#প্রেমের_নির্বাসন - (৩০)
লেখনীতে - #মৃধা_মৌনি
(নোট পড়ে নিয়েন, গুরুত্বপূর্ণ)
____________
শহরের নামীদামী বিলাসবহুল রেস্তোরাঁর নিভৃত কোণে বসে আছে দিশা। তার দুই বন্ধু জুনি আর অলিভার আসার কথা থাকলেও দিশা আজ আগেভাগেই চলে এসেছে। হাতে থাকা কাঁচের গ্লাসটায় আনমনে চুমুক দিচ্ছে সে।
জুনি বিয়েটা করেছে ঝোঁপ বুঝে। একজন দাপুটে ব্যবসায়ীর সাথে ঘর বেঁধেছে সে। বিয়েটা পারিবারিক হলেও লোকটা জুনিকে চোখের মণি করে রাখে। আজ থেকে বছর তিনেক আগে তাকে এক বিশাল বাংলোও উপহার দিয়েছে। সেই বাংলোর ছাদে কয়েকবার পার্টিও করে এসেছে দিশা; সেই পার্টির রাজকীয়তা আর আড়ম্বর এখনো চোখে ভাসে।
আর অলিভা? অলিভার কপাল তো রীতিমতো হিরের। এমন এক মাল পটিয়েছে যে লোকটার মাথায় টাক থাকলেও পকেটে আছে অফুরন্ত টাকা। অলিভা অবশ্য মাঝেমধ্যেই দামী দামী সব গিফটের ছবি পাঠিয়ে দিশাদের চোখ ধাঁধিয়ে দেয়। দিশার মনে হয়, লোকটার আড়ালে কালো টাকার কোনো কারবার আছে বোধহয়; নইলে এত টাকা আসে কোত্থেকে! তবে অলিভা কোনো বাঁধনে নেই। সবাই তাকে বউ বলে চিনলেও আদতে সে এক মুক্ত পাখি। আজ এক দেশ তো কাল অন্য শহর—মানুষ আর জীবনকে এক্সপ্লোর করার যে নেশা অলিভার চোখে, তা দিশাকে রীতিমতো ঈর্ষান্বিত করে তোলে।
ওদের তুলনায় দিশা নিজেকে এই মুহূর্তে বড়ই আটকা পড়া এক নারী মনে করছে। কোথায় সেই বর্ণিল জীবন আর কোথায় ওসমান মির্জার মতো এক সাদামাটা ঘরোয়া লোকের পাল্লায় পড়া! স্রেফ আবেগের বশে সব সঁপে দিয়েছিল সে। মাঝখান থেকে কনসিভ করার পর তো আপদ আরও বাড়ল। ওসমান কিছুতেই অ্যাবোর্ট করতে দিল না, একপ্রকার জোর করেই দিশাকে এই সংসারে টেনে নিল। মাঝেমধ্যে একলা থাকলে দিশা নিজের কপাল চাপড়ায়। আবেগের লাগামটা একটু টেনে ধরলে আজ তার জীবনটাও হয়তো অলিভা বা জুনির মতো কোনো জমকালো রাজপ্রাসাদে হতে পারত।
সাত-পাঁচ ভাবনার মাঝেই রেস্তোরাঁর রাজকীয় দরজাটা ঠেলে জুনি আর অলিভাকে ঢুকতে দেখা গেল। ওদের পরনের পোশাক আর মেকআপে আভিজাত্য চুঁইয়ে পড়ছে। দিশা চট করে নিজেকে গুছিয়ে নেয়। হাতের ব্যাগে রাখা আয়নায় নিজের লিপস্টিকটা একবার খুঁটিয়ে দেখে নিল সে। তারপর বন্ধুদের স্বাগত জানাতে চেহারায় এক চিলতে কৃত্রিম হাসি ফুটিয়ে উঠে দাঁড়াল।
জুনি নিজের দামী সানগ্লাসটা মাথার ওপর তুলে ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল, 'শেষমেশ আসতে পারলি তাহলে? আমরা তো ভেবেছিলাম মির্জা ভিলার অন্দরমহলে তুই বুঝি চিরতরের জন্য বন্দি হয়ে গেলি!'
দিশা একটু অপ্রস্তুত হাসে, 'কেন? তোরা কী ভেবেছিলি শুনি?'
'এই তো, ভেবেছিলাম ভাজা মাছটা উল্টে খেতে না জানা কোনো সেকুলার টাইপ আদর্শ গৃহিণী হয়ে যাস কি না!' জুনির কথায় টিটকারির সুর স্পষ্ট।
দিশা কফির কাপে চুমুক দিয়ে নাক সিটকাল, 'আমি আর হাউজওয়াইফ? ইশ! ওসব আমাকে দিয়ে হবে না রে।'
এবার অলিভা তার রেশমি চুলগুলো একপাশে সরিয়ে ঠোঁট বাঁকালো, 'যা একখান ধরলি তুই দিশা! আমাদের কথা যদি শুনতি, তবে আজ তুই এই দেশেই থাকতি না। ওই পরমেশ্বর ছেলেটা তোকে কত ভালোবাসল, কত অফার দিল... সব হেলায় হারালি।'
দিশা একটু দমে গিয়ে বলল, 'ধর্মের ব্যাপারটার জন্যই তো আটকে গেছিলাম রে। হাজার হোক, সমাজ-সংসার বলে তো একটা কথা আছে।'
'ধুর!' অলিভা হাত ঝাড়া দিয়ে অবজ্ঞার স্বরে বলল, 'এই যুগে এসে ধর্ম, বর্ণ, জাত-পাত—এসব নিয়ে কেউ ভাবে? কী বোকা তুই! লাইফটা এনজয় করতে জানলি না।'
দিশা চুপ করে রইল। তার ভেতরে একটা সূক্ষ্ম হাহাকার মোচড় দিয়ে উঠছে। জুনি এবার উৎসুক হয়ে জানতে চাইল, 'তারপর বল, কেমন তোর শ্বশুরবাড়ির লোকজন? তোকে কি সবাই খুব হ্যাপিলি এক্সেপ্ট করে নিয়েছে? তোর ওই হাজবেন্ডের নাকি একটা মেয়ে আছে, শুনেছিলাম?'
ভোঁতা কণ্ঠে বলল দিশা, 'হুঁ, বিকেল নাম। মেয়ে তো নয়, একদম মিস্ট্রেস টাইপ! কাল রাতভর কাজিনের সঙ্গে বাইরে কাটিয়ে আজ ভোরে ফিরেছে। কোনো শাসন নেই, বারণ নেই।'
'ইশ, ছিঃ!' জুনি ঘৃণাভরা চোখে তাকাল, 'আজকালকার ছেলেমেয়েদের মধ্যে কোনো শিক্ষা-দীক্ষা নেই। একটু বড় হতে না হতেই এদের বয়ফ্রেন্ড লাগে। বংশের মুখে চুনকালি মাখাতে এদের একটুও বাধে না।'
অলিভা টিপ্পনী কেটে যোগ করল, 'আরে বুঝিস না কেন, ওসব নোংরামি না করলে তো ওদের হাত-পা ঝিমঝিম করে। শরীর গরম রাখার জন্য একটা পুরুষ তো লাগবেই!'
দিশা নিজের অস্বস্তি ঢাকতে বলল, 'বাদ দে তো ওর কথা। মুখটা নষ্ট করতে চাই না। তোদের খবর বল। জুনি, তুই নাকি থাইল্যান্ড যাচ্ছিস?'
জুনি গর্বিত মুখে হাসল, ডায়মন্ডের আংটি পরা হাতটা নাড়িয়ে বলল, 'হ্যাঁ রে। বার্থডে গিফট! ও তো আমাকে ছাড়া কিছু বোঝেই না। জোর করে নিয়ে যাচ্ছে।'
'মাই গড! লাকি গার্ল!' দিশার কণ্ঠে ঈর্ষামিশ্রিত প্রশংসা ঝরে পড়ে।
'আমিও বালি যাচ্ছি রে,' অলিভা বলে উঠল মাঝে, 'প্রথমে গোয়া যাওয়ার কথা ছিল, পরে আমিই বললাম- ধুর, গোয়ায় আছেটা কী! তার চেয়ে বালি বেস্ট। এই মাসের লাস্টেই ফ্লাই করছি। আজই আমার শেষ মিটিং, এরপর একদম ফিরে এসে দেখা হবে। বাই দ্য ওয়ে, কার কী চাই এখনই বলে রাখ, ফেরার সময় নিয়ে আসব।'
বন্ধুদের রঙিন জীবনের গল্প শুনতে শুনতে দিশার মনটা হঠাৎ বড্ড মরা হয়ে পড়ে। ওরা কত অনায়াসে ফরেন ট্যুর দেয়, দামী উপহার পায়, আর তার কপালে....ওসমান মির্জাও টাকাপয়সা কামায় তবে ততটা না, যতটা হলে এরকম উচ্চ ল্যাভিশিং লাইফ লিড করা যায়। তাছাড়া ওসমান সবসময় চায়, সংসারী গৃহিণী। অথচ দিশার মন টানে বাইরের জগতে। একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল, মেয়েটার নাসিকাপথ ভেদ করে।
'কী হলো দিশা? তোকে বড্ড টায়ার্ড দেখাচ্ছে। ইজ এভরিথিং ওকে?'
অলিভার তীক্ষ্ণ প্রশ্নে দিশার ভাবনার ঘোর কেটে যায়। সে একটু নড়েচড়ে বসে কোনোমতে হাসার চেষ্টা করে বলল, 'হ্যাঁ রে, ঠিক আছি আমি।'
'ডিস্টার্বড হানি? আমাদের বলতে পারিস!' জুনি সহমর্মিতার সুরে দিশার একটা হাত নিজের হাতের মুঠোয় চেপে ধরল।
দিশা এবার আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। একরাশ ক্লান্তি আর হাহাকার তার কণ্ঠে ঝরে পড়ে, 'জানিস, আমার আর কিছুই ভালো লাগছে না। বয়সই বা কত হলো? মাত্র ২৯। এই বয়সে এসে আমি না পাচ্ছি মেন্টালি স্যাটিসফ্যাকশন, না ফিজিক্যালি। ওসমান... ওকে দিয়ে আসলে কিছু হয় না। ও স্রেফ নিজের আদিম চাহিদাটুকু মিটিয়ে নেয়। অথচ আমি এমন কাউকে চাই, যে আমাকে নিয়ে খেলবে, আমাকে নতুন করে উত্তেজিত করবে। ইউ নো... বিভিন্ন পজিশনে, বিভিন্ন ফ্যান্টাসিতে জীবনটাকে রাঙাবে...' দিশা কথার মাঝপথে থামে, তার চোখে একরাশ অপূর্ণ তৃষ্ণা ঝিলিক খেয়ে উঁকি দেয়।
জুনি খানিকটা ভাবুক হয়ে মাথা নাড়ে, বলল, 'হুম, মানুষের ফ্যান্টাসি থাকতেই পারে। ইটস ভেরি ন্যাচারাল। তুই ওঁর সঙ্গে এ ব্যাপারে সরাসরি কথা বলেছিস?'
অলিভা মাঝখান থেকে টিপ্পনী কেটে বলল, 'আরে, বলে লাভ কী? ওই ব্যাটার বয়সটা দেখেছিস? তার ওপর দেখতেই কেমন আনরোমান্টিক। না করে জিম, না আছে সেলফ-মেইনটেইন। এমন মানুষের সঙ্গে কি এসব পসিবল? বোরিং!'
'আমি এখন কী করব বল তো?' এমন ভাবে বলল, যেন সে ভেঙেই পড়েছে এবার। খান খান হয়ে যাচ্ছে তার বসতবাড়ি কিংবা জীবনের শেষ মূলধন টুকুও! চোখে ছলছল করছে পানি...
জুনি অভয় দিল তাই দেখে, 'শোন, অলি তো বাইরে চলে যাচ্ছে, ওর সময় হবে না। আমার ফ্লাইটের এখনো দেরি আছে। তার আগে তুই আমার সঙ্গে চল।'
'কোথায়?'
'পার্টিতে। একটু রিল্যাক্স লাগবে তোর। নতুন পরিবেশ দেখলে মন ভালো হয়ে যাবে।'
দিশা কিছু সময় নিশ্চুপ হয়ে রইল। মনের একদিকে সংসার আর সন্তানের পিছুটান কাজ করছে, অন্যদিকে নিজের অবদমিত ইচ্ছা মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে। ভালো লাগছে না তার কিছু। চেপে চুপে রাখা কান্নাগুলো ঠেলে বেরিয়ে আসতে চাইছে। জুনি আবার জোর দিয়ে বলে উঠল, 'আরে এত কী ভাবছিস? যত নতুন মানুষ এক্সপ্লোর করবি, ততই আনন্দ। অত না ভেবে আমাদের সাথে চল তো।'
'কিন্তু...বাবু?' দিশার গলায় ক্ষীণ সংশয় প্রকাশ পায়।
'ওর বাবা আছে না? সে দেখবে। সব কি তোর একার দায়িত্ব নাকি? তুই জাস্ট চল। দেখবি সব ঠিক হয়ে যাবে। এখন একটা মাইল্ড ড্রিংক নেই তো দেখি, তোর মুডটা আগে সেট করে দিই,' জুনি গ্লাসে পানীয় ঢালতে ঢালতে বলে কথাগুলি।
দিশার মনটা মুহূর্তেই হালকা হয়ে উঠে।
'রিল্যাক্স এন্ড চিল কর। লাইফ একটাই। এডভেঞ্চার না থাকলে মজা নেই, বুঝছিস?' বলেই অলিভা বা চোখটা টিপে দিল। এই চরম একাকীত্বের সময় এমন দুজন বান্ধবী পাশে থাকায় দিশা মনে মনে বড্ড কৃতজ্ঞ বোধ করে।
ক্লান্তির ভারে কখন যে চোখজোড়া বুঁজে এসেছিল, বিকেল নিজেও জানে না সেটা। তবে ঘুমের ঘোরেও একসময় তার বুকের ভেতরটা ভীষণ হাঁসফাঁস করে ওঠে। আবহাওয়াটা খুব একটা তপ্ত নয়, বরং মাঘের শেষ লগ্ন বলে মৃদু শীতের আমেজ এখনো রয়ে গেছে। পাতলা একটা কম্বল গায়ে না জড়ালে চলে না। তবুও বিকেলের কেন যেন দমবন্ধ লাগছিল। ঘুমটা ভাঙতেই সে ধড়মড় করে উঠে বসল। কপালে হাত দিতেই চমকে যায়। কী ভীষণ ঘামে ভেজা তার কপাল! ঘরটাতে কি অক্সিজেনের অভাব হয়েছিল? নাকি কোনো দুঃস্বপ্নের গোলকধাঁধায় হারিয়ে গিয়েছিল সে? কিছুই মনে পড়ছে না সেভাবে।
জানলা গলে ঘরভর্তি দিনের ঝকঝকে আলো এসে পড়েছে। রোদের লুকোচুরি দেখে বোঝা যাচ্ছে, বিকেল হতে এখনো অনেক দেরি। সময়টা দেখার জন্য হাত বাড়িয়ে মোবাইলটা খুঁজল সে, কিন্তু কোথাও নেই। স্পষ্ট মনে আছে, গত রাতে যখন রোদ্দুরের পিছু পিছু ঘর ছেড়েছিল, ফোনটা এই বিছানার ওপরই রাখা ছিল। তবে কি কেউ এসেছিল তার অনুপস্থিতিতে? পরিবারের মানুষগুলো কি ওর ব্যক্তিগত ফোনে হাত দেবে? ভাবনাটা ঝেড়ে ফেলে বিছানা থেকে নেমে আশেপাশে খুঁজতে শুরু করল সে। কিন্তু ড্রয়ার, বালিশের তলা কিংবা টেবিল—কোথাও নেই।
'আজব তো!' আপনমনে বিড়বিড় করে উঠল বিকেল। ঠিক তখনই দরজার কাছে কারো অস্তিত্ব টের পেয়ে সে সচকিত হয়ে ফিরে তাকাল। তৃপ্তি ভাবলেশহীন মুখে দরজার চৌকাঠে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
'কিরে?' ডেকে উঠল বিকেল।
তৃপ্তি ধীরপায়ে ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বলল, 'তোর ঘুম ভাঙার অপেক্ষাতেই ছিলাম।'
'কেন?'
'বড় মা তোকে খুঁজছেন। শরীরটা খুব খারাপ উনার, বিছানা ছেড়ে উঠতে পারছেন না।'
কথাটা শোনামাত্র বিকেলের শিরদাঁড়া বেয়ে একটা হিমশীতল স্রোত বয়ে গেল যেন। সে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে উদ্বেগ ভরা গলায় বলে ওঠে, 'কখন থেকে? আমি তো কিছুই জানি না!'
'সকাল থেকে কয়েকবার এসে তোকে ডেকেছি,' তৃপ্তি একটু থেমে যোগ করল, 'দেখলাম খুব গভীর ঘুমে আছিস, তাই আর বিরক্ত করিনি। তাছাড়া রাতভর জাগনা ছিলি তো...'
তৃপ্তির শেষ কথাটায় বিকেল কিছুটা অপ্রস্তুত বোধ করল। কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে দ্রুত বাথরুমে গিয়ে হাত-মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে নেয়। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে এলোমেলো চুলগুলো বিনুনি করতে করতে সে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। তৃপ্তি অবাক হয়ে তাকে লক্ষ্য করছিল ক্ষণকাল ধরেই। একসময় তাড়া দিয়ে বলল, 'কিরে, বড় মায়ের কাছে যাবি না?'
বিকেল বিনুনি করতে করতেই বলল, 'যাব তো।'
'তাহলে এত সাজগোজ করছিস কেন?'
বিকেল জবাব দিল না। পরমুহূর্তেই কিছু একটা মনে পড়তেই সারা শরীরে নাম না জানা একটা অস্বস্তি বিঁধতে লাগল তার। গত রাতের সব স্মৃতি ভিড় করে আসতেই নিজেকে কেমন অপবিত্র মনে হতে লাগল। অর্ধেক গাঁথা বিনুনিটা এক টানে খুলে ফেলে তৃপ্তির দিকে তাকিয়ে বলল, 'তুই যা, আমি পনেরো মিনিটের মধ্যে আসছি।'
'কেন? আবার কি!'
'আহ, যা না তুই। আমি আসছি।'
বিকেলের ধমকে না চাইতেও বেশ অবাক দেখাল তৃপ্তিকে,
'বিকেল!' ডেকে উঠল বিস্ময় ভরা কণ্ঠে।
বিকেল চিবুক নামিয়ে নত মুখে শেষমেশ বলেই ফেলল, 'একটু গোসল করে আসি।'
'এখন গোসল?' তৃপ্তির চোখদুটো মুহূর্তে ছানাবড়া হয়ে পড়ে। এক মুহূর্তের জন্য সে স্তব্ধ হয়ে বিকেলের মুখের দিকে চেয়ে রইল। সে চাহনিতে যেন অনেকগুলো না বলা প্রশ্নের ভিড়।
বিকেল লজ্জায় আর অস্বস্তিতে নুইয়ে পড়ছে। পারছে না তৃপ্তিকে ধাক্কা দিয়ে ঘর থেকে বের করে দিতে। দ্রুত হাতে ওয়ারড্রব থেকে কাপড় বের করতে করতে ও দরজার দিকে ইশারা করে।
'আমি আসছি রে, তুই গিয়ে বড় মা-কে বল, আমি আসছি।'
তৃপ্তি আরও মিনিট দুই বিমূর্তের মতো দাঁড়িয়ে রইল। বিকেলের নতজানু ভঙ্গি আর অসময়ের গোসলের কারণটা বোধহয় তার কিশোরী মনেও কোনো এক সংকেত দিয়ে গেছে। আর কথা না বাড়িয়ে ধীরস্থির পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ে তারপর। বিকেল ত্বরিত গতিতে বাথরুমে ঢুকে দরজার খিলটা এঁটে দেয়।
★★★
রেহনুমার শরীরের অবনতিটা ঘটল চোখের পলকে। সকাল পর্যন্ত সব ঠিকই ছিল। উমেদ মির্জা গভীর ঘুমে তলিয়ে যাওয়ার অনেক পর পর্যন্ত রেহনুমা বিছানায় একা বসে ছিলেন, শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলেন দেয়ালের দিকে। মনের ভেতর বয়ে চলা উথালপাথাল ঢেউগুলো বোধহয় শরীর আর সইতে পারছিল না। পরে পানি খাওয়ার জন্য কিংবা অন্য কোনো প্রয়োজনে তিনি উঠতে চেয়েছিলেন, আর ঠিক তখনই পৃথিবীটা তার বনবন করে ঘুরে উঠল। তীব্র মাথা চক্কর আর থরথর কাঁপুনিতে তাঁর শরীরটা সজোরে আছড়ে পড়ল মেঝেতে।
সেই পতনের শব্দেই উমেদ মির্জার ঘুমটা টুটে গেল। আধোঘুমে ধড়মড় করে উঠে বসতেই তিনি দেখলেন, মেঝেতে তাঁর সহধর্মিণী নিথর হয়ে পড়ে আছেন। ভাগ্য ভালো যে শব্দটা হয়েছিল, নইলে দীর্ঘক্ষণ ওই হিমশীতল মেঝেতে পড়ে থাকলে অঘটন অন্য মাত্রা নিতে পারত। উমেদ মির্জা দিশেহারা হয়ে তাঁকে পাঁজাকোলা করে বিছানায় তুললেন। কিন্তু অঘটন তাতেও কম কিছু হয়নি বৈকি। রেহনুমার চেনা কণ্ঠস্বর যেন হারিয়ে গেছে কোনো অতল গহ্বরে। দুবার শুধু জড়িয়ে আসা কণ্ঠে ‘বিকেল’ নামটা অস্ফুটভাবে উচ্চারণ করতে পেরেছিলেন, তারপর থেকেই তিনি নির্বাক। স্থির চোখে তাকিয়ে আছেন কড়িকাঠের দিকে, আর অবাধ্য অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে দু'চোখের কোণ বেয়ে।
ঘরের পরিবেশটা এখন বিষাদ আর উত্তেজনার অদ্ভুত মিশেলে জর্জরিত। জানালার ধারে হাত গুটিয়ে নির্বিকার ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে রোদ্দুর। তার দৃষ্টি জানালার ওপারে, হাস্যজ্বল আকাশটার গায়ে চোখ বুলাচ্ছে অযথাই। দীর্ঘক্ষণ ছেলের এই নির্লিপ্ত ভঙ্গি লক্ষ্য করলেন উমেদ মির্জা। তাঁর বুকের ভেতর জমাট বাঁধা কষ্টগুলো ঘৃণার রূপ নিয়ে বেরিয়ে এল এবারে।
তিনি ধরা গলায় বলে উঠলেন, 'রোদ্দুর, তোমার মায়ের যদি আজ কিছু হয়, আমি ভুলে যাব যে তুমি আমার রক্ত, তুমি আমার সন্তান।'
রোদ্দুর খুব ধীরে পেছন ফিরে তাকাল। তার চোখে কোনো অপরাধবোধ আছে কি না বোঝা দায়, কিন্তু চাউনিটা পাথরের মতো স্থির। তবে তাকে চমকে যেতে হলো বাবার চোখের দিকে তাকিয়ে। উমেদ মির্জার মতো কঠোর মানুষটির চোখ আজ টলমল করছে নোনা জলে। বাবা কাঁদছেন?
উমেদ মির্জা পুনরায় বলে উঠলেন, 'এতটা পাষাণ না হলেও পারতে রোদ! এই রেনু তোমায় জন্ম দিয়েছে। ওই মেয়েটাকেও নিজের মেয়ের মতো বুকে টেনে নিয়েছিল। সেই তোমরা দুজনে মিলে ওর পিঠে ছুরিটা মারলে?'
রোদ্দুর শান্ত স্বরে বলল শুধু, 'মায়ের কিছু হবে না বাবা। আমি শহরের সেরা ডাক্তারকে নিয়ে আসব।'
'ডাক্তার? শরীরের ক্ষত ডাক্তার সারাবে রোদ্দুর, কিন্তু মনের যে ক্ষত তোমরা তৈরি করলে, তার মলম কোনো ফার্মেসিতে পাওয়া যায় না। তা কী দিয়ে সারাবে?'
রোদ্দুর নিরুত্তর। উমেদ মির্জা থামলেন না, 'আমার কথা নাহয় ভাবলে না, কিন্তু তাকে তো জানাতে পারতে! তার বিশ্বাসের সাথে এমন বেইমানি না করলেও পারতে। ও তোমার মা রোদ্দুর, মা! মায়ের মূল্য যেদিন থাকবে না, সেদিন বুঝবে। ওই যে ওই মেয়েটা—যাকে তুমি আজ পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ উপহার মনে করছ, ওকেই জিজ্ঞেস করো মা না থাকার যন্ত্রণা কী! ও তো মা হারিয়েছে, আর তুমি থেকেও মাকে মেরে ফেললে।'
রোদ্দুর নিজের ভেতরেই কুঁকড়ে যাচ্ছিল যেন। সে বিড়বিড় করে আওড়াল, 'আমি বলছি তো, কিচ্ছু হবে না মায়ের।'
'চোখের সামনে এইসব আর সহ্য করা যায় না রে।' উমেদ মির্জা ধপ করে বসে পড়লেন তাঁর আরামকেদারায়। কপালে হাত রেখে ডুকরে কেঁদে উঠলেন তিনি। রোদ্দুর চাইছিল এগিয়ে গিয়ে বাবার কাঁধে হাত রাখতে, একটা সরি বলতে কিংবা পরম মমতায় জড়িয়ে ধরতে—কিন্তু একটা অদৃশ্য দেয়াল বুঝি তাকে আটকে দিল। এক অদ্ভুত জড়তা আর অসাড়তা তাকে গ্রাস করে নিয়েছে। নিজের শরীরটাকে বইতে না পেরে সে পিঠটা ঠেকিয়ে দিল জানালার গ্রিলে।
ঠিক সেই মুহূর্তে দরজার চৌকাঠে আরেকটি ছায়া এসে জায়গা করে নেয়। রোদ্দুর আর উমেদ মির্জা — দুজনেই চোখ তুলে তাকায়। বিকেল দাঁড়িয়ে আছে। মেয়েটার ফ্যাকাসে মুখটা জানান দিচ্ছে সে কতটা বিধ্বস্ত।
বিকেলের চোখে সমুদ্র বিস্ময় আর অপরাধবোধ। সে রোদ্দুরের চোখের দিকে তাকিয়ে কিছু একটা খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করছে। হয়তো একটুখানি আশ্রয়, কিংবা এই বিষাক্ত পরিস্থিতির কোনো ব্যাখ্যা। দু'জনের দৃষ্টি মিলতেই নীরবতা আরও গাঢ় হয়ে ওঠে।
এক পা বাড়াতেই উমেদ মির্জা বজ্রকঠিন কণ্ঠে গর্জে ওঠেন, 'খবরদার, আমার সামনে আসবে না।'
কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে পড়ল বিকেল। পুনরায় হতবিহ্বল চোখজোড়া মেলে চাইলো রোদ্দুরের দিকে, প্রতিবাদ কিংবা কিছু বলবে— এই আশায়। অথচ রোদ্দুর আজ গভীর সমুদ্রের মতোই স্তব্ধ, নির্বিকার।
(চলবে)
________
দ্রুত লাইক-কমেন্ট করুন। তাহলে পরবর্তী পর্বটা আগামীকাল পেয়ে যাবেন। পরের পর্বে ধামাকা আছে।
নোটঃ এখন থেকে গল্পটা এলোমেলো ঝড় দিয়েই এগোবে। কখনো একচিলতে হাসি পাবেন, কখনোবা বৃষ্টি। রোমান্স বা শুধুই রোদ-বিকেলকে যারা চান, তাদের এডজাস্ট করতে হবে। এ গল্পের সব চরিত্রই সমান গুরুত্বপূর্ণ!!
পোস্টঃ https://www.facebook.com/share/p/1X2gqjeH31/
ঢুকে একটা লাভ বা কেয়ার রিয়েক্ট চেপে দিয়েন, প্লিজ 😝