#প্রেমের_নির্বাসন - (২৮)
লেখনীতে - #মৃধা_মৌনি
(নোটটা পড়ে নিবেন)
_________
ওরা বাড়ি ফিরলো ভোর বেলায়।
যেটুকু সাহস বুকের মধ্যিখানে জমে ছিল, সবটুকু ফুঁস হয়ে গেল বিকেলের মেইন গেটের কাছাকাছি আসতে আসতে। দাঁড়িয়ে গেল ঢোকবার মুখে সটান হয়ে। রোদ্দুর ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে ধমকাল, 'কি হলো?'
'ভয় করছে।' জড়ানো গলায় উত্তর করল মেয়েটা।
রোদ্দুর ঠোঁট বাঁকিয়ে কটাক্ষের সুরে শুধাল, 'যখন বিয়ে করলি তখন ভয় করল না? তারপর যখন ওসব...করলি, তখন ও ভয় করল না?'
বিকেলের দু'চোখে এক গুচ্ছ বিস্ময় ভর করে, 'ওসব করলাম মানে?' বুঝতে পেরে পরমুহূর্তেই চিৎকার করে উঠল, 'বিয়েটা কি আমি করেছি নাকি আপনি আমাকে ধরে নিয়ে গিয়ে করেছেন? আর ওসব...তো আমি...' বলতে বলতে ঠোঁট শুকিয়ে গেল। জিভ ভিজিয়ে বলতে চেষ্টা করল, 'আমি তো ইচ্ছে করে...' মাথাটা চিবুকের সঙ্গে প্রায় লাগিয়েই শেষ শব্দটা উচ্চারণ করে, 'করিনি।'
'আচ্ছা?'
'হুঁ।'
দুষ্টুমি খেলে গেলে রোদ্দুরের চোখে-মুখে, 'আমিই জোর করে সব করিয়েছি আর আপনি বোবা পুতুল...আপনাকে দিয়ে যা খুশি তাই করানো যায়, তাই তো?' বলতে বলতে ঝুঁকে এল মেয়েটার দিকে, 'তাহলে আরেকবার....' পিঠটা এমন ভাবে স্পর্শ করে পেছন দিক দিয়ে, বিকেল ছলকে উঠে। চমক ভাঙতেই ছিটকে এক হাত দূরত্ব তৈরি করল। দু'ধারে ঘাড় নেড়ে ফিসফিস করে বলল, 'না।'
ভারী আশ্চর্য হওয়ার ভঙ্গিমা করল রোদ্দুর, 'বারে! এখন না কিসে? খুব তো বললেন, জোর করে করিয়েছি আমি, আপনার মত ছিল না। তবে এখনো জোর করেই নাহয় করি...দেখি, আসুন, আসুন এদিকে...খুলুন...' বা চোখটা বিশ্রি ভাবে টিপে দিয়ে আওড়াল, 'সব।'
দু কান চেপে ধরে চোখ বুঁজে নেয় বিকেল, জোরে জোরে বলতে লাগল, 'স্টপ! ছিঃ!'
'লে...এখানে ছিঃ এর কি হলো? বিয়ে করা বউকে করব...তাতে ছিঃ এর কি হলো?'
বিকেল কটমট চোখে তাকাল, 'প্লিজ, তোমার ঢংটা এই মুহূর্তে না! আমরা আগে ঢুকি...'
'হ্যাঁ, আমিও তো ওটাই বললাম...ঢুকবো আমরা...মানে আমি... আসো না বেবি...পিল্লিইইইজ!' বলেই আবার হাত বাড়ালো ছেলেটা। বিকেলকে যেন খামচে ধরবে- এমন মারমুখী ভঙ্গি। বিকেলের চোখ দিয়ে মিনতি ঝরে পড়ে।
'প্লিজ না।' আওড়ায় বিড়বিড় করে, পরমুহূর্তেই সোজা হয়ে ঠোঁট কামড়ে বলে, 'হাঁটতে পারছি না আমি।'
রোদ্দুরের ঠোঁটে গর্বের হাসি, যেন বিরাট বড় রাজ্য জয়ের কাজ করে ফেলেছে সে। বুকে থাবা দিয়ে বলে ওঠে, 'একদিন তোর নাতি নাতনিকে গর্ব করে বলতে পারবি, কেমন ছিল ওদের দাদা। বিয়ের প্রথম রাতেই...' তারপর আবারও চোখটা টিপে দিয়ে বলল, 'হাঁটাচলা বন্ধ করে দিছিল, হু হু হু...' বিশ্রি শব্দে হাসল ও।
বিকেল নাক-মুখ কুঁচকে বলে ওঠে, 'আপনার মতো অসভ্য আমি আর একটাও দেখিনি।'
'তো? বউয়ের কাছে আবার সভ্যতামি কিসের!
আমি ভাই এসব ব্যাপারে একদম সাফ...বউকে এমন ভালোবাসব, অন্য দিকে চোখ দেওয়া তো দূরের কথা, আমাকে ছাড়া কোনো কিছু কল্পনা ও করতে পারবে না।' থেমে হঠাৎ কিছু মনে পড়ে যাওয়ার ভঙ্গিমায় এক ভ্রু নাচাল, 'বাই দ্য ওয়ে, তুই আমাকে ল্যাবাছ্যাবা ভাবছিলি নাকি? সত্যি করে বল...'
বিকেলের কান গরম হয়, নাকের পাটায় একরাশ লজ্জা, তবু কোনোমতে জবাব দেয়, 'এসব ভাবতে যাব কেন?'
'মানে আমাকে নিয়ে ওসব কখনো ভাবিসইনি তুই, তাই না?'
আবারও লজ্জার দমক ছুঁয়ে গেল মেয়েটার শরীর জুড়ে। মনে পড়ে গেল, এক রাতের কথা। ঘুমুতে যাওয়ার আগ মুহূর্তে কি তীব্র আকাঙ্খা নিয়েই না কোলবালিশটিকে চেপে ধরেছিল সে...মানসপটে দৃশ্যটি সচ্ছ টলমল পানির ন্যায় ভেসে উঠল যেন। আর সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুৎ স্পৃষ্ট হলো বিকেল। ঝাড়া দিয়ে লোম দাঁড়িয়ে গেল। রোদ্দুর অবাক হয়, মুখ নামিয়ে মেয়েটির কাছাকাছি এসে জিজ্ঞেস করে, 'কি? ভেবেছিলি সেসব?'
বিকেলের দৃষ্টি রোদ্দুরের ওপর স্থির। এত কাছ থেকে পুরুষালি এই মুখচ্ছবিটি দেখে ওর চেতনায় কেমন একটা অদ্ভুত ঘোর লেগে যায়। বুকের ভেতরটা পরম তৃপ্তিতে সিক্ত হয়ে আসে যখন মনে পড়ে, এই মানুষটি এখন কেবল ওর প্রিয়তম নয়, ওর স্বামী। মহান আল্লাহর পবিত্র কালাম আর শাশ্বত বাক্যের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে রোদ্দুর তাকে নিজের অর্ধাঙ্গিনী হিসেবে গ্রহণ করেছে, যে বন্ধন কেবল ইহকালের নয়, পরকালের অনন্ত সময়ের জন্যও সত্যি।
এই পরম প্রাপ্তির কথা ভাবতেই বিকেলের দুচোখের কোণে অজান্তেই এক চিলতে আর্দ্রতা জমে ওঠে। রোদ্দুর সেই অশ্রুকণাটুকু টের পেতে এক মুহূর্তও দেরি করল না। এক হাতে ওর চিবুকটা আলতো করে উঁচিয়ে ধরে মায়াবী স্বরে শুধাল, 'আবার কী হলো?'
বিকেল মৃদু মাথা নেড়ে নিজের আবেগ সামলে নেওয়ার বৃথা চেষ্টা করে। খুব ক্ষীণ কণ্ঠে বলল, 'নাহ, কিছু না তো।'
'তবে চোখে জল কেন?' রোদ্দুরের দৃষ্টি ওর মনের গভীরে সেঁধিয়ে যাচ্ছে যেন।
বিকেল চোখ সরিয়ে নিয়ে মিথ্যে অজুহাতে বলল, 'কই?'
'আমি তো স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। কেন মিছে বলছিস?'
'বোধহয় বাতাসে কিছু পড়েছে... কোনো ধুলোবালি হবে হয়তো।'
এড়িয়ে যাওয়ার এই ঠুনকো চেষ্টা দেখে রোদ্দুর আচমকা আরও খানিকটা এগিয়ে এল ওর সান্নিধ্যে। কোনো কথা না বাড়িয়ে পরম আবেশে বিকেলের দু চোখে গভীর ও আদুরে দুটো চুমু এঁকে দিল। মেয়েটা নড়ে না, পাথরের মূর্তির মতো স্থির হয়ে ওমটুকু নিজের অস্তিত্বে শুষে নিল। এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো, শীতের সবটুকু হিম বোধহয় ওই উষ্ণ পরশে ধুয়ে-মুছে সাফ হয়ে গেছে।
পরক্ষণেই রোদ্দুর সোজা হয়ে বিকেলের হাতের আঙুলের ফাঁকে নিজের আঙুলগুলো মজবুত করে গেঁথে নেয়। ছোট করে বলল, 'চল।'
একরাশ জড়তা আর আবেশে বিবশ হয়েই হ্যাঁচকা টানে ওর পিছু পিছু এগিয়ে চলে মেয়েটা।
দ্বিতীয় বার কলিং বেলে চাপ দেওয়ার আগেই দরজাটি হাট করে মেলে যায়। শূন্য দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে আছেন লতা। রোদ্দুর অনেকটা লম্বা চাচীর তুলনায়, তাই তাকে টপকে ঘরের ভেতর আর কে আছে দেখতে পেল সহজেই। ছোটরা বাদে বাড়ির সকলেই জেগে বসে আছে একত্রে। একটা ছোট্ট নিঃশ্বাস বেরিয়ে আসে রোদ্দুরের, অতি সন্তর্পণে, পাছে না মেয়েটা টের পেয়ে ভয় বেড়ে যায়!
বিকেলের মাথা নত। কে কোথায়, দেখবার বালাই নেই মোটেও। বরং ভয়ংকর ভাবে উপলব্ধি করছে, যেকোনো মুহূর্তে তার নার্ভ ছিঁড়ে জ্ঞান হারাতে পারে সে। জীবনে কম তো উত্তেজনার সম্মুখীন হলো না। কিন্তু এরকম অনুভব এর আগে কোনোবার হয়নি। পা টা মনে হয় যুদ্ধ করছে দাঁড়িয়ে থাকবার জন্য। এত ভয়, এত আতংক- কেন? কেবলমাত্র তার পারিবারিক কোনো শক্তপোক্ত অবস্থান নেই এ বাড়িতে, তাই?
লতা কণ্ঠস্বর উঁচু করে সবাইকে উদ্দেশ্য করে শুনিয়ে বলে ওঠেন, 'এই যে আসছে মহারাজ আর মহারানী। রাতভর বাড়ির মানুষগুলারে টেনশনে ফেলে রেখে কোন ডোবায় মরতে গেছিলেন আপনারা? শুনি?'
রোদ্দুর স্বাভাবিক স্বরে জবাব প্রদান করে, 'কোথায় আর যাব! যাওয়ার জায়গা আছে নাকি আমাদের...একটু হাওয়া খেয়ে আসলাম চাচী...'
বলতে বলতে ভেতরে ঢোকে সে। হাতে তখনো বিকেলের হাতটি চেপে ধরা। হ্যাঁচকা টানে মেয়েটিকেও ভেতরে আসার তাগাদা দিলো সে। বিকেল নত মস্তকেই ঘরে ঢুকল।
রেহনুমা পাথরের মূর্তির মতো জবাবহীন বসে আছেন। তার পাশেই উমেদ মির্জার আসন। কিছুক্ষণ আগেই মেহেরজান ঘুমিয়ে পড়ায় এ যাত্রায় অন্তত কোনো কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য বা নোংরা বাক্যবাণ শুনতে হলো না বিকেলকে। এটুকুই ওর জন্য বড় স্বস্তি। বিকেল সাহস সঞ্চয় করে, আঁড়চোখে সামনের দিকে তাকাতেই ভড়কে যায়। ওসমান মির্জাও সেখানে উপস্থিত, কিন্তু তিনি একা নন। তাঁর ঠিক পাশেই বসে আছেন এক অচেনা রমণী।
রমণীটির বয়স আহামরি বেশি নয়, ফুপুর চেয়েও হয়তো কম। আঁটসাঁট করে পরা শাড়ির প্রতিটি ভাঁজে তাঁর উদ্ধত যৌবন আর শরীরের বিভঙ্গ মূর্ত হয়ে উঠেছে। বিকেল চোখ ফেরাতে পারে না। এক অদ্ভুত অস্বস্তি আর হাহাকার ওকে গ্রাস করে। তবে কি এই সেই নারী? এই কি তবে ওর মা হওয়ার দাবি নিয়ে আসা নতুন কেউ?
মেয়ের কিংকর্তব্যবিমূঢ় আর বিস্মিত চাহনি দেখে ওসমান মির্জা মনে মনে এক পৈশাচিক আনন্দ অনুভব করলেন। চাউনিতে এক ধরণের দম্ভ আর উপহাস খেলা করছে। যেন তিনি বোঝাতে চাইছেন, বিকেলের মা না থাকলেও তাঁর জীবন থেমে থাকেনি, তিনিও একটা সুন্দর এবং রঙিন জীবন পাওয়ার অধিকার রাখেন।
বিকেলের ব্যথাতুর চোখ জোড়া বাবার শীতল দৃষ্টির সাথে মিলল আচমকাই। কম্পিত হলো ছোট্ট দেহখানি। ওসমান মির্জা গলা খাঁকারি দিয়ে নিস্পৃহ কণ্ঠে প্রশ্ন করলেন সঙ্গে সঙ্গে, 'সারা রাত বাড়ি ছিলি না, কোথায় ছিলি তুই?'
বহু যুগ পর বোধহয় ওসমান মির্জা ওকে 'তুই' করে সম্বোধন করলেন। বিকেলের বুকের ভেতরটা হু হু করে উঠল। খুব ইচ্ছে হলো, সব শাসন-বারণ তুচ্ছ করে দৌড়ে গিয়ে বাবার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে। হাহাকার করে কাঁদে কিছুক্ষণ। মনটা আজ পাহাড়ের মতো ভার হয়ে আছে ওর। অথচ বাবার পাশে বসা ওই রমণীটির উপস্থিতি একটা অদৃশ্য দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। যেন নীরবে বুঝিয়ে দিচ্ছে, র'ক্তের সম্পর্ক থাকলেও আজ ওসমান মির্জা আর বিকেলের মাঝে যোজন যোজন দূরত্বের এক অতল সমুদ্র তৈরি হয়ে গেছে।
বিকেল কোনো উত্তর দিতে পারল না। জবাব দেওয়ার ভাষাটুকুও ওর ভেতর থেকে হারিয়ে গেছে। সে নিঃশব্দে চোখ সরিয়ে নিল। বুকের ঠিক মাঝখানটায় এক ধরণের অসহ্য যন্ত্রণা আর অশান্তি দানা পাকিয়ে উঠছে। নিজের বাবার কাছেই নিজেকে আজ খুব পরবাসী মনে হচ্ছে ওর। এই যে ভেতরে জমে থাকা এক আকাশ কান্না আর অভিমান- এগুলো ও কাকে বোঝাবে? এই ঘরে যে বোঝার মতো আর কেউ অবশিষ্ট নেই।
ড্রয়িংরুমের থমথমে স্তব্ধতা কাঁপিয়ে দিয়ে রোদ্দুরের কণ্ঠস্বর ভেসে এল তারপর পরই। ওসমান মির্জার প্রশ্নের উত্তরে বিকেলের কিছু বলার আগেই রোদ্দুর ছায়ার মতো মেয়েটার পাশে এসে দাঁড়ায়। ওর শরীরী ভাষায় দুর্ধর্ষ জেদ স্পষ্ট, গলার স্বরে উত্তাপ মিশিয়ে শুধাল,
'তা জেনে আপনি কী করবেন? আপনার মেয়ে কোথায় কী করে, এসব তো এখন আর আপনার মাথা ব্যথার কারণ হওয়া সাজে না।'
কণ্ঠনালি নিসৃত হওয়া প্রতিটি শব্দ চাবুকের মতো আছড়ে পড়ল ওসমান মির্জার পিঠের ওপর। তিনি হতবিহ্বল চোখে বড় ভাইয়ের দিকে তাকালেন।
'রোদ!' উমেদ মির্জা আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। তাঁর কণ্ঠস্বরে জমাট বাঁধা বরফ, 'সাত সকালে হাঙ্গামা করার ইচ্ছে নিয়ে এখানে আসিনি। রাত থেকে তোমরাই শুধু নও, আমরাও উত্তাল সমুদ্রে ভাসছি। আমাদের ফেলে লাপাত্তা হলে, তারপর ফোন বন্ধ করলে, এসবের মানে কী? হাজার চেষ্টা করেও রিচ করতে পারিনি। বাড়ি এসে শুনলাম, শুধু তুমিই নও, ওই মেয়েটাও হাওয়া...আর যখন ফিরলে এই ভোরে, সঙ্গে এই মেয়েটিকে নিয়ে?'
উমেদ মির্জা ধীর পায়ে ছেলের সামনে এসে দাঁড়ান। তাঁর চোখ দুটো শ্যেনদৃষ্টির মতো তীক্ষ্ণ, 'আমি তোমায় শুধু একটা কথাই জিজ্ঞেস করব, চাও কী তুমি?'
পুরো ড্রয়িংরুম জুড়ে আগ্নেয়গিরির পূর্বাভাস। রোদ্দুর বিকেলের হাতটা সবার সামনে শক্ত করে নিজের হাতের মুঠোয় চেপে ধরে আরও একবার। গাছের কাঁপতে থাকা ছোট্ট পাতাটির ন্যায় কাঁপছে মেয়েটির ছোট্ট হৃদয়খানাও! ঠিক সেই সময় রোদ্দুর মাথা উঁচু করে বুক চিতিয়ে বলে বসে, 'আমি বিকেলকে ভালোবাসি বাবা। এটা কোনো ক্ষণিকের মোহ নয়, এটা আমার অস্তিত্বের দাবি। আমি চাই বিকেল আমার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে থাকুক।'
গোটা আকাশটা মাথার উপর পড়লেও বোধহয় এত আশ্চর্য হতেন না কেউ...যতটা না এই কথায় হল। এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা তৃপ্তিই কেবল বিরস মুখে দাঁড়িয়ে,এছাড়া বাকি সকলের চোখেমুখে এক পাহাড় সমান বিস্ময়তার আলোকছটা। সবচেয়ে বেশি, রেহনুমার। তিনি কস্মিনকালেও ভাবেননি, বাবার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে এতবড় তীব্র সত্যটি স্বীকার করে নেওয়ার মতো বুকের পাটা এই ছেলের আছে!
এগিয়ে এলেন লতা এবারে, চোখ জোড়া ফ্যালফ্যাল দৃষ্টিতে চেয়ে শুধু, মুখ থেকে রঙ উড়ে গেছে পুরোপুরি ভাবে। নিজের কানকে বিশ্বাস করতে না পেরে ফের শুধালেন, 'কি বললি বাপ?'
রোদ্দুরের মেজাজ খারাপ লাগলেও উপর দিয়ে শান্তই রইল। হাতের মুঠে কাঁপতে থাকা হাতখানিকে আরও জোর দিয়ে আঁকড়াতে আঁকড়াতে জবাব দিল, 'বললাম, এই মেয়েটাকে আমি ভালোবা...' শেষ হওয়ার পূর্বেই আ'গুনে ঘি পড়ে। লতা সব ভুলে সশব্দে একটা চড় বসিয়ে দেন রোদ্দুরের গালে।
রেহনুমা চেঁচিয়ে উঠে দাঁড়ান, 'লতা!'
উমেদ মির্জা নিজেও বলে উঠেন, 'এটা কি করলে তুমি?'
লতার চোখজোড়া লাল, ঈষৎ র'ক্ত উঠে এসেছে।
কপালের শিরা দপদপ করে জ্বলছে। জীবনে কোনোদিন স্বর উঁচু করে কথা না বলা সে আজ উমেদ মির্জার দিকে চোখ তুলে বলতে লাগলেন, 'এই চড়টা আপনার দেওয়া উচিত ছিল ভাইজান...'
উমেদ মির্জা নিস্তব্ধ।
রেহনুমা তরতর করে এগিয়ে এসে ছেলের দিকে হাত বাড়াতে নিলেন, 'রোদ...'
রোদ্দুর মুখ সরিয়ে নেয় তার আগেই, 'কিছু হয়নি।' বলে গালে একটা হাত রাখে। পাশ ফিরে বিকেলের দিকে তাকাল। মেয়েটা কাঁদছে নীরবে। রোদ্দুর বলে, 'আরে বাবা কিচ্ছু হয়নি। লুক...একদম ঠিক আছি। ওই নরম হাতের চড়ে কি এমন হবে শুনি?'
বিকেল মুখ ফিরিয়ে মাথা নত করে।
দু'চোখে বন্যার জলে ভেসে যাচ্ছে তার।
বুকের ছাতা পিটিয়ে দ্রিম দ্রিম শব্দ করছে কেউ।
এত কষ্ট হচ্ছে তার, যা বলে বোঝানোর নয় কাউকেই...
লতা সমানে চিৎকার চেঁচামেচি করে বলে চলেন, 'আমি আরও বহুত আগেই বলছিলাম, আমার কথা কেউ বাল দিয়েও দাম দেন নাই। এই মাইয়া ওর মায়রে খাইছে, ওর বাপেরে শুরু থেকে অশান্তি দিছে, এখন এই পরিবারটারে খাইতে নামছে। এই মাইয়াই ফুঁসলাইয়া রোদ্দুররে...আমি মানি না। এসব আমি মানিই না...' পরমুহূর্তেই তেড়ে উঠলেন, বিকেলকে মে'রেই ফেলবেন এমন ভাবভঙ্গি তার, 'আমার নিজের পেট দিয়ে জন্ম নিলে তোরে এতক্ষণে কাইট্টা গাঙে ভাসাই দিতাম। নিজের ঘরে নিজের বড় ভাইয়ের লগে প্রেম মারাও...ছিঃ! পতিতার বাচ্চা...'
বিকেলের ভেতরের বাঁধটা এবার ভেঙে পড়ে। এতক্ষণ পাথরের মতো স্তব্ধ হয়ে থাকলেও লতার বিষাক্ত অপবাদ আর সহ্য করতে পারল না সে। বুকফাটা কান্নায় ভেঙে পড়ল মেয়েটা। হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেও অপমানে তার মুখ দিয়ে কোনো প্রতিবাদী শব্দ বেরোলো না; কেবল কান্নার নোনা জলে নরম গাল ভিজে একাকার হয়ে যায়।
কিন্তু রোদ্দুর তো দমে যাওয়ার পাত্র নয়। বিকেলের অসহায়ত্ব তার ভেতরের বারুদে আগুন ধরিয়ে দিল যেন। সে রুদ্রমূর্তি ধারণ করে তীব্র স্বরে গর্জে ওঠে বলতে লাগল, 'চাচী, নিজের মুখটা সামলে কথা বলুন! এখানে যা বলার বা বোঝার, তা আমার বাবা আর ওর বাবা বুঝবেন। তাঁরা দুজনেই এখানে জীবিত বর্তমান। তাঁদের মাঝখানে ফটকামি করার আপনি কে?'
লতা মুহূর্তের জন্য বাকরুদ্ধ হয়ে পড়ে। চরম অপমানে তাঁর চোখমুখ লাল হয়ে উঠল। পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে দেখে তৃপ্তি এবার চপল পায়ে এগিয়ে আসে। মায়ের বাহু শক্ত করে ধরে সামলে নেওয়ার চেষ্টা করতে করতে অনুনয় করল, 'চলো তো মা এখান থেকে! কেন এসবের মাঝখানে অযথা ঢুকছ?'
লতা দাঁতে দাঁত চেপে ফেটে পড়লেন, 'ও কী বলছে শুনতে পাচ্ছিস তৃপ্তি? আমি নাকি ফটকামি করি! এই ভাইজান, আপনার ছেলের মুখে এই আদব? বড়দের সাথে কথা বলার ছিরি এটাই?'
তৃপ্তি এবার মরিয়া হয়ে উঠল। মায়ের জেদ আর রোদ্দুরের ক্ষোভের আগুনে ঘি পড়ার আগেই সে লতাকে একপ্রকার ধাক্কা দিয়ে সরানোর চেষ্টা করে বলল, 'উফ মা, চলো না! কেন ঝামেলা বাড়াচ্ছো? বড় বাবা আছেন তো সবকিছু মেটানোর জন্য, তুমি চলো এখান থেকে...'
রোদ্দুর তখনো শান্ত হয়নি। বিদ্রূপের হাসি মেখে আড়াল থেকে শব্দ ছুঁড়ে দেয়, 'হুম, নিয়ে যা। সামান্য ফটকামি শুনেই এই নাটুকেপনা, অন্য কোনো কড়া শব্দ শুনলে নির্ঘাত স্ট্রোক করে বসবেন। তার চেয়ে চোখের সামনে থেকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।'
লতা কোনো হার না মানা যোদ্ধার মতো পা গেঁড়ে বসেছেন যেন, পণ করছেন আজ এখান থেকে একচুল নড়বেন না। কিন্তু তৃপ্তিও যে নাছোড়বান্দা। সে ডাঙায় তোলা বিশাল কোনো মাছকে জল থেকে টেনে আনার মতো করে সবটুকু শক্তি দিয়ে মাকে ভেতরের ঘরের দিকে টেনে নিয়ে চলল। যাওয়ার পথে মায়ের হাতে দু-চারটে থাপ্পড়ও জুটল তার কপালে, তবু তৃপ্তি তাঁর আঁচল ছাড়ল না; হিড়হিড় করে একপ্রকার যুদ্ধ করেই তাঁকে ভেতরের দিকে নিয়ে যায়।
ওরা চোখের আড়াল হতেই ড্রয়িংরুমের উত্তপ্ত বাতাসটা হঠাৎ করেই অনেকটা স্থির হয়ে আসে। অদ্ভুত, থমথমে নিস্তব্ধতা গ্রাস করল পুরো ঘরটাকে। রোদ্দুর সন্তর্পণে চোরা চাউনিতে বিকেলকে কাঁদতে নিষেধ করে এগিয়ে গেল উমেদ মির্জার উদ্দেশ্যে।
ডাকল, 'বাবা?'
উমেদ মির্জা শান্ত, এত শান্ত তার চোখের চাহনি,
রোদ্দুর নিজেই সামান্য ভড়কে যায়। কি বলবে দিশেহারার ন্যায় খুঁজতে থাকে। পেয়েও যায় শেষমেশ, জিজ্ঞেস করে, 'আমি কি কোনোদিন তোমার কথার অবাধ্য হয়েছি?'
উমেদ মির্জা দু'দিকে ঘাড় নাড়িয়ে না সূচক উত্তর দিলেন, রোদ্দুর পুনরায় জানতে চায়, 'তোমাকে কষ্ট দিয়ে কোনো কাজ করেছি?'
এবারেও উমেদ মির্জা নীরবে ঘাড় নেড়ে না বললেন।
তৃতীয় বার জানতে রোদ্দুর প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল, 'তোমার সম্মানে আঘাত হানার মতো কোনো গুরুতর অপরাধ কিংবা অসম্মান...কোনোটাই আমার দ্বারা হয়েছে বাবা? তুমি কি চোখ বুঁজে আমার উপর আস্থা রাখতে পারোনি?'
উমেদ মির্জা ঠোঁট নাড়িয়ে ছোট্ট একটি শব্দ উচ্চারণ করলেন, 'হ্যাঁ।'
'তাহলে আজ কেন রাখতে পারছ না?
আমি যখন আমার পছন্দের কথা তোমায় জানালাম, কেন এই ধরনের পরিবেশের সৃষ্টি হলো? তোমার অপছন্দ মোতাবেক কোনো কাজ করতে আমার বিবেকে বাঁধতো..আর আজ আমার পছন্দ মেনে নিতে তোমাদের এত দ্বিধা!'
উমেদ মির্জা শান্ত চোখে তাকিয়েই জবাবটা দিলেন, 'আজ তোমার বিবেকে বাঁধলো না তবে?'
এক মিনিট সময় নিয়ে উত্তর করে রোদ্দুর, 'এটা আমার পুরো জীবনের ব্যাপার বাবা!'
উমেদ মির্জার নাসিকাপথ ভেদ করে একটা তপ্ত শ্বাস বেরিয়ে মিশিয়ে গেল ছেলের দেহে। কাঁধে হাত রেখে হতাশার সুর ধরে বলতে লাগলেন, 'শোনো বাবা, আত্মীয় বলে এই মেয়ের প্রতি তোমার মায়া হতেই পারে, কিন্তু ও কি আমাদের ঘরের বউ হওয়ার যোগ্য? আমি চাই তুমি বাইরে যাও, উচ্চশিক্ষা নাও, আর সেখানে নিজের সমতুল্য কোনো মেয়েকে জীবনসঙ্গিনী করো। এই শ্যাওলা ধরা সম্পর্কের পেছনে সময় নষ্ট কোরো না।'
'তোমরা সবাই যাকে শ্যাওলা বলছ, সে আমার কাছে আকাশের নীলিমা।'
'কতক্ষণ রোদ্দুর?'
'যতক্ষণ আমি সজ্ঞানে নিজেকে চিনতে পারব...ততক্ষণই বিকেল আমার!'
উমেদ মির্জা বিমূঢ় হয়ে বললেন, 'তাহলে কি তুমি বাইরে যাচ্ছ না? এটাই তোমার ফাইনাল সিদ্ধান্ত? ওর জন্য নিজের ক্যারিয়ার বলি দেবে?'
রোদ্দুর মাথানিচু করে দাঁড়িয়ে কাঁদতে, কাঁপতে থাকা ভীতু চিত্তের মেয়েটিকে আরেকবার পরখ করে নিয়ে শান্ত সমুদ্রের উত্তাল ঝড়ের গলায় অটল হয়ে প্রত্যুত্তর করল,
'আমি বাইরে যাব বাবা। তোমার স্বপ্ন পূরণ করতে আমি অবশ্যই দেশ ছাড়ব। কিন্তু আমার একটিই শর্ত, আমার সঙ্গে বিকেলও যাবে। বিকেলকে ছাড়া আমি এক পা-ও নড়ব না। ও আমার আকাশ হয়ে আমার সাথেই উড়বে।'
একদণ্ড বিরতি নিয়ে পুনরায় যোগ করল, 'আর তোমরা না চাইলেও বিকেল আমার পাশে থাকবে, এটাই এই দুনিয়া আর আখিরাতের ধ্রুব সত্য।'
ড্রয়িংরুমের বাতাস স্তম্ভিত। ওসমান মির্জার চোখ বিস্ময়ে কপালে, রেহনুমা পাথরের ন্যায় নিশ্চল।
রোদ্দুর বিকেলের হাতটা আবারও শক্ত করে আঁকড়ে ধরে, 'চলো।' বলে পা বাড়ায় ভেতরের ঘরের দিকে। বিয়ের কথাটা সম্পূর্ণ এড়িয়ে যায়, কেন? প্রশ্নটা খচ করে কামড়ে ধরে বিকেলের চিত্ত। কিন্তু এই মুহূর্তে সামান্য নড়বার শক্তিও তার ভেতর অবশিষ্ট নেই যেন। তাই চুপচাপ রোদ্দুরের টানে যেদিকে পথ দেখায়, সেদিকেই উদ্ভ্রান্তের ন্যায় এগিয়ে চলে মেয়েটা।
যেতে পথে ওসমান মির্জার দিকে চেয়ে রোদ্দুর ছুঁড়েও দেয় টিটকারি, 'আপনি আমি একসঙ্গে হিল্লে টা করব... জামাই শ্বশুর... একসাথে... প্রথমবার!! একটা হিস্টোরি ক্রিয়েট হবেনে, শুনতেই আপ্লুত বোধ করছি। বেস্ট অফ লাক...'
ওসমান মির্জা জীবনে কখনো এত অপমানিত হননি বললেই চলে।
(চলবে)
[জলদি ৯০০ লাইক সম্পন্ন করে দিন, বাকি অংশটা আগামীকাল পাবেন তবে]