ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রেমের নির্বসন

৩৩তম পর্ব

লেখক: মৃধা মৌনি

#প্রেমের_নির্বাসন - (৩৩)

লেখনীতে - #মৃধা_মৌনি

_____________

বিকেলের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসির রেখা। তৃপ্তি অযথাই একটু হাসল, তারপর বিকেলের পিঠে আলতো করে হাত বুলিয়ে দিয়ে শুধাল, 'তুই কত বড় হয়ে গেছিস রে হুট করে!'

বিকেল চোখ পাকায় তা শুনে। দুষ্টুমিভরা গলায় প্রতিবাদ জানিয়ে বলে, 'ধুর, না! এখনো মোটে বারো আমার।'

তৃপ্তি টিপ্পনী কেটে বলে, 'হু, হু, একদম দুধের শিশু আপনি! যান, ফিটার খান গে।'

'হ্যাঁ, খাই তো!' বিকেলের চটপট উত্তর, 'তবে ফিটারে কোল্ড কফি থাকে, দুধ না। আই হেইট মিল্ক!' বলেই নাক-মুখ কুঁচকানোর এক অদ্ভুত ভান করল মেয়েটা।

সেই দেখে দু’জনেই পাল্লা দিয়ে হেসে উঠল। হাসির রোল থামলে তৃপ্তি খানিকটা সিরিয়াস হয়ে জানতে চাইল, 'তারপর, প্ল্যান কী তোর?'

বিকেলের হাসিও এবার থিতু হলো। চোখের কোণে অজান্তেই একবিন্দু জল এসে জমেছে; সেটা সন্তর্পণে মুছে নিয়ে অবুঝের মতো প্রশ্ন ছুঁড়ল, 'কিসের প্ল্যান?'

'রোদ ভাইয়া চলে গেলে... তারপর?'

উত্তর দিতে গিয়ে মেয়েটা ভাবুক হয়ে ওঠে ভীষণ, 'মন দিয়ে পড়াশোনা করব। চাকরিবাকরি হয়তো আমাকে দিয়ে হবে না, তবে করতে তো হবেই। আমার তো আর কোনো স্ট্রং সাপোর্ট নেই; থাকলে একটা বিজনেস করতাম। জানিস, নিজের কিছু একটা হবে—এই ভাবনাটাই আমাকে খুব আনন্দ দেয়।'

তৃপ্তি কিছুক্ষণ চুপ থেকে শুধাল, 'চাচার কাছে চাইলে দেবেন না?'

জবাবে একটু ম্লান হাসল বিকেল।

'কী জানি! তাঁর তো এখন রঙিন দিন কাটছে। আমার সৎ মাকে দেখেছিস? কী কড়া রে বাবা! আমার তো রীতিমতো হিংসে হচ্ছিল।'

'ধুর! কী যা-তা বকছিস!' তৃপ্তি স্বগতোক্তি করে।

'আরে সত্যি!' বিকেল জোর দিয়ে বলে, 'তিনি কিন্তু দারুণ পশ মহিলা। কোথায় আমরা একটু টিপটপ হয়ে থাকব, তা না—হুট করে কেউ আমাদের দেখলে ভাববে এ বাড়িতে কামলা দিয়ে খাই!'

তৃপ্তি হেসেই কুটিপাটি, বলল, 'কথা কিন্তু মন্দ বলিসনি।'

পরমুহূর্তেই তৃপ্তির কণ্ঠস্বর ভারী হয়ে আসে। ধীরলয়ে ডেকে উঠল, 'বিকেল?'

'হুঁ?' সংক্ষিপ্ত জবাব মেয়েটার।

তৃপ্তি আচমকাই বিকেলকে জাপটে জড়িয়ে ধরে। ধরা গলায় বলে, 'সবসময় এমন হাসিখুশি থাকিস প্লিজ। তোর মুখে আঁধারের মেঘ একদম মানায় না রে। তোর নামটাই কত সুন্দর—'বিকেল'! বিকেলে কেউ মন খারাপ করে থাকতে পারে বল? আমি তোর জন্য অনেক অনেক দোয়া করব।'

বলতে বলতেই তৃপ্তির চোখের কার্নিশ বেয়ে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ে। বিকেল কিছুটা অবাক হয়। মলিন ঠোঁটে হাসল সে, তারপর শুধাল, 'এভাবে কেন বলছিস? মনে হচ্ছে তুই আমাকে ছেড়ে অনেক দূরে কোথাও চলে যাবি যেন!'

তৃপ্তি ওকে ছেড়ে দিয়ে চোখ মুছে নিল। ম্লান হেসে বলল, 'না রে, এমনিই বললাম। ক’টা দিন তুই এত চুপচাপ ছিলি, ভালো লাগছিল না একদম। আজ আবার মনে হচ্ছে—এই ঘরটায় একটা বিকেল আছে।'

বিকেল আর কথা বাড়াল না। আলতো করে হাসল এবং নিজের দুই হাত দিয়ে পরম মমতায় তৃপ্তির চোখজোড়া মুছিয়ে দিতে লাগল।

★★★

রাত বারোটার নিস্তব্ধতা চাদরের মতো জড়িয়ে ধরে রেখেছে চারপাশ। বিকেলের দু'চোখে সবেমাত্র ঘুমের আবেশ নেমেছিল, ঠিক তখনই একটা অস্পষ্ট ঘর্ষণের শব্দে তন্দ্রাটা টুটে গেল। মনে হলো, নিরেট অন্ধকারের বুক চিরে কেউ একজন খুব সন্তর্পণে সরে গেল ঘরের এক কোণ থেকে।

মুহূর্তেই একটা অজানা আশঙ্কায় বিকেলের শিরদাঁড়া বেয়ে কয়েক ফোঁটা শীতল ঘাম গড়িয়ে পড়ে। বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল তার। ধোঁয়াটে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে অস্ফুটে গলা চিরে বেরিয়ে এল একটি শব্দ— 'কে?'

কোনো উত্তর পাওয়া গেল না। বরং বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ ছাড়া আর কিছুই শোনা গেল না। ভয়টা এবার জগদ্দল পাথরের মতো বুকের ওপর জেঁকে বসল। গায়ের পাতলা কম্বলটা এক ঝটকায় সরিয়ে ধড়মড়িয়ে উঠে বসে মেয়েটা। মনের সমস্ত সাহস সঞ্চয় করে গলার স্বর কিছুটা উঁচুতে তুলে পুনরায় প্রশ্ন ছুঁড়ল, 'কে ওখানে?'

'আপনার কলিজা!'

অন্ধকারের ওপার থেকে উত্তর এল এবারে। কণ্ঠস্বরটা বিকেলের খুব চেনা, এতটাই চেনা যে এক মুহূর্তের জন্যও ভুল হওয়ার অবকাশ নেই। বিকেলের বিস্ময়ের সীমা রইল না। বারান্দার খোলা দরজা দিয়ে আসা হালকা জ্যোৎস্নায় একটা দীর্ঘ ছায়া এসে দাঁড়াল ঘরের মাঝখানে। লম্বাটে গড়ন, চেনা অবয়ব।

'আপনি?!' মেয়েটার কণ্ঠস্বর থেকে বিস্ময় সরে না।

রোদ্দুর অন্ধকারের আড়ালে মৃদু হাসে। তবে নিজের সেই হাসি চেপে রেখে যথাসম্ভব গম্ভীর কণ্ঠেই শুধায়, 'কেন? এই অসময়ে অন্য কাউকে আশা করছিলেন বুঝি?'

বিকেল নিজেকে সামলে নিয়ে একটু কড়া গলায় বলল এবারে, 'কথার মারপ্যাঁচ খেলবেন না তো! এত রাতে এভাবে চোরের মতো আমার ঘরে কীভাবে ঢুকলেন, আগে সেটা বলুন?'

রোদ্দুর হালকা চালে এগিয়ে এল। বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে তাচ্ছিল্যের সুরে বলল, 'বাপরে! আপনার ঘর! যেন একটা আস্ত রাজ্য জয় করে ফেলেছেন আপনি, হাহ!'

'আবার সেই কথার মারপ্যাঁচ?' বিকেল বিছানা থেকে নেমে দাঁড়াল, 'আপনি কি বুঝতে পারছেন না, বাড়ির কেউ দেখলে কী কেলেঙ্কারিটাই না হয়ে যেত!'

রোদ্দুর একদম গা ছাড়া ভঙ্গিতে বলল, 'কিসের কেলেঙ্কারি? নিজের বিবাহিত বউয়ের ঘরে স্বামী আসবে, তাতে কলঙ্ক হবে কেন?'

কথাটা তীরের মতো গিয়ে বিকেলের কানে বিঁধল। 'বউ'—প্রিয় মানুষটার মুখ থেকে এই একটামাত্র শব্দ শোনার জন্য জন্ম জন্মান্তর অপেক্ষা করা যায়। শব্দটা বিকেলের সারা শরীরে এক অদ্ভুত শিহরণ জাগিয়ে তুলে, রুহে কাঁপন ধরায়। ভালো লাগার একটা শীতল পরশ বুলিয়ে যায় হৃদ মাঝারে।

কিন্তু সেই তীব্র ভালোলাগাটুকুকে একপাশে সরিয়ে রেখে সে পরম যত্নে তার আজন্মের অভিমানটুকুকে সামনে টেনে আনল। কণ্ঠস্বরটা একটু ভারি করে, মুখ নিচু করে বলল, 'সেটা তো আর সবাই জানে না।'

পরমুহূর্তেই দু সেকেন্ডের বিরতি নিয়ে পুনরায় বলে উঠল, 'আপনি কাউকে বলেননি, আমরা যে...' পরবর্তী শব্দটা উচ্চারণ কর‍তে কেমন উশখুশ করল মেয়েটা।

তাই দেখে রোদ্দুরের হাসিতে পেট ফাটে। এক ভ্রু খেলিয়ে তোলে। ভোরবেলা রওনা দেবে এয়ারপোর্টে, বাড়ির সবাই তাই তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়েছে আজকে। অথচ মেয়েটার তা নিয়ে চিন্তা নেই, এখনো অভিমান দেখাতেই ব্যস্ত! অভিমান তো রোদ্দুরেরও কম জমা নেই! এই যে মা অসুস্থ হলেন, রোদ্দুরের জন্য! এই যে তার বুকের ভেতর এক আকাশ সমান হাহাকার আর অনুতপ্ততা জমে, সেটা কি ওই বিধাতা ছাড়া আর কেউ জানে না? অথচ জানা উচিত ছিল না বিকেলের? এখন তো সে শুধুই প্রেমিকা নেই, আছে স্ত্রীর তালিকায় জড়িয়ে। স্ত্রী কাকে বলে? সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য জায়গা, পরম মমতার জায়গা, ধূলোবালি মাখানো ইট পাথরের শহরের এক চিলতে নিরিবিলি আশ্রয়ের জায়গা। তবু কই, বিকেল তো একদণ্ড তাকে বোঝার চেষ্টা করেনি সেদিন। বরং তার প্রতিটা কথা অন্যভাবে নিয়েছে। ঝগড়া করেছে। তর্ক ছুঁড়েছে। তার ভাঙাচোরা মনে আঘাত করেছিল। অভিমান তো সেও রাখতে পারে। কিন্তু, আজকের এই রাতটাই...তারপর আকাশটাও বদলে যাবে। একজনের আকাশে বৃষ্টি থাকলে, আরেকজনের আকাশে থাকবে খরতাপ রোদের স্রোত। যোজন যোজনের দূরত্ব গ্রাস করে নেবে দু'জনকেই। চোখ বুঁজে মন ছুঁতে পারলেও হাতটা ধরতে পারবে না তখন আর...এই একটা কথা ভাবলেই বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে রোদের। কিচ্ছু ভালো লাগে না তখন আর। এখনো এল। উত্তপ্ত নিঃশ্বাসটা গিয়ে লাগল বিকেলের গালে। বিকেল চমকালো। মানুষটার কি বড্ড মন খারাপ? এভাবে দীর্ঘশ্বাস ফেলছে কেন? কিছু কি জিজ্ঞেস করবে নিজে থেকেই.....

ভাবনাটা মাথায় আসতেই আরও ইতস্তত বোধ করতে লাগল বিকেল। এক দিকে অভিমানে জর্জরিত মন, এক দিকে মানুষটার মাঝে লেপ্টে যেতে চাওয়া মন- দোটানায় ভুগছে সে। একবার চোখ তুলে তাকাল। কয়েকটা পলক ফেলল পরপর। আকাশে দুয়েকদিন আগের নতুন চাঁদ। আলোটা বেশ উজ্জ্বল। রোদ্দুরের চোখে পড়ে ওভাবে তাকানো। হঠাৎ করেই হাত দুটো তুলে আঁজলায় ভরে নেয় ছোট্ট মুখখানা। বিকেল কাঁপছে তিরতির করে। চোখ নামিয়ে নিতে গিয়েও নেয় না। দুই জোড়া চোখ এঁটে রয় একত্রে। একটা দীর্ঘ সময় এভাবেই কেটে যায়। কয়েকটা তারা জায়গা বদল করে। বাতাস হয়ে ওঠে আরও শীতল। রাস্তার মোড়ের বড় টং দোকানটাও বন্ধ হয়ে গিয়েছে।

অজান্তেই দুই চোখ বেয়ে পানি গড়াতে থাকে বিকেলের। ঝাপসা নয়নে তবু চেয়ে চেয়ে মুখস্থ করে প্রিয়তম'র চোখ,নাক,ভ্রু,ঠোঁট। আর কয় ঘন্টা বাকি?

জড় ঠোঁটজোড়া নাড়িয়ে খুব আলতো করে ডাকল রোদ্দুর, 'জান?'

ডাকটা শুনে বিকেলের ভেতরটা ঈষৎ কেঁপে ওঠে। খুব মৃদু স্বরে জবাব দিল, 'হুঁ?'

'কেঁদো না।'

রোদ্দুরের এই অতি সাধারণ অনুরোধটুকুই বিকেলের বুকের বাঁধ ভাঙা জোয়ার হয়ে আসে। এতক্ষণ যে কান্নাটা সে পাথরচাপা দিয়ে রেখেছিল, তা এবার হু হু করে বেরিয়ে এল। মেয়েটার কান্নায় রোদ্দুরের বুকটা ব্যথায় মুচড়ে ওঠে। নিজেকে সামলাতে না পেরে সে পরম আবেশে জড়িয়ে ধরে তার প্রিয়তমাকে। এত শক্ত করে ধরল, যেন সামান্য আলগা হলেই কেউ একজন এসে তাকে কেড়ে নিয়ে যাবে। বিকেলের চুলের ভাঁজে মুখ গুজে কানের কাছে ফিসফিস করে আওড়াল রোদ্দুর, 'তোর চোখের পানি আমি সহ্য করতে পারি না রে। প্লিজ, আর কাঁদিস না কান্নার ডিব্বা।'

কিন্তু বিকেল কি অত সহজে শান্ত হয়? এই মানুষটা তাকে একলা ফেলে কতদিনের জন্য দূরে চলে যাচ্ছে! নিয়তির নিষ্ঠুর খেলায় ভবিষ্যতে কী লেখা আছে, তা কে জানে?

রোদ্দুর আবার চিবুক ছুঁয়ে বলল, 'এই যে, কান্নার মাত্রা তো কমার নাম নেই, উল্টো বেড়েই চলেছে! এমন করলে আমি কিন্তু এক্ষুনি চলে যাব।'

কথাটা শোনামাত্র বিকেলের হাতের বাঁধন আরও শক্ত হয়। সে এক প্রকার গুঙিয়ে উঠল। রোদ্দুর হালকা হেসে টিপ্পনী কাটল, 'এই না খুব অভিমান করে ছিলি? তাহলে যেতে দে না। ধরে রাখলি কেন?'

বিকেল ফোঁপাচ্ছে সমানে। ফোঁপাতে ফোঁপাতেই কোনোমতে উচ্চারণ করল, 'দেব না যেতে।'

'তাকা আমার দিকে।'

রোদ্দুর এবার একটু জোর করেই বিকেলের মুখটা তুলে ধরে। নয়ন ভরে দেখে নেয় তার চেনা জগতটাকে। কান্নায় চোখজোড়া ফুলে গেছে মেয়েটার, নরম গালদুটো অভিমানে লালচে আভা ধারণ করেছে, নাকের পাটা কাঁপছে ক্ষণে ক্ষণে। বিকেলের এমন করুণ দশা দেখে রোদ্দুরের নিজের চোখ দিয়েও দু-ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল। সে চোখের জল মোছার কোনো চেষ্টা করল না।

অগত্যা ভাঙা গলায় বলতে লাগল, 'আমার ওপর রাগ করে থাকিস না রে। আমি নিরুপায়। মায়ের শারীরিক অবস্থা তুই তো নিজের চোখেই দেখছিস। খুব করে চেয়েছিলাম তোকে সাথে করে নিয়ে যাই, কিন্তু পারছি না। বাবার দিকে তাকালে বড্ড মায়া হয়, মানুষটা এখন পরাজিত সৈনিকের মতো নত মাথায় বসে থাকেন। কিন্তু তুই তো আমারই বউ! সেই তিন কবুলের অছিলায় তোকে আমি নিজের দখলে নিয়ে নিয়েছি। একটু সবুর কর, সবটা থিতু হলেই আমি তোকে নিয়ে যাব।'

বিকেলের কান্নার দমক কিছুটা কমে এল এবারে। ধরা গলায় অনুযোগের সুরে বলল, 'কিন্তু কাউকে জানালেন না কেন? উনারা তো কেউই জানেন না যে আমি আপনার স্ত্রী!'

রোদ্দুর বিকেলের কপালে ভালোবাসার একটা দীর্ঘ চিহ্ন (চুমু) এঁকে দিয়ে প্রত্যুত্তর করে, 'তোর-আমার সম্পর্কের কথা শুনেই মায়ের এই অবস্থা। সেখানে বিয়ের কথাটা জানলে হয়তো মা অথবা বাবার মধ্যে কাউকে একজন হারাতে হতো। আমি তো কাউকে হারাতে চাই না রে।'

'আর আমাকে?'

রোদ্দুর এক মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে রইল প্রশ্নটা শুনে। পরক্ষণেই চোখমুখ শক্ত করে, গলায় কাঠিন্য মিশিয়ে প্রত্যুত্তর করল, 'কক্ষনোই না!'

এ পর্যায়ে একটু দূরত্ব বাড়াতে চেয়ে বাঁকা স্বরে বলল মেয়েটা, 'গেলে তো ঠিক ভুলে যাবেন। ওখানে তো সব ছোট ছোট জামাকাপড় পরা মেমসাহেবরা থাকবে...'

রোদ্দুর তাকে এক চুলও সরতে দিল না। বরং আরও কাছে টেনে নিয়ে বলল, 'আমার ক্যারেক্টর কি এতই ছ্যাড়াব্যাড়া নাকি? যে ছোট কাপড় দেখলেই হুশ খুঁইয়ে ফেলব?' তারপর গলার স্বর নামিয়ে বিড়বিড় করে যোগ করল, 'অবশ্য সাদা রান দেখালে অন্য ব্যাপার!'

বিকেল বড় বড় চোখে তাকাল এ কথা শুনে। চোখমুখ থেকে কান্নার দমক উঠে গেছে এক লহমায়। রাগে লাল হয়ে দুই ভ্রুয়ের মাঝখানে ভাঁজ ফেলে বলল, 'তাই না? সাদা রান দেখার এত্ত শখ?'

রোদ্দুরের হাসি আসে পেট চিরে। বহু কষ্টে সেটাকে চেপেচুপে রেখে বলার চেষ্টা করে, 'তো? বউ তো দেখায় না। পুরুষ মানুষ আফটার অল। একটা ফ্যান্টাসি থাকতেই পারে।'

বিকেলকে ছেড়ে বিছানার উপর বসল এবার। দু'হাত পেছনে নিয়ে আয়েশ করে আড়মোড়া ভাঙে, তারপর বলে আবারও, 'ঘরে খাবার না পেলে বেড়াল তো বাইরে মুখ দেবেই। পেট নিয়ে আসছি, না খেয়ে থাকার জন্য নাকি?'

বিকেলের এত্ত মেজাজ খারাপ হলো!!

দুষ্টুমির ছলে বলুক কিংবা সিরিয়াস ভঙ্গিতে, বলবে কেন? এগুলা কোন ধরনের জোক? তপ্ত মেজাজেই বিকেল বলল, 'এমন বেড়াল আমি রাখব কেন? গলায় টিপ দিয়ে মেরে ফেলব না।'

'অবলা জীব মেরে হত্যার দায় মাথা নেবে? তারচেয়ে দেখিয়ে দিলেই ল্যাটা চুকেবুকে যায়।'

'কি?'

'সাদা রান...'

বা চোখটা বিশ্রি ইংগিতে টিপল রোদ্দুর। এতক্ষণে আসল ঘটনা বুঝতে পারে বিকেল। কেঁপে ওঠে সে। শিহরণ বয়ে যায় রগে রগে। ছিটকে একটুখানি দূরে সরে দাঁড়াতেই রোদ্দুর উঠে দাঁড়ায়, 'দেখাবি না তো? ওকে, আমি তবে চললাম...'

'এটা অন্যায়!'

'কিসের অন্যায়?'

'আপনি ব্ল্যাকমেইল করছেন।'

'করলে করলাম। কিন্তু সিরিয়াসলি বলছি কিন্তু।'

'না দেখালে চলে যাবেন।'

'আলবাত!'

'চলে যান তবে।' বলেই ঠোঁট কামড়ে মেয়েটা চোখ ফিরিয়ে নেয়।

রোদ্দুর এগিয়ে আসে, 'চলে যাব?'

'হুঁ।' সংক্ষেপে ঘাড় নাড়ে ও।

'তিন সত্যি?'

এবার জবাব না দিয়ে কেবল মুখ ফিরিয়ে রাখে সে। রোদ্দুর আরও কাছাকাছি এগিয়ে আসে। চিবুকটা তুলে ধরে জানতে চায়, 'কি হলো, বল? চলে যাব আমি? এভাবেই? কিছু দিবি না?'

একটি প্রশ্নের উত্তর ও মেয়েটা দিতে পারে না। চোখ বন্ধ করে রাখে, যেন নিথর নির্জীব প্রাণ তার। রোদ্দুর অপেক্ষা করে না, ঠোঁট জোড়া ডুবিয়ে দেয় মুহূর্তেই। ছলকে ওঠে প্রিয়তমার বুকের র:ক্ত। পরমুহূর্তেই হিম হয়ে স্থির হয়ে যায়। একবার নড়ে, তাতেই ঠোঁট সরিয়ে ফিসফিস করে ছেলেটা, 'প্লিজ জান.. আই নিড ইউ।'

বিকেলের সমস্ত অভিমান আর প্রতিবাদের ভাষা মুহূর্তেই যেন কর্পূরের মতো উড়ে গেল। রোদ্দুরের অমোঘ টানে সে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। এক অদ্ভুত সমর্পণ গ্রাস করল তাকে। কোনো দ্বিধা নেই, কোনো জড়তা নেই, মেয়েটা নিজেকে সঁপে দিল নিঃশর্তভাবে। ঠিক যেভাবে একরাশ ভক্তি নিয়ে দেবীমূর্তির চরণ যুগলে পরম মমতায় ফুল অর্পণ করা হয়, বিকেলের আত্মসমর্পণটুকুও ছিল ঠিক ততটাই শাশ্বত আর পবিত্র!

★★★

ভোরের আলো ফোটার আগেই বাড়ির আঙিনায় ব্যস্ততা শুরু হয়ে গেল। গুষ্টির অর্ধেক মানুষই আজ ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়েছে- বাড়ির বড় ছেলের বিদেশ যাত্রা বলে কথা, আয়োজন তো একটু হবেই। বাড়ির ছোট্ট স্বস্তিও বাদ গেল না। শুধু দীপ্র রয়ে গেল আইরিনের কাছে; অসুস্থ আর ভেঙে পড়া মানুষটাকে এই অবস্থায় একা ফেলে যাওয়া যায় না।

অথচ এই পুরো শোরগোলের মাঝে বিকেলের কথা কেউ একবারও ভাবল না। মেয়েটা কোনো ভিড়ে মিশল না, বরং বারান্দার এক কোণে অন্ধকারের আড়ালে একা দাঁড়িয়ে রইল। গাড়ি ছাড়ার ঠিক আগ মুহূর্তে রোদ্দুর একবার চোখ তুলে তাকাল। সেই এক পলকের চাওয়ায় হাজারো না বলা কথা বিনিময় হয়ে গেল। তারপর হাত নেড়ে বিদায় জানিয়ে গাড়িটা হুশ করে বেরিয়ে গেল চোখের পলকে। পেছনে ধুলো উড়িয়ে রয়ে গেল একটা মূর্ছে যাওয়া ফুল।

গাড়ির পেছনের সিটে হেলান দিয়ে পকেটে হাত রাখল রোদ্দুর। ভেতরে সবাই কথা বলছে, কেউ কেউ শেষ মুহূর্তের উপদেশ দিচ্ছে- বিদেশে গিয়ে কী করতে হবে, না হবে। রোদ্দুর ওসবে কান দিল না। তার সমস্ত মনোযোগ এখন হাতের মুঠোয় থাকা ছোট্ট কাগজটার ওপর। যাওয়ার ঠিক আগে বিকেল পরম যত্নে তার হাতের তালুতে এটা গুঁজে দিয়েছিল। এলোমেলো হাতে গুটিগুটি অক্ষরে তাতে লেখা:

আমার রাত জাগা তারা,

তোমার আকাশ ছোঁয়া বাড়ি।

আমি পাই না ছুঁতে তোমায়,

আমার একলা লাগে ভারী!

পড়তে পড়তে রোদ্দুরের বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে পড়ে। তপ্ত নিঃশ্বাসটা পরম মমতায় ছুঁয়ে যায় কাগজের প্রতিটি অক্ষরকে।

(চলবে)

________

ভীষণ মন খারাপ নিয়ে আজকের পর্ব লিখেছি। সর্বোচ্চ রেসপন্স পাবো না আপনাদের??

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩৩তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন