#প্রেমের_নির্বাসন - (৪০)
লেখনীতে - #মৃধা_মৌনি
____________________
(বর্তমান)
ভোরের আলো তখনো ফোটেনি, চারদিকের স্তব্ধতা ভেঙে খুব মৃদু একটা শব্দে বিকেলের ঘুমটা ভেঙে গেল। ঘর জুড়ে নিকষ কালো অন্ধকারের রাজত্ব। সাধারণ কেউ হলে হয়তো শিউরে উঠত অকস্মাৎ, কিন্তু বিকেলের চোখে ভয়ের লেশমাত্র নেই। কণ্ঠ চিরে ‘কে’ শব্দটা বেরিয়ে আসার ঠিক আগের মুহূর্তে পরিচিত একটা ঘ্রাণ ওর নাসিকারন্ধ্রে এসে ধাক্কা দেয়। বিকেলের ঠোঁটে এক চিমটি হাসি ফুটে ওঠে। অদৃশ্য কারো উদ্দেশ্যে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়, 'ঘুমের ঘোরে হাঁটার অভ্যাস আছে নাকি?'
ঘরের অপর প্রান্ত থেকে কোনো উত্তর এল না। সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা ছোট্ট শিশুটি ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে গেছে। ঠোঁট জোড়া কাঁপছে ঠিকই, কিন্তু কোনো শব্দ বেরোচ্ছে না। সে যেখানে ছিল, সেখানেই পাথরের মূর্তির মতো জমে গেল। পরক্ষণেই ঘরের বাতি জ্বলে ওঠে। বিছানার পাশে মাস্টার সুইচটা বিকেলের হাতের নাগালেই ছিল। দুধসাদা আলোয় দেখা গেল বিছানায় হেলান দিয়ে বসে আছে বিকেল, মুখে রহস্যময় হাসি।
শ্যামা দ্রুত চোখ সরিয়ে নেয়। এই মেয়েটাকে তার কেমন যেন ভয় লাগে। চলে যাওয়ার জন্য এক পা বাড়াতেই বিকেলের শাসন মেশানো ডাক ভেসে এল, 'এই মেয়ে, দাঁড়াও!'
বিকেল বিছানা ছেড়ে মেঝেতে পা রাখে। দ্রুত পায়ে এগিয়ে গিয়ে দাঁড়ায় শ্যামার মুখোমুখি। মেয়েটা ভীত হরিণীর ন্যায় ড্যাবডেবে চোখে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে, যেন দৃষ্টি লুকানোর একটা বৃথা চেষ্টা চালাচ্ছে আপ্রাণ। বিকেল অবাক হয়, এইটুকু একটা শিশুর মধ্যে কী অকালপক্ব গাম্ভীর্য! ধরা পড়ে যাওয়ার পর তার চোখেমুখে অপরাধবোধের চেয়ে লজ্জাই বেশি ফুটে উঠেছে।
বিকেলের কণ্ঠস্বর খানিকটা নরম হলো এবারে। জানতে চাইল, 'তোমার কি কিছু প্রয়োজন? তাই এসেছিলে?'
শ্যামা নিঃশব্দে মাথা নেড়ে না জানাল।
'তবে কি তেষ্টা পেয়েছে?'
এবারেও মাথা নাড়িয়ে অসম্মতি জানাল মেয়েটা। বিকেল খানিকটা দ্বিধায় পড়ে। এক মুহূর্ত নিস্তব্ধ থেকে ভাবুক স্বরে বিড়বিড় করল, 'তাহলে কেন এলে? আর জানলেই বা কী করে যে এটা আমার ঘর?'
প্রতিপক্ষ এবারও নিরুত্তর। বিকেলের ধৈর্য কিছুটা চ্যুত হলো বোধহয়। একটু কড়া সুরে বলে উঠল, 'কী হলো, উত্তর দাও? আমাকে না বললে আমি বুঝব কী করে?'
শেষ বাক্যটার কাঠিন্য সম্ভবত শ্যামার কচি মনে আঘাত করল। সে শিউরে উঠে এক কদম পিছিয়ে যায়। তারপর অতি কষ্টে, অস্পষ্ট স্বরে বিড়বিড় করে জীবনের প্রথম শব্দটি উচ্চারণ করে— 'ভয়।'
বিকেলের দুই ভ্রু কুঁচকে এক বিন্দুতে মিলিত হলো। সে নিজেও শব্দটা আওড়াল, 'ভয়?'
পরমুহূর্তে জানতে চাইল, 'কিসের ভয়? আমার বাড়িটা তো হন্টেড নয়। সব তো স্বাভাবিক। তবে কিসের এত ভয় তোমার?'
মেয়েটা নিরুত্তর রইল। বিকেল কিছুক্ষণ ভাবল, তারপর হঠাৎ যেন তার বুদ্ধির জট খুলে পড়ে। উজ্জ্বল চোখে হড়বড় করে জিজ্ঞেস করে, 'একা থাকতে ভয় পাও? তাই তো?'
এবার শিশুটি মৃদু মাথা নাড়াল। বিকেলের ঠোঁটে এক চিলতে আত্মতৃপ্তির হাসি ফুটে ওঠে। দু-হাত ভাঁজ করে গর্বিত ভঙ্গিতে বলে, 'ওয়েল... তোমার চেয়ে আমি অনেক বেশি সাহসী। জানো, আমি ছোটবেলা থেকেই নিজের ঘরে একা ঘুমিয়ে আসছি।'
শ্যামার চোখে বিস্ময় চিকচিক করে। এই প্রথম সে কোনো কথায় প্রতিক্রিয়া দেখাল। বিকেলের ভালো লাগল বিষয়টা। সে বলে চলে, 'যাই হোক, কারো সঙ্গে বিছানা ভাগ করে নেওয়ার অভ্যাস আমার নেই। কিন্তু তোমার জন্য এই ঘরেই আমি অন্য একটা বিছানা পাততে পারি। আশা করি, তাতে তোমার কোনো আপত্তি থাকবে না?'
শ্যামা সম্মতির ভঙ্গিতে মাথা নাড়ে আবারও। বিকেল মৃদু হাসল।
'আজকের মতো আমার বিছানাতেই ঘুমিয়ে পড়ো। নাকি খিদে পেয়েছে? কিছু খাবে?'
মাথা নেড়ে না জানাতেই বিকেল অকস্মাৎ তাকে কোলে তুলে নেয়।
'ইউ আর সো ওয়েল ম্যানারড! আ’ম ইম্প্রেসড বাই দ্য ওয়ে...'
মেয়েটি কিছুই বলল না, শুধু বিকেলের কোলে আড়ষ্ট হয়ে রইল। ওকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে বিকেল জানালার ধারের আরামকেদারায় গা এলিয়ে দেয়। পর্দা সরাতেই একগুচ্ছ মায়াবী আলো এসে লুটিয়ে পড়ল কেদারার ওপর।
বাইরে তখন এক অপার্থিব ভোর নামছে। তুষারপাত থেমেছে কিছুক্ষণ হলো, তবে চারপাশ একজন ধবল সুন্দরীর রূপ ধারণ করেছে। যেদিকে চোখ যায়, শুধু শুভ্রতার সমারোহ। দিগন্তজোড়া সেই সাদা চাদরের মাঝে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা পাইন বনটাকে মনে হচ্ছে - রুপালি কোনো স্বপ্নপুরী। বরফে ঢাকা পাইন গাছের শাখাগুলো নুয়ে আছে কোনো এক অদ্ভুত প্রশান্তিতে। বিকেল বিমুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে রইল। কতবার এই দৃশ্য সে দেখেছে, তবু প্রতিবারই যেন নতুনের স্বাদ পায়। আর যতবার দেখে, বুকের ভেতরটা হু হু করে ওঠে অজান্তেই।
এই সৌন্দর্যের ভাগীদার হওয়ার কথা ছিল আরও একজনের। নিয়তির পরিহাস না থাকলে হয়তো আজ দুজনে মিলে ধোঁয়া ওঠা হট চকোলেটের কাপে চুমুক দিতে দিতে এই তুষারশুভ্র ভোর দেখত। দীর্ঘশ্বাসে বুকটা ভারি হয়ে আসে বিকেলের।
ঠিক তখনই পেছন থেকে একটা রিনরিনে কণ্ঠস্বরের সম্পূর্ণ বাক্য ভেসে আসে, 'আপনি ঘুমোবেন না?'
বিকেল চমকে ফিরে তাকাল। শ্যামা বিছানায় পুতুলের মতো বসে আছে। বিকেল বিস্ময় চেপে রাখতে পারে না, 'তোমার কণ্ঠস্বর তো ভারি চমৎকার!'
মেয়েটি হাসল না, এমনকি কোনো আনন্দের চিহ্নও তার মুখে নেই। বিকেল মনে মনে ভাবে, কোন সে ঝড়, যা এইটুকু বয়সেই মেয়েটাকে এত পরিণত করে তুলেছে? কে তার বাবা-মা? উত্তর খুঁজে পায় না সে। শুধু শ্যামার ড্যাবডেবে চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, 'তুমি ঘুমিয়ে পড়ো। আমি এখানেই আছি।'
শ্যামা আর এক মুহূর্তও নষ্ট করল না। তক্ষুনি নরম কমফোর্টারের ওমে নিজেকে লুকিয়ে ফেলল। নিমিষেই তলিয়ে যায় গভীর ঘুমের অতল গহ্বরে।
বিকেল আরামকেদারায় মাথা রেখে বাইরের ওই ধূসর আকাশটার দিকে চেয়ে রইল। নিজেকে বড় একা, বড় নিঃসঙ্গ মনে হতে লাগল তার। চোখ দুটো জ্বালা করছে। সে কাঁদতে চায় না, স্মৃতিদের ভিড় করতে দিতে চায় না। অবসন্ন শরীরটা এলিয়ে দিতেই তার মনে হয়, সে যেন কারো বুকের ওমে মিশে যাচ্ছে। একসময় সেও ঘুমের কোলে ঢলে পড়ল অজান্তে।
ভোরের প্রথম তির্যক রোদ এসে পড়ল বিকেলের শান্ত মুখে। জানালার কার্নিশে এসে বসল একটি ব্ল্যাক-ক্যাপড চিকাডি পাখি। সে তার ছোট্ট ঠোঁট দিয়ে কাঁচের ওপর মৃদু ঠোকর দেয়। বাইরের পাইন বনের ওপর রোদের সোনা রোশনাই উপচে পড়ছে তখন।
★★★
কানাডার বানফ শহরের এই পাথুরে নিস্তব্ধতায় বিকেলের আট-আটটি বছর কীভাবে যে কেটে গেল, তা ভাবতে বসলে ও নিজেই বিস্ময়ে থমকে যায়। স্মৃতির ধুলো ঝাড়লে আট বছর আগের সেই প্রথম দিনগুলোর কথা মনে পড়ে। অলিভার চাচাতো বোন টিউলিপের বাড়িতে যখন প্রথম পেয়িং গেস্ট হয়ে এল, তখন কান্নাই ছিল ওর নিত্যসঙ্গী। পাক্কা চারটি দিন মেয়েটা অঝোরে কেঁদেছিল, নাওয়া-খাওয়া সব তুলে দিয়েছিল শিকেয়।
চোখ বুজলেই মনে হতো, বহুদূর থেকে কেউ যেন ব্যাকুল হয়ে হাতছানি দিয়ে ডাকছে। সেই ডাকের টানে বুকের ভেতরটা খাঁ খাঁ করত, তৃষ্ণায় গলা ফেটে আসত। গ্লাসের পর গ্লাস পানি খেয়েও সেই অদ্ভুত পিপাসা মিটত না। কী এক অবর্ণনীয় বিষাদ আর অসহনীয় সময় ছিল সেটা! তবে টিউলিপ আর ওর পরিবার বিকেলকে আগলে রেখেছিল গভীর মমতায়। দীর্ঘ পথ ড্রাইভ করে ওকে নিয়ে ঘুরে বেড়ানো, নতুন নতুন জায়গায় হারিয়ে যাওয়া - কত কি না করেছে বিকেলের মনটা একটু হালকা করার চেষ্টায়।
তারপর একদিন এক কিন্ডারগার্টেনে শিক্ষিকা নিয়োগের খবর এল। দিশা সবসময় বলত, ‘হানি ইজ মানি’—টাকাই এই দুনিয়ার সবচেয়ে চমৎকার লাইফ পার্টনার। বিকেল আর না করেনি। সেই ছোট ছোট দেবশিশুদের ভিড়ে মিশে গিয়ে ও যেন বেঁচে থাকার একটা নতুন মানে খুঁজে পেয়েছিল। সেই যে শুরু, আজ আট বছর পর বিকেল এখন এক ক্যাথলিক চার্চের সাথেও যুক্ত।
বর্তমানে বিকেল যে বাড়িটিতে থাকে, সেটিও টিউলিপের মাধ্যমেই পাওয়া। টিউলিপের স্বামীর এক দূর সম্পর্কের আত্মীয়র বাড়ি এটি। তারা বেশির ভাগ সময় দেশেই থাকেন, শুধু বছরে এক-আধবার মাসখানেকের জন্য ছুটিতে আসেন। বিশাল বাড়িটি দেখাশোনার জন্য একজন বিশ্বস্ত মানুষের প্রয়োজন ছিল তাদের। অন্য দিকে বিকেলেরও তখন একটা নিজস্ব ঠিকানার বড় দরকার ছিল। পরের আশ্রয়ে আর কত দিন!
পাঁচ বছর আগে এই বাড়িতে যখন ও থিতু হলো, তখন নিজের অজান্তেই বিকেলের মনে পড়ে যাচ্ছিল সেই ছোট্ট মেয়েটার কথা - যে একসময় নিজের ছোট ঘরটুকু গুছিয়ে রাখতে পারত না। আজ সেই মেয়েটিই সুদূর প্রবাসে একলা হাতে নিজের পুরো জীবনটাকে গুছিয়ে নিয়েছে। রোজ নিজের সাথে নিজে যুদ্ধ করে যায়, যেন জীবনে কোনো অনুশোচনা দানা বাঁধতে না পারে। নিজেকে ভালো রাখার এই লড়াইয়ে ও এখন অনেক পরিণত।
তবুও দিনের শেষে এক চিলতে আফসোস মনের কোনো এক কোণে রয়েই গেছে। সেই গোপন হাহাকার কি এ জীবনে কোনোদিন মিটবে? বিকেল জানে না। হয়তো উত্তরটা সময়ের গর্ভেই লুকানো।
হোম থিয়েটারে খুব নিচু স্বরে একটা গান বাজছে। টেইলর সুইফটের পুরনো দিনের সুর। বিকেল আপনমনে গানের তালে ঠোঁট মেলাচ্ছিল—
That I'm not a princess, this ain't a fairy tale
I'm not the one you'll sweep off her feet
Lead her up the stairwell
This ain't Hollywood, this is a small town
I was a dreamer before you went and let me down
Now it's too late for you and your white horse to come around.....
'ভেতরে আসতে পারি?'
চেনা কণ্ঠস্বর, বিকেল গান থামিয়ে ফিরে তাকাল। জুলিয়ানকে দেখেই ওর সারা মুখে বিরক্তির ছাপ ফুটে ওঠে। চার্চে এখন সপ্তাহখানেকের ছুটি। তীব্র শীতের প্রকোপ কিছুটা কমে শান্তির নিশ্বাস ফেলবে যখন জনপদ, তখন আবার শুরু হবে কর্মব্যস্ত দিনের দৌড়াদৌড়ি, ছোটাছুটি। কিন্তু চার্চের ব্যস্ত দিনগুলোর ক্লান্তির চেয়েও এই ছেলেটাকে সামলানো যেন বেশি কঠিন। জুলিয়ানের বাবা বিদেশি হলেও মা ছিলেন খাঁটি বাঙালি, তাই তার বাংলাটা বেশ ঝরঝরে। মূলত এই কারণেই বিকেল তাকে নিজের বাড়িতে পেয়িং গেস্ট হিসেবে আশ্রয় দিয়েছিল। কিন্তু পরে এসব হবে জানলে কখনোই এই ঝামেলা সে নিজের কাঁধে টেনে নিত না।
জুলিয়ান বিকেলের সম্মতির তোয়াক্কা না করেই ভেতরে ঢুকে পড়ল। তাই দেখে কণ্ঠে কিছুটা ঝাঁজ মিশিয়ে বলল, 'তোমাকে না বলেছিলাম, রান্নাঘরে আমি যখন কাজ করি, তখন কেউ ডিস্টার্ব করলে আমার আনকম্ফোর্টেবল লাগে? এই সময়টা একান্তই আমার।'
জুলিয়ান একদম শান্ত স্বরে উত্তর করে, 'আমি জানি।'
'জেনেও কেন এসেছ?'
'আমি চলে যাচ্ছি মিস বি।' পরক্ষণেই নিজেকে শুধরে নিয়ে বলল, 'সরি... মিসেস বি।'
বিকেল মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। দৃষ্টি নত হয়। জুলিয়ানের ওই কটা রঙের চোখে কেমন এক মায়া মেশানো অস্বস্তি আছে। ওর দিকে তাকিয়ে থাকলে বিকেলের মনটা কেমন অস্থির হয়ে ওঠে। নাকি মন একবার একজোড়া চোখের আগুনে এমনভাবে পুড়েছে যে, সে আর নতুন কোনো দৃষ্টির মায়ায় নিজেকে জড়াতে চায় না! কে জানে!
বিকেল আবার রান্নায় মন দেয়। চুলায় ডালের হাঁড়ি থেকে বুদবুদ উঠছে। একদম সাধারণ বাঙালি রান্না খেয়ে অভ্যস্ত ও । আঁচ কমিয়ে রসুন কুচি করতে করতে জানতে চাইল, 'কোথায় যাচ্ছ?'
জুলিয়ান হাসল একটু।
'তুমি জানতে চাইছ? ঠিক বিশ্বাস হচ্ছে না আমার।'
বিকেল চুপ হয়ে গেল। জুলিয়ান আসার পর থেকেই কেন জানি বিকেলের পেছনে আঠার মতো লেগে ছিল। বয়সে বিকেলের চেয়ে দু-তিন বছরের ছোটই হবে হয়তো, অথচ হাবভাবে সে যেন বিকেলের অঘোষিত প্রেমিক! মেয়েটার জন্য বিষয়টি প্রচণ্ড অস্বস্তিকর বটে। সে বারবার কৌশলে জুলিয়ানকে চলে যাওয়ার কথা বুঝিয়ে দিয়েছিল। অথচ আজ যখন ছেলেটি নিজে থেকে বিদায়ের কথা বলছে, বিকেলের মনের কোনো এক কোণে কেন জানি একটু খচখচ করে উঠেছে।
জুলিয়ানের ডাকে ঘোর কাটল ওর, 'মিসেস বি?'
বিকেল ফিরে তাকায়।
'তুমি সত্যিই খুব সুন্দর। আমি তোমাকে কোনোদিন ভুলব না।'
জুলিয়ানের সরাসরি এই প্রশংসা বিকেলের অস্বস্তি বাড়িয়ে দেয়। সে চোখ নামিয়ে খুব নিচু স্বরে বলে, 'ধন্যবাদ।'
'চলি।'
বিকেল অযথা ডেকে বসল, 'কিন্তু কোথায় থাকবে?'
'সেটা নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না বি। একটা গন্তব্য ঠিক জুটে যাবে।' মুচকি হাসি ছুঁড়ে দিয়ে পরমুহূর্তেই যোগ করে, 'অবশ্য ভেবেছিলাম, এই গন্তব্যই চিরস্থায়ী ঠিকানা হবে...'
'আই টোল্ড ইউ, আমি বিবাহিত!'
বিকেলের অস্বস্তি গাঢ় হয়। উশখুশ করছে দ্বিধাভরে। নত স্বর নাড়িয়ে কথাটা ছুঁড়ল কোনোমতে। প্যান বের করে বসিয়ে দিল চুলোয়। ডালের বাগার দিতে হবে।
জুলিয়ান স্মিত হেসে শুধায়, 'যে নেই, তার প্রতি তোমার এত আনুগত্য?'
নিশ্চুপ মেয়েটা।
'পারবে? একটা জীবন এভাবে একা কাটিয়ে দিতে?'
'একটা জীবনই তো। কেটে যাবে।'
'তুমি সত্যিই অনেক শক্ত মনের মানুষ। সম্ভবত এই গুণটাই আমাকে তোমার দিকে টেনেছিল।'
বিকেল আবার মৃদু হাসল। জুলিয়ান চলে যাওয়ার জন্য দরজার দিকে পা বাড়ায়। কিন্তু দু-পা গিয়েই আবার থমকে দাঁড়িয়ে পেছন ফিরে। বিকেলের চোখে চোখ রেখে শেষবারের মতো অনুনয় করল, 'আরেকবার ভেবে দেখা যায় না?'
অনুরোধ নাকি আক্ষেপ—জুলিয়ানের কণ্ঠে কী ঝরে পড়ল তা ঠিক বোঝা গেল না। বিকেলের মায়া হয় বড্ড। ইচ্ছে করছে ছেলেটার সবটুকু বিষাদ এক নিমিষেই ভুলিয়ে দিতে, কিন্তু সে নিরুপায়। মনের ওপর তো জোর খাটানো যায় না।
তাই চুপ করেই রইল। ওর মৌনতাই উত্তর হয়। জুলিয়ান বুঝল, স্মিত হেসে বলল, 'বড় ভাগ্যবান সে... যে তোমাকে পেয়েছিল।'
'বড়ই দুর্ভাগ্য আমার...তাকে আমি হৃদয় দিয়েছিলাম....'
বিকেলের চোখের কোণ চকচক করে ওঠে।
জুলিয়ান কথা বাড়াল না আর। পিঠের ব্যাগটা দরজার কপাটে মৃদু শব্দ তুলে হারিয়ে গেল। সেই যাওয়ার রেশটুকু বিকেলের কানে অনেকক্ষণ ধরে বাজতে থাকল। এবং ঠিক তখনই মস্তিষ্কে তীব্র গতিতে ছুটে এসে ধাক্কা খায় একটি প্রশ্ন, 'কুড়িয়ে পাওয়া মেয়েটির ভাষা বাংলা? সে প্রতিটি শব্দ সুন্দর করে, সঠিক উচ্চারণে, না ভেঙে উচ্চারণ করেছে! কী করে? তবে কি এও কোনো এক কাকতালীয় ঘটনা নাকি স্রেফ অজানা রহস্যের খেলা?' বিকেল বিমূর্ত হয়। স্তব্ধ হয়ে পড়ে। সময় অতিক্রম করে। ঘরটা মুহূর্তে বড় বেশি নিস্তব্ধ হয়ে পড়ে এরপর।
সুদূর বানফের সেই বরফশীতল নীরবতাকেও হার মানায় বাংলাদেশের এই ঘরটির অখণ্ড নিস্তব্ধতা। চারদিকের দেয়ালে দেয়ালে যেন কবরের নিথর নিস্তব্ধতা লেপ্টে আছে। কোথাও কোনো আলোর আভাস নেই, নিকষ কালো অন্ধকার কামড়ে ধরেছে চারপাশ। উত্তুরে হাওয়া খোলা জানালা দিয়ে তীব্র বেগে ঘরে ঢুকছে, কিন্তু সেই হাড়কাঁপানো শীতকে অগ্রাহ্য করেই মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে একজন।
উঁচু-লম্বা এক সুঠাম অবয়ব। পরনে একটি ফ্যাকাশে সবুজ রঙের ক্ষয়ে যাওয়া পাঞ্জাবি, যার বুকের দিকের একটা বোতাম বহুদিন আগেই ছিঁড়ে হারিয়ে গেছে। শীত থেকে বাঁচার কোনো তাগিদ নেই, কোনো আবরণ নেই গায়ে—সে যেন এক অন্য জগতের বাসিন্দা। একমনে শুধু সিগারেটের পর সিগারেট টেনে যাচ্ছে সে। আগুনের লাল স্ফুলিঙ্গ অন্ধকারের মাঝে ক্ষণে ক্ষণে জ্বলে উঠছে, আর ধোঁয়ার কুণ্ডলী মিশে যাচ্ছে জমাট বাঁধা অন্ধকারে।
উদ্ভ্রান্ত চেহারা। কাঁধ অবধি নেমে আসা অবিন্যস্ত চুলে তাকে কোনো এক পরাজিত সৈনিকের মতো দেখায়। অযত্নে বেড়ে ওঠা দাড়ি আর ভেঙে যাওয়া চোয়ালে এক বুক হাহাকার স্পষ্ট। চোখ দুটোর দিকে তাকালে শিউরে উঠতে হয়; সেখানে কেবলই খেলা করছে বিষাদ এবং শূন্যতা। মানুষটা যেন নিশ্বাসটুকু সম্বল করে কোনোমতে টিকে আছে কোনো রকমে, অথচ তার আত্মার মৃত্যু হয়েছে বহু আগেই।
শীতল বাতাস ঘর জুড়ে দাপিয়ে বেড়ায়, কিন্তু তার কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। সে শুধু তাকিয়ে আছে অন্ধকারের দিকে। ওই শূন্যতার মাঝেই মানুষটা খুঁজে ফিরছে হারানো কোনো অতীতের ধূলিসাৎ হওয়া স্মৃতি।
ঘরের দরজায় টোকা পড়ে। রোদ্দুরের ধ্যান ভেঙে খানখান হয়। তীব্র গতিতে পেছন ঘুরে তাকাতেই চোখ-মুখ কঠিন হয়ে উঠল তার। খ্যাঁকখ্যাঁক কণ্ঠে বলে উঠল, 'আবার এসেছ? ওই এক সুর নিয়ে?'
রেহনুমার কান্নাভেজা চোখ, 'তোর বাবা হাত কেটে ফেলছেন রোদ...'
'কাটুক! আমার যে চিত্ত চিরে গেছে, সে বেলায়?'
রেহনুমা এগিয়ে আসতেই রোদ্দুর উদ্ভ্রান্তের মতো ক্ষেপে ওঠে। চিৎকার করে বলে, 'খবরদার মা, আসবে না। আমাকে একা নিজের মতো থাকতে দাও। সব কেড়ে নিয়েছ আমার, সবকিছু!'
'বাবা...'
'ডাকবে না আমাকে। এই ডাক ডেকে ডেকে আমাকে পাগল করে দিয়েছিলে তোমরা। আমি হিতাহিতজ্ঞানশূন্য হয়ে যা নয় তাই করে বসেছি...আর না, আর না মা, আর না!!'
সজোরে পাশে থাকা ড্রেসিং টেবিলে ঘুষি মে★রে বসে রোদ্দুর। হাত কেটে ছিন্নভিন্ন হয়। চুইয়ে চুইয়ে র★ক্ত পড়ে ভেসে যায় মেঝে। রেহনুমা চিৎকার করে ওঠেন। মিশি ছুটে আসে তাই শুনে। মেয়েটা অনেক বড় হয়ে গিয়েছে। দুর্ভাগ্য বিয়েটা হয়নি। এমন বাড়িতে কেউই আত্মীয়তা করতে চায় না কেন যেন।
চোখের চশমাটা নাকের গোড়া থেকে ঠেলে উপরে তুলে আনে। আর্তনাদে হৈহৈ করে, 'এ কি ভাইয়া! তুমিও!'
রোদ্দুর শান্ত হয়। ব্যথায় নাস্তানাবুদ বেচারা, একমাত্র মিশিকেই সহ্য করতে পারে।
কণ্ঠ ব্যথাতুর করে বলল, 'ওই ড্রয়ারে ফার্স্ট এইড আছে, নিয়ে আয়।'
রেহনুমার দিকে তাকাল মিশি, 'তুমি চলে যাও মা। তোমার জন্যে এত কান্ড, বাবাকে সামলাও গিয়ে...'
রেহনুমার বুক ভেঙে আসেন। দুই দুইটা সন্তানের কেউই আজ তাকে কণা পরিমাণ মূল্য দেয় না। বড়টা তো সহ্যই করতে পারেন না। ছোট টাও না। যেই মিশি কথার পিঠে কথা বলতে পারত না, সে আজ কাট কাট ভাষায় তাকে যা তা বলতে থাকে। রেহনুমার মনে হয়, সেদিন মাথা ঘুরে না পড়ে মরণ হয়ে গেলেই ভালো ছিল বুঝি। স্বামীর কথার মান রাখতে গিয়ে ছেলের উপর এতোটা অত্যাচার, অবিচার করা হয়ে গেছে...আজ তার ছেলে তার মুখটাই দেখতে পারে না! একজন মায়ের কাছে এরচেয়ে বেশি নরক যন্ত্রণা আর কিছু হতে পারে?
রেহনুমা কান্নারত চোখে দরজা খুলে বেরিয়ে গেলেন।
পেছনে রোদ্দুর ভয়ানক আর্তনাদ করে চিল্লাচ্ছে। মিশি ক্ষতে হেক্সিসল মেশানো তুলো চেপে ধরেছে নিজের সর্বশক্তি দিয়ে....
(চলবে)
________
টেনেহিঁচড়ে এইটুকু লিখে দিলাম, ওয়েট করালাম না। তারপরও যদি রেসপন্স না করেন, খবর আছে। 🔪
আর যে বলবে ছোট পর্ব কেন? তারে....😾