আজ বাদে কাল ডরমিটরিতে ফিরে যাবে অরু আর অনন্যা। অথচ আজ এই সন্ধ্যাটা যে অরুর পুরো জীবনটাই তিনশো ষাট ডিগ্রি এঙ্গেলে ঘুরিয়ে দেবে সে কথা কেইবা জানতো? নিঘার্ত ভাগ্যে লেখা ছিল এই অপ্রত্যা-শিত অমিমাংসিত ঝড়ের রাতের কথা, নয়তো এভাবেই কেন হলো সবটা?
প্রাকৃতিক ঝড়ের তান্ডবে পুরো সানফ্রান্সিসকো শহর যখন লন্ডভন্ড, ঠিক এমন সময় লিভিং রুমের কাউচে মুখোমুখি হয়ে বসে আছে একজন বৃদ্ধ কাজী সাহেব আর জায়ান ক্রীতিক। ক্রীতিকের চোখেমুখে বিরক্তির ছাপ স্পষ্ট, ও বসে বসে দু'আঙুল দিয়ে কপাল স্লাইড করে যাচ্ছে ক্রমাগত।
ক্রীতিকের পাশেই বসে আছেন ওর মা কিয়ারা জায়ান। ছেলের বির-ক্তিকে এক আনা তোয়াক্কা না করেই তিনি হাসিমুখে কাজী সাহেবের উদ্দেশ্যে বললেন,
কাজী সাহেব বিয়েটা পড়ান। সেই সুদূর লস এ্যাঞ্জেলস থেকে বাড়ি বয়ে এসেছেন আপনাকে আবার ফিরতে হবে তো নাকি?
মায়ের কথায় তীর্যক ভ্রু জুগল আরও খানিকটা উঁচিয়ে গেলো ক্রীতি-কের। মায়ের ছেলেমানুষী আবদার, এমন কি জিদের কাছে সবসময়ই নাজুক জায়ান ক্রীতিক। কিন্তু এটাতো অন্যায় আবদার। এই আবদারে মাকে কিছুতেই সায় দিতে রাজি নয় ক্রীতিক।
যার ফলস্বরূপ মায়ের কথার পাছে ঘোর আপত্তি জানিয়ে ক্রীতিক বলে ওঠে,
--- কি শুরু করলে তুমি মা? এভাবে হুট করে এতোবড় একটা সিদ্ধান্ত নিলে আমার রেপুটেশন, ইমেজ, এমনকি জনপ্রিয়তা সবকিছু শেষ হয়ে যাবে। এটা আমার প্রফেশনাল লাইফে ইফেক্ট ফেলবে। সেটা কি তুমি কি বুঝতে পারছো না?
ছেলের কথায় চটে গিয়ে তিরিক্ষি কন্ঠে কিয়ারা বলেন,
-না বুঝতে পারছি না। তিনমাস হলো ত্রিশে পা দিয়েছো, এখনো বিয়ে করবে না তো কখন করবে বুড়ো হয়ে গেলে? তাছারা যারা তোমার ভক্ত তারা সব সময়ই তোমাকে একই রকম ভালোবাসবে, এতে আমার কোনো সন্দেহ নেই।
-আমি এখন কিছুতেই বিয়ে করবো না মা।
আমাকে রাগিও না ক্রীতিক। কাজী সাহেব তখন থেকে বসে আছেন। তুমি আজ বিয়ে না করলে আমি আর অনন্যা যত দ্রুত সম্ভব দেশে চলে যাবো। এখানে আর আমাদের থেকে কোনো কাজ নেই।
মায়ের জিদের কাছে নিজের মাত্রাতিরিক্ত জিদকে কখনোই প্রাধান্য দিতে পারেনা ক্রীতিক। বাবা বেঁচে নেই পাছে না আবার মা ও অভিমান করে ওর থেকে দূরত্ব বাড়িয়ে দেশে চলে যায়। তাই এবার অপারগ ভঙ্গিতে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে হতাশ কণ্ঠে ক্রীতিক বলে,
কাজী তো এনে বসিয়ে রেখেছো, তা বউ পাবো কোথায় শুনি?
কিয়ারা জায়ান স্মিত হেসে আঙুলের ইশারায় অরুকে দেখিয়ে বললেন,
ওই যে তোমার বউ।
মায়ের ইশারা অনুসরণ করে একপাশে কাঁচুমাচু হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা অরুকে দেখে আপনাআপনি ওষ্ঠাধর ফাঁকা হয়ে গেলো ক্রীতিকের। তৎক্ষনাৎ বিস্মিত কন্ঠে বলে উঠলো,
অরু আমার চেয়ে অনেক ছোট মা। তাছাড়া ওর পড়াশোনা...
ক্রীতিকের কথা শেষ করতে দিলেন না কিয়ারা, বললেন,
ওর পড়াশোনা নিয়ে তোমার না ভাবলেও চলবে। তাছাড়া অরুর তো এই বিয়েতে কোনো আপত্তি নেই।
অরুর নিম্ন মস্তকের দিকে চেয়ে দিগুণ বিরক্ত হলো ক্রীতিক। এরকম একটা পরিস্থিতিতে বললাম আর বিয়ে হয়ে গেলো এটা কি ছেলে খেলা নাকি? সুপারস্টার জায়ান ক্রীতিকের সম্পূর্ণ আলাদা একটা জগত রয়েছে। সেখানে অরুর মতো একটা সাধারণ মেয়েকে নিজের সঙ্গে এভাবে জড়িয়ে ফেলা এতোটাও সহজ কথা নয়। মা যে কেন এতোটা ছেলে মানসী করছে কিছুতেই বুঝে উঠতে পারে না ক্রীতিক।
কাজী সাহেব বিয়ে পড়ান।
-- মা, এটা মোটেই ঠিক হচ্ছে না বোঝার চেষ্টা করো আমাকে।
ক্রীতিকের কন্ঠস্বর আহত শোনালো।
ছেলের কথার বিপরীতে কিয়ারা বললেন,
অরুর মতো এতো সুন্দরী একটা মেয়েকে বিয়ে করতে কিসের এতো আপত্তি তোমার? নাকি তুমি চাইছো আমাদের মতের বাইরে গিয়ে কোনো হলিউড নাইকাকে বিয়ে করে বউ বানিয়ে নিয়ে আসবে?
শেষমেশ একরাশ অপারগতা নিয়ে আড় চোখে এক ঝলক অরুর পানে দৃষ্টিপাত করে পুনরায় কাউচের হেডবোর্ডে মাথা এলিয়ে দিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে ক্রীতিক।
কাজী সাহেব ইতিমধ্যে বিয়ের কার্যক্রম শুরু করে দিয়েছেন। কিয়ারা জায়ান হাত বাড়িয়ে ডেকে এনে ক্রীতিকের পাশে বসালেন অরুকে। ভয় আর সংকোচ এই দুইয়ের মিশ্রনে কুঁকড়ে বসে আছে মেয়েটা। ওকে বা-হুতে আবদ্ধ করে চোখের ইশারায় আস্বস্ত করলেন কিয়ারা। বোঝালেন,
একদম চিন্তা করোনা অরু। সব ঠিক হয়ে যাবে। আমার ছেলেটা একটু রগচটা তবে মনটা খারাপ নয়।
যেহেতু বিয়ে পড়ানো হচ্ছে তাই অনন্যা এগিয়ে এসে পাতলা ফিনফিনে শিফনের একটা ওড়না দিয়ে ঘোমটা টেনে দিলো অরুর মাথায়।
ছেলেকে বিয়ে করানোর ভূতটা আজ সকালেই চেপে বসেছিল কিয়ারা জায়ানের মাথায়। তাইতো সকাল থেকেই ব্যাপারটা নিয়ে ছেলের সঙ্গে একপ্রকার গড়িমসি করছেন তিনি।
গরমের ছুটি শেষ। সবাই আবার পুনরায় ফিরে যাবে যে যার আপন কর্ম-স্থলে। সেই শুনেই ক্রীতিকের বিয়ের ব্যাপারটা দিগুণ চড়াও হয়েছে তার মাথায়। চিন্তা একটাই, যে করেই হোক এবার ছেলের লাগাম টা ভা-লোমতো টেনে ধরবেন তিনি। সুপারস্টার হয়েছে বলে কি মাথা কিনে নিয়েছে নাকি? তিনি যখন বলেছেন ছেলেকে এবার বিয়ে করাবেন তখন করাবেন'ই।
তাছাড়া পাত্রী তো ঘরেই বসে আছে। এই সুযোগ হাতছাড়া করার নয়, ভেবে রীতিমতো সকাল বেলাতেই অরুকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে বসেন তিনি। সকাল সকাল ঘুম ভেঙে আচমকা এহেন প্রস্তাব শুনে বিনা মেঘে বজ্রপাত হয় অরুর মাথায়। কি থেকে কি বলবে, কিভাবে আন্টিকে না করবে, সেই ভেবেই আমতা-আমতা করছিল মেয়েটা। তখনই ওর ভেত-রের শেষ আত্মবিশ্বাস টুকু বেলুনের হাওয়ার মতো চুপসে দিয়ে কিয়ারা জায়ান বলেন,
তুমি যে আমার ছেলের জন্য পাগল সে আমি জানি।
চোখের ইশারায় বিছানার কোণে ফেলে রাখা jk খচিত ব্রেসলেটটা দে-খিয়ে মুচকি হেসে বলেন,
ওটা যে ক্রীতিকের সেটাও আমি জানি।
- ইয়ে মানে আন্টি,
মাথা চুলকে কিছু বলবে অরু, তার আগেই কিয়ারা বলেন,
হয়েছে আর কথা ঘুরিয়ে আমাকে ভুলভাল বোঝাতে হবে না, অনু আমায় সব বলে দিয়েছে।
ক্রীতিকের মায়ের কথা শুনে ঘুমন্ত অনন্যার দিকে তাকিয়ে দাঁত খিঁচিয়ে উঠলো অরু। অতঃপর ঘুরে তাকিয়ে মৃদু হেসে ওর মায়ের উদ্দেশ্যে বললো,
কিন্তু আন্টি আসলে আমি এভাবে...
কিয়ারা জায়ান এবার আদুরে সুরে অরুকে মানানোর চেষ্টা অব্যাহত রে-খেই বললেন,
আমার ছেলেকে নিয়ে চিন্তা করোনা মা, ওর চোখে আমি তোমার জন্য কিছু একটা দেখেছি। তাছাড়া আমার ধারণা কখনো মিথ্যে হয়না। তুমি শুধু একটাবার রাজি হয়ে যাও বাকিটা আমি সামলে নেবো।
সারাজীবন ভালোবাসা হীন নিঃসঙ্গতায় বেড়ে ওঠা অরু হুট করেই নাকচ করে দিতে পারলো না কিয়ারা জায়ানের আদুরে আবদারকে। অগত্যা ভালোমন্দ না বলেই বসে রইলো চুপচাপ, মৌনতা সম্মতির লক্ষন সেই ভেবে কিয়ারা পুনরায় শুধান,
তোমার পরিবারের নাম্বার দাও, আমি কথা বলছি।
জবাবে কিঞ্চিৎ মাথা উঁচিয়ে করুন স্বরে অরু বলে,
সেভাবে বলার মতো আমার কেউ নেই আন্টি।
কিয়ারা ঘাঁটালেন না অরুকে, উল্টো উৎসুক কন্ঠে বললেন,
তাহলে তো ভালোই হলো। আজই বরং বিয়েটা হয়ে যাক। এভাবে হুট করে না হলে ঠিক কোনো না কোনো কৌশলে বিয়ে আটকে দেবে আমার বেয়ারা ছেলেটা। আমি বরং যাই কাজী সাহেব কে এক্ষুনি কল করে আসতে বলি।
কথা বলতে বলতে তাড়াহুড়ো কদমে রুম থেকে বেরিয়ে যান কিয়ারা, এদিকে অজ্ঞাত অরুর তন্দ্রাচ্ছন্ন ফাঁকা মস্তিষ্কে সবকিছু এখনো পুরোপুরি ঢুকেছে কি ঢোকেনি, সে কথা বলা বাহুল্য।