এসে জমে অকারণেই। ভয়, আতংক নাকি অন্যকিছু- গাঢ় হয়ে ভীষণ। অভিমান ও হলো অল্পস্বল্প। নাকের ডগায় কয়েক ফোঁটা ঘাম উঁকি দিয়ে আছে, তাই মুছিয়ে দিতে এক আঙুল তুলল রোদ, বলল, 'তোকে দিয়ে প্রেম হবে না। প্রেমে বুকের পাটা লাগে, তোর আছে কেবল দুইটা ফুসফুস। হৃদয় বলতে কিচ্ছু নেই।'
জবাব না দিয়ে ভেজা চোখেই তাকিয়ে রইল মেয়েটা।
পণ করেছে যেন, আর একটা শব্দ ও উচ্চারণ করবে না সে। রোদ্দুর আলগোছে ওর নাকটা টিপে দিল পরে...
কথায় যোগ করল, 'এই যে আকাশে কি সুন্দর ক্ষয়ানো চাঁদ, এই যে আশেপাশে কোথাও কেউ নেই, শান্ত, শীতল বাতাস দিচ্ছে প্রকৃতি। এরকম একটা জায়গা প্রতিটা প্রেমিক-প্রেমিকের কামনায় থাকে জানিস? অথচ তুই...পেয়েও গা করছিস না। বরং আছিস, অন্য দিকের ধান্দায়...'
একটু আগের করা পণ নিমিষেই ভুলে গেল মেয়েটা। কণ্ঠ ভার করে শুধাল, 'এছাড়া আর কি করার আছে!'
'অনেক কিছু।' বলেই বা চোখটা টিপে দিলো রোদ, 'হাতটা ধরতে পারিস, কাছে এসে পাশে দাঁড়াতে পারিস, এই বুকে মাথা রেখে কান পাততে পারিস, আবার চাইলে ঠোঁটে একটা...' বাকিটুকু শেষ না করে রহস্যময় হাসি হাসল ছেলেটা।
বিকেল বুঝে নিল। এবং অবাক হলো।
এ কোন রোদ্দুরকে দেখছে সে?
মানুষটা একসময় তার সঙ্গে লেগেই থাকত, নানা রকমের শাস্তি দিতে যার জুড়ি মেলা ভার, সবসময় বকা বকি, চিল্লাপাল্লা করা সেই ব্যক্তিই আজ কিনা এ ধরনের কথাবার্তা বলছে!
বেশি চমকানোর সুযোগ পেল না মেয়েটা, পরমুহূর্তেই শুনতে পেল, রোদ্দুর বলছে, 'আবার কোন ভাবনায় জড়ালি? কোনটা রেখে কোনটা আগে করবি, তাই খুঁজছিস? আই ক্যান হেল্প ইউ...হাগ মি, কিস মি এন্ড....'
বলেই এক হাত দূরত্বে থাকা মেয়েটার কোমর ছুঁয়ে দিল রোদ্দুর, টেনে নিল জড়তাহীন ভাবেই।
বিকেল হৈ হৈ করে ওঠে প্রায়, 'কেউ দেখে ফেলবে! এখানে, এভাবে...' অস্বস্তিতে গুটিশুটি দিয়ে যায়। শেষ শব্দটা উচ্চারণ করেন উষ্মবর্ণ কণ্ঠে, 'ছাড়ুন।'
রোদ্দুর ছেড়ে তো দিলোই না, বরং আরও কাছে টেনে নিল ওকে। তাতে বিকেলের বক্ষ জুড়ে শুরু হলো এক অন্যরকম অশান্তি। একদিকে বাড়ির দুশ্চিন্তা, একদিকে প্রেমিকের আরাধনা... কোনদিকে মন দিবে সে? হাত-পা নাচিয়ে বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতিই সৃষ্টি করল তাই। মোচড় কেটে বলে উঠল, 'উমমম...ছাড়ুন না, প্লিইইইজ।'
সঙ্গে সঙ্গে ছেড়ে দিলো রোদ্দুর। রীতিমতো ছোট খাটো একটা ধাক্কাও দিলো সে। বিকেল চমকালো, খানিকটা মন ও খারাপ হলো। রাগ চেপে গেছে ছেলেটার। কতবার কাছে টানতে চাইছে, অথচ বুঝতে পারছে না! চলেই তো যাবে..তারপর কি আর কেউ এভাবে বিরক্ত করবে তাকে?
বাইকটা সাইড করে রাখা ছিল, সেটার স্ট্যান্ড সরিয়ে চেপে বসে ও। গম্ভীর স্বরটি আওড়ে বলে, 'উঠ।'
আদেশ তো নয়, ধমক রীতিমতো!
বিকেল গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে আসে, বাইকে উঠে বসল না। বরং রোদ্দুরের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে জানতে চাইল, 'তুমি কি আমার উপর রাগ করলে?'
স্বরে নমনীয়তা।
কোকিল কণ্ঠে বলছে এখন! এতক্ষণ তো ঠিকই নাটক করছিল...রাগটা আরেকটু বাড়লো বৈ কি।
ওর দিকে তাকাল ও না। অন্ধকারের মাঝে চোখ রেখে জানাল, 'না।'
'তাকাও আমার দিকে!'
'সময় নেই। ওঠ। বাসায় দিয়ে আসি।'
'আর তুমি? তুমি যাবে না?'
'সেটা আমার ব্যাপার!'
বিকেলের চোখ উপচে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়তেই ও ফটাফট মুছে নিল সেটি। রোদ্দুর দেখার আগেই...গলা টেনে স্পষ্ট ভাষায় বলতে চেষ্টা করে, 'কেন? যাবে না কেন? কি করবে সারা রাত তুমি?'
'ঘুরে বেড়াবো। আজ রাতটা ঘুরব করেই বেরিয়েছি আমি।'
'সঙ্গী নেবে কাকে?'
'যাকে খুশি....বাট তোকে আর না! ওঠ এখন।'
বিকেল আচানক ছোট্ট খরগোশ ছানাটি হয়ে পড়ল যেন। লাজুক লতার ন্যায় লজ্জায় গুটিয়ে মিশে গেল ওই চিতানো বুকের উপর। কান্নার দমকে ওর ছোট্ট শরীরটা কেঁপে উঠতে লাগল থেমে থেমে। রোদ্দুরের রাগ পড়ে গেল। এক হাতে আঁকড়ে ধরল প্রেমিকের বাহু দ্বয়।
বিকেল কাঁদছে, হেঁচকি টেনে তুলছে, আবার ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলছে, 'তুমি যদি আমার উপর রাগ করে থাকো, আমি কীভাবে থাকব বলো তো? তুমি ছাড়া আর কেউ কি আছে আমার? নেই! তুমি জানো, আমি সবসময় কতটা আতংকিত থাকি...সব জেনে বুঝেও কেন আমার উপর এত অভিমান দেখাও? আমি নিতে পারি না তো...'
হৃদয়ের বরফ গলতে এরপর আর এক দন্ড সময় নেয়? রোদ্দুরের ও নিল না। দু'হাতে জড়িয়ে নিলো তারপর। থুতনিটা ওর ছোট্ট মাথার উপর রেখে বলল, 'তোর বিয়ে ঠিক করেছে, এ কথা আমাকে আগে বলিসনি কেন?'
বিকেল মাথা তুলে ভেজা চোখে তাকাল, 'আমি ভাবতাম, তুমি জানো...'
উত্তরে রোদ্দুর দু'দিকে ঘাড় নাড়লো, 'জানতাম না। আমার কানে যেন কিছু না আসে, সেই ব্যবস্থাই করেছিল আব্বু।'
'ওহ। তাহলে এখন কীভাবে জানলে?'
'তৃপ্তির কৃপায়! ও না বললে তো তোকে অন্য কেউ এসে তুলে নিয়ে চলে যেতো।'
'আর তুমি তা হতে দিতে?'
'তো কি করতাম আমি?'
'বারে, ছবিতে দেখি না, নায়িকাকে অন্য কেউ বিয়ে করতে এলে নায়ক কত কিছু করে। প্রয়োজনে মারপিট করে। তুমিও করতে।'
রোদ্দুর হেসে বলল, 'আমি মারপিট করতে পারি? তুই জানিস না, আমার কত নরম মন!'
'আচ্ছা?' দু'চোখে বিস্ময়তা ছাপে এবার, 'তুমি আর নরম মন?'
'তো?' রোদ্দুর বুক চিতিয়ে গর্বের ভঙ্গিতে বলল, 'আমি তো কাউকে হেইই বলেও ধমকাতে পারি না। সেখানে কিনা মারপিট!'
হাসি পেল মেয়েটার, তবে অপ্রকাশিত রেখে মুখে মেকী গাম্ভীর্য টেনে প্রত্যুত্তর করে, 'আমার বেলায় তো হেই, হাই, হুই, হিইই - সব বেরোতো...মারপিট, ঠ্যাঙানি, ঘাউড়ামি - সবকিছু!'
'তুই আর অন্য সবাই কি এক? তুই তো ঘরের মানুষ। তোর সঙ্গে একটু পার্ট নেওয়াই যায় কিন্তু বাইরের মানুষ আমায় সুইট চকোলেট বয় নামেই চেনে। বিশেষ করে আমার ওই ফ্রেন্ডরা...'
নামগুলি উচ্চারণের আগেই বিকেল বলে দিলো, 'হ্যাঁ, হ্যাঁ, জেরিন, তারিন, ফারিন, আরহিন....'
চমকপ্রদ হওয়ার নাটকটা করল রোদ্দুর, 'ও মাই গড!! তোর মনে আছে? বাপরে বাপ...দুর্দান্ত মেমোরি তো!!'
ওরকম প্রশংসায় একটুও খুশি হলো না মেয়েটা; বরং রোদ্দুরের বুকের শক্ত বাঁধন থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য অস্থির হয়ে মোচড়ামুচড়ি শুরু করল এবারে। রোদ্দুর যেন তাতে আরও মজা পেল, আলতো হেসেই ওকে আরও নিবিড় করে জাপটে ধরল।
'কী হলো? যাওয়ার জন্য এত উতলা হয়ে উঠলি কেন?' রোদ্দুরের কণ্ঠে প্রশ্রয়ের হাসি।
বিকেল মুখ ফিরিয়ে নিয়ে ঝঝিয়ে উঠল, 'থাকব না আপনার বুকে। ছাড়ুন আমাকে!'
'এই যে, আবার আপনি শুরু হলো? এই মাত্র না তুমি বলছিলি?'
'আপনি আপনিইইই...নো তুমি তুমি! আপনি একটা অসভ্য, একটা বেয়াদব, একটা আস্ত ফালতু লোক!'
ঠোঁটের হাসিটা আরও চওড়া করে বলল, 'বাপরে! এক নিঃশ্বাসে এতগুলো এলিগেশন? আমি তো রীতিমতো অপরাধী হয়ে গেলাম দেখছি।'
বিকেলের গলার স্বর কিছুটা ধরে আসে, অভিমানে ঠোঁট উল্টে বলে, 'হাসবেন না একদম। সবসময় খালি আমাদের মাঝখানে থার্ড পারসন টেনে আনা... আপনার কি একটুও বাধে না?'
রোদ্দুর ওর চিবুকটা আলতো করে উঁচিয়ে ধরে নরম গলায় বলল, 'আরে বাবা, বাস্তবে তো আর কেউ আসছে না! সামান্য একটু ঠাট্টার কথায় কি এমন হয়? মিছেমিছি কেন রাগ করছিস?'
'বাস্তবেও যেদিন চলে আসবে, সেদিন বুঝতে পারবেন। আমায় মনে করবেন, দূর আকাশের তারা ভরা রাতে আমায় খুঁজে বেড়াবেন আর হাউমাউ করে কাঁদবেন। আর বলবেন, বিকেলের মতো লক্ষ্মী দুনিয়াতে আর একটিও ছিল কিনা সন্দেহ।'
রোদ্দুরের কণ্ঠের চপল উচ্ছ্বাসটুকু হঠাৎ করেই কর্পূরের মতো উড়ে যায়। এক অদ্ভুত স্থিরতা নেমে এল তার অবয়বে। তবে হাতের বাঁধন এক চুলও শিথিল হলো না, বরং বিকেলের অস্তিত্বকে নিজের বুকের সাথে আরও নিবিড় করে মিশিয়ে নিল সে। মেয়েটিও শান্ত হয়ে এসেছে; তার অবাধ্য ছটফটানি থেমে গিয়ে এখন সেখানে জায়গা করে নিয়েছে এক আকাশ অভিমান। মুখটা অন্য দিকে ফিরিয়ে সে যেন নিজের ভেতরের অস্থিরতা লুকাতে চাইল।
রোদ্দুর তার স্থির নেত্র বিকেলের ওপর নিবদ্ধ করে খুব নিচু স্বরে জানতে চাইল, 'হারিয়ে যাবি? বলছিস?'
শব্দটা বিকেলের বুকে তীরের মতো বিঁধল। এই একটা শব্দ যেন কোনোদিন তাদের এই ছোট্ট পৃথিবীর মাঝখানে প্রাচীর হয়ে না দাঁড়ায়, মনে মনে স্রষ্টাকে ডাকল সে। পরক্ষণেই ঘাড় ফিরিয়ে তাকাল প্রিয়তমের চোখের অতল গহ্বরে। নজরবন্দি হওয়ায় কণ্ঠস্বর বুজে এল তার। মাথাটা সামান্য ওপর-নিচ নাড়িয়ে খুব ক্ষীণ স্বরে বলল, 'আমি... আমি আসলে কিছু বলতে চাচ্ছি না।'
কিন্তু রোদ্দুর নাছোড়বান্দা। উত্তরের অপেক্ষায় তার দৃষ্টি আরও তীক্ষ্ণ হয়। পুনরায় শুধাল, 'কোথায় হারাবি? বলে যা।'
বিকেল কিছুটা কাচুমাচু হয়ে পড়ে। অপরাধী স্বরে বিড়বিড় করে জানাল, 'আমি কি একবারও স্পষ্ট করে বলেছি, আমি হারিয়ে যাব?'
'তবে দূর আকাশে তোকে খুঁজতে হবে কেন? এই কথা কেন এল?'
'কথার কথা বলেছি।'
'বলবি কেন?'
'আপনি যে বারবার অমুক-তমুক থার্ড পারসন টেনে আনেন, সেটা বুঝি কিছু না? আর এখন সামান্য একটা কথায় সব দোষ আমার ঘাড়ে চলে এল?'
'হ্যাঁ, এল।' রোদ্দুরের কণ্ঠে একরোখা জেদ, 'আমি তো অন্তত হারিয়ে যাওয়ার কথা বলি না। তুই এই কথা বলার সাহস পেলি কোথায়? তোর কলিজা কি খুব বেশি বেড়ে গেছে? ছিঁড়ে এনে দেখব নাকি কত ইঞ্চি বেড়েছে?'
বিকেল আর তর্কে গেল না। হার মেনে নেওয়ার ভঙ্গিতে মাথাটা নিচু করে ধরা গলায় আওড়াল, 'দেখুন। সব দোষ যখন আমারই, তবে তা মাথা পেতে নিলাম। আপনার যা খুশি দেখুন... যা খুশি করুন!'
'সত্যি?'
বিকেলের সংক্ষিপ্ত উত্তর, 'হুঁ।'
'ঠিক আছে,' রোদ্দুর বিড়বিড় করল।
সময় থমকে দাঁড়াল নিভৃত কোণে। রোদ্দুরের দু'চোখে এক আদিম তৃষ্ণা আর অধিকারবোধের খেলা। উত্তরের জন্য সে এক পলক সময়ও নষ্ট করল না; বরং শিকারি বাজের ন্যায় ক্ষিপ্রতায় মুখ নামিয়ে আনল বিকেলের গ্রীবার ভাঁজে। বিকেলের সারা শরীরে এক অদ্ভুত তড়িৎপ্রবাহ বয়ে গেল। শিউলি ফুলের মতো শ্বেতশুভ্র তার ত্বক আচমকা এক উষ্ণ পরশ পেয়ে শিউরে উঠল। এক অজানা শিহরণে বিকেলের আঙুলগুলো মুঠো পাকিয়ে ধরে রোদ্দুরের শার্টের কলার; এক অদৃশ্য অতল গহ্বরে তলিয়ে যাওয়ার ভয়ে সে কোনো শক্ত অবলম্বন খুঁজছে যেন।
রোদ্দুর থামল না। তার ওষ্ঠাধর আরও নিচে নেমে আসে। যেখানে বিকেলের হৃদপিণ্ডের প্রতিটি ধুকপুকানি এক একটি যুদ্ধের দামামার মতো বাজছে। ঠিক সেই পবিত্র মোহনায়, বুকের সেই নরম ও কোমল অরণ্যে রোদ্দুর একটি নিষ্ঠুর, নিবিড় দংশন বসিয়ে দিল। মুহূর্তের জন্য বিকেলের পৃথিবীটা ওলটপালট হয়ে যায়। একটা তীব্র যন্ত্রণার ঝলকানি তার শিরদাঁড়া বেয়ে মস্তিষ্কে আছড়ে পড়ে, পরক্ষণেই সেই যন্ত্রণা ছাপিয়ে এক ধরনের অবাধ্য মাদকতা তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলল।
বিকেল যেন পাগল হয়ে গেল। এতটা অসংবৃত দূরত্ব, শরীরের সাথে শরীরের এমন নিবিড় মিলন — এ তো তার কল্পনারও অতীত। নিঃশ্বাস ঝোড়ো হাওয়ার মতো উত্তপ্ত, চোখের পাতায় হাজারো জোনাকির মেলা। রোদ্দুর তার সর্বস্ব দিয়ে বিকেলের সুকোমল জমিনে নিজের নাম খোদাই করে দিচ্ছে। কোনো এক প্রবল আকর্ষণে সে লীন হয়ে মিশে যাচ্ছে বিকেলের অস্তিত্বের সঙ্গে।
সময় প্রবাহিত হয়। রোদ্দুর ধীরে ধীরে নিজেকে সরিয়ে নেয়, বিকেলের দুগ্ধধবল ত্বকের ওপর এক গাঢ় নীলাভ আভা ফুটে উঠেছে। দেখে মনে হয়, স্বচ্ছ আকাশে হঠাৎ এক টুকরো কালবৈশাখীর মেঘ এসে থিতু হয়েছে। ওই নীল ছোপের দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল রোদ্দুর। চোখের চাউনিতে বিজয়ী বীরের তৃপ্তি, আবার প্রিয়তমাকে দহন করার এক গভীর মায়া মাখানো মুগ্ধতা। নীল দাগটা কেবল চামড়ার ওপর নয়, ওটা যেন বিকেলের আত্মার গভীরে এক চিরস্থায়ী মোহর মেরে দিয়েছে ছেলেটা। যেন বলে দিতে চাইছে দেশবাসীকে, এই মেয়ে আমার, কেবল আমারই!
স্তব্ধ পথে কেবল দুজনের দ্রুততর হৃদস্পন্দনের শব্দ বয়ে চলে। রোদ্দুর তার আঙুল দিয়ে নীলাভ ক্ষতটা আলতো করে ছুঁয়ে দিল। কণ্ঠস্বর গভীর থেকে গভীরতর হয়ে এক আশ্চর্য গাম্ভীর্যে প্রতিধ্বনিত হয়, 'পানিশমেন্ট পছন্দ হলো?'
বিকেল কোনো উত্তর দিতে পারল না। তার চোখের কোণে এক ফোঁটা মুক্তোর মতো জল টলমল করছ। ব্যথার নাকি প্রাপ্তির, তা সে নিজেও জানে না।
রোদ্দুর আঙুলের ডগায় সেই অশ্রু ফোঁটাটি স্পর্শ করতেই বিকেল মাথা নুইয়ে নিল। অস্পষ্ট গলায় আওড়াল, 'কেন... করলেন?'
রোদ্দুর ভ্রু কুঁচকে শুধাল, 'আমার বউকে আমি করব না তো, কে করবে?'
'আপনার বউ?' বিকেলের দু'চোখে অবিশ্বাস, 'হতে পারিনি তো।'
'হতে কতক্ষণ?' রোদ্দুর নড়েচড়ে সোজা হলো।
প্রিয়তমার দৃষ্টিতে যে বিস্ময়তা ঝরে পড়ছে- তা বড্ড উপভোগ্য। চাবিটা জায়গা মতো ভরে বাইক স্টার্ট করতে করতে বলে, 'ওঠ।'
বিকেল আনমনা প্রায়, কিচ্ছু ভালো লাগছে না কেন যেন। কোথায় যাবে আবার, বাসায় ফিরবে নাকি? প্রশ্ন দুটি মস্তিষ্কে আঘাত হানলেও কিচ্ছুটি বলে না আর। চুপচাপ উঠে বসে। রোদ্দুর ও কথা এগোয় না আর। গতি বাড়িয়ে ছুটে চলে অজানা গন্তব্যে।
বিকেল দু'হাতে জড়িয়ে মাথাটা তার কাঁধে রাখে। চোখ ভরে বারবার পানি ছাপিয়ে উঠছে। এক অদ্ভুত দহনে জ্বলছে হৃদয় বাড়ির সবটুকু। কেন, কোনো উত্তর নেই!
★★★
প্রায় তিরিশ মিনিটের নিরবচ্ছিন্ন যাত্রার পর বাইকটির গোঙানি থামল। এক জীর্ণ হাফ-বিল্ডিংয়ের সামনে এসে দাঁড়াল ওরা। বাড়িটার গায়ে সময়ের ক্ষত স্পষ্ট। চুন খসে পড়েছে জায়গায় জায়গায়, পলেস্তারাগুলো শ্যাওলাধরা স্মৃতির মতো আলগা হয়ে আছে। চারপাশের নিস্তব্ধতা বিকেলের মনে এক অজানা আশঙ্কার জন্ম দিল।
রোদ্দুর বাইক থেকে নেমে হেলমেটটা আলগা করে ছোট করে বলল, 'নাম।'
বিকেলের কণ্ঠে একরাশ সংশয়, চোখে অবুঝ জিজ্ঞাসা। সে বাইক থেকে নেমে ধীরপায়ে দাঁড়াল। চারপাশটা একবার দেখে নিয়ে প্রশ্ন করল, 'এখানে কেন? এই নির্জন পুরনো বাড়িটাতে কেন আনলে?'
রোদ্দুর নিজের জ্যাকেটটা ঠিক করতে করতে নির্লিপ্ত গলায় জবাব ছুঁড়ে দেয়, 'ভেতরে গেলেই সব উত্তর পাবি। চল আমার সাথে।'
বিকেল দমল না। তার বুকের ভেতর একটা ঢিপঢিপ শব্দ শুরু হয়েছে। সে আবারও জানতে চাইল, 'না, তুমি আগে বলো এখানে কী কাজ তোমার? আমাদের এখানে কীসের দরকার?'
রোদ্দুর কিছুটা ধমকের স্বরেই বলে উঠল এবার, 'বলছি তো গেলেই দেখতে পারবি! এত কথা না বাড়িয়ে পা চালা তো।'
বিকেল আর কোনো শব্দ করে না। অভিমানে তার ঠোঁট দুটো একটু ফুলে উঠে, পা দুটো মাটির সাথে আটকে যেতে চাইছে। রোদ্দুর সেই জড়তা কাটিয়ে দেওয়ার জন্যই বিকেলের একটা হাত নিজের শক্ত মুঠোয় পুরে নিল। ওই স্পর্শের উত্তাপ অনুভব করল ঠিকই, কিন্তু আড়ষ্টতা কাটল না তার। চুপচাপ রোদ্দুরের ছায়ার মতো পিছু নিল সে।
ভেতরে পা রাখতেই বিকেলের অস্বস্তি আরও কয়েক গুণ বেড়ে গেল। আগে থেকেই দু-তিনজন যুবক বসে ছিল, তাদের গম্ভীর উপস্থিতি নিচু ঘরটাকে যেন আরও ছোট করে তুলেছে। বিকেল ভীষণ আড়ষ্ট বোধ করল; এমন অচেনা একটা পরিবেশে নিজেকে খুব অসহায় মনে হতে লাগল তার। সে সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে রোদ্দুরের দিকে তাকাতেই রোদ্দুর চোখের ইশারায় তাকে আশ্বস্ত করে। যেন বলতে চাইছে, 'ভয় নেই, আমি তো আছি।'
পরক্ষণেই রোদ্দুর এগিয়ে গিয়ে একজন যুবকের সাথে মুসাফা করে। ধীর স্বরে জানতে চায়, 'আন্টি কোথায়?'
ঘরের গভীর থেকে এক বয়স্কা মহিলার স্নেহমাখানো কণ্ঠস্বর ভেসে আসে সেই মুহূর্তে, 'মেয়েটাকে ভেতরে পাঠিয়ে দাও বাবা। আমি এখানেই আছি।'
রোদ্দুর বিকেলের দিকে ফিরে শান্ত গলায় বলল, 'আন্টি, ও একটু ভয় পেয়েছে। ওকে একটু সহজ করে নিয়েন।' তারপর বিকেলের চোখের দিকে তাকিয়ে মৃদু স্বরে নির্দেশ করে, 'যাও, ভেতরে যাও।'
মেয়েটার চোখেমুখে স্পষ্ট আতঙ্ক। সে নিচু স্বরে প্রায় ফিসফিস করে বলতে চায়, 'কেন? কেন যাব আমি ভেতরে? তুমি কী করতে চাইছো?'
বুঝতে পেরে উপস্থিত সবার দৃষ্টি এড়িয়ে বিকেলের কাছে এগিয়ে আসে ছেলেটা। বিকেলের দু’টি হাত নিজের হাতের তালুতে আগলে ধরে খুব গভীরে তাকিয়ে প্রশ্ন ছোঁড়ে, 'ভালোবাসিস আমায়? সত্যি বাসিস?'
এমন এক পরিবেশে দাঁড়িয়ে এই মুহূর্তে এরকম অসময়োপযোগী প্রশ্নের কারণ বিকেলের মাথায় ঢুকল না। সে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে মাথা ঝাঁকিয়ে কোনোমতে বলল, 'হ্যাঁ, বাসি তো। কেন জিজ্ঞেস করছ এসব?'
'তাহলে আজ আমাকে পাকাপাকিভাবে কবুল করে নাও।'
বিকেলের পৃথিবীটা সঙ্গে সঙ্গে থমকে যায়। স্তব্ধ গলায় সে শুধু উচ্চারণ করতে পারল, 'মানে?'
রোদ্দুর আর কোনো ব্যাখ্যার সুযোগ দিল না। একটি মায়াবী হাসি ছুঁড়ে দিয়ে বিকেলকে ভেতরের ঘরের দিকে আলতো করে এগিয়ে দিল। মেয়েটার আরও অনেক কিছু জানার ছিল, অনেকগুলো প্রশ্ন গলার কাছে দলা পাকিয়ে আসছিল- কিন্তু তার আগেই ভেতরের ঘর থেকে একজোড়া বয়স্ক হাত স্নেহের ছোঁ মেরে তাকে ভেতরে টেনে নিয়ে দরজা বন্ধ করে দেয়।
জীর্ণ দেয়াল আর পুরনো চুনকাম করা ঘরটার ভেতর পা রাখতেই একটা অদ্ভুত নিস্তব্ধতা বিকেলকে গ্রাস করে। বাইরের জগতের ধুলোবালি আর ইঞ্জিনের গর্জন এক লহমায় মুছে গেল যেন। ঘরের কোণে রাখা একটা পুরনো কাঠের আলমারি থেকে ধূপ আর চন্দন কাঠের মিশ্রিত একটা পবিত্র ঘ্রাণ ম ম করছে। জানলার ভাঙা কাঁচ দিয়ে স্ট্রিট ল্যাম্পের টিমটিমে আলো এসে আছড়ে পড়েছে ফ্লোরে বিছানো একটা ধবধবে সাদা চাদরের ওপর।
বিকেল মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইল। তার হাত-পা হিম হয়ে আসছে। সেই সময়ই জানলার ধারের নিচু বিছানা থেকে একজন নারীমূর্তি উঠে দাঁড়ালেন। পরনে শুভ্র সুতির শাড়ি, মাথায় আঁচলটা খুব সযত্নে টানা। তাঁর মুখমণ্ডলে বয়সের রেখা থাকলেও কেমন অদ্ভুত এক জ্যোতি খেলা করছে, দেখলেই মনের মাঝখানটা কীরকম করে ওঠে।
বিকেল কিছু বলতে চাইল, কিন্তু গলা দিয়ে শব্দ সরল না তার। কেবল বড় বড় চোখে আতঙ্কে থমকে রইল সে। মহিলাটি ধীরপায়ে এগিয়ে এলেন। বিকেলের ঠাণ্ডা হয়ে যাওয়া হাত দুটো নিজের উষ্ণ হাতের তালুতে পুরে নেন। মৃদু হেসে খুব নিচু স্বরে বললেন,
'ভয় পাচ্ছ কেন মা? আমি তো বাঘ-ভাল্লুক নই। আর রোদ্দুর... ও তো আমার আরেকটা ছেলে। ওর হৃদয়ে যে মানুষটার জন্য এতখানি আকুলতা, তাকে দেখার খুব শখ ছিল আমার।'
বিকেলের কুঁকড়ে যাওয়া শরীরটা এই প্রশান্ত স্বরে কিছুটা শিথিল হয়ে এল। অবাক হয়ে মহিলাটির দিকে তাকিয়ে রইল সে। তিনি বিকেলকে টেনে নিয়ে নিজের একদম কাছে বসালেন। বিকেলের মনে হয়, এই মানুষটার শরীর থেকে এক ধরণের মায়াবী আভা বেরোচ্ছে, যা মুহূর্তেই মনের সব বিষাদ শুষে নিতে সক্ষম।
মহিলাটি বিকেলের চুলে আঙুল চালাতে চালাতে বললেন, 'তুমি ভাবছো তো, আজ কেন হুট করে এই আয়োজন? কেন রোদ্দুর তোমাকে এখানে এভাবে নিয়ে এল? আসলে মা, সম্পর্ক হলো বাতাসের মতোন, ধরা যায় না কিন্তু অনুভব করা যায়। আর বিয়ে হলো সেই বাতাসের বুকে একটা নোঙর। নৌকো যেমন নোঙর ছাড়া মাঝদরিয়ায় দিশেহারা হয়ে ঘোরে, মানুষও তেমন একটা পবিত্র বন্ধন ছাড়া জীবনের পথে ছিটকে যেতে পারে।'
বিস্ময়তা এবার মুগ্ধতায় রূপ নেয়।
বিকেল হা হয়ে গিলছে কথাগুলি। মহিলাটি তাই দেখে অধরে একটা মৃদু হাসির রেখা ফুটিয়ে তুলে বললেন পুনরায়,
'বিয়ের মানে কেবল দুটো মানুষের এক হওয়া নয় মা। বিয়ে হলো একজনের আমানত অন্যজনের হাতে তুলে দেওয়া। স্বামী আর স্ত্রী হলো একে অপরের ছায়া। রোদ উঠলে ছায়া যেমন শরীরকে ছাড়ে না, দুঃখের দিনেও তারা তেমন একে অপরকে আগলে রাখে। রোদ্দুর তোমাকে আজ এখানে এনেছে কারণ ও তোমাকে স্রেফ ভালোবাসতে চায় না, ও তোমাকে রক্ষা করতে চায়। ও চায় স্রষ্টা আর মানুষের সামনে বুক ফুলিয়ে বলতে — ‘এ আমার অর্ধাঙ্গিনী’...'
একটা ঠান্ডা হাওয়ার দমক বয়ে গেল মেরুদণ্ড বেয়ে। বিকেলের মনে হয়, তার হারিয়ে যাওয়া মা আজ অন্য কোনো রূপে ফিরে এসে জীবনের পাঠ দিচ্ছেন। সে অজান্তেই এই মহীয়সী নারীর স্নেহের আঁচলে নিজেকে সঁপে দিতে চাইল। ঘরটার পুরনো শ্রীহীনতা হঠাৎ করেই এক মায়াবী প্রাসাদে রূপ নেয় যেন।
মহিলাটি বিকেলের কপালে আলতো করে চুমু খেয়ে বললেন, 'আজকালকার দুনিয়ায় মানুষ শুধু মুহূর্ত খোঁজে মা, স্থায়িত্ব খোঁজে না। কিন্তু বিয়ে হলো সেই চিরস্থায়ী অঙ্গীকার, যা মৃত্যুর পরও থেকে যায়। তুমি শান্ত হও, স্থির হও। আর শক্ত হও! লড়াই করে জিতে নাও, যা কিছু তোমার...সৃষ্টিকর্তা সকলের সাথেই থাকেন। তাকে খুঁজে নাও। চেয়ে নাও। আমি দুয়া করি, এই যে তোমার দু'চোখে যত অপ্রাপ্তির আখ্যান দেখতে পাচ্ছি, তা যেন একদিন অলংকার হয়ে তোমার গলায় জড়ায়...'
সইতে পারে না মেয়েটি আর। দুর্বল চিত্ত নেতিয়ে পড়ে। হু হু করে বয়ে চলা নদীর কলতানে ভাসিয়ে দেয় নিজেকে। চোখ দুটি ঝরায় আবারও বৃষ্টি। মহিলাটি সস্নেহে আঙুল দিয়ে তা মুছে নিয়ে নিজের শাড়ির আঁচলে মুছে নিলেন।
ওর মাথায় হাত রেখে বিড়বিড়িয়ে আওড়ালেন, 'সৃষ্টিকর্তা তোমায় তাই দিক, যা তুমি কোনোদিন কল্পনা ও করোনি...'
সে রাতেই বিয়েটা হয়ে গেল দু'জনার। কোনো রাজকীয় আয়োজন ছিল না, ছিল না সানাইয়ের উচ্চকিত সুর কিংবা লোকদেখানো কোলাহল। কোনো এক অলক্ষ্যে লেখা হয়ে যাচ্ছিল এক শাশ্বত উপাখ্যান। জীর্ণ সেই ঘরটির পুরনো দেয়ালগুলো সাক্ষী হয়ে রইল।
বাইরে আকাশের চাঁদটা একফালি হাসির মতো ঝুলে থেকে ক্লান্ত হয়ে ডুবে গেছে দিগন্তের ওপারে। কোনো জ্যোৎস্নার বন্যা নেই, জেগেছিল শুধু অনন্ত নক্ষত্রবীথি। যেন এক বিশাল কৃষ্ণমখমলের জমিনে কেউ দুর্ঘটনাবশত শুভ্র শ্বেত চন্দনের কৌটা ঢেলে দিয়েছে; আর সেই আলোকবিন্দুগুলোই অপলক নেত্রে চেয়ে রইল পৃথিবীর এই নিভৃত কোণে।
পবিত্র শব্দ উচ্চারণের পর যখন ‘কবুল’ শব্দটি তৃতীয়বার ধ্বনিত হয়, বিকেলের বুকের ভেতরটা এক শান্ত সমুদ্রের তটে নরম ঢেউ হয়ে আছড়ে পড়ল যেন। অদৃশ্য কোনো দৈব শক্তিতে রোদ্দুর আর বিকেল মিশে গেল এক অবিচ্ছেদ্য মোহনায়।
শব্দহীন সেই গভীর ক্ষণে, বিকেলের কাঁপা আঙুলগুলো যখন রোদ্দুরের দৃঢ় বাঁধনে আশ্রয় নিল, পৃথিবীর সব অনিশ্চয়তা কর্পূরের মতো মিলিয়ে গেল বাতাসে।
বিয়ের সেই শুভ্র মুহূর্ত কোনো উৎসবের কোলাহল নিয়ে আসেনি; এসেছিল প্রশান্ত এক বিকেলের শেষে নেমে আসা স্নিগ্ধ সন্ধ্যার মতো। সেখানে ছিল না কোনো পরিচিত মুখের ভিড়, সাক্ষী ছিল শুধু নীলচে-কালো আসমান আর অগণিত নক্ষত্রপুঞ্জ। তারা যেন একে একে নেমে আসছিল আশীর্বাদের আলোকরেখা হয়ে।
নক্ষত্রখচিত সেই নির্জন রাতেই শুরু হলো তাদের নতুন পথচলা — যার শেষ সীমানা হয়তো কেবল ওই আকাশই জানে।
হিমেল হাওয়ায় উড়ছে দুজনের চুল। ওরা দাঁড়িয়ে আছে ছাদের কার্নিশ ঘেঁষে। গভীর রাতের নিস্তব্ধ চাদরে ঢাকা পড়েছে শহরটা। উত্তুরে বাতাসের ঝাপটায় এই মুহূর্তে হাড়কাঁপানো শীতে কুপোকাত হওয়ার কথা থাকলেও ওদের শরীর তা মানছে না। বরং এক অজানা প্রেমময় শিহরণ আর উত্তেজনায় দুজনের র:ক্তে যেন উষ্ণতার স্রোত বইছে।
রোদ্দুর বিকেলের ঠিক পেছনে দাঁড়িয়ে। তার এক হাত প্যান্টের পকেটে অবহেলায় গোঁজা, অন্য হাতটি দিয়ে বিকেলকে পেছন থেকে পরম মমতায় আগলে ধরে রেখেছে সে। বিকেলের পিঠ ঠেকে আছে রোদ্দুরের চওড়া বুকে। যেখানে হৃদস্পন্দনের প্রতিটি ধুকপুকানি নতুন সুর তুলছে আজ।
হঠাৎ রোদ্দুর খুব নিচু কণ্ঠে গভীর স্বরে টেনে টেনে ডেকে উঠল, 'বিকেএএএএল?'
বিকেল ঘাড় ফিরিয়ে তাকাতেই তার চোখের মনিতে বিস্ময়ের ঝিলিক দেখা যায়। রোদ্দুরের হাতের দুই আঙুলের মাঝে নক্ষত্রের আলো মেখে জ্বলজ্বল করছে একটা ছোট, নিখুঁত সাদা পাথরের আংটি। ছেলেটার ঠোঁটে এক চিলতে রহস্যময় হাসি। ধীর গলায় আদেশ করে বলল, 'হাতটা দে।'
বিকেল নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না যেন।ঘোরলাগা কণ্ঠে শুধাল, 'এটা কখন আনলে?'
'তা জেনে তোর কী?'
বলেই বিকেলের নরম হাতটা আলতো করে টেনে নিল সে। তারপর অত্যন্ত যত্ন সহকারে তার অনামিকায় পরিয়ে দিল জ্বলজ্বলে শুভ্র আংটিটা। সাদা পাথরটা বিকেলের আঙুলে বসার পর মনে হলো, এক টুকরো নক্ষত্র যেন আকাশ থেকে খসে এসে ওর হাতে ঠাঁই নিয়েছে। আংটিটা পরিয়ে দিয়েই রোদ্দুর থামল না, মেয়েটার শীতল অনামিকায় আলতো করে নিজের ওষ্ঠাধর ছোঁয়াল।
একটা দীর্ঘ চুমু শেষে বিকেলের একদম কানের কাছে মুখ নিয়ে গাঢ় স্বরে আওড়াল,
'এতদিন ছিলি আমার বুকের বাম পাশে থাকা এক
অবাধ্য অধিকার, আর আজ থেকে তুই আমার
নামের সাথে মিশে থাকা — আমার প্রিয়তমা স্ত্রী।
এই আংটিটাকে কেবল পাথরের চোখে দেখিস না রে
মায়ার ডিব্বা, এটা তোর জীবনে আমার
চিরস্থায়ী অস্তিত্বের দলিল।'
আরেকটু ঘনিষ্ঠ হতে হতে ছুঁড়ল, 'ভালোবাসি।'
বিকেলের চোখের পাতা ভিজে এল অদ্ভুত প্রাপ্তির সুখে। পরম আবেশে চোখ জোড়া মুদে নেয় সে।
(চলবে)
______
নোটঃ আজকের পর্বে সর্বোচ্চ রিয়েক্ট - কমেন্ট চাই।
সবার রেসপন্স চাই! পাবো কি? 🥹🥀