ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রেমের নির্বসন

৩১তম পর্ব

লেখক: মৃধা মৌনি

#প্রেমের_নির্বাসন - (৩১)

লেখনীতে - #মৃধা_মৌনি

____________

গুমোট পরিবেশ আরও অস্বস্তিকর হয়ে উঠেছে। রোদ্দুরের তরফ থেকে কোনো কথাই ভেসে এল না প্রতিবাদ স্বরুপ। উমেদ মির্জা আবারও অকারণে চেঁচিয়ে বলে উঠলেন, 'কি হলো? এখনো দাঁড়িয়ে আছ কেন?'

বিকেল চেয়েছিল রোদ্দুরের দিকে, তাই আচানক ভেসে আসা কথায় চমকে উঠতে বাধ্য হলো ও। সেই সঙ্গে কাচুমাচু হয়ে পড়ল বড়। মাথাটা নিচু করে নিল সঙ্গে সঙ্গে। চোখে জমা অবাধ্য জলের ভীড় লুকিয়ে ভেজা স্বরে বলল শুধু, 'আমি কিছু কথা বলতে চাই...' বড় বাবা সম্বোধন করবার মতো সাহস তার ঘটে রইল না আর।

উমেদ মির্জা চেয়ারের হাতল চেপে জোরে জোরে থাবা মেরে ওঠেন, 'তোমার কোনো কথা শুনতে এখানে বসিনি আমি।' পরমুহূর্তেই উঠে দাঁড়িয়ে গরম চোখে রোদকে বলেন, 'ওকে চলে যেতে বলবি? নাকি আরও অসম্মান করার আছে তোর?'

রোদ্দুর নিরুপায়, অসহায় বোধ করছে এই মুহূর্তে। পরিস্থিতি হঠাৎ করেই এত জটিল হলো কেন! তবে এরপর আর চুপ করে থাকা যায় না। তাই নিজে থেকে এগিয়ে এসে বিকেলের মুখোমুখি হয়। মেয়েটাকে দেখে বড্ড খারাপ লাগছে, একবার বুকে জড়িয়ে নিতে ইচ্ছে করছে ভীষণ। অথচ অপরাগ সে...সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হচ্ছে তাকে।

বিকেল চোখ তুলে তাকাতেই রোদ্দুরের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে। কিছু একটা বলতে চাইছিল বুঝি, পেছনে উমেদ মির্জার তপ্ত মুখখানা দেখে পুনরায় থম খেল ও। রোদ্দুর বুঝতে পেরে বলল, 'চল, বাবার মেজাজটা ভালো নেই।'

'আমি কিছু করিনি। আমি বড় মায়ের কাছে থাকব।'

'খবরদার রোদ, ওই মেয়ে যেন আমার ঘরের ছায়াও না মাড়ায়। আমি কিন্তু সব ভেঙেচুরে গুড়িয়ে ফেলব।' উমেদ মির্জা চিৎকার করে বলে উঠলেন।

বিকেল ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল। রোদ্দুর এবার আর অপেক্ষা করে না। ঠেলেঠুলে ওকে বাইরে বের করতে উঠেপড়ে লাগল।

'বিকেল, বের হ। পরে আয়। দেখছিস তো, বাবার মেজাজ চরমে...'

'কিন্তু আমার দোষটা কি?'

'তোর কোনো দোষ নেই। দোষ আমাদের ভাগ্যের। তুই আয়...প্লিজ।'

'আমাকে এভাবে অপমান করছ তোমরা...'

স্তব্ধ হলো রোদ্দুর।

বিকেল কাঁদছে, ঠোঁট কামড়ে ধরে বলছে, 'আমায় এত নিচে নামালে কেন তুমি? আমি তো তোমার কাছে আসিনি। তোমায় ভালোবাসিনি যেচে পড়ে। তুমিই ভালোবাসা তৈরি করেছিলে। আজ যদি তা রক্ষাই না করতে পারো, তবে কেন তৈরি করেছিকে, কেন?'

রোদ্দুর থম ধরা সুরে বলল, 'তুই আমায় প্রশ্নই করছিস বিকেল?'

'হ্যাঁ, করছি। করব না বলো? তোমাদের আমায় নিয়ে এত অসুবিধা, এত সমস্যা, এসব কেন ভাবোনি তুমি? কেন দূরে সরে গেলে না তখন? কেন কাছে টেনে নিয়ে এখন দূরত্ব বাড়াচ্ছ?'

'আমি দূরত্ব বাড়াচ্ছি না রে! আমি শুধু তোকে এ ঘর থেকে চলে যাওয়ার জন্য বললাম।'

'কেন বলবে? আমি কি এমন করে ফেলেছি? তোমার বাবা আমার উপর অযথাই রাগ দেখাচ্ছে, তুমিই বা কেন কিছু বলছ না?'

রোদ্দুরের রাগ চাপলো এবারে।

মাথাটা যে তার ও ঠিক নেই পুরোপুরি।

একদিকে মায়ের ওই অবস্থা, একদিকে আজ রাতে তার ফ্লাইট, আরেকদিকে বাবার নাজেহাল দশা, এখন যদি এই মেয়েটাও তাকে না বোঝে। কোথায় যাবে সে? কার কাছে যাবে আর? কেউ তো নেই তার সে ছাড়া....

'কি বলতাম আমি? তুই-ই বলে দে।'

বিকেল সঙ্গে সঙ্গে পালটা প্রত্যুত্তর করে, 'অনেক কিছুই বলার ছিল। অন্তত বলতে পারতে, ওর তো দোষ নেই, ওকে কেন বকছো?'

'এটা না বলায় আমি তোর কাছে অনেক বড় অপরাধী হয়ে গেলামরে বিকেল?'

'জানি না। কিন্তু আমি চেয়েছিলাম, তোমার প্রতিবাদ..'

'প্রতিবাদ? কার উপর? আমার জন্মদাতা পিতার উপর? মায়ের এই করুণ অবস্থাতে যে মানুষটা অঝোরে কাঁদছে, যাকে আমি আজ পর্যন্ত কোনোদিন ভেঙে পড়তে দেখিনি এতোটা, তার উপর? তার উপর কিসের প্রতিবাদ করব আমি? ভুল তো আমি করেছি!'

কপাল টান টান করে, এক আকাশ সম বিস্ময়তা দু'চোখে জমিয়ে বিকেল উচ্চারণ করে, 'ভুল?'

পরমুহূর্তেই ঝাপসা হয়ে আসে চোখের কার্নিশ। করুণ স্বরটি নাড়ায়, 'আমাকে ভালোবাসা এখন ভুল হয়ে গেল?'

রোদ্দুর কি বলবে ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না।

একটা ইট দিয়ে নিজেই নিজের মাথা ভেঙে ফেলবে নাকি দেয়ালে বারি মেরে ফাটিয়ে ফেলবে? কি বলছে সে, আর কি উত্তরে বলছে এই মেয়ে?

রোদ্দুরের নীরব চাউনি বিকেলের হৃদয়ের আগুন আরও বাড়িয়ে দিলো যেন। দাউদাউ করছে জ্বলতে শুরু করল বুকের মধ্যিখানটায়। হাসল সে, মলিন, ক্রুর হাসি....

'এমনই হয়। আমি দেখেছি তো সিনেমায়, ভালোবাসার আগে এত এত কথা...পেয়ে গেলেই সব শেষ। আমিও বোকার মতো বিশ্বাস করে সবটা দিয়ে এখন সস্তা হয়ে গে...'

বাকি কথা শেষ করার আগেই তীব্র ঝটকার চড়টা এসে পড়ে ওর গালের উপর। বিকেল হকচকিয়ে যায়। থতমত খেয়ে দুই পা পিছায়, পিঠটা দেয়ালে ঠেকল ওর। রোদ্দুরের চোখ দুটি টকটকে লাল বর্ণের। নাকের পাটা কেঁপে কেঁপে উঠছে। বিকেলের ভেঙেচুরে কান্না পেয়ে বসল এখন। মানুষটা তাকে চড় মারতে পারল! সত্য বলার এই প্রতিদান?

রোদ্দুর গর্জন করে বলে, 'তোর জিভ ছিঁড়ে ফেলে দেবো..আর একটা শব্দ যদি উচ্চারণ করিস, কু*ত্তার বাচ্চা! তুই কত দূরের কথা বলে ফেললি...জানিস?'

জানে না বিকেল, কিচ্ছু জানে না।

তার কিশোরী হৃদয় এই মুহূর্তে ভরে উঠেছে অসংখ্য আগ্নেয়গিরির লাভায়। তীব্র দহন তাকে গ্রাস করে নিয়েছে। রাগ, ক্ষোভ, দুঃখ - সব মিলেমিশে একাকার! এমতাবস্থায় যৌক্তিক কথার শোনবার মতো মন মানসিকতা কারো থাকে?

গালে হাত চেপেই ওড়নাটা ঠিক করে বুকে বসায় বিকেল। এরপর হাঁটা দেয় গটগট পায়ে।

রোদ্দুর গম্ভীর কণ্ঠে ডাকে, 'দাঁড়া?'

তাতে একবিন্দু নড়চড় হয় না মেয়েটার। যেভাবে হাঁটছে, সেভাবেই হাঁটতে লাগল। বরং পায়ের গতি আরেকটু বাড়িয়ে দিল যেন।

রোদ্দুরের মেজাজেও আগুন জ্বলে ওঠে। আবার ডেকে ওঠে ছেলেটা, 'এই বিকেইল?'

বিকেলের পিন্ডি চটকাতে ইচ্ছে করে ভীষণ। কিন্তু ততক্ষণে মেয়েটা ধরাছোঁয়ার বাইরে। চলে গেছে করিডোরের বাঁক পেরিয়ে। ওর থপথপ পায়ের শব্দ ও আপাতত পাওয়া যাচ্ছে না। রোদ্দুর কাঁপতে থাকে। না পারতে ঘুষি বসিয়ে দিলো দেয়ালের গায়ে। ব্যথা পেলেও গা করল না। এই মুহূর্তে শারীরিক কষ্টের চাইতেও মানসিক টানাপোড়েন অনেকটাই বেশি।

★★★

বাড়ির এমন নাজেহাল পরিস্থিতির মাঝখানেও আদিবা আর সৌম্যর ঝগড়া ঝামেলা কমছে না এক মুহূর্তের জন্যে। আইরিন বিরক্ত প্রায়। এত ঝৈ ঝন্ড করে বিয়ে করেছিস, তাহলে ভালোভাবে মিলেমিশে থাক না, অথচ না। কে কীভাবে কার পিছনে লাগবে, কাকে উচিত কথা শোনাবে, এসব নিয়েই দু'জনের পাল্লা। যেন কম্পিটিশনে নেমেছে কোনো। এর মাঝখান দিয়ে ছেলেটার পড়াশোনা গোল্লায় উঠেছে। জব খুঁজতে নেমেছে এখনই৷ আইরিন হাজারবার বারণ করা সত্ত্বেও। আদিবার সবকিছু কি আইরিনের পক্ষে জোগানো সম্ভব? আর টিউশন পড়িয়ে কীইবা হয়? আইরিন কি করবেন, কোন দিক সামলাবেন, কিছুতেই কোনো হিসেব করতে পারেন না।

তার রাগ ধরে আদিবার উপর।

মেয়ে নিয়েছেন যেখানে, মেয়ের মতো আগলে রাখছেন, তারপরও মেয়েটা সবসময় গোমড়া মুখে থাকে। চুপচাপ, কথাও বলে না ঠিক করে। আর সৌম্য এসব দেখেই রেগে যায়। তাতে আদিবার কালো মুখ আরও কালো হয়। সবই বুঝতে পারেন আইরিন, বয়স তো কম হয়নি, কিন্তু প্রকাশ করতে পারেন না তিনি। মানুষটার কথা খুব মনে হয় তার। উনি থাকলে আজকে নিজের দুঃখ গুলো বলার মতো একজন তার কাছেও থাকত।

এসব ভাবতে ভাবতেই হাঁটছিলেন তিনি। হাতে ঝাউভাতের বাটি। একটু গাজর, মিষ্টি কুমড়াও ম্যাশ করে দেওয়া। রেহনুমার জন্য। মুখে তুলে চামচে করে খাইয়ে দেবেন। অন্যমনস্ক হয়ে ছিলেন ভীষণ, খেয়াল করেননি, কখন দিশা তাকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার জন্য এগিয়ে আসছে। দিশার এক কানে ফোন, ঠোঁট ভর্তি ঝকমকে হাসি। আইরিনের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ লাগতেই আইরিন মুখ দিয়ে ছোট খাটো একটা চাপা চিৎকার করে দাঁড়িয়ে গেলেন।

দিশা বিরক্ত গলায় বলল, 'এভাবে রিয়েক্ট করার কি আছে? আমি কি তোকে ফেলে দিছি নাকি?'

আইরিন হতভম্ব। এ বাড়িতে কেউ তাকে তুই তোকারি করে না, রেহনুমা বাদে। তাও মাঝে মাঝে, স্নেহের চোটে। আর এই মেয়ে দুইদিন আসতে না আসতেই তাকে তুই করে বলছে!!

ফ্যালফ্যাল চোখে তাকিয়ে থাকতে দেখে দিশার বিরক্তির পারদ আরেকটু বাড়ল। 'কল ব্যাক করছি?' বলে ফোনটা কান থেকে নামিয়ে শুধাল, 'কি ব্যাপার? এমন হা করে কি দেখছিস?'

আইরিন বিস্মিত গলায় উত্তর করে, 'বাড়িতে এত বড় সমস্যা চলছে, আর আপনার ভেতর কোনো হেলদোল নেই? আর এসব কি পোশাক পরেছেন আপনি? এত পাতলা শাড়ি!!'

'হাউ ডেয়ার ইউ!!' দিশা ভ্রু কুঁচকে বলে বসল, 'সাহস হয় কি করে আমাকে এসব কথা শোনানোর! আমার ড্রেসআপ নিয়ে কথা বলার! আমার পায়ের কানাকড়ির যোগ্যতা ও তোর নেই...আর তুই কিনা।'

'ভদ্র ভাবে কথা বলেন। আপনি নতুন দেখে আমি আপনাকে সম্মান দিতেছি, আপনি ও দেন। আমাকে তুই তুকারি করবেন না।'

'বাপরে বাপ! উড়ে এসে জুড়ে বসা তোকে আমার সম্মান দিয়ে কথা বলতে হবে?'

'আমি উড়ে এসে জুড়ে বসেছি, নাকি আপনি উড়ে এসেছেন আমার ছোট ভাইয়ের সংসারে..'

'একটা থাপ্পড় মারলে না বুঝতে পারবি, কে কোথায় উড়ে এসেছে আর জুড়ে বসেছে। বাপের বাড়িতে ছেলে নিয়ে উঠে ভাইদের দয়ায় থাকিস আবার বড় বড় কথা তোর! আমি আমার হাজবেন্ডের ঘরে থাকি। তোর মতো না। তুই তো এমন কপাল পোড়া, জামাইটাও তোর রয় নাই। পরে যে অন্য জায়গায় বিয়েশাদি করবি, নিশ্চয়ই তোর মতো অযোগ্য আজাইরারে কেউ বিয়েও করে নাই।'

'আপনি, আপনি আমাকে...' আইরিন নিজেকে ধরে রাখতে পারেন না আর, চিৎকার করে ওঠে তুমুল স্বরে, 'আমার বিয়ে কেন হয় নাই, সেইটা তোকে ব্যাখ্যা করা লাগবে এখন? আর এইটা আমার বাপের বাড়ি। কোনো ভাইয়ের বাড়িতে আমি দয়া দক্ষিণা করে থাকি না। তুই থাকোস। বিয়া ছাড়া একটা বাচ্চা জন্ম দিছোস। লজ্জা করে না, আবার বড় বড় মুখ করোস।'

'ইউ বিচ!' বলে হাত তুলে দিশা, উদ্দেশ্য শরীরের সবটুকু শক্তি দিয়ে আইরিনের গালে ছাপ বসিয়ে দিবেন। কিন্তু তার আগেই কোথা থেকে সৌম্য এগিয়ে আসে। হাতখানা চেপে ধরে তার। পরমুহূর্তেই ঝটকা মেরে সরিয়ে দিল। ঝামটা খেয়ে পড়ল দিশা। তার রাগ বেড়ে গেল আরও। মাথার ভেতর টগবগ করে ফুটতে লাগল আগুন।

'ছোট ইঁদুর, তোকে আমি...' বলতে বলতে জিভ দিয়ে ঠোঁট ভেজালো দিশা। ফোন বের করে ওসমান কে ফোন করল সঙ্গে সঙ্গে।

ওসমান মির্জা বাড়িতেই ছিলেন, দো'তলা থেকে দেখছিলেন একটা জটলা এখানে, মাঝখানে দিশা দাঁড়িয়ে, তাই ফোন না ধরে সরাসরি নিচে নেমে এলেন। গাম্ভীর্য পূর্ণ কণ্ঠে শুধালেন, 'কি হয়েছে?'

তাঁকে দেখামাত্র কেঁদে ফেলার ঢং করল দিশা। গায়ে পড়ল সকলের সামনেই। ওসমান বিব্রত ভঙ্গিতে মেয়েটাকে এক হাতে সামলে নিতে নিতে পুনরায় প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন, 'হয়েছে টা কি? এত হৈচৈ কেন?'

'ভাইজান, আপনার বউ আমাকে...' আইরিন কথা বলতে শুরু করতেই দিশা তার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বলে ওঠে আহ্লাদী কণ্ঠে, 'আমার এই শাড়িটায় আমাকে কি খুব খারাপ দেখাচ্ছে ওসু? বলো তুমিই!'

ওসমান মির্জা অপ্রস্তুত ভাবে মাথা নেড়ে বললেন, 'না তো।'

'আর তুমিই বলেছিলে, তোমার বোন সবার ছোট। সম্পর্কে আমার ননদ হয়। ননদকে কি আপনি করে বলতে হয়? তুই করেও তো বলতে পারি। তুমি তো তুই করেই বলো, তাই না?'

এবারেও ওসমান মির্জা মাথা নাড়লেন।

দিশা বলল, 'আমি তোমার বোনকে তুই করে বলেছি দেখে সে আমাকে কি বাজে ভাষাটাই না করল। আমাকে বলে কিনা, আমি নাকি বাজারি মেয়ের মতো রংঢং করতে এরকম পাতলা ফালতু শাড়ি পরেছি।'

'আস্তাগফিরুল্লাহ। আমি এ কথা বলিনি ভাইজান।'

আইরিন পারছেন না, কেঁদে দিবেন। দিশা চোখ কটমট করে তার দিকে তাকিয়ে বলল, 'আমি কি মিথ্যা বলছি নাকি? এই মেয়ে, তুমি ওর সামনে আমাকে লায়ার প্রমানিত করছ! আর তোমার ছেলে...কি বড় সাহস, আমার গায়ে কিনা হাত দেয়!!' পরমুহূর্তেই ওসমানের দিকে তাকিয়ে শুধাল, 'ওসু, এই কি তোমাদের পারিবারিক শিক্ষা? বড়দের সঙ্গে এসব করা হয়?'

ওসমান মির্জা ফাটা বাশের চিপায় পড়ে গেলেন বুঝি। একদিকে বোন, অন্যদিকে তার এত সাধের স্ত্রী কাম প্রেমিকা! আইরিন ভালো মেয়ে, ভদ্র তার ব্যবহার, আবার দিশাকেও ঠিক অবিশ্বাস করা যাচ্ছে না। দিশা কেন এতগুলো মিথ্যে কথা বলতে যাবে? তাছাড়া সৌম্যকে দেখেছে, হাত ধরে দাঁড়িয়ে ছিল চাচীর। কেন ধরবে? কে সত্যি তবে?

এসবের মাঝখানে সৌম্য যেন নীরব দর্শক এক।

না কিছু বলছে, না কোনো প্রতিবাদ করছে। কারো দিকে চেয়েও নেই। কোথায় যে আছে তাও জানা নেই। মনে হচ্ছে, ছেলেটা নিজের মধ্যে থেকেও নিজের ভেতর নেই।

আইরিন কেঁদেই ফেললেন ডুকরে, 'ভাইজান, বিশ্বাস করো, আমি ভাবিকে এগুলা বলিনি। শাড়ি নিয়ে বলছি কিন্তু অন্য ভাবে। আর বাড়িতে এতবড় সমস্যা চলতেছে..'

'তুই চুপ কর।' ওসমান মির্জার ভার কণ্ঠস্বর আইরিন কে থামিয়ে দেন, 'দিশা আমাদের মতো না। ওর অনেক কাজ থাকে বাইরে। আর ও এরকম পোশাকেই কম্ফোর্ট ফিল করে। এগুলা এখন থেকে অভ্যাস করে নে। আর বড় ভাইজানের সমস্যার মধ্যে তুই কেন জড়াতে যাচ্ছিস? যা হয় হোক গে...নিজের সংসার নিয়ে ভাব। ছেলে তো একটা ও মানুষ করতে পারিসনি। দেখো না চেহারাটা, গাঁজাখোরের মতো দেখাচ্ছে। বিয়ে একটা পাগলকে করে নিয়ে আসছে কোথা থেকে ধরে, এখন নিজেও পাগল হয়ে যাচ্ছে। এসবে মনোযোগ দে, নাকি আমার বউয়ের দিকে।'

আইরিন যারপরনাই অবাক হন, হতাশ হন, একইসঙ্গে দুঃখবোধ করলেন। দিশা খুশিই হলো। সকলের সামনেই তাঁর গলা জড়িয়ে ধরল এক হাতে। চুমু খাওয়ার জন্য ঠোঁট টা আগাতেই ওসমান সামলে নিয়ে বললেন, 'ঘরে চলো। ঘুমাবে। টায়ার্ড নিশ্চয়ই।'

'ইয়েস ডার্লিং।'

'লাঞ্চ করবে না?'

'আই অলরেডি ডান। ওয়াফি কোথায়?'

'ও খেয়ে ঘুমাচ্ছে।'

'তুমি দেখি ভালোই টেক কেয়ার করতে পারো ছেলেকে...আ'ম ইমপ্রেসড।'

বলতে বলতে দু'জনেই হেঁটে হেঁটে দুলকি চালে প্রস্থান করে জায়গাটার। আইরিন বোবা বনে দাঁড়িয়ে থাকেন ঝিম মেরে। তারপর একসময় আচমকাই পাশ ঘুরে সৌম্যর গালে ঠাটিয়ে একটা চড় বসিয়ে দেন। তাতেও বেচারার কোনো হেলদোল হয় না।

চোখে জল নিয়ে আইরিন গজগজ করতে করতে বলেন, 'তোর মতো ছেলের মা হওয়ার চাইতে নিঃসন্তান থাকা ভালো ছিল। আমার কলিজায় আগুন ধরিয়ে দিলি তুই...আমি আশা করিনি,কোনোদিন আশা করিনি।'

কাঁদতে কাঁদতে চলে গেলেন ভদ্রমহিলা। সৌম্য নির্বিকার, নির্লিপ্ত, তবে কেউ খেয়াল করল না, নয়নজোড়া ঈষৎ লাল বর্ণ ধারণ করেছে...

__________

মির্জা বাড়ি তখন এমনিতেই এতসব অস্থিরতা আর অশান্তির ঘন কালো মেঘে ঢেকে আছে। প্রতিটি দেয়ালে জমে আছে অজানা আশঙ্কার ভার, প্রতিটি নিঃশ্বাসে লেগে আছে আতঙ্কের শীতল ছোঁয়া। ঠিক সেই সময়েই যেন মরার ওপর খড়ার ঘা বসাতে ভাগ্য আরও এক নির্মম অধ্যায় খুলে দিল নিয়তির পাতায়।

বাড়ি থেকে সামান্য দূরত্বে পাওয়া গেল সৌম্যের নিথর দেহ। যে ছাদে দাঁড়িয়ে একদিন সে বিস্মিত চোখে আকাশ মেপেছিল, স্বপ্ন গুনেছিল নীলের গভীরতায়—সেই ছাদই হয়ে উঠল তার শেষ আশ্রয়। আকাশ দেখার যে অভ্যাস ছিল তার, সেই আকাশই বুঝি তাকে ডেকে নিল চিরতরে নিজের কাছে। মাটির বুক ছেড়ে সে চলে গেল আকাশের চিরস্থায়ী বাসিন্দা হয়ে।

এশার আজান পড়ছিল তখন।

'আল্লাহু আকবর' — ধ্বনিত হচ্ছিল চারপাশে....

(চলবে)

________

নোটঃ ছোট - বড় পর্ব খুঁজবেন না।

যতটুকু পারব এখন থেকে লিখে দেবো।

গল্পটা প্রায় শেষদিকে চলে এসেছে। এখন নিয়মিত প্রতিদিন লিখে শেষ করে দিবো। ঈদের আগেই সমাপ্তি ঘটবে আমাদের #প্রেমের_নির্বাসনের, আশা করি। যারাই পড়বেন দয়া করে সবাই রেসপন্স করবেন, আপনাদের রেসপন্স না পেলে আমার কিন্তু আলসেমি চলে আসে।

এই পোস্টটি পড়ুন, এটি গুরুত্বপূর্ণ - https://www.facebook.com/share/p/1GnY4oEmKo/

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩১তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন