#প্রেমের_নির্বাসন - (৪৯)
লেখনীতে - #মৃধা_মৌনি
__________________
'কি নাম তোমার?'
শ্যামা জবাব দিল না। কোলের ওপর রাখা পুতুলটাকে আরও একটু শক্ত করে আঁকড়ে ধরল বিনিময়ে। আড়চোখে মানুষটাকে একবার দেখে নিয়ে দৃষ্টি সরিয়ে নিল দ্রুত। বিকেল মাম্মাম বলেছিল, এলোমেলো উসকোখুসকো চুলের এই অদ্ভুতুড়ে ভদ্রলোক নাকি ওর চাচা হন। কিন্তু মানুষটাকে শ্যামার একদমই পছন্দ হয়নি। কেমন পাগল পাগল চেহারা, কথা বলার ধরনটাও তথৈবচ। চেনা নেই জানা নেই, এসেই কেমন অধিকার নিয়ে হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল ওর দিকে! শ্যামার খুব অস্বস্তি হয়। মনে মনে সে পণ করেছে, এই লোকের একটা কথার উত্তরও সে দেবে না। বড়দের অবজ্ঞা করার এই একরোখা ভঙ্গি নিয়েই সে শক্ত হয়ে বসে রইল।
রোদ্দুরের ভ্রু কুঁচকে এল। সে অবাক হয়ে লক্ষ্য করছে সামনে বসে থাকা এই ছোট্ট মানবীকে। আল্লাহর দুনিয়ায় জানা-অজানা কত রহস্যই না লুকিয়ে আছে! এত ছোট একটা বাচ্চার ব্যক্তিত্ব যে এত তীক্ষ্ণ আর ধারালো হতে পারে, তা ওর কল্পনাতেও ছিল না। রোদ্দুর আবারও বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে হ্যান্ডশেক করতে চাইল। মৃদু হেসে বলল, 'হাই? আমি রোদ্দুর মির্জা, এ বাড়ির বড় ছেলে। তোমার বাবা সৌম্য মির্জা ছিল এ বাড়ির মেজো ছেলে। আমরা তিন ভাই, আর—'
'৪ বোন।' শ্যামা বিরক্তির চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছে উত্তর দিল। ওর গলার স্বরে ঝরে পড়ছে একরাশ অনীহা।
রোদ্দুর খানিকটা অবাক হয়ে বলল, 'ওহ, তুমি সব জানো দেখছি!'
'আমি জানি। মাম্মাম আমাকে সবটা বলেছে।'
রোদ্দুর হো হো করে হেসে উঠল।
'যাক, অবশেষে তাহলে বুলবুলি পাখির মুখ খুলল!'
শ্যামা রীতিমতো রাগত স্বরে বলল, 'আমি বুলবুলি নই। মাই নেইম ইজ সন্ধ্যা, ওরফে শ্যামাঙ্গিনী।'
রোদ্দুরের হাসি থামছেই না। এই মুহূর্তে ওর মাথায় আর কোনো জাগতিক চিন্তা নেই। বিকেলের সঙ্গে দেখা হলে কী বলবে, সে ক্ষমা করবে কি না, কিংবা কোন ভাষায় নিজের অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত করবে—সব ভাবনা যেন কর্পূরের মতো উড়ে গেছে। এই ছোট্ট মেয়েটা কোনো এক জাদুবলে সব সহজ করে দিয়েছে। ওর অকালপক্ব গাম্ভীর্য আর মায়াভরা একজোড়া টানা চোখের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে রোদ্দুর ভুলে গেল তার দীর্ঘ বছরের দহন। সে সম্পূর্ণ মনোযোগ শ্যামার ওপর সঁপে দিয়ে বলে, 'তোমায় আমি কোন নামে ডাকব? শ্যামা বলি?'
শ্যামা কঠিন স্বরে স্রেফ একটা শব্দ উচ্চারণ করল, 'না।'
রোদ্দুর দমে না গিয়ে জিজ্ঞেস করল, 'কেন?'
শ্যামা আর কোনো উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন মনে করল না। ধীরস্থিরভাবে চেয়ার থেকে নেমে দাঁড়াল সে। এই লোকটার সঙ্গ ওর কাছে অসহ্য ঠেকছে। কেমন হাভাতের মতো চেয়ে আছে ওর দিকে, যেন জীবনে আর কোনোদিন কাউকে দেখেনি!
'কোথায় যাচ্ছ?' রোদ্দুরও সিট ছেড়ে উঠে দাঁড়াল।
শ্যামা মুহূর্তের জন্য থামল। তারপর ঘাড় ঘুরিয়ে অত্যন্ত দৃঢ় গলায় বলল, 'ডোন্ট ফলো মি।'
ছোট্ট ছোট পদক্ষেপে সে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল তারপর। রোদ্দুর একা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আনমনে হাসে। ইশ, কী পাকা বুড়ি একটা! বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল তার পরক্ষণেই। এমন একটা কোল আলো করা পরী তো তারও হতে পারত। মুহূর্তেই হাসিমুখটা ম্লান হয়ে গেল রোদ্দুরের। সে ধপ করে আবারও চেয়ারে বসে পড়ল।
জীবন নামক নদীতে সে তরী ভাসিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু হালটা শক্ত করে ধরতে পারেনি। যদি পারত, তবে আজ তার অবস্থান থাকত এমন এক গন্তব্যে, যেখানে সূর্যোদয় আর সূর্যাস্ত ঘটে পৃথিবীর অমোঘ প্রেমকে সাক্ষী রেখে। অথচ নিয়তি তাদের সেই প্রেমকে নির্বাসনে পাঠিয়েছে। রোদ্দুর ভাবল, নিজের হাতেই তো সে সব ধ্বংস করেছে। নিজের অজান্তেই সে দূরে ঠেলে দিয়েছে তার বিকেলকে, যে আসলে ছিল তার নিজেরই রুহের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।
রোদ্দুর দুই হাত মুঠো করে বুকের কাছে এমনভাবে ধরল, যেন সে অদৃশ্য কোনো বস্তুকে আঁকড়ে ধরতে চাইছে। আসলে সে চেষ্টা করছে নিজের বুকের ভেতর তিড়িংবিড়িং করে কাঁপতে থাকা হৃদযন্ত্রটাকে শান্ত করতে। কিন্তু তৃষ্ণায় তার বুকের ভেতরটা খা খা করে উঠল। পানির খোঁজে সে যখনই পুনরায় উঠে দাঁড়াল, ঠিক তখনই দরজার দিকে তাকিয়ে তার চোখদুটো বিস্ময়ে স্থির হয়ে গেল।
বিকেল এসে দাঁড়িয়েছে! বিকেল! তার সেই প্রিয় বিকেল! যাকে সে নিজের সর্বোচ্চটা দিয়ে ভালোবেসেছিল। যে মেয়েটির হাসিতে রোদ্দুর হাসত, আর যার চোখের জলে তার মনে হতো আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামুক—সেই মেয়েটি আজ তার সামনে দাঁড়িয়ে। যাকে সে নিজের ভুলে অবহেলা করে দূরে সরিয়ে দিয়েছিল, যাকে দেখার জন্য জনম জনম ধরে তৃষ্ণা বুকে লালন করে বেরিয়েছে, সেই বিকেল আজ মাত্র তিন-চার হাত দূরে!
রোদ্দুরের মনে হয়, সে হয়তো এখনই মাথা ঘুরে মেঝেতে পড়ে যাবে। নয়তো চোখের সামনে থেকে বিকেল এখনই অদৃশ্য হয়ে যাবে। অথবা ঘুম ভাঙলে দেখবে এই সবটাই ছিল একটা সুমধুর স্বপ্ন। নিজের অজান্তেই সে চেয়ারে ধপ করে বসে পড়ল। তার মনে হলো, হৃদপিণ্ডের সব চঞ্চলতা যেন হঠাৎই থেমে গেছে। আগে সে ভেবেছিল বিকেলকে সামনে দেখলে হয়তো ভীষণ অস্থিরতা কাজ করবে, বুক ধকপক করবে; কিন্তু আদতে তেমন কিছুই হলো না। বরং তার সারা শরীর জুড়িয়ে এল, নিঃশ্বাসের উত্তাপ কমল। রোদ্দুর শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে বিকেলের চোখের ভাষার অতলে কিছু একটা খোঁজার চেষ্টা করতে লাগল।
বিকেল ও অপলক তাকিয়ে রইল মানুষটার দিকে। অনেক কাল পরে চেনা মুখটা সামনে আসতেই তার বুকের ভেতর জমানো শত শত অভিমান যেন পাথরের মতো ভারী হয়ে উঠেছে। এক সময় এই মানুষটাকেই সে নিজের পুরো জগত মেনেছিল। ভাঙাচোরা একটা জীবনে রোদ্দুরকে ঘিরেই সে দেখেছিল ঘর বাঁধার স্বপ্ন। পৃথিবীর সব যুক্তি আর সংশয়কে তুচ্ছ করে রোদ্দুরকে বসিয়েছিল বিশ্বাসের সর্বোচ্চ চূড়ায়।
অথচ সেই বিশ্বাসের দেয়াল ভাঙতে রোদ্দুর একবারও দ্বিধা করেনি। একদিন হঠাৎ করে সব ভালোবাসা আর মায়াকে তুচ্ছ করে তাকে উত্তাল মাঝ সমুদ্রে একা ভাসিয়ে দিয়ে সে চলে গিয়েছিল। রোদ্দুর একবারও কি ভেবেছিল, যে মেয়েটা তাকে মাথার ওপরের বিশাল এক বটগাছ ভেবে নিশ্চিন্তে দিন কাটিয়েছে, তার ওপর থেকে সেই ছায়া যখন হুট করে কেড়ে নেওয়া হয়, তখন চারপাশটা কতটা শূন্য আর রিক্ত মনে হয়?
বিকেলের দৃষ্টিতে আজ পুরোনো ভালোবাসা নেই, নেই কোনো আকুলতা। সেখানে শুধু আছে এক অতলান্ত বিষাদ আর অনেকগুলো অনুচ্চারিত প্রশ্ন। যে মানুষটা তার জীবনের সবটুকু রোদ্দুর হয়ে আসার কথা ছিল, সে-ই তাকে দিয়ে গেছে আজন্ম এক তপ্ত দুপুরের হাহাকার। বিকেলের দু’চোখের ভাষা সেই যন্ত্রণারই নীরব অনুবাদ, যা রোদ্দুর পড়ার চেষ্টা করলেও হয়তো আজ আর উদ্ধার করতে পারবে না।
বিকেল শান্ত পায়ে ঘরে ঢুকে। চারপাশে খুব মনোযোগ দিয়ে তাকিয়ে দেখে - কোথায় কতটুকু বদলেছে, তা মেলানোর একটা সূক্ষ্ম চেষ্টা ছিল ওই দৃষ্টিতে। কিন্তু ঠিক ধরতে পারল না; মনে হলো যেন সেই ঘরটাতেই ফিরে এসেছে, যেটা সে বহুকাল আগে ফেলে গিয়েছিল। এখনো সবটুকু ঠিক আগের মতোই ‘রোদ ভাইয়া’র ঘর হয়ে আছে। তবে খুঁটিয়ে দেখলে বোঝা যায়, প্রতিটি আসবাবে আর ঘরের কোণে এখন অযত্নের একটা ধূসর প্রলেপ জমেছে।
ঘরটা একবার ঘুরে দেখে নিয়ে বিকেল এসে বসল রোদ্দুরের ঠিক মুখোমুখি চেয়ারটায়। কোনো আবেগ বা উচ্ছ্বাস নয়, বরং নিতান্তই সৌজন্যবোধ থেকে একজন সাধারণ মানুষের সঙ্গে যেভাবে কথা বলতে হয়, ঠিক সেই স্বরেই সে জিজ্ঞেস করল,
'কেমন আছেন?'
রোদ্দুর নিজের অজান্তেই চমকে ওঠে। বিকেলের গলার স্বর কতটা বদলে গেছে! সেই যে এক সময় রিনরিনে কণ্ঠে ওর বুকে ঝংকার তুলত, সেই স্বর আজ গাম্ভীর্যে ঠাসা। শুনলেই মনে হয় বুকের ভেতরটা হিম হয়ে আসছে।
রোদ্দুর একটু নড়েচড়ে বসে। নিজের ভেতরের সবটুকু জড়তা কাটিয়ে ওঠার আপ্রাণ চেষ্টা করে কোনোমতে আওড়াল, 'ভালো আছি।'
মনে মনে বুঝতে পারল, জীবন মানুষকে দ্বিতীয়বার সুযোগ দিলেও তৃতীয় বা চতুর্থবার দেয় না। আজ যদি বিকেলের সামনে নিজের মনের কথাগুলো বলা না হয়, তবে হয়তো পৃথিবীর কোনোদিন আর তা বলা হবে না। তাই মুখে কুলুপ এঁটে বসে থাকলে হার তারই!
রোদ্দুর কিছুটা ইতস্তত করে আমতা আমতা করে শুধাল তাই, 'তু...তুই কেমন আছিস?'
হঠাৎ করেই বিকেলের বুকের ভেতরটা কেমন যেন তোলপাড় করে ওঠে। একটা তপ্ত স্রোত ছলকে গেল পাজরের হাড়ের ভেতর। তুচ্ছ এক 'তুই' শব্দটা তাকে কেন এভাবে আন্দোলিত করল, তা সে নিজেও জানে না। তবে নিজের ভেতরের অস্থিরতা সে বাইরে প্রকাশ পেতে দিল না। কন্ঠস্বর যথাসম্ভব স্বাভাবিক আর সংযত রেখে বলল, 'হ্যাঁ, ভালো আছি।'
রোদ্দুর স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। সহজ হওয়ার চেষ্টা করে বলে, 'শুনলাম তুই নাকি ওখানে টিচিং প্রফেশনে আছিস?'
বিকেল মৃদুভাবে মাথা নাড়ায়, 'হুম। একটা চার্চের কিন্ডারগার্টেনে পড়াই।'
রোদ্দুরের গলায় খানিকটা বিস্ময় যোগ হলো, 'ভাবতেই পারছি না! যে মেয়ে এককালে পড়াশোনার নাম শুনলে শত গজ দূরে থাকত, সে কি না এখন ছোট ছোট বাচ্চাদের প্রাথমিক শিক্ষা দেয়!'
আসার পর থেকে বিকেলের ঠোঁটের কোণে এই প্রথমবার এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। তবে সেই হাসিতে বিষাদ মিশে ছিল গাঢ়ভাবে। মেয়েটা ম্লান হেসে জানাল, 'এক সময় তো একা থাকাটাও আমার কল্পনার বাইরে ছিল। অথচ দেখুন, আটটা বছর ধরে তো দিব্যি একাই আছি...'
মুহূর্তেই রোদ্দুরের মুখের সহজ ভাবটা মিলিয়ে যায়। একরাশ অপরাধবোধের কালো ছায়া তার মুখটাকে থমথমে করে তুলে। বিকেলের এই একাকীত্বের দায়ভার যেন একান্তই তার!
পরিস্থিতি হালকা করার জন্য বিকেলই আবার কথা শুরু করে, 'আসলে পরিস্থিতি মানুষকে সবকিছুই শিখিয়ে দেয়।'
রোদ্দুর ঝিনঝিনে, তরঙ্গহীন গলায় উত্তরে বলে, 'আর কেউ কেউ পরিস্থিতিটা তৈরি করে দেয়। যেমনটা আমি দিয়েছিলাম...'
বিকেল নিজেকে মানসিক ভাবে শক্ত করল। গত আট বছর ধরে যেসব দুঃস্বপ্নকে সে সযত্নে আড়াল করে রেখেছে, আজ বোধহয় সেগুলোর মুখোমুখি হওয়ার সময় এসেছে। বুকের ভেতর এক দলা পাথর চেপে রেখে লড়াই চালিয়ে যাওয়া সেই দিনগুলোতে ফিরে যেতে হবে আরও একবার।
রোদ্দুর অপলক তাকিয়ে আছে। হয়তো সে আশা করছে বিকেল বলবে—'না না, আপনি কেন দায়ী হবেন!' বা 'ওসব আপনার দোষ ছিল না'। কিন্তু বিকেল নির্লিপ্ত চোখে রোদ্দুরের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল, 'এখন আর এসব কথা তোলার কোনো মানে নেই। যা গেছে, তা আট বছর আগেই চুকেবুকে গেছে।'
রোদ্দুরের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। সে যেন আহত হয়েই বলল, 'মানে নেই? আমি কী করেছি বা কেন করেছি, তার একটা কৈফিয়ত দেওয়ার সুযোগও তুই আমাকে দিবি না?'
'আমি তো এসেছি। পালিয়ে না গিয়ে সরাসরি আপনার সামনেই দাঁড়িয়ে আছি। আপনার সব কথা আমি অবশ্যই শুনব। তবে আমার মনে হয় না নতুন করে কিছু শোনার খুব একটা প্রয়োজন আছে। আপনার মা আমাকে... সবকিছুই স্পষ্ট করে বলে দিয়েছেন।' ধীরস্থির গলায় জবাবে বলল মেয়েটা।
স্তব্ধ হয়ে গেল রোদ্দুর। সম্পর্কের ব্যবধানটা কোথায় গিয়ে পৌঁছেছে তা সে হাড়ে হাড়ে টের পেল। এক সময়ের আদরের 'বড় মা' আজ বিকেলের কাছে শুধুই 'আপনার মা'! কতখানি পর করে দিলে মানুষের সম্বোধন এভাবে বদলে যায়! তবে রোদ্দুর মনে মনে জানে, ওরা যা করেছে তার তুলনায় বিকেলের এই দূরত্বটুকু খুবই নগণ্য। ওর মুখটা যে আরও একবার দেখতে পারছে, এই বা কম কিসে!
নিজের বুকের ভেতরকার দলা পাকানো হতাশা লুকানোর চেষ্টা করে ও, কণ্ঠে একরাশ অনুতাপ মিশিয়ে বিকেলের চোখের দিকে তাকিয়ে অনুনয়ের সুর তুলে বলে, 'তবুও আমি নিজের মুখে একবার সবটা বলতে চাই তোকে... প্লিজ?'
বিকেল কোনো কথা বাড়াল না, কেবল মৌন সম্মতিতে মাথা নাড়ল। এই মুহূর্তে একটি অতিরিক্ত শব্দ খরচ করার মতো মানসিক শক্তিও যেন তার নেই।
রোদ্দুর শুকনো গলায় একবার ঢোক গিলল। বুকের ভেতরটা তৃষ্ণায় ফেটে যাচ্ছে, এক গ্লাস পানি এই মুহূর্তে বড্ড প্রয়োজন। তবুও সেই শারীরিক তৃষ্ণার চেয়েও বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে আজ তার 'কথার তৃষ্ণা'। আট বছর ধরে জমে থাকা কথাগুলো উগড়ে দেওয়ার এমন সুযোগ সে কোনোভাবেই হাতছাড়া করতে চায় না।
সে বলতে শুরু করল, অগোছালো শব্দে, 'তোর মনে আছে? আমি তোকে কথা দিয়েছিলাম সব ঠিক করে দেব। সেই যে সেই রাতে... আমার চলে যাওয়ার আগের রাত। সারা রাত জানলার বাইরে থেকে আসা আবছা আলোয় আমি গুনেছিলাম তোর শরীরের প্রতিটা তিল...'
বিকেলের সারা শরীর রি রি করে ওঠে। তীব্র শিহরণে কেঁপে উঠল বুক পাঁজরের বাড়ি। গায়ের লোম খাড়া হয়ে উঠল তার। সে আবারও নিঃশব্দে ঘাড় নাড়ল।
মনে থাকবে না কেন? ভোলা কি অতই সহজ! জীবনের প্রথম পুরুষ, বৈবাহিক সম্পর্কের পূর্ণ অধিকার নিয়ে প্রথমবার শরীর ছোঁয়া, প্রথম অনুভূতির সেই জোয়ারে নিজেকে সঁপে দেওয়া—এসব তো কেবল স্মৃতিশক্তি হারিয়ে গেলেই ভোলা সম্ভব।
রোদ্দুর থামল না অবশ্য, 'আমি কথা দিয়েছিলাম তোকে। এয়ারপোর্টের দিকে যখন গাড়ি ছুটছিল, তখনও আমার ধ্যান-জ্ঞান জুড়ে কেবল একটাই লক্ষ্য ছিল—আমাকে সব ঠিক করতে হবে। তুই আমাকে একটা চিরকুট দিয়েছিলি না? যেখানে লেখা ছিল—
‘আমার রাত জাগা তারা,
তোমার আকাশ ছোঁয়া বাড়ি।
আমি পাই না ছুঁতে তোমায়,
আমার একলা লাগে ভারী।’
এই যে দেখ, এটা সেই কাগজটা না?'
রোদ্দুর প্যান্টের পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করে সাবধানে একটা ভাঁজ করা পুরনো চিরকুট বের করে আনে। কাগজটার দিকে না তাকিয়েও বিকেলের গা ছমছম করে উঠল। সে চোখ বন্ধ করে নিল। বুকের ভেতরটা দপদপ করছে, দম যেন আটকে আসছে। এই বিষাদময় অনুভূতির সাক্ষী সে আর হতে চায়নি কোনোদিন, তবুও নিয়তি কেন তাকে আবারও এই তপ্ত স্মৃতির সামনে দাঁড় করাল!
রোদ্দুর ব্যাকুল হয়ে প্রশ্ন ছোঁড়ে, 'বল, চিনতে পেরেছিস? এটাই সেই কাগজ তো?'
বিকেল অস্ফুটে ফিসফিস করে বলে, 'চিনেছি।'
রোদ্দুরের চোখের তারায় এক পলকের জন্য আশার ঝিলিক খেলে যায়, পরক্ষণেই সেখানে জায়গা করে নিল গাঢ় বিষণ্নতা। কণ্ঠ ভারী হয়ে এল মানুষটার, 'আমি সত্যিই সবটা ঠিক করতে চেয়েছিলাম বিকেল। বিশ্বাস কর, আমার মনে বিন্দুমাত্র অন্য কোনো উদ্দেশ্য ছিল না। কিন্তু তারপর কোথা থেকে যে কী হয়ে গেল...'
রোদ্দুর কথা বলতে বলতে রীতিমতো হাঁপাচ্ছে। মানুষটার বুকটা যে যন্ত্রণায় ওঠানামা করছে, তা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। বিকেল স্থির থাকতে পারল না। সে উঠে গিয়ে এক গ্লাস পানি এনে রোদ্দুরের সামনে ধরে তাই। রোদ্দুর মাথা নেড়ে জানাল, তার পানি পানের চেয়ে কথা শেষ করা বেশি জরুরি।
বিকেল শান্ত কিন্তু দৃঢ় স্বরে জবাব দিল, 'আমি আছি। আপনি পরেও বলতে পারবেন।'
রোদ্দুর হঠাৎ গভীর দৃষ্টিতে বিকেলের চোখের দিকে তাকিয়ে অবচেতনেই শুধাল, 'থাকবি তুই? সত্যি থাকবি?'
প্রশ্নের আড়ালে লুকিয়ে থাকা আকুতিটা বিকেল মুহূর্তেই বুঝে নেয়। তবে নিজেকে সামলে নিয়ে গলায় কাঠিন্য মিশিয়ে বলে, 'আপনি আগে পানিটা খান, প্লিজ।'
রোদ্দুর কথা বাড়াল না আর। ঢকঢক করে প্রায় এক নিঃশ্বাসে পুরো গ্লাসটা খালি করে দেয়। বিকেল গ্লাসটা যথাস্থানে রেখে এসে আগের জায়গায় বসে। তারপর নিজে থেকেই প্রসঙ্গ তুলে, 'এবার বলুন, কী যেন বলছিলেন আপনি?'
রোদ্দুর ফ্যালফ্যাল করে বিকেলের পাথুরে মুখখানির দিকে তাকিয়ে রইল। এই কি সেই মেয়ে? সেই ছোট্ট বিকেল, যার অস্তিত্বের রন্ধ্রে রন্ধ্রে কেবলই কোমলতা মিশে ছিল? আজকের এই পরিণত বিকেলকে বড় বেশি কঠিন আর বাস্তববাদী দেখায়। রোদ তো এমন বিকেলকে চায়নি; সে চেয়েছিল আট বছর আগে ফেলে যাওয়া সেই অবুঝ, পাগলি মেয়েটাকে। যে মেয়েটা সামান্য কথাতেই হেসে কুটিপাটি হতো, যাকে শাসন করা যেত, আদুরে অধিকারে আটকে রাখা যেত। অথচ আজ সেই মেয়েটাই রোদ্দুরকে জীবনের সবচেয়ে বড় শাস্তিটা দিয়ে চলেছে।
রোদ্দুর আর নিজেকে সামলাতে পারল না। হঠাৎ করেই সে ডুকরে কেঁদে ওঠে - একদম ছোট বাচ্চাদের মতো শব্দ করে। কিন্তু বিকেলের দেহে কোনো কম্পন জাগল না তাতেও। তার ভ্রু-যুগল স্থির, শরীর নিথর। সে যেভাবে বসে ছিল, ঠিক সেভাবেই পাথরের মূর্তির মতো বসে রইল।
রোদ্দুর কাঁদতে কাঁদতেই পাগলের প্রলাপের মতো বলতে লাগল, 'আমি তখনো জানতাম না আমার সাথে কী হতে যাচ্ছে। এয়ারপোর্টে নামার পর বাবা প্রথম কথাটা তুললেন। বললেন, আমি একা নই, তৃপ্তিও আমার সাথে যাবে। আমি তো আকাশ থেকে পড়লাম! অনেক না করলাম, কিন্তু জানানো হলো ওর ভিসা-পাসপোর্ট সব রেডি। মেজো চাচা অনেক টাকা খরচ করেছেন। বাবার সিদ্ধান্তে শেষতক রাজি হতে হলো। কিন্তু ওখানে পৌঁছেই আমি তোকে রিচ করার চেষ্টা করেছি বারবার। বাবাকে ফোন করলে তিনি জানালেন—তুই নাকি বাড়িতেই নেই, ওই উদয় নামের ছেলেটার দলবলসহ পিকনিকে গেছিস! কথাটা শুনে রাগে-অভিমানে আমি স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম ঠিকই আর এই সুযোগটাই কাজে লাগালো তৃপ্তি আর লতা চাচী...'
রোদ্দুরের ভেজা কণ্ঠস্বরে আকস্মিক ঘৃণা আর ক্ষোভ গর্জে ওঠে, 'ওরে চাচী বলতেও আমার বিবেকে বাঁধে রে! ও নিজের মেয়েকে শিখিয়ে দিয়ে আমাকে... আমাকে কি না তাবিজ করেছিল বিকেল! বিশ্বাস করতে পারিস তুই?'
বিকেলের চোখেমুখে কোনো বিকার নেই। সে আগের মতোই নিরুত্তাপ। এই বাড়িতে ঢোকার সময় রেহনুমা বেগম তাকে আটকেছিলেন। ঘণ্টাখানেকেরও বেশি সময় তাঁর ঘরে ছিল বিকেল। রেহনুমা তখন বিকেলের কোলে মাথা রেখে অঝোরে কেঁদেছেন, রোদ্দুরের সাথে ঘটে যাওয়া সব অপকর্মের কথা সবিস্তারে বলেছেন। তখনো বিকেল কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায়নি, এখনো দেখাচ্ছে না। বরফ জমতে জমতে তার হৃদপিণ্ডটা আজ এক হিমশৈল হয়ে গেছে। সে এখন আবেগ সামলাতে বড্ড পটু।
রোদ্দুর আর্তনাদ করে উঠল, 'তুই আমাকে অবিশ্বাস করছিস, তাই না?'
বিকেল শান্ত গলায় জবাব দিল, 'বিশ্বাস-অবিশ্বাসের কোনো দাঁড়িপাল্লাতেই আমি আর দাঁড়াতে চাইছি না। আপনি আমায় কিছু বলতে চান, আর এটাই নাকি আপনার জীবনের শেষ ইচ্ছে—মায়ের মুখে এমনটা শোনার পরেই আমি এসেছি। মুমূর্ষু একজন মানুষ তার শেষ ইচ্ছায় আমাকে রেখেছে, সেই দায়বদ্ধতা থেকেই আসা। আপনি যা বলতে চান বলে যান। আমি বিশ্বাস করছি কি করছি না, সেটা এখন আর ম্যাটার করে না।'
রোদ্দুর বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে পড়ে। তার অবচেতন মন কোথাও একটুকরো আশার মেঘ দেখেছিল; ভেবেছিল রোদ্দুরের টানেই হয়তো বিকেল সব ফেলে ছুটে এসেছে। অথচ মেয়েটার কণ্ঠে চরম নির্লিপ্ততা! যেন কারো জীবন-মরণে তার আর কিচ্ছু আসে যায় না। অথচ বোকা রোদ্দুর জানে না, নারী যখন ভালোবাসে তখন সে নিজেকে ভেঙেচুরে দেয়, আর যখন ঘৃণা করে, তখন সেই ঘৃণার প্রতিটি স্তরে সাজিয়ে রাখে পাহাড়প্রমাণ অভিমান।
রোদ্দুরের চোখে পুনরায় জল চিকচিক করে ওঠে। সে দুই হাত জোড় করে ক্ষমা চাওয়ার ভঙ্গিতে বলল, 'আমায় শুধু ক্ষমা করে দিস। আমি তোকে শুধু এইটুকুই বলতে চাই।'
বিকেল উঠে দাঁড়াল, 'ব্যস, এইটুকুই? এই সামান্য কথাটুকু বলার জন্য আমাকে অযথাই কানাডা থেকে টেনে আনলেন?'
রোদ্দুর নিরুত্তর। বিকেল পুনরায় বলল, 'আমার জীবনের প্রতিটি স্বপ্ন আর আশাকে যে মানুষটা দুমড়েমুচড়ে দিয়েছিল, তার শেষ ইচ্ছেটা আমি পূরণ করে দিয়ে গেলাম। ভালো থাকবেন রোদ্দুর।'
মেয়েটা চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই রোদ্দুর ক্ষ্যাপার মতো ওর একটা হাত টেনে ধরে। কোন অধিকারের টানে ধরল, সে নিজেও জানে না। বিকেল তবুও কোনো প্রতিবাদ করল না। যেন এভাবে ওর হাত টেনে ধরে ওকে আঁটকানোটাও স্বাভাবিক ঘটনা। একদম নির্লিপ্ত চাউনিতেই পিছু ফিরে তাকাল এবং পরমুহূর্তেই তাকে চমকে উঠতে হলো। রোদ্দুর অন্ধ প্রায় পাগল যেন। আচানক নিজের শরীরের ভার ছেড়ে দিয়ে ধপাৎ করে বসে পড়ল নিচে। মেয়েটা কিছু বুঝে ওঠার আগেই দুই হাতে বিকেলের পা জোড়া শক্ত করে আঁকড়ে ধরে বিড়বিড় করে বলতে লাগল, 'আমাদের প্রেমের না হয় নির্বাসন হয়েছে, কিন্তু ভালোবাসার তো হয়নি রে...'
বিকেল কোনো উত্তর দিল না, দিতে পারল না আসলে। তবে এবার তার কপালে ঈষৎ ভাঁজ পড়েছে। দীর্ঘ আট বছর পর এই প্রথম মেয়েটার চোখের কোণে সামান্য অনুভূতির ঝিলিক দেখা যায়। এই হিমশীতল নির্লিপ্ততার আড়ালে তাকে কিছুটা চিন্তিত আর অস্থির দেখায়। নির্বাসিত প্রেমের সেই পুরনো দহন কি তবে আবার নতুন করে শিখা মেলছে? উত্তরটা বিধাতাই বুঝি জানেন!
(চলবে)
________
আগামী পর্বটাও কালকেই পেয়ে যাবেন আশা করি।
মুখোমুখি কীভাবে আনবো, এইটাতেই আমি ব্লক খেয়ে বসে ছিলাম, যেহেতু মুখোমুখি আনতে পেরেছি, বাকিটা গড়গড় করে লিখে যেতে পারব, হোপ সো!
আজকের পর্বের বিস্তারিত মন্তব্য জানিয়ে যাবেন!
বিকেলের জায়গায় সে কি ঠিক নাকি বেঠিক? সবার রেসপন্স এবং উপস্থিতি কাম্য! হ্যাপি রিডিং ❤️