ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রণয়ভেলা

৮ম পর্ব

লেখক: সুরাইয়া রাফা

সমুদ্র উপত্যকায় প্রবল জলোচ্ছ্বাস আঁচড়ে পড়ার মতোই সে রাতে এক অনাকাঙ্ক্ষিত আর অপ্রত্যাশিত বিণে সুতোর টানে বাঁধা পরে ক্রীতিক অরু। সে রাতের পুরো ঘটনাটাই যেন কাল্পনিক অরুর নিকট। মস্তিষ্ক হৃদয় সব কিছুই থমকে আছে। কাউকে ভালো না বেসে, বিয়ে করা কি এতোই সহজ? তাহলে ক্রীতিক কেন এতো সহজে মেনে নিলো তার মা-য়ের আদেশ? পুরো বিষয়টা যেন গোলোক ধাঁধার মতোই অদ্ভুত আর রহস্যে ঘেরা।

বিয়ের পরের মূহুর্তে ও অরুর ক্রমাগত মনে হচ্ছিল এখনই বোধ হয় গভীর ঘুমটা ভেঙে যাবে, আর সেই ঘুমের সাথে সাথে উবে আজকের এই সুন্দর রঙিন স্বপ্নটাও। তবে স্বপ্নের রং টা যে খুব একটা রঙিন ছিল না সেটা অরু তখন'ই আঁচ করতে পারে যখন মায়ের উপর এক আকাশ সম অভিমান নিয়ে ঝড় বৃষ্টির রাতেই বাড়ি থেকে রাগ করে বেরিয়ে যায় ক্রীতিক।

এমন একটা অনাকাঙিক্ষত অস্বাভাবিক বিয়ে খুব সহজেই মেনে নেওয়া সম্ভব নয়। অরু ক্রীতিক দু'জনই আপসে এই বিয়েটা করলেও ওদের মনের অবস্থা লন্ডভন্ড। যার ফলস্বরূপ আচরণে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা-নোটা অত্যন্ত স্বাভাবিক। তবে ক্রীতিক যে সেই প্রতিক্রিয়াটুকু এতো দ্রুত প্রকাশ করে ফেলবে, সেটা বোধ হয় অনুমান করেনি স্বয়ং অরু।

বিয়ে হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রেগেমেগে মা'কে কিছু কড়া কথা শুনিয়ে গা-ড়ির চাবি সমেত বাড়ি থেকে হনহনিয়ে বেরিয়ে যায় ক্রীতিক। যাওয়ার আগে এও জানিয়ে দিয়ে যায় যে, সে আর কোনোদিন ও ফিরবে না বাড়িতে।

ওদিকে ওর সদ্য বিবাহিতা স্ত্রী অরু তখনও শূন্য মস্তিষ্কে নিষ্প্রভ টলটলে চোখে চেয়ে থাকে নিজের সুপারস্টার স্বামীর চলে যাওয়ার পানে। আজ ওর নিজেকে নিজে বড্ড উপহাস করে বলতে ইচ্ছে করছে,

সবাই ঠিকই বলেছিল। সুপারস্টার রা আসলে বাইরে যা দেখায় ভে-তরে মোটেও তা নয়। তাদেরও রাগ আছে, জিদ আছে, অভিমানে অভি-যোগে তিরিক্ষি মেজাজ হওয়ার স্বভাব আছে।

সুপারস্টার জে.কে কে নিয়ে অরুর ফ্যান্টাসী তাহলে সম্পূর্ণ ভুল।

অরুর অযাচিত ভাবনার ছেদ ঘটে অনন্যার গম্ভীর আওয়াজে, সে কর্কশ বিরক্ত গলায় মা'কে বলে,

তুমি অরুকে নিজের মেয়ের মতো ভালোবাসো বলে এতো কিছুর পরেও কোনো নিজস্ব মতামত দিইনি আমি। ভেবেছি ভাইয়া রাজি থা-কলে আমার আর আপত্তি করে কি লাভ? কিন্তু এটা তুমি কি করলে মা? নিজের ছেলের ভবিষ্যত ঠিক করতে গিয়ে আমার বেস্টফ্রেন্ডকে বলির পাঁঠা বানালে?

অনন্যার কথায় কোনোরূপ ভাবান্তর হলোনা কিয়ারা জায়ানের মাঝে। তিনি উল্টো মেয়েকে খানিকটা ঘুরিয়ে প্যাঁচিয়ে জবাব দিলেন,

জায়ান ক্রীতিক নিজের ইচ্ছায় বিয়ে না করলে কারো বাপের ও সাধ্য নেই তাকে বিয়ে করানোর। নিজের ভাইয়াকে এতোটুকু চিনলে না অনু?

কেন যেন মায়ের কথার পাছে আর কোনো জবাবদিহিতা করতে শোনা গেলোনা অনন্যাকে।

মা মেয়ের এতো গভীর কথার মানে বুঝলো না স্বয়ং অরু ও। হয়তো বু-ঝতে ও চাইল না। ভালো লাগছে না ওর এসব, অগত্যা জোর কদমে হেটে লিভিং রুম ডিঙিয়ে চলে গেলো নিজের রুমে।

আজ প্রায় সপ্তাহ খানিক হলো ভার্সিটি খুলেছে অরুর। যথারীতি ভার্সিটি খোলার একদিনের মাথায় ডরমিটরিটে ফিরে এসেছে ওরা। সবকিছু আগের মতোই স্বাভাবিক, শুধু স্বাভাবিক হতে পারেনি অরু একা। সে রাতের অনাকাঙিক্ষত বিয়ে, ক্রীতিকের ওভাবে বাড়ি থেকে অকস্মাৎ রাগ দেখিয়ে বেরিয়ে যাওয়া, কোনোকিছুই যেন জুতসই মেনে নিতে পা-রছে না মেয়েটা। কোথাও একটা কিন্তু রয়ে গিয়েছে ওর মন মস্তিষ্ক জুড়ে। রয়ে গিয়েছে অবিচ্ছেদ্য এক সম্পর্কের টানাপোড়েন। অথচ জা-য়ান ক্রীতিকের কোনোরূপ ভাবান্তর নেই তাতে। সেই যে বিয়ের পরে চলে গেলো, এরপর আর কস্মিনকালে ও একটাবার অরুর খোঁজ নেয়নি সে। যেন কিছুই ঘটেনি, বিয়েটা যেন পুরোটাই শুধু একটা দুঃস্বপ্ন মাত্র।

অরু ও আজকাল ভুলে যেতে চায় সবকিছু। চিন্তায় ফেটে পরা এলো-মেলো মস্তিষ্কটাকে ফুরসত দিতে চায় দু'দণ্ড। মাথা থেকে দূরে ঠেলে দিতে চায় সবচেয়ে পছন্দের সেই কল্প পুরুষকে, যে কিনা আক্ষরিক অর্থে এখন ওর স্বামী।

* বৃষ্টিভেজা স্নিগ্ধ সকাল। আজ বহুদিন বাদে নিজেকে একটু স্বস্তির সময় উপহার দেওয়ার প্রয়াসে ক্লাস শেষ হতে না হতেই অরু ছুটে যায় লাইব্রেরি কর্ণারে। ভেতরে গিয়ে হাজারো বইয়ের মিষ্টি সুবাস নাক টেনে বুকে পুরে নেয় অনায়াসে। যেন বহুদিন বাদে আজ প্রাণ ভরে নিঃশ্বাস নিলো অরু। এরপর হাজারো বইয়ের সমাহার হাতরে কয়েকটা পছন্দের বই তুলে নিলো আলগোছে। তখনই মনেমনে ঠিক করে নিয়েছে জীব-নের এতো জটিল সমীকরণ এক সাইডে সরিয়ে ডরমিটরিতে ফিরে আজ সারাদিন বই পড়বে ও।

বই তুলে নেওয়ার সময় লাইব্রেরিয়ান ইনচার্জকে স্বরণ করা হলে তিনি রেজিষ্ট্রি খাতায় ফর্মালিটিস পালন করার সময় অরুর নাম জিজ্ঞেস করলে অরু জবাব দেয়,

অরোরা।

কেন যেন মহিলাটি লিখতে গিয়েও লিখলো না, ইতস্তত গলায় ফের শুধালো,

- শুধুই অরোরা আগে পরে কিছু নেই?

প্রত্যুত্তরে অরু কিছু বলবে, তার আগেই পেছন থেকে কোনো এক আগ-ন্তুক গলা উচিয়ে বলে ওঠে,

মিসেস অরোরা জায়ান।

আবার সেই অপ্রত্যাশিত জটিল সম্পর্কের টানাপোড়েন। না চাইতেও কিভাবে যেন এক রাতের ব্যাবধানে লোকটার সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে গিয়েছে অরু। কিন্তু এই মূহুর্তে এভাবে প্রকাশ্যে এই নাম ধরে কে ডাকলো ওকে? কৌতুহলী চিন্তাশক্তির জোয়ারে তৎক্ষনাৎ পেছনে ঘুরলো অরু, দেখলো ওর দিকে এগিয়ে আসছে অনন্যা। যদিও ওদের সম্পর্কের ধরন এখন পুরোপুরি ভিন্ন তাও অরুর অস্বস্তি হবে ভেবে এসব ব্যাপার গুলো কখনোই প্রকাশ্যে আনেনা অনন্যা। তবে আজ হঠাৎ হলোটা কি ওর?

অরুর ভাবনার মাঝেই ধীর পায়ে ওর দিকে এগিয়ে এলো অনন্যা, সামনে এসে একগাল হেসে ডেকে উঠলো একই সম্মোধনে,

মিসেস অরোরা জায়ান।

অরু নির্বিকার কন্ঠে শুধালো,

আজ হুট করেই এই নামে ডাকছিস? আমি এসবে অভ্যস্ত নই অনন্যা।

অনন্যা সম্মোহনী হেসে ওর কাঁধে হাত রেখে ওকে আস্বস্ত করে বললো,

ডাকছি, তার বিশেষ কারণ আছে।

কি কারণ?

আমার ভাই, না মানে তোর হাসবেন্ড, আসলে মানে হলো সুপারস্টার জায়ান ক্রীতিক লাইব্রেরির গেইটে তোর জন্য গাড়ি নিয়ে ওয়েট করছে।

অনন্যার অযাচিত বাক্যে থমকে গেলো অরু। অজানা অনুভূতিতে শরী-রটা শিউরে উঠলো মূহুর্তেই। কেন যেন অনন্যার কথায় ভীষণ খুশি হতে চেয়েও পারলো না মেয়েটা। ভেতরে ভেতরে অজানা আর অস্বস্তির দা-বানল ওকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে। বহু কসরতে গলা থেকে কয়েকটা শব্দ বের করলো অরু, বললো,

আমার জন্য মানে?

তোর জন্য মানে তোর জন্য। এখন তোর বর তোকে কি কারণে স্বরণ করেছে, সে উত্তর তো আর আমি দিতে পারছি না।

ঠোঁট উল্টে ভাবলেশহীন গলায় জবাব দেয় অনন্যা।

অনন্যার কথাগুলো অস্বস্তিদায়ক হলেও চিরাচরিত সত্যি। তাই অরু আর বেশি কথা প্যাঁচালো না। ওর কথায় সায় জানিয়ে গেইটের দিকে যেতে যেতে বললো,

---- ঠিকাছে দেখছি।

* মূহুর্তটা গোধূলী। সানফ্রান্সিসকো টুইন পিক পর্বতের চূড়ায় নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছে ক্রীতিক অরু। ক্রীতিক কিছুটা সামনে অরু তার পেছনে। টুইন পিক থেকে পাখির চোখে পুরো সানফ্রান্সিসকো শহরটাতে চোখ বোলানো যায় এক নজরে। গোধূলি বেলায় সূর্যের ঝাঁ ঝাঁ তেজস্ক্রিয়তা কমে এসেছে কয়েকগুণ। ঝুরঝুরে গুড়ো সোনালি রোদে ছেয়ে গিয়েছে পুরো শহর। নিজের কল্প পুরুষের এতোটা কাছে দাঁড়িয়ে সবসময়ের মতোই কেটে ফেলা ডগার ন্যায় সংকোচে মিয়িয়ে আছে অরু। তনু মনের উপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে হাজারো অজানা প্রশ্নের ঝড়।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৮ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন