#প্রেমের_নির্বাসন - (৪৭)
লেখনীতে- #মৃধা_মৌনি
(বাজে ভাষা ব্যবহারের জন্য শুরুতেই ক্ষমাপ্রার্থী)
__________________
'ও আমার আর সৌম্যর সন্তান। ও সৌম্যর সন্ধ্যা।'
কথাগুলো যেন বিকেলের কানের গহ্বরে একটা অন্তহীন হাহাকারের মতো আছড়ে পড়ছে। থামার কোনো লক্ষণ নেই, নেই কোনো বিরতি। অসহ্য যন্ত্রণায় দুই হাতে সজোরে নিজের কান চেপে ধরে সে, যেন বাইরের পৃথিবী থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে নিতে চায়। কিন্তু মনের ভেতরের নাছোড়বান্দা শব্দগুলোকে আটকাবে কে? হঠাৎ করেই বুকের ভেতরটা সাহারার তপ্ত মরুভূমির মতো খাঁ খাঁ করে উঠল; একরাশ তৃষ্ণা যেন কণ্ঠনালী অবধি উঠে এসে তাকে বিদ্ধ করছে। সারাজীবন একা থাকা বিকেলের কাছে এই নিঃসঙ্গতা নতুন কিছু তো নয়, কিন্তু আজকের এই শূন্যতা তাকে গিলে খেতে চায়। ঘরের যেদিকেই চোখ যায়, সেদিকেই নিদারুণ হাহাকার। অথচ সেই ছোট্ট মেয়েটা ছিল মোটে দু’দিনের জন্য! এত অল্প সময়ে কি এত গাঢ় মায়া তৈরি করা সম্ভব? নাকি র★ক্তের অমোঘ টানই তাকে এভাবে অবশ করে দিচ্ছে, কে জানে!
সন্ধ্যার দিকে অস্থিরতা যখন সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গেল, বিকেল আর ঘরে টিকতে পারল না। একরকম উন্মাদের মতোই উবার ডেকে বেরিয়ে পড়ল সে। আসার সময় আদিবা প্রায় জোর করেই তার হাতে ঠিকানা আর ফোন নম্বরটা গুঁজে দিয়েছিল। শহর থেকে প্রায় দুই ঘণ্টার দীর্ঘ পথ। ট্রেনের ঝকঝকানি এড়িয়ে বিকেল গাড়ির পথেই ছুটল। দরকার হলে আদিবার পায়ে পড়বে, হাত পেতে ভিক্ষা চাইবে, তবু মেয়েটাকে সে নিয়ে আসবেই। নিজের বুকের ওমে আগলে রেখে তাকে তিলে তিলে বড় করবে, মানুষের মতো মানুষ করবে। কিন্তু পথের প্রতিটি বাঁকে একটা গভীর সংশয় তার বুক কাঁপিয়ে দিচ্ছিল, আদিবা কি আদৌও দেবে? মায়ার কাছে কি আদিবার মাতৃত্ব হার মানবে?
সহস্র দ্বিধা আর এক বুক অনিশ্চয়তা নিয়ে বিকেল যখন সেই বাড়ির সদর দরজায় গিয়ে পৌঁছালো, আকাশ তখন রাতের ঘন কালো চাদরে ঢাকা পড়েছে। স্তব্ধ জনপদে দাঁড়িয়ে বিকেলের নিজের হৃদস্পন্দনই সবচেয়ে বেশি জোরালো আর তীক্ষ্ণ মনে হতে লাগল।
★★★
দুই দিকে যতদূর চোখ যায়, কেবল ধূ ধূ প্রান্তর আর বাতাসের ঝাপটায় উড়ে বেড়ানো রুক্ষ ধুলিকণা। কদিন আগে এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু এই তৃষ্ণার্ত মাটির বুক ভেজানোর সাধ্য সেই বৃষ্টির ছিল না। চারিদিকে পুনরায় পরিচিত শুষ্কতা আর রুক্ষতা জেঁকে বসেছে। মাঠের মাঝখানে একা দাঁড়িয়ে রোদ্দুর একটা সিগারেট ধরাল। ধোঁয়াগুলো বাতাসের তোড়ে মিলিয়ে যাচ্ছে, ঠিক যেমন ওর জীবনের শেষ কয়েকটা বছর মিলিয়ে গেছে কুয়াশায়। বাড়ি থেকে খুব একটা দূরে নয় জায়গাটা, অথচ মনে হয় এক জনম পার করে এখানে এসে দাঁড়িয়েছে সে।
আজকাল নেশার ঘোর থেকে নিজেকে টেনে বের করার এক আপ্রাণ লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে রোদ্দুর। গাঁজা খাওয়াটা প্রায় ছেড়েই দিয়েছে বলা চলে। সে আবার আগের সেই রোদ্দুর মির্জা হওয়ার চেষ্টা করছে—যে রোদ্দুরকে দেখে একদিন কেউ মুগ্ধ হতো। কারণ রেহনুমা জানিয়েছেন, বিকেল ফিরবে। ওর বিকেল নাকি ওর কাছেই ফিরে আসবে। বিকেলের আসার খবরটা পাওয়ার পর থেকেই রোদ্দুরের বুকের ভেতর এক অদ্ভুত তোলপাড় শুরু হয়েছে। বিকেল যদি এসে দেখে ওর এই জরাজীর্ণ দশা, কোটরাগত চোখ আর উস্কোখুস্কো চুল—তবে যে মেয়েটা ভীষণ রাগ করবে। তার সেই অভিমানী চাউনি সহ্য করার ক্ষমতা যে রোদ্দুরের নেই। তাই বিকেল মির্জা বাড়িতে পা রাখার আগেই নিজেকে যথাসম্ভব পরিপাটি করে তুলতে হবে, নিজেকে আবারও পুরোনো হারিয়ে যাওয়া মানুষটায় রূপান্তর করতে হবে। পথটা কঠিন, প্রতিটি মুহূর্ত অসহ্য যন্ত্রণার, তবু বিকেলের জন্য এটুকু তাকে করতেই হবে।
হঠাৎ কাঁধের ওপর একটা ভারী হাতের স্পর্শ পেয়ে রোদ্দুর সংবিৎ ফিরে পেল। পাশে তাকাতেই দেখল রবিউল দাঁড়িয়ে। পেছনে তানভীর, চয়ন আর নীলয়ও আছে। এই ছেলেগুলো বয়সে রোদ্দুরের চেয়ে অনেক ছোট, অথচ গত কয়েকটা বছর এদের সঙ্গেই আড্ডা দিয়ে, নেশার ঘোরে বুঁদ হয়ে রাত পার করেছে সে। রবিউল ওর কাছে কিছু টাকাও পায়—খুব বেশি নয়, আঠারো হাজার টাকার মতো। একশো-দুশো করে ধার নিতে নিতে কখন যে অঙ্কটা এত বড় হয়ে গেছে, রোদ্দুর নিজেও জানে না। রবিউলের বাবার এই এলাকাতেই পরপর চারটে বাড়ি; পারিবারিক প্রতিপত্তিও বেশ। সেই দম্ভ রবিউলের চলন-বলনে স্পষ্ট ফুটে ওঠে। রোদ্দুর একটু উশখুশ করে, অপরাধী হাসির মতো একটা রেখা ওর ঠোঁটে ফুটে ওঠে।
রবিউল গম্ভীর কণ্ঠে জানতে চাইল, 'শুনলাম তুই নাকি সব ছেড়ে দিচ্ছিস? তোর লাইলী নাকি আবার ফিরে আসছে?'
বয়সে ছোট হলেও ওরা রোদ্দুরকে ‘তুই’ করেই সম্বোধন করে। এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই; রোদ্দুর নিজেই তো নিজের সম্মানটা ধুলোয় মিশিয়েছে। তাছাড়া ওরা সবাই রোদ্দুর আর বিকেলের পুরনো উপাখ্যানটা জানে। নেশার ঝোঁকে প্রথম প্রথম রোদ্দুর যখন ডুকরে কেঁদে উঠত, বমি করে নিজের অবস্থা তছনছ করে ফেলত আর বিলাপ করে বিলেলকে খুঁজত—ওরা সবটাই দেখেছে। সেই থেকেই ওরা ওকে ‘মজনু’ বলে খ্যাপায়, ওর আবেগ নিয়ে তামাশা করে।
রোদ্দুর আজ কোনো প্রতিবাদ করল না। সিগারেটের শেষ টানটা দিয়ে সে দিগন্তের দিকে তাকিয়ে রইল। ধুলো ওড়া জনশূন্য প্রান্তরে বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দের চেয়েও ভয়ঙ্কর এক নিস্তব্ধতা নেমে আসে। রোদ্দুর আর এক মুহূর্ত এখানে দাঁড়াতে চাইল না, বিকেলের ফেরার প্রতীক্ষায় ওর ভেতরটা ছটফট করছে। কিন্তু পা বাড়াতেই এক জোড়া শক্ত হাত খপ করে ওর শার্টের কলার চেপে ধরে। টান দিয়ে নিজের দিকে ঘুরিয়ে আনল রবিউল। শার্টের বোতাম দুটো ছিঁড়ে ছিটকে পড়ল ধুলোয়।
'ভাব মারাস? হা★রামজাদা...' রবিউলের চোখমুখ কুঁচকানো। রোদ্দুর নিজেকে সংযত রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করে। শান্ত, পাথুরে কণ্ঠে বলল, 'গালি দিবি না রবিউল। ছাড়, আমি বাড়ি যাব।'
রবিউল কথাটা শুনে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল। পেছনের দলবলও যোগ দিল তাতে। মুখটা একদম রোদ্দুরের নাকের কাছে এনে বিষাক্ত নিঃশ্বাস ছেড়ে বলে, 'বাড়ি যাবি না কবরে যাবি সেইটা আমি বুঝব। আর কী বললি? গালি দেব না? বে★শ্যার ছেলে এখন বড় সাহেব হয়েছিস, না রে? মা★গী আসবে শুনে এখন ধোয়া তুলসী পাতা সাজতেছিস?'
কথাটা শেষ হতে পারল না। বিদ্যুৎগতিতে রোদ্দুরের শক্ত মুষ্টি আছড়ে পড়ল রবিউলের নাক বরাবর। এক নিমেষে রবিউলের ভারসাম্য টলে গেল, টলতে টলেতে দু-পা পিছিয়ে পড়ল সে।
'আমাকে যা বলার বল, আমার মাকে তুলে গালি দিবি কেন? তোদের মতো কু★ত্তার বাচ্চাদের লাই দিয়ে মাথায় তুলেছি বলেই আজ এই দিন দেখতে হচ্ছে!' রোদ্দুরের কণ্ঠস্বর রাগে কাঁপে। অনেকদিন পর ওর ভেতরে সেই পুরনো রোদ্দুর মির্জা জেগে উঠেছে যেন।
রবিউলের ঠোঁটের কোণ ঘেঁষে নোনা র★ক্ত আর লালা গড়িয়ে পড়ল। হাতের উল্টোপিঠে তা মুছে নিয়ে ও জানোয়ারের মতো গর্জে উঠে বলতে লাগে, 'আমার গায়ে হাত তুললি? ওরে আজ কেউ ধরবি না! তোর এই হাত ভেঙে আজ তোর পাছা দিয়ে যদি না ঢুকিয়ে দিছি, তবে আমি বাপের জন্মানো না! ধর শালা মজনুরে!'
রোদ্দুর স্থির চোখে তাকিয়ে তবু, 'তুই আমার কাছে টাকা পাবি, আমি দিয়ে দেবো। বলেছি তো। কিন্তু আমি আর তোদের এই নোংরামির মধ্যে নেই। তোদের সাথে ওঠা-বসা করাই ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে বড় পাপ।'
পেছন থেকে নীলয় একটা বিশ্রী ভেঙচি কেটে এগিয়ে এল, 'শালা মা★লখোর! তোর ওই মা★গী যখন তোরে লাত্থি মেরে ভাগছিল, তখন তো আমাদের পা চাটতিস। ডাস্টবিনের পাশে পড়ে যখন বমি করতিস, তখন কোথায় ছিল তোর এই ইজ্জত? এখন শুনছি তোর সেই পুরনো খা★নকি আবার ফেরত আসতেছে, তাই আমাদের আর চাস না? নতুন করে আবার রস কষাচ্ছিস?'
নীলয়ের কথা শেষ হতেই পুরো দলটা অসভ্যের মতো হেসে ওঠে। তানভীর পাশ থেকে টিটকারি দিয়ে ছোঁড়ে, 'শোন রবিউল, মজনুর শরীর তো এখন বিকেলের প্রেমে টইটুম্বর। আমাদের টাকা কি আর সে দেবে? এর চেয়ে চল এর লাইলী আসার আগেই ওরে একটু ঝালাই করে দেই!'
চয়ন এগিয়ে এসে রোদ্দুরের বুকে একটা ধাক্কা দিয়ে বসল, 'কিরে ভাই, খুব তো পটর পটর করছিস। নেশা ছেড়ে এখন কি দুধ খাবি নাকি? আমাদের সাথে বিড়ি টানতে তোর এখন শরম লাগে, হা?'
রোদ্দুর দাঁত চিপে বলল, 'চয়ন, তোদের পায়ে পড়ি, আজকের দিনটা অন্তত আমাকে ছেড়ে দে। আমি বাড়ি যাবো। টাকা আমি যেখান থেকে পারি তোদের ম্যানেজ করে দিচ্ছি।'
'টাকা তো দিবিই, তোর বাপ দেবে টাকা!' রবিউল আবার ঝাঁপিয়ে পড়ল রোদ্দুরের ওপর। রোদ্দুরের চুলের মুঠি ধরে টান দিয়ে নিচে ফেলে দিল চোখের পলকে, 'গালি দিলে তোর খুব লাগে না? শোন তাহলে, তোর ওই নায়িকাকে যদি আমি এই রাস্তায় দাঁড়িয়ে না খাইছি, তবে আমার নাম রবিউল না!'
রোদ্দুর আক্রোশে অন্ধ হয়ে গেল কথাটা শুনতেই। নিচ থেকেই রবিউলের পায়ে একটা জোরালো লাথি চালিয়ে দিল সে। রবিউল চিৎ হয়ে পড়তেই রোদ্দুর তার বুকের ওপর উঠে বসে এলোপাথাড়ি ঘুষি চালাতে শুরু করল।
'আর একবার বিকেলের নাম নিবি! আর একবার বলবি! তোকে আজ আমি মে★রেই ফেলব জা★নোয়ারের বাচ্চা!'
নীলয় আর তানভীর পেছন থেকে রোদ্দুরকে টেনে তোলার চেষ্টা করে। নীলয় চিৎকার করে বলল, 'ওরে ধর! লাইলীর প্রেমে শালা পাগল হয়ে গেছে! মা★র ওরে!'
তানভীরের হাতের লাঠিটা রোদ্দুরের পিঠে সজোরে আছড়ে পড়ল। ব্যথায় ককিয়ে উঠলেও রোদ্দুর রবিউলের কলার ছাড়ল না।
'মর শালা! তোদের মতো পাপীদের থাকার চেয়ে মরাই ভালো!' রোদ্দুর নীলয়ের মুখে এক দলা থুতু ছিটিয়ে দিল।
নীলয় রাগে উন্মত্ত হয়ে রোদ্দুরের পেটে একটা জোরালো লাথি কষায়। রোদ্দুর ছিটকে কয়েক হাত দূরে গিয়ে পড়ল। ধুলোয় মাখামাখি হয়ে যাওয়া রোদ্দুর যখন উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে, তখন চারদিক থেকে তাকে ঘিরে ধরা হলো।
রবিউল উঠে দাঁড়িয়ে নিজের পোশাক ঝাড়ে। তারপর পকেট থেকে একটা চকচকে ছু★রি বের করে আনে।
'খুব তেজ হয়েছে না তোর? টাকা তো দিবিই, সাথে তোর এই তেজি চাউনিটাও আজ আমি শেষ করে দেব। দেখি তোর ওই বিকেল ফিরে এসে তোর কোন চেহারা দেখে চুমু খায়!'
রোদ্দুর হাসে র★ক্তাক্ত ঠোঁট নিয়ে, 'মারবি? মার। কিন্তু মনে রাখিস রবিউল, আমি যদি বেঁচে ফিরি, তোদের কারোর হাড় আমি আস্ত রাখব না। তোদের ওই চোদ্দো পুরুষ উদ্ধার করে তবেই শান্ত হবো।'
তানভীর পাশ থেকে চেঁচিয়ে উঠল, 'মুখ বন্ধ কর খা★নকির পোলা! অনেক বড় বড় কথা বলছিস। আগে আজ এখান থেকে জান নিয়ে বের হ!' বলেই সে রোদ্দুরের কাঁধে আবার লাঠির আঘাত করে।
রোদ্দুর যন্ত্রণায় হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে, কিন্তু তাতেও তার চোখের আগুন নিভল না এতটুকু। বরং ছেলেটা চিৎকার করে বলে পাগলের প্রলাপ, 'বিকেল আসছে! আমার বিকেল আসছে! তোরা কি ভাবছিস তোদের এই নোংরামি ও সহ্য করবে? ও যদি জানতে পারে তোরা আমাকে এভাবে ঘিরে ধরেছিস, তোদের ভিটেমাটিতে ঘুঘু চড়িয়ে দেবে! ও যে রাজ্যের চন্ডাল, দস্যিকন্যা, তোরা জানিস?'
'বিকেলের মুখে আমার গু!' রবিউল আবার একটা জঘন্য গালি দিয়ে রোদ্দুরের মুখে লাথি কষাল, 'আসুক তোর সেই মক্ষীরানী। আমরাও একটু দেখি সে কেমন ডাঁসা মা★ল!'
রোদ্দুর প্রতিবাদের ভাষা খুঁজে পায় না। কেবল একটা অমানুষিক গর্জন দিয়ে আবার উঠে দাঁড়ায়। পকেট থেকে তার দেশলাইটা বের করে ছুঁড়ে মারল নীলয়ের চোখে। নীলয় চোখে হাত দিয়ে বসে পড়তেই রোদ্দুর রবিউলের ছু★রি ধরা হাতটা দুই হাতে চেপে ধরে। শুরু হলো জীবনের শেষ লড়াই। ধুলোমাখা এই প্রান্তরে এখন চার-পাঁচটা শরীর একে অপরের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে। র★ক্ত, ঘাম আর ধুলোর গন্ধে বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। রোদ্দুরের শার্টটা ছিন্নভিন্ন প্রায়, পিঠের চামড়া ফেটে র★ক্ত ঝরছে, চোখের কোণটা ফুলে বন্ধ হয়ে আসছে। তবু সে লড়ছে একজন পরাজিত মানুষের শেষ সম্মান রক্ষা লড়াইয়ের মতো করে।
মারপিট তখন চরমে। রবিউলের ছু★রিটা ঘুরে ঘুরে রোদ্দুরের হাতের তালু চিরে দিয়েছে, কিন্তু রোদ্দুর দাঁতে দাঁত চেপে রবিউলের গলাটা চেপে ধরে আছে। নীলয় আর তানভীর পাশ থেকে লাথি আর পাথর দিয়ে রোদ্দুরকে আঘাত করেই যাচ্ছে। রোদ্দুর প্রায় আধমরা, তবু তার হাত রবিউলের টুঁটি ছাড়ছে না...
ধুলোবালিতে হওয়া রণক্ষেত্র একটা বিভীষিকাময় রূপ নিয়েছে প্রায়, ঠিক সেই মুহূর্তে লোকালয়ের দিক থেকে জনাচারেক মুরুব্বি গোছের মানুষ হন্তদন্ত হয়ে এগিয়ে এলেন। তাদের চিৎকার আর ধমকানিতে চারপাশটা হঠাৎ থমথমে হয়ে উঠল।
'এই! কী হচ্ছে এখানে? ছাড়ো! ছাড়ো তোমরা একে অপরকে!' একজনের ভারী কণ্ঠস্বরে নীলয় আর তানভীর একটু পিছিয়ে গেল।
কয়েকজন মিলে ধস্তাধস্তি করে রোদ্দুর আর রবিউলকে টেনে আলাদা করে। রোদ্দুর হাঁপাচ্ছে সমানে, ওর ঠোঁটের কোণ দিয়ে গড়িয়ে পড়া র★ক্ত ধুলোর সাথে মিশে কাদার মতো হয়ে গেছে। রবিউল শার্ট ঠিক করতে করতে থুতু ফেলল মাটিতে, ওর চোখেমুখে খু★নের নেশা স্পষ্ট। ততক্ষণে আশেপাশে আরও কিছু উৎসুক মানুষের ভিড় জমে গেছে। জনমনিষ্যিহীন প্রান্তরটা মুহূর্তেই একটা বিচারসভায় পরিণত হলো যেন।
ভিড়ের মধ্য থেকে একজন প্রবীণ ব্যক্তি চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে রোদ্দুরের দিকে তাকিয়ে তাচ্ছিল্যের স্বরে বললেন, 'মির্জা বাড়ির ছেলের দশা শেষ পর্যন্ত এই হলো? ছিঃ! মানুষের অধঃপতন হতে যে সময় লাগে না, তার জ্যান্ত প্রমাণ এই ছেলেটা। যে রোদ্দুরকে দেখে একদিন পাড়ার ছেলেরা মাথা নিচু করত, সে আজ রাস্তার বখাটেদের সাথে ধুলোয় গড়াগড়ি খাচ্ছে!'
পাশ থেকে আরেকজন তাল মিলিয়ে ফিসফাস করে উঠলেন, 'আরে ভাই, এই ছেলে কত মেধাবী ছিল, পড়াশোনায় কী নামডাক! কিসের এক প্রেম-পিরিতি করে মাথাটা একবারে খেল। এখন তো জা★নোয়ারের অধম হয়ে গেছে।'
সবচেয়ে ধারালো বিদ্রূপটা ছুড়ে দিলেন পেছনের একজন মধ্যবয়সী লোক। তিনি বাঁকা হেসে ভিড়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, 'প্রেম করলেও তো কথা ছিল না। এ তো অদ্ভুত লীলাখেলারে ভাইসাব! ভালোবাসল এক বোনকে, আর বিয়ে করে ঘরে তুলল আরেক বোনকে। ঘরের মেয়েদের তো এরা রক্ষিতা বানিয়ে ছেড়েছে। মির্জা বাড়ির ইজ্জত তো কবেই নর্দমায় গেছে!'
মুহূর্তেই চারদিকে ছি ছি পড়ে গেল। গুঞ্জন, চাপা ফিসফাস আর কটু কথার তিরগুলো তপ্ত শলার মতো রোদ্দুরের কানে এসে বিঁধে। ছেলেটার মনে হয়, এই শারীরিক যন্ত্রণার চেয়ে এই সামাজিক লাঞ্ছনা অনেক বেশি বিষাক্ত। রোদ্দুর মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল নির্বাক, বিকারহীন রূপে।
রবিউল যাওয়ার আগে আঙুল উঁচিয়ে শাসিয়ে গেল শেষটায়, 'আজ তো মুরুব্বিদের খাতিরে বেঁচে গেলি মজনু। কিন্তু তোরে আমি দেখে নিবো। যদি জ্যান্ত মাটির তলে না পুঁতছি, তবে আমার নাম রবিউল সিকান্দার না। মনে রাখিস!'
ধীরে ধীরে ভিড় পাতলা হয়। মানুষের কৌতূহল মিটে গেলে তারা যে যার পথে পা বাড়াল, শুধু ফেলে রেখে গেল একরাশ ঘৃণা আর অবজ্ঞা। রোদ্দুর এতক্ষণ ধরে যন্ত্রণার কথা ভুলে থাকলেও ভিড় কমতেই হাতের তালুটা ভীষণভাবে টনটন করে ওঠে। সে হাত তুলে চোখের সামনে মেলে ধরে। রবিউলের ছুরির টানে হাতের তালুটা গভীরভাবে ফালি হয়ে গেছে; সেখান থেকে লাল টকটকে র★ক্ত চুইয়ে চুইয়ে কবজি বেয়ে পড়ছে। শরীরটা অবসন্ন হয়ে আসতে চায়।
ঠিক সেই মুহূর্তে কোথা থেকে যেন আরও একটা ছায়া এসে ওর ওপর দাঁড়ায়। কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়েই একটি কোমল হাত রোদ্দুরের র★ক্তাক্ত হাতটা নিজের মুঠোয় টেনে নিল। রোদ্দুর কিছু বুঝে ওঠার আগেই দেখল, মেয়েটি ক্ষিপ্র হাতে নিজের ওড়নার আঁচলটা দাঁত দিয়ে ছিঁড়ে ফেলেছে। তারপর অতি সাবধানে কিন্তু দ্রুতগতিতে সেই কাপড়ের টুকরোটা দিয়ে রোদ্দুরের ক্ষতের ওপর একটা শক্ত পট্টি বেঁধে দিল।
র★ক্তের উষ্ণতা আর ওড়নার নরম পরশ মেলাতেই রোদ্দুর সম্বিৎ ফিরে পায়। আবছা দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখে - তৃপ্তি!
তৃপ্তিকে দেখামাত্রই রোদ্দুরের সারা শরীর জুড়ে এক লহমায় বিদ্যুৎ খেলে গেল । সে ঝটকা দিয়ে নিজের হাতটা সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। হাতের বাঁধন খুলে ফেলার চেষ্টায় নিমজ্জিত হয়ে চিৎকারে বলে উঠল, 'এই ইতরের মেয়ে, তুই আমার হাত ধরলি কোন সাহসে?'
তৃপ্তি চুপসে যায়। চোরা চাউনিতে একবার রোদ্দুরকে আপাদমস্তক দেখে নেওয়ার চেষ্টা করে। চোখে চোখে ধরা পড়ে গেলে ছেলেটা আরও তেঁতে উঠবে যে। ক্ষীণ স্বরে শুধাল, 'কি দরকার এসব রাস্তার ছেলেদের সাথে মা★রামারি করতে যাওয়ার? তোমার স্ট্যাটাসের সঙ্গে এসব যায় না রোদ ভাইয়া।'
পারে না ঠাস করে একটা চড় বসিয়ে দেয় মেয়েটার গালে। পাবলিক জায়গা, আশেপাশের সবাই-ই এখনো কেমন ঘোরানো দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ওদের দিকেই, রোদ্দুর নিজেকে যথাসম্ভব শান্ত রাখার চেষ্টা করে কাঠ কাঠ কণ্ঠে বলল, 'আমার জীবনটা ধ্বংস করে দিয়ে এখন আলগা দরদ দেখাতে আসছস? তোরা মেয়েরা পারিস ও ভাই...ও সরি, তোরা না, তোর মতোন মেয়েরা...সবাই তো তোর মতোন ডাইনী হয় না।'
চোখে পানি জমল মেয়েটার, নত হলো মুখ, কথা সরল না মুখ দিয়ে। রোদ্দুর পট্টির অংশটা খুলে ফেলে পায়ের তলায় পিষে দিল আচ্ছা মতো। দাঁত কিড়মিড় করে ছুঁড়ল, 'আমার মরণ হোক, তাও তোর সাথে আর কোনোদিন দেখা না হোক...'
তারপর গটগট পায়ে হেঁটে চলল সামনের পথে। ধূলো মাখানো ওড়নার পট্টিটা রাস্তা থেকে তুলে নিল তৃপ্তি। র★ক্ত লেগে আছে। সেটাই মুঠে চেপে ধরে দুই ফোঁটা অশ্রু ঝরাল। বিড়বিড় করে বলল, 'তুমি শুধু আমার ভুলটাই দেখলে, অনুতপ্ত হৃদয়ের হাহাকারটা বুঝতে পারলে না। জানি, কোনোদিন হয়তো বুঝবেও না...শেষ পর্যন্ত আমিই ভালোবেসে তোমায় সরিয়ে দিয়েছিলাম—
শুধু এই জন্য, যাতে তুমি তোমার ভালোবাসায় ভালো থাকতে পারো। তবু দোষী তো আমিই রয়ে গেলাম…
তাই যতবার দেখা হবে, ততবারই না হয়—
তোমার নীরব দৃষ্টিতেই খু★ন করে দিও আমায়।'
(চলবে)
________
মনে হলো, এক যুগ পর লিখলাম আমি। যাদের সামনে যাবে, সবাই রেসপন্স করবেন প্লিজ। চেষ্টা করব রেগুলার দিতে, গল্পের এন্ডিং টানার সময় এসে গেছে।