ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রেমের নির্বসন

৩২তম পর্ব

লেখক: মৃধা মৌনি

#প্রেমের_নির্বাসন - (৩২)

লেখনীতে - #মৃধা_মৌনি

____________

'অপেক্ষা' উপন্যাসে স্যার হুমায়ুন লিখেছিলেন, 'মৃত মানুষদের জন্য আমরা অপেক্ষা করি না। আমাদের সমস্ত অপেক্ষা জীবিতদের জন্য!' কথাটা কি ভয়ানক সত্যি!

বিস্মৃতি কত দ্রুত থাবা বসায়, তা প্রিয়জন হারালে বোঝা যায়। যে মানুষটি ছাড়া একদিন চলা অসম্ভব ছিল, সময়ের অতল গহ্বরে সে আজ কেবলই এক ঝাপসা স্মৃতি। বিদায়বেলার কান্না শুকানোর আগেই পৃথিবী তাকে ভুলে গিয়ে নতুনের আয়োজনে মেতে ওঠে। নিষ্ঠুর সত্য এটাই- আমরা অপরিহার্য কেউ নই!

সৌম্য মারা যাওয়ার আজ ঠিক তিনটে দিন হলো গুণে গুণে। ঘড়ির কাঁটা আর ক্যালেন্ডারের পাতা কারো জন্য থামেনি, নিস্পৃহভাবে বদলে গেছে। অথচ এই তিন দিনেই বাড়ির চেহারাটা কী অদ্ভুত রকমের স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে! রান্নাঘরে চুলা জ্বলছে, ডাল-ভাতের চেনা ঘ্রাণ নাকে আসছে, কাজগুলো হচ্ছে নিজস্ব ছন্দে। চারপাশটা দেখলে মনে হয় সৌম্য নামের কেউ কোনোদিন এই বাড়িতে ছিলই না, যেন তার অস্তিত্বই মুছে গেছে মহাকালের গর্ভে।

সবাই কত সহজে নিষ্ঠুর সত্যটাকে মেনে নিল, তাই না? নাকি এই পুরোটাই একটা ভান, নিপুণ সাজানো অভিনয়?

দীপ্র এখন সারাক্ষণ গেমের নেশায় বুঁদ হয়ে থাকে। ফোনের স্ক্রিনে আঙুলের দ্রুত সঞ্চালন আসলে শোক লুকানোর এক মরিয়া চেষ্টা বৈকি। ও কি সত্যিই খেলছে, নাকি ওই ডিজিটাল দুনিয়ার আড়ালে নিজের হাহাকারটাকে চেপে রাখতে চাইছে? তৃপ্তি বিকেলের দেখা হয় ঠিকই, কিন্তু কেউ কারো চোখের দিকে তাকায় না। পাছে দৃষ্টি আটকে গেলে মনের গভীর গহ্বরটা ধরা পড়ে যায়! পাছে নোনা জলের বাঁধ ভেঙে সব অভিনয় ফাঁস হয়ে যায়!

মানুষ বলে, সময় নাকি সব ক্ষত সারিয়ে দেয়, দুঃখ ভুলিয়ে দেয়। কী প্রচণ্ড পাষাণ আর মিথ্যেবাদী এই প্রবাদ! সময় আসলে কিছুই ভোলায় না, এক বিন্দুও না। সময় শুধু সইয়ে নিতে শেখায়। কলিজার ভেতর পাথর বেঁধে দেয় যাতে মানুষটা পুনরায় স্বাভাবিক জীবনে হাঁটার নাম করে অভিনয় চালিয়ে যেতে পারে।

তবে একজন পারছেন না। সৌম্যর মা।

তিনি এই সম্মিলিত অভিনয়ের মঞ্চে সবথেকে আনাড়ি। হবেই তো, পেটে ধরেছিলেন যে! দশ মাস দশ দিন যখন গর্ভে ধারণ করেছিলেন, তখন যেমন ব্যথা ভোলার ভান করতে পারেননি, আজও পারছেন না। জন্ম দেওয়ার অসহনীয় যন্ত্রণার মতোই আজকের এই বিচ্ছেদ-যন্ত্রণা তার কাছে বড় বেশি জীবন্ত। তার দু’চোখের কোল সারাক্ষণ নোনা জলে ভিজে থাকে। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকেন সৌম্যর ঘরের দিকে। যে ছেলেটাকে নিপুণ মমতায় বড় করেছিলেন, সে কেন এভাবে মাঝপথে হাত ছেড়ে দিল?

'আম্মা।'

ডাকে আইরিন ফিরে তাকালেন। আদিয়া জুবুথুবু পায়ে এসে দরজায় দাঁড়িয়েছে। যার কাছ থেকে এতদিনে একবার মা ডাক শুনতে পাননি তিনি, বড়ই আক্ষেপ আর আফসোস করে গেছেন, সেই মেয়েটা আজ তাকে আম্মা বলে ডাকছে! এই ক্ষণে এসে তার মনে হয়েছে মা ডেকে একবার হৃদয়ের ব্যথা ভোলানোর বদলে আরও উত্থেলিত করে দিক?

আইরিন কোনো কথা বললেন না। কেবল ফিরেই তাকিয়ে থাকলেন। তার চোখজোড়া এমন নিষ্প্রাণ, পাথর, যেন ওই দেহে প্রাণ সঞ্চার নেই। আদিবার ভাঙাচোরা হৃদয়টা পুনরায় টুকরো টুকরো হয়। একমাত্র সেই দায়ী — আজ এই পরিবারের ধ্বংসের কারণ!

চোরা পায়ে ধীরে ধীরে ভেতরে প্রবেশ করে সে।

আবারও ডেকে ওঠে ভরাট ভেজা গলায়, 'আম্মা?'

আইরিন পূর্বের ন্যায় জবাবহীন, নির্বিকার।

আদিবা থরথর করছে, কাঁপছে আবার কান্নার দমক ও সামলাচ্ছে। পরমুহূর্তেই নিজেকে স্থির করে বলে ওঠে, 'আমি চলে যাচ্ছি।'

এ পর্যায়ে প্রশ্ন ছোঁড়েন আইরিন, 'কোথায়?'

আদিবা নত মস্তকে জানায়, 'জানি না। কিন্তু এখানে আর থাকতে পারছি না আম্মা। যা খুঁইয়েছেন, তা আমি ফিরিয়ে দিতে পারব না আপনাকে। কিন্তু...'

এবারে একটা ডায়েরি বের করে আদিবা। এতক্ষণ ওড়নার আড়ালে লুকিয়ে রেখেছিল সে। অথবা আইরিনই খেয়াল করেননি বুঝি। একটু চমক খেলে যায় ওই নিষ্প্রাণ চোখ দুটোতে।

আদিবা বলল, 'এটা আপনার ছেলের। যে কথাগুলো সে কাউকে বলতে পারত না, সেগুলোই এখানে লিখে রাখত। আমি বেশ কয়েকদিন খেয়াল করেছিলাম। আর আমি লুকিয়ে লুকিয়ে পড়তাম ও...'

বলতে বলতে হঠাৎ থেমে পড়ল ও। আইরিন হাত বাড়িয়ে ডায়েরিটা নিলেন। আদিবা বলে ওঠে আবারও, 'আর আমায় ক্ষমা করবেন না, একদম না। মনে রাখবেন, আমি আপনার ছেলেকে বড় বেশি কষ্টই দিয়েছিলাম।'

কথা শেষ।

আইরিন খুব মনোযোগ দিয়ে ডায়েরিটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছেন, আদিবার এত মায়া হলো। ছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করল মানুষটিকে। এতবড় শোক মুহূর্তেও একটি বারের জন্য মানুষটিকে সে স্বান্তনা স্বরুপ কিচ্ছুটি বলতে পারেনি...কিচ্ছুটি নয়!

চলে যাওয়ার জন্য পা ফেলল আদিবা।

এ বাড়িতে তার সময় ফুরিয়ে এসেছে। ফুরিয়ে এসেছে গল্পেও। তার পরিচয় হয়েছিল সৌম্যর সহধর্মিণী হিসেবে। সে-ই যখন নেই, তখন আদিবা থাকবে কোন পরিচয়ের জের ধরে?

ঘর ছেড়ে যাওয়ার আগ মুহূর্তে আইরিন কেন যেন পিছু ডাকলেন, আদিবা থমকে দাঁড়িয়ে ফিরে চাইল। আইরিন ঘোলাটে মনিতে জানতে চাইলেন, 'তোমার কি একটুও কষ্ট হচ্ছে না বউমা?'

আদিবার ঠোঁট চিরে একচিলতে হাসি বেরিয়ে এল প্রত্যুত্তরে। কিছুই বলল না মেয়েটা, চলে গেল দ্রুত পদক্ষেপ ফেলে। আইরিনের চোখ বেয়ে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ে ডায়েরিটির উপর। তিনি সে ফোঁটা মুছে নিলেন সঙ্গে সঙ্গেই। ছেলেটা তার দুঃখ বৈ আর কিচ্ছুটি সঙ্গে নিতে পারল না। আহারে!

____________

কলেজে গোল্ডেন পেলাম যে বছর, সে বছরের মতো খুশি মা কে কোনোদিন হতে দেখিনি। আর যখন জানালাম, মেডিকেল আমি পড়ব না মা। তখনের মতো বিষাদগ্রস্ত চোখ আমার মায়ের আমি এর আগে কোনোদিন দেখিনি। বাবা চলে যাওয়ার দিন ও বুঝি নয়! মায়ের বরাবর ইচ্ছে ছিল, আমি যেন বড় ডাক্তার হই। আর আমি চেয়েছিলাম একজন প্রফেসর হতে। পড়াতে, শেখাতে কী ভীষণ ভালো যে লাগে আমার! চারটে টিউশন করাতাম। সেই কলেজ জীবনের একদম শুরু থেকে। চারটেই রয়ে গেছে এতগুলো বছর ধরে। দিনকে দিন তার হয়ে উঠেছে অবিচ্ছেদ্য অংশ জীবনের। ছোট ছোট বাচ্চা, ক্লাস সেভেন-এইটে পড়ে। খুব আগ্রহ নিয়ে যখন একটা প্রশ্ন করে, আমার আনন্দ হয় খুব। সেই আনন্দ থেকেই আমি এই প্রফেসর হবার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। পরে মা জানতে পেরে মেনে নিয়েছিলেন। নেহাৎ অসম্মানের পেশা তো নয়। তাছাড়া আমার সুখটা যখন এখানেই লুকিয়ে...মা আর দ্বিমত করেননি একদমই। আমার মা টা না এমনই! আমার আর ছোটর জন্য নিজের সব চাওয়া পাওয়া একদম মাফ। দুটো শাড়ি-চুড়িতে বছরের পর বছর পার করে আমার মায়ের দু মাস গেলেই মনে হবে, আমার প্যান্টটা ফ্যাকাশে হয়ে গেছে, শার্টটা বড্ড পুরোনো। কত বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে মিশি। ক্লাস থাকতে হয়। এত করে বলি, আমার কিছু লাগবে না, মায়ের তবু জোরাজোরি।

এসব আজ আমি খুব করে মিস করছি।

মায়ের সঙ্গে একটা অদৃশ্য দূরত্ব তৈরি হয়ে গেল না? যতই সবাই বোঝাক, আমি তো এতোটাও অবুঝ নই। তবুও অবুঝের মতো কি একটা কাজ করে বসলাম, ইশ! আদুকে আমি কোনোদিন ভালোবাসার মতো করে ভালোবাসিনি। স্রেফ অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল ও আমার। ওর সঙ্গে কাটানো মুহূর্ত, ওর একটু আধটু কেয়ার পাওয়া, খোঁজ রাখা কিংবা নিজের জীবনের সবকিছু খোলা বইয়ের মতো ওর সামনে মেলে ধরা- এ সবটাই আমার অভ্যাস হয়েছিল ব্যস! আর এটাকেই ও ভালোবাসা ভেবে আমায় নিয়ে স্বপ্ন বেঁধেছিল একশো একটা। সেসবের দাবী নিয়ে যেদিন আমার সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল মেয়েটা, দু'চোখে এক অসীম প্রলয়ংকরী ঝড়ের সূচনা নিয়ে, আমি কালবোশেখি আসবে জেনেও এড়িয়ে যেতে পারিনি। ওই মেঘগুলোকে ঝরতে জায়গা করে দিয়েছিলাম আমার আকাশে। বিনিময়ে আমার আঙিনা রোদ শূন্য হয়ে পড়ল একসময়। আমি হারিয়ে গেলাম কোথাও একটা। ঝোঁকের বশে নেওয়া একটা সিদ্ধান্ত আমাকে হীনমন্যতায় ছুঁড়ে ফেলে দিল। আশপাশ হাতড়ে কাউকে পেলাম না আমি, কাউকে না। যেই আদিবার স্বপ্ন গুলো পূরণে আমি নিজেকে বিসর্জন দিয়ে দিলাম, সেই মেয়েটাই আমাকে বুঝল না শেষ পর্যন্ত! আমার নীরবতার ভাষাই যার বোধগম্যের বাইরে, তাকে কি আর্তচিৎকার শোনাবো জানি না। মাথার উপর হঠাৎ করেই এক গাদা দায়িত্ব এসে পড়ল। পরিবারের সকলের মন খারাপের কারণে তৈরি হলাম হুট করেই। এসব মেনে নিতে নিতেই আমার পরিবার চরম বাজে ভাবে অপমানিত হলো আদিবার পরিবারের কাছে। আমি ব্যাপারটাকে মেনে নিতে পারিনি, এখনো পারিনি। কোনোদিন পারব কি না জানিও না। এই অপমানের সমস্ত দায়ভার আমার, কেবল আমার একার! তারপরও আমি নীরবে সবটাই বুকে পুষে নিলাম। দাফন করলাম। অথচ একটি বারের জন্যেও তাকে ছাড়ার কথা চিন্তা করতে পারলাম না। ভালো না বেসেও কারো ভালো চাওয়া কি যায় না? আমিও চেয়েছিলাম, ও যদি আমায় জড়িয়ে ভালো থাকুক, তাহলে থাকুক। একদিন হয়তো আমি তাকে ভালোবাসতে পারব — যতটা ভালোবাসাময় স্বপ্ন সে আমাকে নিয়ে বেঁধেছে...তারচাইতে হাজারগুণ বেশি! সবটা শেষে তাই ফিরিয়েও নিয়ে এসেছিলাম তাকে...

অথচ, ও আমাকে এক মুহূর্তের শান্তি দিল না।

ওর জন্য আমি সবার থেকে এত দূরে সরে গেলাম, ওর জন্য আমি আমাকেই ভালোবাসা ছেড়ে দিলাম, তবু ও কোনোদিন আমার মাথায় একটা হাত রেখে বলল না, আমি তো আছি! তোমার পাশে! তুমি দুশ্চিন্তা করো না। বরং সারাক্ষণ অভিযোগ, অনুযোগ আর কান্নাকাটি। আমি বিরক্ত হয়ে পড়লাম, তিক্ততা বোধ করলাম জীবনের প্রতি। খুব ইচ্ছে করছিল মায়ের কাছে ছুটে যাই, তাকে জড়িয়ে ধরি, তাকে বলি — তুমি আবার সব ঠিক করে দাও না মা। আমার একাডেমিক ক্যারিয়ার প্রায় শেষ, যেই দেখে সেই প্রশ্ন করে, 'কেন এমন করলি?'

যেন পালিয়ে বিয়ে করাটা ভীষণ পাপের কাজ!

নাকি আমার কাছে সবারই এক্সপেক্টেশন একটু বেশিই ছিল?

আমি জানি না। সত্যি জানি না। কত রাত আমার ভালো করে ঘুম হয় না। চোখ জোড়া বুঁজলেই মায়ের স্বপ্ন ভাঙা মুখ দেখি, শিক্ষকদের, শুভাকাঙ্ক্ষীদের করুণা ভরা চোখ দেখি। যেসব ছোট ছোট ছেলেদের আমি একসময় ক্যারিয়ার ফোকাসড হতে একগাদা লেকচার ঝাড়তাম, প্রেম-ভালোবাসায় সময় নষ্ট করাতে বকা দিতাম, আজ তারাই আমার দিকে চেয়ে টিটকারির সুরে হাসে। আমায় নিয়ে কটাক্ষ করে। অথচ আমি প্রতিবাদ করতে পারি না। না পারি, এই দুঃখগুলো কাউকে প্রকাশ্যে জানাতে। কাকে বলব, কে বুঝবে আমার এই অনুভূতি? কেউ না, কেউ না! জীবনসঙ্গী মানেই কেবল বেড পার্টনার নয়, মেন্টাল হেলথ পার্টনার ও হতে হয়। অথচ আদিবার কোনোদিন সেইটুকু বুঝ হয়নি...সে আহ্লাদী হতে চায়, ভালোবাসায় গদগদ হতে চায়, অথচ জানতে চায় না আমি কেমন আছি, আমি কেমন থাকি...

ওকে দোষ দিচ্ছি না আমি।

দোষ তো ওর একলার নয়, আমারই শতভাগ বেশি।

সেদিন যদি নিজেকে একটু বেশিই ভালোবাসতে জানতাম, তবে আজ আমি আমার মায়ের স্বপ্ন ভাঙা দু চোখ দেখতাম না। আজ এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন ও হতাম না। নিজেরই ঘরে অনাহূত বোধ করতাম না।

আরও অনেক কিছু লিখতে ইচ্ছে করছে।

অনেক অনেক ভার জমা এই বুকের ভেতর। পাহাড় সমান ভার নাকি সমুদ্রের মতোই গভীর- জানি না। শুধু জানি, আমার বড্ড ঘুম পাচ্ছে। বড্ড! আমি ঘুমুতে চাই। চির শান্তির ঘুম। যেভাবে ঘুমিয়েছিলাম মায়ের গর্ভে...

মাটিও তো মা-ই, তাই না?

আমায় মাফ করে দিও তোমরা,

মনে রেখো না।

মৃতদের মনে রাখতে নেই বেশিদিন।

তবে যে পিছুটান রয়ে যাবে, দেহ ছাড়লেও পৃথিবী ছাড়তে পারব না আমি...তারচেয়ে আমায় ভুলে যেয়ো, ভালো থেক তোমরা। দূর আকাশের সবচেয়ে ছোট তারাটি হয়ে, সবার অলক্ষ্যে, লুকিয়ে চুরিয়ে আমি দেখব তোমাদের সবাইকে। তোমরা ভালো থাকবে, এই আমার একমাত্র চাওয়া!

ইতি........

বুকে জড়িয়ে ডুকরে কেঁদে উঠলেন আইরিন। হৃদয়ের সবটুকু মমতা বের করে দিয়ে উদ্ভ্রান্তের ন্যায় আওড়ে চলেন, 'তোকে ছাড়া আমি কেমনে ভালো থাকব বাবা, কেমনে ভালো থাকব? আমি বোকা, আমি বুঝিনি, আমার ছোট্ট সৌম্যটার বুকের ভেতর কত কি জমিয়ে রেখেছিল সে। বরং ভেবে গেছি, তুই বুঝি পর হয়ে গেলি। বিয়ের পর সব ছেলেরাই পর হয়ে যায় যে। আমি তাই ভেবেছিলাম। কিন্তু তোর যে আমাকে দরকার, আমার কোল দরকার, আমি সত্যি বুঝিনি সৌম্য।'

ভদ্রমহিলা কেঁদে চলেন হাত-পা ছড়িয়ে, বাচ্চাদের মতো হাউমাউ সুরে। তার চিল চিৎকারে ছুটে আসে বাড়ির বাকিরা। যে যেখানে ছিল, সেখান থেকেই। তৃপ্তি, বিকেল, স্বস্তি, দীপ্র, লতা, মিশি সবাই....তবে সবাই দরজা ধরেই দাঁড়াল। কেউ ভেতরে এসে আইরিন কে সামলানোর বিন্দুমাত্র চেষ্টা করে না। এই কান্নাটার খুব প্রয়োজন আছে। কাঁদুক, কেঁদেকেটে হালকা করুক হৃদয়ে জমা মেঘগুলি। একটা মাত্র জীবনে মানুষ অনেকবার আঘাত পায়, ভেঙে পড়ে, আবার উঠেও দাঁড়ায়। আইরিনকেও দাঁড়াতে হবে। দীপ্রটা আছে তো, তার জন্য হলেও নিজেকে মানিয়ে গুছিয়ে শক্ত করতে হবে একদিন। এ পৃথিবীতে মৃ ত দের কোনো স্থান নেই। তবু কেউ কেউ যত্ন করে বুকে আগলে রাখে।

★★★

সকাল থেকেই আকাশে কালো মেঘের ঘনঘটা। কান পাতলে হুটহাট মেঘের চাপা গর্জন শোনা যায়। হয়তো বৃষ্টি নামনে অচিরেই। শীতকাল অবশেষে বিদায় জানিয়েছে তার দাঁত বসানো গা হীম করা বায়ু নিয়ে। দু'হাত ভাঁজ করে রাখা কোলের উপর, কেমন উদাসীন দেখায় ছেলেটাকে। রোদ্দুর দাঁড়িয়ে আছে এখানে, অনেকক্ষণ ধরে। দৃষ্টি নির্দিষ্ট কোথাও নেই। থেকে থেকে বুকচিরে বেরিয়ে আসা দীর্ঘশ্বাস সামলাতে সামলতেই হিমশিম খাচ্ছে ছেলেটি। হঠাৎ হঠাৎ বাতাসে ঘ্রাণ পাওয়া যায়। যেন সৌম্য আছে পাশেই। মিষ্টি হাসি অধরে ঝুলিয়ে বলছে, 'সিগারেটটা বাদ দাও না ভাইয়া!'

হঠাৎ করেই দৃষ্টি ঘোলাটে হয়ে আসে ছেলেটার। ঝাপসা হয়ে ওঠে সামনের সব দৃশ্যপট। হাতের তালু দিয়ে চটপট করে অবাধ্য জলটুকু মুছে নিল সে। ছেলে মানুষের শোক প্রকাশ করতে নেই যে।

সেদিন রাতেই রিশিডিউল করেছিল তার ফ্লাইট। সৌম্যর চলে যাওয়ার সেই নিস্তব্ধ রাতেই রোদ্দুরকে বসতে হয়েছিল ল্যাপটপ আর ফোন নিয়ে। লন্ডনের University College London (UCL)-এ পড়তে যাওয়ার সব প্রস্তুতি সারা ছিল অনেক আগেই। যাওয়ার কথা ছিল কাতার এয়ারওয়েজে। কিন্তু নিয়তির নিষ্ঠুর খেলায় সব ওলটপালট হয়ে গেল।

সেই অভিশপ্ত রাতেই কাঁপাকাঁপা আঙুলে সে কাতার এয়ারওয়েজের অ্যাপে ঢুকে। ‘ম্যানেজ বুকিং’ অপশনে গিয়ে ‘চেঞ্জ ফ্লাইট’ বাটনটা চেপে রিশিডিউল করল ফ্লাইটটা। পরবর্তী তারিখটা পেল আগামী সপ্তাহের শুরুতেই। এরপর ভার্সিটির অ্যাডমিশন প্যানেলে একটা মেইল পাঠিয়ে দিল সে। সংক্ষেপে জানিয়ে দিল তার অপূরণীয় ব্যক্তিগত ক্ষতির কথা, যার কারণে পৌঁছাতে খানিকটা দেরি হতে পারে।

সবই গোছানো হলো। ফোনের স্ক্রিনে কনফার্মেশন মেসেজটা ভেসে উঠতেই রোদ্দুরের মনে হলো, সময় কতটা নিস্পৃহ আর নিষ্ঠুর হতে পারে! ভাই নেই, অথচ ভাইয়ের শোকটুকু বুক পেতে আগলে রাখার অবসরটুকুও তার নেই। কদিন পরেই মেঘের ওপর দিয়ে ডানা মেলবে প্রকাণ্ড উড়োজাহাজ, আর নিচে পড়ে থাকবে একমুঠো বিষাদ।

হয়তো ভিন দেশের সেই ব্যস্ত যান্ত্রিকতায় একদিন সেও অভ্যস্ত হয়ে যাবে দৈনন্দিন জীবনে। অবাক লাগে ভেবে—প্রকৃতি কীভাবে মানুষকে বাধ্য করে প্রতিটি পরিস্থিতি মুখ বুজে মেনে নিতে! জীবনের এই প্রবহমানতা কি তবে নিষ্ঠুরতা, নাকি বেঁচে থাকার নিরুপায় কৌশল? হাহ্, জীবন বোধহয় এমনই।

'একা একা কি বিড়বিড় করিস?'

রোদ্দুর হুট করে পেছন ফিরে তাকাল। আবছা অন্ধকারে উমেদ মির্জাকে দেখে শরীরটা অজান্তেই শক্ত হয়ে উঠল তার। অস্ফুটে মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল, 'বাবা?'

উমেদ মির্জা সচরাচর ছাদে আসেন না। শেষ কবে তিনি এই সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠেছিলেন, সেটা কারোরই জানা নেই। রোদ্দুর খানিকটা অপ্রস্তুত গলায় পুনরায় আওড়াল, 'বাবা? তুমি এখানে?'

উমেদ মির্জা সহজ গলায় জবাব দিলেন, 'কেন, আসতে পারি না?'

'না, তা নয়। আসলে সচরাচর তো আসো না, তাই বললাম আরকি।'

'তোদের মতো এই আকাশ, চাঁদ, তারা—এসব নিয়ে তো কোনোদিন আগ্রহ পাইনি রে বাপ, তাই আসা হয় না। তার ওপর ইদানীং হাঁটুর ব্যথাটাও বড্ড বেড়েছে।'

রোদ্দুরের গলার স্বর কিছুটা নরম হয়ে আসে এবার, 'কতবার বললাম ডাক্তার দেখাতে, তুমি তো আমার কথা কানেই তুললে না। মা একবার সুস্থ হয়ে ফিরুক, আমি মাকে বলব। তুমি বড্ড অনিয়ম করছ।'

ছেলের উদ্বেগের জবাবে উমেদ মির্জা মৃদু হাসলেন, 'রেনুটা সুস্থ হয়ে যাবে একদিন। যাবে না রে বাবা?'

রোদ্দুর জোর দিয়ে বলল, 'আলবাত যাবে! সুস্থ না হয়ে উপায় আছে?'

কথাটা শুনেই উমেদ মির্জা হঠাৎ গম্ভীর হয়ে পড়লেন। দু'হাতের মুষ্টি শক্ত করে আকাশের অসীম শূন্যতায় নজর বুলিয়ে খুব ধীর স্বরে আওড়ালেন, 'কোথা থেকে কীভাবে যে কী হয়ে গেল! রেনুটা অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে পড়ে আছে, সৌম্যটা এভাবে হুট করে চলে গেল... আইরিন তো প্রায় পাগল হওয়ার দশা। আমি একলা মানুষ কতদিক সামলাব? ছোটটা তো বউ ছাড়া দুনিয়ায় আর কিছু বোঝে না। মেজোটাকে বললাম ফিরে আসতে। অনেক তো হলো, এবার এখানে এসে আমার পাশে দাঁড়ালে বুকটা একটু নির্ভয় হতো।'

রোদ্দুর কোনো কথা বলল না, শুধু নিঃশব্দে বাবার হাহাকারটুকু শুনতে লাগল। কী-ই বা বলার আছে তার? সে কি থেকে যেতে চাইবে? কিন্তু উমেদ মির্জা কোনোদিন তাকে এখানে আটকে রাখার অনুমতি দেবেন না। বাড়ির এত ওলটপালটের মাঝেও লোকটা বারবার রোদ্দুরকে জিজ্ঞেস করেছেন ফ্লাইটের নতুন তারিখ নিয়ে। তিনি যেন মরিয়া হয়ে ছেলেকে বাইরে পাঠাতে চান। ওদিকে মা শুয়ে আছেন হাসপাতালের বিছানায়- এই পরিস্থিতিতে রোদ্দুর যে জোর খাটিয়ে নিজের ইচ্ছার কথা বলবে, সেই সাহসটুকুও পাচ্ছে না। মুখ বুজে থাকা ছাড়া এই মুহূর্তে আর কোনো উপায় তার নেই।

ছেলের নিরবতা ভেঙে উমেদ মির্জা ওর দিকে তাকালেন। মুহূর্তেই গাম্ভীর্যের খোলস ছেড়ে সহাস্য বদনে রোদ্দুরের পিঠ চাপড়ে দিয়ে বললেন, 'তুই কিচ্ছু চিন্তা করবি না। মন দিয়ে পড়াশোনা করবি। যা লাগে আমাকে বলবি, আমি সব পাঠাব। আমি তোকে অনেক বড় হতে দেখতে চাই রোদ্দুর, অনেক বড়! আমার সব অপূর্ণ স্বপ্ন তুই পূরণ করবি।'

বাবার চোখের দিকে তাকিয়ে রোদ্দুর ছোট করে উত্তর করে, 'জি বাবা।' পরমুহূর্তেই চুপ করে গেল।

কিন্তু ওর খুব মন চাইছিল বিকেলের অমীমাংসিত কথাগুলো নিয়ে প্রশ্ন করতে, কিন্তু এই মুহূর্তের ভারী জড়তায় আর কুলাল না। সে আবার মুখ ফিরিয়ে আকাশের বুকে নিঃসীম আঁধারের দিকে তাকিয়ে রয়। পাশে দাঁড়িয়ে উমেদ মির্জাও তাকিয়ে আছেন দূর দিগন্তে। বাপ-ছেলে দু'জনেই নীরবতার অতল গহ্বরে হারিয়ে গেল তারপর।

★★★

জানালার কপাট গুলো খোলা হয় না গত তিনদিন ধরে। বারান্দার দরজাও বন্ধ থাকে সবসময়। ঘরটা কেমন গুমোট হাওয়ায় বদ্ধ। নিঃশ্বাস টানলে যন্ত্রণা বাড়ে। তাই বিকেল আজ সব জানালা খুলে দিল। বারান্দার দরজা মেলে একটা ছোট কাপড় ভিজিয়ে আনলো বাথরুম থেকে। বারান্দার রেলিংটা মুছবে, অনেক ধূলোময়লা পড়ে গেছে ইতিমধ্যেই। আপন মনে এসব নিয়েই ব্যস্ত হয়ে ছিল মেয়েটা, ঠিক তখনই গুটি গুটি কেউ একজন এসে দাঁড়াল। বিকেল ভ্রু কুঁচকে মুখ ফিরিয়ে দেখে, তৃপ্তি!! চেহারাটা বড্ড নিষ্প্রাণ দেখাচ্ছে। বিকেল ঘাড় ঘুরিয়ে নিল। নিজের কাজে পূর্বের ন্যায় মনোযোগ দিতে দিতে শুধাল, 'কিছু বলবি?'

তৃপ্তি ঘাড় বাঁকা করে, হালকা নোয়ায়। মৃদু স্বরে জিজ্ঞেস করে, 'খেতে যাবি না?'

'ক্ষিদে লাগলে খেয়ে নিব।' কাটকাট জবাবে এখানেই বাক্যের সমাপ্তি ঘটালো বিকেল।

তৃপ্তি তবু দাঁড়িয়ে রইল, উশখুশ করছে।

সেদিনের ঘটনাটা এখনো চোখের সামনে সচ্ছ, ভাসমান। সৌম্যর মৃত্যুর পরেরদিন, দাফন শেষে পুরো বাড়ি যখন নিস্তব্ধ, নিগূঢ় হয়ে রইল, ঠিক তখনই তৃপ্তি আর বিকেলের কথা কাটাকাটি হয়। বিষয় সামান্য এবং বিকেলের ব্যক্তিগত। তবু কেন যেন বেশিই অধিকারবোধ দেখিয়ে ফেলেছিল তৃপ্তি। ওই রাতে তারা কোথায় ছিল, কি হয়েছিল- তাই জানতে বারবার প্রশ্ন করায় মেয়েটা বড্ড চটে যায় একসময়। রেগেমেগে বলে ওঠে, 'আমার পারসোনাল লাইফ নিয়ে তোর এত ইন্টারেস্ট কিসের?'

তৃপ্তি হতবাক স্বরে বলেছিল, 'তোর আমার হলো কবে থেকে রে? আমরা তো সবসময় এক হয়েই ছিলাম।'

'তাই বলে আমার ব্যক্তিগত কোনো লাইফ থাকতে পারবে না? বিয়ে হলে জামাই হলে কি তোর সঙ্গে জামাই ও শেয়ার করব আমি?'

'বিকেল?'

'এই যে, একটু কিছু হলেই বিকেল, বিকেল করিস। এমন ভাব যেন সব আমার দোষ, তোর কোনো গাফিলতিই নেই।'

মেজাজটা ধরেই ছিল বিকেলের আসলে, তার আগের দিনই তো ওই রাক্ষস ব্যাটার সাথে একচোট চোটপাট হয়েছিল। সেই ঝাড়টা সে তুলল তৃপ্তির উপরে। তৃপ্তি ও রেগেমেগে শেষে কয়েক কথা শুনিয়ে দেওয়ায় মোটামুটি ভালো রকমের ক্যাচাল হয়েছিল পরে। তারপর থেকেই দু'জন দু'জনের মুখ দেখেনি। সামনে পড়লেও এড়িয়ে গেছে চুপচাপ। পরবর্তীতে তৃপ্তির রাগ নামলেও বিকেলের নেমেছে কিনা সন্দেহ। রোদ্দুর নিজ থেকে আর একবার ও আসেনি আগ বাড়িয়ে কথা বলতে। বিকেল ও যায়নি। এদিকে ফোনটা গায়েব। এমন অবস্থা বাড়ির, কাউকে যে জিজ্ঞেস করবে, কোমরে রশি বেঁধে যে নামবে, তাও পারছে না ঠিকঠাক ভাবে। সবদিক মিলিয়ে জগাখিচুরি অবস্থা মেজাজের। যে পরিমাণ অধৈর্য্য মেয়েটা, তাতে যে এখনো সবুরে রয়েছে, তাই তো অনেক!

তৃপ্তির ইতস্তত ভঙ্গি বিকেল না দেখেও বোঝে স্পষ্ট। একটা মৃদু শ্বাস ফেলে সে হাতের কাজ থামাল। ফিরে চাইলো মেয়েটার মুখোমুখি, ভ্রুয়ের মাঝখানে ভাঁজ রেখে প্রশ্ন করে, 'কিছু বলবি আর?'

'সরি।' বলতে বলতেই এগিয়ে আসে মেয়েটা। মুখ নিচু করে বুকে জড়িয়ে ধরে বিকেলকে। বিকেল স্তম্ভিত হয়। পরমুহূর্তেই মৃদু হাসল। তবে জড়িয়ে ধরল না। গলায় মেকী অভিমান জমিয়ে বলল, 'কি সরি? আর এভাবে ধরেছিস কেন? ছাড়!'

'না।' তৃপ্তি আরও শক্ত করে ধরল ওকে, 'একদম ছাড়ব না। সরি,সরি,সরি। মাথাটা ঠিক ছিল না রে। বিশ্বাস কর।'

'বাদ দে। আমার ব্যক্তিগত কোনো লাইফ থাকতে পারবে না, মেনে নিয়েছি।'

'উঁহু, এখনো রাগে বলছিস এসব। আমিই আসলে বুঝিনি। খুব টেনশনে ছিলাম জানিস। রাত ভর বাড়িতে কেউ ঘুমায়নি৷ দফায় দফায় মিটিং, ভাবছিলাম কি যে হয়। আমি তোকে কতবার ফোন দিয়েছি, তোর ফোন ও অফ বলছিল।'

'ফোনটা হারিয়ে গেছে আমার।'

'বলিস কি! কিভাবে?' তৃপ্তি মুখ তুলে তাকাল।

বিকেল বলল, 'জানি না। ঘরেই ছিল, আসার পর পাইনি।'

'নাকি তুই সাথে করে নিয়ে গেছিস বাট ভুলে গেছিস এখন। বাইরে কোথাও রেখে আসছিস মনের ভুলে।'

ঠোঁট কামড়াল বিকেল। এভাবে ভেবে দেখেনি সে। হতেও পারে। ওইসময় অনেক উত্তেজিত ছিল তার মস্তিষ্ক। কি থেকে কি হয়েছে, স্পষ্ট কোনো ধারণা ও নেই।

'তাছাড়া ঘরে থাকলে নেবে কে? আগে তো এমন কোনোদিন হয়নি।'

তৃপ্তির কথায় নিজের ভাবনা থেকে বেরিয়ে এসে পুনরায় ঘাড় নাড়ল সে, বলল, 'মেবি।'

'আচ্ছা, সরি এক্সেপ্ট করছিস তো?'

'না।' বলেই হেসে দিল বিকেল।

হাসল তৃপ্তিও। মনটা হালকা হয়ে গেছে এবার। পুনরায় জড়িয়ে ধরল ওকে, বিকেল এবার ফেরালো না। নিজেও হাত বাড়িয়ে দিল দুটো।

'ভালো লাগছে না বিকেল! কিচ্ছু ভালো লাগছে না রে। সৌম্য ভাইয়া এভাবে...'

ডুকরে ওঠে তৃপ্তি। বিকেল বলল, 'কাঁদিস না। মনে করিস না প্লিজ। আমার নিজেরই মাথার ঠিক নেই, তার ভেতর এসব...'

'আদিবা চলে গেছে।'

'কোথায়?'

'জানি না। আমি দেখিনি। দীপ্র বলল, শুনলাম।'

'ওকে যেতে দেওয়া একদম ঠিক হয়নি। ধরে পুলিশে দেওয়ার দরকার ছিল। ওই মেয়েটার জন্যে আজকে আমার ভাই...' বিকেল চুপ করে গেল। রাগে দাঁত কিড়মিড় করল দুয়েকবার। তারপর প্রায় অনেকক্ষণ চুপ রইল দু'জনেই।

একসময় পাশাপাশি বসল ওরা। বারান্দার শীতল মেঝেতে শরীর ঠেকতেই দু'জনেই কেমন যেন কেঁপে ওঠে অকস্মাৎ। আবার সামলে নিয়ে নীরব হয়ে পড়ে।

বিকেল হাঁটুতে মুখ গুঁজে রেখেছে। দৃষ্টি জানালার বাইরে।

তৃপ্তি অনেকক্ষণ পর নীরবতা ভেঙে বলে ওঠে, 'রোদ ভাইয়ার ফ্লাইট আগামীকাল নাকি।'

বিকেল জবাবে জানায়, 'জানি না।'

'তোদের আবার কি হলো? আমি দেখলাম, একবার তোকে স্বান্তনাও দিতে আসেনি ভাইয়া।'

বিকেল চুপ করে রইল।

'কিরে, বল?'

বিকেল চোখ তুলে ওর দিকে তাকাতেই কিছু একটা মনে পড়ে যাওয়ার ভঙ্গিমা করে বলে উঠল তৃপ্তি, 'উপস সরি! মনে ছিল না। ইউ হ্যাভ আ পারসোনাল লাইফ। ইটস ওকে! আমি জানতে চাই না।'

বিকেল চোখ পাকায়, 'ট্রল করছিস?'

'উম একদম না!'

পুনরায় হাঁটুতে মুখ গুঁজে মেয়েটা, 'কি যে হইছে আমি নিজেও না জানি না। ভালো লাগছে না কিছুই, জাস্ট এইটুকু জানি। উনি চলে যাচ্ছেন, অথচ আমি বুঝতে পারছি না কী নিয়ে আপসেট হবো আমি? উনার চলে যাওয়া নিয়ে নাকি ভাইকে হারানোর শোক সামলাবো নাকি উনাকে যে আর কোনোদিন দেখতে পারব না সেই শোক...' বলতে বলতে চোখ ভিজে আসে মেয়েটার।

তৃপ্তি মৃদু ধাক্কা দিয়ে বলল, 'এটা কেমন কথা? কোনোদিন দেখতে পারবি না, এটা কেমন ধরনের কথা বলিস?'

বিকেল চোখজোড়া মুছে নেয়, 'মন বলল রে।'

'মন সবসময় সঠিক বলে না।'

'হয়তো বলে। আমরাই মানতে চাই না।'

(চলবে)

________

আগামী পর্বে রোদ-বিকেলের আরেকটি স্পেশাল পর্ব আসবে। তাই সবাই বেশি বেশি রেসপন্স করুন।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩২তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন