#প্রেমের_নির্বাসন - (৪৮)
লেখনীতে - #মৃধা_মৌনি
______________
শীতের তীব্রতায় প্রকৃতি বড় বেশি ম্রিয়মাণ। টানা চারদিন হলো সূর্যের দেখা নেই; কুয়াশার ধূসর চাদর চারপাশকে এমনভাবে জাপটে ধরেছে যে চেনা পৃথিবীটাকেও অচেনা লাগে। কনকনে ঠান্ডার দাপটে জনজীবন স্থবির। স্কুল-কলেজ তো আগেই বন্ধ হয়েছে, এখন শোনা যাচ্ছে অফিস-আদালতেও হয়তো সরকারি ছুটির ঘোষণা আসবে। চারদিকের এই থমথমে স্তব্ধতার মাঝে সময়টাও যেন আষ্টেপৃষ্ঠে জমে আছে।
উমেদ মির্জা বসে আছেন বাড়ির সবচেয়ে বড় বারান্দাটিতে। করিডোরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত এই বিশাল বারান্দাটির আলাদা একটা গরিমা আছে। রেহনুমার খুব কড়া নির্দেশ, এখানে যেন কখনো কাপড় শুকোতে দেওয়া না হয়। তাই জায়গাটা বরাবরই পরিপাটি। ছোট-বড় অসংখ্য মাটির টবে বিচিত্র সব গাছ আর মরসুমি ফুলের সমারোহে বারান্দাটি একটি ছোট্ট বাগানের রূপ পেয়েছে। একদিকে গুছিয়ে রাখা গুটিকয়েক চেয়ার, আর তার পাশেই ছোট্ট একটি কাঠের টি-টেবিল। টেবিলের ওপর চা পানের যাবতীয় সরঞ্জাম—সবই আছে নিজের জায়গায়।
এক সময় এই বারান্দাটুকু ছিল এ বাড়ির প্রাণকেন্দ্র। বিকেলের রোদে কিংবা বর্ষার সন্ধ্যায় বড়দের গম্ভীর আলোচনা আর ছোটদের খিলখিল হাসিতে জায়গাটা মুখর হয়ে থাকত। চায়ের পেয়ালার টুংটাং শব্দ আর আড্ডার সেই ওম একসময় এই বাড়িকে সজীব করে রাখত। তবে আজ শুধুই নীরবতা। কত বছর হয়ে গেল সেই প্রাণোচ্ছ্বল আড্ডাগুলো হারিয়ে গেছে। চারপাশটা একদম সাজানো-গোছানো থাকলেও, কেন জানি এক গভীর একাকীত্বে জায়গাটা খাঁ খাঁ করছে।
উমেদ মির্জা ক্লান্ত স্বরে ডাকলেন, 'রেহনুমা, রেনু?'
রেহনুমা হাত মুছতে মুছতে সামনে এসে দাঁড়ালেন ক্ষণিক বাদেই।
স্তব্ধ বারান্দার মৌনতা ভেঙে বলে উঠলেন তিনি, 'কী হয়েছে?'
উমেদ মির্জা খুব নিচু স্বরে, প্রায় নিজের মনেই উচ্চারণ করলেন, 'এক কাপ চা...'
বাক্যটি পূর্ণ হওয়ার অবকাশ দিলেন না রেহনুমা। নির্লিপ্ত স্বরে জানিয়ে দিলেন, 'গ্যাস নেই। মাটির চুলোয় রান্নাবান্না চলছে। খুব যদি তৃষ্ণা পেয়ে থাকে, তবে বাইরে গিয়ে খেয়ে আসুন।'
উমেদ মির্জা আর কথা বাড়ালেন না। চায়ের তীব্র আকাঙ্ক্ষাটাকে এক নিমেষে বিসর্জন দিয়ে দিলেন। তার শূন্য পকেটের খবর এই কঠিন মানবীকে জানানোর কোনো অর্থ হয় না; তাছাড়া বাকিতে আর কত কাপ চা খাওয়াবে মোড়ের দোকানদার? রেহনুমা যখন প্রস্থানের জন্য উদ্যত হলেন, তখন উমেদ মির্জা নিজের ভেতরে অনেকখানি জড়তা আর অস্বস্তি কুড়িয়ে নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, 'ওরা কি সত্যিই আসবে?'
রেহনুমা এক মুহূর্ত থমকালেন। পরক্ষণেই কণ্ঠে চিরচেনা কঠোরতা বজায় রেখে জবাব দিলেন, 'আসবে। আর না এলেই তো আপনার জন্য ভালো হয়।'
উমেদ মির্জার বুকের ভেতরটা হয়তো মোচড় দিয়ে উঠল। করুণ স্বরে জানতে চাইলেন, 'তুমি আমার ওপর এত ঘৃণা কবে থেকে জমা করলে রেনু?'
প্রশ্নটা যেন রেহনুমাকে অপ্রস্তুত করে দিল। কিছুটা সময় নিয়ে অত্যন্ত ক্ষীণ স্বরে শুধালেন, 'ঘৃণা কোথায় দেখলেন? সবটাই তো রাগ...'
উমেদ মির্জা একটা ম্লান হাসি ছোঁড়েন এ কথার পিঠে, দীর্ঘশ্বাস গোপন করে বলেন, 'আমি মানছি আমি বোকা, রেনু। কিন্তু এতটাও নই যে রাগ আর ঘৃণার সূক্ষ্ম পার্থক্যটুকু বুঝতে পারব না।'
তিনি ধীরপায়ে এগিয়ে গিয়ে স্ত্রীর মুখোমুখি দাঁড়ান। ধরা গলায় ছোঁড়েন পরের শব্দ ক'খানি, 'আমি জানি রেনু, এই সাজানো বাড়িটা মরে যাওয়ার জন্য তুমি একমাত্র আমাকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করাও। কিন্তু তুমি কি একবারও বুঝতে চেয়েছিলে যে আমিও নিরুপায় ছিলাম? আমার যে কথা দেওয়া ছিল রেনু! সেই কথা রাখতে গিয়েই তো...'
তাকে আর এগোতে দিলেন না রেহনুমা। মাঝপথেই কথা কেড়ে নিয়ে বিদ্ধ করলেন অমোঘ প্রশ্নে, 'কথার মর্যাদার চেয়েও কি পরিবার বড় নয়?'
উমেদ মির্জা নির্বাক প্রশ্নবাণে, রেহনুমার কণ্ঠে এবার জমে থাকা অভিযোগের কাঠিন্য ঝরে পড়ল, 'যখন দেখলেন সবটা ভেসে যাচ্ছে, তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ছে সংসার, তখনও কেন আপনি শক্ত হাতে হাল ধরলেন না? আমার আক্ষেপ তো ঠিক এখানেই। একটা মানুষ কতদিন ভুলের ঘোরে বেঁচে থাকতে পারে? আপনি যদি একবার অন্তত শক্ত মুঠোয় সবটা আগলে ধরার চেষ্টা করতেন, তবে আজ আমার ছেলেটা এভাবে পথে পথে কাঙাল হয়ে ঘুরত না। আমরা ভালো থাকতাম, সুখের একটা ধারা আমাদের ঘরেও বইতে পারত।'
উমেদ মির্জার মুখে আর কোনো জবাব জোগাল না। একরাশ হাহাকার নিয়ে তিনি শুধু নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইলেন।
রেহনুমার কণ্ঠস্বর বাঁধ ভাঙা জোয়ারের মতো ধেয়ে আসতে লাগল। এতদিনের জমে থাকা পাথর চাপা অভিমানগুলো আজ তপ্ত লাভার মতো বের হয়ে আসছে। উমেদ মির্জার দিকে স্থির চোখে তাকিয়ে তিনি বলে চললেন, 'রোদ্দুর যে বিকেলকে পছন্দ করে, এই সহজ ধ্রুব সত্যটা আমি যেমন বুঝেছিলাম, আপনিও কি বোঝেননি? নিশ্চয়ই বুঝেছিলেন। আর ঠিক তারপর থেকেই ছলে-বলে-কৌশলে আপনি উঠেপড়ে লাগলেন রোদ্দুরকে পড়াশোনা আর উচ্চ ক্যারিয়ারের দোহাই দিয়ে বিদেশে পাঠিয়ে দিতে। সম্পর্কের দোহাই দিয়ে আমার মুখটা বন্ধ করে দিয়েছিলেন আপনি। এমনকি শেষমেশ আমার অসুস্থতাকেও পুঁজি করলেন! সেবা করার নাম করে কৌশলে তৃপ্তিকে ওর সাথে পাঠিয়ে দিলেন। আপনি শুধু চেয়েছিলেন আপনার ভাইয়ের মেয়ের জীবনটা সুনিশ্চিত হোক, কিন্তু একটিবারও কি ভেবেছিলেন আপনার নিজের ছেলেটার কথা? সে যে কোনোদিন বাবা ডাক শুনতে পাবে না, এই হাহাকার তাকে কতটা দগ্ধ করবে, সেই খবর কি আপনি রেখেছিলেন?'
উমেদ মির্জা বরাবরের মতোই নিথর, পাথরের মতো নিশ্চুপ। রেহনুমার এই জ্বলন্ত প্রশ্নের কোনো উত্তর তার জানা নেই। অথচ তার মনের গহিনে এক অন্য অঙ্ক কষা ছিল। তিনি ভেবেছিলেন, রোদ্দুর আর তৃপ্তির এই নামমাত্র সম্পর্কের কয়েক বছর কেটে গেলে যখন রোদ্দুর জানবে যে তৃপ্তি কোনোদিন মা হতে পারবে না, তখন সে স্বাভাবিকভাবেই বিকেলের দিকে ফিরে আসবে। উমেদ মির্জা তখন রোদ্দুরকে দ্বিতীয় বিয়ের অনুমতি দিতেন। এমনকি তার মেজো ভাইকে এই বলে আশ্বস্ত করতেন যে, তার মেয়ের অন্তত একটা পরিচয় আছে, একটা আশ্রয় আছে—তা নিয়েই সে বেঁচে থাকুক।
উমেদ মির্জার পরিকল্পনা ছিল অত্যন্ত সূক্ষ্ম—যাতে সাপও মরে, আবার লাঠিও না ভাঙে। রোদ্দুর তার ভালোবাসাকে ফিরে পেত, আবার উমেদ মির্জার দেওয়া কথাও রক্ষা হতো। কিন্তু তিনি ঘুণাক্ষরেও কল্পনা করতে পারেননি যে, তার ভাইয়ের বউ লতা তার ছেলেকে কেবল নিজের ঘরের জামাই করার জন্য এতটা জঘন্য পথ বেছে নেবে। লতা যে তৃপ্তির মাধ্যমে রোদ্দুরকে বশ করতে কুসংস্কার, কালো জাদু কিংবা তাবিজ-কবজের মতো অন্ধকার পথ অবলম্বন করবে, তা উমেদ মির্জার চিন্তার অতীত ছিল। এসব অতিপ্রাকৃত বিষয়ে তার কোনোকালেই বিশ্বাস ছিল না, কিন্তু চোখের সামনে তিনি দেখেছেন কীভাবে তিলে তিলে তার প্রাণচঞ্চল ছেলেটা বদলে যাচ্ছিল, কীভাবে সে একটা যান্ত্রিক পুতুলে পরিণত হয়েছিল।
অথচ আসল সত্যিটা তো আরও করুণ। রোদ্দুর আর তৃপ্তির বিয়েটাই তো হয়নি কোনোদিন! অথচ লতা চারদিকে রাষ্ট্র করে দিয়েছিল যে তারা বিয়ে করে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছে। বিকেলকে সেদিন এই মিথ্যেটা উমেদ মির্জাই বলেছিলেন। লতার সাজানো নাটকে অজান্তেই তিনি সবচেয়ে বড় অভিনেতা হয়ে উঠেছিলেন। আজ বুঝতে পারছেন, লতা তাকে স্রেফ একটা ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহার করেছিল নিজের মেয়ের রাজপুত্র পাওয়ার লোভে। লতা কতটা নিচে নামতে পারে, তার পর্দা আজ একে একে সবার সামনে ফাঁস হয়ে গেছে।
এলাকার মানুষজনও এখন আর এসব বিষয়ে অজ্ঞ নয়। তারা যখন তখন এই বাড়ি বয়ে এসে যা-তা বলে যেত। রাস্তায় বেরোলেই মানুষ আড়ালে মির্জা পরিবারের গীবত গাইত। সম্মানী মানুষ হিসেবে পরিচিত মির্জা পরিবারের আভিজাত্য তখন ধুলোয় মিশে যাচ্ছিল। এক পর্যায়ে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে উমেদ মির্জা মেজো ভাইদের বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে বলেন। মেজোর সাথে এ নিয়ে র★ক্তক্ষয়ী বাগবিতণ্ডা হয়েছিল বেশ। শেষমেশ লোকের নিন্দে সইতে না পেরে লতারা চলেই গেল। আর আশ্চর্যের বিষয় হলো, লতার সেই কুচক্রী স্বভাব দেখে ভয় পেয়ে মেজো ভাই নিজেই তাকে তালাক দিয়ে নতুন জীবন শুরু করেছেন। লতার মতো এমন তুকতাক জানা মহিলার সাথে এক ছাদের নিচে বাস করা কি আর সহজ কথা?
উমেদ মির্জা চারদিকের এই শূন্যতার দিকে তাকিয়ে শিহরিত হন। সব ভেঙে গেছে, তাসের ঘরের মতো গুঁড়ো হয়ে গেছে তার সাজানো স্বপ্নগুলো। তিনি যা যা ভেবেছিলেন, তার প্রতিটি পরিকল্পনা আজ ধুলোয় লুটোপুটি খাচ্ছে। তবু তার অবাধ্য মন মানতে চায় না যে, এই বিশাল ধ্বংসস্তূপের দায়ভার কেবলই তার একার। নিয়তির কি এতে কোনোই ভূমিকা ছিল না? রেহনুমার এই তপ্ত অভিযোগ কি কেবল তার প্রাপ্য?
উমেদ মির্জার বুকের ভেতরটা হঠাৎ যেন কোনো এক অদৃশ্য যাতাকলে পিষ্ট হতে শুরু করল। একটা তীব্র, অসহ্য যন্ত্রণার ঢেউ আছড়ে পড়ল পিঞ্জরের হাড়গুলোতে। মাথাটা ঝিনঝিন করে উঠল, দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসতে লাগল মুহূর্তেই। চারপাশের শব্দগুলো যেন অনেক দূর থেকে ভেসে আসা কোনো প্রতিধ্বনির মতো শোনাল। তিনি টাল সামলাতে না পেরে পাশের পাতা চেয়ারটাতে ধপাস করে বসে পড়লেন। শরীরটা অবশ হয়ে আসছে, হাত-পা নড়ানোর শক্তিটুকুও হারিয়ে গেছে বোধহয়।
রেহনুমা তখনও জানতেন না ঝড়ের সংকেত। তিনি আপন খেয়ালে বারান্দার কোণে ফুটে থাকা গোলাপি নয়নতারা গাছটার দিকে তাকিয়ে বলে চললেন, 'সব মেনে নিয়েছি আমি, উমেদ। কিন্তু আপনার কি উচিত ছিল না এত কিছুর পর অন্তত একবার বিকেল মেয়েটাকে খুঁজে বের করা? ওর কাছে ক্ষমা চাওয়া? ছোটবেলা থেকেই তো ওকে কেবল ঠকিয়েই এসেছেন। আর সেই ঠকানোর অভিশাপই হয়তো বিধাতা আজ আমাদের ললাটে লিখে দিলেন। আজ আমরাও তো চারপাশ থেকে সর্বস্ব হারিয়ে ঠকেছি। আমার মাঝে মাঝে ভাবতেও অবাক লাগে, আপনি রক্ত-মাংসের মানুষ তো! এত ধ্বংসের পরেও আপনার মনে বিন্দুমাত্র অনুশোচনা জাগে না? আপনি চাইলে তো অন্তত রোদ্দুরকেও একটা ‘সরি’ বলতে পারতেন। কেমন মানুষ আপনি? কেমন বাবা আপনি?'
রেহনুমা কথা শেষ করে উত্তরের আশায় ঘুরে তাকান, পরক্ষণেই তার দুই চোখ বিস্ময়ে ও আতঙ্কে স্থির হয়ে গেল। মনের অজান্তেই একটা বুকফাঁটা চিৎকার বেরিয়ে এল কণ্ঠ চিরে।
উমেদ মির্জা বুকের ওপর হাত চেপে অবোধ শিশুর মতো কুঁকড়ে বসে আছেন। তার চোখজোড়া বন্ধ নয়; বরং বড় বড় হয়ে মেলে ধরা—যেন এইমাত্র সাক্ষাৎ যমদূত এসে তাকে শেষ বিদায় জানিয়ে গেল। রেহনুমার আর্তচিৎকারে বাড়ির যে যেখানে ছিল, সব ফেলে ছুটে এল বারান্দায়। রেহনুমা সব রাগ, সব ঘৃণা মুহূর্তেই ভুলে গিয়ে মানুষটাকে জড়িয়ে ধরলেন। কিন্তু স্পর্শ করতেই একটা হিমশীতল সত্য তার অন্তরাত্মাকে কাঁপিয়ে দেয়। তিনি উপলব্ধি করেন, এই বিচিত্র পাপের সাম্রাজ্যের অধিপতির অবশেষে মুক্তি মিলেছে।
রেহনুমা অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন নিথর দেহটার দিকে। এই তো কয়েক পলক আগে মানুষটা কথা বলছিল, অভিযোগ শুনছিল। অথচ চোখের পলকে সে এখন ধরাছোঁয়ার বাইরে, অন্য জগতের বাসিন্দা। মৃত্যু কি তবে মানুষের নিঃশ্বাসের চাইতেও বেশি কাছে বাস করে?
উমেদ মির্জার অপলক, স্থির দুই চোখ রেহনুমা কাঁপাকাঁপা হাতে চিরতরে বন্ধ করে দিলেন। তারপর তার কানের কাছে মুখ নিয়ে অতি ক্ষীণ স্বরে ফিসফিস করে বললেন, 'নিজের পাপের বোঝাটা নামানোর জন্য ক্ষমা চাইবার সুযোগটুকুও তুমি পেলে না উমেদ! আফসোস বড়!'
★★★
একটি দাঁড়কাক কর্কশ স্বরে কা-কা করে মাথার ওপর দিয়ে উড়ে যায়। নিস্তব্ধ বিকেলে ওইটুকু শব্দে রোদ্দুর সচকিত হয়ে ওঠে। আজকাল এই যান্ত্রিক শহরে কাকের দেখা পাওয়া দুষ্কর, অথচ এই অসময়ে পাখিটা কোথা থেকে এল? হয়তো পথ ভুলে আপন খেয়ালে এই দিক দিয়েই ডানা ঝাপটে চলে গেল। রোদ্দুরের মগজে কাকের এই ওড়াউড়িটা অদ্ভুতভাবে গেঁথে গেল। যদিও এখন এসব নিয়ে অহেতুক গবেষণা করার বিলাসিতা তার সাজে না।
একটু পরেই তার জীবনের সবচেয়ে প্রতীক্ষিত সেই মুহূর্তটি সমাগত। বলা চলে, এই একটি ঘটনার ওপর নির্ভর করেই রোদ্দুর আজও বেঁচে থাকার রসদ খুঁজে পায়। হ্যাঁ, আর কিছুক্ষণ বাদেই বিকেল আসবে। তার সেই হারিয়ে যাওয়া প্রেম... না না, ‘হারিয়ে যাওয়া’ বলা ভুল হবে, বরং বলা ভালো ‘হারানো’ প্রেম। কারণ বিকেল তাকে ছেড়ে যায়নি, বরং সে-ই বিকেলকে এক অতল অসহায়ত্বের মাঝে ফেলে দূরে সরে গিয়েছিল। বিকেলের কোনো দায় নেই, বিশ্বাসঘাতক যদি কেউ থেকে থাকে, তবে সে রোদ্দুর নিজে।
রোদ্দুর আজ খুব যত্ন নিয়ে জুতার ফিতা বাঁধল। একবার বাঁধা ছিল, তবুও মন খুঁতখুঁত করায় পুনরায় খুলে ফুলের মতো করে গিঁট দিল। আলমারির ভাঁজ করা নতুন শার্ট আর ইস্ত্রি করা প্যান্টটা আজ অনেকদিন পর অঙ্গে তুলেছে সে। এক সময় এই পোশাকগুলো গায়ে একদম ফিট হয়ে থাকত, এখন শরীর ভেঙে যাওয়ায় কিছুটা ঢিলেঢালা লাগে। তবুও আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুলে চিরুনি চালানোর সময় তার বুকের ভেতর এক অন্যরকম শিহরণ খেলে গেল। কতগুলো বছর পার হয়ে গেছে! আজ সেই অভিমানিনী তার সমস্ত মেঘ সরিয়ে সামনে এসে দাঁড়াবে। আসুক, দেখুক—তার রোদ ভাইয়া আজও সেই আগের মতোই আছে অবিকল, শুধু তারই অপেক্ষায়।
'আসব?'
হঠাৎ কণ্ঠস্বরে রোদ্দুর চমকে পেছনে ফিরল, কিন্তু পরক্ষণেই একরাশ হতাশা তার মুখচ্ছবিকে গ্রাস করে। বিকেল নয়, দরজায় দাঁড়িয়ে আছে মিশি। রোদ্দুর তার দীর্ঘশ্বাসটুকু অতি কষ্টে আড়াল করে অস্থির কণ্ঠে বলল, 'আয়।'
মিশির হাতে ধোঁয়া ওঠা দুই কাপ চা। মেয়েটা মৃদুস্বরে শুধাল, 'অপেক্ষা করছিলে?'
রোদ্দুর জানালার বাইরে আকাশের দিকে তাকায়। গোধূলির মায়া মাখা আলোয় চারপাশটা এক অপার্থিব সৌন্দর্যে ডুবে আছে। এই আলোয় মন কেমন উদাস হয়ে যায়। বিষণ্ণতা মাখা গলায় উত্তর করে, 'কবে থেকে যে অপেক্ষা করে আছি, তার হিসাব নেই রে।'
মিশি চায়ের কাপটা এগিয়ে দিল। রোদ্দুর হাতে নিলেও চুমুক দিল না, পাথরের মতো স্থির হয়ে তাকিয়ে রইল অজানার দিকে। মিশিই আবার নিরবতা ভেঙে কথা পাড়ল, 'জানো ভাইয়া, মাঝে মাঝে এই জীবনটা আমার বড় অসহ্য লাগে। ইচ্ছে করে সব ছেড়েছুড়ে অনেক দূরে কোথাও চলে যাই। যেখানে কেউ আমাকে চিনবে না, আর আমিও কাউকে চিনব না।'
রোদ্দুর বোনের দিকে ফিরে তাকায়। শান্ত স্বরে বলল, 'এমন মনে হওয়ার কারণ কী? বিশ্বাস কর, একাকী নিঃসঙ্গ জীবনের চেয়ে প্রিয়জনদের ছায়ায় থাকা হাজার গুণ সুখের।'
'আর সেই প্রিয়জনেরাই যদি কোনোদিন ঘৃণার কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তখন?'
রোদ্দুর কয়েক মুহূর্ত মিশির চোখের দিকে তাকিয়ে রয়। তারপর ধীরলয়ে বলে, 'মানুষকে ক্ষমা করতে জানতে হয় মিশি। ক্ষমার মতো সুন্দর আর মহৎ এই পৃথিবীতে আর কিছু নেই।'
মিশি ঠোঁটের কোণে একটু ম্লান হাসল। বিদ্ধ করার মতো করে বলল, 'কিন্তু তুমি তো বাবাকে ক্ষমা করতে পারোনি ভাইয়া। বাবা চলে গেল, অথচ তোমার চোখে এক ফোঁটা জলও দেখা গেল না।'
রোদ্দুর কোনো প্রতিউত্তর খুঁজে পেল না এর। নির্বোধের ন্যায় তাকিয়ে থাকে পাশে দাঁড়ানো মেয়েটির দিকে। অবাক হয়ে ভাবে, মিশিটা কবে এত বড় হয়ে গেল যে, বড় ভাইকে এভাবে কথার প্যাঁচে আটকে ফেলার দক্ষতা অর্জন করল!
'মাঝে মাঝে কিছু অপরাধ এমন হয় ভাইয়া, যা শত চাইলেও ক্ষমা করা যায় না। কিছু কষ্টের দাগ আজীবন বয়ে বেড়াতে হয়, আর এক সময় মানুষ সেই ক্ষতটা নিয়েই অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। তুমি বিকেলকে যে পরিমাণ দগ্ধ করেছ, তার কোনো হিসেব নেই আমি জানি। তবুও বোন হিসেবে মন থেকে চাইব, মেয়েটা যেন অন্তত একবার তোমাকে ক্ষমা করে দেয়...'
কথাটা শেষ করেই মিশি রোদ্দুরের হাত থেকে চায়ের কাপটা তুলে নিল। এক নিমিষে জুড়িয়ে যাওয়া চা-টুকু এক চুমুকে শেষ করে ফেলল সে। রোদ্দুরের বিষণ্ণ মুখের দিকে তাকিয়ে অপরাধবোধ থেকে যোগ করল, 'আমার কথায় কষ্ট পেলে আমায় ক্ষমা করে দিও ভাইয়া। মনে হলো কথাগুলো তোমাকে বলা দরকার, তাই বলে ফেললাম।'
রোদ্দুর একটা ম্লান হাসি হাসল জবাবে। তারপর ধীরস্বরে প্রশ্ন ছুঁড়ে, 'তুই কি ভাবছিস মিশি, আমার এই চাতক পাখির মতো অপেক্ষা কেবল বিকেলকে নিয়ে নতুন করে সংসার শুরু করার জন্য?'
মিশি কোনো উত্তর না দিয়ে চুপটি করে দাঁড়িয়ে রয়।
রোদ্দুরই বলে কয়েক সেকেন্ডের স্বল্প বিরতি শেষে,
'হ্যাঁ, তার জন্য আমি অপেক্ষা করেছি ঠিকই। স্বপ্নেও বহুবার দেখেছি—বিকেল এসেছে, আমার হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় শক্ত করে চেপে ধরে বলছে, অনেক হয়েছে রোদ ভাইয়া, চলো এবার বাকি পথটা একসঙ্গে হাঁটি... কিন্তু,' এক মুহূর্ত চুপ থেকে রোদ্দুরের কণ্ঠে ঝরে পড়ে গভীর আর্তি, 'আমি আমাকে ছেড়ে যাওয়ার জন্য ওকে কখনো জোর করিনি, আজ ওকে ফিরে পাওয়ার জন্যও কোনো জোর খাটাব না। ওর সাথে দেখা হওয়ার তৃষ্ণার চেয়েও বড় তৃষ্ণা হলো ওর কাছে একবার ক্ষমা চাওয়া।'
রোদ্দুর তার ঝাপসা হয়ে আসা চোখজোড়া আকাশের বিশালতায় মেলে ধরে। গোধূলির শেষ আলোয় তার মুখটা দেখায় কোনো এক বিমর্ষ কবির মতো। সে ফিসফিস করে বলে, 'আমি মুক্তি চাই রে মিশি। ওই আকাশে ভেসে বেড়ানো মুক্ত মেঘের মতো ডানা মেলতে চাই। আর ওই পশ্চিম দিগন্তে টুপ করে ডুবে যাওয়া সূর্যটার মতো একদিন চিরতরে হারিয়ে যেতে চাই। আজ যদি ও আসে, আর যদি শুনি ওর জীবনের দখলদারি অন্য কারো হাতে চলে গেছে, আমি তবুও ওকে অভিশাপ দেব না। জানতেও চাইব না যে—এমন তো কথা ছিল না! শুধু বলব, আমায় ক্ষমা করে দিয়ে এই অপরাধবোধ থেকে মুক্তি দাও। আর প্রার্থনা করব, যা কিছু ভালো হওয়ার কথা ছিল তোমার, আমার কিংবা আমাদের—তার শ্রেষ্ঠ অংশটুকু যেন আজ থেকে কেবল তোমারই হয়!'
বলতে বলতে রোদ্দুরের দু’চোখ ছাপিয়ে নোনাজল গড়িয়ে পড়ে। অজান্তেই তার পৌরুষদীপ্ত কণ্ঠস্বর কান্নায় ভেঙে পড়ল। মিশি ব্যথাতুর হৃদয়ে এগিয়ে এসে ভাইয়ের পিঠে হাত রাখে, সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা খুঁজে পেল না সেও।
ঠিক সেই মুহূর্তে মির্জা বাড়ির সদর দরজার সামনে এসে থামল একটি বড়সড় কালো রঙের গাড়ি। গাড়ির চাকার ঘর্ষণে নুড়ি পাথরের শব্দে রোদ্দুর মুহূর্তেই সচকিত হয়ে উঠল। মিশি অস্ফুটে বিড়বিড় করল, 'বিকেল?'
রোদ্দুর ঝাপসা দৃষ্টি মুছে গভীর উৎকণ্ঠা নিয়ে তাকায়। না, গাড়ি থেকে বিকেল নেমে আসেনি। দরজা খুলে বেরিয়ে এসেছে একটা দেবশিশু! কোঁকড়ানো কালো চুল, গায়ের রঙ ঈষৎ শ্যামবর্ণ — নিষ্পাপ মায়াবী চেহারা নিয়ে শিশুটি দাঁড়িয়ে আছে মির্জা বাড়ির নামফলকের দিকে।
(চলবে)
________
আগামী পর্বে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ!!
রোদ-বিকেলের শুভ দেখা!!
এক্সাইটেড কারা কারা, হাত তুলুন প্লিজ!!